Wednesday, December 28, 2011

শেখার কোন শেষ নেই

I have learnt silence from the talkative, toleration from the intolerant, and kindness from the unkind; yet strange, I am ungrateful to these teachers. 

Kahlil Gibran এর এই কোট টা আমি প্রথম শুনি যখন ইউনিভার্সিটির এক ফ্যাকাল্টির খুব বাজে ব্যবহার পেয়ে আমার মন অসম্ভব খারাপ। এই কথার অপরিমিত শক্তি বোঝার অবস্থা তখন আমার ছিলনা। আমি তখন দুঃখের সাগরে ডুবছি। কিন্তু এর পর থেকে, গত দেড় বছরে, এই কথাগুলো একদিনের জন্যেও ভুলিনি। প্রতিদিন অল্প অল্প করে, একটু আধটু করে নিজের অভিজ্ঞতা দিয়ে বার বার অনুভব করেছি এর প্রয়োজন।

আমরা কি আমাদের চারপাশ থেকে শিখি? সবাই বলবে শিখি। কেমন করে? এই যেমন ভাল জীবনাচরণের উদাহরণ দেখলে তার মত করে চলার শিক্ষা নেই, কারো আত্মবিশ্বাস আমাদের উদ্বুদ্ধ করে, কারো সৃষ্টিশীলতায় মুগ্ধ হয়ে আমরা অনুপ্রাণিত হই, আমাদের আগামী প্রজন্মও যেন এমন হয় - ইত্যাদি ইত্যাদি। নিজের জীবনে ঠেকে শিখি সবাই। অনেকে অনেক ঠকেও ধরতে পারেনা ঠিক আর বেঠিকের ফারাক। শিখছি আমরা প্রতিদিনই। কিন্তু কাজে লাগাতে পারছি কতটুকু? 

আমরা মানুষেরা বোধহয় জন্মগতভাবেই ভুলোমনা। বড় হওয়ার সাথে সাথে ভুলে যাই কৈশোরের আমাদের মনটা কেমন ছিল। আমরা বোধহয় স্বার্থপরও, নিজেকে আরেকজনের অবস্থানে বসিয়ে কিছুতেই বিচার করতে পারিনা কেন একজন মানুষ ভুল করে। আমার জন্য যেটা খুব সহজ, অপরজনের জন্য তাই হয়ত নিত্যদিনের স্ট্রাগল। আমার এক কাছের মানুষ সময়ের ব্যাপারে খুব বিচক্ষণ, অন্য কেউ সময়ের নড়চড় করলে তার থেকে কর্কশ মন্তব্য শুনতে হবেই। তার কথা হচ্ছে আমি ত কোন কমিটমেন্ট করলে আর সব কিছু সেভাবে প্ল্যান করে নেই, তুমি পার না কেন? সেই একই মানুষ নিত্যনিয়ত স্ট্রাগল করে যাচ্ছে তার বাকযন্ত্র কে সংযত রাখার। প্রতিদিন সে হেরে যায় এখানে, বার বার হারে, একই ভুল প্রতিদিন করে। তবু সে শেখেনি - স্ট্রাগল প্রত্যেকেরই আছে, যার যার নিজের মত, সময়ের হোক অথবা সংযমের। 

