Sunday, March 21, 2021

I have been thinking, why do we try to make a story of our whole life? Wouldn't it make more sense to compartmentalize and see each episode in a new light? 

ছোট বেলা আমি যে মানুষ  টা  ছিলাম, কেন ভেবে নিচ্ছি ওটাই আমি, আমাকে কোনোভাবে ওটাতে ফেরত যেতে হবে? কেন কোন একটা পরিকল্পনা ঠিক মতো সফল না হওয়ায় ভেবে নিচ্ছি ওই সময় টা ভুল ছিল? বিশেষ করে কী ছিলাম আর কী করছি - এই বোধটা ভয়ানক - ওটা আমাদের অতীত কে একটা শুদ্ধ/পবিত্র/পুরোপুরি নির্ভুল জায়গায় বসায়, আর বর্তমান টাকে ভাবায় একটা কিছু যেটা আমার সাথে হওয়ার কথা ছিল ন। কিন্তু এমন তো হতেই পারে, কঠিন সময়টা আমার সহজ সময়ের মতোই 'আমারই!' 

আমার ছেলে হওয়ার পর একবার লিখেছিলাম, "আল্লাহ আনন্দের বালতি উপুড় করে দিয়েছেন। অথচ এই ব্লেসিং টাই উনি যদি নিজের কাছে নিয়ে যেতে চান আমি ভাববো আমার সাথেই কেন এমন হয়!" তার সাড়ে তিন বছর পর আল্লাহ যখন ওর লাইফলং ইন্সুলিন ডিপেন্ডেন্স এর মাধ্যমে খুব ছোট্ট একটা পরীক্ষার মধ্যে আমাকে ফেললেন, তখন কি একবারও আমি ভাবিনি, আমার তো এমন হওয়ার কথা ছিল না? অনেক বার ভেবেছি। অনেক অনেক বার। সত্যি বলতে, হেরে যাওয়ার দলে আমি কোনোদিন থাকবো এটা মেনে নিতে আমার কিভাবে বিঁধেছে আমি বলে বোঝাতে পারবো না। আমি কেন? অন্যদের হবে! আমার সাথে কেন এমন হবে? খুব স্বার্থপর শোনায়, কিন্তু সত্যি, ঠিক এটাই ভেবেছি দিনের পর দিন। কোন স্বান্তনা, কোন উইজডম আমাকে কোন সত্যিকারের সোলেস দেয় নি। যতদিন না পর্যন্ত যত ধরণের ইগো, আত্মঅভিমান ছিল সব ভালো মতো ভেঙেছে। মেধাবী হওয়ার, জ্ঞানী হওয়ার, বিজ্ঞ হওয়ার, ভালো মা হওয়ার, ভালো কর্মী হওয়ার, ভালো লেখক হওয়ার, ভালো গানের গলা থাকার, ভালো মানুষ হওয়ার - সব সব সব ভেঙেছে। আমি নিজের চোখে নিজেকে দেখেছি কোনঠাসা হলে কীভাবে নিজের টা ছাড় না দিয়ে স্বার্থপর হয়ে যাই। কীভাবে যেটুকু মূলধন ছিল যা দিয়ে দু'একটা প্রশংসা কুড়িয়েছি কোনকালে, সেটাকে বার বার বার বার চোখের সামনে ঘুরিয়ে, নাচিয়ে, খুঁচিয়ে আরেকটু পাওয়ার চেষ্টা করেছি। ইগো আসলে ভাঙার দরকার আছে। সব ভাবে না হারলে আসলে অন্যকে হারিয়ে নিজে জেতার এই প্রক্রিয়াটার খুঁতগুলো কখনো চোখে পড়ে না। 

ফেসবুকে ছবি দেয়া বন্ধ করে দিয়েছি। কেন? কারণ সত্যি বলতে আমরা গত দেড় মাস ধরে বিভিন্ন জায়গায় ঘুরে বেড়াচ্ছি। রেহান প্রায় প্রতিদিন রোদে দাঁড়াতে পারছে, আমরা এক জোড়া স্যান্ডেল পায়ে দিয়ে পানির ধারে যেতে পারছি, সমুদ্রের গর্জন শুনতে পাচ্ছি। প্রতিটা মুহূর্তে আমার কেবল মনে হয় আমি কী অসম্ভব ব্লেসড, এবং কতটা সুবিধাভোগী শ্রেণীর অংশ। কত পরিবারের শ্বাস ফেলার জায়গাটা পর্যন্ত নেই, সাধ্য যদিও থাকে, উপায় নেই, হয়তো তাদের সপ্তাহে দু'দিন অফিসে যেতে হচ্ছে, পরিবারে এমন কেউ আছেন যার ২৪/৭ কেয়ার নিতে হচ্ছে। 

গত বছর এই সময় টাতে লক ডাউনে তীব্র ঠান্ডার মধ্যে বের হতে পারছি না, চাকুরী চলে যাচ্ছে, নতুন চাকরি খুঁজতে হবে, বাচ্চা সারাদিন জিজ্ঞাসা করে মমি আমার সাথে খেলবে? জোঁকের মুখে নুন পড়ার মতো মুখটা করে চলে যায় যখন বলি আমি এখন খেললে ঘরের কাজগুলি করবে কে?  আর যেদিন খেলি সেদিন রাত জেগে থাকি আড়াইটা তিন টা পর্যন্ত, কাজ তো শেষ করতে হবে! না একটা পেপার পড়তে পারতাম, না রিসার্চের দুটো লাইন লিখতে পারতাম। পরের দিন মিটিং এ কথা বলতে গেলে দু'টো শব্দ এক করে বলতে পারিনা - এই ছিল আমার দিন।  

এখন নাহয় নীল সমুদ্রের পানিতে পা ডুবাতে পারি। এখন কোনটা কে আমার রিয়েলিটি ধরবো? এটা? না ঠিক এক বছর আগের এ সময় টাকে? সারি সারি পাম গাছের মধ্য দিয়ে হাঁটা, এটা? নাকি দেশে আমার মায়ের সার্জারির সময় আমার বাবা মায়ের ভাই বোনের পাশে না থাকতে পারা - এটা? 

আমি একই সাথে অসম্ভব ভাগ্যবান, আবার একই সাথে অনেকগুলো স্ট্রাগলের মধ্য দিয়ে যাই। ফেসবুকের চিত্রগল্পগুলো যে কতটা ন্যারো - অথচ প্রতি টা অভিজ্ঞতা এত তীব্র করে এখানে প্রকাশ পায় যে মাঝে মধ্যে নিজেই কনফিউজড হয়ে যাই, এই যে হাসিমুখে ছবি দেয়া মানুষটা না সেদিনই খুব কাঁদলো শরীর আর মনের এতগুলো ক্ষত নিয়ে? এই যে দুঃখী দুঃখী গল্প বলা মানুষ টা না সেদিনই এত্তগুলো টাকা বেহিসেবি খরচ করে ঘুরে আসলো? অন্যদের কেন, সব ক'টা গল্প তো আমার নিজেরও! কোনটা কে ধরে থাকবো? 

এজন্যই মনে হয়, এই যে সবগুলো গল্প কে করে একটা আইডেন্টিটি দাঁড় করানোর এই আগ্রহটাই বোধ হয় ভুল। বহুরূপী হওয়াটাই বোধ হয় ঠিক। এটাই হওয়ার কথা। আমি যখন রেহানের পাকা পাকা কথার গল্প বলি আমি ওর একটা ইমেজ তৈরী করি যে ও বোধহয় ভীষণ পরিণত ওর বয়সের তুলনায়। একটু বড় হলে (বা হয়তো এখনই), ও বুঝে যাবে যে ওর থেকে এটাই আশা করা হয়, ও তখন ওভাবেই কথা বলার চেষ্টা করবে, আস্তে করে আমি কন্ডিশনিং করে ওর ছ' বছর বয়সের বাচ্চামিগুলো কেড়ে নিবো। অথচ যদি আমি একই ফ্রেম এ রেহান কে পাগলা, গুফি, দুরন্ত, পড়াশুনায় কম মনোযোগী, গান কবিতা কিচ্ছু না পারা, আঁকতে লিখতে অনীহা, চঞ্চল একটা বাচ্চা হিসেবে দেখাই যে কিনা মাঝে মধ্যে কিছু পন্ডিতি কথা বলে ফেলে, যেটা সব বাচ্চাই করে - তাহলে কিন্তু এই অযাচিত/আরোপিত এক্সপেক্টেশন টা আর আসেনা! 

