Wednesday, December 28, 2011

শেখার কোন শেষ নেই

I have learnt silence from the talkative, toleration from the intolerant, and kindness from the unkind; yet strange, I am ungrateful to these teachers. 

Kahlil Gibran এর এই কোট টা আমি প্রথম শুনি যখন ইউনিভার্সিটির এক ফ্যাকাল্টির খুব বাজে ব্যবহার পেয়ে আমার মন অসম্ভব খারাপ। এই কথার অপরিমিত শক্তি বোঝার অবস্থা তখন আমার ছিলনা। আমি তখন দুঃখের সাগরে ডুবছি। কিন্তু এর পর থেকে, গত দেড় বছরে, এই কথাগুলো একদিনের জন্যেও ভুলিনি। প্রতিদিন অল্প অল্প করে, একটু আধটু করে নিজের অভিজ্ঞতা দিয়ে বার বার অনুভব করেছি এর প্রয়োজন।

আমরা কি আমাদের চারপাশ থেকে শিখি? সবাই বলবে শিখি। কেমন করে? এই যেমন ভাল জীবনাচরণের উদাহরণ দেখলে তার মত করে চলার শিক্ষা নেই, কারো আত্মবিশ্বাস আমাদের উদ্বুদ্ধ করে, কারো সৃষ্টিশীলতায় মুগ্ধ হয়ে আমরা অনুপ্রাণিত হই, আমাদের আগামী প্রজন্মও যেন এমন হয় - ইত্যাদি ইত্যাদি। নিজের জীবনে ঠেকে শিখি সবাই। অনেকে অনেক ঠকেও ধরতে পারেনা ঠিক আর বেঠিকের ফারাক। শিখছি আমরা প্রতিদিনই। কিন্তু কাজে লাগাতে পারছি কতটুকু? 

আমরা মানুষেরা বোধহয় জন্মগতভাবেই ভুলোমনা। বড় হওয়ার সাথে সাথে ভুলে যাই কৈশোরের আমাদের মনটা কেমন ছিল। আমরা বোধহয় স্বার্থপরও, নিজেকে আরেকজনের অবস্থানে বসিয়ে কিছুতেই বিচার করতে পারিনা কেন একজন মানুষ ভুল করে। আমার জন্য যেটা খুব সহজ, অপরজনের জন্য তাই হয়ত নিত্যদিনের স্ট্রাগল। আমার এক কাছের মানুষ সময়ের ব্যাপারে খুব বিচক্ষণ, অন্য কেউ সময়ের নড়চড় করলে তার থেকে কর্কশ মন্তব্য শুনতে হবেই। তার কথা হচ্ছে আমি ত কোন কমিটমেন্ট করলে আর সব কিছু সেভাবে প্ল্যান করে নেই, তুমি পার না কেন? সেই একই মানুষ নিত্যনিয়ত স্ট্রাগল করে যাচ্ছে তার বাকযন্ত্র কে সংযত রাখার। প্রতিদিন সে হেরে যায় এখানে, বার বার হারে, একই ভুল প্রতিদিন করে। তবু সে শেখেনি - স্ট্রাগল প্রত্যেকেরই আছে, যার যার নিজের মত, সময়ের হোক অথবা সংযমের। 

নিজের সংসার হওয়ার পর থেকে আমি প্রত্যেকটা পরিবারকে খুব ভালভাবে পর্যবেক্ষণ করি। প্রবাসে থাকি, বাবা মা, শ্বশুরবাড়ি ত নেই, এরাই সব। বেশ অনেকদিন ধরে সংসার করছেন এমন বড়বোনদের সংসর্গে থাকার চেষ্টা করি, যাতে তাদের অভিজ্ঞতালব্ধ শিক্ষা অল্প আয়াসে অর্জন করে ফেলতে পারি। শিক্ষার ধরণটাই এমন, না ছেঁকে নেয়ার উপায় নেই কোন কিছুই। গ্র্যাড স্কুলে এতদিন ধরে আমাদের এটাই অনেক কষ্টে শেখানোর চেষ্টা করছে, কোন পাবলিকেশন বিশ্বাস করবে না, ডাটা যাচাই না করে। একটা সময় বুঝলাম, এই পদ্ধতি শুধু একাডেমিক লাইফে না, সোশ্যাল লাইফেও খুব জরুরি। ছোটবেলা থেকে শিখে এসেছি বাবা মা সবসময় ঠিক, স্কুল কলেজ ইউনিভার্সিটিতে শিক্ষক মানে অবিসংবাদিত চরিত্রের অধিকারী, তাদের একটু চ্যুতি দেখলে মুষড়ে পড়তাম। আশ্চর্য ব্যাপার, কেন কখনও কেউ বলে দেয়নি, তাদেরও ভুল হয়, ভুল করতে দেখলে হতাশ না, শিখতে হয়। তেমনি এখনও, সুপারভাইজর কে মাথায় তুলে রাখি, আত্মীয়, বন্ধুবান্ধব সহ নিজেদের পরিবারকে ভাবি সব ভুলের ঊর্ধ্বে, যখন দেখি ভীষণ নীতিবাগিশ মানুষটি জীবনের কোন একটা জায়গায় এসে অন্যায় করে ফেলছে, তখন তার উপর বিশ্বাসটাই চলে যায়। কেন, সে কি ভুল করতে পারেনা? অন্যায় করলেই আমি তার থেকে শেখা বন্ধ করে দেব কেন? তার ভুলটা ত আমিও করতে পারতাম! 

অনেকদিন ধরে পরিচয় থাকলে মানুষের ভাল খারাপ সবকিছুই চোখে পড়ে। সমস্যা হচ্ছে, আমি কিছুদিন যাওয়ার পরেই তাকে লেবেল করে ফেলি, 'আমি একে পছন্দ করি, আমি একে পছন্দ করি না।' তারপর যাদের পছন্দ করি, তাদের ভাল গুণগুলি খুঁটিয়ে দেখে শিখতে থাকি, আর যাদের পছন্দ করি না, তাদের দোষগুলিও মনের মধ্যে জমা রেখে শিখতে থাকি। উল্টোটা সচেতনভাবে কখনই করতে পারিনা। বিশেষ করে যাকে পছন্দ করিনা, তার গুণগুলো দেখতে আমার ভীষণ এলার্জি। কিন্তু এটা কি ঠিক পথ? আমি না আল্লাহর কাছে দুআ করি উনি যাতে আমাকে সরল পথে রাখেন সঠিক পথে রাখেন? নাস্তিকরা যা বলে তার কি সব খারাপ? ইসলামের দোহাই দিয়ে গালিগালাজ থেকে শুরু করে আর যা কিছু করা হয় তার কি সব ভাল? আমরা ছাঁকতে শিখিনি। বাইনারি ডিজিট এর মত 'All or none' এই জায়গাতে এসে থেমে গেছি। 

আমি শিখছি, সবই শিখছি, সাইকোলজিক্যাল ডিজঅর্ডার থেকে শুরু করে স্ট্রিং থিওরি - তত্ত্বকথা যত আছে, জীবনের সাথে সামঞ্জস্যহীন - তার সবকিছুতেই আমার খুব আগ্রহ। কিন্তু শিখিনি গৃহস্থালির খুব বেসিক কিছু বিষয়ও, শাক সবজি কীভাবে তাজা রাখা যায়, ঘরকে পরিচ্ছন্ন রাখার জন্য কী কী রুটিন মেনে চলা জরুরি - এগুলো কোন কিছুই আমার কাছে জরুরি মনে হয়নি কোনদিন। একদিন ব্লগে দেখলাম এক ছেলে অহংকার করে বলছে, 'আমি জীবনে কোনদিন ভাত বেড়ে খাইনি।' আমরা না পারা, না জানা - এসবও অহংকার করার বিষয় মনে করি। শিক্ষার কী অদ্ভুত বিকলাঙ্গ রূপ! 

যাই হোক, এত হতাশামার্কা কথা বলে লেখা শেষ করতে চাইনা। যারা ছাত্রজীবনে আছেন, বিশেষ করে যারা দেশে আছেন, তারা অবসর সময়ে হতাশা চর্চা না করে চলুন একটু বড় বড় চোখ করে চারপাশে তাকাই। যদি বৃষ্টির জন্য বাসা থেকে বের হতে না পারেন, একটু রান্নাঘরে যান, দেখুন মা কীভাবে চটপট রান্না, ধোয়ামোছা সবই খুব স্মার্টভাবে করে ফেলেন খুব অল্প সময়ে। এটা একটা স্কিল। দুপুরে বিছানায় অলস শুয়ে থাকলে চুপচাপ একটু ভাবুন আপনার অপছন্দের কোন মানুষের কথা। তার ভাল দিকগুলো, দোষগুলো - সবকিছু নিয়েই চিন্তা করুন। শেখার অ-নে-ক কিছু পাবেন। বাবাকে যদি সবসময় দেখেন ব্যাংকে বিল দিয়ে আসলেই মেজাজ খারাপ থাকে, তাহলে একদিন তার সাথে যান, শেখা হয়ে যাবে মেজাজ ঠিক রাখতে হলে কোন কোন জিনিসগুলো সহ্য করতে শিখতে হবে। শেখার কি শেষ আছে? অল্প কথায় কী করে অনেক কথা বলা যায় - তাও একটা শেখার মত জিনিস, আমাকে যেটা শিখতে হবে খুব শীঘ্রই।

Tuesday, December 13, 2011

আমাদের আড্ডা

গ্র্যাজুয়েট স্টুডেন্টদের জীবনটা বেশ পানসে টাইপ। বাসা, ল্যাব, ল্যাব, বাসা - এই করে করেই আড়াই বছর কাটিয়ে দিলাম। আন্ডারগ্র্যাডরা দেখি কত রকমের ক্লাব করে, কমনস্ এ নাচ প্র্যাক্টিস করে - আর ফ্রি মুভি, সোশ্যাল আওয়ার - এসব ত চলছেই। অনার্স পড়াকালে আমারও কতকিছুতে উৎসাহ ছিল, এখন কেবল চশমা এঁটে ভারিক্কি চেহারা করে ল্যাবে গিয়ে ডেস্কে বসে থাকি। ছুটির দিনগুলোতেও ভারি আলিস্যি, ঝিমিয়ে ঘুমিয়ে আর virtual socializing করে করেই দেখি দুই দিন পার হয়ে গেছে। 

আমাদের মতই আলস্যপ্রিয়, উদ্যমহীন, ভাবুক শ্রেণীর আরও কিছু গ্র্যাড স্টুডেন্ট এর পরিচয় হয়েছে এই দু'বছরে। দেশীয় স্টাইলের আড্ডার নেশা ঢুকিয়ে দিয়েছি ওদের মধ্যেও। মনে যত কথা আসে, ভাঙা ইংরেজিতে তার অর্ধেকও প্রকাশ করতে পারিনা, তাতে কী হয়েছে? আন্তরিকতা আর হৃদ্যতার বোধ করি ভাষা প্রয়োজন হয়না। কারও একজনের পরীক্ষা ভাল হলে বা প্রেজেন্টেশন/প্রজেক্ট শেষ হলে মহানন্দে রান্না করে সবাইকে আমন্ত্রণ জানায় খেয়ে যাবার জন্য। প্রতি সপ্তাহেই এই মুখগুলো দেখি, মাঝে মধ্যে মনেও হয়, এত কী কথা বলব? সেদিনই ত দেখা হল! 

কিন্তু মজা হচ্ছে এদের সাথে কথা বলার টপিক কখনও ফুরায় না। পৃথিবীর যাবতীয় নিয়মকানুনের গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে আমাদের প্রশ্ন। রাজনীতি নিয়ে আমাদের তর্ক, সাদার সাথে শুভ্রতা আর কালোর সাথে কেন মন্দকে মেলানো হবে তাই নিয়ে আপত্তি। আফ্রিকান আমেরিকানরা কতটা নির্যাতিত হয়েছে (এখনও হচ্ছে) এ বিষয়ে বিশেষজ্ঞজনের মতামত ইত্যাদি ইত্যাদি। দর্শন হচ্ছে প্রত্যেকের প্রিয় বিষয়বস্তু। আমরা কীভাবে বিভিন্ন ঘটনাকে দেখি, কীভাবে সিদ্ধান্ত নেই, কোনটা শিক্ষণীয়, কোনটা মিডিয়ার প্রভাব - এসব নিয়ে সূক্ষ্মাতিসূক্ষ পর্যালোচনা চলছেই। 

আরেকটা অতিপ্রিয় বিষয় হচ্ছে মানুষের ব্যক্তিত্ব কীভাবে গড়ে ওঠে, সম্পর্কগুলোর প্রতি দৃষ্টিভঙ্গি কীভাবে ঘাত প্রতিঘাতে নতুন রূপ নেয়, সম্পর্কের প্রতি দায়িত্বশীলতা gender ও culture ভেদে কতটুকু ভিন্ন হয়, আদর্শ ব্যক্তিত্ব ও আদর্শ পরিবার কেমন হওয়া উচিৎ এসব। বলা বাহুল্য, এধরণের চিন্তাভাবনার অফুরন্ত খোরাক আছে ধর্মে। তাই ঘুরে ফিরে আমাদের তর্কে বারবারই আসে ধর্ম। যেহেতু সবাই মুসলিম, অল্প বিস্তর প্রত্যেকেরই আগ্রহ আছে ইসলামকে জানার, আর অন্য ধর্মগুলো নিয়ে জ্ঞানের পরিধি ভয়ঙ্কর রকমের কম, তাই ইসলামকে নানা দৃষ্টিকোণ থেকে আলোচনা করা হয় প্রায়ই। 

একটা সময় আমরা খেয়াল করলাম আমাদের আলোচনাগুলো, প্রশ্নগুলো একই জায়গায় ঘুরপাক খাচ্ছে। কারণ আমরা কুরআন ভাল জানিনা, হাদীস গল্পের মত পড়েছিলাম কোন এক কালে, সীরাহ (রাসুলুল্লাহ (স) এর জীবনী) সম্পর্কে ত অতল অন্ধকারে। আমাদের আড্ডায় চিন্তা করার মত অসাধারণ মাথা আছে অনেক, কিন্তু জ্ঞানের সীমাবদ্ধতার কারণে হিরা কাটার ছুরি দিয়ে ঘাঁটছি কাদামাটি। এর মধ্যে তারিক রামাদানের লেকচার শুনতে Johns Hopkins এ গেলাম, উনি বারবার জোর দিয়ে বললেন, মুসলিমদের তার মূল রেফারেন্সে আসতে হবে। কুরআন ও হাদীস বুঝতে হবে, কিন্তু একই সাথে intellectual humilityর চর্চাও করতে হবে। সব শুনে মনে হল ইসলামকে বিভিন্ন আঙ্গিকে বুঝতে চাওয়ার আমাদের এই প্রয়াসটা ঠিকই আছে, কিন্তু রেফারেন্স অংশটুকু অনুপস্থিত। 

ঐ দিনই লেকচারের পর আমরা একটা রেস্টুরেন্ট এ খেতে গিয়েছিলাম, ওখানে বসে ঠিক করলাম, প্রতি শুক্রবার সন্ধ্যায় আমরা কারও বাসায় একত্রিত হব, শুধুমাত্র কুরআন, হাদীস এবং সীরাহ নিয়ে methodically জ্ঞান অর্জন করতে। কীভাবে methodically জ্ঞান অর্জন করা যায়? আমাদের ৮-৯ জনের মধ্যে ৩ জন প্রতি সপ্তাহে ৩টা পার্ট আলোচনা করবে। কুরআন ৩০ মিনিট, হাদীস ৫-১০ মিনিট, সীরাহ ২০ মিনিট। মাগরিবের পর শুরু হবে, খাওয়া দাওয়া হবে, আলোচনার যে কোন অংশে যে কেউ প্রশ্ন এবং তর্ক বিতর্ক শুরু করতে পারে। তবে একজন (আমাদের মধ্যে ওরই পড়াশুনা সবচেয়ে বেশি) খেয়াল রাখবে আলোচনা যেন বেশি অফট্র্যাক হয়ে না যায়, বা অতি উত্তপ্ত হয়ে না যায়। 

গত ছয় সাত মাস ধরে অনিয়মিত ভাবে এই স্টাডি সার্কেল চলে আসছে। 

আমাদের মধ্যে কেউই স্কলার না হওয়ায়, আর খুব ঘনিষ্ঠ বন্ধু হওয়ায়, ধর্ম নিয়ে যত রকমের বিব্রতকর প্রশ্ন আছে সবই উঠে আসে। আমরা যে যেটুকু জানি, বুঝি শেয়ার করি, অথবা পরে খুঁজে পেলে কমন মেইল করে জানিয়ে দেই। শুক্রবার ছাড়াও অন্যান্য সময় ওদের সাথে আড্ডা হলে এই রেফারেন্সগুলো চলেই আসে। আমাদের প্রত্যেকেই অনেক অল্প আয়াসে ৯-১০ গুণ বেশি শিখে ফেলছি। আমার সবচেয়ে ভাল লাগে রাসুলুল্লাহ (স) এর জীবনী অংশটুকু, এ বিষয়ে জানি তুলনামূলকভাবে অনেক কম, তাই সবই শিখছি, আর মুসলিম, নন-মুসলিম বিভিন্ন লেখকের ভিন্ন ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি থেকে ব্যাখ্যা পড়তে পড়তে মনে হয় আমি যেন ঐ পরিবেশেই আছি, এমন ঘটনা আমারও চারপাশে ঘটছে, আমিও রাসুলুল্লাহ (স) এর মত সবচেয়ে অশান্ত সময়ে শান্ত আছি, মানুষের বিদ্রুপের উত্তর দিচ্ছি দু'আর মাধ্যমে। যুদ্ধক্ষেত্রে দাঁড়িয়ে নামাজে মনসংযোগ করে ভুলে যাচ্ছি চারপাশের আর সব প্রতিকূলতা। শুনতে গল্পের মত, তার উপর আছে পারিবারিক, সামাজিক, রাজনৈতিক, ধর্মীয় - সব কিছুরই সংমিশ্রণ, তাই এ সময় সবার মুখে প্রশ্নের ফুলঝুরি ফোটে, সবাই চেষ্টা করে নিজের জীবনে প্রয়োগ করা যায় এমন উদাহরণ মনের লাইব্রেরিতে তুলে রাখতে। 

আল্লাহর দ্বীন জানার উদ্দেশ্যে যারা একত্রিত হয় ফেরেশতারা নাকি তাদের উপর রহমতের ডানা বিছিয়ে দেন, তাদের উপর 'সুকুন' নাযিল হয় (সুকুনের মানে আমি বুঝিয়ে বলতে পারব না, মুভিতে যেমন দেখায় চারপাশে সব স্লো মোশনে চলছে, সবকিছু সুন্দর, নায়কের মুখে স্মিত হাসি ... ঐ ধরণের শান্তি, স্থিরতা, কৃতজ্ঞতার মিশ্র রূপ হচ্ছে 'সুকুন'; দেশে ঝিরি ঝিরি বৃষ্টির মাঝে কৃষ্ণচুড়ায় লাল হয়ে থাকা পথের উপর খালি পায়ে হাঁটলে মনটা যেমন হালকা.. হয়ে যায়, সুকুন তেমনই।) অন্যদের কথা জানিনা, আমি প্রায়ই এরকম 'সুকুন' স্টেট এ থাকি। শরীরটা এত.. হালকা লাগে, হাত পা কোন কিছুর ওজন টের পাইনা। মনের মধ্যে কে যেন বলতে থাকে, সবকিছু এত সুন্দর কেন? এত সুন্দর কেন? আলহামদুলিল্লাহ..., আলহামদুলিল্লাহ ... সত্যি! ঐ সময়টায় আমি যদি মরেও যাই, মনে হয় কেবল চোখটুকু বন্ধ করা ছাড়া আর কোন কিছু করতে হবেনা। 

আমি নিজেকে খুবই ভাগ্যবান মনে করি আমার এই বন্ধুদের জন্য। ওদের সাথে থেকে আমি এত কিছু শিখেছি... আসলে আল্লাহর অনেকগুলি রহমতের মধ্যে এটাও একটা, আমার বন্ধুরা প্রত্যেকের মন এত এত সুন্দর - ওদের সাথে যত সময় কাটাই ততই শিখি। এখন আফসোস হয়, কেন দেশে থাকতে বন্ধুরা মিলে এমন স্টাডি সার্কেল করলাম না! আমি ত চাই আমার প্রিয় মানুষগুলোর প্রত্যেকের উপর ফেরেশতারা রহমতের ডানা বিছিয়ে রাখুক, সবসময়।

ডমেস্টিক ভায়োলেন্স নিয়ে কিছু কথা

'ডমেস্টিক ভায়োলেন্স' শব্দটার সাথে আমার পরিচয়ই ছিল না। আবছা একটা ধারণা ছিল, যেসব নরপশু স্ত্রীর চোখ উপড়ে প্রথম আলোর প্রথম পাতা দখল করে তারাই ওসব ভায়োলেন্স টায়োলেন্স এর সাথে জড়িত। কিন্তু ভায়োলেন্স এর অসংখ্য দিক আছে, যা আমার জানা ছিলনা। জানতাম না ইমোশনাল ভায়োলেন্স বলে একটা কিছু আছে, যেখানে একপক্ষ সারাক্ষণ ভয়ে কাঁটা হয়ে থাকে অপরপক্ষ 'মাইন্ড' করবে দেখে। তাকে খুশি করার জন্য সে যা বলে তাই মেনে নেয়, আপত্তি করলে অবস্থা আরো খারাপের দিকেই যাবে, তাই যা বলে মুখ বুজে মেনে নেয়। ইমোশনাল অ্যাবিউজ একটা চক্র মেনে চলে। প্রথম ধাপে চাপা টেনশন তৈরি হবে, দ্বিতীয় ধাপে তা বার্স্ট করবে, রাগ, কান্না, দোষারোপ - যেভাবেই হোক - আর তৃতীয় ধাপে অনুশোচনা, ক্ষমা প্রার্থনা - যাকে বলে 'হানিমুন পিরিয়ড', অ্যাবিউজার ভীষণ ভাল ব্যবহার করবে, আদর যত্ন হাসি খুশি - অ্যাবিউজড যখন ভাবতে শুরু করবে, সব ঠিক হয়ে গেছে, তখনই প্রথম ধাপের পুনরাবৃত্তি হবে। 