নিজের সংসার হওয়ার পর থেকে আমি প্রত্যেকটা পরিবারকে খুব ভালভাবে পর্যবেক্ষণ করি। প্রবাসে থাকি, বাবা মা, শ্বশুরবাড়ি ত নেই, এরাই সব। বেশ অনেকদিন ধরে সংসার করছেন এমন বড়বোনদের সংসর্গে থাকার চেষ্টা করি, যাতে তাদের অভিজ্ঞতালব্ধ শিক্ষা অল্প আয়াসে অর্জন করে ফেলতে পারি। শিক্ষার ধরণটাই এমন, না ছেঁকে নেয়ার উপায় নেই কোন কিছুই। গ্র্যাড স্কুলে এতদিন ধরে আমাদের এটাই অনেক কষ্টে শেখানোর চেষ্টা করছে, কোন পাবলিকেশন বিশ্বাস করবে না, ডাটা যাচাই না করে। একটা সময় বুঝলাম, এই পদ্ধতি শুধু একাডেমিক লাইফে না, সোশ্যাল লাইফেও খুব জরুরি। ছোটবেলা থেকে শিখে এসেছি বাবা মা সবসময় ঠিক, স্কুল কলেজ ইউনিভার্সিটিতে শিক্ষক মানে অবিসংবাদিত চরিত্রের অধিকারী, তাদের একটু চ্যুতি দেখলে মুষড়ে পড়তাম। আশ্চর্য ব্যাপার, কেন কখনও কেউ বলে দেয়নি, তাদেরও ভুল হয়, ভুল করতে দেখলে হতাশ না, শিখতে হয়। তেমনি এখনও, সুপারভাইজর কে মাথায় তুলে রাখি, আত্মীয়, বন্ধুবান্ধব সহ নিজেদের পরিবারকে ভাবি সব ভুলের ঊর্ধ্বে, যখন দেখি ভীষণ নীতিবাগিশ মানুষটি জীবনের কোন একটা জায়গায় এসে অন্যায় করে ফেলছে, তখন তার উপর বিশ্বাসটাই চলে যায়। কেন, সে কি ভুল করতে পারেনা? অন্যায় করলেই আমি তার থেকে শেখা বন্ধ করে দেব কেন? তার ভুলটা ত আমিও করতে পারতাম! 

অনেকদিন ধরে পরিচয় থাকলে মানুষের ভাল খারাপ সবকিছুই চোখে পড়ে। সমস্যা হচ্ছে, আমি কিছুদিন যাওয়ার পরেই তাকে লেবেল করে ফেলি, 'আমি একে পছন্দ করি, আমি একে পছন্দ করি না।' তারপর যাদের পছন্দ করি, তাদের ভাল গুণগুলি খুঁটিয়ে দেখে শিখতে থাকি, আর যাদের পছন্দ করি না, তাদের দোষগুলিও মনের মধ্যে জমা রেখে শিখতে থাকি। উল্টোটা সচেতনভাবে কখনই করতে পারিনা। বিশেষ করে যাকে পছন্দ করিনা, তার গুণগুলো দেখতে আমার ভীষণ এলার্জি। কিন্তু এটা কি ঠিক পথ? আমি না আল্লাহর কাছে দুআ করি উনি যাতে আমাকে সরল পথে রাখেন সঠিক পথে রাখেন? নাস্তিকরা যা বলে তার কি সব খারাপ? ইসলামের দোহাই দিয়ে গালিগালাজ থেকে শুরু করে আর যা কিছু করা হয় তার কি সব ভাল? আমরা ছাঁকতে শিখিনি। বাইনারি ডিজিট এর মত 'All or none' এই জায়গাতে এসে থেমে গেছি। 

আমি শিখছি, সবই শিখছি, সাইকোলজিক্যাল ডিজঅর্ডার থেকে শুরু করে স্ট্রিং থিওরি - তত্ত্বকথা যত আছে, জীবনের সাথে সামঞ্জস্যহীন - তার সবকিছুতেই আমার খুব আগ্রহ। কিন্তু শিখিনি গৃহস্থালির খুব বেসিক কিছু বিষয়ও, শাক সবজি কীভাবে তাজা রাখা যায়, ঘরকে পরিচ্ছন্ন রাখার জন্য কী কী রুটিন মেনে চলা জরুরি - এগুলো কোন কিছুই আমার কাছে জরুরি মনে হয়নি কোনদিন। একদিন ব্লগে দেখলাম এক ছেলে অহংকার করে বলছে, 'আমি জীবনে কোনদিন ভাত বেড়ে খাইনি।' আমরা না পারা, না জানা - এসবও অহংকার করার বিষয় মনে করি। শিক্ষার কী অদ্ভুত বিকলাঙ্গ রূপ! 