আমাদের এই নিজেদের প্রতি, অন্যদের প্রতি একটা এক্সপেক্টেশনের বোঝা, তাকে আমার ফ্রেমে ফিট করার একগুঁয়ে ইচ্ছা - এটা আসলে ঠিক না। শেইম ট্রিগারিং পোস্টগুলি মানুষের রং বেরঙের জীবনের গল্পগুলি কে একটা বদ্ধ মলাটে আটকাতে চায়।  এটা ঠিক না। মানুষের মন একটা বড় খোলা মাঠে বিচরণ করতে পারলে তার সবচেয়ে সুন্দর অংশ টা বের করে আনতে পারবে। শেমিং খুব বেশি কাজ করেনা। শুধু পিঠে এত্ত বড় একটা বোঝা চাপিয়ে দেয়। 

লেখাটার কোন মূল কথা টাইপ কিছু নেই। শুধু খেয়াল করলাম, লেখালেখির এক যুগে আমি খোলা দমকা হাওয়া থেকে বাঁশির সুর হওয়ার চেষ্টা করেছি। এই আবদ্ধ হওয়ার ইচ্ছে টা কি এমনিতেই হয়ে গেছে? নাহ! একটা একটা সমালোচনা অবচেতনে দেয়াল তুলতে থাকে। এই আর কি! বাঁশির সুরের প্রয়োজন আছে, কিন্তু দমকা হাওয়া কে কষে বেঁধে তা বানানোর চেষ্টা করা অনর্থক।  

Tuesday, March 9, 2021

রিপ্রেজেন্টেশন ম্যাটারস


[Published in Women Express magazine, 2021]

সম্প্রতি বাংলাদেশি অধ্যুষিত নিউ ইয়র্কের শহর গুলো তে অফিসিয়াল পদে দাঁড়াচ্ছেন বাংলাদেশি সহ বিভিন্ন মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশের দ্বিতীয় প্রজন্মের আমেরিকান নারীরা। মূলত তৃণমূল পর্যায় থেকে অ্যাক্টিভিজম করে উঠে আসা এই পদপ্রার্থীরা নিজেদের পরিচয় দেন 'বিগ ডোনার' দের থেকে কোন পৃষ্ঠপোষকতা না নেয়া আমজনতার প্রতিনিধি হিসেবে। এঁদের অনেকের পরিবারই সংগ্রাম করে উঠে এসছে, যেমন তাহানি আবুশি(1) (ফিলিস্তিনি বংশোদ্ভূত আমেরিকান নাগরিক, ম্যানহাটান, নিউ ইয়র্কের ডিসট্রিক্ট এটর্নি পদপ্রার্থী হিজাবি মুসলিম আমেরিকান) তাঁর ক্যাম্পেইন প্লাটফর্মে লিখেছেন তাঁর বাবা ২২ বছরের জন্য কারাগারে দণ্ডিত হয়েছেন। ডিসট্রিক্ট এটর্নি হিসেবে তিনি নিউ ইয়র্কের জাস্টিস সিস্টেম কে নিরপেক্ষ করতে চান। অপরদিকে মৌমিতা আহমেদ (2) (বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত আমেরিকান নাগরিক, নিউ ইয়র্ক সিটি কাউন্সেলর পদপ্রার্থী) জানান, তাঁর মা কোভিডের কারণে জেনারেল স্টোরের চাকুরী হারান, তাঁর বাবা ওষুধ প্যাকেজিং এর এক স্টোরে ডাবল শিফট শুরু করেন। সিটি কাউন্সেলর হিসেবে তিনি সুবিধাবঞ্চিতদের জন্য কাজ করতে চান। 


আমি ও আমারই মত অসংখ্য বাংলাদেশি যারা বহু বছর আমেরিকায় কাটানোর পরও শেকড়টা খুঁজে বেড়ান, তাদের জন্য এই প্রতিনিধিত্ব আশাজাগানিয়া। তার কারণ আর কিছুই নয়, শুধুমাত্র জীবিকার জন্য উপার্জন করে যাওয়া আর সপ্তাহান্তে নিজের কমিউনিটির মধ্যেই সামাজিকতা চালিয়ে যাওয়া বাংলাদেশি পরিবারদের মধ্যে এই প্রতিনিধিত্ব এই বোধটা তৈরি করে যে, আমরা এই সমাজেরই অংশ।এই সমাজকে আরেকটু উন্নত করার যোগ্যতা আমারও আছে। বিভাজনের যে রাজনীতি ট্রাম্প আমলেরও বহু আগে থেকে আমেরিকায় চলে আসছে, সেখানে সুবিধাবঞ্চিত জনগোষ্ঠীর আসলে তেমন কোন ভয়েস নেই। প্রান্তিক জনগোষ্ঠী প্রতিদিন যে সিস্টেমিক মারজিনালাইজেশনের মুখোমুখি হয়, সেটাই নিজেদের মত করে আত্মিকরন করে তার চেয়েও সুবিধাবঞ্চিতর উপরে চড়াও হয়। প্রসঙ্গত, প্রবাসী বাংলাদেশিদের মাঝে কালোদের প্রতি বিরুদ্ধভাব প্রবল। আমি মনে করি এই বিভাজন একটি বৃহত্তর বর্ণবাদি সিস্টেমের ক্ষুদ্র প্রতিফলন মাত্র। যখন সুবিধাবঞ্চিত জনগোষ্ঠী নিজেদের স্বার্থ হাসিলের জন্য একে অপরের বিরুদ্ধে নামে তখন সুবিধাটা মূলত যায় ক্ষমতাধরের পকেটে। উদাহরণস্বরুপ, আমেরিকার বৃহৎ ব্যবসা প্রতিষ্ঠান 'আমাজনের' কর্মীরা নিজেদের অধিকার আদায়ের জন্য ইউনিয়ন প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করছে, উপর মহল থেকে এই ইউনিয়ন যাতে না হয় তার জন্য চেষ্টা চালিয়ে যাওয়া হচ্ছে (3)। এছাড়াও, আফ্রিকার তৃতীয় বৃহত্তম হিরের জোগানদার দেশ এঙ্গোলায় ২৭ বছর ধরে গৃহযুদ্ধ চলে কয়েকটি ক্ষমতাধর দেশের পৃষ্ঠপোষকতায়(4)। দুঃখের বিষয়, হিরের খনির ওপর বসেও দেশের মানুষগুলো লাগামহীন মুদ্রাস্ফীতির কারণে অন্ন সংস্থান করতে হিমশিম খাচ্ছে। বলা বাহুল্য, হিরের খননকার্য কিন্তু থেমে থাকেনি।


যা হোক, মূল প্রসঙ্গ হচ্ছে, ক্ষুদ্র জনগোষ্ঠীর লোকজন উপরের পদগুলোতে আসলে তাদের নিজেদের পক্ষে কথা বলার লোক তৈরি হয়। রিপ্রেজেন্টেশন ম্যাটারস। যেমন কংগ্রেসওম্যান ইলহান ওমরের মাঝে আমি নিজের পরিচয় খুঁজে পেয়েছি(5)। উনি ওম্যান অফ কালার, এবং উনি হিজাব পরেন। বিভিন্ন প্রান্তিকতার হায়ারারকি তে ওম্যান অফ কালার হচ্ছে ডাবল প্রান্তিক। দুটো সংখ্যালঘু পরিচয়ের প্রান্তিকতা কে বলে Intersectionality (6). এর ওপরে যদি আরও যোগ হয় হিজাব পরুয়া - তবে তো কথাই নেই! এই তিনটি পরিচয়ের সমন্বয়ের যে কী বিড়ম্বনা তা ঠিক একই রকম বিপদের আরেকজন ছাড়া বুঝবেনা। সে কারণে সংখ্যালঘুদের সব প্লাটফর্মই সমান হয়না। মুসলিমদের প্লাটফর্মগুলোতে মেয়েদের ইস্যুগুলো উঠে আসছে না, নারী আন্দোলনের প্লাটফর্মে হয়তো ওম্যান অফ কালাররা পাত্তা পাচ্ছেনা। সে দুটো যদিও বা পাওয়া গেল, মুসলিম পরিচয়ের কারণে যে বাড়তি ব্যাগেজগুলো টানতে হয়, সেটা হয়ত আবার  এরা কেউই বুঝবেনা। 


