Showing posts with label Daily affairs. Show all posts
Showing posts with label Daily affairs. Show all posts

Monday, June 11, 2012

কর্তব্য - শরীরের প্রতি

কিছুদিন আগে মোখতার মাগরুবির এক লেকচারে শুনছিলাম, আখলাক্ব শব্দের উৎপত্তি 'খ ল ক্ব' থেকে দু'টো শব্দ আসে, খালক্ব এবং খুলক্ব। এর একটির মানে শরীর, অপরটির অর্থ আত্মা। আখলাক্ব বা সর্বোত্তম চরিত্র নিশ্চিত করতে খালক্ব ও খুলক্ব - দুটোরই নিয়মিত পরিচর্যা প্রয়োজন। তিনি আরো একটা কথা বলেছিলেন, আমরা নিয়মিত শরীর পরিচ্ছন্ন রাখতে গোসল করি, আমাদের মধ্যে কতজন নিয়মিত 'স্পিরিচুয়াল শাওয়ার' নেন? অনেক দিনের ময়লা জমে জমে তাদের আত্মা যে দুর্গন্ধযুক্ত হয়ে যায়, সেটা আশপাশের সবাই টের পায় - কেবল তারাই টের পান না। 

যা হোক, আত্মা, স্পিরিট - এসব নিয়ে আমার আগ্রহের কমতি নেই, তাই স্পিরিচুয়াল শাওয়ার জাতীয় ব্যাপার স্যাপার আমি ঘেঁটে দেখেছি মোটামুটি (Click this link...,Click this link..., Click this link...); কিন্তু বারবারই যে অংশটা আমার মনোযোগের বাইরে ছিল - তা হল শরীর, শরীরের যত্ন - সুন্দর চরিত্র গঠনের জন্য শরীরের যত্নের প্রয়োজনিয়তা। আমার মা সারাজীবনই অভিযোগ করে এসেছেন আমার মত শরীরের হেলাফেলা করা মানুষ নাকি তিনি আর একটি দেখেন নি। সকালে না খেয়ে বের হয়ে যাওয়া, কাঠফাটা রোদ মাথায় নিয়ে শুধুশুধু ঘুরে বেড়ান, ফচফচে নাক নিয়ে ঝুপ করে বৃষ্টিতে ভেজা, সারারাত বাতি নিভিয়ে কম্পিউটারের মনিটরে তাকিয়ে থাকা - আর কত বলব? কেন জানিনা, নিজের যত্ন নেয়াটা আমার কাছে আদিখ্যেতা মনে হত। শরীরকে আদু আদু করাটা মনে হত বিলাসিতা। 

মোখতার মাগরুবির এই টক শুনে নতুন করে শরীরটার কথা একটু মনে করলাম। মনে পড়ল, শেষ বিচারের দিনে আমার অঙ্গ প্রত্যঙ্গ আমার বিরূদ্ধে নালিশ জানাবে, যে আমি তাদের প্রতি অন্যায় করেছি, তাদের দিয়ে আল্লাহর অপ্রিয় কাজ করিয়েছি। আমারই হাতের আঙুল কিনা বলবে আমি কী বোর্ডে অলস হাত বুলিয়েছি, যখন এতিম কারো মুখে ভাত তুলে দেয়ার কথা ছিল? 

আমি জানিনা, নালিশ বলতে আমি দু'টো পক্ষ বুঝি, বাদী আর বিবাদী। এক পক্ষ অন্যায় করে, অপর পক্ষ সে অন্যায়ের বিরূদ্ধে নালিশ করে। আমার চোখ যখন বাদী হয়ে যাবে - তখন ত সে আর আমার না, সে ত 'আমার' চোখ না। সে একটা নিজস্ব এনটিটি, যার কিনা নিজের মত করে ন্যায় অন্যায় বোঝার ক্ষমতা আছে। এই চিন্তাটা হঠাৎ করেই আমাকে ভয় পাইয়ে দিয়েছে। এভাবে এক এক করে আমি যদি চোখ, নাক, কান, মুখ, হাত, পা সবাইকে বাদ দিতে থাকি, তাহলে আমি আর 'আমি' রইলাম কই? 

বুঝতে অসুবিধা হচ্ছে? চোখটা বন্ধ করুন, করে নিজের শরীরের দিকে তাকান (মনে মনে); তারপর পা দুটো বাদ দিয়ে বাকি অংশটাকে নিজের মনে করুন, তারপর কোমরের নিচ থেকে সবটুকু বাদ দিয়ে বাকিটাকে নিজের মনে করুন... এভাবে সব বাদ দিতে দিতে শেষ পর্যন্ত এসে দাঁড়াবে আমার মস্তিষ্কটুকু কেবল আমার, বাকি সব আল্লাহর থেকে বর্গা দেয়া কিছু কর্মচারি। ওহো! না না! মস্তিষ্কও ত বলে বসতে পারে, সে আমাকে মানুষের নামে খারাপ চিন্তা করতে বাধ্য করত... তাহলে আসলে কেবল মাত্র রয়ে যায় আমার স্বাধীন ইচ্ছা - যা কিনা আর সব... সব কিছুকে নিয়ন্ত্রণ করছে। আমার স্বাধীন ইচ্ছার বিরূদ্ধে সাক্ষ্য দেবে আমার প্রত্যেকটা ইন্দ্রিয়, প্রত্যেকটা অঙ্গ - আমার আত্মা, আমার নফস ... শেষ পর্যন্ত ভয় পেয়ে আবিষ্কার করলাম, যত বেশি দয়া, তত বেশি আমানত। আমি আমার পায়ের প্রতি ইহসান দেখাচ্ছি ত? কিডনীর প্রতি? মাথার চুলগুলোর প্রতি? আল্লাহ কি জানতে চাইবেন না, তোমাকে তাহলে দু' দুটো ভাল কিডনী দেয়ার দরকার কী ছিল, যদি একুশ বছর বয়সেই সেগুলো ড্যামেজ করে বসে থাক? 

এই প্রচন্ড ভয়ের অনুভূতিটা থেকে আমি ঠিক করলাম আল্লাহর এই আমানতগুলির যত্নআত্তি শুরু করব। কোন ফ্যাক্টরি যুগের পর যুগ এমনি এমনি চলে আসার পর হঠাৎ করে মেইনটেন্যান্সের প্রয়োজন পড়লে একটা প্রাথমিক সার্ভে করে নিতে হয়। তাই আমি ঠিক করলাম, ওদের সাথে কথা বলব। সত্যি সত্যি, একদিন ঘুমোতে যাওয়ার আগে চোখকে জিজ্ঞাসা করলাম, ও চোখ! তুমি কেমন আছ? চোখ ধমকের সুরে উত্তর দিল, ভাল থাকব কীভাবে? তুমি জীবনে আমাদের কোন যত্ন নাও? আমি মাথা চুলকে বললাম, কী মুশকিল! কেন কেন? চোখ ঠিক মধ্যবয়সী ঘেঁয়ো কুকুরের মত একঘেঁয়ে সুরে বলল, দুই বছর হয়ে যাচ্ছে একটা ভুল পাওয়ারের চশমা পরে কাটিয়ে দিচ্ছ, আমার লেন্স এডজাস্ট করতে কত কষ্ট হয় তা জান? তারপর কথা নাই বার্তা ল্যাব এ কাজ করার মধ্যে হাত না ধুয়ে চোখ রগড়ানো শুরু করলে, তোমার হাতে সেদিন কী রিএজেন্ট লেগে ছিল জান? 

আমি ভয় পেয়ে স্যরি টরি বলে প্রতিজ্ঞা করলাম, এক সপ্তাহের মধ্যে চোখ দেখিয়ে নতুন চশমা নেব। 

গেলাম দাঁতের কাছে। ভীষণ অভিমান করে দাঁত জানাল আমি নাকি ভুলেই যাই তাদের কোন রকমের চাহিদা থাকতে পারে। এমনি করে নাক, কান, ফুসফুস, হৃদপিন্ড, মস্তিষ্ক - সবার অভাব অভিযোগ শুনতে শুনতে আর নিজেকে গাল দিতে দিতে পৌঁছলাম পাকস্থলির কাছে। দিব্যদৃষ্টিতে দেখতে পাচ্ছিলুম, সে কী বিরাট অভিযোগের ডালি খুলে বসবে। তাই আর সেদিন সাহস করে পাকস্থলির সাথে কথা বলতে পারিনি। 

এমনি করে বাকহীন, বুদ্ধিহীন যন্ত্রগুলোকে একটা বড় ফ্যাক্টরির কর্মচারি ভেবে কথা বলতে বলতে আমি যেন সত্যি চোখের সামনে এদের অর্গানাইজেশনটা দেখতে পাচ্ছিলাম। এরা প্রত্যেকে নিজেদের কাজ সম্পর্কে খুব ভাল ধারণা রাখে, এবং নিজেদের কাজ নিখুঁতভাবে করতে ওয়াদাবদ্ধ। একজনের কাজ ঠিকমত না হলে অন্যজনও একটু সমস্যায় পড়ে যায়, কিন্তু তাই বলে অন্যের কাজের উপর সর্দারি করেনা মোটেও। প্রত্যেকেই জানে, তারা সবাই মিলে একটা মহান লক্ষ্যের অংশীদার, তা হচ্ছে, 'আমি' নামক এই মাথামোটা মানুষটিকে কর্মক্ষম রাখা। তাই এদের একজন ছোটখাট বিগড়ে গেলেও অন্যান্য সব অঙ্গ তাদের দায়িত্ব আরেকটু বাড়িয়ে দিয়ে মহান লক্ষ্যটাকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে। 

ফ্যাক্টরির রুট লেভেলের প্রত্যেকটা কর্মচারিই তাদের দাবিদাওয়া গুলো বিভিন্ন ভাবে পেশ করে। কিন্তু মাথামোটা কর্মকর্তা অনেক সময় ওসব পাত্তা না দিয়েই তার পছন্দমত যা ইচ্ছে করে যায়। যেমন দশ বারো ঘন্টা শরীরে গ্লুকোজ না দিয়ে হঠাৎ করে একগাদা চকলেট খেয়ে ইনসুলিন কোম্পানিকে ঝামেলায় ফেলে দেয়। প্রচন্ড রোদ্দুরে মস্তিষ্কের তাপমাত্রা ঠিক রাখার জন্য যেটুকু পানি খাওয়া দরকার - সেটুকু না দিয়েই আশা করে মস্তিষ্ক বাবাজি ঠিকঠাক মত কাজ করবে। এ যেন স্বেচ্ছাচারি শাসকের যাচ্ছেতাই ফরমায়েশ! আমার অন্যায় অত্যাচার তাদের চোখে দেখতে গিয়ে আমারই উপর আমার রাগ ধরে যাচ্ছিল। 

শুধু তাই নয়, এই অসম্ভব সিনসিয়ার, নিখুঁত, এত বড় একটা কর্মযজ্ঞ - কোন রকম বিশ্রাম না নিয়ে কাজ করে যাচ্ছে, করেই যাচ্ছে - কী জন্য? কেবলমাত্র 'আমি', অর্থাৎ হাত পা চোখ কান সব বাদ দিয়ে যে একরত্তি আমি থাকি - সেই 'আমি'র সব রকমের চাওয়া পূরণ করার জন্য। মনে হতেই মনে হয়, বাব্বাহ! আমি এত স্পেশাল? ঝানতাম নাহ! কিন্তু আত্মপ্রসাদের আনন্দটুকু থিতু হতে না হতেই নক নক করে মনের দরজায় টোকা মারে আরো একটি প্রশ্ন, কেন? 

