Showing posts with label Thoughts. Show all posts
Showing posts with label Thoughts. Show all posts

Monday, September 24, 2012

রিলে রেস্ (একটি আটপৌরে কথোপকথন)

আজকে সকালে নাস্তার পর চা খেতে খেতে স্বামী স্ত্রীতে আলাপ হচ্ছিল। প্রসঙ্গ, যাকাতের টাকাটা কোথায় খরচ করলে ভাল হয়। আমাদের সাধ্য অল্পই, তাই যাকাত ছাড়া অন্য সময় এতটা অর্থ একবারে দান করার সুযোগ হয়না। তাই এ সময় আমরা আমাদের ইচ্ছার/স্বপ্নের সর্বোত্তম প্রয়োগ করার চেষ্টা করি। আমার স্বামীর ইচ্ছা সেল্ফ সাস্টেইনেবল প্রজেক্ট চালাবে, এবং একটা পরিবারকে হলেও স্বনির্ভর করে দেবে, আমার ইচ্ছা জ্ঞান ও মেধার বিকাশ হয় এমন যে কোন প্রজেক্টে, যত সামান্যই হোক, অবদান রাখব। 

এভাবেই কথা বলতে বলতে আমেরিকায় হামজা ইউসুফ পরিচালিত জয়তুনা কলেজের কথা আসল। এটি একটি লিবারেল আর্টস কলেজ। সেখান থেকে ভবিষ্যতের ইবনে তাইমিয়্যা, ইমাম গাজ্জালি, তারিক রামাদান বের হবেন, এমনই স্বপ্ন দেখি আমি। আমার স্বামী বরাবরই বাস্তবমুখি চিন্তা ভাবনার মানুষ। উনি বললেন, "ঠিক আছে। মুসলিম দার্শনিকের দরকার আছে, যারা ধর্মের সাথে জীবনাচারের সামঞ্জস্যের নতুন নতুন রূপরেখা নির্দেশ করবে। কিন্তু একটা আন্ডারগ্র্যাজুয়েট কলেজ খুলে তার কতদূর হবে? সদ্য হাইস্কুল পাশ করা একটা ছেলের/মেয়ের ম্যাচিউরিটি ত কখনই এতখানি হবে না যে সে তারিক রামাদানের লেভেলের চিন্তাভাবনা করবে। আর জয়তুনা কলেজের কারিকুলামে যা আছে, তা মদীনা ইউনিভার্সিটি বল, আল আজহার বল... এসব প্রতিষ্ঠিত বিশ্ববিদ্যালয়ে ত চলে আসছেই। আমার মতে ওদের উচিৎ মাস্টার্স বা পিএইচডি চালু করা, যেখান থেকে একেবারে ফাইনাল প্রোডাক্ট হয়ে থিংকাররা বের হবে, যারা সরাসরি কমিউনিটি তে কাজ করার উপযোগিতা নিয়ে আসবে। আবার দিনরাত্রি চিন্তাভাবনা করে, এমন লোকজনই বা ক'টা পাবে? আমার ত ভাল লাগেনা, তোমার হয়ত তাও কিছুটা ভাল লাগে।" 

চুপচাপ চায়ের কাপে চুমুক দিতে দিতে কথাগুলো মনের মধ্যে আনাগোনা করলাম। তারপর বললাম, "তারিক রামাদানদের তাত্ত্বিক কথাবার্তা সমাজ পর্যন্ত পৌঁছাতে এক ধাপে হবে না। তার আর সমাজের মাঝখানে অনেকগুলো ধাপ আছে। আমি হয়ত রামাদানের কথা কিছুটা বুঝি, আমার সোশ্যাল সায়েন্সে পড়া বান্ধবী আরো ভাল বোঝে। তুমি যদি আরো কম বোঝ তাতেও ত কোন সমস্যা নেই। কারণ তোমাকে দেখেছি, যে কোন তত্ত্বীয় দিকের প্রয়োগটা খুব সুন্দর করে প্ল্যান করে ফেলতে পার। আমি যেমন তত্ত্বকথা নিয়ে পড়ে থাকতে ভালবাসি, তুমি সে আইডিয়াটা ভাল হলে সর্বোচ্চ প্রয়োগ কীভাবে করা যায় সাথে সাথে বের করে ফেলতে পার। সুতরাং তুমি সরাসরি ওদের কথা বোঝনা মানে কিন্তু এই না, তোমাকে ছাড়াও মুসলিম উম্মাহর চলবে, বা তোমার মুসলিম কমিউনিটি কে দেয়ার মত কিছু নেই।" 