ইমোশনাল অ্যাবিউজের মধ্যে আছে এক পক্ষের অন্য পক্ষকে পূর্ণ কন্ট্রোলের মধ্যে রাখার চেষ্টা, কার সাথে মিশবে, কোথায় যাবে - সে ব্যাপারে সার্বক্ষণিক নজর (লক্ষ্য করুন, কোথায় কার সাথে মিশছে তা খোঁজ নেয়াতে কোন সমস্যা নেই, অভিভাবক হিসেবে তা করাও উচিৎ, কিন্তু) জানার বাইরে কারো সাথে পরিচয় হলে অস্থির হয়ে যাওয়া, রেগে যাওয়া - এসব অ্যাবিউসিভ কনডাক্ট। এছাড়া মানুষের সামনে অপমানজনক নাম ধরে ডাকবে, সমালোচনা করবে, হাসাহাসি করবে, পরিবারের অন্যদের কাছে তার ভুল নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করবে ও পরিবারের অন্যদেরও নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি আনতে উস্কে দেবে - যাতে করে সেই মানুষটা একই সাথে ঘরে কোনঠাসা মনে করে, ও নিজেকে সবকিছুর জন্য অপরাধী ভাবতে থাকে। 

ইমোশনাল অ্যাবিউজ আর খাঁটি দোষের শাস্তি অনেকটা একই রকম, তাই অ্যাবিউজড হচ্ছে যে, সে ভেবে নেয়, এটা ত আমার ভালর জন্যই করা। কিন্তু অ্যাবিউজিভ রিলেশনে মূল উদ্দেশ্য থাকে ডমিনেট করার ইচ্ছা, আর তাকে জাস্টিফাই করার জন্য অ্যাবিউজার বিভিন্ন সামাজিক ও ধর্মীয় অজুহাত দেখায়। 

ধর্মীয় অজুহাতের কথা যখন আসলোই, তখন স্পিরিচুয়াল অ্যাবিউজ নিয়েও বলি। তুমি 'ভাল মুসলিম' এর মত কাজ করছ না, এই অজুহাতে স্বামী/স্ত্রী বা তার আত্মীয় স্বজন অন্যায় সব দাবি চাপিয়ে দিতে পারে, এমনকি মেয়েদের বেলায় বাবার বাড়ি যাওয়ার উপরেও নিষেধাজ্ঞা দিতে পারে। প্যারেন্ট-চাইল্ড রিলেশনশিপেও অমন দেখা যায়। ছেলে মেয়েকে অন্যদের সামনে স্টুপিড, গাধা ইত্যাদি বলে অ্যাবিউজ করলেও, সন্তানের অবাধ্যতা বা অসন্তোষ দেখলে কুরআনের আয়াত টেনে আনবে, জাহান্নামের শাস্তির ভয় দেখাবে। 

যেহেতু এই বিষয়গুলো খুবই স্পর্শকাতর, বিশেষত আমাদের দেশের প্রেক্ষাপটে, তাই কয়েকটা বিষয় স্পষ্ট করে নেয়া ভাল। 

১. সন্তান বাবা মা কে জান্নাতের দরজা হিসেবে ট্রিট করা উচিৎ, এতে কোন মতভেদ নেই, কিন্তু বাবা মা স্বেচ্ছাচারিতা করার অধিকার রাখেন না। আল্লাহর থেকে প্রত্যেকে নিজ নিজ বিবেক ও সিদ্ধান্ত নেয়ার স্বাধীনতা নিয়ে এসেছে। বাবা মা একটা বয়স পর্যন্ত সেই বিবেক কে মজবুত করবেন, এবং সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষমতাটাকে ঘষে মেজে ধারালো করবেন। এবং অবশ্যই মূল লক্ষ্য থাকবে সে যেন নিজের বিচারবুদ্ধির প্রতি আস্থাশীল হয়। রাসুলুল্লাহ (স) নিজের সন্তানের সাথে কেমন আচরণ করতেন বা কিশোর বয়সী সাহাবীদেরও কতটা মর্যাদা দিয়ে কথা বলতেন তা লক্ষ্য করলেই ইসলামে বড়দের প্রতি ছোটদের অধিকার কী এটা পরিষ্কার হয়ে যাবে। 

২. বৈবাহিক সম্পর্কে ছোটখাট অসন্তোষ এড়িয়ে গিয়ে ঘরে শান্তি রাখার চেষ্টা করা, আর নিজের স্বাধীনতা পুরোপুরি ত্যাগ করা - এ দুটো এক জিনিস না। অনেক ছেলেই আছে মায়ের সব রকমের ইমোশনাল অ্যাবিউজ চুপচাপ মেনে নিয়ে নিজের উপরেও জুলুম করছেন, স্ত্রীর উপরেও করছেন। যেটা অন্যায় সেটাকে উপেক্ষা করতে ইসলাম আমাদের শেখায় নি। আমরা মুসলিমরা একে অপরকে ধৈর্য ধরতে উপদেশ দিতে পারি, ধৈর্য ধরতে বাধ্য করতে পারিনা। সুতরাং এ ধরণের সমস্যাকে অন্তত সমস্যা হিসেবে স্বীকার করতেই হবে। 

অ্যাবিউজিভ রিলেশনশিপের শিকার যারা তাদের ব্যক্তিত্ব গঠন চরমভাবে বাধাগ্রস্ত হয়। বিভিন্ন সামাজিক পরিবেশে তারা স্বচ্ছন্দভাবে অংশগ্রহণ করতে ভয় পায়। সমালোচনার প্রতি অতিরিক্ত নাজুক হয়। আত্মবিশ্বাসে ঘাটতি থাকে, কারণ নিজের সিদ্ধান্ত কে বাধাহীন ভাবে প্রয়োগ করার সুযোগ সে খুব একটা পায়নি, পেলেও গঠনমূলক বা উৎসাহব্যঞ্জক প্রতিক্রিয়া পায়নি। সমাজে খুব একটা মেশার সুযোগ হয়না বলে অ্যাবিউজিভ পরিবেশেই বেশির ভাগ সময় কাটাতে হয় - পরিণতিতে মানসিক এই দৈন্যের ব্যাপারটা বহুগুণে বেড়ে যায়। সবচেয়ে ভয়াবহ ব্যাপার হচ্ছে, যারা ডমেস্টিক ভায়োলেন্স এর মধ্যে বড় হয়েছে, তারা এই পরিবেশে অভ্যস্ত হয়ে ওঠে বলে তারাও নিজের জীবনে অ্যাবিউজার হওয়ার সম্ভাবনা বেশি থাকে। 

এই বিষয়গুলো নিয়ে আমাদের সবার সচেতন হওয়া দরকার। পরে হয়ত কখনো আরো গুছিয়ে এ বিষয়ে লিখব।

Wednesday, November 16, 2011

বদরাগ ও সূরা নাস

'রাগ হলে আমার লজিক্যাল সেন্স হারিয়ে যায়। অদ্ভুত সব কারণ একটার উপর একটা যোগ হতে থাকে। আমি নিজের মধ্যে বুঝতে পারি, আমি রাগ করছি কারণ আমার মধ্যে একটা হেরে যাওয়া অনুভূতি হচ্ছে। আমি নিজের মত করে একটা কিছু ভেবে রেখেছিলাম, কিন্তু বাস্তবে তেমন করে হয়নি। আমি হেরে যাচ্ছি, আমার কথা কেউ পাত্তা দিচ্ছেনা, আমার সুযোগ সুবিধার দিকে কারো খেয়াল নেই... আমার উপর অন্যায় হলে দেখার কেউ নেই..'

উপরের কথাগুলো একটু অদল বদল করে দিলে প্রত্যেকেই নিজের ছায়া খুঁজে পাবেন। রাগ এমন এক জিনিস, তখন কে যে কী থেকে কী হয়ে যায়, কোন ঠিকঠিকানা থাকেনা। রাগ আর মাতাল অবস্থার মধ্যে আমি কোন পার্থক্য দেখি না। যে মাদক নেয়া থামাতে পারে না, তাকে আমরা বলি, ওর নিজের উপর কন্ট্রোল নেই। যে রাগ হলে শান্ত হতে পারেনা, তাকেও আমরা বলি, ওর কন্ট্রোল থাকেনা। আফসোস, মাদকাসক্ত কে আমরা দেখি ঘৃণার চোখে, আর বদরাগ কে দেখি কিঞ্চিৎ প্রশ্রয়ের চোখে।

কেন এভাবে রেগে যাই আমরা? আগের কোন রাগকে ট্র্যাক করতে পারবেন? এখানে রাগ বলতে আমি কিন্তু 'অযৌক্তিক রাগ' বুঝাচ্ছি। নিজের উপর অন্যায় হলে যে রাগ হয়, সে রাগের কথা বলছি। যে রাগ কমানোর জন্য মানুষ মেডিটেশনের দ্বারস্থ হয়, ডাক্তারের কাছে মুখ কাঁচুমাচু করে বলে, 'দেখেন ত ডাক্তার সাহেব, আমার প্রেশারটা কি বেশি দেখে এত রাগ উঠে?', সেই রাগের কথা বলছি। আমার রাগের ৯০%ই তৈরি হয় 'এটা অন্যায়' - এই চিন্তা থেকে। এই যেমন বন্ধুরা সবাই মিলে বেড়াতে যাওয়ার প্ল্যান করছি, এর মাঝে একজন বলা নাই কওয়া নাই শেষ মুহূর্তে পিছু হটল। হয়ে গেলাম রাগ, 'তার কি এইটা উচিৎ হইসে?' বাসায় গুরূত্বপূর্ণ কোন সিদ্ধান্ত আমাকে জিজ্ঞাসা ছাড়াই নিয়ে ফেলল। রাগ, 'আমি কি কেউ না?' গ্রুপে মিলে কোন কাজ করছি, একজন ফাঁকিবাজি করল। হয়ে গেল মেজাজ খারাপ, 'ফাইজলামি পাইসে?' প্রত্যেকবারই হয় 'আমার' কমফোর্ট নষ্ট হয়েছে, নয়ত 'আমার' ইগো হার্ট হয়েছে, অথবা 'আমার' তৈরি করা প্ল্যান অনুযায়ী কাজ হয়নি। প্রত্যেকটাই খুব আত্মকেন্দ্রিক কারণ, কিন্তু আমি যখন রেগে যাচ্ছি, তখন আর স্বার্থপরতার ওই দিকটা আর চোখে পড়ছে না, মনে হচ্ছে, আমি বৃহত্তর স্বার্থে অন্যায়ের প্রতি জিরো টলারেন্স দেখাতে রাগ দেখাচ্ছি। অথচ এই ঘটনাটাই অন্যের বেলায় ঘটলে হয়ত আমি মিষ্টি মিষ্টি হেসে ধৈর্য ধরার উপদেশ দিতাম। এ রকম ডাবল স্ট্যান্ডার্ড, হীন একটা চিন্তাকে মনের ভেতর মহৎ বানিয়ে ফেলছে কে?

সূরা নাস এ আল্লাহ আমাদের শিখিয়েছেন শয়তানের অনিষ্টকর কুমন্ত্রণা থেকে আল্লাহর কাছে আশ্রয় চাইতে (মিন শাররিল ওয়াসওয়াসিল খান্নাস।) শয়তান আমাদের কুমন্ত্রণা দেয় - এটা কি আমরা আসলেই বিশ্বাস করতে পারি? মাঝে মধ্যে পারি, কিন্তু বেশির ভাগ সময়ই আমাদের যুক্তিবাদী মন বিশ্বাস করতে চায়না কোন জ্বীন ভূত এসে কুবুদ্ধি দিচ্ছে, আর সেটার ফল আমাদের কাজে এসে পড়ছে। শয়তানকে নিয়ে কারো সাথে রিয়েলিস্টিক আলোচনা করার চেষ্টা করে দেখুন, হাসতে হাসতে আপনাকে উড়ায় ফেলবে, স্কিজোফ্রেনিক রোগীও বানায় ফেলতে পারে। শয়তানকে নিয়ে আমি প্রায়ই চিন্তাভাবনা করি, তারপরেও, এশার নামাজ একটু দেরি করে ফেললে যখন ভী-ষ-ণ আলসেমি লাগে, ঘুমে মনে হয় পড়েই যাব, আর কষ্ট করে নামাজ পড়ে ফেলার সাথে সাথে ঘুমও পালায় - তখনও আমার মনে হয়না এটা শয়তানের কারসাজি। শয়তান এখনও আমার কাছে সামহোয়াট ইমাজিনারি কিছু। আমার বাসা, ল্যাব, ল্যাপটপ - এরা যেমন খুব বাস্তব, শয়তানকে ততটা বাস্তব ধরতে মনের মধ্যে কেমন কেমন যেন লাগে।

রাগের বেলায় শয়তানের ভূমিকা বলার আগে সূরা নাসের পরের লাইনটা আলোচনা করে নেই। আল্লাযি ইয়ুওয়াসয়িসু ফী সুদুরিন নাস, সেই শয়তান, যে মানুষের বুকের মধ্যে বসে কুমন্ত্রণা দেয়। 'ইয়ুওয়াসয়িসু' হচ্ছে ঘটমান বর্তমান ক্রিয়াপদ। চলতেই থাকবে, চলতেই থাকবে। কোন থামাথামি নেই। শয়তান বুকের মধ্যে বসে থাকবে, একটা ফুট কাটবে, আপনি তাকে ধমক দিয়ে থামাবেন, সে একটু দমে যাবে, তারপর মুখটা বাড়ায় আবার আরেকটা কিছু বলবে.. আবারও, আবার... ! আপনি যখন কোন কারণে অফেন্ডেড, আপনার মনের মধ্যে এমনিতেই কিছু নেগেটিভ চিন্তা আছে অফেন্ডারের প্রতি। এখন শয়তান করবে কি, ওই ভদ্রলোকের/ভদ্রমহিলার সাথে আপনার বিগত জীবনে যা যা খারাপ অভিজ্ঞতা হয়েছে সব ছবির মত সামনে তুলে ধরতে থাকবে। একটা করে ছবি দেখবেন, মেজাজ খারাপ বাড়তে থাকবে। শুধু এই না, ছবির নিচে ক্যাপশনের মত একটা এক্সপ্লানেশন ও থাকবে, ও এইটা করসিল, দেখ, সে তোমার জন্য কক্ষণো কেয়ার করে নাই। সবসময় তুমিই করে গেছ... ইত্যাদি ইত্যাদি। কারো উপর রাগ হওয়ার পর তার ভালমানুষির কথাগুলি কি আপনার কখনো মনে পড়ে? আমি কারো উপর রাগ হয়ে আমার স্বামীর কাছে ঝাল ঝাড়লে সে তার ভাল দিকগুলি মনে করিয়ে দেয়ার চেষ্টা করে, কিন্তু আমার তখন আরো রাগ হয়, 'আমি বলতেসি খারাপ আর তুমি ভাল দিক দেখাচ্ছ! আমার ত এখন নিজেকে আরো বেশি খারাপ মনে হচ্ছে!' কী ভয়ংকর ইগো!

যাই হোক, পার্সোনাল ডিসকমফোর্ট আর শয়তানের ওয়াসওয়াসা - এ দুটোই আমাদের জন্য অনেক, তার উপর আরো আছে পারিপার্শ্বিকতার চাপ। আশেপাশের মানুষের উস্কানিতে ঘটনা আরো খারাপের দিকে গেছে - এ রকম দেখেছেন কখনো? আল্লাহ সূরা নাস এর শেষ লাইনে বলেছেন 'মিনাল জিন্নাতি ওয়ান নাস', খারাপ জ্বীন ও মানুষের কুমন্ত্রণা। ওয়াসওয়াসা শুধু বুকের ধারেকাছে ওঁৎ পেতে থাকা বেহায়া শয়তানটাই দেয়না, তার সাঙ্গোপাঙ্গো যারা অন্যদের ভেতর বসে আছে, তারাও একযোগে বুদ্ধি দিতে থাকে, এটা বল, ওটা মনে করিয়ে দাও। ফলাফল... থাক, নাই বা বলি। রাগ করে মানুষ বাসনকোসন ভাঙে, হাত পা ভাঙে। সম্পর্ক ভাঙে, ভাঙে আল্লাহর উপর বিশ্বাসও। তারপর একটা সময় ফলাফল দেখে কান্নায়ও ভেঙে পড়ে।

ফেসবুকে এক ছোট বোন লিখেছিল, মানুষকে চেনার সবচেয়ে ভাল উপায় হল তাকে রাগিয়ে দেয়া। এমনিতে ফেরেশতা, আর রাগিয়ে দিলে মুখের ভাষা শয়তান টাইপ হয়ে যায়। আমি এই বক্তব্যের সাথে একমত না। রাগিয়ে দিলে মুখের ভাষা শয়তান টাইপ হয়, কারণ সে তখন শয়তান আর মানুষের ওয়াসওয়াসা দ্বারা প্রভাবিত হয়। রাসুলুল্লাহ (স) কখনোই মানুষের রাগের অবস্থা বিচার করতেন না। এমন ভাব করতেন, যেন এমন কোন ঘটনা ঘটেই নি। তিনি বুঝতেন, এটা অন্য যে কোন প্রবৃত্তির মতই মানুষের একটা দুর্বলতা। তাই উনি সবচেয়ে শক্তিশালী বলেছেন সেই ভাই বা বোনকে, যে রাগের সময় নিজেকে সংযত রাখতে পারে।

রাগ হলে কী করতে হবে? বলব না। যে সত্যিকারের আন্তরিক সে খুঁজে বের করে নিক। আমি চাই মানুষ বদরাগ কে মাদকাসক্তির মতই এক সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করুক। বদরাগের কারণে যাদের সম্পর্কে ফাটল ধরেছে তারা বিষয়টার ভয়াবহতা নিয়ে অন্যদের সাথে কথা বলুক, মানুষ যেন আরো সচেতন হয়। Domestic violence এর অনেকটুকুই আসে বদরাগ থেকে। ঠান্ডা, সুস্থ মাথায় ভায়োলেন্স করে যাচ্ছে, এরকম কেস আপনি কমই পাবেন। রাগ নিয়ে চিন্তা করুন। যে বদরাগী, সেও, যে ভুক্তভোগী, সেও। চট করে রেগে যাওয়া, লম্বা সময় রাগ ধরে রাখা - এগুলো পরিবার, সমাজের বড়সর ক্ষতি করে ফেলছে। এখন শুনি রিকশাওয়ালার সাথে ঝগড়া হলেই কষে চড় লাগিয়ে দেয় স্কুল কলেজের ছেলেমেয়েরা। রাগ কি কেবল স্টুডেন্টদেরই আছে? আল্লাহ না করুক, এইসব অন্যায় আর অসম্মানের খেসারত যদি আপনার কোন ভাই/বোনের জীবন/সম্মানের বিনিময়ে দিতে হয়, তখন কি একচেটিয়া রিকশাওয়ালাদের দোষারোপ করে পার পাওয়া যাবে?

