Monday, June 27, 2011

পাছে লোকে কী বলে..


আমার এক ছোট বোন বিদেশ পাড়ি দেয়ার আগে খুব মন খারাপ করে আমাকে মেইল করেছিল, আপু, মানুষজন বলে আমি নাকি বাইরে একা পড়তে গিয়ে নষ্ট হয়ে যাব্, এমন সব কথা বলে... আমি যেসব কল্পনাও করতে পারিনা। i m feeling so low...  

আপু, তোমাকে মেইল এর উত্তরে বলেছিলাম, এখনও বলি, পৃথিবীতে কোন মানুষের তোমার সম্পর্কে কমেন্ট করার অধিকার নাই। তুমি যাই কর, মানুষ তোমার সম্পর্কে আজেবাজে কথা বলার অধিকার রাখেনা। তুমি একটুও ভয় পেওনা আপু, তুমি ভাল থাকলে আল্লাহ তোমার সম্মান রক্ষার দায়িত্ব নিবেন আর তোমাকে যারা দু:খ দিল তাদের বিচার করার ভারও আল্লাহ নিবেন। 

ইসলামের কিছু কিছু ব্যাপার খুব মজার। এখানে individualism কে ্সমর্থন করা হয় যতক্ষণ না পর্যন্ত সামাজিক গঠন ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তোমার কোন আচরণ যদি সত্যি উদ্বেগজনক হয়, তখন তোমাকে শুধরে দেয়ার দায়িত্ব অন্যদের। মন্তব্য করার অধিকার কারো নেই এটা ঠিক, কিন্তু উপদেশ দেয়ার অধিকার রাখে যে কেউ। এমনকি যদি তা ঘরের বুয়া বা ড্রাইভার ও হয়! ইসলামে পাশ্চাত্যের মত "who r u to tell me this" এর কোন জায়গা নেই। sincere advice যদি কেউ দেয় সেটাকে অবশ্যই শ্রদ্ধা করতে হবে। মানা না মানা তোমার ব্যাপার, কিন্তু তা হেসে উড়িয়ে দিতে পারনা। 

জিনিসটা কী strikingly different না? আমরা তথাকথিত সুশীল প্রাণীরা কী করি? প্রিয় বন্ধুকে ঘুণাক্ষরেও টের পেতে দেইনা যে তার আদৌ কোন দোষ আছে। অথচ আড়ালে সেটা নিয়ে কথা বলতে একটুও বাধে না। এটা হচ্ছে খুব সহজ একটা 'সাপও মরল না, লাঠিও ভাঙল না' টাইপ অ্যাপ্রোচ। তার কাছেও আমি ভাল থাকলাম, আবার সেও অন্যদের কাছে ছোট হল।

অথচ ইসলাম মানলে কী হবে জান আপু? বন্ধুত্ব নষ্ট হওয়ার ঝুঁকি নিয়ে তার দোষ সংশোধন করার দায়িত্ব আমাকে নিতে হবে, ধৈর্য ধরে, নরমভাবে দিনের পর দিন তাকে বলতে হবে। পাশাপাশি বন্ধুত্বের বাকি প্রয়োজনগুলিও মেটাতে হবে, যাতে আমাকে তার কেবলই ভাঙা উপদেশ বাক্স মনে না হয়। আবার তার একই দোষের কথা যখন অন্যেরা আলোচনা করবে, তখন আলোচনার মোড় ঘুরিয়ে দিতে হবে, যাতে করে মানুষজনের কাছে আমার বন্ধুর কোন বাজে ইমপ্রেশন না পড়ে। সেটা সম্ভব না হলে স্বীকার করতে হবে, হ্যা, তার এই দোষটা আছে, তবে তার মধ্যে পরিবর্তন আসছে/এসেছে....

এক সাহাবীর গল্প শুনেছিলাম (সম্ভবত উমর রা এর), তিনি অপর এক সাহাবীকে বলছেন, তুমি আমার দোষ বর্ণনা কর। অপর সাহাবী বললেন, ইয়া আমিরুল মু'মিনীন, আমি ত আপনার কোন দোষই দেখতে পাইনা। উনি তখন তেড়ে মারতে গেলেন, "আমি কি তোমাকে আমার গুণগান করার জন্য বলেছি?" অপর সাহাবী তখন উমর (রা) এর দোষ বলল, "আমি শুনেছি আপনি দুই পদ খাবার খান, ্‌আর দুইটা কাপড়ের থেকে একটা বেছে পরেন।" 

সুবহানাল্লাহ! আমাদের কে কেউ এইরকম দোষের কথা বললে সাথে সাথে ডিফেন্ড করার চেষ্টা করতাম, এটা আবার দোষ হল নাকি? হাদীস এ ত আছেই, আল্লাহ সুন্দর এবং তিনি সৌন্দর্য পছন্দ করেন ইত্যাদি ইত্যাদি। উমর (রা) কেবল বললেন, ঠিক আছে, আজকের পর থেকে আর এটা নিয়ে তোমাকে ভাবতে হবেনা।