কিছুক্ষণ বিরতি। বোধহয় কথাগুলো মনে ধরল। তারপর বলল, "আমি চাই মুসলিমরা জাগতিক উৎকর্ষের দিক থেকে ইহুদিদের মত হবে। ছোট্ট একটা জাতি, কী নেই তাদের? বিজ্ঞানে এগিয়ে আছে, মিডিয়া তাদের দখলে, প্রচুর টাকা.." আমি থামিয়ে দিয়ে বললাম, "কেন, আমাদের মুসলিমদের কি ব্যক্তি পর্যায়ে টাকাপয়সা নেই?" "আছে! ডাক্তারদের আছে! কিন্তু তারা গিয়ে টাকা ঢালে মসজিদে। মসজিদগুলিও দানের টাকা তার সৌন্দর্যবর্ধনের কাজেই লাগিয়ে খুশি থাকে! অথচ হওয়া উচিৎ ছিল এমন, বাল্টিমোর একটা কমিউনিটি, এখানে এতজন মুসলিম ডাক্তার থাকতে হবে, এতজন লইয়্যার থাকতে হবে, সিনেটে লোকজন থাকতে হবে। তারপর হিসাব করতে হবে, এর কতটুকু এখন আছে। তারপর মসজিদভিত্তিক স্কুলগুলোতে ছাত্রবৃত্তির ব্যবস্থা করতে হবে, তুমি যদি হাইস্কুলের পর এই লাইনে যাও, বৃত্তি পাবে।" 

কথাগুলো এত ভাল লাগল, বলে ফেললাম, "ইনশাআল্লাহ! আমরা আমাদের ছেলে/মেয়েকে ল' পড়াব, যদি তার যোগ্যতা ও ইচ্ছা থাকে। আর সাধ্যের মধ্যে থাকলে এমন মেধাকে বিকাশে সাহায্যও করব।" তারপর বললাম, "দেখ, তুমি মসজিদ কমিটিকে দোষ দিতে পারনা। তারা তাদের যোগ্যতার মধ্যে থেকে যা করার করেছে। তাদের লিমিটেশন আছে। কমিউনিটি কে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার প্রথম ধাপ ছিল মসজিদ তৈরি করা, সে মসজিদে মানুষকে আকৃষ্ট করা। সেটা উনারা করেছেন। ভবিষ্যতের চিন্তা করে এভাবে প্ল্যান করাটা উনাদের যোগ্যতায় কুলাবে না।" কী বলতে চাইছি, বুঝতে পেরে বলল, "কিন্তু আমার মত মানুষ ত কেবল প্ল্যান দিয়ে আর সংগঠকদের একটু সমালোচনা করেই সারা। আমরা ত এগিয়ে গিয়ে কাজ করব না। কাজ করার জন্য আরো অনেক বেশি কর্মঠ, গোছানো, ডেডিকেটেড হতে হয়। আমি প্ল্যান দিলেই কী আর না দিলেই কী?" 

চুপ করে থাকলাম। এভাবেই সুন্দর ভাবনার চারাগুলো আলো, পানি, হাওয়া না পেয়ে মারা যায়। এই মানুষটাকে যদি ঠিকভাবে বলতে না পারি, সে হয়ত কখনোই বুঝবে না, এভাবে চিন্তা করার মত আন্তরিক মনের সংখ্যা কত কম! 

বললাম, "দেখ! তুমি এই যে চিন্তাটা করলে, এইটাই কিন্তু তোমার স্বকীয়তা ছিল। অর্গানাইজ করা, এক্সিকিউট করা - এসব না করার দোষ তোমার উপর চাপিয়ে দিলে তোমার উপর অন্যায় করা হবে। মসজিদ কমিটির লোকদের লিমিটেশন আছে সুদূরপ্রসারী চিন্তা করতে পারেনা। সে অভাবটা তুমি পূরণ করছ। তোমার আমার লিমিটেশন আছে, আমরা কোন কিছুর জন্যই সময় বের করতে পারিনা। আমরা কী করব - বড়জোর মসজিদ কমিটির যে বড় ভাই কে চিনি, উনাকে গিয়ে বলব। উনি অন্যদের থেকে একটু আলাদা, কিন্তু উনারও সীমাবদ্ধতা আছে। উনিও কাজটা একা করতে পারবেন না। এজন্যই সবাই মিলে কাজ করাটা খুব বেশি দরকার। সামুদ্রিক কোরালের মত এক কণা এক কণা ইনপুট দিয়ে পুরো জিনিসটা গড়ে উঠবে। আর যে যেখানে পায়, তার যোগ্য মত জায়গাটা খুঁজে নেবে। তার পক্ষে যেটুকু করা সম্ভব, সেটুকু করে আসবে। তোমার কাজ ছিল আইডিয়া দেয়া। তুমি দিয়েছ। তোমার ত মন খারাপ করার দরকার নেই, তুমি এক্সিকিউট করতে পারনা বলে। এক্সিকিউট করা তোমার কাজ না। এক্সিকিউট করার মানুষ বের হয়ে যাবে ইনশাআল্লাহ।" 


কাপের চা শেষ হয়ে ঘড়ির কাঁটা বেয়াড়া রকমের সামনে চলে গেল। আমাদেরও ল্যাবে যাওয়ার জন্য উঠতে হল। বের হওয়ার প্রস্তুতি নিতে নিতে মনে হল, আমরা সবাই একটা সুদীর্ঘ রিলে রেস এ অংশ নিয়েছি। রেস এ কার দৌড় আগে, কার পরে, সেটা জরুরি না, যে দায়িত্বটা দেয়া হয়েছে, সেটা অন্যজনের তুলনায় সম্মানের না অসম্মানের - সেটাও জরুরি না। ব্যাটনটা এখন আমার হাতে, সেটা নিয়ে সময়ের মধ্যেই পরের জনের হাতে তুলে দিতে হবে - এটাই কেবল জরুরি।

