আমার নোট লেখার শুরু মোটামুটি এক বছর আগে। অপুর নোট পড়ে খুব ভাল লাগত, কত সহজ ভাষায় কত দরকারি কথাগুলো বলে ফেলছে। আমারও মনে হত আমিও যদি ওর মত লেখালেখির মাধ্যমে অনেক মানুষের কাছে পৌঁছাতে পারতাম! কিন্তু ইসলাম নিয়ে লেখার দুঃসাহস করার আগে ত তা সম্পর্কে জানতে হবে! একটা ঢোঁক গিললাম। আমি কি কখনও 'যথেষ্ট জেনেছি' বলতে পারব? কেউই ত পারবেনা! তাহলে কি কোনদিনই লিখতে পারবনা? কতটা পথ পেরুলে তারে পথিক বলা যায়? কতটা বাধা ডিঙালে আলোর দিশারী হওয়া যায়?
আমার বাবার একটা স্বভাব হচ্ছে সব অসম্ভবের মধ্যে সে সম্ভাবনা দেখে। অন্যরা সাহায্য করুক আর সমালোচনাই করুক। বাবার এই ইয়ে আমার ভেতরেও চলে এসেছে। ভেবে দেখলাম, অদূর বা সুদূর ভবিষ্যতে স্কলার হওয়ার মত প্রস্তুতি আমার নেই। সুতরাং শুরু করতে হলে যা আছে তা দিয়েই করতে হবে। আমি একেবারেই মধ্যবিত্ত পড়াশুনা-সম্বল একটা আধুনিক পরিবারে বড় হয়েছি, আমার মত মন মানসিকতার হাজার হাজার ছেলেমেয়ে পাবলিক আর প্রাইভেট ইউনিভার্সিটিতে আছে। ফ্যামিলি কালচারে ভিন্নতা থাকার কারণে স্বাধীনতা কারো একটু বেশি ছিল, কারো কম। কিন্তু সবারই লক্ষ্য ভাল রেজাল্ট করে বের হতে হবে, ভালভাবে সেটলড হতে হবে। এই গতানুগতিক 'এইম ইন লাইফের' স্রোতে আমিও চলছি, তাই আমি জানি এই মানুষগুলো ভালভাবে বাঁচতে চায়, শান্তিতে থাকতে চায়। কিন্তু শান্তি রক্ষা করার জন্য যে স্ট্রাগলটুকু করতে হয় সেটার ট্রেইনিং পাওয়ার সুযোগ তাদের হয়নি। এখন সত্যিকারের সমস্যায় এসে যে যার যার বিবেকবুদ্ধি অনুযায়ী সলভ করার চেষ্টা করছে। অথবা নিজের চিন্তাভাবনাগুলি বদলে নতুনভাবে সবকিছু দেখার চেষ্টা করছে।
আলহামদুলিল্লাহ এই প্রসেসের মধ্যে পড়ে আমি বরাতজোরে ইসলামের মধ্যে সলিউশন খুঁজেছি। একবার বাসায় গল্পের বই পাচ্ছিলাম না তাই হাদীসের বই নামিয়ে পড়ে ফেলেছিলাম - ঐ একবারের পড়া থেকেই টুকটাক বিভিন্ন কাজে এক একটা প্রাসঙ্গিক হাদীস মনে পড়ে যেত। যেমন একবার খুব ঠান্ডা লাগায় আম্মু বিদেশ থেকে কলিগের দেয়া একটা ঠান্ডার ওষুধ আমাকে খেতে বলেছে। আমি খাইনি, পরে আম্মু বলল, 'তুমি এখনই একটা ওষুধ খেয়ে ফেল।' খেলাম। আধ ঘন্টার মধ্যে এলার্জিতে সারা মুখ, হাত পা ফুলে একাকার। আম্মু পরে আমাকে বলছিল, আমি বললাম আর তুই তক্ষুণি খালি পেটে খেয়ে ফেললি? তখন আম্মুকে এই হাদীসটা শোনালাম যে, রাসুলুল্লাহ বলেছেন, বাবা মা যেন সাধারণ বিষয়ে সন্তানদের সরাসরি আদেশ না দেন। কারণ কোন কারণে সন্তান যদি সে আদেশ পালন না করে তাহলে আল্লাহর কাছে জবাবদিহি করতে হবে। সে জন্য বাবা মায়ের উচিৎ উপদেশ এর মত করে বলা। এই রকম আরো, রাসুলুল্লাহ (স) যেভাবে খুব নরম আচরণ করতেন, সবাই কথা বলতে কমফোর্ট ফিল করত, স্ত্রীরা মেজাজ খারাপ থাকলে চিল্লাচিল্লি করতেও ভয় পেতনা - এইসব ছোট ছোট অনেক কথা মনে পড়ে যেত। ওখান থেকেই ইসলাম - ওয়ে অব লাইফ - এর ব্যাপারটা কী জানার আগ্রহ হল।
এই যে আগের সময়টার সাথে এখনকার সময়ে চিন্তা ভাবনার আকাশ পাতাল পার্থক্য, বা গতানুগতিক জীবনধারার সাথে ইসলামিক মতাদর্শের শার্প কনট্রাস্ট - এই জিনিসগুলি আমাকে খুব খুব প্রভাবিত করেছিল। আমার ডায়রিতে লেখা কয়েকটা কথা -
"আমার আজকাল নিজেকে জন্মান্ধ মনে হয়, যার এই মাত্র অপারেশন করে চোখ দেয়া হয়েছে। পাগলের মত এই ওয়েবসাইট থেকে সেই ওয়েবসাইট ঘাটি, একদিন ব্যস্ততায় টক শুনতে না পারলে অস্থির লাগে। মনে মনে বলি, আল্লাহ, তোমার সৃ্ষ্টির সবচাইতে সুন্দর জিনিসটা বোধহয় নলেজ, জ্ঞানের সৌন্দর্যে আমি অন্ধ হয়ে গেছি। ।আল্লাহ! তুমি মানুষের জন্য এত সুন্দর একটা জিনিস তৈরি করে রেখেছ? in my mind, everything starts making sense, i see a problem, i try to understand, i try to look for a solution, and i find it, in my dreams, or during prayer, or while doing household works. আমি কী বলব? আমি সারাটাক্ষণ অভিভূত হয়ে থাকি, আমার চোখে পানি চলে আসে, মনে হয, সবাইকে ধরে ধরে বলি, তোমরাও দেখ, দেখতে পাচ্ছনা?"
আস্তে আস্তে আরো অনেক প্র্যাক্টিসিং মুসলিমের সাথে মিশে দেখলাম, আমার ইউনিকনেস এটাই। আমি যেভাবে কমপেয়ার করে দেখছি, বা আগের থেকে এখনের ট্রানজিশনটা খুব ভাল করে ফিল করছি, সবসময়ই প্র্যাক্টিস করে আসা অনেক মুসলিম ভাই বোনদের মধ্যে ওই বোধটা ফিকে হয়ে গেছে। আমারো হয়ত হয়ে যাবে, সুতরাং আমাকে এখনই লিখতে হবে। এই চিন্তাগুলি কিছুদিন পরে নাও থাকতে পারে!
আলহামদুলিল্লাহ, আমার ছাতা মাথা লেখার প্রতিক্রিয়া দেখে আবারো বুঝলাম আল্লাহ তিল থেকে শুধু তেল আর তাল না, তিলোত্তমাও বানায় ফেলতে পারে। গত একমাসে কত... আপু ভাইয়া যে মেসেজ করে আমাকে কৃতজ্ঞতা জানিয়েছেন - আমার ভয় লাগসে, এত এত ভালবাসা পাইতেসি, আমি কি এখন মরে টরে যাব? আই মিন দুনিয়ায় ত এর বেশি ভালবাসা পাওয়া সম্ভব না, তাইলে কি পৃথিবীর কাছে আমার পাওনা শেষ? বা যা পাওয়ার আল্লাহ সব এইখানেই দিয়ে দিল? কবরে ফড়ে ফক্কা?
ইনশাল্লাহ, স্কলার হওয়ার চেষ্টা শুরু করব, কারণ মুসলিমের কাছে আল্লাহর প্রথম কমান্ডই আসছে পড়তে বসার (ঠিক যেন আম্মু, পড়, পড়, পড়...) কিন্তু ঐ ছুতায় আল্লাহ এখন পর্যন্ত যে জ্ঞান আর সুযোগ সুবিধা দিয়েছেন তার বিনিয়োগ ত বন্ধ রাখা যায়না! আমাদের সবার জন্যই ত একই কথা। ঠিক আপনার মত পড়াশুনা, আপনার মত ফ্যামিলি, আপনার মত ফ্রেন্ড সার্কেল, আপনার মত করে চিন্তা করা আর একজন মানুষ কি এই পৃথিবীতে আছে?
ইয়াসির কাজী দাওয়াহ বিষয়ক একটা লেকচার এ খুব সুন্দর একটা কথা বলেছিলেন। 'এই রুমটাতে পাঁচ হাজার লোক আছে। ধরুন এই রুমের সব বাতি একটা সুইচ দিয়ে জ্বালান হয়, কোন কারণে সে সুইচটা অফ হয়ে গেল। এখন এই পাঁচ হাজার লোক কী করবে? সুইচ কই, কে জ্বালাবে - এসব বলে অপেক্ষা করতে থাকবে? আপনাদের প্রত্যেকেরই ত সেলফোন আছে। বাতি নিভে গেলে প্রত্যেকে তাদের সেলফোনটা মাথার উপর উঁচু করে ধরুন। পাঁচ হাজার মৃদু আলো এক হলে এই ঘরটায় কি আর অন্ধকার থাকবে?'
Saturday, July 16, 2011
Tuesday, July 12, 2011
দুই রকমের আলো
এক নববিবাহিত মেয়ের কথা শুনেছিলাম, একটা ছোট্ট শোপিস গুছিয়ে রাখতে গিয়ে ভেঙে ফেলে সে ভয়ে অস্থির হয়ে যায়, ওর স্বামী ওকে এসে কথা শোনাবে। ওর মা সে সময় সামনে ছিল, মেয়ের এই করুণ অবস্থা দেখে খুব কাঁদছিলেন আর বলছিলেন, এত আদরের মেয়েকে অনেক দেখেশুনে সেরা পাত্র, বড় পরিবারে বিয়ে দিলাম - এই তার পরিণতি?
আমার খুব কষ্ট লেগেছিল। সত্যিই ত, সুন্দর চেহারা, দামি জামাকাপড়, পার্টি, ক্যারিয়ার - এ জিনিসগুলি ত এনজয় করা যায় যখন মনের সবটুকু স্বাধীনতা থাকে। একটা জিনিসের মূল্য কতটুকু, ফেললই না হয় ভেঙে, তার বদলে ওর নতুন পরিবার কী করল? তার মনোবলটা গুঁড়ো করে দিল। এরকম কত.. মানুষ দেখলাম, ভুল হলে খুব শক্ত কঠিন ভাষায় শাসন করে। আমি চিন্তা করি, এর পেছনে কারণটা কী? তার কি মনে হয় আত্মসম্মানের গোড়া ধরে টান দিলে সে আর কখনো কথার বাইরে যাবেনা, তখন ইচ্ছেমত এক্সপ্লয়েট করা যাবে? দাসপ্রথা যখন চালু ছিল তখন নাকি দাসদের কাপড় ছাড়া জনসম্মুখে যেতে বাধ্য করত, গোসল করতে দিত না - যাতে করে ওর নিজের ওপরে ঘেন্না চলে আসে। দাসদের কোন স্বাধীন ইচ্ছা বা চিন্তা থাকা খুব বিপদজনক।
আমাদের আধুনিক পরিবারগুলো বুঝে না বুঝে প্রায় একই রকম কাজ করে। শারীরিক আকৃতি নিয়ে মজা করা, কাজে ভুল হলে 'এতদিনে এই শিখেছ..' টাইপ কথা বলা, কোন দায়িত্ব দেয়ার প্রস্তাব উঠলে 'ও পারবেনা' বলে আগেই ডিসমিস করে দেয়া - এসব দেখে মনে হয় এগুলো মানসিক দাসত্বের বেড়ি ছাড়া আর কিছু না।
আরেকটা কারণ হতে পারে যারা এমন করে তারা নিজেরাও একই ধরণের ব্যবহার পেয়ে এসেছে, আর সময়ের সাথে সাথে কিছুটা অভ্যস্ত ও হয়ে পড়েছে। নতুন একটা মানুষকে এ ব্যবহার যে কষ্ট দিতে পারে, তা তার মাথায়ও আসেনি। কাজ বা কথা বলার আগে তার পরিণতি নিয়ে আরেকটু বেশি চিন্তা করলে এ সমস্যাটা থাকত না। আল্টিমেটলি এই কথাটা বা ব্যবহারটা যার উদ্দেশ্যে করা, তার সাথে ত সম্পর্ক একটু নষ্টই হবে, তাই না? এই সম্পর্ক কর্মকর্তা কর্মচারি হোক, পরিবারের মধ্যে হোক বা যেখানেই হোক। একটু যে খারাপ ব্যবহার করল তার উদ্দেশ্য কি অন্য মানুষটাকে শোধরানো, না নিজের ভেতরের রাগ ঝাড়া?