লেখাটা শেষ করি আমার খুব প্রিয় একটা হাদীস বলে। রাসুলুল্লাহ (স) এর সামনে এক সাহাবীর সাথে আরেকজনের ঝগড়া হচ্ছিল। সাহাবী নম্রভাবে জবাব দিচ্ছিলেন আর ওইপক্ষ একনাগাড়ে গালিগালাজ করেই যাচ্ছিল। তাই দেখে রাসুলুল্লাহ (স) মুচকি মুচকি হাসছিলেন। একটা সময় আর টিকতে না পেরে সাহাবীও উঁচু গলায় জবাব দিতে থাকল, তখন রাসুলুল্লাহ (স) সে জায়গা থেকে সরে গেলেন। ব্যাপারটা সেই সাহাবী লক্ষ করলেন, উনি এসে রাসুলুল্লাহ (স) এর কাছে জানতে চাইলেন, উনি অসন্তুষ্ট হওয়ার কারণ কী। রাসুলুল্লাহ (স) তখন উনাকে জানালেন, তুমি যখন চুপ ছিলে তখন এক ফেরেশতা তোমার হয়ে জবাব দিচ্ছিল। আর তুমি যখন গলা উঁচু করলে, তখন ফেরেশতার বদলে শয়তান এসে জায়গা করে নিল, আর তোমার হয়ে জবাব দিতে থাকল। তাই দেখে আমি চলে এলাম।

Ref:

http://www.youtube.com/watch?v=TTWn8CSM7Vw
http://www.youtube.com/watch?v=BLMHjWz7X-E
http://www.youtube.com/view_play_list?p=15B78B2B348C0A7D
http://bayyinah.com/podcast/ (sura nas)

Tuesday, October 25, 2011

ভালবাসার অদ্ভুত রূপ

ভালবাসা জন্ম নেয় ভালবাসার মৃত্যু দিনে
ভালবাসা শুদ্ধ হয় ভালবাসার স্পর্শ চিনে

গানের রচয়িতা কী বুঝে এই লাইন ক'টি লিখেছেন তিনিই জানেন। ভালবাসা নিয়ে কীই বা লিখব? আজ প্রায় আড়াই যুগ পার করে দিয়েও ভালবাসার জন্য আকুতি একটুও কমাতে পারিনি। আমার জানা ছিলনা, বয়স বাড়লেও ভালবাসা পাওয়ার মনটা বুড়ো হয় না। ছ' বছর বয়সে যেভাবে একটু আদর বা মনোযোগ পাওয়ার জন্য কাতর হয়ে থাকতাম, এতদিন পরে এসেও আকুতিটা প্রায় একই রকম রয়ে গেছে। আমি কোনদিন বুঝিনি, আমার যেমন করে অভিমান হয়, আমার মায়েরও তেমনি করে ভালবাসার অভাবে অসহায় লাগে। আমার ফোকলা দাদী, রোগে শোকে জীর্ণ নানু - জানি না বুকের ভেতর তাদের কত হাজার অভিমান জমা আছে।

ভালবাসা না পেলে কি সবারই বুকের ভেতরটায় একটা খালি খালি ভাব হয়? কণ্ঠনালীর কাছটায় কেমন যেন কাঁপতে থাকে সারাটাক্ষণ। শক্ত করে বালিশটা বুকের মধ্যে চেপে ধরলে মনে হয়, আরও একটু জোরে চাপ দিলে পাঁজরদুটো কাছাকাছি আসবে তখন ফাঁকা জায়গাটা একটু কমবে। আবার অভিমানে চু...প হয়ে স...ব কিছু থেকে নিজেকে গুটিয়ে নিতে ইচ্ছে হয়, যেন পৃথিবীর সাথে আমার যোগাযোগ এতটুকুই, নিঃশ্বাস নেয়া আর দীর্ঘশ্বাস ছাড়া।

আমার নানুরও বোধহয় এমন লাগে, ছোট বাচ্চাদের সাথে উনার পার্থক্য এটুকুই, তারা ডাক ছেড়ে কাঁদতে পারে, আর উনি কেবলই স্থবির হয়ে থাকেন। হয়ত উনার ইচ্ছে হয়, কেউ উনার চুলে তেল দিযে দেবে, রাতে ঘুম না আসলে গল্প করবে - আমার নানুর স্মৃতির এলবামে নানার কোন ছবি নেই। আমার স্বামী নানাশ্বশুরের গল্প শুনতে চেয়েছিল, উনি বলেছিলেন, 'মানুষটা যে কেমন আছিল - রাগী না সরল সোজা, হাসিখুশি না কী.. আমি ত কিসু কইতে পারতাম না।' আমার নানুর কৈশোর, যৌবন সব কেটেছে ছেলে মেয়ে মানুষ করে আর গেরস্থালি করে। নয়টা বাচ্চার একটা দুষ্টুমি করলে সব ক'টাকে লাগাতার পেটাতেন। অসম্ভব গল্পের বই পড়ার নেশা ছিল উনার। বাচ্চারা ঘুমালে নাকি রাতে কেরোসিনের কুপি জ্বালিয়ে মশারির মধ্যে গল্পের বই পড়তেন। আমাদের বাসায় আসলেও, রান্না আর বই পড়া - এই দেখেছি কেবল উনার।

বাইরে আসার পরে নানুর জন্য যে কত... বার করে মন খারাপ হয়েছে - কীভাবে কীভাবে যেন উনার সাথে আমার মনের একটা মিল পেতাম। শহরে থাকতে ভাল লাগে না - তাই গ্রামে এই বয়সেও একা থাকেন। উনার কাছে কিন্তু বুকের মধ্যে করে নিয়ে ভালবাসা দেয়ার মত কেউ নেই। একা একা না জানি কতবার করে পুরনো দিনের কথা ভাবেন। আর আমি? স্বামীর সাথে আছি, অনেকের জন্য ঈর্ষণীয় অবস্থানে আছি - তারপরেও শীতের রাতে একলা বাস স্ট্যাণ্ডে দাঁড়িয়ে যত দূর পর্যন্ত চোখ যায় - আপন কাউকে দেখিনা। হঠাৎ করে ঘুম ভেঙে যায়, আম্মুর মাথাব্যথা - আমার হাতটা আম্মুর কপালে - এই স্বপ্ন দেখে। আমার ত আম্মু একটাই, নানুর নয় নয়টা সন্তান -- জানিনা, বুকের পাঁজর কতটুকু দোমড়ালে শূন্যতাটুকু আড়াল করা যায়।

দেশের বাইরে বুকের মধ্যে নিয়ে আগলে রাখার কেউ নেই। ভালবাসা না পেয়ে একটা একটা করে যেন কোমলতাগুলো কোথায় হারিয়ে যায়। কণ্ঠস্বরে আবেগের পরিমাণ কমে আসে, নস্টালজিয়া ঢাকতে দেশের ব্যাপারে উপেক্ষা - আর সারাটাক্ষণ চাপা উদ্বেগ, কোন দুঃসংবাদ এল কি? তাই ভাবি, যে বাচ্চাটা বড় হওয়ার আগেই মাকে হারিয়েছে, তার জীবনটা কেমন হয়? যে মেয়েটা খুব খুব শুদ্ধ অনুভূতি দিয়ে কাউকে আপন করার স্বপ্ন দেখেছে - স্বপ্ন ভাঙার পরে তার দিনগুলো কেমন হয়? প্রতারণা, স্বার্থপরতা - পরিবারের আপন মানুষগুলোর থেকে এসব দেখার পর একটা যুবক কোথায় গিয়ে আশ্রয় নেয়? প্রিয় মানুষগুলোর থেকে আমার ত তবু বাধা দূরত্বের, কারো হয়ত সে বাধা বিশ্বাসের, কারো হয়ত জীবন আর মৃত্যুর।

ভালবাসা ছাড়া মানুষ বাঁচে কী করে? ভালবাসা একটা প্রয়োজন, যে কাছের মানুষের কাছে না পায়, সে দূরের মানুষের কাছে খুঁজতে যায়। আর দূরের মানুষও যখন কাছে আসেনা - তখন না জানি কত কত কিছুতে নিস্ফল ভালবাসার আকুতি নিয়ে ঠুকরে মরে।

একটা অদ্ভুত ভালবাসার কথা অনেকেই জানেনা। মনটার মধ্যে যখন কোন খারাপ চিন্তা থাকেনা, কোন উদ্ধতভাব না, কোন দুশ্চিন্তা না - যখন মনের ভেতর থেকে অনেক অনেক গভীর থেকে আলহামদুলিল্লাহ মনে আসে, মাথাটা এলিয়ে দিয়ে চুপ করে সময়টাকে ভালবাসতে ইচ্ছে করে - তখন কেমন যেন অদ্ভুউ..ত এক অনুভূতি হয়। আস্তে আস্তে নিঃশ্বাসটা ভারি হয়ে আসে, মনে হয় একটা ভারি চাদরের মত কিছু একটা আমাকে ঢেকে দিচ্ছে। মনে হয় এই আবরণ আমাকে সব কষ্ট থেকে আড়াল করে রাখবে, কোন কষ্ট নেই, কোন একাকীত্ব না। আমার যাই হারিয়ে যাক, আমি কখনও একা হব না। এই অদ্ভুত ভাললাগাটা আমার চোখ ভিজিয়ে দেয়, আমার গলা ভারি হয়ে আসে .. সারাটা শরীর খুউব হালকা লাগে। আর বুকের ভেতরটা - আমার প্রাণের স্পন্দন আমি টের পাই। উচ্ছ্বল এক ছন্দ। ঝর্ণার শব্দের মত। আমি জানিনা আগের সাথে পরের কী এমন ঘটে যায়, আমি শুধু টের পাই, আমার জীবনটা অনেক সুন্দর। আমার ভালবাসার একটুকু অভাব নেই কোথাও। আল্লাহ আমাকে খুব ভালবাসে। আমি তাঁর কাছে ছোট্ট অবুঝ এক শিশু। আমার জীবনটা এই মাত্র শুরু হল। আমি মাত্র হাঁটতে শিখেছি, পেছনে তাকানোর আমার কিছু নেই। আমি হাঁটব, সামনের দিকে। আমাকে যারা ভালবাসে তারা অনেক প্রত্যাশা নিয়ে হাত বাড়িয়ে আছে, আর একটু পথ সামনে এগোলেই বুকে জড়িয়ে নেবে।

এমনি অদ্ভুত এই ভালবাসার অনুভূতিটা বুঝতে আমার অনেক সময় লেগেছিল, কিন্তু যখন বুঝতে পারলাম, মনে হল, এই অনুভূতির মত সুন্দর কিছু হয়না। এই একটা বোধ নিয়ে জীবন কাটানো যায়। কখনও মনে হবেনা, যে আমাকে ভালবাসার কেউ নেই। খুব কাছের মানুষটার অবহেলায়ও মনে হবে - 'আমার এত এত ভালবাসাকে ও হারিয়ে দিল, আজ আমি পৃথিবীর সবাইকে ভালবেসে জয়ী হব।'

Thursday, October 6, 2011

আসরের চারটি উপদেশ

সূরা আসর এর তাফসির শুনে আমি এতই মুগ্ধ, এর মূল বক্তব্য স্পর্শ না করেও আরো অনেক খুঁটিনাটি নিয়ে লেখালেখি করতে ইচ্ছে করছে। এই যেমন এই সূরার শেষ আয়াতটা। এখানে আগের দুই আয়াতের (চাইলে আগের লেখাটা পড়ে আসতে পারেন) বিপরীত কথা লেখা হয়েছে। অর্থাৎ আল্লাহর এত শক্ত সতর্কবাণী শুনে আমরা যখন পুরোপুরি নিজের মধ্যে নিশ্চিত হব যে খুসর এ পতিত আর কেউ না, আমি। তারপর দিশেহারা হয়ে এর পথ খুঁজব, তখন আল্লাহরই নির্দেশিত পথে আমরা নিজেদের বাঁচানোর চেষ্টা করব। আল্লাহর নির্দেশিত পথ কী কী? আমানু (বিশ্বাস), আমিলুস সালিহা (ভাল করা), তাওয়াসাও বিল হাক্ক (consult with/to truth), তাওয়াসাও বিস সাবর (consult with/to patience).

আল্লাহ নির্দিষ্ট করে বলেননি কীসে বিশ্বাস, কী ভাল করা, কাকে পরামর্শ দেয়া, কোন ক্ষেত্রে পরামর্শ দেয়া। সুতরাং আল্লাহর দেখানো পথের ক্ষেত্র অনেক অনেক বিস্তৃত। খুসর থেকে বাঁচতে চাইলে উপরের চারটি কাজের যে কোন একটি বা দুটি বেশি করে করলেই হবে না। চারটিই করতে হবে। বিশ্বাস এনে ভাল ভাল কাজ করে কারো সাতে পাঁচে না থাকলেই বেঁচে গেলাম - এরকম সুবিধাবাদী এপ্রোচের সুযোগ নেই। নতুন নতুন ইসলামপন্থী হয়ে পরিবারে দাওয়াহ দিতে গিয়ে চরম ঝাড়ি খেয়ে - এদের সাথে কোন সম্পর্ক রাখব না - এত সহজ সমীকরণে অঙ্ক কষারও উপায় নেই। সৎ কাজের পরামর্শ দিয়ে যেতেই হবে, আন্তরিকভাবে, ধৈর্যের সাথে।

তাওয়াসাও শব্দটি ওয়াসিয়ত শব্দের ক্রিয়ারূপ। আমরা জানি ওয়াসিয়ত মানে উইল করে যাওয়া বা সম্পত্তি হ্যান্ডওভার করে যাওয়া। মানুষ তার প্রিয় জিনিস উইল করে যায় তাকেই যাকে সে ভালবাসে ও তার উন্নতি চায়। আপনি যদি জানেন আগামীকালের পর আপনি আর পৃথিবীতে থাকবেন না, তখন আপনার প্রিয় মানুষগুলোকে যা যা বলে যেতে চাইবেন - যতটা উদ্বেগের সাথে, তাওয়াসাও বিল হাক্ক ও যেন ততটাই আন্তরিক হয়। ওয়াসিয়ত শুধু মূল্যবান সম্পদ প্রিয় মানুষকে সমর্পণ করাই নয়, এর মধ্যে উভয়পক্ষের সম্মতি থাকতে হবে। একটা সমঝোতা থাকতে হবে। সংশোধন বা পরামর্শ এমনভাবে দিতে হবে যাতে সে মানুষটা ছোট না মনে করে। আসলেও, আপনি যদি একজনকে খুব ভালবাসেন, তাকে ছোট করতে বা তার মনটায় কষ্ট দিতে আপনার ইচ্ছে হবেনা। কিন্তু আপনি এটাও চান না আল্লাহর সামনে তার কোন দোষের জন্য সে ছোট হোক। সুতরাং সত্যি কথাটা তাকে উইল হিসেবে দেয়ার জন্য আপনার পূর্ণ আন্তরিকতা দেখাতে হবে। আপনার বক্তব্যের কমনীয়তায়, আপনার ব্যবহারের উদারতায় যেন অপর মানুষটা আপনার উদ্দেশ্য সম্পর্কে পুরোপুরি নিশ্চিত হয়।

যদি আপনার সকল চেষ্টার পরেও উদ্দেশ্য সফল না হয়? যদি সে মানুষটা আপনাকে ভুল বোঝে? যদি মুখের উপর বলে বসে, তুমি আমার ব্যাপারে কথা বলার কে? যদি তিনি আপনার বাবা হন, ভাই হন, স্বামী হন? আপনি কষ্ট পাবেন, সেটাই স্বাভাবিক। কিন্তু আল্লাহ প্রদত্ত মুশকিল আসানের চার নম্বর টিপ, তাওয়াসাও বিস সাবর ব্যবহার করা আপনার এখনো বাকি আছে।

দাম্পত্য সিরিজ টা লিখতে গিয়ে বারবারই মনে হত, এত কথার দরকার কী? সূরা আসর এর চারটা উপদেশ মনে করিয়ে দিলেই ত হয়। আসলে ইনিয়ে বিনিয়ে ঘুরিয়ে পেঁচিয়ে আমরা কোন না কোন ভাবে এই চারটা কাজই করার চেষ্টা করি। কখনও আল্লাহর প্রতি আন্তরিক আস্থা রেখে সহ্য করা, কখনও নিজের ব্যবহার অটুট রেখে উদাহরণ তৈরি করা, কখনও সুন্দরভাবে ভুল শুধরে দেয়া, কখনও শুধুই ধৈর্য ধরতে বলা। সম্পর্কগুলোতে চিড় ধরে যখন আমরা এর কোন একটা স্টেজ এ এসে ব্যর্থ হয়ে পড়ি।

কেউ কেউ বলেন এই চারটি কাজ হচ্ছে ধাপের মত। প্রথম ধাপ বিশ্বাস আনা, আপনার বিশ্বাস শক্ত হলে সে অনুযায়ী আমল করা, তারপর ধীরে ধীরে বাকি দুটো। কেউ কেউ বলেন চেয়ারের চারটি পায়ের মত। একটা ছাড়া অন্যগুলি টিকতে পারবেনা। তবে এটুকু বুঝি, একটা থেকে পরের টাতে যেতে গেলে পিঠের চামড়া শক্ত করে করে এগুতে হবে। ইসলামের মূল কনসেপ্টটা একটু বোঝার পর গতানুগতিক চিন্তাধারার সাথে এর শকিং কনট্রাস্ট দেখে নিজের সাথে বেশ অনেকটা যুদ্ধ করতে হয়েছে। কারণ এর জন্য আমাকে অনেক মোহই মন থেকে মুছে ফেলতে হয়েছে। সবচেয়ে কঠিন লেগেছিল আল্লাহ ও রাসুল (স) কে অন্য যে কারো চেয়ে বেশি ভালবাসতে হবে। তার মানে আমার বয়ফ্রেণ্ড এর কথা যতক্ষণ ভাবব তার চেয়ে বেশিক্ষণ মনের মধ্যে থাকবে আল্লাহর কথা। আম্মুর মন খারাপ দেখলে যতটুকু অস্থির হই, রাসুলুল্লাহ (স) কষ্ট পেতে পারেন এমন সব ব্যাপারে তার চেয়েও অনেক বেশি যত্নবান হতে হবে। আমিলুস সালিহাও প্রথম প্রথম খুব সহজ কিছু ছিলনা। এখনও পাঁচ ওয়াক্ত নামাজের জন্য প্রবৃত্তির সাথে যুদ্ধ করতে হয়। আচরণে, বেশভূষায় পরিবর্তন আসাতে আশপাশের মানুষগুলোকেও অভ্যস্ত করতে সময় দিতে হয়। এটুকু পর্যন্ত তাও চলে। তৃতীয় আর চতুর্থ ধাপ যে কতটা ভয়াবহ রকমের কঠিন তা আমি জানি প্রত্যেকে নিজেকে দিয়ে বোঝেন। আমি ভুলেই গিয়েছিলাম প্রায় যে আমার চাচা কে নসীহত করা আমার দায়িত্ব, আমার বান্ধবীদের সাথে এসব অস্বস্তিকর আলোচনাগুলো আনতে হবে। মনের কোন এক কোণে বিশ্বাস হয়ে গিয়েছিল যার যার ব্যাপার তার তার থাকাই ভাল, কিন্তু না! জাহান্নামের আগুন থেকে আমি বাঁচতে চাইলে তাদের প্রতি আমার দায়িত্ব আমি এড়াতে পারবনা।

এই সূরার বক্তব্যের একটা প্রতিকী গল্প এমন -

আপনি ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে চমৎকার সব স্বপ্ন দেখছেন। হঠাৎ ঘুম চটে গিয়ে দেখলেন আপনি পানিতে ডুবে যাচ্ছেন। আপনার হাতে সময় নেই। আপনি প্রবলভাবে হাত পা ছোড়াছুড়ি করে ডুবে যাওয়া থেকে বাঁচার চেষ্টা করছেন, আস্তে আস্তে শিখে গেলেন এভাবে পা নাড়ালে ভেসে থাকা যায়। তারপরেও কী করে যেন একটু একটু করে তলিয়ে যাচ্ছেন। চারপাশে তাকিয়ে দেখলেন আপনার পায়ে শেকল বাঁধা, তার সাথে জোড়া লাগানো রয়েছে আপনার কাজিন, আপনি তাকেও ঘুম থেকে জাগালেন, দু'জন মিলে সাঁতরাতে শুরু করলেন, এবারে আপনাকে টেনে ধরছে আপনার দাদী, আপনার মা, বাবা, বন্ধুরা। তারা বলল, রিয়েলিটি অনেক কঠিন, এর চেয়ে আমার ঘুমই ভাল। তারা আবার ঘুমিয়ে যেতে চাইল। কিন্তু আপনি কিছুতেই তাদের ঘুমোতে যেতে দিতে পারেন না। সজ্ঞানে সবাইকে নিয়ে ডুবে যাওয়ার মত বুদ্ধিহীন আপনি নন। আপনাকে বাঁচতেই হবে। যে করেই হোক।

আসর (সময়)

এই ছোট্ট তিন আয়াতের সূরাটা সম্পর্কে লিখতে বসে কোথা থেকে শুরু করব ভেবে কূল কিনারা করতে পারছিনা। একবার মনে হচ্ছে যা শিখেছি সব লিখি, আবার ভাবছি যার আগ্রহ আছে সে ত নিজেই শিখে নিতে পারবে, বরং আমাদের জীবনে কীভাবে কাজে লাগাতে পারি তাই নিয়ে লিখি। আল্লাহর উপর সম্পূর্ণ ভরসা করে শুরু করলাম, জানিনা শেষ পর্যন্ত আল্লাহর আয়াতের কতটুকু মর্যাদা দিতে পারব।

কারো যদি সূরা আসর টা পড়া না হয়ে থাকে তার সুবিধার জন্য মোটামুটি একটা তর্জমা দিচ্ছি।

১. শপথ সময়ের (ওয়াল আসর)
২. নিশ্চয়ই প্রত্যেকটি মানুষ নি:সন্দেহে ক্ষতির মধ্যে রয়েছে (ইন্নাল ইনসানা লা ফী খুসর)
৩. শুধুমাত্র তারা ব্যতীত, যারা (ইল্লাল্লাযীনা)
- বিশ্বাস করেছে এবং (আ'মানু ওয়া)
- সৎকর্ম করেছে এবং (আ'মিলুস সালিহাতি ওয়া)
- উপদেশ দিয়েছে সত্যের দিকে / সততার সাথে এবং (তাওয়াসাও বিল হাক্ব ওয়া)
- উপদেশ দিয়েছে ধৈর্যের দিকে / ধৈর্যের সাথে (তাওয়াসাও বিস সাবর)

ছোট্ট সূরা। সিম্পল কথাবার্তা, কুরআনের অন্যান্য সব সূরায় যেমন সতর্কবাণী থাকে এখানেও তেমনই। কিন্তু এই সূরার গঠন, পূর্ণাঙ্গতা, শব্দচয়ন সবকিছু চিন্তা করলে রীতিমত ভয় লাগে। প্রথমেই বলি, আল্লাহ কুরআনে অনেক বস্তু নিয়েই শপথ করেছেন, (যেমন সূরা ত্বীন, সূরা শামস্, সূরা আদিয়াত), শপথ নিয়ে শুরু করা সূরার ধারাবাহিকতায় শেষ সূরা হচ্ছে সূরা আসর, এর পরে আর কোন সূরায় আল্লাহ কোন কিছুর শপথ করে কিছু বলেন নি। তিনি কিসের শপথ নিলেন? সময়ের। কেন? সময়কে এত সম্মান কেন? কারণ প্রত্যেকটি মানুষের জীবনে আল্লাহর দেয়া সবচেয়ে বড় অনুগ্রহ সময়। ধনী হোক, গরীব হোক, অ্যাথলিট হোক, পঙ্গু হোক - সবার জন্য সময়ের দয়া সমান পরিমাণে আছে। একটা জিনিসের মূল্য আরো বেশি মনে হয় যখন জানি একে ধরে রাখা যাবেনা। দেশের বাইরে থেকে তিন সপ্তাহের জন্য দেশে বেড়াতে গেলে এর মর্ম আমরা হাড়ে হাড়ে টের পাই। আল্লাহ সেই সময়ের শপথ করেছেন, ওয়াল আসর - যেখানে আসর এর শব্দগত উৎপত্তি 'আসীর' বা ফলের রস থেকে, নিংড়ে বের করতে গেলে যাকে কখনোই হাতের মুঠোয় ধরে রাখা যায়না।