Monday, June 11, 2012

কর্তব্য - শরীরের প্রতি

কিছুদিন আগে মোখতার মাগরুবির এক লেকচারে শুনছিলাম, আখলাক্ব শব্দের উৎপত্তি 'খ ল ক্ব' থেকে দু'টো শব্দ আসে, খালক্ব এবং খুলক্ব। এর একটির মানে শরীর, অপরটির অর্থ আত্মা। আখলাক্ব বা সর্বোত্তম চরিত্র নিশ্চিত করতে খালক্ব ও খুলক্ব - দুটোরই নিয়মিত পরিচর্যা প্রয়োজন। তিনি আরো একটা কথা বলেছিলেন, আমরা নিয়মিত শরীর পরিচ্ছন্ন রাখতে গোসল করি, আমাদের মধ্যে কতজন নিয়মিত 'স্পিরিচুয়াল শাওয়ার' নেন? অনেক দিনের ময়লা জমে জমে তাদের আত্মা যে দুর্গন্ধযুক্ত হয়ে যায়, সেটা আশপাশের সবাই টের পায় - কেবল তারাই টের পান না। 

যা হোক, আত্মা, স্পিরিট - এসব নিয়ে আমার আগ্রহের কমতি নেই, তাই স্পিরিচুয়াল শাওয়ার জাতীয় ব্যাপার স্যাপার আমি ঘেঁটে দেখেছি মোটামুটি (Click this link...,Click this link..., Click this link...); কিন্তু বারবারই যে অংশটা আমার মনোযোগের বাইরে ছিল - তা হল শরীর, শরীরের যত্ন - সুন্দর চরিত্র গঠনের জন্য শরীরের যত্নের প্রয়োজনিয়তা। আমার মা সারাজীবনই অভিযোগ করে এসেছেন আমার মত শরীরের হেলাফেলা করা মানুষ নাকি তিনি আর একটি দেখেন নি। সকালে না খেয়ে বের হয়ে যাওয়া, কাঠফাটা রোদ মাথায় নিয়ে শুধুশুধু ঘুরে বেড়ান, ফচফচে নাক নিয়ে ঝুপ করে বৃষ্টিতে ভেজা, সারারাত বাতি নিভিয়ে কম্পিউটারের মনিটরে তাকিয়ে থাকা - আর কত বলব? কেন জানিনা, নিজের যত্ন নেয়াটা আমার কাছে আদিখ্যেতা মনে হত। শরীরকে আদু আদু করাটা মনে হত বিলাসিতা। 

মোখতার মাগরুবির এই টক শুনে নতুন করে শরীরটার কথা একটু মনে করলাম। মনে পড়ল, শেষ বিচারের দিনে আমার অঙ্গ প্রত্যঙ্গ আমার বিরূদ্ধে নালিশ জানাবে, যে আমি তাদের প্রতি অন্যায় করেছি, তাদের দিয়ে আল্লাহর অপ্রিয় কাজ করিয়েছি। আমারই হাতের আঙুল কিনা বলবে আমি কী বোর্ডে অলস হাত বুলিয়েছি, যখন এতিম কারো মুখে ভাত তুলে দেয়ার কথা ছিল? 

আমি জানিনা, নালিশ বলতে আমি দু'টো পক্ষ বুঝি, বাদী আর বিবাদী। এক পক্ষ অন্যায় করে, অপর পক্ষ সে অন্যায়ের বিরূদ্ধে নালিশ করে। আমার চোখ যখন বাদী হয়ে যাবে - তখন ত সে আর আমার না, সে ত 'আমার' চোখ না। সে একটা নিজস্ব এনটিটি, যার কিনা নিজের মত করে ন্যায় অন্যায় বোঝার ক্ষমতা আছে। এই চিন্তাটা হঠাৎ করেই আমাকে ভয় পাইয়ে দিয়েছে। এভাবে এক এক করে আমি যদি চোখ, নাক, কান, মুখ, হাত, পা সবাইকে বাদ দিতে থাকি, তাহলে আমি আর 'আমি' রইলাম কই? 