অনেক স্মার্ট, আলোকিত মানুষকেই দেখি অন্যের ভুলের ব্যাপারে তাদের মনটা কত কঠোর! একটা ছোট্ট ভুল হলে হেসে উড়িয়েও দেয়া যায়, আবার এর সূত্র ধরে অনেক খোঁটাও দেয়া যায়। কেন যে মানুষ শুধু কর্পোরেট এটিকেটই শেখে, মনুষ্যত্ব শেখেনা - বুঝিনা। মনটা অহংকারের বদলে দয়া আর ক্ষমা দিয়ে ভরে দিলে কী হয়? কথা শুনিয়ে মানুষকে আরো বেশি সতর্ক করা যায়, যত্নবান ত করা যায় না। কত বাবা মা ছেলে মেয়ের অবাধ্যতা দেখলে যাচ্ছেতাই গালাগালি করেন, একবার কি চিন্তা করেন, এর এক পার্সেন্টও যদি বুড়ো বয়সে উনাদের কাছে ফিরে আসে তখন কেমন হবে?
মন নরম করার কোন বিকল্প নাই। যে কোন কাজের বা রিলেশনের লং টার্ম বেনিফিট পেতে হলে শক্ত কথা, বিরক্তি - এসব বাদ দিতে হবে। সহানুভূতির সর্বোচ্চ লেভেল এ যেতে হবে। অন্য মানুষটা যেন আপনার কথা ভাবলে আপনার আদর, কেয়ারের কথাই ভাবে - এ ব্যাপারে খুব যত্নবান হতে হবে। তা না হলে এইসব শাসন কতটুকু পরিবর্তন আনে জানি না, ঘৃণা আনে অনেক, এটুকু জানি।
ভাবতে খুব অবাক লাগে, প্র্যাক্টিক্যাল প্রবলেম এ পড়ে ঠেকে ঠেকে যে সিদ্ধান্তগুলিতে পৌছাই, হাদীস বই খুলে ওগুলোই দেখি সবার আগে লেখা। অন্তরের কাঠিন্য নিয়ে বিলাল ফিলিপস এর এক লেকচারের বাংলা অনুবাদ পেলাম, ওটা পড়তে পড়তে খেয়াল হল, এত এত ফ্যামিলি প্রবলেমের মূল কারণ ত এই কঠিন মন। কেউ কারো দোষ মাফ করেনা, নিজের আরাম কে স্যাক্রিফাই করেনা, যুক্তিতে ঠিক থাকলে বলে ফেলতে দুইবার চিন্তা করেনা। এগুলি কঠিন মন ছাড়া আর কী? মানুষের আত্মসম্মান কেন এত ঠুনকো হয়ে গেছে, যে অন্যকে ছোট না করে নিজেকে বড় ভাবতে পারেনা? একটু সুবিধা কম হয়ে গেলে তার প্রতিশোধ নিতে ছাড়েনা? আত্মসম্মানের স্ট্যান্ডার্ড টা যে একজন আরেকজনকে দেখে ঠিক করে, এ কারণেই বোধহয় এরকম। শাশুড়ি বউ কে ছোট করে প্রমাণ করতে চায় সংসার চালাতে কে বেশি পারদর্শী। নতুন বউ ঘরে এসেই শাশুড়ির সব বাতিল করে দিতে চায় দেখানোর জন্য যে সে আরো বেশি কোয়ালিফাইড। সম্পর্কের শুরুতে ইনটেনশন এমন না থাকলেও আস্তে আস্তে একটা প্রতিযোগিতা শুরু হয়েই যায় - নিজেকে প্রমাণ করার। এই লড়াই থেকে একজন বের হয়ে আসতে চাইলে যে পরিমাণ হেরে আসতে হয়, সেটা কভার করার মত মনের জোর ত তাকে কেউ দেয়না। তখন আশপাশ থেকে অন্য ভাল কাজ করে মনের জোর জোগাড় করতে হয়। এই ভয়ংকর যুদ্ধের মধ্যে পড়ে কত মন বিকলাঙ্গ হয়ে যাচ্ছে সে খোঁজ কে রাখে?
আল্লাহ, তুমি আমাদের সবাইকে মাফ কর। তোমার দেখান পথ বেস্ট জেনেও আমরা নিজেরা নিজেদের মত করে পথ খুঁজতে যাই। যারা তোমার পথের সন্ধান পেয়েছে তারা শুধু নিজের আলোটুকু বাঁচাতেই সারা জীবন ব্যস্ত থেকেছে। পথের পাশে এসে একটু দাঁড়ায়নি আমাদের আলোকিত করার জন্য। তুমি আমাদের মাফ কর আল্লাহ, তোমার আলোর মূল্যটাই উপলব্ধি করার মত বোধ আমাদের এখনো আসেনি।
রেফারেন্স: http://sonarbangladesh.com/blog/uknews/47158
আমার খুব কষ্ট লেগেছিল। সত্যিই ত, সুন্দর চেহারা, দামি জামাকাপড়, পার্টি, ক্যারিয়ার - এ জিনিসগুলি ত এনজয় করা যায় যখন মনের সবটুকু স্বাধীনতা থাকে। একটা জিনিসের মূল্য কতটুকু, ফেললই না হয় ভেঙে, তার বদলে ওর নতুন পরিবার কী করল? তার মনোবলটা গুঁড়ো করে দিল। এরকম কত.. মানুষ দেখলাম, ভুল হলে খুব শক্ত কঠিন ভাষায় শাসন করে। আমি চিন্তা করি, এর পেছনে কারণটা কী? তার কি মনে হয় আত্মসম্মানের গোড়া ধরে টান দিলে সে আর কখনো কথার বাইরে যাবেনা, তখন ইচ্ছেমত এক্সপ্লয়েট করা যাবে? দাসপ্রথা যখন চালু ছিল তখন নাকি দাসদের কাপড় ছাড়া জনসম্মুখে যেতে বাধ্য করত, গোসল করতে দিত না - যাতে করে ওর নিজের ওপরে ঘেন্না চলে আসে। দাসদের কোন স্বাধীন ইচ্ছা বা চিন্তা থাকা খুব বিপদজনক।
আমাদের আধুনিক পরিবারগুলো বুঝে না বুঝে প্রায় একই রকম কাজ করে। শারীরিক আকৃতি নিয়ে মজা করা, কাজে ভুল হলে 'এতদিনে এই শিখেছ..' টাইপ কথা বলা, কোন দায়িত্ব দেয়ার প্রস্তাব উঠলে 'ও পারবেনা' বলে আগেই ডিসমিস করে দেয়া - এসব দেখে মনে হয় এগুলো মানসিক দাসত্বের বেড়ি ছাড়া আর কিছু না।
আরেকটা কারণ হতে পারে যারা এমন করে তারা নিজেরাও একই ধরণের ব্যবহার পেয়ে এসেছে, আর সময়ের সাথে সাথে কিছুটা অভ্যস্ত ও হয়ে পড়েছে। নতুন একটা মানুষকে এ ব্যবহার যে কষ্ট দিতে পারে, তা তার মাথায়ও আসেনি। কাজ বা কথা বলার আগে তার পরিণতি নিয়ে আরেকটু বেশি চিন্তা করলে এ সমস্যাটা থাকত না। আল্টিমেটলি এই কথাটা বা ব্যবহারটা যার উদ্দেশ্যে করা, তার সাথে ত সম্পর্ক একটু নষ্টই হবে, তাই না? এই সম্পর্ক কর্মকর্তা কর্মচারি হোক, পরিবারের মধ্যে হোক বা যেখানেই হোক। একটু যে খারাপ ব্যবহার করল তার উদ্দেশ্য কি অন্য মানুষটাকে শোধরানো, না নিজের ভেতরের রাগ ঝাড়া?
অনেক স্মার্ট, আলোকিত মানুষকেই দেখি অন্যের ভুলের ব্যাপারে তাদের মনটা কত কঠোর! একটা ছোট্ট ভুল হলে হেসে উড়িয়েও দেয়া যায়, আবার এর সূত্র ধরে অনেক খোঁটাও দেয়া যায়। কেন যে মানুষ শুধু কর্পোরেট এটিকেটই শেখে, মনুষ্যত্ব শেখেনা - বুঝিনা। মনটা অহংকারের বদলে দয়া আর ক্ষমা দিয়ে ভরে দিলে কী হয়? কথা শুনিয়ে মানুষকে আরো বেশি সতর্ক করা যায়, যত্নবান ত করা যায় না। কত বাবা মা ছেলে মেয়ের অবাধ্যতা দেখলে যাচ্ছেতাই গালাগালি করেন, একবার কি চিন্তা করেন, এর এক পার্সেন্টও যদি বুড়ো বয়সে উনাদের কাছে ফিরে আসে তখন কেমন হবে?
মন নরম করার কোন বিকল্প নাই। যে কোন কাজের বা রিলেশনের লং টার্ম বেনিফিট পেতে হলে শক্ত কথা, বিরক্তি - এসব বাদ দিতে হবে। সহানুভূতির সর্বোচ্চ লেভেল এ যেতে হবে। অন্য মানুষটা যেন আপনার কথা ভাবলে আপনার আদর, কেয়ারের কথাই ভাবে - এ ব্যাপারে খুব যত্নবান হতে হবে। তা না হলে এইসব শাসন কতটুকু পরিবর্তন আনে জানি না, ঘৃণা আনে অনেক, এটুকু জানি।
ভাবতে খুব অবাক লাগে, প্র্যাক্টিক্যাল প্রবলেম এ পড়ে ঠেকে ঠেকে যে সিদ্ধান্তগুলিতে পৌছাই, হাদীস বই খুলে ওগুলোই দেখি সবার আগে লেখা। অন্তরের কাঠিন্য নিয়ে বিলাল ফিলিপস এর এক লেকচারের বাংলা অনুবাদ পেলাম, ওটা পড়তে পড়তে খেয়াল হল, এত এত ফ্যামিলি প্রবলেমের মূল কারণ ত এই কঠিন মন। কেউ কারো দোষ মাফ করেনা, নিজের আরাম কে স্যাক্রিফাই করেনা, যুক্তিতে ঠিক থাকলে বলে ফেলতে দুইবার চিন্তা করেনা। এগুলি কঠিন মন ছাড়া আর কী? মানুষের আত্মসম্মান কেন এত ঠুনকো হয়ে গেছে, যে অন্যকে ছোট না করে নিজেকে বড় ভাবতে পারেনা? একটু সুবিধা কম হয়ে গেলে তার প্রতিশোধ নিতে ছাড়েনা? আত্মসম্মানের স্ট্যান্ডার্ড টা যে একজন আরেকজনকে দেখে ঠিক করে, এ কারণেই বোধহয় এরকম। শাশুড়ি বউ কে ছোট করে প্রমাণ করতে চায় সংসার চালাতে কে বেশি পারদর্শী। নতুন বউ ঘরে এসেই শাশুড়ির সব বাতিল করে দিতে চায় দেখানোর জন্য যে সে আরো বেশি কোয়ালিফাইড। সম্পর্কের শুরুতে ইনটেনশন এমন না থাকলেও আস্তে আস্তে একটা প্রতিযোগিতা শুরু হয়েই যায় - নিজেকে প্রমাণ করার। এই লড়াই থেকে একজন বের হয়ে আসতে চাইলে যে পরিমাণ হেরে আসতে হয়, সেটা কভার করার মত মনের জোর ত তাকে কেউ দেয়না। তখন আশপাশ থেকে অন্য ভাল কাজ করে মনের জোর জোগাড় করতে হয়। এই ভয়ংকর যুদ্ধের মধ্যে পড়ে কত মন বিকলাঙ্গ হয়ে যাচ্ছে সে খোঁজ কে রাখে?