এই আসর বা সময় শুধু সদা প্রবহমান - এটা বুঝাতেই ওয়াল আসর বলা হয়নি। আসর সাক্ষ্য দিচ্ছে যে প্রত্যেকটি মানুষ সত্যি সত্যি ক্ষতিগ্রস্ত। সময় একইসাথে গতিশীল, কিন্তু মহাকালের বিবেচনায় সবটুকু মিলিয়ে স্থানুও বটে। আমাদের হাসি খেলা, ইঁদুর দৌড়, পরষ্পরকে দোষারোপ, সামান্য অর্জনে আস্ফালন - তারপর একদিন নিরবে প্রস্থান - সব কিছুর সাক্ষী হয়ে আছে সময়। যে একই সাথে ছোট্ট শিশুর মত চঞ্চল, আবার শতবর্ষী ঋষির মত গম্ভীর। ইতিহাসের পাতার অসংখ্য সফল জাতির উত্থান ও পতন সময় দেখেছে, দেখেছে খুব সফল জননেতাকেও মৃত্যুর পরে ধূলোয় মিশে যেতে। আমাদের এত আয়োজন, এত আত্মম্ভরিতা - কিছুই সময়কে টানেনা, কারণ সে জানে এর শেষ হবে একটু পরেই।

এটা খুব অবাক করা ব্যাপার, আল্লাহ প্রত্যেকটা মানুষকে এত বড় একটা জিনিসের শপথ করে বলল ক্ষতিগ্রস্ত? আল্লাহ ইনসান না বলে কাফির বলতে পারত! মুশরিক বলতে পারত! ইনসান কেন? ইনসান দিয়ে ত বোঝায় পুরো পৃথিবীতে যত মানুষ আছে, বা যারা আগে চলে গেছে তাদের প্রত্যেকে আলাদা আলাদা করে। আমার ডিপার্টমেন্ট এর চেয়ারম্যান সব স্টুডেন্ট কে ডেকে যদি বলে, নূসরাত, you r in deep trouble, জেসি, you need to be careful, মমতা..., মারলন..., ব্রায়ান..., ক্যাথি - তাহলে যেমন ভয়ে আমাদের সবার আত্মা উড়ে যাবে, ইনসান ততটাই স্পেসিফিক। তাও একবার না, 'ইন্না' আর 'লা' একই বাক্যে দু দুটো অব্যয় ব্যবহার করে বাক্যটাকে খুবই জোরালো করা হয়েছে। প্রথমে 'আসর' দিয়ে শপথ, এক এক করে সবার দিকে অঙ্গুলি নির্দেশ, তারপর 'ইন্না' আর 'লা' দিয়ে এর গুরূত্ব দশ পনের গুণ বাড়িয়ে দেয়া - এই সূরায় আল্লাহ যেন মানুষের জন্য এক্সট্রিম এক্সট্রিম সতর্কবাণী দিয়েছেন।

আল্লাহ বললেন আমরা সবাই খুসর এর মধ্যে আছি। খুসর বলতে কিন্তু ছোটখাট ক্ষতি বোঝায় না। ব্যবসা করতে নেমে মূলধন সহ খুইয়ে নিঃস্ব হওয়া হচ্ছে 'খুসর।' আপনার পাঁচতলার ফ্ল্যাটে আগুনে আটকা পড়া হচ্ছে খুসর। অজ্ঞান অবস্থায় পানিতে পড়া খুসর। মোদ্দা কথা, সারভাইভাল এর প্রশ্ন যেখানে, যেখানে এই ক্ষতি থেকে উদ্ধার পাওয়া ছাড়া আর সব কিছু গৌণ হয়ে যায় - তাই খুসর। আল্লাহ কেন বললেন আমাদের জীবন নিয়ে টানাটানি? তিনি কি দেখেন না, আমরা দিব্যি বেঁচে বর্তে আছি? আমরা ত শেষ দিবসে বিশ্বাস করি, আর সাধ্যমত ইবাদত ও করি। তাহলে কেন তিনি ঘোর নাস্তিক এর সাথে আমাদের একই কাতারে ফেললেন?

উত্তর একটাই। সময়। আল্লাহ মানুষকে সৃষ্টি করে তাদের থেকে কমিটমেন্ট নিয়েছেন যে তারা নিজেদের 'আক্বল' বা ইন্টেলেক্ট ব্যবহার করে স্বেচ্ছায়, সজ্ঞানে আল্লাহর পছন্দসই কাজ করবে। আমরা পৃথিবীতে কতসময় থাকব সেটা অনেক আগেই ঠিক করা। এসময়টায় কী করব সেটাও হলফ করে আল্লাহর কাছে বলে এসেছি। ভাবতে গেলে মনে হয় সময়টাই যেন আমাদের একটা টুল। আল্লাহর কাছে প্রতিজ্ঞা করে ধার নিয়ে এসেছি। আল্লাহ দেখছেন তাঁর এই অনুগ্রহের কী সদ্ব্যবহার আমরা করছি। অনেকটা এমন, আমরা একটা বিশাল বালিঘড়ির নিচের অংশে আছি। একটা একটা করে বালি উপর থেকে পড়ছে, কথা ছিল তাই দিয়ে আমরা আল্লাহর নাম গুলি লিখব। কিন্তু সব ভুলে তাই দিয়ে আমরা ঘর বাড়ি বানাচ্ছি, ছাদটাকে ছোঁয়ার সিড়ি বানাচ্ছি। আল্লাহ সব দেখছেন, আমাদের মনে করিয়ে দেয়ার জন্য রাসুল পাঠাচ্ছেন, তাঁরা কাঁচের দেয়ালের বাইরে থেকে বারবার আমাদের নিষেধ করছেন, আমরা ফিরেও তাকাচ্ছিনা। বালিঘড়ির শেষ বালিটা যখন তার যাত্রা শেষ করবে, জীবনের দীপটা নিভে যাবে, আল্লাহর সামনে দাঁড়াব নতমুখে, তখন আমাদের হয়ে সাক্ষ্য দেবে আমাদেরই তৈরি বালির ঘর, নষ্ট করা সময়।

http://bayyinah.com/podcast/2010/01/19/103-asr-part-1/ 
http://bayyinah.com/podcast/2010/01/19/103-asr-part-2/

বাড়ি ফেরার প্রতীক্ষায়

নিউইয়র্কে সাবওয়ের এক লোকাল ট্রেনে বসে ঢুলছেন নাম না জানা ভদ্রলোক, অফিস ফেরত, মধ্যবয়সী। চেহারায় দেশী ছাপ স্পষ্ট। আমেরিকায় কত প্রজন্ম চলছে কে জানে। ন'টা পাঁচটা অফিস করে পৌনে এক ঘন্টা জার্নি করে পড়ন্ত বিকেলে বাড়ি ফিরছেন, সঙ্গী এক রাশ ক্লান্তি।

অফিস শেষ হলেই মুহিব সাহেবের মেজাজটা খারাপ হয়ে যায়। সেই ত ঘরে ফেরা, স্ত্রীর সাথে দূরত্ব, ছেলে মেয়েদের বেয়াদবি দেখেও না দেখার ভান করা। ধূউউউর.. কীসের জন্য এত কিছু করা? সারাদিন গাধার খাটনি খেটে ফিরি, কারো কোন খেয়াল আছে, মানুষটা বেঁচে আছে না মরে গেছে? খেয়াল হবে মাসের শেষে টাকা দিতে না পারলে। হালের গরুর সাথে আমার আর পার্থক্য কী?

ল্যাব থেকে আজকে তাড়াতাড়ি বের হচ্ছে লুসিয়া। তার প্রিয় কুকুর স্প্রকেট কে নিয়ে বেড়াতে বের হবে। সামারটা স্প্রকেট এর খুব প্রিয়। সপ্তাহে দু'দিন অন্তত ওকে নিয়ে বেড়াতে না গেলে ভীষণ মাইন্ড করে। লুসিয়া ঘরে ফিরলেই ভৌ ভৌ, হুফ হুফ করে লাফালাফি করে আর রাখেনা। লুসিয়াও প্রাণ দিয়ে ভালবাসে স্প্রকেট কে।

ঘরে ফেরার সাথে কীভাবে কীভাবে যেন আমাদের খুব গভীরে গেড়ে থাকা একটা আকাঙ্ক্ষা জড়িয়ে আছে। আমরা কল্পনা করতে ভালবাসি এই যে আমি বাইরে - ঘরে গেলেই একটা বিরাট কিছু ঘটে যাবে। একটু চিন্তা করে দেখুন ত, কড়া জ্যামে আটকা পড়ে ঘরে ফিরতে দেরি হলে কেমন অস্থির লাগতে থাকে! তা কি শুধু বিশ্রাম পাওয়ার জন্যই? কাজের জায়গা থেকে বাসা বেশ দূরে হলে প্রতি সেকেন্ডে বাসার জন্য টান টা কেমন বাড়তে থাকে? কখনও কি ভাল করে চিন্তা করে দেখেছেন এই টানটার উৎস কোথায়? এর পরের বার বাড়ি ফেরার সময় একটা একটা করে জিনিস ধরে চিন্তা করে দেখেন, আলাদা আলাদা করে সবগুলোই মনে হবে এটার জন্যই ত যাই।

যেমন খাবার। ক্ষুধা লাগলে ঘরের টানে ফিরে আসা, কিন্তু খাবার টা এমন কী? বাইরে খেলে কী হয়? নিজের বিছানা। তাহলে গ্র্যাড স্টুডেন্টদের ঘরে ফিরতে এত অনীহা কেন? ঘরের মানুষ - তাহলে মুহিব সাহেবের ঘর নরক কেন? আর লুসিয়ার ঘরে কেউ না থেকেও এত আনন্দ কেন?

আমার মনে হয় ঘরে কেউ একজন অপেক্ষায় আছে - এই অনুভূতি টা ঘরের জন্য টান এত বাড়িয়ে দেয়। এই এক থিমের উপর কত গল্প উপন্যাস পড়ে ফেললাম। আপনারাও একটু চিন্তা করে দেখেন, ঘরে ঢুকে সবাইকে যার যার মত কাজে ব্যস্ত থাকতে দেখলে কেমন কষ্ট লাগে, অভিমান লাগে। তার বদলে কুকুরটাও ঝাঁপিয়ে পড়লে মনে হয় আমার এই ফেরার প্রয়োজন ছিল, আমি না আসলে একটা শূন্যতা থেকেই যেত।

ঘরটাকে ঘরের মত রাখার জন্য এই ছোট্ট বিষয়টা খেয়াল রাখা খুব গুরূত্বপূর্ণ। ছেলেমেয়েরা বাবা মায়ের বাসায় ফেরার জন্য অপেক্ষায় থাকে, বাবা মায়ের খুবই খুবই উচিৎ ফেরার পরপরই ছেলেমেয়ের সাথে গল্প করা, সারাদিন কী করেছ, কেমন গিয়েছে ইত্যাদি ইত্যাদি। স্ত্রী স্বামীর অপেক্ষায় থাকে, তার ইচ্ছে করে ঘরের খুঁটিনাটি বিষয়গুলি নিয়ে স্বামীর সাথে কথা বলতে, কারণ সে তার কাজের ক্ষণগুলোতে স্বামীর অভাব বোধ করেছে, সেটা প্রকাশ করার মত ভাষা তার নেই, তাই 'এইটা হয়েছে ওইটা হয়েছে' এসব বলে বলে সে চায় স্বামীকে তার দিনের সাথে রিলেট করতে, যেন স্বামী তার কষ্টগুলোর ভাগীদার হতে পারে। স্বামী স্ত্রীর কাছে তার অভাববোধটুকু দেখার অপেক্ষায় থাকে। তার চিন্তায় থাকে, এতটা সময় আমি ছিলাম না, আমাকে মিস করলে এখন নিশ্চয়ই তার প্রতিফলন হবে ভালবাসা, যত্ন দিয়ে!

একজন বাবার বা স্বামীর ঘরে ফেরা নিয়ে যে তাড়া বা উৎসাহ থাকে, ফেরার পর তার প্রতিফলন হওয়া উচিৎ কে কেমন ছিল তার খোঁজখবর নিয়ে, খুবই হালকা কথাবার্তা বলে, just to show that I really thought about you when I was away. স্ত্রী যদি বাইরে কাজ করে তারও একই ভাবে বাচ্চাদের আর স্বামীর সারাদিনের খোঁজ নেয়া উচিৎ। পাশাপাশি স্বামী বা স্ত্রী যেন ঘরে ফিরে অনুভব করে অন্যরা তার আসার অপেক্ষায় ছিল, সে ব্যাপারটা খুব যত্ন করে মেইনটেইন করা উচিৎ। এটা করা যায় আসার পর অন্তত পাঁচ দশ মিনিট তার দিকে পূর্ণ মনোযোগ দিয়ে। অফিস শেষে বাড়ি ফিরে পরিবারের মানুষগুলোকে বিনোদন এ ডুবে থাকতে দেখলে কী যে খারাপ লাগে সেটা বলে বোঝানো যায় না। মনে হয় টেলিভিশনের কাছে আমি হেরে গেলাম। আমার চেয়ে টেলিভিশনের/কম্পিউটারের আকর্ষণ বেশি। তাই বলে পরিবারের সদস্যরা কাজে ব্যস্ত থাকলেই যে খুশি তে মন ভরে যাবে তাও না। তখন মনে হয়, সবাই যার যার মত ব্যস্ত। আমি আসলেই কী আর না আসলেই কী। বেশি না, পাঁচ দশ মিনিট। তারপর ঐ মানুষটা নিজের মত ব্যস্ত হয়ে গেলে আর কিছু লাগবেনা।

আমাদের ডিপার্টমেন্টের গ্র্যাড স্টুডেন্ট জেফারি কে অনেক ধন্যবাদ, ওর একটা কথাই আমার জন্য eye opener ছিল। ওর সারাদিন ল্যাব এ পড়ে থাকা দেখে রনি দরদ দেখিয়ে বলছিল, তুমি ঘরে যাওনা কেন? সে দুষ্টুমি হাসি হেসে বলল, আমার তোমার মত ঘরে বউ নেই যে! এই দেশে বেড়ে ওঠা একটা ছেলের জন্য বউয়ের অল্টারনেটিভ খুঁজে পাওয়া ত এমন কঠিন না, ওর আর আমাদের ঘরের মধ্যে কমফোর্ট জনিত বেশি পার্থক্যও হবেনা। বোধহয় পার্থক্য এখানেই, প্রতীক্ষায়।

দাম্পত্য - ৬

পরিবারে একজন পুরুষের সবচেয়ে প্রিয় দুইটি নারী - মা আর স্ত্রীর মধ্যকার বিবাদের অনেকটাই চলে ভালবাসার দাবি তে। নতুন দম্পতিরা সত্যিই বুঝতে পারেন না, একে অপরকে নিয়ে ব্যস্ত থাকতে গিয়ে তারা আর সবার থেকে কতটা আলাদা হয়ে গেছেন। একটা ফ্রেন্ড সার্কেলে দুজন জুটি বেঁধে গেলে অন্যদের কেমন হিংসে হয় এটা একটু কল্পনা করলে বুঝতে পারবেন 'কাছের মানুষটা পর হয়ে গেছে' - এই উপলব্ধি পরিবারের অন্যদের কতটা কষ্ট দেয়।

মানি, নতুন দম্পতির পরস্পরকে জানা ও চেনা প্রয়োজন। কিন্তু তা কি আর সব কিছু থেকে নিজেকে আলাদা করে তারপর? দুটো গাছ একজন আরেকজনের উপর ভর করে বেড়ে উঠবে। তার জন্য কি শেকড়গুলি সব উপড়ে তবেই এক হতে হবে? লতাগুলো হয়ত পরস্পরের বাহুডোরে থেকে কিছুই টের পাবেনা। কিন্তু মাটির কান্না? মাটি সে শূন্যতা ভরবে কী দিয়ে? তিল তিল করে বুক চিরে যে আদরের ফসল এত বড় হয়েছে, তার উপস্থিতি ছাড়া মাটির ত আর কিছুই নেই! সে বাঁচবে কী নিয়ে? আমরা সহজে বলি, বাবা মায়েরা আমাদের যথেষ্ট 'স্পেস' দেয়না। সত্যি কথা কী, স্পেস দেয়ার জন্য মায়ার বাঁধন একটা একটা করে ছিঁড়ে রিক্ত শূন্য হয়ে, তবেই স্পেস তৈরি করা যায়। স্পেস মানে ত খালি জায়গা, তাই না? যে জায়গাটা বাবা মা মনোযোগ দিয়ে যত্ন দিয়ে ঘিরে রেখেছিল, স্পেস দেয়ার জন্য সেখান থেকে তাদের নিজেদের গুটিয়ে নিতে হবে, তাই ত?

গাছের উপমায় আবারো ফিরে আসি। শেকড় আর লতানো বাহু - দুটোর টানই তীব্র। দুটোর জন্যই তার আকর্ষণ অসীম। মমতাময়ী মা যেভাবে খাবার জন্য পীড়াপীড়ি করত, অসুখ হলে অস্থির হত - ওই আনন্দগুলি ত অন্যরকম! অমনি করে ভালবাসা পাওয়ার ইচ্ছে ত কোনদিন মরে না। আর স্ত্রী? তার জন্য একটা পুরুষ জীবন দিতে পারে। তার যা আছে সবকিছু বিনিয়োগ করতে পারে। ভুল হয়ে যায় তখনই, যখন ভালবাসায় অবুঝ হয়ে এই মানুষগুলো তাদের আপন আপন গন্ডি ছেড়ে আরও অনেকটা দখল করে নিতে চায়। তাই পুরুষটিকে হতে হবে খুবই সচেতন। মা যেন কখনও না ভাবে ছেলেটা বদলে গেছে। আগের মত করে সময় দিতে না পারলেও আদুরে গলায় 'মা তোমার ঐ রান্নাটা অনেকদিন খাইনা', বা 'মা আমার মাথায় একটু হাত রাখ' - এ ধরণের কথা বলে ছোট ছেলেটা হয়ে গেলে মায়ের অনেক দুঃখ দূর হয়ে যাবে।

মায়ের বয়স হয়েছে, তিনি চান বউ সংসারের দায়িত্ব নিক, কিন্তু এত যত্নে গড়ে তোলা সিস্টেম একটা আনাড়ি মেয়ের হাতে তুলে দেয়ার আগে তিনি চাইবেন মেয়েটাকে তার সিস্টেমে অভ্যস্ত করিয়ে নিতে। কিন্তু সুপারভাইজিং, ট্রেনিং বেশ কঠিন কাজ। অনেক ধৈর্য আর সহনশীলতা দরকার হয়। বিভিন্ন কারণে গুরুজনেরা এই বয়সে অনেক সময় বুঝতেও পারেন না কোন কথাটায় কতটুকু কষ্ট পেতে পারে ছেলেমেয়েরা। এক প্রজন্ম থেকে অন্য প্রজন্মে সেনসিটিভিটি এর মাত্রা বদলায়। যুক্তি দিয়ে সরাসরি ভুল ধরাটা আমাদের প্রজন্মে কমন, উনারা হয়ত খুবই আহত হন। আবার স্বভাব চরিত্র নিয়ে একটু খোঁচা মেরে কথা বলাটা উনাদের কাছে হয়ত নিছক রসিকতা, আমরা ভীষণ অফেন্ডেড হই।

যাই হোক, নতুন বউয়ের এ ধরণের আচরণে কষ্ট লাগবে। স্বভাবতই সে সবার আগে স্বামীকে খুলে বলবে। স্বামীর দায়িত্ব এখানে রিঅ্যাক্ট না করে পুরোটা শোনা, মা যদি অন্যায় করে থাকে তাহলে অকপটে স্বীকার করা, তারপর মায়ের দোষগুলোর পিছনে ওনার ভাল নিয়ত টুকু দেখানোর চেষ্টা করা, বা বুঝিয়ে বলা যে এটা জেনারেশন গ্যাপ ইত্যাদি। এতে দুটো সুবিধা আছে। স্ত্রী বুঝবে এটা একটা সমস্যা, আর তা সমাধান করার জন্য সে একা নয়, আরেকটি সহানুভূতিশীল মন তার পাশে আছে। মায়ের দোষ ছেলে স্বীকার করলে স্ত্রী তখন ব্যাপারটাকে একটা সমস্যা হিসেবেই দেখবে, অন্যায় হিসেবে না। এতে করে সমস্যার সমাধান না হোক, সমস্যাটা আপনাদের মধ্যকার বন্ধন আরো দৃঢ় করতেই সাহায্য করবে।

আবার এদিকে মা খুবই কষ্ট পাবেন যদি ছেলে এসে তার দোষ ধরিয়ে দেয় বা বউয়ের দোহাই দেয়। আগে থেকে বাবা মা সমালোচনা গ্রহণ করতে অভ্যস্ত না হলে বিয়ের পরে সে চেষ্টা করতে যাবেন না। বরং এভাবে শুরু করতে পারেন, 'কী মা, তোমার বউ নাকি এটা এটা করেছে!' মায়ের প্রতি আপনার আবেগ যেন প্রকাশ পায়, বউয়ের নাম ধরে না বলে 'তোমার বউ' বলার মাধ্যমে তাদের দুজনের সম্পর্কের উপর জোর দিন (নিজেকে আড়াল করে), এটা করেছে - বলার মাধ্যমে হালকা একটা দোষারোপের ভঙ্গি করুন। এতে করে মায়ের মনে 'ছেলে আমার কথা শুনবে না' এই ধরণের ডিফেন্সিভ ভাবটা থাকবেনা। উনি মন খুলে কথা বলতে পারবেন। আপনি আন্তরিকভাবে শুনলেই উনার মনটা অনেক শান্ত হয়ে যাবে। সমস্যা যদি ঘরের কাজ সংক্রান্ত হয় তাহলে কাজটা আপনি শুরু করুন, স্ত্রীকে আগে থেকেই রাজি করিয়ে রাখবেন যাতে সেও জয়েন করে।

বউ শাশুড়ি ঘটিত সমস্যা ত আর হাদীস এ নেই, কিন্তু তার সূত্রপাত যেখানে, ভালবাসা জনিত ঈর্ষা, তার উদাহরণ কিন্তু ঠিকই আছে। আয়িশা (রা) এর ঘরে মেহমানদের জন্য রাসুলুল্লাহ (স) এর অপর স্ত্রী খাবার পাঠিয়েছিলেন। আয়িশা (রা) রাগে খাবার সহ বাটি মাটিতে ফেলে দেন। কী অস্বস্তিকর অবস্থা! রাসুলুল্লাহ (স) করলেন কী, 'তোমাদের মা ঈর্ষায় পড়েছেন' বলে নিজেই ভাঙা টুকরাগুলো মাটি থেকে তুলতে লাগলেন। মেহমানদের সামনে অপমান করা হয়েছে মনে করে রাগ করলেন না, শাস্তি দিলেন না, মেহমানদের কাছে বললেন 'তোমাদের মা'; আবার অপর স্ত্রীর বাটি ভেঙে তার উপর অন্যায় করা হয়েছে, এ জন্য আয়িশা (রা) এর ঘর থেকে একটা বাটি নিয়ে উনাকে ফেরত দিলেন।

কে ঠিক আর কে বেঠিক সে বিচার করতে যাবেন না ভুলেও। দুজনেই অবুঝ, দুজনেই আপনাকে খুব ভালবাসে, দুজনেই চায় আপনার ঘরটাকে সুখ দিয়ে ভরিয়ে তুলতে। আপনার কাজ শান্তিপূর্ণ মধ্যস্থতা করা। শেকড় থেকে জীবনীশক্তি আর সঙ্গী গাছের থেকে দৃঢ়তা পেলে একটি গাছ ফুলে ফলে ছায়ায় কত মানুষের মুখে হাসি ফোটাতে পারবে চিন্তা করে দেখেছেন?