ইলহান ওমর মাথা ঢেকে অফিসে যাওয়ায় উনার এক পুরুষ কলিগ (কোন এক স্টেটের রিপ্রেজেন্টেটিভ) তাঁর স্কার্টের দিকে ইঙ্গিত করে বলেন, আই গেট দিস (অর্থাৎ আমি এই পোশাকটার সাথে রিলেট করতে পারি), বাট (স্কার্ফের দিকে ইঙ্গিত করে) আই ডোন্ট গেট দ্যাট (7)। জবাবে ইলহান ওমর ফুল কালো আবায়া পরে পরদিন অফিসে উপস্থিত হন। শুধু এটা বোঝানোর জন্য যে, আমি যে পোষাকেই আসি, সে পোষাকেই আমি আমার কাজ করার যোগ্যতা রাখি! এই গল্পটা আমাকে সাহস যোগায় কেন? কারণ দেশি পোষাক শালওয়ার কামিজে অনেক বাংলাদেশি এমনকি দোকানে যেতেও অস্বস্তি বোধ করেন। নিজেদের স্বাচ্ছন্দের পোশাকটা ছেড়ে আর সবার মত হতে চাওয়ার এই তাগিদটা আসে ওখান থেকেই, যে এই সমাজ আমার ভিন্ন পোশাক, সংস্কৃতিকে আপন করে নিতে এখনো তৈরি না। অথচ, শাহানা হানিফ (8) (বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত, নিউ ইয়র্ক ডিসট্রিক্ট ৩৯ থেকে সিটি কাউন্সিল নির্বাচনে দাঁড়াচ্ছেন) উনার ক্যাম্পেইনের ভিডিও করেছেন সালওয়ার কামিজ পরে। লিন্ডা সারসুর (9) (ফিলিস্তিনি বংশোদ্ভূত হিজাবি পলিটিক্যাল এক্টিভিস্ট) ইউনিভার্সিটির গ্র্যাজুয়েশন সেরেমনিতে স্পীচ দিয়েছেন আবায়া পরে। 


পোশাকের এই প্রসঙ্গগুলো টানতে হল কারণ বাহ্যিক অবয়বকে ব্যবহার করেই গোটা সমাজটা প্রান্তিকীকরণের খেলায় মেতে আছে। একটা সময় ওম্যান ইস্যু নিয়ে পড়তাম অনেক। তারপর দেখলাম শেরিল স্যান্ডবার্গ এর 'লীন ইন' (10) মুভমেন্ট মূলত কর্পোরেট কালচারে মেয়েদের উপরে ওঠার টিপ্স নিয়ে বই। আরে! একজন ব্ল্যাক ওম্যান ত ঐ জায়গায় উঠতেই পারবে না! অ্যান মেরি স্লোটার জেন্ডার রোল রিডিফাইন নিয়ে কথা বলতেন (11)। কিন্তু উনি একজন একাডেমিক। একাডেমিয়া এখনো জেন্ডার ইকুইটি নিয়েই পড়ে আছে, সম্প্রতি বর্ণনিরপেক্ষতার দিকে ঝুঁকছে - কিন্তু এখনো একাডেমিয়া তে ফ্যাকাল্টি তে ডাইভার্সিটি বলতে বোঝায় নন-হোয়াইট পুরুষ অথবা সাদা মহিলা ফ্যাকাল্টি। ইন্টারসেকশনালিটি পর্যন্ত যেতে একাডেমিয়ার বহু, বহু দিন বাকি। তারপর বর্ণবাদ নিয়ে পড়তে শুরু করলাম, দেখলাম, কালোদের স্ট্রাগল আমাদের মত ইমিগ্র্যান্টদের চেয়ে বহু বহু গুণ কঠিন। ফলস্বরূপ কালোদের নিজেদের সার্কেলের বাইরে অন্য কমিউনিটির সমস্যা দেখার সময় বা সাধ্য নেই। আর সেখানেও কালো পুরুষদের থেকে কালো মহিলাদের স্ট্রাগল আলাদা। আর হিজাবি যদি বলি, আমি রীতিমত হিজাব পরে এমন মেয়েদের লিঙ্কডইন এ ট্র্যাক করে খুঁজতাম।  এখানে বলে নেয়া প্রয়োজন, হিজাব দিয়ে আমি কারও রেলিজিয়সিটি  বিচার করছিনা। হিজাব হচ্ছে মুসলিম হিসেবে নিজেকে পরিচয় করিয়ে দেয়ার সবচেয়ে সহজ পথ। প্রতিকূল পরিবেশে (for example, after 9/11), কেউ হিজাব টাকে বেছে নেন বাইরে বের হওয়াটাকে ছাড় দিয়ে, কেউ বাইরে বের হওয়াটাকে বেছে নেন, হিজাবটাকে ছাড় দিয়ে। যারা দুটোই একসাথে করতে চান তাদের এত বড় দেশটাতে হারিকেন দিয়ে খুঁজে পাওয়া দুষ্কর ছিল। 


Until I found Linda Sarsour: ট্রাম্প অভিষেকের পরের দিন ৪ মিলিয়ন মানুষের সামনে দাঁড়িয়ে যিনি বলেন, "I stand here before you, unapologetically Muslim American, unapologetically Palestinian American" (12). Her speech has a lasting impact on me. Thanks to all of them, finally I found people to look up to with my intersectional identities. 





1. https://www.tahanieforda.com/

2. https://votemoumita.com/

3. https://www.cnbc.com/2020/10/24/how-amazon-prevents-unions-by-surveilling-employee-activism.html

4. https://en.wikipedia.org/wiki/Angolan_Civil_War

5. https://omar.house.gov/

6. https://www.ywboston.org/2017/03/what-is-intersectionality-and-what-does-it-have-to-do-with-me/

7. This is what America looks like: book by Ilhan Omar

8. https://www.shahanafrombk.com/

9. https://en.wikipedia.org/wiki/Linda_Sarsour

10. https://leanin.org/

11. https://www.ted.com/talks/anne_marie_slaughter_can_we_all_have_it_all?language=en

12. https://www.youtube.com/watch?v=DnaT8JxUTY0

Thursday, February 25, 2021

মা ছেলের গল্প

রেহান, আজকে তোর সাথে রেল লাইনের পাশ ধরে হেঁটেছি, হাঁটতে হাঁটতে গল্প করেছি আমাদের বাংলাদেশের রেল লাইন গুলিও এমন হয়, একটু উঁচু, তার পাশে আইল ধরে ঝোপ ঝাড়! বিকেলের সোনা রোদ তোর চিরুনি না পড়া ঝাঁকড়া চুল ছুঁয়ে হাতের লাঠিটায় এসে থামছিল... কাশফুলের মতো একরকম ঝোপ তোর কাঁধ পর্যন্ত আসে, তুই তাই নিয়েই মেতে ছিলি, আর আমি ভাবছিলাম, কবে একবার গ্রামে যাবো! আব্বুর গ্রাম পর্যন্ত নাকি এখন গাড়ি নেয়া যায়, শেষবার, বারো বছর আগে যখন গিয়েছিলাম, দু' দুটো নদী পার হয়ে যেতে হয়েছিল. ফুপুরা ছিল, কাকী ছিল, দাদি ছিল! কাকারা সবাই ঈদ করতে এসেছিলেন. বারো বছর! নানুবাড়ি শেষবার যাই প্রায় কুড়ি বছর আগে. নানুবাড়ির বাঁধের ওপরের রাস্তাটা বেয়ে বৃষ্টির সময় নামতে বেগ পেতে হতো বেশ. কুড়ি বছর! মামাদের আড্ডা, রান্নাঘরে লাকড়ির চুলায় নানু আর বড় মামীর রান্না, পেছনে পুকুর - সবগুলো স্মৃতি খুব স্পষ্ট. 