আল্লাহ, তুমি আমাদের সবাইকে মাফ কর। তোমার দেখান পথ বেস্ট জেনেও আমরা নিজেরা নিজেদের মত করে পথ খুঁজতে যাই। যারা তোমার পথের সন্ধান পেয়েছে তারা শুধু নিজের আলোটুকু বাঁচাতেই সারা জীবন ব্যস্ত থেকেছে। পথের পাশে এসে একটু দাঁড়ায়নি আমাদের আলোকিত করার জন্য। তুমি আমাদের মাফ কর আল্লাহ, তোমার আলোর মূল্যটাই উপলব্ধি করার মত বোধ আমাদের এখনো আসেনি।
রেফারেন্স: http://sonarbangladesh.com/blog/uknews/47158
Friday, July 8, 2011
কিছু করার পাইনা
আমার বোনের এইচ এস সি পরীক্ষা নিয়ে ভয়ঙ্কর টেনশন ছিল। এস এস সি তে ঝড়ে বক মরার মত গোল্ডেন পেয়ে ফেলেছে - এখন এইচ এস সি তে গিয়ে খারাপ করলে মানুষ কী বলবে.. মহা দুশ্চিন্তা! পরীক্ষার চার-পাঁচ দিন আগে ওকে ফোন করে বললাম, 'দ্যাখ, তুই ত স্কুল কলেজে পড়ার চাপে সময় করতে পারিস নাই, এতদিন শুধু পড়া নিয়েই ছিলি। পড়ার বাইরে একটা অনেক বড় পৃথিবী আছে, ওখানে টিকে থাকতে হলে আরো অনেক কিছু জানতে হয়, শিখতে হয়। তোর অনেক কাজ বাকি আছে, পরীক্ষার ঝামেলাটা তাড়াতাড়ি শেষ কর।' ও হেসেই বাঁচেনা, সবাইকে গল্প করে বলেছে, আপু আমাকে বলসে পরীক্ষার জ্বালায় নাকি আমি অনেক ইম্পরট্যান্ট কাজ করতে পারতেসি না, তাই তাড়াতাড়ি ঝামেলা শেষ করতে।
যাই হোক, দেড় মাস ব্যাপী দীর্ঘ পরীক্ষার শুভ সমাপন হল, এখন আমি পড়লাম বিপদে। 'কী রে, তুই না বলসিলি, আমার কত কাজ? এখন ত পরীক্ষা শেষ, আমি ত কিসুই করার পাইনা।' তাই ত! কী কাজ দেয়া যায়? আমার ত কত শখ আমার বোন মানুষের জন্য কাজ করবে, ইসলাম নিয়ে পড়াশুনা করবে, নিজে প্র্যাক্টিস করার পাশাপাশি অন্যদেরও জানাবে - এতে করে ওর কনফিডেন্সটাও যেমন বাড়বে, তেমনি মানুষের কল্যাণে কাজ করার একটা অভ্যাস তৈরি হবে, পরবর্তী লাইফে যত টাকাই হাতে আসুক, সে টাকা অন্তরে জায়গা করে নেবে না। কিন্তু এইসব বড় বড় কথা মুখে বললে ত হবে না! তার জন্য সুযোগ সেট করে দেয়া চাই। ও ত চাইলেই যেখানে সেখানে যেতে পারেনা। তাছাড়া নিরাপত্তারও ত ব্যাপার আছে, যতটা না শারীরিক, তার চেয়ে বেশি মানসিক নিরাপত্তা নিয়ে আমার ভয়। এই অফুরন্ত অবসরে অলস সময় কাটানো এক টিন এজারের জন্য অদেখা পৃথিবীটায় এত বেশি ফাঁদ পাতা যে তা থেকে গা বাঁচিয়ে চলা রীতিমত এক যুদ্ধের মত।
ওকে বললাম, 'তুই ছয় সাত বছর পরের সময়টার কথা চিন্তা কর, তোর জব থাকবে, নিজের সংসার থাকবে, আর আমাদের মত যদি বাইরে চলে আসিস তখন ঘরে বাইরে সবই দুই হাতে সামলাতে হবে। তখন কিছু কিছু গুণ খুব থাকা দরকার। যেমন, একটু আগে থেকে প্ল্যান করে কাজ সামলান। ধর আব্বু আম্মু অসুস্থ, বাসায় কাজের লোক নাই, তোর পরীক্ষা - তখনও ত সব সামলায় ক্লাশে যেতে হবে, তাই না? তুই কি এখন কয়েকটা কাজ একসাথে করতে পারিস?' না। 'বেশ, তাহলে একদিন তোর ফ্রেন্ডদের বাসায় দাওয়াত কর, সব রান্না তুই করবি, সার্ভ ও করবি আবার চলে যাওয়ার পর গুছায় রাখার কাজটাও করবি।' ধুর! রান্নাবান্না - এইটা কোন মজার কাজ হইল? 'আহা! একটা সময় গিয়ে এগুলি তোর জন্য অনেক সহজ হয়ে যাবে, কিন্তু তখনও এমন কাজ আসবে যেগুলো তোর কঠিন লাগবে। তোর করতে ভয় করবে। এখন যেমন একা গেস্ট সামলানো তোর জন্য খুব ভয়ের, পরে হয়ত জব আর বেবি, অথবা বাবা মা, সংসার, চাকরি, বেবি - এসব ভয় লাগবে। তোর রান্না বা দাওয়াতটা ত ইম্পরট্যান্ট না, এই যে সাধ্যের বাইরে একটা কঠিন কাজ করে ফেলতে পারলি - এটা ইম্পরট্যান্ট।'
হুঁ। করলাম, আর কী?
আর... ও হ্যাঁ, তোর বিভিন্ন লেভেলের মানুষের সাথে ভালভাবে মিশতে পারা শিখতে হবে। তুই যেন চায়ের দোকানদার মামার সাথে থেকে শুরু করে তোর টিচার, বয়স্ক আত্মীয় - কারো সাথে কথা বলতে অস্বস্তি না লাগে সে জন্য অনেক বেশি মানুষের সাথে গল্প করতে হবে। ইউনিভার্সিটি তে উঠলে সার্কেল বড় হবে, কিন্তু ওটাও ঐ ক্লাশমেট দের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। ওখানে বিভিন্ন ফ্যামিলি ব্যাকগ্্রাউন্ডের মানুষ হয়ত পাবি, কিন্তু বিভিন্ন বয়স বা পেশার মানুষ ত পাবিনা। তুই ইসলামের দাওয়াত দিতে গেলে তাদের কাছে যেতে হবেনা? বা গ্রামে গিয়ে কাজ করতে হলে তাদের একজন হতে হবে ত! ত এর জন্য ঢাকার বাইরে যত আত্মীয় আছে ফোন করে কথা বলবি, দূর সম্পর্কের চাচী, মামী, ফুফু - সবার সাথে যোগাযোগ রাখবি। এতে করে অনেক সময় যখন ফ্রেন্ডরা থাকেনা - তখন বোরড লাগবে না। ফ্রেন্ডদের অভাবও বোধ করবি না অনেক সময়। আর অনেক রকম মানুষ মানেই অনেক রকম টপিক - কত যে মজার মজার দিক জানা যায় মানুষের! দেখবি একটা ঘটনাই কত জন কত ভাবে দেখে। মানুষের সাইকোলজি বোঝার জন্য এর চেয়ে সহজ উপায় আর নেই।
তারপর?
তারপর... তোকে আমি কিছু টাকা পাঠাব। তুই কত টাকা একসাথে হাতে পেয়েছিস এই পর্যন্ত? উম... চার হাজার। আচ্ছা, আমি এমন পরিমাণ টাকা দিব যাতে তোর অনেক টাকা মনে হয়। তুই এই টাকা তিন ভাগে ভাগ করবি। একভাগ ফ্রেন্ডদের সাথে ফাস্ট ফুডে গিয়ে উড়াবি আর তোর শখের জিনিস কিনবি। একভাগ দিয়ে বই কিনবি। আর একভাগ চ্যারিটি করবি। চ্যারিটি জাস্ট হাতে টাকা ধরায় দিলেই হবে না। লং টার্ম কাজে লাগে এরকম জায়গায় চ্যারিটি করতে হবে। তারপর পুরা টাকা শেষ হলে আমাকে বলবি কোনভাবে টাকা খরচ করে তোর সবচেয়ে ভাল্লাগসে।
কী দরকার? আমি টাকাটা রেখে দেই, একটা কোর্স করব ঐ টাকা দিয়ে!
তার মানে আল্লাহ তোকে অর্থ দিয়ে পরীক্ষা করল, আর তুই পুরাটা নিজের ভবিষ্যতের জন্য হাপিশ করে দিলি? কঞ্জুস! স্বার্থপর!
ইয়ে! আচ্ছা ঠিক আছে, দিস টাকা, চিন্তা করে দেখি কী করা যায়।
হ্যা, আর আল্লাহ যে তোকে সময় দিয়ে পরীক্ষা করতেসে তার কী? পুরা টাইমটা নিজের ফিউচারের জন্য খরচ করতেসিস? নাইলে টিভি দেখতেসিস? চ্যারিটি অব মানি বুঝিস, চ্যারিটি অব টাইম বুঝিস না? ঘরের কাজ কর, আব্বা আম্মার সাথে সময় কাটা, নেট এ বসলে এডুকেশনাল ভিডিও কী পাওয়া যায় খুঁজে বের কর, ঐগুলি অনুবাদ করে বাংলায় ভয়েস দিয়ে ডিভিডি বানাবি। স্কুলে স্কুলে পাঠানোর ব্যবস্থা করতে হবে। নানু কে ফোন করে জিজ্ঞাসা কর ঢাকা থেকে কী কী পাঠাতে হবে। আমার এক ফ্রেন্ড এর বেবি হবে, ওকে গিফট কিনে দিয়ে আসবি।
ধ্যুৎ! এত কাজ করতে বলিস, ভাল্লাগেনা!
আমি হাসলাম। আমার কাজ এ পর্যন্তই।
যাই হোক, দেড় মাস ব্যাপী দীর্ঘ পরীক্ষার শুভ সমাপন হল, এখন আমি পড়লাম বিপদে। 'কী রে, তুই না বলসিলি, আমার কত কাজ? এখন ত পরীক্ষা শেষ, আমি ত কিসুই করার পাইনা।' তাই ত! কী কাজ দেয়া যায়? আমার ত কত শখ আমার বোন মানুষের জন্য কাজ করবে, ইসলাম নিয়ে পড়াশুনা করবে, নিজে প্র্যাক্টিস করার পাশাপাশি অন্যদেরও জানাবে - এতে করে ওর কনফিডেন্সটাও যেমন বাড়বে, তেমনি মানুষের কল্যাণে কাজ করার একটা অভ্যাস তৈরি হবে, পরবর্তী লাইফে যত টাকাই হাতে আসুক, সে টাকা অন্তরে জায়গা করে নেবে না। কিন্তু এইসব বড় বড় কথা মুখে বললে ত হবে না! তার জন্য সুযোগ সেট করে দেয়া চাই। ও ত চাইলেই যেখানে সেখানে যেতে পারেনা। তাছাড়া নিরাপত্তারও ত ব্যাপার আছে, যতটা না শারীরিক, তার চেয়ে বেশি মানসিক নিরাপত্তা নিয়ে আমার ভয়। এই অফুরন্ত অবসরে অলস সময় কাটানো এক টিন এজারের জন্য অদেখা পৃথিবীটায় এত বেশি ফাঁদ পাতা যে তা থেকে গা বাঁচিয়ে চলা রীতিমত এক যুদ্ধের মত।
ওকে বললাম, 'তুই ছয় সাত বছর পরের সময়টার কথা চিন্তা কর, তোর জব থাকবে, নিজের সংসার থাকবে, আর আমাদের মত যদি বাইরে চলে আসিস তখন ঘরে বাইরে সবই দুই হাতে সামলাতে হবে। তখন কিছু কিছু গুণ খুব থাকা দরকার। যেমন, একটু আগে থেকে প্ল্যান করে কাজ সামলান। ধর আব্বু আম্মু অসুস্থ, বাসায় কাজের লোক নাই, তোর পরীক্ষা - তখনও ত সব সামলায় ক্লাশে যেতে হবে, তাই না? তুই কি এখন কয়েকটা কাজ একসাথে করতে পারিস?' না। 'বেশ, তাহলে একদিন তোর ফ্রেন্ডদের বাসায় দাওয়াত কর, সব রান্না তুই করবি, সার্ভ ও করবি আবার চলে যাওয়ার পর গুছায় রাখার কাজটাও করবি।' ধুর! রান্নাবান্না - এইটা কোন মজার কাজ হইল? 'আহা! একটা সময় গিয়ে এগুলি তোর জন্য অনেক সহজ হয়ে যাবে, কিন্তু তখনও এমন কাজ আসবে যেগুলো তোর কঠিন লাগবে। তোর করতে ভয় করবে। এখন যেমন একা গেস্ট সামলানো তোর জন্য খুব ভয়ের, পরে হয়ত জব আর বেবি, অথবা বাবা মা, সংসার, চাকরি, বেবি - এসব ভয় লাগবে। তোর রান্না বা দাওয়াতটা ত ইম্পরট্যান্ট না, এই যে সাধ্যের বাইরে একটা কঠিন কাজ করে ফেলতে পারলি - এটা ইম্পরট্যান্ট।'
হুঁ। করলাম, আর কী?