দাম্পত্য - ৫

দম্পতি মানে কী? আভিধানিক অর্থে জায়া আর পতি - সুখী দম্পতি মানে তাহলে একজোড়া সুখী চড়াই চড়ানি - সমীকরণটা যদি এত সহজ হত, তাহলে চারপাশে শুধু সুখেরই বন্যা বইত।

বিয়ের সাথে সাথে অবিচ্ছেদ্যভাবে চলে আসে শ্বশুরবাড়ি, আত্মীয় স্বজন। বিয়ে হলে একটা ছেলেকে বা একটা মেয়েকে একই সাথে অনেকগুলো বন্ধন তৈরি করতে হয়। এদের একেকটার ডাইমেনশন একেক রকম। যেমন শ্বশুর শাশুড়ির চাহিদার সাথে শ্যালক সম্বন্ধীয় আত্মীয়ের চাহিদার মিল নেই। একটা নতুন বউ বা নতুন জামাই, বিয়ের অনুষ্ঠানে যেমন হাসি খুশি, লাজুক একটা ভাব নিয়ে সম্পর্কের বাঁধনে জড়ায়, নানা ধরণের আত্মীয়ের চাহিদা পূরণ করতে গিয়ে তা থেকে একটু সরে আসলেই অনেক সমালোচনার শিকার হতে হয়।

আজকের লেখাটা শুধু ছেলেদের উদ্দেশ্য করে লিখব। আমি জানি, বিয়ের আগে ছেলেরা খুবই ভয় পেয়ে যায় তার সবচেয়ে প্রিয় দু'জন মানুষ, মা আর স্ত্রীর মধ্যকার সম্পর্ক কেমন হবে তাই নিয়ে। অনেক ছেলেই এই অশান্তির ভয়ে বিয়ে করতেও চায়না। তারা বুঝেও উঠতে পারেনা কী এমন হয়ে গেল সকাল থেকে সন্ধ্যার মধ্যে, যে ঘরে পা দিয়েই মায়ের ছলছল চোখ, স্ত্রীর অগ্নিবর্ষণ (অথবা উল্টোটা) দেখতে হচ্ছে। প্রথম প্রথম হয়ত আপনি আসাতে পরিস্থিতি বদলাবে, কিন্তু মনটাকে বদলাবে কে? মায়ের কাছে বউয়ের নামে অসন্তোষ, বউয়ের কাছে মায়ের নামে গঞ্জনা - এসব শুনে শুনে ছেলেটার ত মানুষের উপর থেকে সম্মানটাই উঠে যাওয়ার কথা। প্রথম প্রথম ছেলেটার মন খারাপ থাকে, নিজেকে ব্যর্থ মনে হয়, একটা সময় বুঝতে পারে, উপেক্ষা করাটাই সহজতম পন্থা। দুইজন কে আলাদা আলাদা তাল দিয়ে মন রক্ষা করলেই সুন্দর শান্তি থাকবে ঘরে। আর সব মেয়েলি ব্যাপার নিয়ে ছেলেদের মাথা ঘামাতে নেই। তাদের সমস্যা তারাই সমাধান করুক, এ সময়টা বরং আমি একটু ঘুমিয়ে নেই।

আমি দুঃখিত, সত্যিই দুঃখিত ছেলেদের এই টানাপোড়েন দেখে। শ্যাম রাখি না কুল রাখি - এই করে করে ছেলেটার বেড়ে ওঠাই বন্ধ হয়ে যায়। যে ছেলেটা পরিবার নিয়ে অনেক প্ল্যান করে সুন্দরের পথে এগোনোর দিকে পথ প্রদর্শক হতে পারত, হোম পলিটিক্স এর জটিলতায় পড়ে শেষ পর্যন্ত সংসারে তার ভূমিকা হয় নিরব দর্শকের। হয় তখন আপনার স্ত্রী কে নিয়ে আলাদা হয়ে যেতে হবে, নাহয় স্ত্রীর মুখ কড়া শাসন করে বন্ধ রাখতে হবে, বলতে হবে, মা কে মাথায় করে রাখবা - আমি আমার মায়ের নামে কোন কথা শুনতে চাইনা। তোমার যা লাগে আমি দিব কিন্তু সংসারে আমি কোন অশান্তি চাইনা।

আমি দাবি করছিনা আমি এই হাজার বছরের সমস্যার কোন ইনস্ট্যান্ট সমাধান নিয়ে এসেছি। আমি চাই আপনি আপনার ভূমিকাটাকে একটু যাচাই করুন। একজন সন্তান হিসেবে, একজন স্বামী হিসেবে, একটা পরিবারের প্রধান হিসেবে (শ্বশুরেরা সাধারণত মৌনী ঋষি হন - সময় মত খাবার, গরম পানি আর সংবাদপত্র পেলেই তাদের চলে - তাই ফ্যামিলি ম্যানেজমেন্ট এর হর্তাকর্তা হিসেবে) আপনার কি আরো কিছু করার ছিল? আমি জানি এটা এমন এক সমস্যা যা নিয়ে অফিসের কলিগের সাথে আলাপ করা যায়না। বন্ধুরাও হয়ত ধৈর্য ধরার উপদেশ দিয়েই দায় সারবে। কিন্তু আপনি কি আরো একটু বুদ্ধি খরচ করে আরো একটু বেশি ইফোর্ট দিয়ে পরিবেশটাকে বদলাতে পারতেন? নিদেনপক্ষে আপনার মা ও স্ত্রীর মধ্যে দূরত্বটা একটু ঘুচাতে পারতেন?

প্রথমেই বলি, ছেলেরা ভুল আশা করে যে তার স্ত্রী তার মাকে ঠিক তার মত করেই ভালবাসবে। যদি না পারে, তাহলে দীর্ঘশ্বাস ফেলে, মেয়েরা এত সংকীর্ণমনা কেন? কিন্তু ব্যাপারটা যে অসম্ভব যে কোন মানুষের জন্যই! মায়ের সাথে সম্পর্কটা গড়ে ওঠে অনেক বছরের আদর ভালবাসার উপর ভিত্তি করে। সন্তানের দোষ মায়ের চোখে ধরা পড়ে না, তেমনি বাবা মায়েরও অনেক অন্যায় ছেলে মেয়েরা দেখেও না দেখার ভান করে। অন্য মানুষের জন্য ত এটা করা যায়না। একটা ছেলে কি পারবে তার স্ত্রীর মাকে আপন মায়ের সমান ভালবাসতে? হ্যা, সার্ভিস হয়ত আপন মায়ের সমান দেয়া যায়, কিন্তু দোষ ক্ষমা করার বা উদারতার রেঞ্জটা কিন্তু এখানে কমই হবে, আর এটা খুবই ন্যাচারাল। মানতে কষ্ট হলে নিজেকে দিয়ে একটা এক্সপেরিমেন্ট করে দেখতে পারেন। শ্বশুরবাড়িতে এক মাসের জন্য থেকে আসুন। জামাই হিসেবে না, ছেলে হিসেবে। বাজার করে দিন, বিল দিন, শ্যালিকাকে পড়ান, সংসারের খরচপাতির ব্যবস্থা করুন, শাশুড়িকে ডাক্তারের কাছে নিয়ে যান, তখনই বুঝতে পারবেন অন্য একটা পরিবারে গিয়ে ব্যক্তিত্ব বজায় রেখে দিনের পর দিন সবাইকে খুশি রাখা কত কঠিন।

দ্বিতীয়ত, একজন ভাল মা মানেই একজন ভাল শাশুড়ি না। একজন চমৎকার মানুষ মানেই একজন ভাল বৌমা না। একজন ভাল লেখক যেমন ভাল প্রশাসক না - তেমনি একেকটা সম্পর্কের ডাইমেনশন একেকরকম, দায়িত্বগুলিও ভিন্ন। সেজন্য আপনার ফেরেশতাসম মা শাশুড়ি হিসেবে ব্যর্থ হলে বুক ভেঙে যাওয়ার কোন কারণ নেই। যে মেয়েটা ফুল দেখত, গান গাইত, চিঠি লিখত, বিয়ের পর ঘরে এসে চরম পলিটিক্স শুরু করলে ঘৃণায় মুখ ফিরিয়ে নেয়ার দরকার নেই।

তৃতীয়ত, মা আর স্ত্রী - এদের মধ্যে যে বন্ধন তা আপনাকে কেন্দ্র করেই রচিত। এই সম্পর্ক কোন খাতে বইবে - সেটাও অনেকটা নির্ভর করছে আপনার সাথে তাদের সম্পর্ক কেমন তার উপর। এটা একটা টাগ অব ওয়ারের মত, দুটো নারী তাদের সমস্ত কিছু দিয়ে একটা প্রতিযোগিতায় নেমেছে, পুরস্কার আর কিছু না, আপনার অখন্ড মনোযোগ। বাস্তবিক, আমার মনে হয়, ছেলেটার একটা ক্লোন করে যদি দু'জনের হাতে দুটো ধরিয়ে দেয়া যেত - তাহলে বেশ হত।

চতুর্থ, এরকম সিলি বিষয় নিয়ে এরা এমন করে কেন - এরকম একটা উঁচুদরের চিন্তা করে গা বাঁচিয়ে চলার অবকাশ নেই। সিলি বিষয়গুলি মোটেও সিলি না, কারণ এর কারণে পরিবার নামক দেয়ালটায় বড়সড় ফাটল দেখা দিচ্ছে। আপনি কি শুধু এক কোণে দাঁড়িয়ে দেখবেন, আর মাঝে মধ্যে দুই পক্ষেই হাত লাগাবেন? এর বেশি কি আপনার কিছু করার নেই?

দাম্পত্য - ৪

আমার বিয়ের আগে একটা মাত্র উপদেশ পেয়েছিলাম আমার এক কাজিনের থেকে, সে বলেছিল, যত যাই হোক, তোদের একটা কমন পয়েন্ট অব ইন্টারেস্ট রাখবি। যাতে তোদের শখের জিনিসটা নিয়ে আলোচনা করতে পারিস, দেখবি অনেক ঝড়ের মধ্যেও ওটা তোদের কাছাকাছি রাখবে।

আমি এত ভাল বুঝি নাই। কমন পয়েন্ট অব ইন্টারেস্ট - আমাদের ত আনকমন ইন্টারেস্ট খুঁজে পাওয়াই কষ্ট বেশি। এক সাবজেক্টে পড়াশুনা করেছি, এখনও একই জায়গায় একসাথে পড়ি, কমন না কী? সবই ত কমন। যাই হোক, মূল্যবান উপদেশটার মাথা মুণ্ডু হদিস করতে না পেরে শিকেয় যত্ন করে তুলে রেখেছিলাম। ল্যাব এ জয়েন করার পর আমার সুপারভাইজর কাপলটাকে দেখে খুউব ভাল লাগত। ভদ্রলোক বেশ আলাভোলা সাইন্টিস্ট, ভদ্রমহিলা খুব কেয়ারিং, অর্গানাইজড। আমরা বাসায় এসে বলাবলি করতাম, আমরা ওদের মত কাপল হব, হ্যা? একই ওয়ার্কপ্লেসে কাজ করাটা অনেকটা ঘরের কাজ ভাগাভাগি করে করার মত। পারস্পরিক সমঝোতা তৈরি হওয়ার সুযোগ অনেক বেড়ে যায়। উল্টোটাও হতে পারে, ব্যক্তিত্বের সংঘাত আরো বেড়েও যেতে পারে, কারণ ভুলগুলো আরো বেশি চোখে পড়বে।

কিন্তু ভলান্টারি কাজ একসাথে করার মধ্যে যে আনন্দ তার কোন তুলনা হয়না। এতে ত কোন কিছু পার্থিব লাভ বা ক্ষতি নেই, তাই ভুলচুক হলেও অত গায়ে লাগেনা। আবার কাজটা না করলেও ত সে পারত - এরকম একটা মেন্টালিটি থাকে, তাই ছোট্ট কাজকেও খুব মহৎ লাগে। অন্যের জন্য স্বার্থ ছেড়ে কাজ করার একটা বাই ডিফল্ট ভাল অনুভূতি আছে, সেটা প্রিয় মানুষটার সাথে ভাগাভাগি হলে আনন্দটা বহুগুণ বেড়ে যায়। হয়ত কোনদিন ভাল করে চোখ মেলে দেখেন নি, যে তার ভেতর এত মহত্ত্ব আছে। আর কিছু না, ছোট্ট একটা চ্যারিটিও দুজন মিলে প্ল্যান করে করলে হঠাৎ একটা উপলব্ধি আসে, 'কীসের জন্য তেল নুন চাল ডাল নিয়ে ঝগড়া করছি? আমরা একসাথে ত আছি অ-নে-ক উপরের লেভেলের কাজ করার জন্য।' আমার সত্যিই মনে হয় আল্লাহ এরকম ইফোর্ট দেখলে এত খুশি হন যে নিজ উদ্যোগে তখন ঘরটা শান্তি দিয়ে ভরে দেন। আর ভাল কাজ একসাথে মিলে করলে খুব গর্বও হয়, আমার বউ/ স্বামী আর দশজনের মত না, সে অন্যদের কথা ভাবে, সে স্বার্থপর না।

অনেক দম্পতির নানা কারণে ঘরের বাইরে ভলান্টারি কাজ করার সুযোগ নেই। আসলে বাইরে যাওয়ার দরকারও নেই। সন্তান মানুষ করার কাজটাকে যদি কেউ জাস্ট আল্লাহ কে খুশি করার উদ্দেশ্যে পূর্ণ ইফোর্ট দিয়ে করে, তাহলে এর চেয়ে বড় চ্যারিটি আর হয়না। কিন্তু এই প্যারেন্টিং ইস্যু তে এসে দম্পতিরা সবচেয়ে বেশি ধরা খেয়ে যান। তারা এটাকে ঘাড়ের উপর চেপে বসা একটা বোঝা মনে করেন। যদি ভাবতেন একটা নতুন মানুষের জীবনের ট্র্যাক ঠিক করে দেয়ার জন্য আল্লাহ আমাদের দুজন কে এক করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন, তাহলেই হয়ে যেত। স্বামী স্ত্রী করেন কি, একজন আরেকজনের উপর রাগ উঠলে বাচ্চাদের সামনে বা বাচ্চাদেরই উপর প্রতিশোধ নেন। অথচ হওয়ার কথা ছিল উল্টো। বাচ্চারা শিখে ফেলবে এই ভয়ে রাগ টা কপ করে গিলে ফেলা, কারণ shaping up someone's personality is a far more prestigious task than winning in this psychological tug of war.

নিদেনপক্ষে অন্য মানুষটার শখের বিষয়টাতে আন্তরিকভাবে উৎসাহ দিলেও হয়। এই যে বিখ্যাত লেখকরা প্রায় সময়ই অদৈহিক ভালবাসার সম্পর্কে জড়িয়ে পড়েন, বেশির ভাগ সময় এটার শুরু হয় তাদের যার যার সৃষ্টি নিয়ে উঁচুমানের মত বিনিময় থেকে। জাগতিক বিষয়াদি হয়ত তার স্ত্রী সামলাচ্ছে, কিন্তু ভাবনার জগতে, সৃষ্টির জগতে সে একদম একা। অন্তত 'প্রথম আলো' উপন্যাসে রবীন্দ্রনাথের স্ত্রীর বর্ণনা পড়ে আমার ওরকমই মনে হয়েছে। এক জনপ্রিয় সাহিত্যিক তার স্ত্রী সম্পর্কে লিখেছিল, ওর অনেকগুলো মুগ্ধ করা গুণের মধ্যে একটা হল আমি টুকরো টাকরা কাগজে যাই লিখি ও যত্ন করে একটা বাক্সে গুছিয়ে তুলে রাখে, যদি পরে কাজে লাগে! এক অভিনেত্রী তার স্বামী এক্সিডেন্ট এ মারা যাওয়ার পর দুঃখ করে বলছিলেন, আমার সম্পর্কে কাগজে যত রিপোর্ট আসত সব সে সংগ্রহ করে লেমিনেট করে রাখত।

লেখার শুরুতে যে বলেছিলাম, ম্যাজিক স্পেল বা তালিসমান - আমি নিশ্চিত এটাই সে জিনিস। আপনাদের মধ্যে যত সমস্যাই থাকুক, খুঁজে এমন একটা কাজ বের করুন, যেটা দুজনের কাছেই নিঃস্বার্থ ভাল কাজ মনে হয়। যদি সেটা হয় ধর্মচর্চা বা প্রচার, তাহলে ত কথাই নেই। একসাথে করে দেখুন, সঙ্গের মানুষটার জন্য নতুন করে ভালবাসায় বুকটা ভরে যাবে। মনে হবে, s(he) may not be the perfect person of the world, but s(he) is perfect in my world.

Monday, August 1, 2011

দাম্পত্য - ৩

কমফোর্ট আর স্বস্তি একটা ঘরে সুখের ফোয়ারা বইয়ে দিতে পারে সত্যি, কিন্তু এর বাইরেও দাম্পত্য জীবনে অনেক কিছুই করার আছে। স্বামী স্ত্রী উত্তম বন্ধু রূপে শুধু একে অপরকে নিরাপত্তাই দিয়ে যাবে জীবনভর, এর বাইরে আর কিছু নয় - ব্যাপারটা এমন নয়। আর চাহিদা অনুযায়ী পরিপূর্ণ আরাম না পেলেই যে সংসার উচ্ছন্নে যাবে - তাও না। পুরোপুরি স্বতন্ত্র দু'জন মানুষের আচরণ সব সময়ই পছন্দ মত হবে - এমন ভাবাটা ঠিক না। পদে পদে কমফোর্ট নষ্ট হবে, কমিউনিকেশন এর সব চেষ্টা ব্যর্থ হবে, ক্ষুদ্রতা দেখে বুক ভেঙে যাবে - সম্মানের বদলে জায়গা করে নেবে করুণা - এমন অনেক কিছুই হতে পারে। তখন কি আল্লাহর প্রতিশ্রুত শান্তি সে ঘর থেকে হারিয়ে যাবে? বিয়ের উপর যে এত বার করে গুরূত্ব আরোপ করা হয়েছে, রাসুলুল্লাহ (স) যে বলেছেন, দ্বীন এর অর্ধেক হচ্ছে বিবাহ - তা কি দুটো ব্যক্তিত্বের অসামঞ্জস্যেই ভুল হয়ে যাবে? তা কী করে হয়?