রাস্তার ধারে আজকে অনেক আবর্জনা ছিল, তুই আর আমি আজকে ঠিক করেছি এর পরের বার হাতে পলিথিন আর গ্লাভস পরে বের হবো. তুই বলছিলি, "i cannot let the earth be polluted like this, Greta Thunberg is still fighting for it, you should join her মমি!" গ্রেটা থুনবার্গ, গ্রিন নিউ ডিল, ক্যাপিটালিজম এর প্রাণ বেহিসাবি কেনাকাটা - সবকিছু মাথায় ঘুরপাক খায় রে! আজই দেখলাম এক ইউটিউবার মম প্লাস্টিক ছাড়া বাচ্চা বড় করার টিপস দিচ্ছে. এলিটিস্ট মাইন্ডসেট এর একটা মজা আছে, জানিস! নিজের বলয়ে পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন থাকতে পারলেই ভেবে নেয়া যায় যে সমস্যার সমাধান হয়ে গেছে. ইন্ডিভিজুয়াল লেভেলে অলমোস্ট নাথিং মেকস এ ডিফারেন্স যতক্ষণ না ঐ এলিট ক্লাসটাই নিজেদের লাভের হিসাব টা কাট ছাঁট করে পেট্রোলিয়াম প্রোডাক্ট এর উপর কর আরোপ করে. কিন্তু সেটা তো করবে না! 


তুই এখনো যথেষ্ট বড় হোস নি, বড় হলে প্যারাসাইট মুভি টা তোকে দেখাব. তোর বাবার সাথে যে গল্পগুলো করেছি ঘন্টার পর ঘন্টা, ওগুলোই তোর সাথে ঝালাই করব. তুই দেখবি যে বৃষ্টি মালকিনের বাচ্চার বার্থ ডে পার্টির জন্য 'রহম' হয়ে আসে, সেই বৃষ্টিই বাড়ির ড্রাইভারের ঘর সুয়ারেজের পানিতে ডুবিয়ে দেয়. বাড়ির নতুন গভর্নেস তার চাকরিটা টিকিয়ে রাখার জন্য আগের গভর্নেস কে লিটারেলি লাথি দিয়ে নিচ্তলায় ফেলে দেয়. যে মেয়েটা একটু সুযোগ পেয়ে স্পা রুমে বাকি জীবন শাওয়ার করার স্বপ্ন দেখে, বাস্তবতা তাকেই আবার এনে উপচে পড়া কমোডের উপর এনে বসায়. আরো যখন বড় হবি, তখন তোকে সাউথ কোরিয়ার ক্যাস্তেলা শপ আর পপ চিকেন বাবলএর গল্প শোনাব. মিডল ক্লাস ফ্যামিলি কীভাবে লোয়ার ক্লাস বনে যায় একের পর এক ফেইল্ড বিজনেস এ - লোন শার্ক কাছিমের মতো লেগে থাকে ধারের টাকা উসূলের জন্য - তোকে সব শোনাব. তোকে আমেরিকার হাউজিং বাবলের গল্প শোনাব. মেডিক্যাল বিলের জন্য ব্যাংকরাপট হয়ে যাওয়া পরিবারের গল্প শোনাব. গেমস্টপ শেয়ার বাড়ায় যখন হেজ ফান্ডের লাভ ধরে টানাটানি পড়েছে তখন ফ্রি মার্কেট এর বুলি কীভাবে মুহূর্তে উধাও হয়ে যায় সে গল্প শোনাব. 


আর শোনাব এলিটিসিজমের গল্প. না রে, এলিট ক্লাস কেবল ঐ এক সাদা দাদারাই হয়না. যে ক্লাস যেখানে একটু সুবিধা পায়, সেখানেই সুবিধা টাকে কামড়ে ধরে রাখার মতো লোকজন বের হয়ে যায়. ইটস অল এবাউট ক্লাস প্রিভিলেজ, আর কিছু না. প্যারাসাইটএর ঐ দুই গভর্নেস এর মতো, ইট্টুখানি লেভারেজ - একটা কোনো মতন যুক্তি সুবিধা মতন পেলেই - ব্যাস! 


তুই আমাকে আজকাল বলিস, মমি ইউ শুড গো ব্যাক টু ইওর রাইটিং! থিঙ্ক অফ বুলিজ এজ হোয়াইট নয়েজ. ডু ইউ ওয়ান্ট টু স্টপ রাইটিং বিকজ বুলিজ ওয়ান্ট ইউ টু অর ডু ইউ ওয়ান্ট টু কিপ রাইটিং বিকজ দিজ মেকস ইউ হ্যাপি? গ্রাড লাইফের আড্ডা গুলো খুব মিস করি. হালকা করতাম, বুক ক্লাব করতাম, আর চা আড্ডা তো চলতোই! সে সময়ের বন্ধুগুলোকে স্বর্ণালী মনে হয়. মনে আছে রোড ট্রিপ এ তারিক রামাদানের সিডি বানিয়ে নিয়ে গিয়েছিলাম, পুরো রাস্তা তর্ক বিতর্ক. দাঁড়া! একবার কোথাও থিতু হয়ে নেই, প্রতি শনিবার ওপেন হাউজ করব দেখিস! তুই তোর বন্ধু বান্ধব নিয়ে আসবি, এসে তোর বাবার আর আমার কলিগদের সাথে তর্ক করবি. কেমন হবে? 


রেললাইনের পাশে দাঁড়িয়ে তোকে বলছিলাম, বাবা এমন যদি হয় আমি রাস্তার এক ধারে আর তুমি আরেক ধারে, এর মধ্যে ট্রেইন আসে, কী করতে হবে বলো তো? "দূরে যেতে হবে". "মামনির কাছে আসা যাবে না কিন্তু, তাই না? একটু ভয় লাগবে, কারণ আমরা একজন আরেকজন কে দেখতে পাবো না". তুই তখন বললি, "স্টিল ইট উইল বি ফুলিশ টু প্যানিক কজ উই উইল সি ইচ আদার ফর দ্য রেস্ট অফ আওয়ার লাইফ!" আমি ধরে নিচ্ছি ওপারের তুই হচ্ছিস আমার রাইটার সোল্, এপারে আমি. ট্রেইন টা হচ্ছে বাস্তবতার ধুলো ঝড়. লেখকসত্তাটাকে বাঁচিয়ে রাখার জন্যই উই হ্যাড টু পার্ট, সো উই ক্যান স্টে টুগেদার ফর দ্য রেস্ট অফ আওয়ার লাইফ. 

Friday, March 8, 2013

দাম্পত্য - ১১


আজকের বিষয়টি একটু অদ্ভুত শোনাতে পারে। দাম্পত্যের একটি পর্যায়ে আপনার সত্যিই জানা দরকার মেনে নেয়া কাকে বলে।
যদি একই বিষয় নিয়ে অসংখ্যবার ঝগড়া হয়ে যায়, এর পরেও কোন পরিবর্তন না আসে, একটু ভেবে দেখার দরকার আছে, এই অবস্থা মেনে নেয়া আমার পক্ষে সম্ভব কি না। কিছু বাস্তব উদাহরণ দেই –