আর... ও হ্যাঁ, তোর বিভিন্ন লেভেলের মানুষের সাথে ভালভাবে মিশতে পারা শিখতে হবে। তুই যেন চায়ের দোকানদার মামার সাথে থেকে শুরু করে তোর টিচার, বয়স্ক আত্মীয় - কারো সাথে কথা বলতে অস্বস্তি না লাগে সে জন্য অনেক বেশি মানুষের সাথে গল্প করতে হবে। ইউনিভার্সিটি তে উঠলে সার্কেল বড় হবে, কিন্তু ওটাও ঐ ক্লাশমেট দের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। ওখানে বিভিন্ন ফ্যামিলি ব্যাকগ্্রাউন্ডের মানুষ হয়ত পাবি, কিন্তু বিভিন্ন বয়স বা পেশার মানুষ ত পাবিনা। তুই ইসলামের দাওয়াত দিতে গেলে তাদের কাছে যেতে হবেনা? বা গ্রামে গিয়ে কাজ করতে হলে তাদের একজন হতে হবে ত! ত এর জন্য ঢাকার বাইরে যত আত্মীয় আছে ফোন করে কথা বলবি, দূর সম্পর্কের চাচী, মামী, ফুফু - সবার সাথে যোগাযোগ রাখবি। এতে করে অনেক সময় যখন ফ্রেন্ডরা থাকেনা - তখন বোরড লাগবে না। ফ্রেন্ডদের অভাবও বোধ করবি না অনেক সময়। আর অনেক রকম মানুষ মানেই অনেক রকম টপিক - কত যে মজার মজার দিক জানা যায় মানুষের! দেখবি একটা ঘটনাই কত জন কত ভাবে দেখে। মানুষের সাইকোলজি বোঝার জন্য এর চেয়ে সহজ উপায় আর নেই।
তারপর?
তারপর... তোকে আমি কিছু টাকা পাঠাব। তুই কত টাকা একসাথে হাতে পেয়েছিস এই পর্যন্ত? উম... চার হাজার। আচ্ছা, আমি এমন পরিমাণ টাকা দিব যাতে তোর অনেক টাকা মনে হয়। তুই এই টাকা তিন ভাগে ভাগ করবি। একভাগ ফ্রেন্ডদের সাথে ফাস্ট ফুডে গিয়ে উড়াবি আর তোর শখের জিনিস কিনবি। একভাগ দিয়ে বই কিনবি। আর একভাগ চ্যারিটি করবি। চ্যারিটি জাস্ট হাতে টাকা ধরায় দিলেই হবে না। লং টার্ম কাজে লাগে এরকম জায়গায় চ্যারিটি করতে হবে। তারপর পুরা টাকা শেষ হলে আমাকে বলবি কোনভাবে টাকা খরচ করে তোর সবচেয়ে ভাল্লাগসে।
কী দরকার? আমি টাকাটা রেখে দেই, একটা কোর্স করব ঐ টাকা দিয়ে!
তার মানে আল্লাহ তোকে অর্থ দিয়ে পরীক্ষা করল, আর তুই পুরাটা নিজের ভবিষ্যতের জন্য হাপিশ করে দিলি? কঞ্জুস! স্বার্থপর!
ইয়ে! আচ্ছা ঠিক আছে, দিস টাকা, চিন্তা করে দেখি কী করা যায়।
হ্যা, আর আল্লাহ যে তোকে সময় দিয়ে পরীক্ষা করতেসে তার কী? পুরা টাইমটা নিজের ফিউচারের জন্য খরচ করতেসিস? নাইলে টিভি দেখতেসিস? চ্যারিটি অব মানি বুঝিস, চ্যারিটি অব টাইম বুঝিস না? ঘরের কাজ কর, আব্বা আম্মার সাথে সময় কাটা, নেট এ বসলে এডুকেশনাল ভিডিও কী পাওয়া যায় খুঁজে বের কর, ঐগুলি অনুবাদ করে বাংলায় ভয়েস দিয়ে ডিভিডি বানাবি। স্কুলে স্কুলে পাঠানোর ব্যবস্থা করতে হবে। নানু কে ফোন করে জিজ্ঞাসা কর ঢাকা থেকে কী কী পাঠাতে হবে। আমার এক ফ্রেন্ড এর বেবি হবে, ওকে গিফট কিনে দিয়ে আসবি।
ধ্যুৎ! এত কাজ করতে বলিস, ভাল্লাগেনা!
আমি হাসলাম। আমার কাজ এ পর্যন্তই।
Saturday, July 2, 2011
শিরোনামের প্রয়োজন নেই (শেষ)
প্রতীতির পড়ার ঘর। স্নিগ্ধার ঘরের চেয়ে কম অগোছালো না। জানে, মা এসে চিৎকার জুড়ে দেবে, কিন্তু মাকে ঠান্ডা করার উপায় ওর জানা আছে। এই যে মা ঢুকল, মুখ নরমাল, এ..ই যে খাটের দিকে তাকাল, মুখের এক্সপ্রেশন চেঞ্জ... অ্যাকশন!
'মা! থ্যাংকিউ! তোমার চায়ের গল্পটা খুব কাজে দিয়েছে।' মার চোখ ঘুরে গেল মেয়ের দিকে, চোখে উৎসাহ, তাই? বলেছিস? 'হ্যা মা! দাড়ি কমা সহ।' পাপিয়া স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললেন, যাক, তোর বাবার অকাজের তাহলে ভাল দিক ও আছে। কী বলল স্নিগ্ধা? 'তেমন কিছু বলেনি মা, তবে চোখে আগ্রহ দেখলাম' তুই ত ওকে আস্তে আস্তে কুরআন পড়ার কথা বলতে পারিস। এবার বিরক্ত হল প্রতীতি, 'মা! আমার কাজ কি ওকে কুরআন পাতার পর পাতা বসে পড়ানো, না কুরআনের সাথে পরিচয় করিয়ে দেয়া? ওর সমস্যার সমাধান খুঁজে পেলে ও নিজে থেকেই আগ্রহ নিয়ে পড়বে। আমার পড়াতে হবেনা।' একটু দমে যান পাপিয়া, তবে মেয়েকে বুঝতে দেন না। 'তা অবশ্য ঠিক বলেছিস, তুই তাহলে ওর সাথে গল্পের মত করেই বলিস।'
- বাবা কই মা?
- রুমে, খেয়ে দেয়ে পেপার পড়তে পড়তে পা দুলাচ্ছে।
- আজকে ঘরের কাজ করেছে কোন?
- হুম, বাটিগুলি টেবিল থেকে সরিয়ে রান্নাঘরে নিয়ে গেছে।
- ইস মা, কবে যে বাবা মানুষ হবে! তোমার খুব কষ্ট হয়ে যাচ্ছে। অফিস করে রান্না বান্না, ঘর গুছানো..
- নাহ! কষ্ট হলে ত বুয়াই রেখে দিতাম। তুই ত জানিস, আমি বুয়া বিদায় করেছি, শুধুমাত্র যাতে কাজের ছুতায় আমাদের সবার আরো বেশি কথাবার্তা হয় - এই জন্য। এই যে কাজের অজুহাতে যখন তখন তোদের টিভি, কম্পিউটার থেকে উঠাতে পারি.. এইটাই বা কম কী? আর সবই ত সওয়াব, না রে? আর তোর বাবা এখন পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ রেগুলারলি পড়ছে, এর চেয়ে বেশি আর কী চাই বল?
- হুম....
- যাকগে! তুই ঘুমা। বিছানার জঞ্জাল পরিষ্কার করে ঘুমাবি। সকাল বেলা আমি যেন এগুলি না দেখি!
প্রতীতি একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে, এত প্ল্যান, কোন কাজেই লাগলনা। ঘরের কাজে মাকে ফাঁকি দেয়া ভারি কঠিন।
অন্য রুম -
- কী, মেয়ের সাথে আবার কী নতুন প্ল্যান আঁটলে?
- মেয়ে খুব চিন্তায় আছে স্নিগ্ধাকে নিয়ে।
- স্নিগ্ধা? ও! পাশের বাসার মেয়েটা? ওর সাথে এখনো যোগাযোগ রাখছে?
- হ্যা, ক্লাশ, ঘরের কাজ সব কিছুর মধ্যেও ঠিকই সময় বের করে ওকে নিয়ে বের হয়।
- ভাল ভাল। এই বয়সটাতে মানুষকে সাহায্য করার অভ্যাসটা করালে আখেরে ভাল হবে।
- হ্যাঁ, মেয়ে ত মাঝে মধ্যে হতাশ হয়ে ফিরে, বলে স্নিগ্ধাকে দেখলে মনে হয় ড্রাকুলা সব রক্ত চুষে নিয়ে গেছে। কথা বলেনা, কোন ব্যাপারে ওপিনিয়ন দেয়না... কোথাও গেলে একশবার মানুষের মুখের দিকে তাকায় কে ওকে দেখছে..