আমার কাছে মনে হয় দাম্পত্যের দ্বিতীয় স্তরের পূর্ণতা আসে যখন স্বামী স্ত্রী সত্যি সত্যি একে অপরকে পূর্ণতা দেয়ার জন্য চেষ্টা করে। যখন একজন অপরজনের দোষত্রুটি গুলি চিহ্নিত করে সেগুলি বদলানোর জন্য কাজ করে। আমি ফাইন্যান্সিয়াল ব্যাপার কিচ্ছু বুঝি না, আমার স্বামী ধৈর্যের সাথে অল্প অল্প করে একটু করে কাজ দিয়ে আমাকে মানুষ করার চেষ্টা করছে। অপর দিকে তার লেখা নিয়ে একটা ভীষণ রিপালশন কাজ করে। আমি চেষ্টা করছি প্রতি সপ্তাহে ছলে বলে কৌশলে যে করেই হোক একটা করে তার কাছ থেকে লেখা আদায় করতে। ও লেখায় সরগর না হলে কি আমার ঘর ভেঙে যাবে? আমার কী দায় পড়েছে ওকে দিয়ে লেখাতে? কিন্তু আমরা ত আগামী অনেকগুলো বছর ইনশাল্লাহ একসাথে থাকব, আল্লাহ ছয়শ কোটি মানুষের মধ্যে থেকে আমাদের দুজন কেই এক সাথে জীবন কাটানোর সুযোগ দিয়েছেন। এর মধ্যে কি আল্লাহর এতটুকু প্ল্যান ছিলনা, যে আমার উইকনেস ও দূর করবে, ওর টা আমি?

একই কথা স্পিরিচুয়ালিটির বেলায়ও। স্পিরিচুয়ালিটি আর স্বামী স্ত্রী নিয়ে ভাবতে গেলে আমার কেবল একটা উদাহরণই মনে আসে। লতানো গাছ দেখেছেন, ঐ যে ছোট ছোট আঁকশির মত বের হয়ে একটা কিছু ধরে বেয়ে ওঠে? এমন দুটো গাছ যেন পরস্পরকে জড়িয়ে ধরে একজন আরেকজনের থেকে সাপোর্ট নিয়ে দ্রুত উপরের দিকে উঠে যাচ্ছে। এই গাছ দুটোর একটা শক্ত দৃঢ় ভিত্তির উপরে দাঁড়ানোও হতে পারে, আরেকটা তার উপর ভর দিয়ে উপরে উঠবে। অর্থাৎ স্বামী স্ত্রীর একজন বেশি প্র্যাক্টিসিং, অপরজন কমও হতে পারে, সেক্ষেত্রে সাপোর্ট দিয়ে দিয়ে টেনে তুলতে হবে। ভেবেই দেখুন না, কী একটা জুটল কপালে - এই ভেবে কপালকে দোষ না দিয়ে এভাবেও ত দেখা যায় - আল্লাহ আপনার স্ট্রেংথ জানেন, আল্লাহ পারফেক্ট কম্প্লিমেন্ট খুঁজে দিয়েছেন আপনার জন্য। এখনকার যে অশান্তি হচ্ছে, তা হচ্ছে এ কারণে যে আপনি আপনার করণীয় সবটুকু করছেন না। আপনার কথা ছিল অনেক বেশি নিজেকে উন্নত করার, আর উদাহরণের মাধ্যমে ধৈর্য ধরে অপরজন কে শেখানোর। আপনি তা না করে আরো ভাল কিছু পেতে পারতেন এই আফসোস এ মাথা কুটে মরছেন।

এমনকি ভাল, আরো ভাল - এই মাপকাঠিটাও ত মানুষের জন্য অসম্পূর্ণ। সে হয়ত বিচার করার সময় একটা স্বভাবের দোষ ধরে ভাগ্যকে ধিক্কার দিচ্ছে। অন্যদিক দিয়ে হয়ত তাদের মধ্যে এত সুন্দর সামঞ্জস্য - যেটা তার কাছে এতই ন্যাচারাল যে টেরও পাচ্ছেনা এর মূল্য কত। আগের লেখায় একটা পাথরের কথা বলেছিলাম না? আপনি হয়ত আপনার সম্পর্কের এবড়ো খেবড়ো অংশটাই শুধু দেখছেন, একটু সময় নিয়ে উল্টে দেখুন, তার অনেক ভালো দিকও চোখে পড়বে। রাসুলুল্লাহ (স) ত বলেছেন, স্ত্রীদের সাথে নরম আচরণ কর, কারণ তার এক আচরণ তোমার অসন্তুষ্টির কারণ হলেও, অন্য আচরণ তোমায় সন্তুষ্ট করবে। স্বামীদের জন্য এটা আরো বেশি সত্যি। কারণ আমরা স্ত্রীরা অভিযোগে মুখর হতে খুবই পারদর্শী।

আমি ঘরের কাজে অপটু, বাইরের কাজে অকর্মণ্য। ভাবনার জগতে ক্রীড়ণক, বাস্তব জীবনে জড়ভরত। আমার অতি প্র্যাক্টিকাল স্বামীর অভাবে আমি অর্ধেক না, এক চতুর্থাংশ হয়ে থাকতাম বোধহয়। কিন্তু আমার যেটুকু অগুণ আছে তাই দিয়ে ঠেলেঠুলে এমন একটা জায়গা করে নিয়েছি যে জানি ওই জায়গার দখল পাকাপাকি ভাবে আমার হয়ে গেছে। গুণ যেখানে কম, চাতুরির সেখানে পুরো ব্যবহার ত করতেই হবে, তাই না? তাই ওর অদক্ষতাগুলোতেই আমার যত জোর। আল্লাহকে ধন্যবাদ ও দেই, অন্তত একটা কিছু যোগ করার মত যোগ্যতা ত আমার আছে। যদি কমফোর্টই সুখের একমাত্র ইয়ে হত, তাহলে আমি ফেল করতাম নির্ঘাত।

এক রাতে প্রচণ্ড গরমে পুরো আড়াই ঘন্টা লোডশেডিং ছিল আমাদের এলাকায়। খুব দেশ দেশ লাগছিল সময়টাকে। আমরা অন্ধকার ঘরে মনের সুখে গপ্পো করেছি অনেকক্ষণ। লোডশেডিং হওয়াতে আমাদের মনে এতই ফুর্তি হয়েছিল, গল্পের ফাঁকে সে নিজে গান বানিয়ে সুর দিচ্ছিল। আমি তখন ওকে বললাম, Thanks to Allah, He joined a composer with a singer, a speaker with a writer, a philanthropist with a pure mind.

দাম্পত্য - ৩

কমফোর্ট আর স্বস্তি একটা ঘরে সুখের ফোয়ারা বইয়ে দিতে পারে সত্যি, কিন্তু এর বাইরেও দাম্পত্য জীবনে অনেক কিছুই করার আছে। স্বামী স্ত্রী উত্তম বন্ধু রূপে শুধু একে অপরকে নিরাপত্তাই দিয়ে যাবে জীবনভর, এর বাইরে আর কিছু নয় - ব্যাপারটা এমন নয়। আর চাহিদা অনুযায়ী পরিপূর্ণ আরাম না পেলেই যে সংসার উচ্ছন্নে যাবে - তাও না। পুরোপুরি স্বতন্ত্র দু'জন মানুষের আচরণ সব সময়ই পছন্দ মত হবে - এমন ভাবাটা ঠিক না। পদে পদে কমফোর্ট নষ্ট হবে, কমিউনিকেশন এর সব চেষ্টা ব্যর্থ হবে, ক্ষুদ্রতা দেখে বুক ভেঙে যাবে - সম্মানের বদলে জায়গা করে নেবে করুণা - এমন অনেক কিছুই হতে পারে। তখন কি আল্লাহর প্রতিশ্রুত শান্তি সে ঘর থেকে হারিয়ে যাবে? বিয়ের উপর যে এত বার করে গুরূত্ব আরোপ করা হয়েছে, রাসুলুল্লাহ (স) যে বলেছেন, দ্বীন এর অর্ধেক হচ্ছে বিবাহ - তা কি দুটো ব্যক্তিত্বের অসামঞ্জস্যেই ভুল হয়ে যাবে? তা কী করে হয়?

আমার কাছে মনে হয় দাম্পত্যের দ্বিতীয় স্তরের পূর্ণতা আসে যখন স্বামী স্ত্রী সত্যি সত্যি একে অপরকে পূর্ণতা দেয়ার জন্য চেষ্টা করে। যখন একজন অপরজনের দোষত্রুটি গুলি চিহ্নিত করে সেগুলি বদলানোর জন্য কাজ করে। আমি ফাইন্যান্সিয়াল ব্যাপার কিচ্ছু বুঝি না, আমার স্বামী ধৈর্যের সাথে অল্প অল্প করে একটু করে কাজ দিয়ে আমাকে মানুষ করার চেষ্টা করছে। অপর দিকে তার লেখা নিয়ে একটা ভীষণ রিপালশন কাজ করে। আমি চেষ্টা করছি প্রতি সপ্তাহে ছলে বলে কৌশলে যে করেই হোক একটা করে তার কাছ থেকে লেখা আদায় করতে। ও লেখায় সরগর না হলে কি আমার ঘর ভেঙে যাবে? আমার কী দায় পড়েছে ওকে দিয়ে লেখাতে? কিন্তু আমরা ত আগামী অনেকগুলো বছর ইনশাল্লাহ একসাথে থাকব, আল্লাহ ছয়শ কোটি মানুষের মধ্যে থেকে আমাদের দুজন কেই এক সাথে জীবন কাটানোর সুযোগ দিয়েছেন। এর মধ্যে কি আল্লাহর এতটুকু প্ল্যান ছিলনা, যে আমার উইকনেস ও দূর করবে, ওর টা আমি?

একই কথা স্পিরিচুয়ালিটির বেলায়ও। স্পিরিচুয়ালিটি আর স্বামী স্ত্রী নিয়ে ভাবতে গেলে আমার কেবল একটা উদাহরণই মনে আসে। লতানো গাছ দেখেছেন, ঐ যে ছোট ছোট আঁকশির মত বের হয়ে একটা কিছু ধরে বেয়ে ওঠে? এমন দুটো গাছ যেন পরস্পরকে জড়িয়ে ধরে একজন আরেকজনের থেকে সাপোর্ট নিয়ে দ্রুত উপরের দিকে উঠে যাচ্ছে। এই গাছ দুটোর একটা শক্ত দৃঢ় ভিত্তির উপরে দাঁড়ানোও হতে পারে, আরেকটা তার উপর ভর দিয়ে উপরে উঠবে। অর্থাৎ স্বামী স্ত্রীর একজন বেশি প্র্যাক্টিসিং, অপরজন কমও হতে পারে, সেক্ষেত্রে সাপোর্ট দিয়ে দিয়ে টেনে তুলতে হবে। ভেবেই দেখুন না, কী একটা জুটল কপালে - এই ভেবে কপালকে দোষ না দিয়ে এভাবেও ত দেখা যায় - আল্লাহ আপনার স্ট্রেংথ জানেন, আল্লাহ পারফেক্ট কম্প্লিমেন্ট খুঁজে দিয়েছেন আপনার জন্য। এখনকার যে অশান্তি হচ্ছে, তা হচ্ছে এ কারণে যে আপনি আপনার করণীয় সবটুকু করছেন না। আপনার কথা ছিল অনেক বেশি নিজেকে উন্নত করার, আর উদাহরণের মাধ্যমে ধৈর্য ধরে অপরজন কে শেখানোর। আপনি তা না করে আরো ভাল কিছু পেতে পারতেন এই আফসোস এ মাথা কুটে মরছেন।

এমনকি ভাল, আরো ভাল - এই মাপকাঠিটাও ত মানুষের জন্য অসম্পূর্ণ। সে হয়ত বিচার করার সময় একটা স্বভাবের দোষ ধরে ভাগ্যকে ধিক্কার দিচ্ছে। অন্যদিক দিয়ে হয়ত তাদের মধ্যে এত সুন্দর সামঞ্জস্য - যেটা তার কাছে এতই ন্যাচারাল যে টেরও পাচ্ছেনা এর মূল্য কত। আগের লেখায় একটা পাথরের কথা বলেছিলাম না? আপনি হয়ত আপনার সম্পর্কের এবড়ো খেবড়ো অংশটাই শুধু দেখছেন, একটু সময় নিয়ে উল্টে দেখুন, তার অনেক ভালো দিকও চোখে পড়বে। রাসুলুল্লাহ (স) ত বলেছেন, স্ত্রীদের সাথে নরম আচরণ কর, কারণ তার এক আচরণ তোমার অসন্তুষ্টির কারণ হলেও, অন্য আচরণ তোমায় সন্তুষ্ট করবে। স্বামীদের জন্য এটা আরো বেশি সত্যি। কারণ আমরা স্ত্রীরা অভিযোগে মুখর হতে খুবই পারদর্শী।

আমি ঘরের কাজে অপটু, বাইরের কাজে অকর্মণ্য। ভাবনার জগতে ক্রীড়ণক, বাস্তব জীবনে জড়ভরত। আমার অতি প্র্যাক্টিকাল স্বামীর অভাবে আমি অর্ধেক না, এক চতুর্থাংশ হয়ে থাকতাম বোধহয়। কিন্তু আমার যেটুকু অগুণ আছে তাই দিয়ে ঠেলেঠুলে এমন একটা জায়গা করে নিয়েছি যে জানি ওই জায়গার দখল পাকাপাকি ভাবে আমার হয়ে গেছে। গুণ যেখানে কম, চাতুরির সেখানে পুরো ব্যবহার ত করতেই হবে, তাই না? তাই ওর অদক্ষতাগুলোতেই আমার যত জোর। আল্লাহকে ধন্যবাদ ও দেই, অন্তত একটা কিছু যোগ করার মত যোগ্যতা ত আমার আছে। যদি কমফোর্টই সুখের একমাত্র ইয়ে হত, তাহলে আমি ফেল করতাম নির্ঘাত।

এক রাতে প্রচণ্ড গরমে পুরো আড়াই ঘন্টা লোডশেডিং ছিল আমাদের এলাকায়। খুব দেশ দেশ লাগছিল সময়টাকে। আমরা অন্ধকার ঘরে মনের সুখে গপ্পো করেছি অনেকক্ষণ। লোডশেডিং হওয়াতে আমাদের মনে এতই ফুর্তি হয়েছিল, গল্পের ফাঁকে সে নিজে গান বানিয়ে সুর দিচ্ছিল। আমি তখন ওকে বললাম, Thanks to Allah, He joined a composer with a singer, a speaker with a writer, a philanthropist with a pure mind.

দাম্পত্য - ২

দাম্পত্য জীবনে হারমনি প্রতিষ্ঠা করা এমন না যে একটা তুড়ি বাজালাম আর হয়ে গেল। ইনফ্যাক্ট প্রতিদিনের কাজকর্মের মুখ্য উদ্দেশ্যই আমাদের হয়ে গেছে হারমনি আনা, যতক্ষণ এক সুরে সুর বাজে, মনে হয় এর বেশি আর কী চাওয়ার আছে জীবনে? কিন্তু মানুষ ত অনেক ভাবেই দুজনে মিলে সুখে থাকতে পারে, তাই না? স্বার্থপরের মত, ভোগবিলাসীর মত, অন্যায়কারীর মত - এদের হারমনিও ত হারমনি। কিন্তু তাতে স্বর্গীয় সুখ কই? ফেরেশতাদের ডানা বিছানো 'সুকুন' কই? আল্লাহ যে বলেছেন অমন পরিবারে তিনি রহমত নাযিল করেন, ফেরেশতারা সে পরিবারের জন্য আল্লাহর কাছে দোয়া করতে থাকেন?

আস্তে আস্তে মনে হল, দাম্পত্য নিয়ে মানুষ তিন স্তরে সন্তুষ্ট থাকতে পারে। এক, একজন আরেকজনের কমফোর্ট হবে। তা শুধু খাবার দাবার, আর অন্যান্য শারীরিক কমফোর্ট ই না। দু'জনের নিজস্ব জগতের অশান্তি শেয়ার করে হালকা হবে, বাইরে অনেক অপমান সহ্য করে ঘরে এসে নিশ্চিন্তে মাথা গুঁজতে পারবে। এমন নিরাপত্তা আর প্রশান্তি পেলে একটা সংসারে আসলে আর কিছু লাগেনা। রাসুলুল্লাহ (স) তাঁর পনের বছরের বড় (এ নিয়ে দ্বিমত চলছে আজকাল) স্ত্রীর কাছে এতটাই নিরাপত্তা, সম্মান আর ভালবাসা পেয়েছিলেন, খাদিজা (রা) মারা যাওয়ার অনেক বছর পরেও তাঁর কথা ভেবে রাসুলুল্লাহ (স) এর চোখে পানি চলে আসত। আসবেই ত। জিবরাইল (আ) কে প্রথমবার দেখে উনি ভয়ে এত উপর থেকে নেমে ঘরের মধ্যে এসে চাদর দিয়ে মুড়িয়ে টুড়িয়ে স্ত্রীকে বলেছিলেন 'আমাকে কি জ্বীন এ ধরেছে?' উনার স্ত্রী কোত্থেকে জানবে উনার কী হয়েছে? উনি কি ফেরেশতা মারফত আগে খবর পেয়েছিলেন? উনি যা জানতেন তা হল, মুহম্মদ (স) কত অসাধারণ মানুষ। এরকম একটা ঘটনার প্রেক্ষিতে উনি রেফারেন্স টানলেন রাসুলুল্লাহ (স) এতিমদের কত যত্ন করেন, কত সত্যবাদী ইত্যাদি ইত্যাদি। এসব কথা এখানে বলা কি খুব প্রাসঙ্গিক ছিল? খাদিজা (রা) যা করেছেন তা হল উনি রাসুলুল্লাহ (স) এর নিজের সম্পর্কে ভয়, শঙ্কা দূর করে দিয়েছেন তাঁর সম্পর্কে অনেক পজিটিভ কথা বলে। আমরা আমাদের পার্টনারের ভঙ্গুর সময়ে কতটুকু ভাল কথা বলি? আর আউট অব কনটেক্সট প্রশংসা? অসম্ভব! আউট অব কনটেক্সট অভিযোগ করা যায়, কিন্তু প্রশংসা? কদ্যপি নহে!

আমার বাসায় হিটার ঠিক করতে এক ইলেক্ট্রিশিয়ান এসেছিল, ভদ্রলোক খুব কথা বলতে পছন্দ করেন, কথায় কথায় বলেছিলেন, তোমাদের মেয়েদের আমি হিংসা করি। you don't know the power of your words. শুধু মুখের কথা দিয়ে you can bring a lion out of a mouse.

খাদিজা (রা) এর মত প্রজ্ঞা যদি সব ছেলেমেয়ের থাকত, শুধু কথা দিয়েই কত শান্তি তৈরি করতে পারত ঘরে। একই ভাবে মন খারাপ হলে তার টেক কেয়ার করা, বাইরে অপমান জনক একটা কিছু ঘটলে ঘরের মানুষটা আরো অনেক বেশি kindness দিয়ে তার মনের জোর ফিরিয়ে আনা - এ বিষয়গুলোতে অনেক বেশি যত্নশীল হওয়ার দরকার আছে। ছেলেরা বোঝে না মেয়েদের কমফোর্ট কেবল ভাল শপিং করতে পারার স্বাধীনতার মধ্যেই না। এপ্রিসিয়েশন একটা ছেলের জন্য যতটা ইন্সপায়ারিং, একটা মেয়ের জন্য তার চেয়েও বেশি। অনেক সময়ই মেয়েটার চিন্তাভাবনা বা বাইরের কাজে ম্যাচিউরিটি ছেলেটার মত হয়না, তখনও বিভিন্ন বিষয়ে পরামর্শ নেয়া মেয়েটার মানসিক শক্তি বাড়াতে অনেক সাহায্য করে। ঘরের কাজে ব্যস্ত থাকায় মেয়েটার বাইরে এক্সপ্লোর করার সুযোগ সমানভাবে হয়না। এর প্রভাব যদি তার চিন্তায়, আচরণে পড়ে, আর তার কারণে স্বামীর থেকে তিরস্কৃত হতে হয়, তাহলে মেয়েটার কী দায় পড়েছে সংসারের ঘানি টানতে? সে ও ত স্মার্ট হওয়ার, আধুনিক হওয়ার জন্য সময় ব্যয় করতে পারে, ঘরে সময় না দিয়ে। এই সব খুঁটিনাটি অনেক কিছুই দুই পক্ষে মনের মধ্যে জমা হয়। তার কিছু কথা বলে, কিছু ক্ষমা করে, আর পুরোটা আল্লাহর থেকে রিটার্ণ পাওয়ার আশায় মন থেকে মুছে ফেলে কমফোর্ট বাড়ানোর চেষ্টা করতে হবে।

ও! কমফোর্ট এর কথা এতবার বলেছি, একটা কথা বলিনি, পুরোনো জামার awesome উদাহরণটা খুব সংক্ষেপে কুরআনে আছে। husband and wife are garments for each other. তাও রোজার নিয়মের দুইটা আয়াতের মাঝখানে দেয়া। নোমান আলি খান এর ব্যাখ্যা করেছেন খুব সুন্দর করে, রোজায় ইফতার, সেহরি, তারাবী, কুরআন পড়া - এসব রুটিনের মধ্যে স্বামী স্ত্রী একে অপরকে যেন কভার করে যাতে দুজনই সমানভাবে স্পিরিচুয়ালি এগোতে পারে। লিংক টা এখানে পাবেন।

http://www.youtube.com/watch?v=t6Cd08mUjvU

দাম্পত্য - ১

আমার বিয়ের পর থেকে বিবাহ নামক সম্পর্কের বাঁধনটা নিয়ে অনেক ভেবেছি। ধুম ধাম করে বড় করে মেহেদী, বিয়ে, রিসেপশন এর পরে কী হয়? জমকালো সাজে বউটা বেশ আনন্দের সাথে নতুন ঘরে পা রাখে। তারপর কী হয়? আনুষ্ঠানিকতার লৌকিকতা যত ফিকে হয়ে আসে, মেহেদীর নকশা যত মিলিয়ে যেতে থাকে, বউটাও কি তত মেয়ের মত হয়ে মিশে যায় এই পরিবারে? অচেনা বা অর্ধচেনা মানুষটি কি তার বাকি সব বন্ধনের অভার ভুলিয়ে দিতে পারে?