সত্যিই, কেন? আমার স্বাধীন ইচ্ছা, যে ইচ্ছা আমাকে আট ঘন্টা ঘুমাতে বাধা দেয়না, ঘন্টার পর ঘন্টা ওয়েবসাইটগুলোতে শপিং ডিল খুঁজে বেড়ানোর সময় বাধা দেয়না, ভাত খাওয়ার সময় একটা টিভি সিরিয়াল দেখতে হবেই, আমারো ত বিশ্রাম প্রয়োজন - এমন অজুহাতে কাজের অকাজের সব রকমের চাওয়া চাপিয়ে দেয় আমার আজ্ঞাবহ শরীরটার উপর - শেষ বিচারের দিনে তা ঠিকঠাক মত আমার চাওয়া পূরণ করবে ত? ভাবতে ভয় হয়। 

মোকতার মাগরুবির সেই টক, আর উপরে লেখা হাদীসটা আমাকে খুব ভাল করে মনে করিয়ে দিয়েছে, এই পৃথিবীতে আমার সময় কেবলই কিছু কর্তব্যের সমষ্টি। আমি আমার কর্তব্যগুলো কত ভালভাবে পালন করতে পারি তা দিয়েই নির্ধারিত হবে আমার সাফল্য। এতদিন পর্যন্ত কর্তব্য বলতে ভাবতাম স্ত্রী হিসেবে কর্তব্য, কন্যা হিসেবে কর্তব্য. মুসলিম হিসেবে কর্তব্য। সেদিনের পর থেকে যোগ হয়েছে, রূহধারী দেহটার প্রতি কর্তব্যও। 


উৎসর্গ: মেয়েদের শরীরচর্চার প্রয়োজন আছে কি নেই, বা থাকলেও এর ব্যপ্তি কতটুকু - তা নিয়ে চিন্তা করেন এমন সকল ব্লগার ভাই ও বোনেরা।

Friday, April 20, 2012

আর্ট অব এপ্রিসিয়েশন - ৪

অপ্রিয় সত্যটাকে অস্বীকার না করেও কীভাবে ভাল দিকগুলো তুলে আনা যায় - সেটা বোঝাতেই এই সত্য/অর্ধসত্য/কাল্পনিক ঘটনাগুলোর অবতারণা 


আজকে নাহিয়ান আর আসাদের গল্প করার দিন। দু'জনেরই বেশ খানিকটা অবসর, তাই গল্পের ডালি খুলে বসেছে দু'জনে। ওদের বিয়ে হয়েছে দুই তিন মাস হল। এখনও অনেক কিছু জানার বাকি, তাই একথা সেকথা থেকে দু'জনেই ফিরে গেল শৈশবে। 

(নাহিয়ান): আমি ছোটবেলা খুব বাবার ভক্ত ছিলাম। বাবা বাইরে যেতে নিলে পা জড়িয়ে ধরে রাখতাম। ঘরে আসলেই আবার বাবার কোলে। 

(আসাদ): আমি ছিলাম প্রচন্ড মায়ের ন্যাওটা। আম্মুর সাথে সাথেই ঘুরতাম, আম্মু ঘরের কাজ করত, আমি তার সাথে বসে থাকতাম। আমার যন্ত্রণায় কাজই করতে পারত না। 

(নাহিয়ান): হ্যা, আম্মুও আদর করত, কিন্তু বাবা সবসময় থাকত না ত, বাসায় আসলে আমার সাথে খেলা করত... তারপর বিকেল বেলা আব্দার করলে শিশুপার্ক, নিউমার্কেট - এসব জায়গায় নিয়ে যেত - খুব মজা! তারপর একবার আব্বু ঢাকায় গিয়েছিল, আসার সময় আমার জন্য ৩-৪ টা পুতুল, গল্পের বই, রং - অনেক কিছু এনে দিয়েছিল। এই জন্য আমার কাছে বাবা মানেই আনন্দ ছিল। 

(আসাদ): শাসন করত না? 

(নাহিয়ান): নাহ্! বড় হওয়ার পরে করেছে, কিন্তু এমনিতে খালি আদরই করত। 

আসাদের মুখটা আস্তে আস্তে কাল হয়ে গেল। ধীরে ধীরে বলল, 'তুমি খুব লাকি, নাহিয়ান! তোমার শৈশব খুব সুন্দর ছিল।' 

- কেন, তোমার ছিল না? 

- আমার সারা জীবনে কোনদিন কোন খেলনা ছিলনা। 

- তো কী হয়েছে? কত বাচ্চারই ত থাকেনা। তোমাদের ত কিছুটা অস্বচ্ছলতা ছিল, খেলনা কেনার মত বিলাসিতাটা হয়ত উনারা করতে পারেন নি। এতে মন খারাপ কর কেন? 

আসাদ মৃদু হাসে, 'তোমার কি মনে হয়, আমি এত অকৃতজ্ঞ যে আমার বাবা মায়ের অক্ষমতা নিয়ে অভিযোগ করব? ব্যাপারটা তা ছিলনা।' 

- তাহলে? 

- আমার বাবা কোনদিন আমাকে বাবার আদর দিয়ে বড় করেন নি। 

- কী বল তুমি? আমার শ্বশুরের মত ভাল মানুষ কয়টা হয়? আমাকেই ত কীরকম আদর করেন!! 

- হ্যা, উনি পৃথিবীর সবার কাছে ভাল মানুষ। কেবল স্ত্রী, সন্তানদের জন্য উনার কোন দায়িত্ব আছে, এটা তিনি মনে করতেন না, এখনও করেন না। খেলনা বল, বেড়ানো বল, কাপড় চোপড় বল.. কোন কিছুই উনার কাছে মনে হতনা যে এটা আমার পরিবারের মানুষদের জন্য দরকার। সামান্য যে ক'টা টাকা আয় করতেন, বাসায় বাজারটা করে দিয়ে বাকি টাকা নিজের ভাই ভাবীর পরিবারে খরচ করতেন। 

- উনাদের হয়ত আরো বেশি দরকার ছিল! 

- মোটেই না, উনারা খুবই স্বচ্ছল, নিজেদের ব্যবসাপাতি আছে। 

- তাহলে? 

- জানি না। একবার আমার মনে পড়ে বাজার থেকে বেশ কিছু খেলনা, বাচ্চাদের জিনিস কিনে আনেন। সব আমার চাচাত ভাই বোনদের জন্য, আমার বয়স তখন সাত। 

- কেন? 

- জানিনা। 

আসাদের মুখের বিমর্ষতা কেটে আস্তে আস্তে ভর করে ক্ষোভ। অস্ফুট স্বরে বলতে থাকে, 'আম্মু চাচাদের বাসায় কত অসম্মান পেয়েছে, আমার বাবা পাত্তাও দেয়নি। বড় হওয়ার আগ পর্যন্ত বাবা আমাদের কাছে কেবলই ভয়ের ব্যাপার ছিল। পড়ার টেবিলে না পেলে মারবেন, এ ছাড়া বাবার সাথে আমার আর কোন শৈশব নেই।' 

বলতে বলতে নাহিয়ানের দিকে তাকিয়ে দেখে ওর চোখে টলটল করছে পানি। 'আরে! এ্যই মেয়ে, কান্না করছ কেন? তোমাকে ত আর কিছু বলাই যাবে না দেখি।' আসাদ মুখোমুখি বসে চোখের পানি মুছিয়ে দিতে থাকে। নাহিয়ান একটু ধাতস্থ হলে আবার কথা শুরু করে - 

- কান্না কর কেন? এটা এমন কী কষ্ট? মানুষ আরো কত কষ্টে থাকে না? কারো ত বাবাই থাকে না! 

- তারপরেও, যার যার স্ট্রাগল তার তার। তুমি যে কষ্ট পাওনি তা ত না। 

- না, কষ্ট পেয়েছি এটা অস্বীকার করব না। কিন্তু দেখ, এতদিন পরে পেছনে তাকিয়ে মনে হয়, আমি আজকে যে মানুষটা হয়েছি, তার জন্য এ ঘটনাগুলোর অবদান আছে। 

- কীরকম? 

- আমি এগুলো পাইনি দেখেই বুঝি বাবা হিসেবে, স্বামী হিসেবে দায়িত্বগুলো পালন করা কত জরুরি। আমার বন্ধুবান্ধবদের অনেকের মধ্যেই বিয়ে মানে একটা ফ্যান্টাসি, একটা মেয়ের সাথে ২৪ ঘন্টা থাকা - এটুকুই। তোমার মনে আছে, তোমার বাবা যখন তোমার হাতটা আমার হাতে তুলে দিল, আমি কী বলেছিলাম? 

- হুঁ, বলেছিলে, 'আপনারা যে বিশ্বাস নিয়ে ওকে আমার হাতে দিলেন, দোয়া করবেন যেন তার সবটুকু মর্যাদা রাখতে পারি।' 

- আমি সত্যিই মনে প্রাণে এটাই বিশ্বাস করি। 

- আমি জানি। 

- তারপর দেখ, তোমরা অনেক নিরাপত্তা পেয়ে বড় হয়েছ। তোমার বাবা ছিল বিপদ আপদ দেখার জন্য, মা তোমাদের মানসিক শক্তি দিয়েছেন, সে তুলনায়, আমরা ভাইবোনেরা অনেক ছোট থেকেই জানি, আমাদের জন্য মাথার উপর কেউ নেই। আমার মা এত সরল, উনি আমাদের সামলাবেন কী, আমাদেরই উনাকে মানসিক শক্তি দিতে হয়েছে। সে জন্য আমরা ভাইবোনেরা, মা - সবাই একটা ইউনিট এর মত ছিলাম। এখনও ত তুমি বল, আমাদের মধ্যে বন্ধনটা অনেক বেশি। 

- হ্যাঁ, তোমরা ভাইবোনেরা যেভাবে একাত্মা হয়ে আছ, এটা এখন আর অত দেখা যায় না। 

- তাছাড়া, তোমাকে ত বললামই, আত্মীয়দের থেকেও অনেক সময় কষ্ট পেয়েছি। তাই বন্ধুবান্ধব, প্রতিবেশী, যেই হাত বাড়িয়ে দিয়েছে, আপন মানুষের মত দেখেছি। 

- হুঁ, তুমি মানুষকে খুব দ্রুত আপন করে নিতে পার। 

- কী করব বল, আমাদের একমাত্র আনন্দ ত ছিল হিউম্যান ইন্টারঅ্যাকশনেই। টিভি নেই, গল্পের বই কেনার টাকা নেই, ঘুরতে যাওয়ার উপায় নেই... আড্ডা দিতাম, ওটাই আনন্দ। 

- হ্যা, আমি নতুন জায়গায় গেলে ভয় লাগে, মানুষের সাথে মিশতে ভয় পাই, তুমি পাওনা, দেখেছি। 

- প্লাস সবসময় মাথায় ছিল ভাল পড়াশুনা না করলে এই অবস্থা থেকে কোনদিন বের হতে পারব না। দাঁতে দাঁত চেপে কেবল পড়াশুনা করেছি। আমার মধ্যে একটা বাধনছেঁড়া ভাব আছে। এখন মনে হয়, পরিবারের এই চাপটা না থাকলে আমি মনে হয় ঠিক থাকতাম না। 

- কী জানি! 

- সবকিছু মিলিয়ে আমার এখন আর কোন দুঃখ নেই, জান! আমার মনে হয় দুঃখের সময়গুলো আমার জন্য ট্রেইনিং পিরিয়ড ছিল। উৎরে যেতে পেরেছি বলেই এখন এখানে আছি এবং তোমাকে পেয়েছি। 

নাহিয়ানের ভেজা গালে খুশি আর লজ্জা মিলে অদ্ভুত এক রং দেখা দিল। আসাদ আরও একবার মেয়েটার সরলতা দেখে অবাক হল।

Tuesday, April 17, 2012

আর্ট অব এপ্রিসিয়েশন - ৩


অপ্রিয় সত্যটাকে অস্বীকার না করেও কীভাবে ভাল দিকগুলো তুলে আনা যায় - সেটা বোঝাতেই এই সত্য/অর্ধসত্য/কাল্পনিক ঘটনাগুলোর অবতারণা 


আরও একটা কর্মব্যস্ত দিন। অনিকের এখন ছুট.. ছুট... ছুট করে কাজ নিয়ে ব্যস্ত থাকার কথা ছিল। কিন্তু সে অলস পড়ে আছে বিছানায়, জানালা দিয়ে আকাশ দেখছে। সামনের দিনগুলো কী হবে - কিছুই বলতে পারেনা। 

অনিক ভাবতেও পারেনা দেড় বছর পর এক কথায় তাকে ল্যাব থেকে বাদ দিয়ে দিতে পারে। তার শখের রিসার্চ, দেড় বছরের ডাটা - সব ফেলে দিয়ে আবার নতুন করে শুরু করতে হবে। অন্য কোন ল্যাবে গিয়ে ধর্ণা দিতে হবে, ওর কত প্রিয় ছিল এই কাজটা! কোন মুখে নতুন কোন ল্যাবে যাবে সে? নিশ্চয়ই পুরো ডিপার্টমেন্টে চাউর হয়ে গেছে, গত বছরের এই পিএইচডি স্টুডেন্টটা কিক্ আউট হয়েছে - সবাই কী ভাবছে.. সব শেষ হয়ে গেল... কীভাবে আবার শুরু করবে? পিএইচডির পাঁচ বছরের বেঁধে দেয়া সময়ে নতুন ল্যাবে ঢোকা, নতুন জিনিস নিয়ে আবার শিখতে শুরু করা, প্রজেক্ট গুছানো ... এত কিছু করে আদৌ কি সে আর শেষ করতে পারবে পিএইচডি? দেশে থাকা মায়ের মুখটা মনে পড়ে অনিকের। কী লজ্জা! কী লজ্জা!! কেউ নেই পাশে সাপোর্ট দেয়ার মত... কী অপ্রয়োজনীয়, অপদার্থ লাগছে! মাথা তুলে চারদিকে তাকাতেও লজ্জা, ঘেন্না হচ্ছে। 