- লেগে থাকতে বল। ওর নিজের জীবনেও এরকম কত হতাশা আসবে, তখন এই মেয়েকে কীভাবে ঠিক করেছিল মনে পড়লে শক্তি পাবে।
- দেখতে দেখতে বড়ই হয়ে গেল, না? আর ক'দিন পর পরের ঘরে চলে যাবে।
- পরের ঘর বলছ কেন? বল মেয়ের নিজের ঘর হবে। আর তোমার মেয়ে কি যেমন তেমন? যে ঘরে যাবে ঘর আলো করে রাখবে।
- হুঁহ! ঘরের কাজ দেখলে ত মনে হয়না আমার মেয়ে। তখন পুরোই তোমার মেয়ে।
- আচ্ছা আচ্ছা ঠিক আছে। কালকে বাটি ধুয়ে রাখব যাও। (পুনরায় পেপারে মনোনিবেশ)
এ গল্পটার এখানেই ইতি। প্রতীতি স্নিগ্ধাকে কতটুকু বদলাতে পারল সেটা অনেক কিছুর উপর নির্ভর করে। প্রতীতির লেগে থাকার উদ্যম, প্রতীতির বাবা মায়ের উৎসাহ, প্রতীতির বলতে পারার ক্ষমতা.. স্নিগ্ধার গ্রহণ করার ক্ষমতা, সর্বোপরি আল্লাহর পক্ষ থেকে গাইডেন্স - এর সবকিছুর সঠিক সমন্বয়ে গল্পটি খুব সুন্দর পরিণতি নিতে পারে। আবার প্রতীতি হাল ছেড়ে দিলে স্নিগ্ধা নিজ তাগিদেও ঘুরে দাঁড়াতে পারে, জীবনের প্রয়োজনে নিজেই খুঁজে বের করতে পারে সর্বোত্তম জীবন ব্যবস্থা, সরলতম পন্থা। এই গল্পের মূল চরিত্র স্নিগ্ধা নয়, প্রতীতিও নয়। প্রতীতির বাবা মা, তাদের দূরদর্শিতা, তাদের আত্মত্যাগ। আসুন আমরা অঙ্গিকার করি আমাদের সন্তানকে তাদের অধিকার থেকে একটুকু বিচ্যুত করবনা। সন্তানের ভবিষ্যৎকে আমাদের নিজেদের স্বার্থের জন্য সস্তাদরে বিকিয়ে দেবনা।
'মা! থ্যাংকিউ! তোমার চায়ের গল্পটা খুব কাজে দিয়েছে।' মার চোখ ঘুরে গেল মেয়ের দিকে, চোখে উৎসাহ, তাই? বলেছিস? 'হ্যা মা! দাড়ি কমা সহ।' পাপিয়া স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললেন, যাক, তোর বাবার অকাজের তাহলে ভাল দিক ও আছে। কী বলল স্নিগ্ধা? 'তেমন কিছু বলেনি মা, তবে চোখে আগ্রহ দেখলাম' তুই ত ওকে আস্তে আস্তে কুরআন পড়ার কথা বলতে পারিস। এবার বিরক্ত হল প্রতীতি, 'মা! আমার কাজ কি ওকে কুরআন পাতার পর পাতা বসে পড়ানো, না কুরআনের সাথে পরিচয় করিয়ে দেয়া? ওর সমস্যার সমাধান খুঁজে পেলে ও নিজে থেকেই আগ্রহ নিয়ে পড়বে। আমার পড়াতে হবেনা।' একটু দমে যান পাপিয়া, তবে মেয়েকে বুঝতে দেন না। 'তা অবশ্য ঠিক বলেছিস, তুই তাহলে ওর সাথে গল্পের মত করেই বলিস।'
- বাবা কই মা?
- রুমে, খেয়ে দেয়ে পেপার পড়তে পড়তে পা দুলাচ্ছে।
- আজকে ঘরের কাজ করেছে কোন?
- হুম, বাটিগুলি টেবিল থেকে সরিয়ে রান্নাঘরে নিয়ে গেছে।
- ইস মা, কবে যে বাবা মানুষ হবে! তোমার খুব কষ্ট হয়ে যাচ্ছে। অফিস করে রান্না বান্না, ঘর গুছানো..
- নাহ! কষ্ট হলে ত বুয়াই রেখে দিতাম। তুই ত জানিস, আমি বুয়া বিদায় করেছি, শুধুমাত্র যাতে কাজের ছুতায় আমাদের সবার আরো বেশি কথাবার্তা হয় - এই জন্য। এই যে কাজের অজুহাতে যখন তখন তোদের টিভি, কম্পিউটার থেকে উঠাতে পারি.. এইটাই বা কম কী? আর সবই ত সওয়াব, না রে? আর তোর বাবা এখন পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ রেগুলারলি পড়ছে, এর চেয়ে বেশি আর কী চাই বল?
- হুম....
- যাকগে! তুই ঘুমা। বিছানার জঞ্জাল পরিষ্কার করে ঘুমাবি। সকাল বেলা আমি যেন এগুলি না দেখি!
প্রতীতি একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে, এত প্ল্যান, কোন কাজেই লাগলনা। ঘরের কাজে মাকে ফাঁকি দেয়া ভারি কঠিন।
অন্য রুম -
- কী, মেয়ের সাথে আবার কী নতুন প্ল্যান আঁটলে?
- মেয়ে খুব চিন্তায় আছে স্নিগ্ধাকে নিয়ে।
- স্নিগ্ধা? ও! পাশের বাসার মেয়েটা? ওর সাথে এখনো যোগাযোগ রাখছে?
- হ্যা, ক্লাশ, ঘরের কাজ সব কিছুর মধ্যেও ঠিকই সময় বের করে ওকে নিয়ে বের হয়।
- ভাল ভাল। এই বয়সটাতে মানুষকে সাহায্য করার অভ্যাসটা করালে আখেরে ভাল হবে।
- হ্যাঁ, মেয়ে ত মাঝে মধ্যে হতাশ হয়ে ফিরে, বলে স্নিগ্ধাকে দেখলে মনে হয় ড্রাকুলা সব রক্ত চুষে নিয়ে গেছে। কথা বলেনা, কোন ব্যাপারে ওপিনিয়ন দেয়না... কোথাও গেলে একশবার মানুষের মুখের দিকে তাকায় কে ওকে দেখছে..
- লেগে থাকতে বল। ওর নিজের জীবনেও এরকম কত হতাশা আসবে, তখন এই মেয়েকে কীভাবে ঠিক করেছিল মনে পড়লে শক্তি পাবে।
- দেখতে দেখতে বড়ই হয়ে গেল, না? আর ক'দিন পর পরের ঘরে চলে যাবে।
- পরের ঘর বলছ কেন? বল মেয়ের নিজের ঘর হবে। আর তোমার মেয়ে কি যেমন তেমন? যে ঘরে যাবে ঘর আলো করে রাখবে।
- হুঁহ! ঘরের কাজ দেখলে ত মনে হয়না আমার মেয়ে। তখন পুরোই তোমার মেয়ে।
- আচ্ছা আচ্ছা ঠিক আছে। কালকে বাটি ধুয়ে রাখব যাও। (পুনরায় পেপারে মনোনিবেশ)
এ গল্পটার এখানেই ইতি। প্রতীতি স্নিগ্ধাকে কতটুকু বদলাতে পারল সেটা অনেক কিছুর উপর নির্ভর করে। প্রতীতির লেগে থাকার উদ্যম, প্রতীতির বাবা মায়ের উৎসাহ, প্রতীতির বলতে পারার ক্ষমতা.. স্নিগ্ধার গ্রহণ করার ক্ষমতা, সর্বোপরি আল্লাহর পক্ষ থেকে গাইডেন্স - এর সবকিছুর সঠিক সমন্বয়ে গল্পটি খুব সুন্দর পরিণতি নিতে পারে। আবার প্রতীতি হাল ছেড়ে দিলে স্নিগ্ধা নিজ তাগিদেও ঘুরে দাঁড়াতে পারে, জীবনের প্রয়োজনে নিজেই খুঁজে বের করতে পারে সর্বোত্তম জীবন ব্যবস্থা, সরলতম পন্থা। এই গল্পের মূল চরিত্র স্নিগ্ধা নয়, প্রতীতিও নয়। প্রতীতির বাবা মা, তাদের দূরদর্শিতা, তাদের আত্মত্যাগ। আসুন আমরা অঙ্গিকার করি আমাদের সন্তানকে তাদের অধিকার থেকে একটুকু বিচ্যুত করবনা। সন্তানের ভবিষ্যৎকে আমাদের নিজেদের স্বার্থের জন্য সস্তাদরে বিকিয়ে দেবনা।
শিরোনামের প্রয়োজন নেই - ৩
লিফটে পাশের ফ্ল্যাটের এক বড় আপুর সাথে স্নিগ্ধার প্রায়ই দেখা হয়। আপুটা একটু কেমন জানি। হুট করে একদিন ডেকে বলে, এই, আমি ফুচকা খেতে যাচ্ছি, যাবে আমার সাথে? এই সামনেই। কি মনে করে জানি রাজি হয়ে যায়। ফুটপাথের ওপর বিছানো টিনের বেঞ্চে বসে আপন মনে বকবক করতেই থাকে মেয়েটা, কথার মাঝখানেই বলে, আমার এত বড় নাম 'প্রতীতি' বলে ডাকার দরকার নাই। আর আমি ত মোটে দুই বছরের বড়, দুই বছর পর ত তুমি আমার সমানই হয়ে যাবে, তুমি বরং আমাকে পৃতিপু বলে ডেক। আর আপনি ফাপনি বলার দরকার নাই। আমি মোটে ইউনিভার্সিটিতে ভর্তি হলাম। আমাকে কেউ আপনি বলেনা। ওর কথার ধরণ শুনে স্নিগ্ধার খুব হাসি পায়, ওকে দেখে যেন মনে হয় পৃথিবীর কোন কিছু নিয়েই পৃতিপুর কোন টেনশন নেই। একটু মনোযোগ দিয়ে শোনার চেষ্টা করে আপু কী বলছে, এই দেখ, এই যে কৃষ্ণচূড়া গাছগুলি না, এর ফুলগুলির পাপড়ি গুলি কিন্তু চারটা হুবহু একরকম, একটা অন্যরকম, বড়, হলুদ। কুঁড়ি থাকতে আমি একবার পাপড়ি খুলে দেখেছিলাম, বড়টা বাকি চারটাকে ঢেকে রাখে। একবার একটা বিড়ালকেও দেখি চারটা বাচ্চাকে জড়ায় গোল করে ঘুমাচ্ছে। স্নিগ্ধার কানে অর্ধেক কথা ঢোকে, বাকিটা সময় সে আপুকে ভাল করে লক্ষ্য করে। উনার কি একেবারেই চিন্তা নেই মানুষজন কীভাবে তাকাচ্ছে, বা এরকম পোশাকে তাকে কেমন দেখাচ্ছে? আপুকে সে সবসময় এরকমই দেখে আসছে। বলি বলি করে বলেই ফেলল, পৃতিপু, তুমি ফ্রেন্ডদের সাথে বের হওনা? হবনা কেন? এইমাত্র এক ফ্রেন্ডের দাওয়াত থেকে আসলাম, বুঝলি, ব্যাটন রুজে মনে হয় ড্রেস কোড আছে, আমাকে যে কী লাগতেসিল, হি হি... সম্বোধনটা তুই এ নেমে এসেছে খেয়াল করলেও খুব স্বাভাবিকই লাগে স্নিগ্ধার। হঠাৎ করে ওর মনটা ভাল হয়ে যায়।
এরপর থেকে দুই সপ্তাহ পরপরই পৃতিপু একবার স্নিগ্ধার খোঁজে বাসায় হানা দিয়ে যায়। পড়ায় ব্যস্ত, জোর করে টেনে হিঁচড়ে বইয়ের দোকানে নিয়ে যাবে, নাহয় টংএর দোকানে বসে চা খাবে, সবসময় স্নিগ্ধার যেতেও ইচ্ছা করেনা, যেতে না চাইলে ও খুব শীতল হয়ে যায়, এই পদ্ধতি সে অনেকবার বাবা মায়ের উপর প্রয়োগ করেছে। কিন্তু প্রতীতি যেন কোন কিছুই গায়ে মাখবেনা। ওঠ, ওঠ... তোর কী পড়া, দে আমি বুঝিয়ে দেই। এক ঘন্টার জন্য চল, এক ঘন্টার মধ্যে ফেরত আসব, প্রমিজ। রুম থেকে তাকে বের করবেই। মনটা যখন ভয়ানক খারাপ থাকে স্নিগ্ধা প্রায় পুরোটা সময় মৃত মানুষের মত হয়ে থাকে, কিন্তু প্রতীতি বকবক করেই যায়।
