Monday, June 27, 2011

দেশে ফেরা


দূরে বসে দেশ নিয়ে বুলি কপচানো সাজে না। প্রতি মাসে অন্তত একবার পরিচিত কেউ না কেউ জানতে চায়, তোমরা পড়াশুনা শেষে এইখানেই থাকবা না দেশে ব্যাক করবা? প্রথম প্রথম প্রশ্ন শেষ হওয়ার আগেই উত্তর দিতাম, 'অবশ্যই অবশ্যই যাব।' পরে চিন্তা করে দেখলাম, এত শিওর হয়ে ভবিষ্যদ্বাণী করার আমি কে? আজকাল তাই সাথে একটা ইনশাল্লাহ যোগ করি।

আসার পর অসংখ্যবার নিজের মনে ওলটপালট করে দেখেছি, মন থেকে কেউ একজন বলে, দেশে গিয়ে করবা কী? বাবা মা কে বছরে একবার দেখে আসলেই ত হয়! বেশি টান লাগলে কিছু টাকা ডোনেট করে দিও... এখানে কত সুযোগ সুবিধা, দেশে ফিরে গেলে কিছুদিনের মধ্যেই আবার ফিরে আসতে মন চাইবে।

কথাগুলি খুব সত্যি, এমন কি আমি নিজের মন থেকে অগ্রাহ্যও করতে পারিনা। কে জানে, একটা সময় হয়ত আসলেও তাই করব! তারপরেও যখন মনে হয়, একদিকে নিজের ক্যারিয়ার, সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য অন্যদিকে মনের গভীরে গেড়ে থাকা আপন দেশ, পরিসরে এক হয়ে থাকার ইচ্ছা - দুটোর মধ্যে যে কোন একটা বেছে নিতে হবে - তখন নিজেকে খুব স্বার্থপর লাগে। 

একটা সময় পর্যন্ত আমার কাছে সত্যিকারের সাফল্য ছিল পিএইচডি, পাবলিকেশন, পোস্ট ডক ইত্যাদি। এতটা প্যাশন কাজ করত, তার জন্য আর সব কিছুকে (চরিত্রটা ছাড়া) ত্যাগ করতে প্রস্তুত ছিলাম। প্রথম যখন এডমিশন পেলাম, রনি কে মুখের উপর বলে দিলাম, তুমি যাও না যাও, আমি যাচ্ছি, ইট'স মাই ড্রিম, মাই লাইফ। মি, মাই, মাইন -- এই শব্দগুলি আমার মনে আসত খুব স্বাভাবিকভাবে, প্রতিদিন অসংখ্যবার। কেউ যদি চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়েও দিত আমি অহংকারী, আমি স্বার্থপর - বিশ্বাস করতাম না। ভাবতাম, এটুকু হওয়ার প্রয়োজন আছে। 

সেই দিনগুলিতে আমার জন্য শ্রেষ্ঠত্বের স্ট্যান্ডার্ড ছিলাম আমি নিজেই। বুঝতাম, প্রত্যেকটা মানুষই নিজের একটা অহমিকা নিয়ে থাকতে চায়। তাই যে কাজিনটা অল্প বয়সে বিয়ে করে লেখাপড়া থেকে দূরে আছে তার সাথে গিয়ে পড়াশুনা, এইম ইন লাইফ নিয়ে কথা বলতাম। যে পড়ার মধ্যে ডুবে অন্য কিছু নিয়ে মাথা না ঘামাত তাকে বলতাম সাহিত্য, গান এসবের কথা। উদ্দেশ্য একটাই, তাকে কোন না কোন ভাবে জানিয়ে দেয়া যে আমি ওর চেয়ে একটু বেশি উন্নত। 

গ্রামের আত্মীয়দের সাথে ভাল করে কথা বললে নিজের ভেতরেই মনে হত, আমি কত মহৎ। কাছের কোন বন্ধু কে তার খারাপ সময়ে স্বান্তনা দিতে পেরে মনে হত, উফ! আমি মানুষকে এ্ত ভালবাসি কেন? আমি আমি আমি আমি আমি.......... 

সত্যি কথা, আমি যে ভুল কিছু করছি সেটা আমার স্বপ্নেও কল্পনা করতে পারতাম না। কারণ তখন আমার একমাত্র ধ্যান জ্ঞান ছিল ক্যারিয়ার। প্রতিদিনের প্রতিটা মুহূর্ত থাকবে ক্যারিয়ারের জন্য, আর এদিক ওদিক যাওয়া আসার পথে টুকরো টাকরা ভাল কাজ করব, just to make me feel better. 