বুঝতে অসুবিধা হচ্ছে? চোখটা বন্ধ করুন, করে নিজের শরীরের দিকে তাকান (মনে মনে); তারপর পা দুটো বাদ দিয়ে বাকি অংশটাকে নিজের মনে করুন, তারপর কোমরের নিচ থেকে সবটুকু বাদ দিয়ে বাকিটাকে নিজের মনে করুন... এভাবে সব বাদ দিতে দিতে শেষ পর্যন্ত এসে দাঁড়াবে আমার মস্তিষ্কটুকু কেবল আমার, বাকি সব আল্লাহর থেকে বর্গা দেয়া কিছু কর্মচারি। ওহো! না না! মস্তিষ্কও ত বলে বসতে পারে, সে আমাকে মানুষের নামে খারাপ চিন্তা করতে বাধ্য করত... তাহলে আসলে কেবল মাত্র রয়ে যায় আমার স্বাধীন ইচ্ছা - যা কিনা আর সব... সব কিছুকে নিয়ন্ত্রণ করছে। আমার স্বাধীন ইচ্ছার বিরূদ্ধে সাক্ষ্য দেবে আমার প্রত্যেকটা ইন্দ্রিয়, প্রত্যেকটা অঙ্গ - আমার আত্মা, আমার নফস ... শেষ পর্যন্ত ভয় পেয়ে আবিষ্কার করলাম, যত বেশি দয়া, তত বেশি আমানত। আমি আমার পায়ের প্রতি ইহসান দেখাচ্ছি ত? কিডনীর প্রতি? মাথার চুলগুলোর প্রতি? আল্লাহ কি জানতে চাইবেন না, তোমাকে তাহলে দু' দুটো ভাল কিডনী দেয়ার দরকার কী ছিল, যদি একুশ বছর বয়সেই সেগুলো ড্যামেজ করে বসে থাক? 

এই প্রচন্ড ভয়ের অনুভূতিটা থেকে আমি ঠিক করলাম আল্লাহর এই আমানতগুলির যত্নআত্তি শুরু করব। কোন ফ্যাক্টরি যুগের পর যুগ এমনি এমনি চলে আসার পর হঠাৎ করে মেইনটেন্যান্সের প্রয়োজন পড়লে একটা প্রাথমিক সার্ভে করে নিতে হয়। তাই আমি ঠিক করলাম, ওদের সাথে কথা বলব। সত্যি সত্যি, একদিন ঘুমোতে যাওয়ার আগে চোখকে জিজ্ঞাসা করলাম, ও চোখ! তুমি কেমন আছ? চোখ ধমকের সুরে উত্তর দিল, ভাল থাকব কীভাবে? তুমি জীবনে আমাদের কোন যত্ন নাও? আমি মাথা চুলকে বললাম, কী মুশকিল! কেন কেন? চোখ ঠিক মধ্যবয়সী ঘেঁয়ো কুকুরের মত একঘেঁয়ে সুরে বলল, দুই বছর হয়ে যাচ্ছে একটা ভুল পাওয়ারের চশমা পরে কাটিয়ে দিচ্ছ, আমার লেন্স এডজাস্ট করতে কত কষ্ট হয় তা জান? তারপর কথা নাই বার্তা ল্যাব এ কাজ করার মধ্যে হাত না ধুয়ে চোখ রগড়ানো শুরু করলে, তোমার হাতে সেদিন কী রিএজেন্ট লেগে ছিল জান? 

আমি ভয় পেয়ে স্যরি টরি বলে প্রতিজ্ঞা করলাম, এক সপ্তাহের মধ্যে চোখ দেখিয়ে নতুন চশমা নেব। 

গেলাম দাঁতের কাছে। ভীষণ অভিমান করে দাঁত জানাল আমি নাকি ভুলেই যাই তাদের কোন রকমের চাহিদা থাকতে পারে। এমনি করে নাক, কান, ফুসফুস, হৃদপিন্ড, মস্তিষ্ক - সবার অভাব অভিযোগ শুনতে শুনতে আর নিজেকে গাল দিতে দিতে পৌঁছলাম পাকস্থলির কাছে। দিব্যদৃষ্টিতে দেখতে পাচ্ছিলুম, সে কী বিরাট অভিযোগের ডালি খুলে বসবে। তাই আর সেদিন সাহস করে পাকস্থলির সাথে কথা বলতে পারিনি। 

এমনি করে বাকহীন, বুদ্ধিহীন যন্ত্রগুলোকে একটা বড় ফ্যাক্টরির কর্মচারি ভেবে কথা বলতে বলতে আমি যেন সত্যি চোখের সামনে এদের অর্গানাইজেশনটা দেখতে পাচ্ছিলাম। এরা প্রত্যেকে নিজেদের কাজ সম্পর্কে খুব ভাল ধারণা রাখে, এবং নিজেদের কাজ নিখুঁতভাবে করতে ওয়াদাবদ্ধ। একজনের কাজ ঠিকমত না হলে অন্যজনও একটু সমস্যায় পড়ে যায়, কিন্তু তাই বলে অন্যের কাজের উপর সর্দারি করেনা মোটেও। প্রত্যেকেই জানে, তারা সবাই মিলে একটা মহান লক্ষ্যের অংশীদার, তা হচ্ছে, 'আমি' নামক এই মাথামোটা মানুষটিকে কর্মক্ষম রাখা। তাই এদের একজন ছোটখাট বিগড়ে গেলেও অন্যান্য সব অঙ্গ তাদের দায়িত্ব আরেকটু বাড়িয়ে দিয়ে মহান লক্ষ্যটাকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে। 