একদিন প্রতীতি ওকে বলে, জানিস, আব্বু আজকে চা ভাল হয় নাই দেখে ছুড়ে কাপ ভেঙে ফেলসে, আমাদের ত বুয়া নাই, আম্মু অফিস থেকে এসে রেস্ট ও নিতে পারে নাই, তাড়াহুড়ায় চা বানায় দিসে.. স্নিগ্ধার চকিতে এমন অনেক ঘটনাই মনে পড়ে যায়। ও চুপ করে থাকে। প্রতীতি আবার বলে, আব্বুর জন্য খুব মায়া লাগসে আমার। স্নিগ্ধা অবাক হয়ে যায়, 'আব্বুর জন্য? কেন?' ত লাগবে না? এত বড় মানুষটা কীরকম দুর্বল.. 'দুর্বল? মানে কী?' প্রতীতি তখন বোঝায়, দ্যাখ, আম্মু কী না করে আমাদের সবার জন্য, আব্বু এই যে রাগ দেখাল, আম্মুর এখন মনে হবে না, এত কষ্টের মূল্যায়ন এই? তখন তার মনটা খারাপ হবে না? এর চেয়ে যদি রাগটা কে কন্ট্রোল করত, আর বলত, তুমি পাতিলটা ধুয়ে দাও, আমি আরেকবার চা বসাই, আজকে ভাল চা খেতে ইচ্ছা করছে, আম্মু সুন্দর হাসিমুখে আবার চা বানায় দিত। যে মানুষ ফল ভাল হবে জেনেও দুই মিনিটের জন্য নিজেকে কন্ট্রোল করতে পারেনা তাকে দুর্বল বলব না ত কী? স্নিগ্ধা খুব মজা পেল শুনে। তাই ত! ওর বাবার রাগের মাথায় চেঁচামেচি দেখে তাহলে ভয় পাওয়ার কিছু নেই, করুণা করা উচিৎ? এভাবে দেখলে কিন্তু আবার কেমন জানি বিতৃষ্ণা ব্যাপারটাও আসেনা।
কিন্তু আম্মু? স্নিগ্ধা সন্তর্পণে জানতে চায়, আন্টি খুব আপসেট, তাই না? আংকেল শুধু শুধু এমন করল? প্রতীতি হেসে বলে, 'না রে, আমার আম্মু মানুষটা অনেক সেনসিটিভ হলেও আব্বুর সাথে কখনও ইয়ে হয়না। স্নিগ্ধা হতবাক। মানে? কেন? কারণ আম্মু সবসময় বলে সংসারে মেয়েদের ক্ষমতা কতখানি এটা মেয়েরা বোঝেনা। একটা ছেলে ঘরে কমফোর্ট আর একটু সুপেরিয়রিটি ছাড়া কিন্তু আর কিছু চায়না। তুই যদি আপাতদৃষ্টিতে একটু ঝাড়ি বা রাগ হজম করিস, আর একটু যত্ন করিস, তোকে মাথায় তুলে রাখবে। তুই বছরের পর বছর ঝগড়া করেও যেটা আদায় করতে পারবিনা, রাগ হজম করলে অনেক সহজে পেরে যাবি। কারণ হঠাৎ অযৌক্তিক রাগ করে ফেলার পর একটা অপরাধবোধ হয়, তাইনা? তখন যদি পার্টনারের কাছে ডিফেন্ড করতে না হয়, উল্টো আরো কেয়ার পায়, তখন আপনি মনটা অনেক ঝুঁকে যাবে। চাই কি প্রায়শ্চিত্ত করতে একটু বাড়তি খাতিরও করতে পারে কয়েক দিন।
স্নিগ্ধার তাও ভাল লাগলনা। বলল, তা না হয় বুঝলাম, কিন্তু তাই বলে আংকেল এরকম যখন ইচ্ছা করবে, আর আন্টি সহ্য করবে? প্রতীতি বলে, নাহ! বললাম না, আম্মু অনেক সেনসিটিভ। আমি শিওর তিন চার দিন পর আব্বু কে চা দেয়ার সময় আম্মু আমাকে বলবে, 'এ্যাই পৃতু, এইদিক এসে দাঁড়া ত! ক্যাচ ধরিস, তোর বাবাকে চা দিচ্ছি।' ব্যাস! সাপও মরল, লাঠিও ভাঙল না। স্নিগ্ধা হেসে ফেলল, আন্টির ত খুব বুদ্ধি তাহলে! প্রতীতি বলে, আম্মু এসব মহানবীর জীবন থেকে শিখেছে। আমাদের মহানবী কে উমর একবার কড়া কড়া কথা বলেছিল, সব সাহাবীদের সামনে। ঐটা খুবই ক্রুশিয়াল টাইম ছিল মুসলিমদের এক হয়ে থাকার জন্য। কিন্তু মহানবী উমর কে কিছু বলেন নি। পরে উমর ভুল বুঝতে পেরে লজ্জায়, ভয়ে শেষ, উনার কাছে গিয়ে সালাম দিতে মহানবী সুন্দর উনার সাথে নরমাল কথাবার্তা বললেন, যেন কিছুই হয় নি। আরেকবার আয়িশা উনার সাথে গলা উঁচায় কথা বলছিল, এই দেখে আয়িশার বাবা আবু বকর আয়িশাকে মারতে যায়। তখন মহানবী ঠেকায়, আর হেসে আয়িশা কে বলে, দেখলে ত, মিয়া সাহেবের থেকে তোমাকে কেমন করে বাঁচালাম? আমার আব্বু আম্মুও আর দশটা কাপলের মত ছিল। আমার বড় ফুফু উনাদের কুরআন হাদীসের সাথে পরিচয় করিয়ে দেন। এই যে আব্বা রাগ দেখাল, আমি নিশ্চিত জানি আব্বা দুই রাকআত নফল পড়ে এই কাজের জন্য মাফ চাবে।
স্নিগ্ধা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে। প্রতীতি সবই লক্ষ্য করে, কিছু বলে না। মনে মনে প্রার্থনা করে, আল্লাহ, তুমি এই মেয়েটিকে রক্ষা কর। ওর মাধ্যমে তুমি ওর বাবা মাকে সঠিক পথে ফেরাও।
এরপর থেকে দুই সপ্তাহ পরপরই পৃতিপু একবার স্নিগ্ধার খোঁজে বাসায় হানা দিয়ে যায়। পড়ায় ব্যস্ত, জোর করে টেনে হিঁচড়ে বইয়ের দোকানে নিয়ে যাবে, নাহয় টংএর দোকানে বসে চা খাবে, সবসময় স্নিগ্ধার যেতেও ইচ্ছা করেনা, যেতে না চাইলে ও খুব শীতল হয়ে যায়, এই পদ্ধতি সে অনেকবার বাবা মায়ের উপর প্রয়োগ করেছে। কিন্তু প্রতীতি যেন কোন কিছুই গায়ে মাখবেনা। ওঠ, ওঠ... তোর কী পড়া, দে আমি বুঝিয়ে দেই। এক ঘন্টার জন্য চল, এক ঘন্টার মধ্যে ফেরত আসব, প্রমিজ। রুম থেকে তাকে বের করবেই। মনটা যখন ভয়ানক খারাপ থাকে স্নিগ্ধা প্রায় পুরোটা সময় মৃত মানুষের মত হয়ে থাকে, কিন্তু প্রতীতি বকবক করেই যায়।
একদিন প্রতীতি ওকে বলে, জানিস, আব্বু আজকে চা ভাল হয় নাই দেখে ছুড়ে কাপ ভেঙে ফেলসে, আমাদের ত বুয়া নাই, আম্মু অফিস থেকে এসে রেস্ট ও নিতে পারে নাই, তাড়াহুড়ায় চা বানায় দিসে.. স্নিগ্ধার চকিতে এমন অনেক ঘটনাই মনে পড়ে যায়। ও চুপ করে থাকে। প্রতীতি আবার বলে, আব্বুর জন্য খুব মায়া লাগসে আমার। স্নিগ্ধা অবাক হয়ে যায়, 'আব্বুর জন্য? কেন?' ত লাগবে না? এত বড় মানুষটা কীরকম দুর্বল.. 'দুর্বল? মানে কী?' প্রতীতি তখন বোঝায়, দ্যাখ, আম্মু কী না করে আমাদের সবার জন্য, আব্বু এই যে রাগ দেখাল, আম্মুর এখন মনে হবে না, এত কষ্টের মূল্যায়ন এই? তখন তার মনটা খারাপ হবে না? এর চেয়ে যদি রাগটা কে কন্ট্রোল করত, আর বলত, তুমি পাতিলটা ধুয়ে দাও, আমি আরেকবার চা বসাই, আজকে ভাল চা খেতে ইচ্ছা করছে, আম্মু সুন্দর হাসিমুখে আবার চা বানায় দিত। যে মানুষ ফল ভাল হবে জেনেও দুই মিনিটের জন্য নিজেকে কন্ট্রোল করতে পারেনা তাকে দুর্বল বলব না ত কী? স্নিগ্ধা খুব মজা পেল শুনে। তাই ত! ওর বাবার রাগের মাথায় চেঁচামেচি দেখে তাহলে ভয় পাওয়ার কিছু নেই, করুণা করা উচিৎ? এভাবে দেখলে কিন্তু আবার কেমন জানি বিতৃষ্ণা ব্যাপারটাও আসেনা।
কিন্তু আম্মু? স্নিগ্ধা সন্তর্পণে জানতে চায়, আন্টি খুব আপসেট, তাই না? আংকেল শুধু শুধু এমন করল? প্রতীতি হেসে বলে, 'না রে, আমার আম্মু মানুষটা অনেক সেনসিটিভ হলেও আব্বুর সাথে কখনও ইয়ে হয়না। স্নিগ্ধা হতবাক। মানে? কেন? কারণ আম্মু সবসময় বলে সংসারে মেয়েদের ক্ষমতা কতখানি এটা মেয়েরা বোঝেনা। একটা ছেলে ঘরে কমফোর্ট আর একটু সুপেরিয়রিটি ছাড়া কিন্তু আর কিছু চায়না। তুই যদি আপাতদৃষ্টিতে একটু ঝাড়ি বা রাগ হজম করিস, আর একটু যত্ন করিস, তোকে মাথায় তুলে রাখবে। তুই বছরের পর বছর ঝগড়া করেও যেটা আদায় করতে পারবিনা, রাগ হজম করলে অনেক সহজে পেরে যাবি। কারণ হঠাৎ অযৌক্তিক রাগ করে ফেলার পর একটা অপরাধবোধ হয়, তাইনা? তখন যদি পার্টনারের কাছে ডিফেন্ড করতে না হয়, উল্টো আরো কেয়ার পায়, তখন আপনি মনটা অনেক ঝুঁকে যাবে। চাই কি প্রায়শ্চিত্ত করতে একটু বাড়তি খাতিরও করতে পারে কয়েক দিন।
স্নিগ্ধার তাও ভাল লাগলনা। বলল, তা না হয় বুঝলাম, কিন্তু তাই বলে আংকেল এরকম যখন ইচ্ছা করবে, আর আন্টি সহ্য করবে? প্রতীতি বলে, নাহ! বললাম না, আম্মু অনেক সেনসিটিভ। আমি শিওর তিন চার দিন পর আব্বু কে চা দেয়ার সময় আম্মু আমাকে বলবে, 'এ্যাই পৃতু, এইদিক এসে দাঁড়া ত! ক্যাচ ধরিস, তোর বাবাকে চা দিচ্ছি।' ব্যাস! সাপও মরল, লাঠিও ভাঙল না। স্নিগ্ধা হেসে ফেলল, আন্টির ত খুব বুদ্ধি তাহলে! প্রতীতি বলে, আম্মু এসব মহানবীর জীবন থেকে শিখেছে। আমাদের মহানবী কে উমর একবার কড়া কড়া কথা বলেছিল, সব সাহাবীদের সামনে। ঐটা খুবই ক্রুশিয়াল টাইম ছিল মুসলিমদের এক হয়ে থাকার জন্য। কিন্তু মহানবী উমর কে কিছু বলেন নি। পরে উমর ভুল বুঝতে পেরে লজ্জায়, ভয়ে শেষ, উনার কাছে গিয়ে সালাম দিতে মহানবী সুন্দর উনার সাথে নরমাল কথাবার্তা বললেন, যেন কিছুই হয় নি। আরেকবার আয়িশা উনার সাথে গলা উঁচায় কথা বলছিল, এই দেখে আয়িশার বাবা আবু বকর আয়িশাকে মারতে যায়। তখন মহানবী ঠেকায়, আর হেসে আয়িশা কে বলে, দেখলে ত, মিয়া সাহেবের থেকে তোমাকে কেমন করে বাঁচালাম? আমার আব্বু আম্মুও আর দশটা কাপলের মত ছিল। আমার বড় ফুফু উনাদের কুরআন হাদীসের সাথে পরিচয় করিয়ে দেন। এই যে আব্বা রাগ দেখাল, আমি নিশ্চিত জানি আব্বা দুই রাকআত নফল পড়ে এই কাজের জন্য মাফ চাবে।
স্নিগ্ধা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে। প্রতীতি সবই লক্ষ্য করে, কিছু বলে না। মনে মনে প্রার্থনা করে, আল্লাহ, তুমি এই মেয়েটিকে রক্ষা কর। ওর মাধ্যমে তুমি ওর বাবা মাকে সঠিক পথে ফেরাও।
শিরোনামের প্রয়োজন নেই - ২
স্নিগ্ধার দিনগুলো সবচেয়ে করুণ হয় যখন কোন উৎসব আসে। প্রায় নেই হয়ে যাওয়া রিলেটিভদের সাথে যখন দেখা হয়, ওর ঘরের মানুষগুলোর বিভাজন যেন ওর ভেতরটা এতটুকু করে ফেলে। খুব রাগ হয় মা'র উপর, বাবার উপর। কেন পৃথিবীতে আনলে আমাকে? কেন এই উৎকট অস্বস্তিকর পারিবারিক গেট টুগেদারে আমাকে সং বানানোর খেলা খেলবে? কোন প্রোগ্রামে যেতে ওর ইচ্ছে হয়না। কিন্তু না গেলে যে আরো কতগুলো তীর্যক মন্তব্য আর অসংলগ্ন উপদেশ সইতে হবে!