১
নাবিলা প্রকৃতি অসম্ভব ভালোবাসে। বৃষ্টি হলে সব এলোমেলো হয়ে যেতে চায় তার। ওর বর ঘরের বাইরে যেতেই চায়না। অফিস এর পর বাকি সময় ল্যাপটপে নাক গুঁজে থাকতেই তার যত আনন্দ। একেকটা দিন ঝিরিঝিরি বৃষ্টিতে ওর খুব ইচ্ছে হয় নুপুর পায়ে রাস্তায় হাঁটতে। কিন্তু কার সাথে? একা? একটুও ভালো লাগে না ওর। পূর্ণিমা কত অজস্র বার সমস্ত পৃথিবীতে স্বপ্নের তুলি বুলিয়ে গেল – কিন্তু পার্থ কোনদিনই তাই নিয়ে উচ্ছ্বসিত হল না।
এ নিয়ে ঝগড়া হয়েছে, কান্নাকাটি, অভিযোগ, বুঝিয়ে শুনিয়ে ঘরের বাইরে নিয়ে যাওয়া – এমনকি কাকুতি মিনতিও করেছে। ভদ্রতা করে পার্থ সময় দেয়, কিন্তু তাকে যে একটুও ছোঁয় না এসব বুঝতে পেরে নাবিলাই হাল ছেড়ে দিয়েছে।

২
আরিফ চটপটে স্মার্ট একটা ছেলে। সংসার, ক্যারিয়ার সবই সময় মত গুছিয়ে নিয়েছে। এখন থেকে আগামি দশ বছরের প্ল্যান মাথায় আঁকা আছে তার। পঁচিশে নিজের খরচে বিয়ে, ঊনত্রিশে নিজ এপার্টমেন্টে প্রথম সন্তান – এগুলো কোনটিই তার পরিকল্পনার বাইরে ছিল না। শুধু, শুধু … ভাবতে ভাবতে ভুরূ কুঁচকে যায় ওর। শুধু এই মিথিলাকে নিয়েই হয়েছে যত বিপদ। চার বছরেও একটু সংসারি হল না মেয়েটা। মানুষের চিন্তায় ঘুম নেই, ভবিষ্যতের পরিকল্পনা নেই, চাকুরিতে মন নেই – কেবল কীভাবে কার কী হল না হল – কাকে কীভাবে সাহায্য করা যায় – আরে বাবা! নিজের উন্নতি হলেই না দেশের উন্নতি। এত বলে, একটু টাকা পয়সার হিসাব কর, নিজেকে সেটল করার চেষ্টা কর – কীসের কী! মিথিলা ডুবে আছে দশের চিন্তায়।

৩
মুনা ও ইশতিয়াকের বিয়ের বারো বছর হতে চলল। ওদের ঘর টিপটপ সাজানো গোছান। এক কণা ধুলোও  পড়তে পারেনা। মুনার মাত্রাতিরিক্ত শুচিবাই এর যন্ত্রণায় ঘরের মানুষগুলি তটস্থ হয়ে থাকে একেবারে। একটু এদিক থেকে ওদিক হলে খণ্ডপ্রলয় হয়ে যায়। ইশতিয়াকের পরিবার কেবল না, মুনার বাবা মাও অনেক চেষ্টা করেছে। একসময় ইশতিয়াক ভেবেছিল সন্তান আসলে সব ঠিক হয়ে যাবে। হয়নি। সন্তানের যত্নআত্তি সব করেও মুনা কী করে যেন ঠিকই সময় বের করে নেয়।

৪
জামান সাহেব পলিটিক্স এর পোকা। রাতভর টিভি তে টক শো, দিনে সবগুলো পেপার খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে পড়া – লং ডিস্টেন্স কলে লম্বা লম্বা আলাপ জমানো – উনার আর কিছু নেই, পলিটিক্সই ধ্যান জ্ঞান। উনার স্ত্রী চাকুরি, সন্তান বড় করা, ঘরকন্না সব করেও ভদ্রলোকের মনের থই পান না। স্বাভাবিক ভাবেই উনার মনে জমে আছে অসংখ্য অভিযোগ। যাকে পান তার কাছেই বলে মনের বোঝা হালকা করেন। না, জামান সাহেব পরিবার কে অর্থকষ্টে রাখেন নি কোন দিন, কিন্তু অর্থ সরবরাহের বাইরে সত্যিকার অর্থে তেমন কিছু আর করেনও নি।

এই গল্পগুলো একটাও কি আজগুবি মনে হচ্ছে? নিশ্চয় না। অমন জমে থাকা পুরনো ক্ষোভ কোন্‌ দম্পতির না থাকে? স্বামীটা মনের মত হয়নি, বা স্ত্রী তার নিজের জগতে থাকে – এমন অভিযোগ ছাড়া দম্পতি পাওয়াই ভার। অভিযোগের বৈশিষ্ট্যই এই, একের পর এক প্রলেপ পড়তে পড়তে গাঢ় বর্ণের হয়ে যায়। যেহেতু অনেকবার চেষ্টা করেও বদলানো যায়নি – তাই যতবার ব্যর্থ হয়েছে ততবার এক পোঁচ করে তিক্ততার রঙ লেগেছে। এরপর যত সময় যাবে, একেকটা অভিযোগ পুরনো সবগুলো স্মৃতির বোঝা সঙ্গে করে নিয়ে আসবে। তখন ঐ ছোট্ট ঘটনাটাও ক্রমাগত অভ্যাসের কারণে বড় হয়ে দাঁড়াবে। বলে না – ছোট পাপও বার বার করলে বড় পাপ হয়ে যায় – ছোট দুঃখও বার বার ছাপ ফেলতে ফেলতে গভীর দুঃখের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

এখানেই ছাড় দেয়ার প্রশ্ন আসে। যখন অপরজনের একটা অভ্যাস বা স্বভাব আপনার মধ্যে বিরক্তির উদ্রেক করে, কিন্তু সবরকমের চেষ্টা করেও একে বদলাতে পারেন নি। আপনার পক্ষে কি সম্ভব একে মেনে নেয়া? নিজেকে প্রশ্ন করে দেখুন –

এই অভ্যাস কি তার মজ্জাগত?
আমি কি আমার পক্ষে যত ধরণের চেষ্টা সম্ভব সব ভাবে চেষ্টা করেছি?
ঐ বিরক্তিকর অভ্যাস/স্বভাবটার বাইরে বাকি সময়টা কি আমাদের সুন্দর কাটে?
ঐ স্বভাবের কারণে আমি যা হারাচ্ছি তাকে মেনে নিয়ে কি আমি সুখে থাকতে পারবো?

উপরের উদাহরণগুলোতে দেখুন, মিথিলা স্বভাবগত ভাবেই পরোপকারী। ওর চিন্তাগুলো এমনভাবেই বিকশিত হয়েছে। ওর পক্ষে আরিফের মত করে চিন্তা করা প্রায় অসম্ভব, যেমন অসম্ভব আরিফের পক্ষে নিজের জীবনের প্ল্যানের উপরে অন্যের জন্য উপকার করাকে স্থান দেয়া। মুনার ভয়ানক শুচিতার এই স্বভাবটা না থাকলে ওদের পরিবারে আরও অনেক বেশি আনন্দ থাকত হয়তো, কিন্তু এতে করে ইশতিয়াককে ঘরকন্না সম্পর্কিত চিন্তাভাবনা প্রায় করতেই হয়না। উপরন্তু ও একটা টিপটপ সাজানো গোছান সংসার পেয়ে যাচ্ছে কিছু ধরাবাঁধা নিয়ম মেনে চলে!