ফ্যাক্টরির রুট লেভেলের প্রত্যেকটা কর্মচারিই তাদের দাবিদাওয়া গুলো বিভিন্ন ভাবে পেশ করে। কিন্তু মাথামোটা কর্মকর্তা অনেক সময় ওসব পাত্তা না দিয়েই তার পছন্দমত যা ইচ্ছে করে যায়। যেমন দশ বারো ঘন্টা শরীরে গ্লুকোজ না দিয়ে হঠাৎ করে একগাদা চকলেট খেয়ে ইনসুলিন কোম্পানিকে ঝামেলায় ফেলে দেয়। প্রচন্ড রোদ্দুরে মস্তিষ্কের তাপমাত্রা ঠিক রাখার জন্য যেটুকু পানি খাওয়া দরকার - সেটুকু না দিয়েই আশা করে মস্তিষ্ক বাবাজি ঠিকঠাক মত কাজ করবে। এ যেন স্বেচ্ছাচারি শাসকের যাচ্ছেতাই ফরমায়েশ! আমার অন্যায় অত্যাচার তাদের চোখে দেখতে গিয়ে আমারই উপর আমার রাগ ধরে যাচ্ছিল। 

শুধু তাই নয়, এই অসম্ভব সিনসিয়ার, নিখুঁত, এত বড় একটা কর্মযজ্ঞ - কোন রকম বিশ্রাম না নিয়ে কাজ করে যাচ্ছে, করেই যাচ্ছে - কী জন্য? কেবলমাত্র 'আমি', অর্থাৎ হাত পা চোখ কান সব বাদ দিয়ে যে একরত্তি আমি থাকি - সেই 'আমি'র সব রকমের চাওয়া পূরণ করার জন্য। মনে হতেই মনে হয়, বাব্বাহ! আমি এত স্পেশাল? ঝানতাম নাহ! কিন্তু আত্মপ্রসাদের আনন্দটুকু থিতু হতে না হতেই নক নক করে মনের দরজায় টোকা মারে আরো একটি প্রশ্ন, কেন? 

সত্যিই, কেন? আমার স্বাধীন ইচ্ছা, যে ইচ্ছা আমাকে আট ঘন্টা ঘুমাতে বাধা দেয়না, ঘন্টার পর ঘন্টা ওয়েবসাইটগুলোতে শপিং ডিল খুঁজে বেড়ানোর সময় বাধা দেয়না, ভাত খাওয়ার সময় একটা টিভি সিরিয়াল দেখতে হবেই, আমারো ত বিশ্রাম প্রয়োজন - এমন অজুহাতে কাজের অকাজের সব রকমের চাওয়া চাপিয়ে দেয় আমার আজ্ঞাবহ শরীরটার উপর - শেষ বিচারের দিনে তা ঠিকঠাক মত আমার চাওয়া পূরণ করবে ত? ভাবতে ভয় হয়। 

মোকতার মাগরুবির সেই টক, আর উপরে লেখা হাদীসটা আমাকে খুব ভাল করে মনে করিয়ে দিয়েছে, এই পৃথিবীতে আমার সময় কেবলই কিছু কর্তব্যের সমষ্টি। আমি আমার কর্তব্যগুলো কত ভালভাবে পালন করতে পারি তা দিয়েই নির্ধারিত হবে আমার সাফল্য। এতদিন পর্যন্ত কর্তব্য বলতে ভাবতাম স্ত্রী হিসেবে কর্তব্য, কন্যা হিসেবে কর্তব্য. মুসলিম হিসেবে কর্তব্য। সেদিনের পর থেকে যোগ হয়েছে, রূহধারী দেহটার প্রতি কর্তব্যও। 


উৎসর্গ: মেয়েদের শরীরচর্চার প্রয়োজন আছে কি নেই, বা থাকলেও এর ব্যপ্তি কতটুকু - তা নিয়ে চিন্তা করেন এমন সকল ব্লগার ভাই ও বোনেরা।

Wednesday, May 30, 2012

প্রকৃতি থেকে শেখা

আমার সবসময়েই পাহাড়ের প্রতি অদ্ভুত টান। অনার্স সেকেন্ড ইয়ারে যখন আমাদের প্রিয় ম্যাডাম স্যারদের সঙ্গে সিলেট বেড়াতে গেছি, মাধবকুন্ড ঝর্ণার সামনে আমার একটা ছবি আছে, সবাই ঝর্ণার সামনে হাসিমুখে বসে আছে, আমি উল্টোদিকে ফিরে হা করে পাহাড় দেখছি। অনার্স শেষ বর্ষে স্টাডি ট্যুরে ইন্ডিয়া না নেপাল যাব - এই তর্কে আমার আর ব্লগার মনপবনের প্রবল আপত্তিতে ইন্ডিয়ার প্রস্তাব ধোপেই টেকেনি। দশদিন ধরে পাহাড় দেখতে পারব - এই আনন্দেই আমি অধীর হয়ে ছিলাম। 

পাহাড় নিয়ে আমার অতি আগ্রহের কথা আমার স্বামী খুব ভালভাবেই জানে। জানে, কেবলমাত্র হাইকিং এর সুযোগ থাকলেই আমাকে বেড়াতে নিয়ে খুশি করা যাবে। তাই সেমিস্টারটা শেষ হতেই চলে এসেছি আমেরিকার পশ্চিম উপকূলে, উদ্দেশ্য পর্বত দর্শন ও আরোহণ, তার পাশাপাশি আরো যা কিছু বোনাস হিসেবে পাওয়া যায়.. 