যাই হোক, এত হতাশামার্কা কথা বলে লেখা শেষ করতে চাইনা। যারা ছাত্রজীবনে আছেন, বিশেষ করে যারা দেশে আছেন, তারা অবসর সময়ে হতাশা চর্চা না করে চলুন একটু বড় বড় চোখ করে চারপাশে তাকাই। যদি বৃষ্টির জন্য বাসা থেকে বের হতে না পারেন, একটু রান্নাঘরে যান, দেখুন মা কীভাবে চটপট রান্না, ধোয়ামোছা সবই খুব স্মার্টভাবে করে ফেলেন খুব অল্প সময়ে। এটা একটা স্কিল। দুপুরে বিছানায় অলস শুয়ে থাকলে চুপচাপ একটু ভাবুন আপনার অপছন্দের কোন মানুষের কথা। তার ভাল দিকগুলো, দোষগুলো - সবকিছু নিয়েই চিন্তা করুন। শেখার অ-নে-ক কিছু পাবেন। বাবাকে যদি সবসময় দেখেন ব্যাংকে বিল দিয়ে আসলেই মেজাজ খারাপ থাকে, তাহলে একদিন তার সাথে যান, শেখা হয়ে যাবে মেজাজ ঠিক রাখতে হলে কোন কোন জিনিসগুলো সহ্য করতে শিখতে হবে। শেখার কি শেষ আছে? অল্প কথায় কী করে অনেক কথা বলা যায় - তাও একটা শেখার মত জিনিস, আমাকে যেটা শিখতে হবে খুব শীঘ্রই।

Tuesday, December 13, 2011

আমাদের আড্ডা

গ্র্যাজুয়েট স্টুডেন্টদের জীবনটা বেশ পানসে টাইপ। বাসা, ল্যাব, ল্যাব, বাসা - এই করে করেই আড়াই বছর কাটিয়ে দিলাম। আন্ডারগ্র্যাডরা দেখি কত রকমের ক্লাব করে, কমনস্ এ নাচ প্র্যাক্টিস করে - আর ফ্রি মুভি, সোশ্যাল আওয়ার - এসব ত চলছেই। অনার্স পড়াকালে আমারও কতকিছুতে উৎসাহ ছিল, এখন কেবল চশমা এঁটে ভারিক্কি চেহারা করে ল্যাবে গিয়ে ডেস্কে বসে থাকি। ছুটির দিনগুলোতেও ভারি আলিস্যি, ঝিমিয়ে ঘুমিয়ে আর virtual socializing করে করেই দেখি দুই দিন পার হয়ে গেছে। 

আমাদের মতই আলস্যপ্রিয়, উদ্যমহীন, ভাবুক শ্রেণীর আরও কিছু গ্র্যাড স্টুডেন্ট এর পরিচয় হয়েছে এই দু'বছরে। দেশীয় স্টাইলের আড্ডার নেশা ঢুকিয়ে দিয়েছি ওদের মধ্যেও। মনে যত কথা আসে, ভাঙা ইংরেজিতে তার অর্ধেকও প্রকাশ করতে পারিনা, তাতে কী হয়েছে? আন্তরিকতা আর হৃদ্যতার বোধ করি ভাষা প্রয়োজন হয়না। কারও একজনের পরীক্ষা ভাল হলে বা প্রেজেন্টেশন/প্রজেক্ট শেষ হলে মহানন্দে রান্না করে সবাইকে আমন্ত্রণ জানায় খেয়ে যাবার জন্য। প্রতি সপ্তাহেই এই মুখগুলো দেখি, মাঝে মধ্যে মনেও হয়, এত কী কথা বলব? সেদিনই ত দেখা হল! 

কিন্তু মজা হচ্ছে এদের সাথে কথা বলার টপিক কখনও ফুরায় না। পৃথিবীর যাবতীয় নিয়মকানুনের গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে আমাদের প্রশ্ন। রাজনীতি নিয়ে আমাদের তর্ক, সাদার সাথে শুভ্রতা আর কালোর সাথে কেন মন্দকে মেলানো হবে তাই নিয়ে আপত্তি। আফ্রিকান আমেরিকানরা কতটা নির্যাতিত হয়েছে (এখনও হচ্ছে) এ বিষয়ে বিশেষজ্ঞজনের মতামত ইত্যাদি ইত্যাদি। দর্শন হচ্ছে প্রত্যেকের প্রিয় বিষয়বস্তু। আমরা কীভাবে বিভিন্ন ঘটনাকে দেখি, কীভাবে সিদ্ধান্ত নেই, কোনটা শিক্ষণীয়, কোনটা মিডিয়ার প্রভাব - এসব নিয়ে সূক্ষ্মাতিসূক্ষ পর্যালোচনা চলছেই। 