ল্যাবটার কথা বারবারই মনে পড়ে তার। কাজটা ভাল হলেও, ল্যাবের মানুষগুলোর আসলে সাথে কখনোই তার বনিবনা হয়নি। ওরা বেশ উন্নাসিক, আড়ালে একজন আরেকজনের নামে বাজে কথাও বলে। ওর সুপারভাইজর, ব্যস্ত মানুষ, তার সাথে কোন অন্তরঙ্গতাই হয়নি কখনো, তিনিও ল্যাবের পুরনোদের কথা বেশ গুরূত্ব দেন, যাচাই না করেই। ল্যাবের অনেকেই পুরনো ল্যাব মেম্বারদের তোয়াজ করে চলত। পুরো পরিবেশটাই ওর খুব বাজে লাগত। এমনকি কাজটা... কাজের ফিল্ডটা এক্সাইটিং হলেও, ওকে একই কাজ বারবার করতে হচ্ছিল, নতুন কিছু শিখছিল না, সুপারভাইজর নতুন কোন কাজ করতে খুব একটা উৎসাহও দিত না। কাজটাও এত গোলমেলে, ঠিকঠাক মত কোন রেজাল্ট পাওয়া যায় না। 

নাহ! কাজটা যত সহজ আর আনন্দের মনে হত, আসলে ততটা ছিলনা, একই কাজ করতে করতে একঘেঁয়েমি পেয়ে বসত, তার উপর রেজাল্ট না পেলে হতাশ লাগত। তার উপর ল্যাবের মানুষগুলোর কারণে ওর ল্যাবের জন্য টানটাও ছিল না। মানুষ পিএইচডি করাকালে সুপারভাইজরের থেকে কত কিছু শেখে, ওর সুপারভাইজরের সময় কোথায়? সপ্তাহে দু'বার মিটিং ছাড়া আর কখনও তাকে দেখাই যায়না। আর তাকে সবাই এত ভয় পায়, যে সত্যিকারের মেন্টরশীপ আদৌ গড়ে উঠত কিনা সন্দেহ। যা হয়েছে ভালই হয়েছে, পাঁচ বছর এই বাজে পরিবেশে থাকতে হয়নি। 

কিন্তু দেড় বছর যে নষ্ট হল? আর মোটে সাড়ে তিন বছরে নতুন কাজ খুঁজে শুরু করা, প্রথম থেকে? পারবে ত সে? ভাবতে ভাবতে তার মনে পড়ল, গত বছর একটা কোর্সে এক ফ্যাকাল্টি কে দেখে ওর ভাল লেগেছিল, ভদ্রলোক খুব অমায়িক, ওদের কাজগুলোও মজার। তাছাড়া সে ল্যাবে ওর খুব কাছের একজন বন্ধু কাজ করে, পড়াশুনার গ্যাপটা বন্ধুর সাথে আলোচনা করেও অনেকটা পুষিয়ে নিতে পারবে। তাছাড়া, সে বন্ধু সবসময় বলে ওদের ল্যাবে অনেক ফ্লেক্সিবিলিটি। সুপারভাইজরের নতুন নতুন কাজ করতে খুব উৎসাহ! চেষ্টা করে দেখতে ক্ষতি কী? 

ভাবতে ভাবতে বিছানা থেকে উঠে বসল অনিক, নাহ! এক্ষুণি বন্ধুকে একটা ফোন দিতে হবে। আর সে ভদ্রলোকের সাথেও একটা এপয়েন্টমেন্ট নেয়া দরকার। অনেক কাজ, শুয়ে থাকলে হবে না।

Sunday, April 15, 2012

আর্ট অব এপ্রিসিয়েশন - ১

মৌমিতার প্রাণের বন্ধু আসমার মুখ ভার, চোখমুখ কাল, প্রায় কাঁদকাঁদ মুখ। মৌমিতা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। আসমা যে অফিসে কাজ করে সেখানে এক উচ্ছ্বল, উদার হৃদয়ের যুবককে মনে ধরে গেছে আসমার। কিন্তু প্রাণে ধরে কখনই সে কল্পনা করতে পারেনা, তাকে কারও পছন্দ হতে পারে। হবেই বা কী করে? গায়ের রং, শারীরিক গঠন - সব কিছু নিয়ে কি কম কথা শুনতে হয়েছে সারা জীবন? তাও যদি দাঁতগুলো একটু সুন্দর হত! আসমার ভুসো মাখানো মুখটাতে রঙের খেলা বোঝা যায়না, তবু মৌমিতা বুঝতে পারে ফেরেশতাসম সুন্দর মনের এই মেয়েটার মনে কত দুঃখ। কী বলবে বুঝতে পারেনা। আসমাই এক সময় মুখ খোলে - 

'আমার মনে হয় কখনো বিয়ে হবে না রে!' 

কেন? 

কে বিয়ে করবে আমাকে? 

কেন? 

আমি কত কুচ্ছিত। 

তুই কুচ্ছিত হলি কোন দিক দিয়ে? 

ওমা! তোর কি চোখ নেই? আমার গায়ের রং দেখেছিস? চেহারা দেখেছিস? মানুষ হাসলে কত সুন্দর দেখায়... আমি হাসলে... কে বিয়ে করবে আমাকে? 

কী সব যা তা বলিস? তোকে ভালবাসবে না যে ছেলে সে আসলে তোকে পাওয়ার যোগ্যই না! 

ধ্যেৎ! শুরু হল তোর কথার খেলা। 

আচ্ছা, ঠিক আছে। আগে বল, সৈকত ভাই তোর সাথে কথা বলে? 

ম্... বলে ত! 

সুন্দর করে? 

হ্যা! ভালই ত, ভদ্র ব্যবহার। 

আচ্ছা! তাহলে বল, তোর সাথে কথা বলার আগে ত উনাকে তোর চেহারা দেখতে হয়েছে, এমন ত না যে চোখ বন্ধ করে কথা বলেছে। 

হ্যা, ত? 

ত, উনি ত তোকে ঘৃণা করেন না। করেন? 

ন্ না... 

ত, চেহারার আকর্ষণের পর্যায়টা ত উনি পার হয়েই এসেছেন, তাই না? 

হ্যা। তাতে কী? 

মানুষ ত চেহারা দেখে প্রথম পরিচয়ে, তারপর ত চেহারাটা কেবলই মুখ চেনার জন্য। বাকিটা চেনাজানা ত হয় মনের চেহারা দিয়ে। 

হু, কী বলতে চাচ্ছিস? 

দ্যাখ, তুই খুব গভীর চিন্তা চেতনার একটা মেয়ে। তোর মনটা খুব স্বচ্ছ। যখন কথা বলিস, ফালতু কথা বলিস না, আন্তরিকতা নিয়ে, চিন্তাভাবনা করে কথা বলিস। এতদিন হয়ে গেল, কখনও তোকে হিংসা করতে দেখলাম না, কাউকে নিয়ে খারাপ কথা বলতে দেখলাম না... তোর চালচলন, পোশাক আশাকে সুরুচির পরিচয় পাওয়া যায়। তুই শুধু গাধার মত পড়াশুনাই করিস নি দিন রাত, অনেক দায়িত্ব নিতে শিখেছিস, যে কোন কাজ দিলে গুছিয়ে টিপটপ করে করে ফেলতে পারিস। বল্, আমি কোন মিথ্যা বলেছি? 

 

তাহলে বল, সৈকত ভাই কি এতই অন্ধ যে এসব কিছুই উনার চোখে পড়বে না? 

আমি জানি না... 

তুই ত লুকিয়ে প্রেম করবি না, ভাল লাগলে বাসায় প্রস্তাব পাঠাতে বলবি। হলে হল, না হলে নাই। 

তাও... 

অ্যাই! তোর এসব ইয়ে বাদ দে ত! আমার কথাটা লিখে রাখ্, কোন মেয়েই তোর চেয়ে ভাল অপশন হতে পারে না। 

পাম্প মারিস? 

নাআআ... মানলাম তুই ডানাকাটা পরী না। ডানাকাটা পরী হলে কী হত? সৈকত ভাইয়ের চোখ ধাঁধাত, তারপর ভেতরটা বাইরের মত না হলে একসময় আগ্রহ হারিয়ে ফেলত। আর এখন? তোকে যদি একবার কাছ থেকে চেনে, তারপর থেকে যতই চিনবে, ততই আরও বেশি মুগ্ধ হবে। There is no way anyone will like you less over time. 

ইস্! তুই যে এসব কথা কোথায় পাস!!  

মিথ্যা বলেছি? বললে আমার কান কেটে নিস, যা! > 

Tuesday, April 10, 2012

কনফিউজড, কী করি?

যে বিষয়টা নিয়ে লিখতে শুরু করেছি তা নিয়ে লেখা আমাকে একেবারেই সাজে না। খুব ছোট বিষয়েও আমি এত বেশি চিন্তাভাবনা করা শুরু করে দেই যে মূল উদ্দেশ্য থেকে বেশ দূরে সরে আসি। এই যেমন, কয়েকদিন আগে আমার একটা বেশ কঠিন প্রেজেন্টেশন ছিল। প্রায় দেড় মাস ধরে এর জন্য দিন গুনছিলাম। একাডেমিক এসব টকগুলোতে মোটামুটি ফরমাল কাপড় পরে টক দিতে হয়। আমি সাধারণত এই ব্যাপারগুলো একেবারেই মাথায় রাখি না। কিন্তু এটা বড় পরীক্ষা হওয়ায় যেই না একটু মাথায় আনলাম, ওমা! একেবারে সিন্দাবাদের ভূত এর মত রাজ্যের চিন্তা ঘাড়ে চেপে বসল। ফরমাল কী? ফরমালিটির এ মাপকাঠি কে ঠিক করেছে? আমার প্রেজেন্টেশনে ওরা যাচাই করবে আমি কতটুকু জানি, কী পরলাম তাই নিয়ে গাত্রদাহের প্রয়োজন টা কী? আমি একটু কিছু পরে আমাকে খারাপ না দেখালেই ত হল। ওদের চোখে ফরমাল না ইনফরমাল তা দিয়ে কী এসে যায়? ইত্যাদি ইত্যাদি... 