এখনও ট্রিপ শেষ হয়নি। গত সাত দিনের প্রতিটি দিন পাহাড়ে চড়েছি। অ্যাজমার জন্য শরীরে কুলোয়নি, তবু থেমে থেমে যে করেই হোক, পাড়ি দিয়েছি - যতটুকু পথ নিয়ে যায়। এর মধ্যে পাহাড় চুড়া থেকে কত... যে রূপ দেখলাম.. আল্লাহর সৃষ্টির মধ্যে হারিয়ে গিয়ে চিনলাম সর্বশ্রেষ্ঠ স্থপতি, সর্বশ্রেষ্ঠ শিল্পী, সর্বশ্রেষ্ঠ সংগঠক কে। 

59:24 He is God, the Creator, the Maker who shapes all forms and appearances! His [alone] are the attributes of perfection. All that is in the heavens and on earth extols His limitless glory: for He alone is almighty, truly wise! 


আমাদের পাঁচজনের এই গ্রুপের অনন্য দিক হল, কমবেশি মাত্রায় প্রত্যেকেই আল্লাহভক্ত, এবং উঁচুমাত্রার দর্শন আলোচনায় কারো কোন ক্লান্তি নেই। তাই পাহাড়ের উপর দাঁড়িয়ে জামাতে নামাজ বা লং ড্রাইভে স্কলারদের লেকচার শোনাই কেবল নয়, কার দৃষ্টিতে এইসব সৌন্দর্য কী উপলব্ধি এনে দিয়েছে, তা শোনারও সুযোগ হয়েছে অনেক। এর অল্প কিছু এখানে বলি - 


ইয়োসিমিটি ন্যাশনাল পার্ক (ক্যালিফোর্নিয়া) তে অর্ধবৃত্তাকার এক পাহাড় আছে, একে হাফ ডোম বলে। এ পাহাড়ের উত্তল অংশটাতে দশফুট পরপর স্টিক গুঁজে চেইন দিয়ে ট্রেইল করা হয়েছে। অবিশ্বাস্য রকমের কঠিন হাইক। কঠিন বলেই হয়ত, মানুষের আকর্ষণও বেশি। তাছাড়া আশপাশের সবকিছু মিলিয়ে এই পাহাড়ের নান্দনিক সৌন্দর্য বলে বোঝানো যাবে না। হাফ ডোম একটা সেলিব্রিটি পর্যায়ের পাহাড়, তাকে নিয়ে বিভিন্ন গল্পও চালু আছে শুনেছি। ত যাই হোক, আমাদের মধ্যে একজন বলল, এই পাহাড়টার যদি এমন করে প্রচার প্রসার করা না হত, একে কি এতটাই সুন্দর লাগত? আমরা বললাম, লাগত, কারণ পাহাড়টা ইউনিক। ও তখন একটা গল্প শোনাল, নিউইয়র্কের সাবওয়ে স্টেশনে এক নামকরা মিউজিশিয়ান এককোণে দাঁড়িয়ে পারফর্ম করছিল, কেউ ফিরেও তাকায়নি। আমরা আসলে উপযুক্ত জায়গায় উপযুক্ত ব্যাকআপ ছাড়া সৌন্দর্যটাও ঠিক মত এপ্রিসিয়েট করতে পারিনা। তখন আমার ব্লগার মনপবনের এভারেস্ট বিজয় নোটটার কথা মনে পড়ে গেল - কে-২ পর্বতচুড়ায় আরোহন অনেক বেশি কঠিন হলেও তা নিয়ে মানুষ এত হইচই করেনা, যতটা করে এভারেস্ট নিয়ে। 


সে হাফ ডোম দূর থেকে দেখবার জন্য একটা 'গ্লেসিয়ার পয়েন্ট' নামে একটা জায়গা আছে, সেখানে ভীষণ মানুষের ভিড়। আমরা 'দুত্তোরি ছাই' বলে চলে গেলাম একটু দূরে, অল্প কিছু পাথরের আড়ালে। হইচই, ভিড়বাট্টা সব দূরে চলে গেল। চোখের সামনে শুধু কালো গ্রানাইট পাথরের রূক্ষ উঁচু উঁচু পাহাড়ের মাঝখান দিয়ে একে বেঁকে যাওয়া শীর্ণ গিরিপথ, অনেকের মধ্যে থেকেও সগৌরবে অনন্য হাফ ডোমের আত্মগরিমা, আর একটু দূরে প্রচন্ড গর্জনে ধেয়ে আসা সফেন নাম না জানা এক ঝর্ণা। কোন মানুষের শব্দ নেই, শুধু ঝর্ণার গর্জন, পাখির ডাক, পাথরের ওপর ছড়িয়ে ছিটিয়ে বসে থাকা আমরা কজন। ওপাশে সূর্য আজকার মত বিদায় নেবার প্রস্তুতি নিচ্ছে। পাশে তাকিয়ে দেখি আমার প্রিয় এক আপুর চোখে পানি, আপন মনেই বলল, এসবের কাছে নিজেকে কতটা ছোট মনে হয়! এই এতসব সৃষ্টির মাঝে আমরা কত তুচ্ছ! আর তার চেয়েও কত.. কত... তুচ্ছ আমাদের সমস্যাগুলো.... 