একইভাবে, বৃষ্টিভেজা পথে নাবিলা পার্থকে না পেলেও বৃষ্টির সৌন্দর্য মিথ্যে হয়ে যায়নি। নূপুরের শব্দের প্রতি কোন মোহ না থাকলেও পার্থ তার নিজের মত করে নাবিলাকে ভালবেসেছে। হ্যাঁ, নাবিলার স্বপ্নের মত হয় নি, কিন্তু বাস্তবটাও সুন্দর, অন্যরকম। মিসেস জামানের এই মানুষটার প্রতি অনেক ক্ষোভ থাকলেও তিনি বুঝে গেছেন, এর বাইরে আর কিছু হবার নয়। যদি জামান সাহেব অন্য রকম হতেন, উনিও অন্য রকমের এক স্ত্রী হতেন। লতায় পাতায় শান্তি অশান্তি সুখ অসুখের মধ্য দিয়েই কেমন করে যেন জীবনটা কেটে যাচ্ছে। উনার চাওয়ার ১০০ ভাগ উনি কোনদিন পান নি, কিন্তু যে পঞ্চাশ ভাগ পেয়েছেন, তার চারপাশেই বৃত্ত রচনা করে আশার পরিধি ছোট করে এনেছেন। দিন শেষে সুখের পূর্ণতার খোঁজে সবাই যে কেবল দিকভ্রান্ত হয়ে ফেরে, তা বুঝতে উনার ভুল হয়নি।

ছাড় দেয়া ক্ষেত্র বিশেষে মহৎ, আবার ক্ষেত্র বিশেষে অন্যায়ও। ইবাদতে ফরজ আর নফলের মাঝে যেমন পার্থক্য স্পষ্ট, সহনশীলতার বেলায়ও তেমনি বিভাজনরেখাটা স্পষ্ট থাকা উচিৎ। অনেক সময় ডমেস্টিক ভায়োলেন্স এর শিকার নারী/পুরুষটিকে উপদেশ দেয়া হয় সংসারের স্বার্থে মেনে নিতে। বা স্ত্রীর বা স্বামীর অবশ্যকর্তব্যগুলি পালন করেন না এমন মানুষের বেলায় বলা হয় “তারপরেও তো তোমার সাথে একজন আছে। না থাকলে কী করবা?” উল্লেখ্য, ছাড় দেয়ার বোধ নিজের ভেতর থেকেই আসতে হবে, অন্যে যেন জোর করে রাজি না করায়। আর অন্যায়ের প্রশ্রয় দিয়ে নিজের ও সন্তানদের ভবিষ্যৎ নষ্ট করাকে ছাড় দেয়া বলে না, অন্যায় বলে। আমরা যখন বুঝব অদূর ও সুদূর ভবিষ্যতের কল্যাণের জন্য দাম্পত্যে কোন বিষয়গুলি অপরিহার্য, তখন ছাড় দেয়ার সিদ্ধান্ত নেয়াটাও সহজ হয়ে আসবে। 

Sunday, October 14, 2012

স্কিল ডেভেলপমেন্ট সিরিজ: টাইম ম্যানেজমেন্ট

গত সপ্তাহে দু'টো সেমিনারে গিয়েছিলাম, একটা ক্যারিয়ার বিষয়ক, অপরটা স্কিল ডেভেলপমেন্ট বিষয়ক। ক্যারিয়ার সেমিনারে এক কোম্পানির রিক্রুটার এসছেন, তিনি কোম্পানির ভাল মন্দের পাশাপাশি রিক্রুটাররা কীভাবে চিন্তা করে সেটা নিয়েও কথাবার্তা বললেন, যেমন, একে দেখে কনফিডেন্ট মনে হয় কি না, সরাসরি চোখের দিকে তাকিয়ে কথা বলে কি না, বসার কিছু ভঙ্গি আছে রক্ষণাত্মক, সেগুলো এড়িয়ে চলে কি না। তারপর কোম্পানি সম্পর্কে যথেষ্ট জানে কি না। এসব ত জানা কথা, কিন্তু তার বাইরেও বেশ কিছু কথা বললেন, যেটা খুব ভাল লেগেছে আমার। 

উনি বললেন, এখন থেকেই বিভিন্ন কাজে নিজের দক্ষতাগুলি যাচাই করার চেষ্টা কর। এত ক্লাশ, কাজের ভিড়ে বাসার জন্য সময় বের করা - এগুলো নির্দেশ করে তুমি দায়িত্বগুলোর মধ্যে ভারসাম্য রাখতে পার। আর ভারসাম্য রাখার পূর্বশর্ত নিজের সময়টাকে গুছিয়ে ব্যবহার করতে পারা। তুমি যদি ছাত্রজীবনে ভাল করে টাইম ম্যানেজমেন্ট শেখ, তাহলে চাকুরিতেও অনেক রকমের চাপ সহ্য করে কাজ করতে পারবে - সেটা নিশ্চিত হয়ে বলা যায়। 

বেশ ভাল লাগল কথাটা। এর দুইদিন পরেই ছিল একঘন্টার একটা টাইম ম্যানেজমেন্ট সেমিনার। আমি উন্মুখ হয়ে ছিলাম যাওয়ার জন্য, কারণ আমার কাজের প্রায়োরিটিগুলি এত ছড়ানো ছিটানো, ঠিকঠাকমত সময় অ্যালোকেট করতে না পারলে সমস্যা। 

উনারা প্রথমেই যেটা করতে দিলেন, জানতে চাইলেন, সারাদিনে আমরা কী কী কাজ করি। কীসে কীসে বেশির ভাগ সময় চলে যায়। আমার জন্য ছিল ব্লগিং, নেটওয়ার্কিং এসব। অন্য কয়েকজন বলল ইউটিউবে ভিডিও দেখে দেখে। একজনের বাচ্চাকাচ্চা সামলাতে। ত সব মিলিয়ে কয়েকটা মোটা দাগে কাজ বের হল, যেগুলো দিনের অনেকটা সময় খেয়ে নেয়। 

তারপর উনারা জিজ্ঞাসা করলেন, সময় বাঁচাতে কী কী পদক্ষেপ নিয়েছি এখন পর্যন্ত। আমি ঘুমের সময় কমিয়ে দিয়েছিলাম কয়েকবার, কাজ হয়নি। এক মেয়ে দৈনিক, সাপ্তাহিক, মাসিক রুটিন ঠিক করে রেখে ফলো করার চেষ্টা করেছে, কিছুদিন পর বাদ দিয়েছে। 

তখন একটা এক্সারসাইজ করতে দিল, আমাদের দৈনিক কোন কাজে কত ঘন্টা সময় যায়। যেমন ঘুম দৈনিক কত ঘন্টা, গোসল, সাজুগুজু কত ঘন্টা, রান্না ও খাওয়া ও ক্লিনিং কত ঘন্টা, কাজ কত ঘন্টা, ব্রাউজিং, সোশ্যালাইজিং ইত্যাদি ইত্যাদি.. সব কিছু মিলিয়ে মোট কত ঘন্টা হয় সেটা যোগ করে সপ্তাহের মোট যে ১৬৮ ঘন্টা - তার থেকে বিয়োগ করতে হবে। উদ্দেশ্য হচ্ছে হিসাব কষে দেখানো, কে কত ঘন্টা সময় পায় পড়াশুনা করার জন্য বা যে কাজ করা দরকার তার জন্য। 

হিসাব করার পর বেশ মজার উপাত্ত বের হয়ে আসল। অনেকগুলো ছোট বাচ্চা নিয়ে বেসামাল ভদ্রমহিলাটির হাতে আছে ৩৬ ঘন্টা। তিনি হতভম্ব! তাঁর ধারণা ছিল তাঁর কোন সময়ই নেই। আরেক মেয়ে, যে প্রায় সারাটা সময় অলস ইউটিউব দেখে কাটায়, তার পড়াশুনার জন্য পুরো সপ্তাহে সময় আছে মাত্র ৬ ঘন্টা। চুপসে গিয়ে নরম করে বলল, "makes sense!" আরেকজন ৪২ঘন্টা দেখে অবিশ্বাসের সুরে জানতে চাইল, এই সময় কোথায় যাচ্ছে? আমি ত দেখতে পাচ্ছিনা। তখন ওরা বুঝিয়ে বলল, হয়ত তুমি ভাবছ তুমি ড্রাইভ কর দশ মিনিট। কিন্তু আসলে বাসার দরজা থেকে বের হওয়ার পর থেকে পার্কিং পেয়ে হেঁটে জায়গামত পৌঁছুতে হয়ত তোমার লাগে ত্রিশ মিনিট। তারপর ক্লাশের আগে পরে দশ পনের মিনিট হয়ত এমনিই চলে যাচ্ছে, তুমি হিসাবে ধরনি। এমনিতে দেখতে দশ পনের মিনিট তেমন কিছুই না, কিন্তু দিনে পাঁচ ছ' বার অমন হলে কিন্তু দেড় ঘন্টা এভাবেই চলে যাচ্ছে, সপ্তাহ শেষে দাঁড়াচ্ছে সাড়ে দশ ঘন্টা। 


মনে ধরল। আরও মনে ধরল পরের কথাটা। ওরা বলল, হারিয়ে যাওয়া সময়কে ধরতে একটা সপ্তাহ একটু ট্র্যাক করুন, কী কী কাজ করছেন। জিমেইলে ত একটা ক্যালেন্ডার ফ্রি ফ্রি আছেই। সেখানে লিখতে থাকুন পুরো এক সপ্তাহ প্রতি ঘন্টার হিসেব। দেখবেন একটা প্যাটার্ণ খুঁজে পাচ্ছেন। তখন বুঝতে সুবিধা হবে কোথা থেকে সময় কেটে কোথায় জোড়া লাগাতে হবে। 

গত দু'দিন ধরে কাজটা করছি। আপাতত এই সপ্তাহান্তের হিসাব বলছে ব্লগিং এর চেয়ে বহুগুণ বেশি সময় খরচ হচ্ছে ঘরকন্নায়। দেখা যাক আরো এক সপ্তাহ কী বলে! 