ত যা হয়, এত রকমের চিন্তায় খেই হারিয়ে ছোট বিষয়ও অনেক বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়ায়। তবে এই প্রক্রিয়ার মধ্যে পড়ে একটা বিষয় আমার ভালভাবে শেখা হয়ে গেছে - কীভাবে সিদ্ধান্ত নিতে হয়। খুবই সহজ একটা উপলব্ধি, পাঠকদের প্রত্যেকে আশা করি সিদ্ধান্ত নিতে সিদ্ধহস্ত, তবু লিখছি। শার্লক হোমস তার রহস্যের সমাধান নিজে নিজে করলেও ওয়াটসন কে তার এত প্রয়োজন ছিল কেন জানেন? ওয়াটসনকে বুঝিয়ে বলার জন্য হোমস কে ধাপে ধাপে ব্যাখ্যা করতে হত। যে কোন জটিল বিষয়ই ছোট ছোট ভাগ করে নিলে সমাধান করাটা অনেক সহজ হয়ে যায়। সিদ্ধান্ত নেয়ার এই প্রক্রিয়াটা তাই লিখছি, যাতে আমরা প্রত্যেকেই নিজের সাথে ঝালাই করে নিতে পারি। 

ফিরে যাই আবারো সেই কাপড়ের বিষয়ে। যেহেতু ফরমাল বলতে কী বুঝায় সেটা নিয়েই একটু সন্দেহ ছিল, নেট এ একটু ঘাঁটাঘাঁটি করে বুঝলাম এর কোন ধরে দেয়া মানদণ্ড নেই। যে ক'টা উদাহরণ পেলাম, তার কোনটাই আমার জন্য খাটে না। তবে ধরণ দেখে মোটামুটি একটা আন্দাজ পেয়ে আমার নিজের যে কাপড়গুলো ছিল সেগুলো দিয়ে ট্রায়াল দিলাম। দেখে শুনে দুই তিনটা বাছাই করে রাখলাম। তারপর আমার বেচারা বান্ধবীদের মতামত জানতে চাইলাম, কারো পছন্দ কারো সাথে মিলল না। বুঝলাম, এর যে কোনটাই মোটামুটি উতরে যাওয়ার যোগ্যতা রাখে। 

এই ঘটনাটায় সিদ্ধান্ত নেয়ার দু'টো গুরূত্বপূর্ণ ধাপ মেনে চলা হয়েছে। যে কোন সমস্যায় প্রথম কাজ হচ্ছে সেটা নিয়ে নিজে ব্রেইনস্টর্ম করা। সরাসরি সিদ্ধান্তে চলে না গিয়ে মোটামুটি সমস্যাটা কী, কেন হচ্ছে, আমার জানায় কোন গ্যাপ আছে কি না, এ ধরণের সমস্যায় অন্যরা কী করে - এ সব গুলো বিষয়ে একটা মোটামুটি হোমওয়ার্ক করে রাখলে সুবিধা হয়। তারপর যা যা জানলাম, তার উপর ভিত্তি করে কিছু সম্ভাব্য অগ্রগতি চিন্তা করে রাখা যায়, এই ধাপে 'কী' ফলাফল ঠিক করলাম সেটা গুরূত্বপূর্ণ না, গুরূত্বপূর্ণ হচ্ছে 'কেন' আমি এই ফলাফল টা পছন্দ করলাম। এই যেমন জামাগুলোর ক্ষেত্রে কোনটাই আমি শেষ পর্যন্ত পরি নি, কিন্তু রং, ফিটিং, প্যাটার্ণ - সবকিছু নিয়েই কিছুটা সময় বাছ বিচার করেছি। 

নিজে নিজে হোমওয়ার্ক শেষে বিষয়টা নিয়ে অন্যদের সাথে আলাপ করেছি। এই ধাপটা খুবই, খুবই গুরূত্বপূর্ণ, কেন একটু পরে বলছি। আলাপ করাতে কী হল, একেকজন একেকটার পক্ষে রায় দিল। এতে করে আমার বিচারটা যে মোটামুটি ঠিক আছে সে আত্মবিশ্বাসটা পেলাম। কাপড় না হয়ে বিষয়টা যদি আরো গুরুতর হত (এই যেমন সুপারভাইজরের সাথে সমস্যা), তখন আমার আগে থেকে করা হোমওয়ার্কের ভিত্তিতে তা নিয়ে আরো বিশদ আলোচনা করা যেত। এতে করে শুধু যে আরো শক্তপোক্ত সিদ্ধান্ত নেয়া যেত তাই না, সে মানুষটার দৃষ্টিভঙ্গি সম্পর্কেও আরো ভাল জানা যেত। মেডিটেশন কোর্সে একটা কথা বারবার বলত, 'পয়েন্ট অব রেফারেন্স' বাড়াতে হবে। একটা নতুন মানুষের সমস্যাকে সমাধান করার ধরণ একটা নতুন পয়েন্ট অব রেফারেন্স। কে জানে, ভবিষ্যৎ জীবনে কোন একটা পর্যায়ে গিয়ে হয়ত আমি তার মত করে সমস্যাগুলো কে দেখতে চাইব! 

এছাড়া এর কিছু সেকেন্ডারি সুবিধা আছে। মতামত চাওয়া মানেই একজনের বিচার বুদ্ধির প্রতি সম্মান প্রদর্শন। আমি ব্যাপারটা মনে না রাখলেও অপরজন এটা মনে রাখবে বহুদিন। সম্মান, নির্ভরতা - ব্যাপারগুলো এমনই, হৃদ্যতা বাড়িয়ে দেয় বহুগুণে। তাছাড়া পুরো বিষয়টিতে আন্তরিকভাবে একজনকে অংশীদার করে নিলে তার দোয়ারও অংশীদার হয়ে যেতে পারি। 

আলোচনায় প্রত্যেকে একটা করে মতামত দেবে। কেউ কেউ তার মতের ক্ষেত্রে অত্যন্ত জোরালো হবে। এদের মধ্যে কারও কারও প্রভাব আমার উপর অত্যন্ত প্রবল (যেমন আমার পরিবারের মানুষগুলো), হয়ত আমি একজন সফল মানুষ হিসেবে তার মত হতে চাই, বা তাকে এত ভালবাসি যে তার কোন কথা সমালোচনা করতে আমি প্রস্তুত নই। তখন আমি কী করব? আর কিছু কানে না নিয়ে সে যা বলল, অন্ধভাবে পালন করব। না! কোনভাবেই না। যে যাই বলুক, নিজে বিবেচনা না করে কোন কাজ করা যাবে না। সূরা ত্বীন এ আল্লাহ বলেছেন, 

নিশ্চয়ই আমি মানুষকে সর্বোৎকৃষ্ট রূপে তৈরি করেছি 

সর্বোৎকৃষ্ট কেন জানেন? সিদ্ধান্ত নেয়ার স্বাধীন ক্ষমতা আর কারো নেই (জ্বীন ছাড়া); এই আয়াতে 'ইনসান' শব্দ টা একবচন, তার মানে এটা আমার পরিবারের মানুষগুলোর জন্য যতটা সত্যি, আমার জন্যেও ততটা সত্যি। অন্ধভাবে কোন পথ বেছে নেয়ার পথ আমাদের জন্য আল্লাহ বন্ধ করে দিয়েছেন। 

And We have certainly honored the children of Adam.. (17:70) 

এই honor বা dignity কোথা থেকে আসছে? আল্লাহরই দেয়া বিবেক বোধ ও স্বাধীন বিবেচনা বোধ থেকে। আমি কাউকে যতই ভালবাসি, তাকে অনুসরণ করার আগে আমি যেন আমার বিচার বিবেচনায় নিশ্চিত হয়ে নেই যে আমি ঠিক। 

যাই হোক। অন্যদের মতামত চাওয়ার পর আমার অনেকগুলো পয়েন্ট অব রেফারেন্স থাকবে। তারা কেন এ মতামত দিল তাও জানা হবে। তখন তৃতীয় ধাপ হচ্ছে আবারও চিন্তা করা, নিজে নিজে। আমার আগের চিন্তার সাথে এখনের চিন্তার পার্থক্য কী? আগে একটা বিস্তৃত ভাসাভাসা ধারণা ছিল, এখন সমমনা/অভিজ্ঞ ব্যক্তিদের সাথে কথা বলে পক্ষে বিপক্ষে আরো খুঁটিনাটি জানা গেছে। এখন ইনশাআল্লাহ, আমি যা সিদ্ধান্ত নেব তা খারাপ হবে না। এই যে একটা ছোট্ট ইনশাআল্লাহ, এরও খুব প্রয়োজন আছে। সব কিছুর পরেও, আমরা মানুষ হিসেবে আমাদের সীমাবদ্ধতাকে অতিক্রম করতে পারিনা। আমি আমার সীমিত ক্ষমতায় যা কিছু করা সম্ভব, সব করেছি, সিদ্ধান্ত নিয়েছি, কিন্তু আগামী একশ বছরের পরিপ্রেক্ষিতে এই কাজের কী প্রভাব পড়বে আমি জানি না। একশ কেন, কিছুক্ষণ পরেও কী হবে আমি জানি না। সুতরাং, আমাদের সীমাবদ্ধতাকে মনে রেখেই আল্লাহর উপর নির্ভর করে আমি আমার সিদ্ধান্ত নিচ্ছি। আশা করি আল্লাহ আমার সহায় হবেন। 

সিদ্ধান্তের চতুর্থ বা সর্বশেষ ধাপ হচ্ছে ইস্তিখারা। আমি দুই রাকআত নফল নামায পড়ব, নামাযে দু'আ করব, যদি আমার দ্বীন ও দুনিয়ার জন্য এটি ভাল হয়, তাহলে এটি আমার জন্য সহজ করে দাও, নয়ত আমাকে এর থেকে দূরে সরিয়ে দাও। ইস্তিখারা এমন না যে সমস্যায় পড়লেই নামায পড়ে স্বপ্নের তালাশ করব। নামাযের আগে/পাশাপাশি এই ধাপগুলো পার হতে হবে। 

ইস্তিখারার দু'টো প্রচলিত ভুল ধারণা আছে - 

ইস্তিখারার উত্তর স্বপ্নেই দেখা যাবে: সব সময় না। ইস্তিখারার দুয়ায় আল্লাহর কাছে আমরা চাই যেন সর্বাঙ্গীন মঙ্গলময় একটা পথ আমরা বেছে নিতে পারি। আমার এক বান্ধবী তার প্রিয় মানুষটিকে বিয়ে করার জন্য ইস্তিখারা করে স্বপ্ন দেখে যে তাদের বিয়ে হবে না। হয়ও নি। আরেক বান্ধবী ইস্তিখারা করল অনেকবার। কিছুই দেখল না স্বপ্নে। কিন্তু ধীরে ধীরে তার পছন্দের মানুষটি এমনিতেই অনেক দূরে চলে গেল। আমার বেলায় ইস্তিখারায় আমি খুব সুন্দর একটা স্বপ্ন দেখি। আমাদের বন্ধু অপুর সাথে ভার্সিটিতে পড়াকালেই রনির প্ল্যান ছিল বিয়ের পর দুই বন্ধু বউ নিয়ে কাশ্মীর বেড়াতে যাবে। আমি ইস্তিখারায় স্বপ্নে দেখি আমরা একটা পাহাড়ের উপর বেড়াতে গেছি, নিচে খুব সুন্দর একটা শহর, রনি বলছে, 'ওটা কাশ্মীর'... এর মধ্যেই আমার ঘুম ভেঙে যায় একটা ফোনের শব্দে। রনি ফোন করে আমাকে জানায় আমার ইউনিভার্সিটি থেকে ওরও এডমিশন কনফার্ম হয়েছে। 

জানি না এই গল্প কেন বললাম। আমি যতবার ভাবি আমার হৃদয় ছুঁয়ে যায়, সেজন্য বোধ হয়। তবে ইস্তিখারা থেকে কোন উত্তর না পেলে, বা নিজের সিদ্ধান্তে খুব নিশ্চিন্ত না বোধ করলে ইস্তিখারা আবারো করতে পারেন। ইস্তিখারার কোন সর্বোচ্চ সীমা নেই। আর স্পষ্ট হ্যা বা না নিশ্চিত না হলে কাজ থামিয়ে রাখতে হবে, এমনও কোন কথা নেই। ইস্তিখারা এক অর্থে আল্লাহর অনুমতি চাওয়া। 

আমাদের দেশে পীর, আলেম, ইমামদের দিয়ে ইস্তিখারা করানোর প্রচলন আছে। ভাবনাটা এমন, আমি ত অত প্র্যাকটিস করি না, আমার ইস্তিখারা বোধহয় হবে না। তার চেয়ে যে ভাল নামায রোজা করে, তাকে দিয়ে করালে ঠিকঠাক মত হবে। এটা খুব ভুল ধারণা। আল্লাহর সাথে কথাবার্তায় কোন মাধ্যম নিলে তাতে বড়সর ভুল হয়ে যাবে। আল্লাহ ত এমনিতেই জানেন আমরা কে কেমন। যদি এমন মনে হয় যে আল্লাহ ভাববে, 'এতদিন খোঁজ নেই, এখন দরকারে আমাকে ডাকছে' - ব্যাপারটা কিন্তু মোটেও তা না। ফাঁকিবাজ স্টুডেন্ট পরীক্ষার আগে সিরিয়াস হয়ে গেলে টীচাররা আরো খুশি হন, সাহায্য করতে আরো আগ্রহী হন। আমরাই ভয়ে আল্লাহর সামনে দাঁড়াতে চাই না, শয়তান মনের মধ্যে হীনমন্ন্যতা ঢুকিয়ে দেয়, 'ছিঃ তোমার লজ্জাও নেই, কোন মুখে দাঁড়াও তুমি আল্লাহর সামনে?' তখন যতবার নামায মিস দিয়েছি, সব মনে পড়বে, মুভি দেখা, গালি দেয়া - সব মনে আসতে শুরু করবে। আসুক! তবু দাঁড়াই। মনে মনে বলি, আল্লাহ, তুমি ত জানই আমি কেমন, তোমার ইবাদতটাও ঠিক মত করি না। কিন্তু তারপরেও তুমি ছাড়া আমার কোন উপায় নেই। তুমি পথ না দেখালে, সাহায্য না করলে আমি আরো ভুলের মধ্যে তলিয়ে যাব। দেখ, শয়তান আমাকে কীভাবে ডাকছে! আমার উপর রাগ হয়ে থেক না আল্লাহ প্লীজ! 