আরেকটা অতিপ্রিয় বিষয় হচ্ছে মানুষের ব্যক্তিত্ব কীভাবে গড়ে ওঠে, সম্পর্কগুলোর প্রতি দৃষ্টিভঙ্গি কীভাবে ঘাত প্রতিঘাতে নতুন রূপ নেয়, সম্পর্কের প্রতি দায়িত্বশীলতা gender ও culture ভেদে কতটুকু ভিন্ন হয়, আদর্শ ব্যক্তিত্ব ও আদর্শ পরিবার কেমন হওয়া উচিৎ এসব। বলা বাহুল্য, এধরণের চিন্তাভাবনার অফুরন্ত খোরাক আছে ধর্মে। তাই ঘুরে ফিরে আমাদের তর্কে বারবারই আসে ধর্ম। যেহেতু সবাই মুসলিম, অল্প বিস্তর প্রত্যেকেরই আগ্রহ আছে ইসলামকে জানার, আর অন্য ধর্মগুলো নিয়ে জ্ঞানের পরিধি ভয়ঙ্কর রকমের কম, তাই ইসলামকে নানা দৃষ্টিকোণ থেকে আলোচনা করা হয় প্রায়ই। 

একটা সময় আমরা খেয়াল করলাম আমাদের আলোচনাগুলো, প্রশ্নগুলো একই জায়গায় ঘুরপাক খাচ্ছে। কারণ আমরা কুরআন ভাল জানিনা, হাদীস গল্পের মত পড়েছিলাম কোন এক কালে, সীরাহ (রাসুলুল্লাহ (স) এর জীবনী) সম্পর্কে ত অতল অন্ধকারে। আমাদের আড্ডায় চিন্তা করার মত অসাধারণ মাথা আছে অনেক, কিন্তু জ্ঞানের সীমাবদ্ধতার কারণে হিরা কাটার ছুরি দিয়ে ঘাঁটছি কাদামাটি। এর মধ্যে তারিক রামাদানের লেকচার শুনতে Johns Hopkins এ গেলাম, উনি বারবার জোর দিয়ে বললেন, মুসলিমদের তার মূল রেফারেন্সে আসতে হবে। কুরআন ও হাদীস বুঝতে হবে, কিন্তু একই সাথে intellectual humilityর চর্চাও করতে হবে। সব শুনে মনে হল ইসলামকে বিভিন্ন আঙ্গিকে বুঝতে চাওয়ার আমাদের এই প্রয়াসটা ঠিকই আছে, কিন্তু রেফারেন্স অংশটুকু অনুপস্থিত। 

ঐ দিনই লেকচারের পর আমরা একটা রেস্টুরেন্ট এ খেতে গিয়েছিলাম, ওখানে বসে ঠিক করলাম, প্রতি শুক্রবার সন্ধ্যায় আমরা কারও বাসায় একত্রিত হব, শুধুমাত্র কুরআন, হাদীস এবং সীরাহ নিয়ে methodically জ্ঞান অর্জন করতে। কীভাবে methodically জ্ঞান অর্জন করা যায়? আমাদের ৮-৯ জনের মধ্যে ৩ জন প্রতি সপ্তাহে ৩টা পার্ট আলোচনা করবে। কুরআন ৩০ মিনিট, হাদীস ৫-১০ মিনিট, সীরাহ ২০ মিনিট। মাগরিবের পর শুরু হবে, খাওয়া দাওয়া হবে, আলোচনার যে কোন অংশে যে কেউ প্রশ্ন এবং তর্ক বিতর্ক শুরু করতে পারে। তবে একজন (আমাদের মধ্যে ওরই পড়াশুনা সবচেয়ে বেশি) খেয়াল রাখবে আলোচনা যেন বেশি অফট্র্যাক হয়ে না যায়, বা অতি উত্তপ্ত হয়ে না যায়। 