দুরন্ত সময়কে বেঁধে ফেলতে পরের টিপ ছিল মাল্টিটাস্কিং (একই সাথে কয়েকটা কাজ করা।) যেমন রাস্তা দিয়ে যেতে যেতে রেকর্ড করা ক্লাসের লেকচারগুলো একবার শুনে ফেলা। অলস ব্রাউজিং এর ফাঁকেই অনলাইন বিলগুলো দিয়ে ফেলা। ইউটিউব দেখতে দেখতে ঘরের হাল্কা কাজ, যেমন কাপড় গুছানো, ডিশ ক্লিনিং - এগুলো করে ফেলা। ভেবে দেখলাম আমি কিছু কিছু ক্ষেত্রে মাল্টি টাস্কিং করি। যেমন রান্না করার সময় তাফসিরের লেকচার শুনি, আর অলস ব্রাউজিং এর সময়টাতে লেখালেখি করি বা কাউন্সেলিং এর মেইলগুলোর উত্তর দেই। 

কিন্তু মাল্টিটাস্কিং করা যায় একটা হাল্কা কাজের সাথে একটা প্রিয় কাজকে জোড়া লাগিয়ে। যখন বিতিকিচ্ছিরি একটা কাজ করা দরকার, তখন? মানে বলতে চাইছি, জঘন্য খান তিরিশেক আর্টিকেল ঘেঁটে রিসার্চ প্রপোজাল দাঁড় করাতে হবে যখন, তখন? বা বসের চেহারা মনে করেই মেজাজ খারাপ হয়ে যায় এমন কোন কাজের ডেডলাইন যখন শেষ হয় হয়? তখন আমরা কী করি? 

দেখা গেছে এ সময়টাতে (অর্থাৎ চরম বিকর্ষণ হয় এমন কাজে) অমনোযোগিতার পরিমাণ অনেক বেশি থাকে। মানুষ হয় কাজটা ফেলে রাখতে রাখতে একদম শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত ফেলে রাখে (প্রোক্র্যাস্টিনেশন), অথবা আগে শুরু করলেও সময়টা ঠিকমত কাজে লাগায় না। আমি আমার বেলায় দেখেছি, চারদিনব্যাপী একটা রাইটিং ওয়ার্কশপে নিয়ম ছিল তিনঘন্টার একেকটা সেগমেন্ট এ বসে টানা লিখতে হবে। একেকসময় মাথার তার ছিঁড়ে যাওয়ার মত অবস্থা হয়, মনে হয় সব ছেড়েছুড়ে দিয়ে বিবাগী হয়ে যাই। কী যে অসহ্য লাগে! স্বাধীনভাবে পড়াশুনা করার সময় ত আর কেউ নিয়ম করে রাখেনা! তাই মনে বিরাগের উদয় হলেই আমরা ইউটিউবে পালাই। 

এসব ক্ষেত্রে ওদের পরামর্শ ছিল, একদিনের কাজের তালিকায় যদি সমান গুরূত্বপূর্ণ দু'টো কাজ থাকে, তাহলে কঠিন আর করতে ভাল লাগেনা এমন কাজটা আগে করা (অথচ আমরা ঠিক তার উল্টোটাই করি সবসময়।) 

তালিকার কথায় যখন আসলামই, আরেকটা কথা বলে শেষ করি। কোন একটা সময় করে মাসিক, সাপ্তাহিক আর দৈনিক কাজের তালিকা করে রাখলে ফোকাস ঠিক রাখা যায়। কিন্তু প্রথম প্রথম তালিকা করতে নিলে আমরা উৎসাহের চোটে পৃথিবীর যাবতীয় ভাল কাজের লিস্টি করে ফেলি। তা করা যাবেনা। রিয়েলিস্টিক হতে হবে। ঐ যে বললাম এক সপ্তাহ নিজের রুটিন ট্র্যাক করা - ওটা করে তারপর যদি দেখা যায় দিনে ক্রিকেট খেলা অবলোকন বাবদ দশ ঘন্টা সময় ব্যয় করেন, তাহলে রুটিনে তাই লিখুন, এক লাফে একঘন্টায় নামিয়ে আনতে যাবেন না যেন! দিনের রুটিনে ভারসাম্য বজায় রেখে প্রিয় কাজ, অপ্রিয় কাজ, বিশ্রাম - সব মিলিয়েই একটা প্ল্যান করুন। মনে রাখবেন, যে প্ল্যান মেনে চলা সম্ভব না, সেটা আসলে কোন প্ল্যানই না, সেটা ফ্যান্টাসি। 

সুন্দর করে প্ল্যান করলেই কিন্তু কাজ শেষ না। নিয়মিত প্ল্যানটাকে ঝালাই করতে হবে। কী লিখেছিলাম, তার কতদূর সফল হতে পেরেছি - সফল না হলে কোন্ কোন্ বিষয়গুলোর কারণে হতে পারিনি - এসব খতিয়ে দেখে আবারো প্ল্যানটা গুছাতে হবে.. ইত্যাদি ইত্যাদি। 

সব মিলিয়ে, এখন কীভাবে সময় কাটাচ্ছি, আর কীভাবে কাটানো উচিৎ - সেটার মধ্যে সামঞ্জস্য করাই টাইম ম্যানেজমেন্ট। মুসলিমদের জন্য ত টাইম ম্যানেজমেন্ট অপরিহার্য। সূরা আসরে ত আল্লাহ বলেই দিয়েছেন টাইম ম্যানেজমেন্ট না জানা সব মানুষ বিপদের মধ্যে আছে।

Monday, October 1, 2012

সহজ ছোট ভাল কাজ


আমাদের জীবনটা ত খুব ছোট। তার মধ্যে এক চতুর্থাংশ চলে যায় বড় হতে, শিখতে, বুঝতে। বড় হওয়ার পরেও তিন ভাগের একভাগ কাটে ঘুমিয়ে আর নিত্য প্রয়োজনীয় কাজ সারতেই। বাকি এত অল্প সময়টার মধ্যে পড়াশুনা, চাকুরি, ব্যবসা - এসব করব কী, সংসার চালাব কী.. আর আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য কাজই বা করব কী?

আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য কাজ করাও ত চাট্টিখানি কথা নয়, আগে জানতে ও বুঝতে হবে, নিয়্যতটাকে পরিষ্কার করতে হবে, তবেই না! এসব করে সেরে মোটামুটি সংসারের দায়িত্ব সেরে টেরে হিসেব মেলাতে গেলে দেখা যায়, ওমা! কবে জীবনের দুই তৃতীয়াংশ শেষ করে ফেলেছি, টেরই পাইনি! এখন এই শেষ সময়ে তড়িঘড়ি করে দানের টাকা দিয়ে ফেলা, একটু বেশি করে তজবি জপা.. সারাদিন জায়নামাজে বসে থাকা - এসব করতে হয়।

কিন্তু ওসবেও ত সমস্যা। আল্লাহ ত চান ভারসাম্যপূর্ণ জীবন। যখন যেখানে সুবিধা সেখানে হেলে পড়লে ত আর ভারসাম্য হল না। আল্লাহ চান আপনি যখন অফিসের কাজে দম বন্ধ হয়ে যাচ্ছে, তখনও আল্লাহ কে খুশি করুন, ছেলে মেয়ে দুটোর পরীক্ষা পরদিন সকালে - সিলেবাস শেষ করাতে করাতে আল্লাহকে মনে করুন.. এমন। তাহলে কীভাবে হবে?