একটা মানুষের জীবনের লক্ষ্য যখন এত সংকীর্ণ হয় তখন সে অবশ্যই তার লক্ষ্যের দিকে সফল হবে। তার জন্য পরিবারের মানুষগুলির অযত্ন হোক, কিচ্ছু যায় আসে না। একটা ছোট্ট কথায় ছোট্টবেলার বন্ধুর বুক চিরে যাক, ব্যাপার না। ভাড়া নিয়ে গন্ডগোল হলে রিকশাওলাকে ঝাড়ি দিতে গায়ে লাগেনা, কোন কিছু পছন্দ না হলে মুখের উপর বলে দিতে খারাপ লাগেনা, সে যেই হোক। 

সন্দেহ নেই, আমি যদি সেই আমিই থাকতাম, দেশে ফিরে যাওয়ার চিন্তা করতাম না।

আমি অপুর কাছে খুব কৃতজ্ঞ, সে আমাকে বলেছিল, তুই ক্যারিয়ার, পিএইচডি এইসব কিছুকে ছেড়ে দে। আরেকটু বড় পরিসরে চিন্তা কর। তুই সারাজীবন আর সব কিছু বাদ দিয়ে রিসার্চ করে গেলি, ultimately এটা তোর কী কাজে আসতেসে, বা দেশের মানুষ কতটুকু বেনিফিটেড হচ্ছে? ফ্যামিলির কথা বাদই দিলাম। বা আরেকটু পরের কথা চিন্তা কর, তুই নিশ্চয়ই বিশ্বাস করিস তোকে আল্লাহর সামনে দাঁড়াতে হবে। তুই আল্লাহর সামনে কী নিয়ে দাঁড়াবি? 

That was the first time I started thinking about purpose. আমার অন্ধের মত পিএইচডির পেছনে ছোটার কারণ কী? কারণ এটা আমাকে একটা বাড়তি সম্মান দিবে। আমার বাবা মা খুব গর্ব করে মানুষের কাছে বলতে পারবে। আর কোন না কোন ভাবে entire humanity কে সাহায্য করা হবে। 

এই অল্প কয়েকটা জিনিসের মোহে আমি এত ডুবে ছিলাম যে আর সব কিছু ফেলনা হয়ে গিয়েছিল? আমি যদি পিএইচডির পাশাপাশি একটা সৎ, ভাল মানুষ হই সেটা ত আরো অনেক বেশি সম্মানের, আমার বাবা মা গর্ব করার আরো অনেক কিছু পাবে। আর হিউম্যানিটি কে সাহায্য? হাহ!

মুহুর্তে priority বদলে গেল। বুঝলাম, আল্লাহর দেয়া জ্ঞান বুদ্ধি কাজে লাগিয়ে গবেষণা করার আগে আল্লাহর প্রতি আমার responsibility পালন করা উচিৎ। PhD শেষে দূরে অ্যাপ্লাই করার আগে ফ্যামিলির সাথে থাকতে পারব কিনা সেটা চিন্তা করা উচিৎ। আজীবন আরাম আয়েশের জন্য USA এর মাটি কামড়ায় পড়ে থাকার চেয়ে আমার দেশের হক পূরণ করা উচিৎ। 

দেশে গিয়ে কী করব? জানিনা। প্রাইভেট ইউনিভার্সিটির টিচার হব, খুব বেশি হলে আই.সি.ডি.ডি.আর.বি তে ঢুকব। এখানে স্কলারশিপের টাকায় যা পাই তার তিন ভাগের এক ভাগ আয় করব। তাতে কি না খেয়ে মরে যাব? নাহয় আমার একটা এসএলআর ক্যামেরা থাকবে না। এর অর্ধেক টাকায় আমার আব্বুর তৈরি গ্রামের স্কুলে প্র্যাকটিকাল এর জিনিসপত্র কিনে ভরে দেয়া যায়। আর দুর্নীতি, যানজট, লোডশেডিং - আমি ত এগুলোর মধ্যেই বড় হয়েছি। আমার ছেলেমেয়েরা পারবে না? 

এখনও বন্ধুরা মেইল করে, তোকে খুব মিস্ করি। বোন মন খারাপ হলে ফোন করে। আম্মুর থেকে টুকরো টাকরা নানারকম পারিবারিক সমস্যার কথা শুনি। আমি কাছে থাকলে আমার যা আছে স...ব দিয়ে ওদের সাহায্য করার চেষ্টা করতাম (ভাব বাড়ানোর জন্য না, আল্লাহকে ভালবেসে।) গ্রামের আত্মীয় আমার বাসায় উঠে চিকিৎসা করাতে পারত। রিকশা থেকে নেমে রিকশাওলাকে বলতে পারতাম, আজকে আমার এখানে খেয়ে যান। এই কাজগুলি তেমন কঠিন না, মানুষের কাছে দাম খুব একটা বাড়বে না। কিন্তু আল্লাহর কাছে দাম হু হু করে বেড়ে যাবে। 

দেশে ফিরব নাকি? একদিকে আছে ফি-সপ্তাহে পার্টি, সেখানে নতুন নতুন শাড়ি পরে ক্যারিয়ার নিয়ে বড়ফাট্টাই, আরেকদিকে আছে দূ...র গ্রামে আমার দাদী, আশির মত বয়স, দেখলেই ফোকলা দাঁতে বলবে, জেমী নাকি? তা কির'ম আসিস? একটা শাল কিনে গায়ে জড়ায় দিলে মহা খুশি। 

in the end, what makes you really happy? have you ever asked yourself?

No comments:

Post a Comment