বিয়ের আগে আমার একমাত্র বিবাহিত বান্ধবীর কাছে জানতে চেয়েছিলাম, বিয়েটা আসলে কী বল্ ত? তুই তোর বরকে কি মাথায় করে রাখিস? কোন কিছু পছন্দ না হলে কী করিস? বাবা মায়ের কথা যেমন আমরা পছন্দ না হলেও মেনে নেই, এখানেও কি তুই তাই করিস? নাকি বন্ধুর মত মতে না মেলা পর্যন্ত গলা ফাটিয়ে তর্ক করিস? ওর কোন একটা কাজ অন্যায় দেখলে তুই কীভাবে সামলাস? ইত্যাদি ইত্যাদি। আচ্ছা পাঠক, বলুন ত, আপনাদের মধ্যে কি একজনও আছে যে বিয়ের আগে এসব ব্যাপারে স্পষ্ট ধারণা নিয়ে আসে? একজনও কি আছে যে বলতে পারে, না, আমার মা আমাকে এগুলো শিখিয়ে দিয়েছেন? ছেলেদের অবস্থা ত আরো ভয়াবহ। ছেলেকে স্বামী হওয়ার জন্য প্রস্তুত করার দায়িত্ব বাবার, এইটাত বাবারা কল্পনাই করতে পারেন না। মাঝে মধ্যে মনে হয়, এ যুগের বাবারা কি জীবিকা ছাড়াও জীবনে শেখার কিছু আছে এটা জানেন?

বেশির ভাগ ছেলেমেয়েরই যেটা হয়, একগাদা অবাস্তব স্বপ্ন নিয়ে তারা সংসার শুরু করে। মেয়েটা মনে করে দিন রাত চব্বিশ ঘন্টা ছেলেটার চিন্তা জুড়ে থাকবে শুধু সে। তার চাওয়া পাওয়ার দিকে শতভাগ মনোযোগ থাকবে। অপর দিকে ছেলেটা দেখে কল্পনার পরী জোছ্না রাতে গল্প করতে আসলেই বেশ লাগে। সিন্দাবাদের ভুতের মত ঘাড়ে চেপে থাকলে অসহ্য বোধ হয়। ফলাফল, মেয়েটার অভিযোগ, আর ছেলেটার উদাসীনতা। স্বপ্নের নীড় স্বপ্নের দেশেই পড়ে থাকে। এর সাথে যদি অভিভাবকদের অন্যায় ব্যবহার যোগ হয়, তখন এই স্বপ্নকাতর কপোত কপোতীর কী যে দশা হয় বলাই বাহুল্য। একটা সময় হয়ত মেয়েটার মন কঠোর হয়ে যায়, ছেলেটা নিজের মত করে ভাল থাকতে শিখে যায়, দুজনেই কষ্টগুলোকে একা একা সামাল দিতে শিখে যায়। দূর দেশে কেঁদে মরে অপূর্ণ স্বপ্নগুলো। তার কান্না ভুলতেই বোধ করি এত এত বাস্তবতায় নিজেকে বেঁধে ফেলতে হয়।

যাই হোক। আমি কখনও চাইনি আমার বা আমার বন্ধুদের দাম্পত্য জীবন এমন হবে। তাই শুধু খুঁজতাম একটা তালিসমান, একটা ম্যাজিক স্পেল - যেটা ফলো করলে স-ব সমস্যা নিমিশেই ফিনিশ হয়ে যাবে।

স্বামী স্ত্রীর সম্পর্ক নিয়ে একটা মনে গেঁথে থাকার মত মন্তব্য শুনেছিলাম ড: মুহম্মদ জাফর ইকবালের মুখে, একটা অনুষ্ঠানে মনে আছে বলেছিলেন, যে এই সম্পর্কটা একটা পুরনো জামার মত। আমার এই তুলনাটা এত ভাল লেগেছিল! শুনেই মনে হয় কমফোর্ট আর কমফোর্ট। আমার বান্ধবীও বলল, প্রবলেম হলে মনে জমায় রাখবি না। কথা বলে সলভ করবি। বলে ফেললে দেখবি শান্তি।

আমি প্রথম প্রথম তাই করতাম। কিন্তু ফলাফল দেখে বুঝলাম এ পদ্ধতি সবসময় সবার জন্য না। কখনো কখনো একটু নিরবতা অনেক কথা বলে। দুজনের মতে না মিললে আমার মনে হাজার যুক্তি দাঁড়িয়ে যেত, তা বলার জন্যে আর ঠিকটাকে প্রতিষ্ঠা করার জন্যে যেন আর তর সইত না। অঙ্ক কষে দুইয়ে দুইয়ে চার না মিললে হতবুদ্ধি হয়ে যেতাম। আমি ত ঠিক ই বলেছি। ঠিক বললেই ঠিক হয় না কেন? আবার দেখলাম আমি ভুল করলে প্রাণপনে মনটা চায় একটু যেন রেহাই দেয় ও, কিছু যেন না বলে। বুঝলাম, আমার ন্যায়ের ঝাণ্ডার চেয়ে ওর নিরব সহিষ্ণুতা অনেক বেশি শক্তিশালী।

কিন্তু চুপচাপ থাকার পক্ষে কোন রেফারেন্স পাচ্ছি না ত! আর এটা কেমন কথা? দোষ দেখলে খালি চুপ করে থাকলে হবে? কত সময় কাজে ঝামেলা লেগে যায়, কথা পছন্দ হয়না, তখন শুধু চুপ থেকে চোখের পানি ফেলব নাকি? আর এভাবে আদৌ ত কোনদিন কেউ কাউকে উপরে তুলতে পারবনা, উল্টা মনে অনেক অভিমান জমা হবে। কী করি? উত্তরটা একদিন পেয়ে গেলাম কুরআনের পাতা উল্টাতে উল্টাতে। তাফসিরে একটা কোণে ছোট্ট করে লেখা, spouses are to establish peace and harmony.

এই হারমনি নিয়ে চিন্তা করতে থাকলাম, করতেই থাকলাম। হারমনি মানে কী? হারমনি মানে এক সুরে গাঁথা, ছন্দ মিলিয়ে চলা। একসাথে মিলে সুন্দর একটা গান রচনা করা। একসাথে, একই ছন্দে তালে তাল মিলিয়ে একটা কিছু তৈরি করা - এমনভাবে যেন কোথাও কর্কশ সুর না বাজে। আমার এই বিজ্ঞ জজ সাহেবের ভূমিকা কি হারমনি তৈরি করছে? মোটেও না। তার মানে কি যেভাবে চলে চলুক বলে তালে তাল মিলিয়েই যাব? অবশ্যই না।

দুটো ভিন্ন স্কেলের কম্পোজিশন কে এক জায়গায় আনতে হলে কখনও তর্ক, কখনও ধৈর্য, কখনও একটু অভিমান - অনেক কিছুই ব্যবহার করতে হয়। যা বুঝেছি, সায়েন্স এর জটিল বিষয়াদি বুঝতে যেটুকু বিদ্যা খরচ হয়, হিউম্যান সাইেকালজি বুঝতে তার চেয়ে অনেক বেশিই কসরত করতে হয়। কিন্তু সবশেষে যে তানটা বাঁধা হবে তার চমৎকারিত্বে আশ্চর্য হয়ে যেতে হবে। এ যেন একটা ঝড়ো হাওয়ার মত, শক্তিকে শক্তি দিয়ে বাধা দিয়ে প্রলয় আরো বাড়াতেও পারেন, বাঁশির মধ্য দিয়ে বইয়ে অপূর্ব সুর ও তুলতে পারেন।

চাবির রিং

আমি এক পরিচিত বড় ভাইকে দিয়ে কষ্টে মষ্টে আমার বোনের কাছে একটা চাবির রিং পাঠিয়েছি। সুদূর আমেরিকা থেকে বাংলাদেশ, তিন হাত ঘুরে একখানা চাবির রিং - বারো হাত কাঁকুড়ের একশ তের হাত বিচি। তাও জিনিসটা দেখতে সুন্দর হলে কথা ছিল। একটা অর্ধেক কাটা পাথর, আমাদের জাফলং এ গেলে হাত ভরে নিয়ে আসা যায়।

খনিজ পাথর যে কত রকমের হয়! ভার্জিনিয়ায় Luray Cavern নামে একটা গুহা আছে, উপর থেকে ফোটা ফোটা পানি পড়ে পড়ে ইয়া বড় বড় স্তম্ভ তৈরি হয়েছে। ছোট বেলা রকিব হাসানের তিন গোয়েন্দাতে স্ট্যালাকটাইট, স্ট্যালাগমাইট এর কথা পড়ে মোটামুটি একটা আইডিয়া ছিল এইগুলি কীরকম হয়, কিন্তু গিয়ে দেখি এলাহী কারবার! কত রকমের যে স্ট্রাকচার! সুবহানাল্লাহ, শুধু পানির ফোটার সাথের ক্যালসিয়াম কার্বনেট জমে জমে এরকম মিনারের মত, পর্দার মত, আলাদীনে আঁকা রাজপ্রাসাদের মত - কত কিছু তৈরি হয়ে বসে আছে - দেখে গায়ে কাঁটা দেয়। তবে লুরে তে সমস্যা হচ্ছে রঙের খুব বেশি বৈচিত্র নেই। হলদেটে লাল একটা রং, এইটাও অবাক লাগে, শুধু প্যাটার্ণ দিয়েই কত রকম ইয়ে করা যায়! এর সাথে যদি রং যোগ হয়, মাথা ঘুরে যায়। বিশ্বাস না হলে উইকি তে লিস্ট অব মিনারেলস এ ঢুকে দেখতে পারেন। আমার সবচেয়ে ভাল লাগে মালাকাইট। যেমন রং তেমন প্যাটার্ণ। সুবহানাল্লাহ!

এই পাথরদের আরো ভালবেসে ফেললাম আমিনাহ আস্সিলমির এক লেকচার দেখার পর। উনি বাচ্চাদের কাছে ডেকে একটা একটা করে পাথর দেখাচ্ছিলেন, বাচ্চারা ত খুব খুশি! উনি তখন বলছিলেন এগুলো আল্লাহ তৈরি করেছেন, আমাদের জন্য। একটা পাথর দেখালেন, সাদামাটা পাথর। কিন্ত মাঝখানে গোল মসৃণ একটা ফুটো। বছরের পর বছর ধরে এক ফোটা এক ফোটা করে পানি পড়ে এমন হয়েছে। উনি মা দের বলছিলেন, এটা হচ্ছে পেশেন্স। একবারে বদলাতে যান, ভেঙে যাবে, কিন্তু দীর্ঘ সময় ধরে অল্প অল্প করে বললে শক্ত পাথরও শেপ আপ হয়।

আরেকটা পাথর উপরটা খুব সাদামাটা। ভেতরের দিকে মুক্তো দানার মত ঝিকমিক করে। উনি বললেন ইসলাম বাইরে থেকে দেখতে এমনই, যত কাছ থেকে দেখবে, ততই এর সৌন্দর্য টের পাবে।

ঐ একটা লেকচার থেকে আমি অনেক কিছু শিখেছি। শিখেছি আল্লাহর ভালবাসাকে চিনিয়ে দিলে মানুষের আপনা থেকেই পরিবর্তন আসে। শিখেছি ছোট্ট ছোট্ট নিদর্শন থেকেও আল্লাহর স্মরণ করা সম্ভব। আল্লাহর সাথে প্রাথমিক পরিচয়ের জন্য কুরআনে এক্সপার্ট, আরবিতে তুখোড় হওয়ার দরকার নেই। নেচারের দিকে তাকালেই যথেষ্ট। আল্লাহ বলেন, তোমরা কি দেখনা কীভাবে পানিকে আকাশে উত্তোলিত করি, আর বৃষ্টি নামাই, আমরা পানি চক্র আবিষ্কার করে বলি, তাই ত! তাই ত! উনি বলেন, পর্বতকে পেরেক বানিয়েছি, ভূগোলে পর্বতের গঠন পড়ে আমরা মাথা চুলকাই, 'জানল কেমনে?' একাডেমিক পড়ার সাথে আমরা কুরআনের সম্পর্ক করতে শিখিনি। অথচ এগুলো আল্লাহর পারফেকশনের উদাহরণ - এটা মাথায় রাখলেই অনেক কিছু স্পষ্ট হয়ে যেত। শুধু বিজ্ঞানের বেলায় না, রিয়োল লাইফে একটা প্রবলেম আসুক, নিজের বুদ্ধিমত সলভ করে দেখুন, শেষ পর্যন্ত আবিষ্কার করবেন আল্লাহর দেয়া সলিউশন টা বেস্ট ছিল। আল্লাহ কুরআনে এক লাইনে স্বামী স্ত্রীর সম্পর্ককে 'garments for each other' বলে খালাস। এটাকে টানতে টানতে কমফোর্ট বের হয়, প্রটেকশন বের হয়, কমপ্লিমেন্ট করা বের হয়, ফ্লেক্সিবিলিটি ইত্যাদি ইত্যাদি।

পড়তে হবে, পড়ার কোন বিকল্প নাই। আমার খুব ইচ্ছা যদি আল্লাহ সুযোগ দেন সাইকোলজি, স্পিরিচূয়ালিটি, ফিলসফি নিয়ে পড়াশুনা করব। এসব সম্পর্কে কিছুই ত জানিনা, শুধু মনে হয় একটা খনিভর্তি না জানি কত রত্ন লুকানো আছে। নেট এ এখন কত ইনফরমেশন, পছন্দের টপিক নিয়ে পড়াশুনা করার কি কোন অসুবিধা আছে? ফেসবুকিং, আড্ডা, টিভি, মেয়ে মেয়ে, ছেলে ছেলে - এসব করতে কতক্ষণ ভাল লাগে সত্যি করে বলেন ত? একটা সময় 'দুচ্ছাই!' বলে সব ঝেড়েঝুড়ে উঠে পড়তে ইচ্ছ্া করে না? তখন প্লিজ একটু পড়াশুনা করেন, যেইটা নিয়ে মনে চায়, দেখবেন খুব ভাল্লাগবে।

আমিনাহ আস্সিলমির সেই ভিডিও আমাকে এত মুগ্ধ করেছে, আমি একটা চাবির রিং এ ওরকম সাদা এবড়ো খেবড়ো পাথর দেখে আমার বোনকে পাঠিয়েছি। জিনিসটা ওর হাতে পৌছানোর পর ওকে আমিনাহ আসসিলমির এই লেকচারের গল্প শোনালাম। ওকে বললাম, পাথরটা রোদে নিয়ে দেখিস একটা পিঠ কেমন রোদে ঝিলমিল করে। জিনিসটা কেনার পর আমি শুধু দোয়া করছিলাম, আল্লাহ, এই পাথরটার মতই আমার বোনের ভেতরটা সুন্দর করে দাও, বাইরে সে যেমনই হোক। তোমার দেয়া জ্ঞানের আলোয় ওও যেন ঠিক এমনি করেই ঝিকমিক করে।

আসছে রোজায় নতুন রেসিপি

রোজার সময় ত সবাই একটু আধটু কুরআন তিলাওয়াত করেন, এইবার একটু অন্যভাবে পড়ি চলেন।

কুরআনটা কিন্তু আর কিছুনা, আল্লাহর আমাদের সাথে কথোপকথন। কুরআন পড়ার আগে খুব ভাব নিয়ে অজু করে ভয়ে ভয়ে খুলে সুন্দর করে তিলাওয়াত করে আবার কাপড় দিয়ে মোড়ায় শোকেসের উপর তুলে রাখার বদলে এই কাজটা করতে পারেন (যেটা আমি করি) - বেশ আরাম করে কোথাও বসি যাতে পড়তে গিয়ে পিঠ ব্যথা না করে। আউযুবিল্লাহি মিনাশ ... এই দুআটা করে কুরআন খুলে অর্থ পড়া শুরু করি। আউযুবিল্লাহি দুআটা করা উচিৎ কারণ কুরআন থেকে যা শিখব তা যেন ঠিকমত বুঝি আর ইমপ্লিমেন্ট করতে পারি তার জন্যেও ত আল্লাহর সাহায্য লাগবে! এই দুআটায় আমরা শয়তানের কুমন্ত্রণা থেকে আল্লাহর আশ্রয় চেয়ে আল্লাহর নামে শুরু করছি বলি। ত আশা করা যায় আল্লাহ তখন আমাদের পড়ায় আরো অনেক বেশি blessing দিবেন।

যে কোন একটা সূরা পড়া শুরুর আগে একটু দেখে নিলেন তার সম্পর্কে summary তে কী লেখা আছে। বড় সুরাগুলির জন্য এই অংশটা খুব সাহায্য করে। যেমন সূরা বাকারা এত বড়... কোত্থেকে কই চলে যাচ্ছে তাল রাখতে পারিনা। এই আদম (আ) এর কাহিনী বলল, তারপর কতক্ষণ বনি ইসরায়েল তারপর কী কী... সব মিলায় আমি ফুল কোন মেসেজ পাইনা। লাইন বাই লাইন পড়ি, কোথাও আল্লাহ বকা দিসে, কোথাও বলসে যাকাত দাও, কোথাও গল্প শুনাইসে... পড়তে পড়তে আমার হাই উঠতে থাকে। ট্র্যাকই রাখতে পারিনা, শিখব কী? ত আমার কাছে যে কুরআন টা আছে তার ইন্ট্রো টা আগে কখনও পড়া হয়নাই। সেদিন পড়ে দেখি এই সূরাটা বিভিন্ন প্যারায় ভাগ করা। প্রথম পর্বে তিন রকম human psyche নিয়ে কথা বলেছে। সেখানে আবার সেই রকম কিছু উদাহরণ। তার পরের অংশে আল্লাহ আদম (আ) কে সৃষ্টি, তার সামনে সবাই সিজদা করা -এই কাহিনী বলেছে, এর পরেই ৪৭ আয়াত ধরে বনি ইসরায়েল। তারপর ঈসা (আ), মুসা (আ)।

মজার ব্যাপার হচ্ছে, it starts making sense when you take the organization of the sura as a continuation of the previous one. প্রথম সূরা হচ্ছে ফাতিহা। সেখানে সুন্দর করে আল্লাহর কাছে কীভাবে গাইডেন্স চাইতে হয় সেটা শেখানো হয়েছে। তুমি একটা বই পড়তে শুরু করলা গাইডেন্স পাওয়ার জন্য, সবার প্রথমে ত ঠিক এরকম কিছু থাকাই মানায়। তারপরের সূরাই বাকারা। সেখানে বলসে এই বইয়ে অস্পষ্ট কিছু নাই। কিন্তু এই সূরাটা শুরুই হইসে এমন তিনটা অক্ষর দিয়ে যার অর্থ কোন মানুষ কখনও বের করতে পারবেনা। হয়ত আল্লাহ চাইসে গাইড করার সাথে সাথে আমাদের লিমিটেশনটাও বুঝায় দিতে। তারপর উনি বলসে, কুরআনের শিক্ষা কে মানুষ তিনভাবে গ্রহণ করে। কেউ বিশ্বাস করে ও তা বোঝার চেষ্টা করে, কেউ যাই বলুক কানে তোলেনা, আবার কেউ কেউ যেটুকু পছন্দ সেটুকু নেয়, বাকিটুকু ফালায় দেয়। এরপর আদম (আ) এর সৃষ্টির কাহিনী বলসে আল্লাহ, কিন্তু পুরাটা বলে নাই। বলসে আমি পৃথিবীতে 'খলিফা' তৈরি করব। খলিফা শব্দটাই দুই রকমের অর্থ বহন করে। একটা মানে হচ্ছে যে ফলো করে, আরেকটা মানে যে প্রতিজ্ঞা ভঙ্গ করে। তারপর আদম (আ) এর জ্ঞানের বহর দেখিয়ে ফেরেশতাদের অভিভূত করা, তাদের সম্মান আদায়, বেহেশতে থাকা - এসব বলেছেন। কিন্তু ইবলিশ যে সিজদা করলনা - এইটা নিয়ে হালকার উপর ঝাপসা বলে গেছেন। তারপর বেহেশত থেকে কীভাবে প্রতিজ্ঞাভঙ্গ করে বিচ্যুত হল, সে কথা বলেছেন। এই প্যারার শেষ দুই লাইন হচ্ছে যারা আমার কথা শুনে, ফলো করে তাদের দুঃখ বা ভয় করার কোন কারণ নাই।

দেখেন, পুরাটাতেই একটা কনফ্লিকটিং নেচারের ছাপ। মানুষ বিশ্বাস করলে তার অন্তরে কী থাকে, অবিশ্বাস করলে কী হয়। খলিফা শব্দটায়, তারপর আদম (আ) এর ঘটনায়, আল্লাহ বলল তাকে শুরুতে আল্লাহ কত বড় করে তৈরি করসে, আর প্রতিজ্ঞা ভঙ্গ করে সে কই গেসে। এরপরে বনি ইসরায়েল এর কাহিনী ত আরো স্ট্রেইট ফরোয়ার্ড, তাদের কী কী নিয়ামত দেয়া হইসিল আর ওরা কী করসে তার ডিটেইল বর্ণনা আছে।

আল্লাহ আসলে একটা মেইন থিম কে বিভিন্ন ঘটনার মাধ্যমে আমাদের কাছে ব্যাখ্যা করেছেন। সৃষ্টির সময় আল্লাহর কাছে আমাদের প্রতিজ্ঞাই ছিল আমরা তার দেয়া গাইডেন্স মেনে চলব, আর অন্য মানুষদের মধ্যে ছড়িয়ে দেব। সেটা ভঙ্গ করার কারণে আমরা তার অসন্তুষ্টির শিকার হই। তখন উনিই আবার বিভিন্ন পথ বলে দিয়েছেন এই থেকে ফিরে আসার। আমার কাছে ভাল লেগেছে এত বড় আপাতদৃষ্টিতে অসংলগ্ন সূরাটার এত চমৎকার coherence টা।