আপুর থেকে দৃষ্টি ফিরিয়ে চোখ রাখলাম পাহাড়সীমায়। চিরচেনা কথাগুলো আবারও নিজের জীবনের সাথে মিলিয়ে নতুন মনে হল। 


ইউটাহ থেকে ইয়োসিমিটি পার্ক এ যাওয়ার পথে গিরিসংকুল এক পথ পড়ে, তিয়োগা রোড। বছরের অধিকাংশ সময় সে রাস্তা তুষারের কারণে বন্ধ থাকে। আমরা ইউটাহ থেকে মরুভূমি দেখতে দেখতে আসছি, হঠাৎ কথা নেই বার্তা নেই তুষারপাত শুরু হয়ে গেল। যে মোটেলে উঠব সেখানকার মালিক ফোন করে জানাল তিয়োগা পাস বন্ধ হয়ে গেছে, আমরা যেন প্ল্যান করে আসি। আমাদের ত আর ফেরার উপায় নেই, সে কি রাস্তা! অন্ধকারে একটা গাড়ি নেই, একেবেঁকে পিচ্ছিল রাস্তার উপর দিয়ে বর্ষার ফলার মত গাড়ির শিল্ডে এসে ফুটছে বরফকণা - আমরা সমানে আল্লাহকে ডাকতে ডাকতে এগোচ্ছি। কোনমতে এসে পৌঁছলাম হোটেলে। পরদিন তিয়োগা খুললে ইযোসিমিটি যাত্রা। আমাদের হোটেল তিয়োগার অল্প একটু আগেই। ট্যুর এর হোটেল বুকিং, গাড়ি বুকিং, ফ্লাইট বুকিং সব করেছে আমার স্বামী। তাকে এই ইয়োসিমিটির হোটেল নিয়ে খুব যন্ত্রণা সহ্য করতে হয়েছে, কোথাও কোন হোটেল খালি নেই, তিন দিন ধরে সাধ্যসাধনা করে যে একটা পেল, সেটাও তারা শেষ মুহূর্তে ওকে মানা করে দিল। অবশেষে তিয়োগার আগে এই একটা দু'কামরার চিলেকোঠা। 

মোটেল মালিকের ফোন পেয়ে আমার স্বামী উচ্ছ্বসিত হয়ে বলে উঠল, আল্লাহকে অশেষ অশেষ ধন্যবাদ। যে হোটেলটা না পেয়ে আমি মন খারাপ করেছিলাম ওটা ছিল ইয়োসিমিটি পার্কের ভেতরে। ওটা পেলে আজকে রাতে তিয়োগা পারও হতে পারতামনা, এই বরফের মধ্যে আমাদের গাড়িতে রাত কাটাতে হত। আল্লাহ আমাদের জন্য কী নির্ধারণ করে রেখেছেন তা বুঝতে না পেরে আমরা অকারণেই হতাশ হই। নিকষ কালো পথে হেডলাইটের আলোয় তুষারের ঝিলিক দেখতে দেখতে আবারও মনে পড়ল, আল্লাহ ইজ দা বেস্ট প্ল্যানার। 


লেখাটা লিখতে লিখতে হাসিই পাচ্ছে, কারণ, সে রাতেই আমি আর আমাদের আরেক বন্ধু তর্ক করছিলাম প্রকৃতি কুরআনের বিকল্প হতে পারে কিনা। আমার সে বন্ধু বলছিল, কুরআন যেমন আল্লাহর উপহার, প্রকৃতিও তাই। তুমি যদি চোখকান খোলা রাখ, এবং চিন্তা করতে পার, প্রকৃতির সবকিছুই তোমাকে একই মেসেজ দিবে। আমি বলছিলাম, হতে পারে, কিন্তু কুরআনের প্রয়োজনিয়তা অস্বীকার উপায় নেই। আর প্রকৃতি খুব প্যাঁচালো, কে জানে আমরা কতটুকু ঠিক শিক্ষা পাব। এখন লিখতে গিয়ে দেখি আল্লাহর অন্তত পাঁচ ছয়টা নাম আমার অন্তরে গাঁথা হয়ে গেছে কেবল মাত্র এই ট্যুর থেকে। 