গত ছয় সাত মাস ধরে অনিয়মিত ভাবে এই স্টাডি সার্কেল চলে আসছে। 

আমাদের মধ্যে কেউই স্কলার না হওয়ায়, আর খুব ঘনিষ্ঠ বন্ধু হওয়ায়, ধর্ম নিয়ে যত রকমের বিব্রতকর প্রশ্ন আছে সবই উঠে আসে। আমরা যে যেটুকু জানি, বুঝি শেয়ার করি, অথবা পরে খুঁজে পেলে কমন মেইল করে জানিয়ে দেই। শুক্রবার ছাড়াও অন্যান্য সময় ওদের সাথে আড্ডা হলে এই রেফারেন্সগুলো চলেই আসে। আমাদের প্রত্যেকেই অনেক অল্প আয়াসে ৯-১০ গুণ বেশি শিখে ফেলছি। আমার সবচেয়ে ভাল লাগে রাসুলুল্লাহ (স) এর জীবনী অংশটুকু, এ বিষয়ে জানি তুলনামূলকভাবে অনেক কম, তাই সবই শিখছি, আর মুসলিম, নন-মুসলিম বিভিন্ন লেখকের ভিন্ন ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি থেকে ব্যাখ্যা পড়তে পড়তে মনে হয় আমি যেন ঐ পরিবেশেই আছি, এমন ঘটনা আমারও চারপাশে ঘটছে, আমিও রাসুলুল্লাহ (স) এর মত সবচেয়ে অশান্ত সময়ে শান্ত আছি, মানুষের বিদ্রুপের উত্তর দিচ্ছি দু'আর মাধ্যমে। যুদ্ধক্ষেত্রে দাঁড়িয়ে নামাজে মনসংযোগ করে ভুলে যাচ্ছি চারপাশের আর সব প্রতিকূলতা। শুনতে গল্পের মত, তার উপর আছে পারিবারিক, সামাজিক, রাজনৈতিক, ধর্মীয় - সব কিছুরই সংমিশ্রণ, তাই এ সময় সবার মুখে প্রশ্নের ফুলঝুরি ফোটে, সবাই চেষ্টা করে নিজের জীবনে প্রয়োগ করা যায় এমন উদাহরণ মনের লাইব্রেরিতে তুলে রাখতে। 

আল্লাহর দ্বীন জানার উদ্দেশ্যে যারা একত্রিত হয় ফেরেশতারা নাকি তাদের উপর রহমতের ডানা বিছিয়ে দেন, তাদের উপর 'সুকুন' নাযিল হয় (সুকুনের মানে আমি বুঝিয়ে বলতে পারব না, মুভিতে যেমন দেখায় চারপাশে সব স্লো মোশনে চলছে, সবকিছু সুন্দর, নায়কের মুখে স্মিত হাসি ... ঐ ধরণের শান্তি, স্থিরতা, কৃতজ্ঞতার মিশ্র রূপ হচ্ছে 'সুকুন'; দেশে ঝিরি ঝিরি বৃষ্টির মাঝে কৃষ্ণচুড়ায় লাল হয়ে থাকা পথের উপর খালি পায়ে হাঁটলে মনটা যেমন হালকা.. হয়ে যায়, সুকুন তেমনই।) অন্যদের কথা জানিনা, আমি প্রায়ই এরকম 'সুকুন' স্টেট এ থাকি। শরীরটা এত.. হালকা লাগে, হাত পা কোন কিছুর ওজন টের পাইনা। মনের মধ্যে কে যেন বলতে থাকে, সবকিছু এত সুন্দর কেন? এত সুন্দর কেন? আলহামদুলিল্লাহ..., আলহামদুলিল্লাহ ... সত্যি! ঐ সময়টায় আমি যদি মরেও যাই, মনে হয় কেবল চোখটুকু বন্ধ করা ছাড়া আর কোন কিছু করতে হবেনা। 

আমি নিজেকে খুবই ভাগ্যবান মনে করি আমার এই বন্ধুদের জন্য। ওদের সাথে থেকে আমি এত কিছু শিখেছি... আসলে আল্লাহর অনেকগুলি রহমতের মধ্যে এটাও একটা, আমার বন্ধুরা প্রত্যেকের মন এত এত সুন্দর - ওদের সাথে যত সময় কাটাই ততই শিখি। এখন আফসোস হয়, কেন দেশে থাকতে বন্ধুরা মিলে এমন স্টাডি সার্কেল করলাম না! আমি ত চাই আমার প্রিয় মানুষগুলোর প্রত্যেকের উপর ফেরেশতারা রহমতের ডানা বিছিয়ে রাখুক, সবসময়।