বাবা মায়ের উপর রাগ হয়, আবার মায়াও লাগে খুব। এই মানুষগুলোর মত দুঃখী আর ক'জন আছে? সবচেয়ে কাছের যে সম্পর্কটা থেকে ওরা নির্ভরতা পেতে পারত, সেটা বদলে গেছে ইগো রক্ষার যুদ্ধে। ওদের আর আমি ছাড়া কী আছে? তাই ত আমার এতটুকু স্খলন ওরা সইতে পারেনা। উন্মত্তের মত একে অপরকে দোষারোপ করতে থাকে। আমি যদি কষ্ট দেই এরা যাবে কোথায়? এক আমাকে নিয়েই ত ওদের যা কিছু স্বপ্ন, যা কিছু বেঁচে থাকার অবলম্বন! এসব ভেবে অনেকবার আত্মহত্যা করতে গিয়েও পারেনা সে। সাহসও বোধ করি হয়না অতটা। মৃত্যু কেমন হয়? আমি মরে গেলে কি আব্বু আম্মু কাঁদবে? কতটুকু কাঁদবে? আহ্, আমাকে জড়িয়ে ধরে খুব কাঁদবে, তাই না? ইস, আমি যদি ওদের পাগল পাগল কান্না দেখতে পেতাম!
স্নিগ্ধার ইচ্ছে হয় সব কিছু ফেলে অনেক দূরে পালিয়ে যেতে। নিজের মত থাকবে, কাউকে নিয়ে ভাবতে হবেনা.. কিন্তু আব্বু আম্মুকে যে বড় ভালবাসে ও। কত রাত চুপিচুপি দোয়া করেছে বাবা মার সব যেন ঠিক হয়ে যায়। ঠিক একটা মুভির মত যেন ওরা খুব খুব সুখে থাকে। একা একাই ফ্যান্টাসি গড়ে স্নিগ্ধা। কখনো ওর মরে যাওয়ার, কখনো বাবা মায়ের খুনসুটির, কখনো নিজের কথাও ভাবে সে। প্রিন্স চার্মিং,
আমার প্রিন্সও ঠিক এমন করেই আমাকে কষ্ট দেবে, তাই না? আচ্ছা, আব্বু কি কখনো আম্মুর প্রিন্স চার্মিং ছিল? ধ্যাৎ, কী সব ভাবছি!
স্নিগ্ধা কলেজ, কোচিংএর বাইরের পৃথিবীটাতে খুব নাজুক, ও জানেই না কী করে অচেনা মানুষের সাথে কথা বলতে হয়, কী করে সমস্যা সমাধান করতে হয়, বা সিদ্ধান্ত নিতে হয়। ওকে ত কেউ শেখায়নি! তবে হ্যা, এই গুণগুলো না থাকার কারণে ভর্ৎসনা পেয়ে ফেলেছে বেশ কয়েকবার, নিজের ভেতরে গুটাতে গুটাতে ছোট্ট একটা বিন্দু হয়ে যেতে পারত যদি সে! ভয়ই করে তার, কী করে মানুষের চাওয়া পূরণ করবে সে? কখনো কি পেরেছে? এইটুকু বয়সে কত বড় বড় কথা চিন্তা করে স্নিগ্ধা। আচ্ছা, অন্যরা কেন চিন্তা করে না? বাবা মা, শিক্ষক - এরা ত আমার অনেক বড়! ওরা কেন এত অন্ধ?
টিভির প্রোগ্রাম মন ভাল করতে পারেনা। কী সব আজগুবি ফান এদের। গল্পের বই পড়তে বেশ লাগে, ফ্যান্টাসি গুলো বেশ বাধন ছাড়া হয়! এক আধজন বন্ধু বান্ধব আছে, কিন্তু কেমন যেন হাঁপ ধরে যাওয়া আলোচনা এদের। স্নিগ্ধার নিজের মনের জগতে সে একা থেকেই অভ্যস্ত হয়ে পড়েছে। খুব বেশি ভালবাসা পেতে তার অস্বস্তি লাগে। বিষন্নতা, একা থাকা - এটা তার অনেক দিনের সঙ্গী। বোধকরি জীবনসঙ্গীর থেকে উদাসীনতা পেলেই তার স্বাভাবিক মনে হবে।
পাঠক, বলতে পারেন, স্নিগ্ধা আর চার বছর পরে বিয়ে করে নিজের সংসারে গিয়ে কী করবে? আবেগ, অভিমান, হতাশা, অপরিপক্কতা, অদূরদর্শিতা, জীবনের সব কিছুর প্রতি বিতৃষ্ণা ওকে কেমন জীবন সঙ্গী হিসেবে গড়ে তুলবে? একজন মা হিসেবে সে কেমন হবে? চাকরির কথা নাহয় বাদই দিলাম। এই মেয়েটা যদি ভারসাম্য করে চলতে না পারে, তার পরিবারেও কি তবে তার বাবা মায়ের গল্পেরই পুনরাবৃত্তি হবে? এর শেষ কবে, কোথায়?
বাবা মায়ের উপর রাগ হয়, আবার মায়াও লাগে খুব। এই মানুষগুলোর মত দুঃখী আর ক'জন আছে? সবচেয়ে কাছের যে সম্পর্কটা থেকে ওরা নির্ভরতা পেতে পারত, সেটা বদলে গেছে ইগো রক্ষার যুদ্ধে। ওদের আর আমি ছাড়া কী আছে? তাই ত আমার এতটুকু স্খলন ওরা সইতে পারেনা। উন্মত্তের মত একে অপরকে দোষারোপ করতে থাকে। আমি যদি কষ্ট দেই এরা যাবে কোথায়? এক আমাকে নিয়েই ত ওদের যা কিছু স্বপ্ন, যা কিছু বেঁচে থাকার অবলম্বন! এসব ভেবে অনেকবার আত্মহত্যা করতে গিয়েও পারেনা সে। সাহসও বোধ করি হয়না অতটা। মৃত্যু কেমন হয়? আমি মরে গেলে কি আব্বু আম্মু কাঁদবে? কতটুকু কাঁদবে? আহ্, আমাকে জড়িয়ে ধরে খুব কাঁদবে, তাই না? ইস, আমি যদি ওদের পাগল পাগল কান্না দেখতে পেতাম!
স্নিগ্ধার ইচ্ছে হয় সব কিছু ফেলে অনেক দূরে পালিয়ে যেতে। নিজের মত থাকবে, কাউকে নিয়ে ভাবতে হবেনা.. কিন্তু আব্বু আম্মুকে যে বড় ভালবাসে ও। কত রাত চুপিচুপি দোয়া করেছে বাবা মার সব যেন ঠিক হয়ে যায়। ঠিক একটা মুভির মত যেন ওরা খুব খুব সুখে থাকে। একা একাই ফ্যান্টাসি গড়ে স্নিগ্ধা। কখনো ওর মরে যাওয়ার, কখনো বাবা মায়ের খুনসুটির, কখনো নিজের কথাও ভাবে সে। প্রিন্স চার্মিং,
আমার প্রিন্সও ঠিক এমন করেই আমাকে কষ্ট দেবে, তাই না? আচ্ছা, আব্বু কি কখনো আম্মুর প্রিন্স চার্মিং ছিল? ধ্যাৎ, কী সব ভাবছি!স্নিগ্ধা কলেজ, কোচিংএর বাইরের পৃথিবীটাতে খুব নাজুক, ও জানেই না কী করে অচেনা মানুষের সাথে কথা বলতে হয়, কী করে সমস্যা সমাধান করতে হয়, বা সিদ্ধান্ত নিতে হয়। ওকে ত কেউ শেখায়নি! তবে হ্যা, এই গুণগুলো না থাকার কারণে ভর্ৎসনা পেয়ে ফেলেছে বেশ কয়েকবার, নিজের ভেতরে গুটাতে গুটাতে ছোট্ট একটা বিন্দু হয়ে যেতে পারত যদি সে! ভয়ই করে তার, কী করে মানুষের চাওয়া পূরণ করবে সে? কখনো কি পেরেছে? এইটুকু বয়সে কত বড় বড় কথা চিন্তা করে স্নিগ্ধা। আচ্ছা, অন্যরা কেন চিন্তা করে না? বাবা মা, শিক্ষক - এরা ত আমার অনেক বড়! ওরা কেন এত অন্ধ?
টিভির প্রোগ্রাম মন ভাল করতে পারেনা। কী সব আজগুবি ফান এদের। গল্পের বই পড়তে বেশ লাগে, ফ্যান্টাসি গুলো বেশ বাধন ছাড়া হয়! এক আধজন বন্ধু বান্ধব আছে, কিন্তু কেমন যেন হাঁপ ধরে যাওয়া আলোচনা এদের। স্নিগ্ধার নিজের মনের জগতে সে একা থেকেই অভ্যস্ত হয়ে পড়েছে। খুব বেশি ভালবাসা পেতে তার অস্বস্তি লাগে। বিষন্নতা, একা থাকা - এটা তার অনেক দিনের সঙ্গী। বোধকরি জীবনসঙ্গীর থেকে উদাসীনতা পেলেই তার স্বাভাবিক মনে হবে।
পাঠক, বলতে পারেন, স্নিগ্ধা আর চার বছর পরে বিয়ে করে নিজের সংসারে গিয়ে কী করবে? আবেগ, অভিমান, হতাশা, অপরিপক্কতা, অদূরদর্শিতা, জীবনের সব কিছুর প্রতি বিতৃষ্ণা ওকে কেমন জীবন সঙ্গী হিসেবে গড়ে তুলবে? একজন মা হিসেবে সে কেমন হবে? চাকরির কথা নাহয় বাদই দিলাম। এই মেয়েটা যদি ভারসাম্য করে চলতে না পারে, তার পরিবারেও কি তবে তার বাবা মায়ের গল্পেরই পুনরাবৃত্তি হবে? এর শেষ কবে, কোথায়?
শিরোনামের প্রয়োজন নেই
স্নিগ্ধার প্রতিটা দিন একই রকম। কলেজ যাওয়া, আসা, বাড়ি ফিরে একটু টিভি দেখা, পড়ার টেবিলে বসে থাকা। অগোছালো ঘরটার দিকে একটা বিতৃষ্ণা নিয়ে তাকায়। উদ্যমগুলি কোথায় যেন হারিয়ে গেছে, শরীরটা টেনে টেনে সব পরিপাটি করতে গিয়েও মাঝপথে থেমে যায়। কীসের জন্য করবে সে?