ত যেটা বলছিলাম, এরকম ইন্ট্রো পড়ে তারপর সূরাটা পড়া শুরু করলে বুঝতে আরো সহজ হয়। আরবিতে তিলাওয়াত করলে করেন, কিন্তু যখন শুধু বুঝার উদ্দেশ্যে পড়বেন তখন মোটামুটি একটা ধারাবাহিকতা রেখে পড়বেন, তাতে বুঝতে অনেক সুবিধা হয়।

কুরআনের কনটেক্সট বা flow of thought যেমন মজার, word by word অর্থগুলিও অনেক মজার। যেমন সূরা মু'মিনুন এ মু'মিনের বৈশিষ্ট্য হিসেবে বলা হয়েছে 'আল্লাযিনা হুম লিয যাকাতি ফা'ইলুন'
আল্লাযিনাহুম (যারা) লি (এর মধ্যে) যাকাতি (যাকাত) ফা'ইলুন (করা) - সোজা ভাষায় যারা রেগুলার যাকাত দেয়। কিন্তু এই ফা'ইলুন হচ্ছে করা এর আরবি ভার্সন। করা এর আরেকটা আরবি হচ্ছে 'আমল। ফা'ল আর 'আমল এর মধ্যে পার্থক্য হচ্ছে ফা'ল স্বতঃস্ফূর্ত, নিঃশ্বাস নেয়ার মত, এইটার জন্য কোন ইফোর্ট দিতে হয়না। আর 'আমল হচ্ছে উদ্যোগ নিয়ে করা। যাকাত এর আরেকটা মানে যে নিজেকে পরিশুদ্ধ করা এটা ত আগেও বলেছি। তাহলে সব মিলায় কথাটা কী দাঁড়াল? যারা নিজেদের খারাপ স্বভাব কে ছেঁটে ফেলে সবসময় পরিশুদ্ধ করার চেষ্টাটাকেই স্বভাব বানিয়ে ফেলেছে তারাই মুমিন।

ত এসব মজার মজার কথাগুলি একটা বইয়েই পাওয়া গেলে খুব ভাল হত। দুঃখের বিষয়, প্রতি ওয়ার্ডের বিশদ ব্যাখ্যা করতে গেলে ছাপানো, বিলি করা - এসব কঠিন হয়ে যাবে। তাছাড়া তাফসির যারা করেন তারা একেকজন একেক অ্যাঙ্গেল থেকে গবেষণা করেন। তাই সব একজায়গায় পাওয়াও সহজ হয়না। আমার কাছে এই ভাষাগত ব্যাখ্যাটা খুব ভাল লেগেছে। নোমান আলি খান এই কাজটা খুব সুন্দর করেছেন। উনার এখন পর্যন্ত করা তাফসির bayyinah.com/podcast এ পাওয়া যাবে। তাফসির ইবন কাসিরও বেশ ডিটেইল। আরেকজনের তাফসির বেশ ভাল লাগল, www.quran-tafsir.org, word for word নিজে বুঝতে চাইলে এই লিংক টা তে যেতে পারেন।http://www.studyquran.co.uk/Quran_ArabicEnglish_WordforWord_Translation.htm

এসব দেখে ভয় পাওয়ার দরকার নাই। আমি জানি রোজার সময় সবারই একটু আধটু কুরআন পড়তে ভাল লাগে, তাই একটু নতুন এপ্রোচ এ পড়তে বললাম। আর রাসুলুল্লাহ (স) এর সময় খতমে তারাবির কোন কাহিনী ছিল না কিন্তু। যে টাইমটা কুরআন খতম করার জন্য বরাদ্দ রেখেছিলেন সেটা একটা সূরা বোঝার জন্য ব্যয় করে দেখতে পারেন, ঠকবেন না।

আসছে রোজায় নতুন রেসিপি

রোজার সময় ত সবাই একটু আধটু কুরআন তিলাওয়াত করেন, এইবার একটু অন্যভাবে পড়ি চলেন।

কুরআনটা কিন্তু আর কিছুনা, আল্লাহর আমাদের সাথে কথোপকথন। কুরআন পড়ার আগে খুব ভাব নিয়ে অজু করে ভয়ে ভয়ে খুলে সুন্দর করে তিলাওয়াত করে আবার কাপড় দিয়ে মোড়ায় শোকেসের উপর তুলে রাখার বদলে এই কাজটা করতে পারেন (যেটা আমি করি) - বেশ আরাম করে কোথাও বসি যাতে পড়তে গিয়ে পিঠ ব্যথা না করে। আউযুবিল্লাহি মিনাশ ... এই দুআটা করে কুরআন খুলে অর্থ পড়া শুরু করি। আউযুবিল্লাহি দুআটা করা উচিৎ কারণ কুরআন থেকে যা শিখব তা যেন ঠিকমত বুঝি আর ইমপ্লিমেন্ট করতে পারি তার জন্যেও ত আল্লাহর সাহায্য লাগবে! এই দুআটায় আমরা শয়তানের কুমন্ত্রণা থেকে আল্লাহর আশ্রয় চেয়ে আল্লাহর নামে শুরু করছি বলি। ত আশা করা যায় আল্লাহ তখন আমাদের পড়ায় আরো অনেক বেশি blessing দিবেন।

যে কোন একটা সূরা পড়া শুরুর আগে একটু দেখে নিলেন তার সম্পর্কে summary তে কী লেখা আছে। বড় সুরাগুলির জন্য এই অংশটা খুব সাহায্য করে। যেমন সূরা বাকারা এত বড়... কোত্থেকে কই চলে যাচ্ছে তাল রাখতে পারিনা। এই আদম (আ) এর কাহিনী বলল, তারপর কতক্ষণ বনি ইসরায়েল তারপর কী কী... সব মিলায় আমি ফুল কোন মেসেজ পাইনা। লাইন বাই লাইন পড়ি, কোথাও আল্লাহ বকা দিসে, কোথাও বলসে যাকাত দাও, কোথাও গল্প শুনাইসে... পড়তে পড়তে আমার হাই উঠতে থাকে। ট্র্যাকই রাখতে পারিনা, শিখব কী? ত আমার কাছে যে কুরআন টা আছে তার ইন্ট্রো টা আগে কখনও পড়া হয়নাই। সেদিন পড়ে দেখি এই সূরাটা বিভিন্ন প্যারায় ভাগ করা। প্রথম পর্বে তিন রকম human psyche নিয়ে কথা বলেছে। সেখানে আবার সেই রকম কিছু উদাহরণ। তার পরের অংশে আল্লাহ আদম (আ) কে সৃষ্টি, তার সামনে সবাই সিজদা করা -এই কাহিনী বলেছে, এর পরেই ৪৭ আয়াত ধরে বনি ইসরায়েল। তারপর ঈসা (আ), মুসা (আ)।

মজার ব্যাপার হচ্ছে, it starts making sense when you take the organization of the sura as a continuation of the previous one. প্রথম সূরা হচ্ছে ফাতিহা। সেখানে সুন্দর করে আল্লাহর কাছে কীভাবে গাইডেন্স চাইতে হয় সেটা শেখানো হয়েছে। তুমি একটা বই পড়তে শুরু করলা গাইডেন্স পাওয়ার জন্য, সবার প্রথমে ত ঠিক এরকম কিছু থাকাই মানায়। তারপরের সূরাই বাকারা। সেখানে বলসে এই বইয়ে অস্পষ্ট কিছু নাই। কিন্তু এই সূরাটা শুরুই হইসে এমন তিনটা অক্ষর দিয়ে যার অর্থ কোন মানুষ কখনও বের করতে পারবেনা। হয়ত আল্লাহ চাইসে গাইড করার সাথে সাথে আমাদের লিমিটেশনটাও বুঝায় দিতে। তারপর উনি বলসে, কুরআনের শিক্ষা কে মানুষ তিনভাবে গ্রহণ করে। কেউ বিশ্বাস করে ও তা বোঝার চেষ্টা করে, কেউ যাই বলুক কানে তোলেনা, আবার কেউ কেউ যেটুকু পছন্দ সেটুকু নেয়, বাকিটুকু ফালায় দেয়। এরপর আদম (আ) এর সৃষ্টির কাহিনী বলসে আল্লাহ, কিন্তু পুরাটা বলে নাই। বলসে আমি পৃথিবীতে 'খলিফা' তৈরি করব। খলিফা শব্দটাই দুই রকমের অর্থ বহন করে। একটা মানে হচ্ছে যে ফলো করে, আরেকটা মানে যে প্রতিজ্ঞা ভঙ্গ করে। তারপর আদম (আ) এর জ্ঞানের বহর দেখিয়ে ফেরেশতাদের অভিভূত করা, তাদের সম্মান আদায়, বেহেশতে থাকা - এসব বলেছেন। কিন্তু ইবলিশ যে সিজদা করলনা - এইটা নিয়ে হালকার উপর ঝাপসা বলে গেছেন। তারপর বেহেশত থেকে কীভাবে প্রতিজ্ঞাভঙ্গ করে বিচ্যুত হল, সে কথা বলেছেন। এই প্যারার শেষ দুই লাইন হচ্ছে যারা আমার কথা শুনে, ফলো করে তাদের দুঃখ বা ভয় করার কোন কারণ নাই।

দেখেন, পুরাটাতেই একটা কনফ্লিকটিং নেচারের ছাপ। মানুষ বিশ্বাস করলে তার অন্তরে কী থাকে, অবিশ্বাস করলে কী হয়। খলিফা শব্দটায়, তারপর আদম (আ) এর ঘটনায়, আল্লাহ বলল তাকে শুরুতে আল্লাহ কত বড় করে তৈরি করসে, আর প্রতিজ্ঞা ভঙ্গ করে সে কই গেসে। এরপরে বনি ইসরায়েল এর কাহিনী ত আরো স্ট্রেইট ফরোয়ার্ড, তাদের কী কী নিয়ামত দেয়া হইসিল আর ওরা কী করসে তার ডিটেইল বর্ণনা আছে।

আল্লাহ আসলে একটা মেইন থিম কে বিভিন্ন ঘটনার মাধ্যমে আমাদের কাছে ব্যাখ্যা করেছেন। সৃষ্টির সময় আল্লাহর কাছে আমাদের প্রতিজ্ঞাই ছিল আমরা তার দেয়া গাইডেন্স মেনে চলব, আর অন্য মানুষদের মধ্যে ছড়িয়ে দেব। সেটা ভঙ্গ করার কারণে আমরা তার অসন্তুষ্টির শিকার হই। তখন উনিই আবার বিভিন্ন পথ বলে দিয়েছেন এই থেকে ফিরে আসার। আমার কাছে ভাল লেগেছে এত বড় আপাতদৃষ্টিতে অসংলগ্ন সূরাটার এত চমৎকার coherence টা।

ত যেটা বলছিলাম, এরকম ইন্ট্রো পড়ে তারপর সূরাটা পড়া শুরু করলে বুঝতে আরো সহজ হয়। আরবিতে তিলাওয়াত করলে করেন, কিন্তু যখন শুধু বুঝার উদ্দেশ্যে পড়বেন তখন মোটামুটি একটা ধারাবাহিকতা রেখে পড়বেন, তাতে বুঝতে অনেক সুবিধা হয়।

কুরআনের কনটেক্সট বা flow of thought যেমন মজার, word by word অর্থগুলিও অনেক মজার। যেমন সূরা মু'মিনুন এ মু'মিনের বৈশিষ্ট্য হিসেবে বলা হয়েছে 'আল্লাযিনা হুম লিয যাকাতি ফা'ইলুন'
আল্লাযিনাহুম (যারা) লি (এর মধ্যে) যাকাতি (যাকাত) ফা'ইলুন (করা) - সোজা ভাষায় যারা রেগুলার যাকাত দেয়। কিন্তু এই ফা'ইলুন হচ্ছে করা এর আরবি ভার্সন। করা এর আরেকটা আরবি হচ্ছে 'আমল। ফা'ল আর 'আমল এর মধ্যে পার্থক্য হচ্ছে ফা'ল স্বতঃস্ফূর্ত, নিঃশ্বাস নেয়ার মত, এইটার জন্য কোন ইফোর্ট দিতে হয়না। আর 'আমল হচ্ছে উদ্যোগ নিয়ে করা। যাকাত এর আরেকটা মানে যে নিজেকে পরিশুদ্ধ করা এটা ত আগেও বলেছি। তাহলে সব মিলায় কথাটা কী দাঁড়াল? যারা নিজেদের খারাপ স্বভাব কে ছেঁটে ফেলে সবসময় পরিশুদ্ধ করার চেষ্টাটাকেই স্বভাব বানিয়ে ফেলেছে তারাই মুমিন।

ত এসব মজার মজার কথাগুলি একটা বইয়েই পাওয়া গেলে খুব ভাল হত। দুঃখের বিষয়, প্রতি ওয়ার্ডের বিশদ ব্যাখ্যা করতে গেলে ছাপানো, বিলি করা - এসব কঠিন হয়ে যাবে। তাছাড়া তাফসির যারা করেন তারা একেকজন একেক অ্যাঙ্গেল থেকে গবেষণা করেন। তাই সব একজায়গায় পাওয়াও সহজ হয়না। আমার কাছে এই ভাষাগত ব্যাখ্যাটা খুব ভাল লেগেছে। নোমান আলি খান এই কাজটা খুব সুন্দর করেছেন। উনার এখন পর্যন্ত করা তাফসির bayyinah.com/podcast এ পাওয়া যাবে। তাফসির ইবন কাসিরও বেশ ডিটেইল। আরেকজনের তাফসির বেশ ভাল লাগল, www.quran-tafsir.org, word for word নিজে বুঝতে চাইলে এই লিংক টা তে যেতে পারেন।http://www.studyquran.co.uk/Quran_ArabicEnglish_WordforWord_Translation.htm

এসব দেখে ভয় পাওয়ার দরকার নাই। আমি জানি রোজার সময় সবারই একটু আধটু কুরআন পড়তে ভাল লাগে, তাই একটু নতুন এপ্রোচ এ পড়তে বললাম। আর রাসুলুল্লাহ (স) এর সময় খতমে তারাবির কোন কাহিনী ছিল না কিন্তু। যে টাইমটা কুরআন খতম করার জন্য বরাদ্দ রেখেছিলেন সেটা একটা সূরা বোঝার জন্য ব্যয় করে দেখতে পারেন, ঠকবেন না।

একটি ছোট উদ্যোগ

আসসালামু আলাইকুম। লেখাটা একটা রিপোর্ট হিসেবে শুরু করলেও মনে হচ্ছে এটা নিছক এক রিপোর্টই না। কোন ফটোব্লগ ও না। বা নিজের কীর্তিকাহিনীর খোশগল্পও না। এগুলো জীবনের গল্প। শূন্য থেকে শুরু করে একটু একটু করে উঠে দাঁড়ানোর আশা নিরাশায় ভরা টুকরো টাকরা ঘটনা।

দুই বছর ধরে দেশের বাইরে আছি। দূরে থাকায় দেশের মানুষগুলোর প্রতি আবেগ যেন আরো বেড়ে গিয়েছিল। এই যে এদেশে এসে পড়ার সুযোগ পেয়েছি, এই অর্জনের পুরোটুকু কি আমার হতে পারে? আমার দেশ আমাকে পড়ার সুযোগ করে না দিলে আমি কি কোনদিন এখানে আসতে পারতাম? না। বিনিময়ে আমি কি দেশকে কিছু দিতে পেরেছি? না।

তাই খুব সামান্য একটুখানি টাকা জমিয়ে ঠিক করেছিলাম দেশে গিয়ে ডোনেট করব। শুধু এটাই প্ল্যান ছিল, টাকা এমন কোথাও দিব যাতে তা রোজার ঈদে নতুন কাপড় বিলানো বা জেয়াফতে খিচুড়ি খাওয়ানোর মত ক্ষণস্থায়ী কিছু না হয়। আমার সঞ্চয় খুব কম হতে পারে, কিন্তু এই অর্থটুকুই যদি একটা পরিবারকে মাথা তুলে দাঁড়ানোর ব্যবস্থা করে দিতে পারে তাই বা কম কী?

আমরা মূলতঃ দুটো গ্রামে নয়টি ভাগ্যহত পরিবারে সাহায্য করার চেষ্টা করেছি। জামালপুরের নদীভাঙন কবলিত একটি গ্রামে তিনটি কিশোরী মেয়ের কারোরই পরিবারে উপার্জনক্ষম কোন সদস্য নেই। এরা সেলাই শিখতে আগ্রহী, উপযুক্ত সরঞ্জাম পেলে টেইলরিং এর কাজ শিখে রোজগার করতে পারবে। একটি সেলাই মেশিন কত দাম? পাঁচ ছয় হাজার? এই অবলম্বনটুকু না করে দিলে এরা কি একসময় শহরের গার্মেন্টস এ জড়ো হত, পরিবারের সবাইকে ছেড়ে? এই স্বস্তি নিয়ে বছর পার করত, যে বস্তির অনিরাপদ ছাউনির তলে আরো একটা রাত নিরাপদে পার হল? 



কিছু পরিবারে উপার্জনক্ষম লোক আছে, উপার্জন করার পন্থা নেই। ক্ষেত এ দিনমজুরি সবার বেলায় জোটেনা, জুটলেও তার ব্যবস্থা মৌসুমভিত্তিক। বেশির ভাগ সময়ই চিকিৎসা, মেয়ের বিয়ে - এ ধরণের বড় খরচের সময় মোটা সুদে টাকা ধার নিতে হয়। কিন্তু বান্ধা কোন আয় না থাকায় এই নিঃস্ব মানুষগুলো একদিন ভিটেমাটি খুইয়ে সর্বহারা হয়। ফলস্বরূপ, ঢাকায় আগমন, রিকশা চালিয়ে পেটে ভাতে টিকে থাকার যুদ্ধ, আর আমাদের নাসিকা কুঞ্চন, 'ইস্! এত মানুষ ঢাকায় কী করে?' এরকম গুটিকয়েক পরিবারে ভ্যান কিনে দিয়েছি, দেখা যাক, জীবনের বোঝা টানতে কতটুকু সাহায্য করতে পারে এই ভ্যান। 


এর পরেও বেশ কিছু টাকা হাতে ছিল। মানিকগঞ্জের এক মফস্বল এলাকার মধ্যবয়স্ক এক পিতার কথা বলল আমার বন্ধু। ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী। বড় মেয়ের বিয়েতে সামাজিকতা রক্ষা করতে গিয়ে নিম্নবিত্তের কাতারে নেমে এসেছেন। বাকি ছেলে মেয়েরা সবাই স্কুলে পড়ছে। কিছু মূলধন পেলে ধ্বসে পড়া টিনের ব্যবসাটা আবার দাঁড় করাতে পারেন। আমি একটু দোনোমনায় ছিলাম, উনি আর যাই হোক, না খেয়ে মরবেন ত না। উনার চেয়ে আরো অনেক needy পরিবার আছে যাদের কাছে পৌঁছান আরো অনেক বেশি দরকার। কিন্তু যখন শুনলাম উনার ছেলেমেয়ের লেখাপড়া বন্ধ হয়ে যাচ্ছে, তখন আর প্রায়োরিটিটা টাকাভিত্তিক রইলনা।

উনাকে বারোহাজার টাকা এককালীন মূলধন হিসেবে দিয়েছি, এই শর্তে, ব্যবসা দাঁড়িয়ে গেলে এই টাকাটা ফেরত দিতে হবে। আমাকে না, অন্য এক পরিবারকে স্বনির্ভর করার জন্য বিনিয়োগ করতে হবে। আমি কোন লিখিত চুক্তিপত্র করিনি। টাকাটা সামান্য, এই জন্য না। টাকাটা আমি দান হিসেবেই উনাকে দিয়েছি। কিন্তু ব্যবসায়ের পাশাপাশি উনার মানুষের প্রতি বিশ্বাসটাও যেন দাঁড়িয়ে যায় সে চেষ্টা করেছি। জানিনা কতটুকু সম্ভব হবে, তবে আমার আশা, যদি উনার পরিবারটা আবার আগের অবস্থানে ফিরে আসতে পারে, উনার ছেলেমেয়েরা শিক্ষিত হয়ে এই বিশ্বাস আর সহানুভূতির শিক্ষাটুকু তাদের চারপাশে ছড়িয়ে দেবে। 



এই লেখায় আমি আমি অনেকবার এসেছে। আসলে আমি উদ্যোগটা শুরু করেছি কেবল, টাকা, সাপোর্টসহ সবকিছুর কৃতিত্ব প্রবাসী বাংলাদেশীদের আর আমার ছেলেবেলার বন্ধু মাহমুদুর রহমান নাজমুলের। দেশে গিয়ে বাবার হঠাৎ ওপেন হার্ট সার্জারি করাতে হয়েছিল, তাই ওর জিম্মায় টাকাটা ছিল। নাজমুল একাই ঘুরে ঘুরে লোকজন খুঁজে বের করেছে, জিনিসপত্র কিনে দিয়ে এসেছে। সবার আন্তরিকতায় খুব ছোট উদ্যোগও কত সুন্দর হয়ে উঠতে পারে! আপনাদের সবাইকে বিনীত অনুরোধ, এই শুভ্র অন্তরটাকে বাঁচিয়ে রাখবেন সবসময়, যত যাই হোক।

[শামস্ এর অনুরোধে তার ফান্ড রেইজিং এর উপর একটা ছোট্ট রিপোর্ট লেখার কথা ছিল। কিন্তু কখন যে এতবড় গল্প লিখে বসেছি, টেরই পাইনি। শামস্ কে তার উদ্যোগের জন্য স্যালুট।]