ইনশাআল্লাহ, আল্লাহ আমাদের সিদ্ধান্তে তাঁর রাহমাহ ও জ্ঞানের পরশ বুলিয়ে দেবেন। 

http://www.youtube.com/watch?v=EEcovFTsQ4E

Wednesday, December 28, 2011

শেখার কোন শেষ নেই

I have learnt silence from the talkative, toleration from the intolerant, and kindness from the unkind; yet strange, I am ungrateful to these teachers. 

Kahlil Gibran এর এই কোট টা আমি প্রথম শুনি যখন ইউনিভার্সিটির এক ফ্যাকাল্টির খুব বাজে ব্যবহার পেয়ে আমার মন অসম্ভব খারাপ। এই কথার অপরিমিত শক্তি বোঝার অবস্থা তখন আমার ছিলনা। আমি তখন দুঃখের সাগরে ডুবছি। কিন্তু এর পর থেকে, গত দেড় বছরে, এই কথাগুলো একদিনের জন্যেও ভুলিনি। প্রতিদিন অল্প অল্প করে, একটু আধটু করে নিজের অভিজ্ঞতা দিয়ে বার বার অনুভব করেছি এর প্রয়োজন।

আমরা কি আমাদের চারপাশ থেকে শিখি? সবাই বলবে শিখি। কেমন করে? এই যেমন ভাল জীবনাচরণের উদাহরণ দেখলে তার মত করে চলার শিক্ষা নেই, কারো আত্মবিশ্বাস আমাদের উদ্বুদ্ধ করে, কারো সৃষ্টিশীলতায় মুগ্ধ হয়ে আমরা অনুপ্রাণিত হই, আমাদের আগামী প্রজন্মও যেন এমন হয় - ইত্যাদি ইত্যাদি। নিজের জীবনে ঠেকে শিখি সবাই। অনেকে অনেক ঠকেও ধরতে পারেনা ঠিক আর বেঠিকের ফারাক। শিখছি আমরা প্রতিদিনই। কিন্তু কাজে লাগাতে পারছি কতটুকু? 

আমরা মানুষেরা বোধহয় জন্মগতভাবেই ভুলোমনা। বড় হওয়ার সাথে সাথে ভুলে যাই কৈশোরের আমাদের মনটা কেমন ছিল। আমরা বোধহয় স্বার্থপরও, নিজেকে আরেকজনের অবস্থানে বসিয়ে কিছুতেই বিচার করতে পারিনা কেন একজন মানুষ ভুল করে। আমার জন্য যেটা খুব সহজ, অপরজনের জন্য তাই হয়ত নিত্যদিনের স্ট্রাগল। আমার এক কাছের মানুষ সময়ের ব্যাপারে খুব বিচক্ষণ, অন্য কেউ সময়ের নড়চড় করলে তার থেকে কর্কশ মন্তব্য শুনতে হবেই। তার কথা হচ্ছে আমি ত কোন কমিটমেন্ট করলে আর সব কিছু সেভাবে প্ল্যান করে নেই, তুমি পার না কেন? সেই একই মানুষ নিত্যনিয়ত স্ট্রাগল করে যাচ্ছে তার বাকযন্ত্র কে সংযত রাখার। প্রতিদিন সে হেরে যায় এখানে, বার বার হারে, একই ভুল প্রতিদিন করে। তবু সে শেখেনি - স্ট্রাগল প্রত্যেকেরই আছে, যার যার নিজের মত, সময়ের হোক অথবা সংযমের। 

নিজের সংসার হওয়ার পর থেকে আমি প্রত্যেকটা পরিবারকে খুব ভালভাবে পর্যবেক্ষণ করি। প্রবাসে থাকি, বাবা মা, শ্বশুরবাড়ি ত নেই, এরাই সব। বেশ অনেকদিন ধরে সংসার করছেন এমন বড়বোনদের সংসর্গে থাকার চেষ্টা করি, যাতে তাদের অভিজ্ঞতালব্ধ শিক্ষা অল্প আয়াসে অর্জন করে ফেলতে পারি। শিক্ষার ধরণটাই এমন, না ছেঁকে নেয়ার উপায় নেই কোন কিছুই। গ্র্যাড স্কুলে এতদিন ধরে আমাদের এটাই অনেক কষ্টে শেখানোর চেষ্টা করছে, কোন পাবলিকেশন বিশ্বাস করবে না, ডাটা যাচাই না করে। একটা সময় বুঝলাম, এই পদ্ধতি শুধু একাডেমিক লাইফে না, সোশ্যাল লাইফেও খুব জরুরি। ছোটবেলা থেকে শিখে এসেছি বাবা মা সবসময় ঠিক, স্কুল কলেজ ইউনিভার্সিটিতে শিক্ষক মানে অবিসংবাদিত চরিত্রের অধিকারী, তাদের একটু চ্যুতি দেখলে মুষড়ে পড়তাম। আশ্চর্য ব্যাপার, কেন কখনও কেউ বলে দেয়নি, তাদেরও ভুল হয়, ভুল করতে দেখলে হতাশ না, শিখতে হয়। তেমনি এখনও, সুপারভাইজর কে মাথায় তুলে রাখি, আত্মীয়, বন্ধুবান্ধব সহ নিজেদের পরিবারকে ভাবি সব ভুলের ঊর্ধ্বে, যখন দেখি ভীষণ নীতিবাগিশ মানুষটি জীবনের কোন একটা জায়গায় এসে অন্যায় করে ফেলছে, তখন তার উপর বিশ্বাসটাই চলে যায়। কেন, সে কি ভুল করতে পারেনা? অন্যায় করলেই আমি তার থেকে শেখা বন্ধ করে দেব কেন? তার ভুলটা ত আমিও করতে পারতাম! 

অনেকদিন ধরে পরিচয় থাকলে মানুষের ভাল খারাপ সবকিছুই চোখে পড়ে। সমস্যা হচ্ছে, আমি কিছুদিন যাওয়ার পরেই তাকে লেবেল করে ফেলি, 'আমি একে পছন্দ করি, আমি একে পছন্দ করি না।' তারপর যাদের পছন্দ করি, তাদের ভাল গুণগুলি খুঁটিয়ে দেখে শিখতে থাকি, আর যাদের পছন্দ করি না, তাদের দোষগুলিও মনের মধ্যে জমা রেখে শিখতে থাকি। উল্টোটা সচেতনভাবে কখনই করতে পারিনা। বিশেষ করে যাকে পছন্দ করিনা, তার গুণগুলো দেখতে আমার ভীষণ এলার্জি। কিন্তু এটা কি ঠিক পথ? আমি না আল্লাহর কাছে দুআ করি উনি যাতে আমাকে সরল পথে রাখেন সঠিক পথে রাখেন? নাস্তিকরা যা বলে তার কি সব খারাপ? ইসলামের দোহাই দিয়ে গালিগালাজ থেকে শুরু করে আর যা কিছু করা হয় তার কি সব ভাল? আমরা ছাঁকতে শিখিনি। বাইনারি ডিজিট এর মত 'All or none' এই জায়গাতে এসে থেমে গেছি। 

আমি শিখছি, সবই শিখছি, সাইকোলজিক্যাল ডিজঅর্ডার থেকে শুরু করে স্ট্রিং থিওরি - তত্ত্বকথা যত আছে, জীবনের সাথে সামঞ্জস্যহীন - তার সবকিছুতেই আমার খুব আগ্রহ। কিন্তু শিখিনি গৃহস্থালির খুব বেসিক কিছু বিষয়ও, শাক সবজি কীভাবে তাজা রাখা যায়, ঘরকে পরিচ্ছন্ন রাখার জন্য কী কী রুটিন মেনে চলা জরুরি - এগুলো কোন কিছুই আমার কাছে জরুরি মনে হয়নি কোনদিন। একদিন ব্লগে দেখলাম এক ছেলে অহংকার করে বলছে, 'আমি জীবনে কোনদিন ভাত বেড়ে খাইনি।' আমরা না পারা, না জানা - এসবও অহংকার করার বিষয় মনে করি। শিক্ষার কী অদ্ভুত বিকলাঙ্গ রূপ! 

যাই হোক, এত হতাশামার্কা কথা বলে লেখা শেষ করতে চাইনা। যারা ছাত্রজীবনে আছেন, বিশেষ করে যারা দেশে আছেন, তারা অবসর সময়ে হতাশা চর্চা না করে চলুন একটু বড় বড় চোখ করে চারপাশে তাকাই। যদি বৃষ্টির জন্য বাসা থেকে বের হতে না পারেন, একটু রান্নাঘরে যান, দেখুন মা কীভাবে চটপট রান্না, ধোয়ামোছা সবই খুব স্মার্টভাবে করে ফেলেন খুব অল্প সময়ে। এটা একটা স্কিল। দুপুরে বিছানায় অলস শুয়ে থাকলে চুপচাপ একটু ভাবুন আপনার অপছন্দের কোন মানুষের কথা। তার ভাল দিকগুলো, দোষগুলো - সবকিছু নিয়েই চিন্তা করুন। শেখার অ-নে-ক কিছু পাবেন। বাবাকে যদি সবসময় দেখেন ব্যাংকে বিল দিয়ে আসলেই মেজাজ খারাপ থাকে, তাহলে একদিন তার সাথে যান, শেখা হয়ে যাবে মেজাজ ঠিক রাখতে হলে কোন কোন জিনিসগুলো সহ্য করতে শিখতে হবে। শেখার কি শেষ আছে? অল্প কথায় কী করে অনেক কথা বলা যায় - তাও একটা শেখার মত জিনিস, আমাকে যেটা শিখতে হবে খুব শীঘ্রই।

Tuesday, December 13, 2011

ডমেস্টিক ভায়োলেন্স নিয়ে কিছু কথা

'ডমেস্টিক ভায়োলেন্স' শব্দটার সাথে আমার পরিচয়ই ছিল না। আবছা একটা ধারণা ছিল, যেসব নরপশু স্ত্রীর চোখ উপড়ে প্রথম আলোর প্রথম পাতা দখল করে তারাই ওসব ভায়োলেন্স টায়োলেন্স এর সাথে জড়িত। কিন্তু ভায়োলেন্স এর অসংখ্য দিক আছে, যা আমার জানা ছিলনা। জানতাম না ইমোশনাল ভায়োলেন্স বলে একটা কিছু আছে, যেখানে একপক্ষ সারাক্ষণ ভয়ে কাঁটা হয়ে থাকে অপরপক্ষ 'মাইন্ড' করবে দেখে। তাকে খুশি করার জন্য সে যা বলে তাই মেনে নেয়, আপত্তি করলে অবস্থা আরো খারাপের দিকেই যাবে, তাই যা বলে মুখ বুজে মেনে নেয়। ইমোশনাল অ্যাবিউজ একটা চক্র মেনে চলে। প্রথম ধাপে চাপা টেনশন তৈরি হবে, দ্বিতীয় ধাপে তা বার্স্ট করবে, রাগ, কান্না, দোষারোপ - যেভাবেই হোক - আর তৃতীয় ধাপে অনুশোচনা, ক্ষমা প্রার্থনা - যাকে বলে 'হানিমুন পিরিয়ড', অ্যাবিউজার ভীষণ ভাল ব্যবহার করবে, আদর যত্ন হাসি খুশি - অ্যাবিউজড যখন ভাবতে শুরু করবে, সব ঠিক হয়ে গেছে, তখনই প্রথম ধাপের পুনরাবৃত্তি হবে। 

ইমোশনাল অ্যাবিউজের মধ্যে আছে এক পক্ষের অন্য পক্ষকে পূর্ণ কন্ট্রোলের মধ্যে রাখার চেষ্টা, কার সাথে মিশবে, কোথায় যাবে - সে ব্যাপারে সার্বক্ষণিক নজর (লক্ষ্য করুন, কোথায় কার সাথে মিশছে তা খোঁজ নেয়াতে কোন সমস্যা নেই, অভিভাবক হিসেবে তা করাও উচিৎ, কিন্তু) জানার বাইরে কারো সাথে পরিচয় হলে অস্থির হয়ে যাওয়া, রেগে যাওয়া - এসব অ্যাবিউসিভ কনডাক্ট। এছাড়া মানুষের সামনে অপমানজনক নাম ধরে ডাকবে, সমালোচনা করবে, হাসাহাসি করবে, পরিবারের অন্যদের কাছে তার ভুল নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করবে ও পরিবারের অন্যদেরও নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি আনতে উস্কে দেবে - যাতে করে সেই মানুষটা একই সাথে ঘরে কোনঠাসা মনে করে, ও নিজেকে সবকিছুর জন্য অপরাধী ভাবতে থাকে। 