লোকে যদি কিছু বলেই ফেলে আপু, তার মাপকাঠি দিয়ে তুমি নিজেকে বিচার করনা। কারণ মানুষ একটা খারাপ দেখলে সাথে সাথে বলে ফেলে, আবার তার একটা উপকার করলে পুরনো সব কথা ভুলে যায়। আরবিতে মানুষের একটা নাম 'ইনসান', ইনসান যে রুট থেকে এসেছে তার অর্থ forgetfulness. তোমার সেল্ফ ইমেজ যখন অন্য মানুষের ভিউ এর উপর ভিত্তি করে তৈরি হবে, তখন মনের এই টানাপোড়েনের মধ্যে তোমাকে সারাক্ষণই থাকতে হবে। তোমার ব্যক্তিত্ব শেয়ারবাজারের সূচক না যে ঘন্টায় ঘন্টায় ওঠানামা করবে। 

তাহলে ব্যক্তিত্ব যাচাই করব কী দিয়ে? নিজেকে মাপব কীসের ভিত্তিতে? আমি ঠিক আছি কিনা বুঝব কীভাবে? বোঝার সবচেয়ে ভাল উপায় হচ্ছে পৃথিবীর বেস্ট মানুষটাকে স্ট্যান্ডার্ড ধরা। তার কাজ, কথা, আচরণ খুব ভালভাবে লিখে রাখা আছে। 

একটা ছোট্ট উদাহরণ দেই। হুদাইবিয়া সন্ধির আগে মক্কা যাওয়ার পথে এক জায়গায় রাসুলুল্লাহ (স) এর উট মাঝপথে বসে পড়ল। তাকে আর কিছুতেই নাড়ানো চাড়ানো যায়না। এটা দেখে এক সাহাবী মন্তব্য করলেন, আপনার উট অথর্ব হয়ে গেছে। তিনি তখন উত্তর দিলেন, তুমি তাকে যে দোষ দিলে তা তার মধ্যে কখনোই ছিলনা। তার প্রতিপালক তাকে থামিয়ে দিয়েছেন, যিনি এর চেয়ে বড় প্রাণীকেও থামিয়ে দিয়েছিলেন (সুরা ফীল এর কাহিনী নির্দেশ করছিলেন)। 

একটা উট, তার সম্মান রক্ষাও রাসুলুল্লাহ (স) এর জন্য গুরূত্বপূর্ণ ছিল। আমরা হলে কী বলতাম, না, মনে হয় আল্লাহ তাকে থামিয়ে দিয়েছেন - এটা বলার মাধ্যমে আমরা অ্যাক্সেপ্ট করে নিতাম, যে অথর্ব ও হতে পারত, কিন্তু মনে হয় এখনও হয়নাই। এই টাইপের ছোট্ট ছোট্ট ইঙ্গিত কিন্তু আমরা প্রায়ই করি, রাসুলুল্লাহ (স) করতেন না। 

আরেকবার উনি স্ত্রীদের উপর রাগ করে একমাস বাড়িতে প্রবেশ না করার ওয়াদা করেছিলেন। একমাস শেষে ফিরতে আয়শা (রা) এর সাথে দেখা হল। আয়শা (রা) এর প্রশ্ন টা শোন! "একমাস হতে ত আরো একদিন বাকি আছে। একদিন আগে চলে আসলেন কেন?" আমাকে আমার স্বামী এই কথা জিজ্ঞাসা করলে কী করতাম? থাক্‌, না বলি। উনি বললেন, "আয়শা, মাস ত্রিশ দিনের ও হয় আবার ঊনত্রিশ দিনের ও হয়।" :D

লোকের কথা শুনে যদি কষ্ট পাও আপু, রাসুলুল্লাহ (স) কীভাবে রিঅ্যাক্ট করত দেখে নাও। উনার সময়কার লোকজন ঠাস ঠাস মুখের উপর কথা শুনায় দিতে ওস্তাদ ছিল্। গুজবের হাত থেকে উনি, উনার স্ত্রী কেউ রেহাই পায়নি। অথচ উনার না ছিল পড়াশুনা, না ছিল কোন জ্ঞানী লোকের সাহায্য। তোমার জন্য কিছু ভাল লেকচার আছে, শুনলে মন খারাপ চলে যাবে আশা করি। 


Shaykh Yaasir Fazaga  Self image psychology - http://www.youtube.com/watch?v=bJFmCG_-_34
Nouman Ali Khan Justice vs forgiveness - 

No comments:

Post a Comment