ডমেস্টিক ভায়োলেন্স নিয়ে কিছু কথা

'ডমেস্টিক ভায়োলেন্স' শব্দটার সাথে আমার পরিচয়ই ছিল না। আবছা একটা ধারণা ছিল, যেসব নরপশু স্ত্রীর চোখ উপড়ে প্রথম আলোর প্রথম পাতা দখল করে তারাই ওসব ভায়োলেন্স টায়োলেন্স এর সাথে জড়িত। কিন্তু ভায়োলেন্স এর অসংখ্য দিক আছে, যা আমার জানা ছিলনা। জানতাম না ইমোশনাল ভায়োলেন্স বলে একটা কিছু আছে, যেখানে একপক্ষ সারাক্ষণ ভয়ে কাঁটা হয়ে থাকে অপরপক্ষ 'মাইন্ড' করবে দেখে। তাকে খুশি করার জন্য সে যা বলে তাই মেনে নেয়, আপত্তি করলে অবস্থা আরো খারাপের দিকেই যাবে, তাই যা বলে মুখ বুজে মেনে নেয়। ইমোশনাল অ্যাবিউজ একটা চক্র মেনে চলে। প্রথম ধাপে চাপা টেনশন তৈরি হবে, দ্বিতীয় ধাপে তা বার্স্ট করবে, রাগ, কান্না, দোষারোপ - যেভাবেই হোক - আর তৃতীয় ধাপে অনুশোচনা, ক্ষমা প্রার্থনা - যাকে বলে 'হানিমুন পিরিয়ড', অ্যাবিউজার ভীষণ ভাল ব্যবহার করবে, আদর যত্ন হাসি খুশি - অ্যাবিউজড যখন ভাবতে শুরু করবে, সব ঠিক হয়ে গেছে, তখনই প্রথম ধাপের পুনরাবৃত্তি হবে। 

ইমোশনাল অ্যাবিউজের মধ্যে আছে এক পক্ষের অন্য পক্ষকে পূর্ণ কন্ট্রোলের মধ্যে রাখার চেষ্টা, কার সাথে মিশবে, কোথায় যাবে - সে ব্যাপারে সার্বক্ষণিক নজর (লক্ষ্য করুন, কোথায় কার সাথে মিশছে তা খোঁজ নেয়াতে কোন সমস্যা নেই, অভিভাবক হিসেবে তা করাও উচিৎ, কিন্তু) জানার বাইরে কারো সাথে পরিচয় হলে অস্থির হয়ে যাওয়া, রেগে যাওয়া - এসব অ্যাবিউসিভ কনডাক্ট। এছাড়া মানুষের সামনে অপমানজনক নাম ধরে ডাকবে, সমালোচনা করবে, হাসাহাসি করবে, পরিবারের অন্যদের কাছে তার ভুল নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করবে ও পরিবারের অন্যদেরও নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি আনতে উস্কে দেবে - যাতে করে সেই মানুষটা একই সাথে ঘরে কোনঠাসা মনে করে, ও নিজেকে সবকিছুর জন্য অপরাধী ভাবতে থাকে। 

ইমোশনাল অ্যাবিউজ আর খাঁটি দোষের শাস্তি অনেকটা একই রকম, তাই অ্যাবিউজড হচ্ছে যে, সে ভেবে নেয়, এটা ত আমার ভালর জন্যই করা। কিন্তু অ্যাবিউজিভ রিলেশনে মূল উদ্দেশ্য থাকে ডমিনেট করার ইচ্ছা, আর তাকে জাস্টিফাই করার জন্য অ্যাবিউজার বিভিন্ন সামাজিক ও ধর্মীয় অজুহাত দেখায়। 

ধর্মীয় অজুহাতের কথা যখন আসলোই, তখন স্পিরিচুয়াল অ্যাবিউজ নিয়েও বলি। তুমি 'ভাল মুসলিম' এর মত কাজ করছ না, এই অজুহাতে স্বামী/স্ত্রী বা তার আত্মীয় স্বজন অন্যায় সব দাবি চাপিয়ে দিতে পারে, এমনকি মেয়েদের বেলায় বাবার বাড়ি যাওয়ার উপরেও নিষেধাজ্ঞা দিতে পারে। প্যারেন্ট-চাইল্ড রিলেশনশিপেও অমন দেখা যায়। ছেলে মেয়েকে অন্যদের সামনে স্টুপিড, গাধা ইত্যাদি বলে অ্যাবিউজ করলেও, সন্তানের অবাধ্যতা বা অসন্তোষ দেখলে কুরআনের আয়াত টেনে আনবে, জাহান্নামের শাস্তির ভয় দেখাবে। 