ইমোশনাল অ্যাবিউজ আর খাঁটি দোষের শাস্তি অনেকটা একই রকম, তাই অ্যাবিউজড হচ্ছে যে, সে ভেবে নেয়, এটা ত আমার ভালর জন্যই করা। কিন্তু অ্যাবিউজিভ রিলেশনে মূল উদ্দেশ্য থাকে ডমিনেট করার ইচ্ছা, আর তাকে জাস্টিফাই করার জন্য অ্যাবিউজার বিভিন্ন সামাজিক ও ধর্মীয় অজুহাত দেখায়। 

ধর্মীয় অজুহাতের কথা যখন আসলোই, তখন স্পিরিচুয়াল অ্যাবিউজ নিয়েও বলি। তুমি 'ভাল মুসলিম' এর মত কাজ করছ না, এই অজুহাতে স্বামী/স্ত্রী বা তার আত্মীয় স্বজন অন্যায় সব দাবি চাপিয়ে দিতে পারে, এমনকি মেয়েদের বেলায় বাবার বাড়ি যাওয়ার উপরেও নিষেধাজ্ঞা দিতে পারে। প্যারেন্ট-চাইল্ড রিলেশনশিপেও অমন দেখা যায়। ছেলে মেয়েকে অন্যদের সামনে স্টুপিড, গাধা ইত্যাদি বলে অ্যাবিউজ করলেও, সন্তানের অবাধ্যতা বা অসন্তোষ দেখলে কুরআনের আয়াত টেনে আনবে, জাহান্নামের শাস্তির ভয় দেখাবে। 

যেহেতু এই বিষয়গুলো খুবই স্পর্শকাতর, বিশেষত আমাদের দেশের প্রেক্ষাপটে, তাই কয়েকটা বিষয় স্পষ্ট করে নেয়া ভাল। 

১. সন্তান বাবা মা কে জান্নাতের দরজা হিসেবে ট্রিট করা উচিৎ, এতে কোন মতভেদ নেই, কিন্তু বাবা মা স্বেচ্ছাচারিতা করার অধিকার রাখেন না। আল্লাহর থেকে প্রত্যেকে নিজ নিজ বিবেক ও সিদ্ধান্ত নেয়ার স্বাধীনতা নিয়ে এসেছে। বাবা মা একটা বয়স পর্যন্ত সেই বিবেক কে মজবুত করবেন, এবং সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষমতাটাকে ঘষে মেজে ধারালো করবেন। এবং অবশ্যই মূল লক্ষ্য থাকবে সে যেন নিজের বিচারবুদ্ধির প্রতি আস্থাশীল হয়। রাসুলুল্লাহ (স) নিজের সন্তানের সাথে কেমন আচরণ করতেন বা কিশোর বয়সী সাহাবীদেরও কতটা মর্যাদা দিয়ে কথা বলতেন তা লক্ষ্য করলেই ইসলামে বড়দের প্রতি ছোটদের অধিকার কী এটা পরিষ্কার হয়ে যাবে। 

২. বৈবাহিক সম্পর্কে ছোটখাট অসন্তোষ এড়িয়ে গিয়ে ঘরে শান্তি রাখার চেষ্টা করা, আর নিজের স্বাধীনতা পুরোপুরি ত্যাগ করা - এ দুটো এক জিনিস না। অনেক ছেলেই আছে মায়ের সব রকমের ইমোশনাল অ্যাবিউজ চুপচাপ মেনে নিয়ে নিজের উপরেও জুলুম করছেন, স্ত্রীর উপরেও করছেন। যেটা অন্যায় সেটাকে উপেক্ষা করতে ইসলাম আমাদের শেখায় নি। আমরা মুসলিমরা একে অপরকে ধৈর্য ধরতে উপদেশ দিতে পারি, ধৈর্য ধরতে বাধ্য করতে পারিনা। সুতরাং এ ধরণের সমস্যাকে অন্তত সমস্যা হিসেবে স্বীকার করতেই হবে। 

অ্যাবিউজিভ রিলেশনশিপের শিকার যারা তাদের ব্যক্তিত্ব গঠন চরমভাবে বাধাগ্রস্ত হয়। বিভিন্ন সামাজিক পরিবেশে তারা স্বচ্ছন্দভাবে অংশগ্রহণ করতে ভয় পায়। সমালোচনার প্রতি অতিরিক্ত নাজুক হয়। আত্মবিশ্বাসে ঘাটতি থাকে, কারণ নিজের সিদ্ধান্ত কে বাধাহীন ভাবে প্রয়োগ করার সুযোগ সে খুব একটা পায়নি, পেলেও গঠনমূলক বা উৎসাহব্যঞ্জক প্রতিক্রিয়া পায়নি। সমাজে খুব একটা মেশার সুযোগ হয়না বলে অ্যাবিউজিভ পরিবেশেই বেশির ভাগ সময় কাটাতে হয় - পরিণতিতে মানসিক এই দৈন্যের ব্যাপারটা বহুগুণে বেড়ে যায়। সবচেয়ে ভয়াবহ ব্যাপার হচ্ছে, যারা ডমেস্টিক ভায়োলেন্স এর মধ্যে বড় হয়েছে, তারা এই পরিবেশে অভ্যস্ত হয়ে ওঠে বলে তারাও নিজের জীবনে অ্যাবিউজার হওয়ার সম্ভাবনা বেশি থাকে। 

এই বিষয়গুলো নিয়ে আমাদের সবার সচেতন হওয়া দরকার। পরে হয়ত কখনো আরো গুছিয়ে এ বিষয়ে লিখব।

Wednesday, November 16, 2011

বদরাগ ও সূরা নাস

'রাগ হলে আমার লজিক্যাল সেন্স হারিয়ে যায়। অদ্ভুত সব কারণ একটার উপর একটা যোগ হতে থাকে। আমি নিজের মধ্যে বুঝতে পারি, আমি রাগ করছি কারণ আমার মধ্যে একটা হেরে যাওয়া অনুভূতি হচ্ছে। আমি নিজের মত করে একটা কিছু ভেবে রেখেছিলাম, কিন্তু বাস্তবে তেমন করে হয়নি। আমি হেরে যাচ্ছি, আমার কথা কেউ পাত্তা দিচ্ছেনা, আমার সুযোগ সুবিধার দিকে কারো খেয়াল নেই... আমার উপর অন্যায় হলে দেখার কেউ নেই..'

উপরের কথাগুলো একটু অদল বদল করে দিলে প্রত্যেকেই নিজের ছায়া খুঁজে পাবেন। রাগ এমন এক জিনিস, তখন কে যে কী থেকে কী হয়ে যায়, কোন ঠিকঠিকানা থাকেনা। রাগ আর মাতাল অবস্থার মধ্যে আমি কোন পার্থক্য দেখি না। যে মাদক নেয়া থামাতে পারে না, তাকে আমরা বলি, ওর নিজের উপর কন্ট্রোল নেই। যে রাগ হলে শান্ত হতে পারেনা, তাকেও আমরা বলি, ওর কন্ট্রোল থাকেনা। আফসোস, মাদকাসক্ত কে আমরা দেখি ঘৃণার চোখে, আর বদরাগ কে দেখি কিঞ্চিৎ প্রশ্রয়ের চোখে।

কেন এভাবে রেগে যাই আমরা? আগের কোন রাগকে ট্র্যাক করতে পারবেন? এখানে রাগ বলতে আমি কিন্তু 'অযৌক্তিক রাগ' বুঝাচ্ছি। নিজের উপর অন্যায় হলে যে রাগ হয়, সে রাগের কথা বলছি। যে রাগ কমানোর জন্য মানুষ মেডিটেশনের দ্বারস্থ হয়, ডাক্তারের কাছে মুখ কাঁচুমাচু করে বলে, 'দেখেন ত ডাক্তার সাহেব, আমার প্রেশারটা কি বেশি দেখে এত রাগ উঠে?', সেই রাগের কথা বলছি। আমার রাগের ৯০%ই তৈরি হয় 'এটা অন্যায়' - এই চিন্তা থেকে। এই যেমন বন্ধুরা সবাই মিলে বেড়াতে যাওয়ার প্ল্যান করছি, এর মাঝে একজন বলা নাই কওয়া নাই শেষ মুহূর্তে পিছু হটল। হয়ে গেলাম রাগ, 'তার কি এইটা উচিৎ হইসে?' বাসায় গুরূত্বপূর্ণ কোন সিদ্ধান্ত আমাকে জিজ্ঞাসা ছাড়াই নিয়ে ফেলল। রাগ, 'আমি কি কেউ না?' গ্রুপে মিলে কোন কাজ করছি, একজন ফাঁকিবাজি করল। হয়ে গেল মেজাজ খারাপ, 'ফাইজলামি পাইসে?' প্রত্যেকবারই হয় 'আমার' কমফোর্ট নষ্ট হয়েছে, নয়ত 'আমার' ইগো হার্ট হয়েছে, অথবা 'আমার' তৈরি করা প্ল্যান অনুযায়ী কাজ হয়নি। প্রত্যেকটাই খুব আত্মকেন্দ্রিক কারণ, কিন্তু আমি যখন রেগে যাচ্ছি, তখন আর স্বার্থপরতার ওই দিকটা আর চোখে পড়ছে না, মনে হচ্ছে, আমি বৃহত্তর স্বার্থে অন্যায়ের প্রতি জিরো টলারেন্স দেখাতে রাগ দেখাচ্ছি। অথচ এই ঘটনাটাই অন্যের বেলায় ঘটলে হয়ত আমি মিষ্টি মিষ্টি হেসে ধৈর্য ধরার উপদেশ দিতাম। এ রকম ডাবল স্ট্যান্ডার্ড, হীন একটা চিন্তাকে মনের ভেতর মহৎ বানিয়ে ফেলছে কে?

সূরা নাস এ আল্লাহ আমাদের শিখিয়েছেন শয়তানের অনিষ্টকর কুমন্ত্রণা থেকে আল্লাহর কাছে আশ্রয় চাইতে (মিন শাররিল ওয়াসওয়াসিল খান্নাস।) শয়তান আমাদের কুমন্ত্রণা দেয় - এটা কি আমরা আসলেই বিশ্বাস করতে পারি? মাঝে মধ্যে পারি, কিন্তু বেশির ভাগ সময়ই আমাদের যুক্তিবাদী মন বিশ্বাস করতে চায়না কোন জ্বীন ভূত এসে কুবুদ্ধি দিচ্ছে, আর সেটার ফল আমাদের কাজে এসে পড়ছে। শয়তানকে নিয়ে কারো সাথে রিয়েলিস্টিক আলোচনা করার চেষ্টা করে দেখুন, হাসতে হাসতে আপনাকে উড়ায় ফেলবে, স্কিজোফ্রেনিক রোগীও বানায় ফেলতে পারে। শয়তানকে নিয়ে আমি প্রায়ই চিন্তাভাবনা করি, তারপরেও, এশার নামাজ একটু দেরি করে ফেললে যখন ভী-ষ-ণ আলসেমি লাগে, ঘুমে মনে হয় পড়েই যাব, আর কষ্ট করে নামাজ পড়ে ফেলার সাথে সাথে ঘুমও পালায় - তখনও আমার মনে হয়না এটা শয়তানের কারসাজি। শয়তান এখনও আমার কাছে সামহোয়াট ইমাজিনারি কিছু। আমার বাসা, ল্যাব, ল্যাপটপ - এরা যেমন খুব বাস্তব, শয়তানকে ততটা বাস্তব ধরতে মনের মধ্যে কেমন কেমন যেন লাগে।

রাগের বেলায় শয়তানের ভূমিকা বলার আগে সূরা নাসের পরের লাইনটা আলোচনা করে নেই। আল্লাযি ইয়ুওয়াসয়িসু ফী সুদুরিন নাস, সেই শয়তান, যে মানুষের বুকের মধ্যে বসে কুমন্ত্রণা দেয়। 'ইয়ুওয়াসয়িসু' হচ্ছে ঘটমান বর্তমান ক্রিয়াপদ। চলতেই থাকবে, চলতেই থাকবে। কোন থামাথামি নেই। শয়তান বুকের মধ্যে বসে থাকবে, একটা ফুট কাটবে, আপনি তাকে ধমক দিয়ে থামাবেন, সে একটু দমে যাবে, তারপর মুখটা বাড়ায় আবার আরেকটা কিছু বলবে.. আবারও, আবার... ! আপনি যখন কোন কারণে অফেন্ডেড, আপনার মনের মধ্যে এমনিতেই কিছু নেগেটিভ চিন্তা আছে অফেন্ডারের প্রতি। এখন শয়তান করবে কি, ওই ভদ্রলোকের/ভদ্রমহিলার সাথে আপনার বিগত জীবনে যা যা খারাপ অভিজ্ঞতা হয়েছে সব ছবির মত সামনে তুলে ধরতে থাকবে। একটা করে ছবি দেখবেন, মেজাজ খারাপ বাড়তে থাকবে। শুধু এই না, ছবির নিচে ক্যাপশনের মত একটা এক্সপ্লানেশন ও থাকবে, ও এইটা করসিল, দেখ, সে তোমার জন্য কক্ষণো কেয়ার করে নাই। সবসময় তুমিই করে গেছ... ইত্যাদি ইত্যাদি। কারো উপর রাগ হওয়ার পর তার ভালমানুষির কথাগুলি কি আপনার কখনো মনে পড়ে? আমি কারো উপর রাগ হয়ে আমার স্বামীর কাছে ঝাল ঝাড়লে সে তার ভাল দিকগুলি মনে করিয়ে দেয়ার চেষ্টা করে, কিন্তু আমার তখন আরো রাগ হয়, 'আমি বলতেসি খারাপ আর তুমি ভাল দিক দেখাচ্ছ! আমার ত এখন নিজেকে আরো বেশি খারাপ মনে হচ্ছে!' কী ভয়ংকর ইগো!