নিজের রুমের বাইরে এসে দাঁড়ালে আব্বু আম্মুর রুমটা দেখতে পায় সে। জানে, ওখান থেকে হাসির শব্দ ভেসে আসবে না কখনোই। বেশির ভাগ সময় ওঘরে যে কোন একজন থাকে। অপরজন টিভির রিমোট হাতে নিয়ে পার করে ঘন্টার পর ঘন্টা। ঘরে একমাত্র সচল মানুষ কাজের বুয়াই। নিজের মনে কাজ করে.. বুঝে গেছে কবরের মত এই বাড়িতে টিকে থাকতে হলে নিরব হয়েই কাটাতে হবে।
এ বাড়িতে তাই কোন প্রাণ নেই। প্রাণীগুলো বোধহীন রোবটের মত, কেবল নিজে নিজের কাজ নিয়ে থাকতে জানে। কবে তারা সবাই মিলে পিকনিক এ গিয়েছিল? বা কারো বাড়ি বেড়াতে গিয়েছিল? মনেও করতে পারেনা স্নিগ্ধা। কবে কোন কথায় আঘাত না করে একসাথে খাবার টেবিলে গল্প করেছিল? কবে আম্মু তার অনেক ব্যর্থতার গল্প শুনে বুকে টেনে বলেছিল. 'ইশ মা! তোকে সবাই এত কষ্ট দেয়?' আচ্ছা, আম্মু কবে 'মা' বলে ডেকেছিল? এতক্ষণে খেয়াল হল তার, অনেক বান্ধবীর মাকে তার এত ভাল লাগে কেন! ওরা মা বলে ডাকে, তাই।
ওর বাবা খুব ভালমানুষ, কিন্তু রাগলে কান্ডজ্ঞান থাকেনা। সে সময় বাবার মুখের কথা শুনে সে পাথর হয়ে থাকে, এটা তার বাবা? মাও খুব ভালমানুষ, শুধু তীব্র আত্মসম্মানবোধসম্পন্ন। একবার কেউ কষ্ট দিলে কখনো আর ভোলেনা। ওদের সব ভাল, শুধু কথাগুলো একটু শ্লেষ জড়ানো। শুনতে ভালই লাগে, কিন্তু বুকের মধ্যকার খচখচ ভাবটা যায়না। চোখদুটোও ওর ভারি বেয়াদব, যখন তখন ঢল নামে। তাই বিব্রতকর পরিস্থিতি এড়াতে সে পারতপক্ষে সবাই একসাথে থাকলে ওখানে যায়না।
ঘরটা তার কাছে একটা দামি খাঁচার মত, সবাই টিপটপ, সব ভাল, তবু মন চায়না ঘরে ফিরতে। কিন্তু বাইরেই বা সে কোথায় যাবে? বান্ধবীদের সাথে পাল্লা দিয়ে তাদের মত নিজেকে সাজাতে ত সে পারেনা। ওদের পাশে যে ওকে ভীষণ ম্যাড়মেড়ে লাগে! প্রায় প্রতিদিনই কেউ না কেউ উপদেশ দেয়, একটু পার্লারে যাও, ফেসিয়াল করে আস, স্মার্টভাবে চল। ও ভেতরে ভেতরে আরো কুঁকড়ে যায়, যদি পুরোপুরি স্মার্ট হতে না পারি? যদি টইটই সব ঠিকঠাক মত করতে না পারি? ওরা কি আমাকে নিয়ে আরো হাসাহাসি করবে? বারবার স্মার্ট হওয়ার উপদেশ শুনতে শুনতে সে বুঝে গেছে ওর আচার ব্যবহার, চালচলনে বড় কোন খুঁত আছে, যেটা খুব সহজেই চোখে লাগে। আজকাল তাই ওর চেষ্টা অদৃশ্য হওয়ার।
স্নিগ্ধা প্রাণপন চেষ্টা করে ভাল রেজাল্টটুকু করে যাচ্ছে, কারণ রেজাল্ট খারাপ হলে মানুষের আরো অপমান সহ্য করার শক্তিটা ওর নেই। আয়নায় দাঁড়িয়ে নিজেকে যখন সে দেখে তখন কেন জানি নিজের চোখ দিয়ে দেখতে পায়না। অপরের চোখ দিয়ে দেখে। মুহূর্তে মনে পড়ে যায় খুব কাছের মানুষেরা গল্পোচ্ছলে কী কী বলেছিল। আচ্ছা, কেউ কখনো কেন বলেনা, তুমি একটু বক্তৃতা দেয়ার প্র্যাক্টিস কর, আত্মবিশ্বাস বাড়বে, পনের বছর পর কার জন্য কী করবে, একটা স্বপ্ন দেখ, উৎসাহ পাবে। কেন কেউ বলেনা, পোশাক আশাক, রূপচর্চার বাইরেও একটা জিনিস আছে, তোমার আত্মা, তোমার মন। ওখানটায় তোমার মত সুন্দর আর কেউ নেই! তোমার সব বান্ধবীরা মানুষের প্রশংসা কুড়াতে হ্যাংলার মত দ্বারে দ্বারে ঘুরছে, আর তুমি তোমার সুন্দর মনটাকে খুব যত্ন করে আদর করে রেখেছ। হাজারটা মানুষের অপমানেও তুমি কিছু রিঅ্যাক্ট করনা। শুধু চোখটা বড় বড় করে তাকাও। তোমার চুপ করে থাকা দেখে মানুষ ভাবে তুমি বোধহয় বোধহীন। আরো শক্ত করে না বললে তোমার মগজে পৌঁছাবে না। তুমি মুখ ফুটে তবু ত বল না, 'আমার আত্মবিশ্বাস ত কবেই তোমরা শেষ করে দিয়েছ, আত্মাটাকেও কি মেরে ফেলতে চাও?'
স্নিগ্ধা সাতপাঁচ ভেবে আবার নিজের ঘরে ফিরে আসে। শূন্য দেয়ালগুলো তার বড় আপন। কেবল এই জায়গাটাতেই সে যখন তখন মুখ লুকাতে পারে।
(আমার কলেজ জীবনে দেখা প্রত্যেকটা হাত কাটা বান্ধবীর উদ্দেশ্যে লিখলাম। আজও আমার বোনের মুখে শুনি ঘুমের ওষুধ, হাতকাটার এই প্রচলন যায়নি। শুধু একটু আত্মবিশ্বাস আর বুকের মধ্যে জড়িয়ে ধরে আদর এই মেয়েগুলিকে কত সুন্দর জীবন দিতে পারত, সেটা অভিভাবকেরা কবে বুঝবে?)
নিজের রুমের বাইরে এসে দাঁড়ালে আব্বু আম্মুর রুমটা দেখতে পায় সে। জানে, ওখান থেকে হাসির শব্দ ভেসে আসবে না কখনোই। বেশির ভাগ সময় ওঘরে যে কোন একজন থাকে। অপরজন টিভির রিমোট হাতে নিয়ে পার করে ঘন্টার পর ঘন্টা। ঘরে একমাত্র সচল মানুষ কাজের বুয়াই। নিজের মনে কাজ করে.. বুঝে গেছে কবরের মত এই বাড়িতে টিকে থাকতে হলে নিরব হয়েই কাটাতে হবে।
এ বাড়িতে তাই কোন প্রাণ নেই। প্রাণীগুলো বোধহীন রোবটের মত, কেবল নিজে নিজের কাজ নিয়ে থাকতে জানে। কবে তারা সবাই মিলে পিকনিক এ গিয়েছিল? বা কারো বাড়ি বেড়াতে গিয়েছিল? মনেও করতে পারেনা স্নিগ্ধা। কবে কোন কথায় আঘাত না করে একসাথে খাবার টেবিলে গল্প করেছিল? কবে আম্মু তার অনেক ব্যর্থতার গল্প শুনে বুকে টেনে বলেছিল. 'ইশ মা! তোকে সবাই এত কষ্ট দেয়?' আচ্ছা, আম্মু কবে 'মা' বলে ডেকেছিল? এতক্ষণে খেয়াল হল তার, অনেক বান্ধবীর মাকে তার এত ভাল লাগে কেন! ওরা মা বলে ডাকে, তাই।
ওর বাবা খুব ভালমানুষ, কিন্তু রাগলে কান্ডজ্ঞান থাকেনা। সে সময় বাবার মুখের কথা শুনে সে পাথর হয়ে থাকে, এটা তার বাবা? মাও খুব ভালমানুষ, শুধু তীব্র আত্মসম্মানবোধসম্পন্ন। একবার কেউ কষ্ট দিলে কখনো আর ভোলেনা। ওদের সব ভাল, শুধু কথাগুলো একটু শ্লেষ জড়ানো। শুনতে ভালই লাগে, কিন্তু বুকের মধ্যকার খচখচ ভাবটা যায়না। চোখদুটোও ওর ভারি বেয়াদব, যখন তখন ঢল নামে। তাই বিব্রতকর পরিস্থিতি এড়াতে সে পারতপক্ষে সবাই একসাথে থাকলে ওখানে যায়না।
ঘরটা তার কাছে একটা দামি খাঁচার মত, সবাই টিপটপ, সব ভাল, তবু মন চায়না ঘরে ফিরতে। কিন্তু বাইরেই বা সে কোথায় যাবে? বান্ধবীদের সাথে পাল্লা দিয়ে তাদের মত নিজেকে সাজাতে ত সে পারেনা। ওদের পাশে যে ওকে ভীষণ ম্যাড়মেড়ে লাগে! প্রায় প্রতিদিনই কেউ না কেউ উপদেশ দেয়, একটু পার্লারে যাও, ফেসিয়াল করে আস, স্মার্টভাবে চল। ও ভেতরে ভেতরে আরো কুঁকড়ে যায়, যদি পুরোপুরি স্মার্ট হতে না পারি? যদি টইটই সব ঠিকঠাক মত করতে না পারি? ওরা কি আমাকে নিয়ে আরো হাসাহাসি করবে? বারবার স্মার্ট হওয়ার উপদেশ শুনতে শুনতে সে বুঝে গেছে ওর আচার ব্যবহার, চালচলনে বড় কোন খুঁত আছে, যেটা খুব সহজেই চোখে লাগে। আজকাল তাই ওর চেষ্টা অদৃশ্য হওয়ার।
স্নিগ্ধা প্রাণপন চেষ্টা করে ভাল রেজাল্টটুকু করে যাচ্ছে, কারণ রেজাল্ট খারাপ হলে মানুষের আরো অপমান সহ্য করার শক্তিটা ওর নেই। আয়নায় দাঁড়িয়ে নিজেকে যখন সে দেখে তখন কেন জানি নিজের চোখ দিয়ে দেখতে পায়না। অপরের চোখ দিয়ে দেখে। মুহূর্তে মনে পড়ে যায় খুব কাছের মানুষেরা গল্পোচ্ছলে কী কী বলেছিল। আচ্ছা, কেউ কখনো কেন বলেনা, তুমি একটু বক্তৃতা দেয়ার প্র্যাক্টিস কর, আত্মবিশ্বাস বাড়বে, পনের বছর পর কার জন্য কী করবে, একটা স্বপ্ন দেখ, উৎসাহ পাবে। কেন কেউ বলেনা, পোশাক আশাক, রূপচর্চার বাইরেও একটা জিনিস আছে, তোমার আত্মা, তোমার মন। ওখানটায় তোমার মত সুন্দর আর কেউ নেই! তোমার সব বান্ধবীরা মানুষের প্রশংসা কুড়াতে হ্যাংলার মত দ্বারে দ্বারে ঘুরছে, আর তুমি তোমার সুন্দর মনটাকে খুব যত্ন করে আদর করে রেখেছ। হাজারটা মানুষের অপমানেও তুমি কিছু রিঅ্যাক্ট করনা। শুধু চোখটা বড় বড় করে তাকাও। তোমার চুপ করে থাকা দেখে মানুষ ভাবে তুমি বোধহয় বোধহীন। আরো শক্ত করে না বললে তোমার মগজে পৌঁছাবে না। তুমি মুখ ফুটে তবু ত বল না, 'আমার আত্মবিশ্বাস ত কবেই তোমরা শেষ করে দিয়েছ, আত্মাটাকেও কি মেরে ফেলতে চাও?'
স্নিগ্ধা সাতপাঁচ ভেবে আবার নিজের ঘরে ফিরে আসে। শূন্য দেয়ালগুলো তার বড় আপন। কেবল এই জায়গাটাতেই সে যখন তখন মুখ লুকাতে পারে।
(আমার কলেজ জীবনে দেখা প্রত্যেকটা হাত কাটা বান্ধবীর উদ্দেশ্যে লিখলাম। আজও আমার বোনের মুখে শুনি ঘুমের ওষুধ, হাতকাটার এই প্রচলন যায়নি। শুধু একটু আত্মবিশ্বাস আর বুকের মধ্যে জড়িয়ে ধরে আদর এই মেয়েগুলিকে কত সুন্দর জীবন দিতে পারত, সেটা অভিভাবকেরা কবে বুঝবে?)
Subscribe to:
Posts (Atom)