এজন্যই, আমরা দিনের একেবারে খুঁটিনাটি ঘটনায় আল্লাহকে এনে ফেললে আর দিন শেষে তজবির উপর ভরসা করে থাকতে হবে না। এখানে অত্যন্ত সরল সোজা কিছু টিপস্ দেই।

প্রতিদিন একটু হাঁটা হয়না? হাঁটার সময়টা কী করেন আপনি? পা দিয়ে ত হাঁটাই হয়, মনটা দিয়ে কী করা হয়? কিছুই না, তাইনা? এদিক ওদিক তাকিয়ে দেখা, আগের বা পরের কিছু ভাবা - এসবই ত! এখন থেকে হাঁটার ছন্দের সাথে ছোট দু'আ (যেমন সুব-হা-নাল্-লাহ, ওয়ালহাম-দু-লিল্-লাহ, ওয়ালা-ইলাহা-ইল্লাল্-লাহু, ওয়াল্-লাহু-আক্ব-বার, অথবা সুবহানাল্লাহি ওয়া বিহামদিহী সুবহানাল্লাহিল আযীম) মিলিয়ে পড়তে পড়তে হাঁটবেন। প্রথম প্রথম মনেই থাকবে না পড়ার কথা। তারপর একটা সময়ে পুরোপুরি প্রোগ্রাম হয়ে যাবে মাথার ভেতর। দিনে কত কদম হাঁটা হয়? দুহাজার? প্রতি ষোল কদমে যদি একবার করে দু'আটা শেষ করা হয়, দিন শেষে কতগুলি নেকী জমা পড়ল? কোন কষ্ট ছাড়াই?


এই ত গেল হাঁটা। গোনাগুনির কাজ করতে হয়না? আটটা ডিম, ছ'টা কলম, তিন তলা, কুড়িটা সিঁড়ি? এক দুই তিন করে না গুণে 'সুবহানাল্লাহ' 'ওয়ালহামদুলিল্লাহ' 'ওয়া লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু' 'ওয়াল্লাহু আক্ববার' - এভাবে চার চার করে গুণে ফেলুন। একদম কোন ঝামেলা ছাড়া আরও আট দশবার দুআ পড়া হয়ে যাবে। গায়েই লাগবেনা।

তারপর নতুন সূরা শেখা হয়না কতবছর হল? শিখতে চান? পছন্দের তিলাওয়াতকারীর তিলাওয়াতের এমপিথ্রি চালিয়ে দিয়ে রাখুন মোবাইলে, গাড়িতে, ঘর গুছানোর সময় - গানের মত পুরোটা মাথায় কপি হয়ে যাবে দু'সপ্তাহ পর। এভাবে শুনে শেখার আরো সুবিধা হচ্ছে উচ্চারণও শুদ্ধ হবে, কোথায় কতটুকু বিরতি দিতে হবে, সব জানা হয়ে যাবে।

ক্লাসে যাবেন, বাজারে যাবেন, অফিসে যাবেন, জ্যামে বসে আছেন, মেজাজটা তিরিক্ষি - সময়টা কাজে লাগান একটা অডিও লেকচার শুনে। সেটা হতে পারে কুরআনের তাফসির, নবীদের জীবনী, পারিবারিক সম্পর্কের উপর ইসলামিক আলোচনা.. শুধু যে মেজাজ রক্ষা পাবে তাই না, অলস সময়টাতে অনেক ভাল ভাল চিন্তা মাথায় চলে আসবে। হঠাৎই হয়ত মনে হবে, 'আরে! এই কাজটা ত করা যায়!' ব্যাস, কোন রিকশাওলা কোন দিক দিয়ে ঢুকে গেল - এসব দেখে আর মেজাজ খারাপ হবে না। আপনি ত আর আপনার সময় নষ্ট করছেন না! ওরা যা ইচ্ছে করুক না!

এগুলো ছিল একদম কোন আয়াস ছাড়াই সওয়াব কুড়ানোর পদ্ধতি। এবার আসি একটু শ্রম দিতে হয় এমন কাজে। বন্ধুদের সাথে আড্ডা দিতে ভাল লাগে? তক্কে তক্কে থাকুন, কখন অসুস্থ হয় (তাই বলে আবার দোয়া করতে যাবেন না যেন অসুখে পড়ে); হলেই মিস নেই, দেখতে যান, ফোন করে খোঁজ নিন, অন্য সময়ের চেয়ে দুইবার বেশি ফোন দিন। শুধু বন্ধুর অসুখই না, বন্ধুর পরিবারের যে কারোর বেলায়ও। আল্লাহ ভীষণ খুশি হন এসব কাজে। আর তার উপর যদি আল্লাহকে খুশি করার নিয়্যতে করেন, তাহলে ত ডাবল লাভ!!

দাওয়াতে কোন মুরুব্বী কারও সাথে দেখা হয়? নানু দাদু শ্রেণীর, যারা পার্টি টার্টিতে চুপচাপ এক কোণে বসে থাকেন, সবাই দেখা হলে সালাম দিয়ে চলে যায়, কিন্তু কথা বলে না এমন বয়সের? পাশে গিয়ে বসে কথা বলতে শুরু করুন। এমনভাবে আধা ঘন্টা গল্প করুন, যাতে তাঁর মনে হয় এই সমাবেশে উনার সাথে সময় কাটিয়েই আপনি সবচেয়ে বেশি মজা পাচ্ছেন। চলে আসার সময় দেখবেন প্রাণঢালা দোয়ার ওজনে হাঁটতে পারছেন না।

পরিচিত মানুষজনের সাথে এমনভাবে নরম করে কথা বলা শুরু করুন, যাতে কেউ সমস্যায় পড়লে আপনার কাছে বলতে ভরসা পায়। তারপর সমাধান করতে পারেন না পারেন, একটু সুন্দর করে বলুন, 'হ্যা... সত্যিই ত... আসলেই ত সমস্যা... ধৈর্য ধরে থাকেন ভাই! আপনার ত অনেক ধৈর্য মাশাআল্লাহ!' হয়ে গেল! সে ভাই খুশি, আল্লাহ খুশি, আপনি খুশি। খুশিই খুশি।


যদি দেখেন কেউ একটা ভাল উদ্যোগ নিয়েছে, কিন্তু কাজটা সুন্দর করে হয়নি দেখে অনেক সমালোচনা করছে সবাই... খুব উৎসাহ দেখান। বলুন, জিনিসটা খুবই ভাল হয়েছে। সে যখন উৎসাহে টগবগ করতে থাকবে - তখন না হয় সময় নিয়ে ধীরে সুস্থে খুঁতগুলো ঠিক করার পরামর্শ দেবেন। ভাল কাজে এই যে উৎসাহ দিলেন, চালিয়ে যাওয়ার পরামর্শ দিলেন - এতে করে আল্লাহ সে ভাল কাজের সওয়াবে আপনারও একটা অংশ লিখে রাখবেন ইনশাআল্লাহ।


ফিরে আসি হাঁটার কথায় আবারো। চাইলে এক জোড়া গ্লাভস/পলিথিন সাথে করে বের হতে পারেন। রাস্তায় ঠোঙা, পেপসির ক্যান, পলিথিন পড়ে থাকতে দেখলে তুলে ডাস্টবিনে ফেলে দেবেন। রাস্তার জিনিস পলিথিন মোড়া হাত দিয়ে ধরলে কিন্তু হাত খসে পড়ে যায় না। আমরা টাকা ধরার সময় আরো অনেক জীবাণু ধরি। আর ভাববেন না, আমি মিউনিসিপ্যালিটির পয়সা বাঁচানোর জন্য আপনাকে দিয়ে ফ্রি ফ্রি কাজ করাচ্ছি। এগুলো সব সদকা। আখিরাতে ভাল কাজের পাল্লা ভারি করার কিছু ফ্রি টিপস।