যাই হোক, পার্সোনাল ডিসকমফোর্ট আর শয়তানের ওয়াসওয়াসা - এ দুটোই আমাদের জন্য অনেক, তার উপর আরো আছে পারিপার্শ্বিকতার চাপ। আশেপাশের মানুষের উস্কানিতে ঘটনা আরো খারাপের দিকে গেছে - এ রকম দেখেছেন কখনো? আল্লাহ সূরা নাস এর শেষ লাইনে বলেছেন 'মিনাল জিন্নাতি ওয়ান নাস', খারাপ জ্বীন ও মানুষের কুমন্ত্রণা। ওয়াসওয়াসা শুধু বুকের ধারেকাছে ওঁৎ পেতে থাকা বেহায়া শয়তানটাই দেয়না, তার সাঙ্গোপাঙ্গো যারা অন্যদের ভেতর বসে আছে, তারাও একযোগে বুদ্ধি দিতে থাকে, এটা বল, ওটা মনে করিয়ে দাও। ফলাফল... থাক, নাই বা বলি। রাগ করে মানুষ বাসনকোসন ভাঙে, হাত পা ভাঙে। সম্পর্ক ভাঙে, ভাঙে আল্লাহর উপর বিশ্বাসও। তারপর একটা সময় ফলাফল দেখে কান্নায়ও ভেঙে পড়ে।

ফেসবুকে এক ছোট বোন লিখেছিল, মানুষকে চেনার সবচেয়ে ভাল উপায় হল তাকে রাগিয়ে দেয়া। এমনিতে ফেরেশতা, আর রাগিয়ে দিলে মুখের ভাষা শয়তান টাইপ হয়ে যায়। আমি এই বক্তব্যের সাথে একমত না। রাগিয়ে দিলে মুখের ভাষা শয়তান টাইপ হয়, কারণ সে তখন শয়তান আর মানুষের ওয়াসওয়াসা দ্বারা প্রভাবিত হয়। রাসুলুল্লাহ (স) কখনোই মানুষের রাগের অবস্থা বিচার করতেন না। এমন ভাব করতেন, যেন এমন কোন ঘটনা ঘটেই নি। তিনি বুঝতেন, এটা অন্য যে কোন প্রবৃত্তির মতই মানুষের একটা দুর্বলতা। তাই উনি সবচেয়ে শক্তিশালী বলেছেন সেই ভাই বা বোনকে, যে রাগের সময় নিজেকে সংযত রাখতে পারে।

রাগ হলে কী করতে হবে? বলব না। যে সত্যিকারের আন্তরিক সে খুঁজে বের করে নিক। আমি চাই মানুষ বদরাগ কে মাদকাসক্তির মতই এক সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করুক। বদরাগের কারণে যাদের সম্পর্কে ফাটল ধরেছে তারা বিষয়টার ভয়াবহতা নিয়ে অন্যদের সাথে কথা বলুক, মানুষ যেন আরো সচেতন হয়। Domestic violence এর অনেকটুকুই আসে বদরাগ থেকে। ঠান্ডা, সুস্থ মাথায় ভায়োলেন্স করে যাচ্ছে, এরকম কেস আপনি কমই পাবেন। রাগ নিয়ে চিন্তা করুন। যে বদরাগী, সেও, যে ভুক্তভোগী, সেও। চট করে রেগে যাওয়া, লম্বা সময় রাগ ধরে রাখা - এগুলো পরিবার, সমাজের বড়সর ক্ষতি করে ফেলছে। এখন শুনি রিকশাওয়ালার সাথে ঝগড়া হলেই কষে চড় লাগিয়ে দেয় স্কুল কলেজের ছেলেমেয়েরা। রাগ কি কেবল স্টুডেন্টদেরই আছে? আল্লাহ না করুক, এইসব অন্যায় আর অসম্মানের খেসারত যদি আপনার কোন ভাই/বোনের জীবন/সম্মানের বিনিময়ে দিতে হয়, তখন কি একচেটিয়া রিকশাওয়ালাদের দোষারোপ করে পার পাওয়া যাবে?

লেখাটা শেষ করি আমার খুব প্রিয় একটা হাদীস বলে। রাসুলুল্লাহ (স) এর সামনে এক সাহাবীর সাথে আরেকজনের ঝগড়া হচ্ছিল। সাহাবী নম্রভাবে জবাব দিচ্ছিলেন আর ওইপক্ষ একনাগাড়ে গালিগালাজ করেই যাচ্ছিল। তাই দেখে রাসুলুল্লাহ (স) মুচকি মুচকি হাসছিলেন। একটা সময় আর টিকতে না পেরে সাহাবীও উঁচু গলায় জবাব দিতে থাকল, তখন রাসুলুল্লাহ (স) সে জায়গা থেকে সরে গেলেন। ব্যাপারটা সেই সাহাবী লক্ষ করলেন, উনি এসে রাসুলুল্লাহ (স) এর কাছে জানতে চাইলেন, উনি অসন্তুষ্ট হওয়ার কারণ কী। রাসুলুল্লাহ (স) তখন উনাকে জানালেন, তুমি যখন চুপ ছিলে তখন এক ফেরেশতা তোমার হয়ে জবাব দিচ্ছিল। আর তুমি যখন গলা উঁচু করলে, তখন ফেরেশতার বদলে শয়তান এসে জায়গা করে নিল, আর তোমার হয়ে জবাব দিতে থাকল। তাই দেখে আমি চলে এলাম।

Ref:

http://www.youtube.com/watch?v=TTWn8CSM7Vw
http://www.youtube.com/watch?v=BLMHjWz7X-E
http://www.youtube.com/view_play_list?p=15B78B2B348C0A7D
http://bayyinah.com/podcast/ (sura nas)

Thursday, October 6, 2011

বাড়ি ফেরার প্রতীক্ষায়

নিউইয়র্কে সাবওয়ের এক লোকাল ট্রেনে বসে ঢুলছেন নাম না জানা ভদ্রলোক, অফিস ফেরত, মধ্যবয়সী। চেহারায় দেশী ছাপ স্পষ্ট। আমেরিকায় কত প্রজন্ম চলছে কে জানে। ন'টা পাঁচটা অফিস করে পৌনে এক ঘন্টা জার্নি করে পড়ন্ত বিকেলে বাড়ি ফিরছেন, সঙ্গী এক রাশ ক্লান্তি।

অফিস শেষ হলেই মুহিব সাহেবের মেজাজটা খারাপ হয়ে যায়। সেই ত ঘরে ফেরা, স্ত্রীর সাথে দূরত্ব, ছেলে মেয়েদের বেয়াদবি দেখেও না দেখার ভান করা। ধূউউউর.. কীসের জন্য এত কিছু করা? সারাদিন গাধার খাটনি খেটে ফিরি, কারো কোন খেয়াল আছে, মানুষটা বেঁচে আছে না মরে গেছে? খেয়াল হবে মাসের শেষে টাকা দিতে না পারলে। হালের গরুর সাথে আমার আর পার্থক্য কী?

ল্যাব থেকে আজকে তাড়াতাড়ি বের হচ্ছে লুসিয়া। তার প্রিয় কুকুর স্প্রকেট কে নিয়ে বেড়াতে বের হবে। সামারটা স্প্রকেট এর খুব প্রিয়। সপ্তাহে দু'দিন অন্তত ওকে নিয়ে বেড়াতে না গেলে ভীষণ মাইন্ড করে। লুসিয়া ঘরে ফিরলেই ভৌ ভৌ, হুফ হুফ করে লাফালাফি করে আর রাখেনা। লুসিয়াও প্রাণ দিয়ে ভালবাসে স্প্রকেট কে।

ঘরে ফেরার সাথে কীভাবে কীভাবে যেন আমাদের খুব গভীরে গেড়ে থাকা একটা আকাঙ্ক্ষা জড়িয়ে আছে। আমরা কল্পনা করতে ভালবাসি এই যে আমি বাইরে - ঘরে গেলেই একটা বিরাট কিছু ঘটে যাবে। একটু চিন্তা করে দেখুন ত, কড়া জ্যামে আটকা পড়ে ঘরে ফিরতে দেরি হলে কেমন অস্থির লাগতে থাকে! তা কি শুধু বিশ্রাম পাওয়ার জন্যই? কাজের জায়গা থেকে বাসা বেশ দূরে হলে প্রতি সেকেন্ডে বাসার জন্য টান টা কেমন বাড়তে থাকে? কখনও কি ভাল করে চিন্তা করে দেখেছেন এই টানটার উৎস কোথায়? এর পরের বার বাড়ি ফেরার সময় একটা একটা করে জিনিস ধরে চিন্তা করে দেখেন, আলাদা আলাদা করে সবগুলোই মনে হবে এটার জন্যই ত যাই।

যেমন খাবার। ক্ষুধা লাগলে ঘরের টানে ফিরে আসা, কিন্তু খাবার টা এমন কী? বাইরে খেলে কী হয়? নিজের বিছানা। তাহলে গ্র্যাড স্টুডেন্টদের ঘরে ফিরতে এত অনীহা কেন? ঘরের মানুষ - তাহলে মুহিব সাহেবের ঘর নরক কেন? আর লুসিয়ার ঘরে কেউ না থেকেও এত আনন্দ কেন?

আমার মনে হয় ঘরে কেউ একজন অপেক্ষায় আছে - এই অনুভূতি টা ঘরের জন্য টান এত বাড়িয়ে দেয়। এই এক থিমের উপর কত গল্প উপন্যাস পড়ে ফেললাম। আপনারাও একটু চিন্তা করে দেখেন, ঘরে ঢুকে সবাইকে যার যার মত কাজে ব্যস্ত থাকতে দেখলে কেমন কষ্ট লাগে, অভিমান লাগে। তার বদলে কুকুরটাও ঝাঁপিয়ে পড়লে মনে হয় আমার এই ফেরার প্রয়োজন ছিল, আমি না আসলে একটা শূন্যতা থেকেই যেত।

ঘরটাকে ঘরের মত রাখার জন্য এই ছোট্ট বিষয়টা খেয়াল রাখা খুব গুরূত্বপূর্ণ। ছেলেমেয়েরা বাবা মায়ের বাসায় ফেরার জন্য অপেক্ষায় থাকে, বাবা মায়ের খুবই খুবই উচিৎ ফেরার পরপরই ছেলেমেয়ের সাথে গল্প করা, সারাদিন কী করেছ, কেমন গিয়েছে ইত্যাদি ইত্যাদি। স্ত্রী স্বামীর অপেক্ষায় থাকে, তার ইচ্ছে করে ঘরের খুঁটিনাটি বিষয়গুলি নিয়ে স্বামীর সাথে কথা বলতে, কারণ সে তার কাজের ক্ষণগুলোতে স্বামীর অভাব বোধ করেছে, সেটা প্রকাশ করার মত ভাষা তার নেই, তাই 'এইটা হয়েছে ওইটা হয়েছে' এসব বলে বলে সে চায় স্বামীকে তার দিনের সাথে রিলেট করতে, যেন স্বামী তার কষ্টগুলোর ভাগীদার হতে পারে। স্বামী স্ত্রীর কাছে তার অভাববোধটুকু দেখার অপেক্ষায় থাকে। তার চিন্তায় থাকে, এতটা সময় আমি ছিলাম না, আমাকে মিস করলে এখন নিশ্চয়ই তার প্রতিফলন হবে ভালবাসা, যত্ন দিয়ে!