যেহেতু এই বিষয়গুলো খুবই স্পর্শকাতর, বিশেষত আমাদের দেশের প্রেক্ষাপটে, তাই কয়েকটা বিষয় স্পষ্ট করে নেয়া ভাল। 

১. সন্তান বাবা মা কে জান্নাতের দরজা হিসেবে ট্রিট করা উচিৎ, এতে কোন মতভেদ নেই, কিন্তু বাবা মা স্বেচ্ছাচারিতা করার অধিকার রাখেন না। আল্লাহর থেকে প্রত্যেকে নিজ নিজ বিবেক ও সিদ্ধান্ত নেয়ার স্বাধীনতা নিয়ে এসেছে। বাবা মা একটা বয়স পর্যন্ত সেই বিবেক কে মজবুত করবেন, এবং সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষমতাটাকে ঘষে মেজে ধারালো করবেন। এবং অবশ্যই মূল লক্ষ্য থাকবে সে যেন নিজের বিচারবুদ্ধির প্রতি আস্থাশীল হয়। রাসুলুল্লাহ (স) নিজের সন্তানের সাথে কেমন আচরণ করতেন বা কিশোর বয়সী সাহাবীদেরও কতটা মর্যাদা দিয়ে কথা বলতেন তা লক্ষ্য করলেই ইসলামে বড়দের প্রতি ছোটদের অধিকার কী এটা পরিষ্কার হয়ে যাবে। 

২. বৈবাহিক সম্পর্কে ছোটখাট অসন্তোষ এড়িয়ে গিয়ে ঘরে শান্তি রাখার চেষ্টা করা, আর নিজের স্বাধীনতা পুরোপুরি ত্যাগ করা - এ দুটো এক জিনিস না। অনেক ছেলেই আছে মায়ের সব রকমের ইমোশনাল অ্যাবিউজ চুপচাপ মেনে নিয়ে নিজের উপরেও জুলুম করছেন, স্ত্রীর উপরেও করছেন। যেটা অন্যায় সেটাকে উপেক্ষা করতে ইসলাম আমাদের শেখায় নি। আমরা মুসলিমরা একে অপরকে ধৈর্য ধরতে উপদেশ দিতে পারি, ধৈর্য ধরতে বাধ্য করতে পারিনা। সুতরাং এ ধরণের সমস্যাকে অন্তত সমস্যা হিসেবে স্বীকার করতেই হবে। 

অ্যাবিউজিভ রিলেশনশিপের শিকার যারা তাদের ব্যক্তিত্ব গঠন চরমভাবে বাধাগ্রস্ত হয়। বিভিন্ন সামাজিক পরিবেশে তারা স্বচ্ছন্দভাবে অংশগ্রহণ করতে ভয় পায়। সমালোচনার প্রতি অতিরিক্ত নাজুক হয়। আত্মবিশ্বাসে ঘাটতি থাকে, কারণ নিজের সিদ্ধান্ত কে বাধাহীন ভাবে প্রয়োগ করার সুযোগ সে খুব একটা পায়নি, পেলেও গঠনমূলক বা উৎসাহব্যঞ্জক প্রতিক্রিয়া পায়নি। সমাজে খুব একটা মেশার সুযোগ হয়না বলে অ্যাবিউজিভ পরিবেশেই বেশির ভাগ সময় কাটাতে হয় - পরিণতিতে মানসিক এই দৈন্যের ব্যাপারটা বহুগুণে বেড়ে যায়। সবচেয়ে ভয়াবহ ব্যাপার হচ্ছে, যারা ডমেস্টিক ভায়োলেন্স এর মধ্যে বড় হয়েছে, তারা এই পরিবেশে অভ্যস্ত হয়ে ওঠে বলে তারাও নিজের জীবনে অ্যাবিউজার হওয়ার সম্ভাবনা বেশি থাকে। 

এই বিষয়গুলো নিয়ে আমাদের সবার সচেতন হওয়া দরকার। পরে হয়ত কখনো আরো গুছিয়ে এ বিষয়ে লিখব।