একজন বাবার বা স্বামীর ঘরে ফেরা নিয়ে যে তাড়া বা উৎসাহ থাকে, ফেরার পর তার প্রতিফলন হওয়া উচিৎ কে কেমন ছিল তার খোঁজখবর নিয়ে, খুবই হালকা কথাবার্তা বলে, just to show that I really thought about you when I was away. স্ত্রী যদি বাইরে কাজ করে তারও একই ভাবে বাচ্চাদের আর স্বামীর সারাদিনের খোঁজ নেয়া উচিৎ। পাশাপাশি স্বামী বা স্ত্রী যেন ঘরে ফিরে অনুভব করে অন্যরা তার আসার অপেক্ষায় ছিল, সে ব্যাপারটা খুব যত্ন করে মেইনটেইন করা উচিৎ। এটা করা যায় আসার পর অন্তত পাঁচ দশ মিনিট তার দিকে পূর্ণ মনোযোগ দিয়ে। অফিস শেষে বাড়ি ফিরে পরিবারের মানুষগুলোকে বিনোদন এ ডুবে থাকতে দেখলে কী যে খারাপ লাগে সেটা বলে বোঝানো যায় না। মনে হয় টেলিভিশনের কাছে আমি হেরে গেলাম। আমার চেয়ে টেলিভিশনের/কম্পিউটারের আকর্ষণ বেশি। তাই বলে পরিবারের সদস্যরা কাজে ব্যস্ত থাকলেই যে খুশি তে মন ভরে যাবে তাও না। তখন মনে হয়, সবাই যার যার মত ব্যস্ত। আমি আসলেই কী আর না আসলেই কী। বেশি না, পাঁচ দশ মিনিট। তারপর ঐ মানুষটা নিজের মত ব্যস্ত হয়ে গেলে আর কিছু লাগবেনা।

আমাদের ডিপার্টমেন্টের গ্র্যাড স্টুডেন্ট জেফারি কে অনেক ধন্যবাদ, ওর একটা কথাই আমার জন্য eye opener ছিল। ওর সারাদিন ল্যাব এ পড়ে থাকা দেখে রনি দরদ দেখিয়ে বলছিল, তুমি ঘরে যাওনা কেন? সে দুষ্টুমি হাসি হেসে বলল, আমার তোমার মত ঘরে বউ নেই যে! এই দেশে বেড়ে ওঠা একটা ছেলের জন্য বউয়ের অল্টারনেটিভ খুঁজে পাওয়া ত এমন কঠিন না, ওর আর আমাদের ঘরের মধ্যে কমফোর্ট জনিত বেশি পার্থক্যও হবেনা। বোধহয় পার্থক্য এখানেই, প্রতীক্ষায়।

Friday, July 8, 2011

কিছু করার পাইনা

আমার বোনের এইচ এস সি পরীক্ষা নিয়ে ভয়ঙ্কর টেনশন ছিল। এস এস সি তে ঝড়ে বক মরার মত গোল্ডেন পেয়ে ফেলেছে - এখন এইচ এস সি তে গিয়ে খারাপ করলে মানুষ কী বলবে.. মহা দুশ্চিন্তা! পরীক্ষার চার-পাঁচ দিন আগে ওকে ফোন করে বললাম, 'দ্যাখ, তুই ত স্কুল কলেজে পড়ার চাপে সময় করতে পারিস নাই, এতদিন শুধু পড়া নিয়েই ছিলি। পড়ার বাইরে একটা অনেক বড় পৃথিবী আছে, ওখানে টিকে থাকতে হলে আরো অনেক কিছু জানতে হয়, শিখতে হয়। তোর অনেক কাজ বাকি আছে, পরীক্ষার ঝামেলাটা তাড়াতাড়ি শেষ কর।' ও হেসেই বাঁচেনা, সবাইকে গল্প করে বলেছে, আপু আমাকে বলসে পরীক্ষার জ্বালায় নাকি আমি অনেক ইম্পরট্যান্ট কাজ করতে পারতেসি না, তাই তাড়াতাড়ি ঝামেলা শেষ করতে। 

যাই হোক, দেড় মাস ব্যাপী দীর্ঘ পরীক্ষার শুভ সমাপন হল, এখন আমি পড়লাম বিপদে। 'কী রে, তুই না বলসিলি, আমার কত কাজ? এখন ত পরীক্ষা শেষ, আমি ত কিসুই করার পাইনা।' তাই ত! কী কাজ দেয়া যায়? আমার ত কত শখ আমার বোন মানুষের জন্য কাজ করবে, ইসলাম নিয়ে পড়াশুনা করবে, নিজে প্র্যাক্টিস করার পাশাপাশি অন্যদেরও জানাবে - এতে করে ওর কনফিডেন্সটাও যেমন বাড়বে, তেমনি মানুষের কল্যাণে কাজ করার একটা অভ্যাস তৈরি হবে, পরবর্তী লাইফে যত টাকাই হাতে আসুক, সে টাকা অন্তরে জায়গা করে নেবে না। কিন্তু এইসব বড় বড় কথা মুখে বললে ত হবে না! তার জন্য সুযোগ সেট করে দেয়া চাই। ও ত চাইলেই যেখানে সেখানে যেতে পারেনা। তাছাড়া নিরাপত্তারও ত ব্যাপার আছে, যতটা না শারীরিক, তার চেয়ে বেশি মানসিক নিরাপত্তা নিয়ে আমার ভয়। এই অফুরন্ত অবসরে অলস সময় কাটানো এক টিন এজারের জন্য অদেখা পৃথিবীটায় এত বেশি ফাঁদ পাতা যে তা থেকে গা বাঁচিয়ে চলা রীতিমত এক যুদ্ধের মত। 

ওকে বললাম, 'তুই ছয় সাত বছর পরের সময়টার কথা চিন্তা কর, তোর জব থাকবে, নিজের সংসার থাকবে, আর আমাদের মত যদি বাইরে চলে আসিস তখন ঘরে বাইরে সবই দুই হাতে সামলাতে হবে। তখন কিছু কিছু গুণ খুব থাকা দরকার। যেমন, একটু আগে থেকে প্ল্যান করে কাজ সামলান। ধর আব্বু আম্মু অসুস্থ, বাসায় কাজের লোক নাই, তোর পরীক্ষা - তখনও ত সব সামলায় ক্লাশে যেতে হবে, তাই না? তুই কি এখন কয়েকটা কাজ একসাথে করতে পারিস?' না। 'বেশ, তাহলে একদিন তোর ফ্রেন্ডদের বাসায় দাওয়াত কর, সব রান্না তুই করবি, সার্ভ ও করবি আবার চলে যাওয়ার পর গুছায় রাখার কাজটাও করবি।' ধুর! রান্নাবান্না - এইটা কোন মজার কাজ হইল? 'আহা! একটা সময় গিয়ে এগুলি তোর জন্য অনেক সহজ হয়ে যাবে, কিন্তু তখনও এমন কাজ আসবে যেগুলো তোর কঠিন লাগবে। তোর করতে ভয় করবে। এখন যেমন একা গেস্ট সামলানো তোর জন্য খুব ভয়ের, পরে হয়ত জব আর বেবি, অথবা বাবা মা, সংসার, চাকরি, বেবি - এসব ভয় লাগবে। তোর রান্না বা দাওয়াতটা ত ইম্পরট্যান্ট না, এই যে সাধ্যের বাইরে একটা কঠিন কাজ করে ফেলতে পারলি - এটা ইম্পরট্যান্ট।' 

হুঁ। করলাম, আর কী? 

আর... ও হ্যাঁ, তোর বিভিন্ন লেভেলের মানুষের সাথে ভালভাবে মিশতে পারা শিখতে হবে। তুই যেন চায়ের দোকানদার মামার সাথে থেকে শুরু করে তোর টিচার, বয়স্ক আত্মীয় - কারো সাথে কথা বলতে অস্বস্তি না লাগে সে জন্য অনেক বেশি মানুষের সাথে গল্প করতে হবে। ইউনিভার্সিটি তে উঠলে সার্কেল বড় হবে, কিন্তু ওটাও ঐ ক্লাশমেট দের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। ওখানে বিভিন্ন ফ্যামিলি ব্যাকগ্্রাউন্ডের মানুষ হয়ত পাবি, কিন্তু বিভিন্ন বয়স বা পেশার মানুষ ত পাবিনা। তুই ইসলামের দাওয়াত দিতে গেলে তাদের কাছে যেতে হবেনা? বা গ্রামে গিয়ে কাজ করতে হলে তাদের একজন হতে হবে ত! ত এর জন্য ঢাকার বাইরে যত আত্মীয় আছে ফোন করে কথা বলবি, দূর সম্পর্কের চাচী, মামী, ফুফু - সবার সাথে যোগাযোগ রাখবি। এতে করে অনেক সময় যখন ফ্রেন্ডরা থাকেনা - তখন বোরড লাগবে না। ফ্রেন্ডদের অভাবও বোধ করবি না অনেক সময়। আর অনেক রকম মানুষ মানেই অনেক রকম টপিক - কত যে মজার মজার দিক জানা যায় মানুষের! দেখবি একটা ঘটনাই কত জন কত ভাবে দেখে। মানুষের সাইকোলজি বোঝার জন্য এর চেয়ে সহজ উপায় আর নেই। 

তারপর? 

তারপর... তোকে আমি কিছু টাকা পাঠাব। তুই কত টাকা একসাথে হাতে পেয়েছিস এই পর্যন্ত? উম... চার হাজার। আচ্ছা, আমি এমন পরিমাণ টাকা দিব যাতে তোর অনেক টাকা মনে হয়। তুই এই টাকা তিন ভাগে ভাগ করবি। একভাগ ফ্রেন্ডদের সাথে ফাস্ট ফুডে গিয়ে উড়াবি আর তোর শখের জিনিস কিনবি। একভাগ দিয়ে বই কিনবি। আর একভাগ চ্যারিটি করবি। চ্যারিটি জাস্ট হাতে টাকা ধরায় দিলেই হবে না। লং টার্ম কাজে লাগে এরকম জায়গায় চ্যারিটি করতে হবে। তারপর পুরা টাকা শেষ হলে আমাকে বলবি কোনভাবে টাকা খরচ করে তোর সবচেয়ে ভাল্লাগসে। 

কী দরকার? আমি টাকাটা রেখে দেই, একটা কোর্স করব ঐ টাকা দিয়ে! 

তার মানে আল্লাহ তোকে অর্থ দিয়ে পরীক্ষা করল, আর তুই পুরাটা নিজের ভবিষ্যতের জন্য হাপিশ করে দিলি? কঞ্জুস! স্বার্থপর! 

ইয়ে! আচ্ছা ঠিক আছে, দিস টাকা, চিন্তা করে দেখি কী করা যায়। 

হ্যা, আর আল্লাহ যে তোকে সময় দিয়ে পরীক্ষা করতেসে তার কী? পুরা টাইমটা নিজের ফিউচারের জন্য খরচ করতেসিস? নাইলে টিভি দেখতেসিস? চ্যারিটি অব মানি বুঝিস, চ্যারিটি অব টাইম বুঝিস না? ঘরের কাজ কর, আব্বা আম্মার সাথে সময় কাটা, নেট এ বসলে এডুকেশনাল ভিডিও কী পাওয়া যায় খুঁজে বের কর, ঐগুলি অনুবাদ করে বাংলায় ভয়েস দিয়ে ডিভিডি বানাবি। স্কুলে স্কুলে পাঠানোর ব্যবস্থা করতে হবে। নানু কে ফোন করে জিজ্ঞাসা কর ঢাকা থেকে কী কী পাঠাতে হবে। আমার এক ফ্রেন্ড এর বেবি হবে, ওকে গিফট কিনে দিয়ে আসবি। 

ধ্যুৎ! এত কাজ করতে বলিস, ভাল্লাগেনা! 


আমি হাসলাম। আমার কাজ এ পর্যন্তই।