যাই হোক, আরো একটা গল্প বলি। আমরা ইউটাহ তে জায়ন ন্যাশনাল পার্ক এ একরাত থেকেছিলাম, সে পার্কটা বেশ মজার, নবীদের (আ) দের নামে পাহাড়ের নাম, এক পাহাড় চুড়ার নাম অ্যাঞ্জেল'স ল্যান্ডিং (অর্থাৎ যেখানে কিনা ফেরেশতাদের আড্ডা বসে) - সে পার্কে হাইক করতে গিয়ে মনে হচ্ছিল, ইনশাআল্লাহ জান্নাতে আমাদের প্রত্যেকের এরকম ঝর্ণাওয়ালা পার্সোনালাইজড পাহাড় থাকবে, সেখানে সত্যিকারের অ্যাঞ্জেলরা ল্যান্ড করবে। ত সে পার্কে বিরা.....ট বিরা.....ট সব রেডউড ট্রি, ইয়া মোটা মোটা তার গুঁড়ি। একেকটার ভেতর দিয়ে টানেল বানিয়ে গাড়ি চলতে পারবে। তেমন এক গাছ শেকড়সুদ্ধ উপড়ে মাটিতে পড়ে আছে। পৌনে দুই তলা সমান উঁচু একপাশের বেড়। আমি অবাক হয়ে সে গাছের শেকড়ের দিকে তাকিয়ে থাকলাম, এ ত রীতিমত আধুনিক ভাস্কর্য! সিমেন্ট দিয়ে বানিয়ে এ জিনিস প্রদর্শনীতে দিলে বাহবা পড়ে যাবে। আল্লাহ সত্যিই সেরা আর্কিটেক্ট। তখন মনে পড়ল, একটা সময় আমি কনফিউজড ছিলাম, আল্লাহ আমাদের ক্রিয়েটিভিটি কেন দিয়েছেন। তা নিয়ে নোট লিখেছি, প্রশ্নের আকারে, ইবাদত বনাম ক্রিয়েটিভিটি নামে। এই জিনিস দেখে বুঝলাম, আর্কিটেকচার কী না জানলে ত এই জিনিসের মহিমা বুঝতেও পারতাম না। যেমন করে অ্যাবস্ট্রাক্ট পেইন্টিং না দেখলে বুঝতাম না বালির পাহাড়ে এত রংয়ের মহিমা কোথা থেকে আসে! আবারও প্রকৃতির মধ্য দিয়ে আমি পেলাম আমার প্রশ্নের উত্তর। 


আমাদের গ্রুপের সবচাইতে ভাবুক সবচাইতে দার্শনিক মানুষটি হচ্ছে আমাদের সেই জ্যামাইকান বন্ধু, যার কথা ঘুরে ফিরে বারবারই লিখি। আমার সবচেয়ে কঠিন প্রশ্নগুলো আমি তার জন্য তুলে রাখি। এতসব পাহাড় দেখে আমাদের মনে আর কোন সন্দেহের অবকাশ নেই যে পাহাড় চড়ার মত আপাত অর্থহীন কাজটাও আমাদের স্রষ্টার সান্নিধ্যে নিয়ে যায়। আমি তাকে জিজ্ঞাসা করলাম, কেন? একটা ত জানি, এত বিশালতার মধ্যে নিজের ক্ষমতার ক্ষুদ্রতা বোঝা যায়। আর কী? সে বলল, এ ধরণের কাজে তোমার মন ফোকাস হয়, সবধরণের ডিস্ট্রাকশন দূর হয়ে যায়। আবারও জিজ্ঞাসা করলাম, কেন? শারীরিক পরিশ্রম, এমনকি জিম করলেও শুনেছি মন ফোকাস হয়, কীভাবে? 

সে তখন বোঝাল, তোমার মধ্যে তোমার শরীর আর তোমার আত্মা, দু'টোরই অস্তিত্ব আছে। ওর মুখের কথা কেড়ে নিয়ে বললাম, ও.... তার মানে শারীরিক পরিশ্রমে আমার শরীর ট্যাঁ ফো করার সুযোগ পায়না, কন্ট্রোল এ থাকে, তখন আত্মা মুক্তভাবে চিন্তা করার সুযোগ পায়? যেমনটি তারিক রামাদান তার লেকচারে বলেছেন, spirituality is the most demanding among all of your religious requirements? সে বলল, শুধু তাই না, মনকে মুক্ত করার দু'টো উপায় আছে, এক হচ্ছে, নির্বিঘ্নে চিন্তা করতে করতে এমন পর্যায়ে চলে যাওয়া যেখানে তোমার সব চিন্তা থিতিয়ে যাবে, এবং হঠাৎ করে মন পরিষ্কার হয়ে যাবে। যেমনটি রাসুলুল্লাহ (স) করেছিলেন, হেরা গুহায়। আরেকটা হচ্ছে শর্টকাট মেথড, যেখানে তুমি আর সব কিছু বাদ দিয়ে শরীরকে মনকে কেবল একদিকে ফোকাস করে রাখবে, যেমন হাইকিং এ - তখন সব বাজে চিন্তা দূর হয়ে তোমার মন পরিষ্কার হয়ে যাবে। সত্যিকার অর্থে রাসুলুল্লাহ (স) এর দু'টোই একসাথে করেছিলেন। হেরা গুহায় যাওয়া চাট্টিখানি কথাটা না, আমার মামা দেখতে গিয়েছিলেন, তিনি বলেছেন। আর আত্মাকে পরিশুদ্ধ করতে চিন্তা করার ত কোন বিকল্পই নেই। আমরা হাফ ডোমের ওখানে মানুষজন থেকে দূরে গিয়ে প্রকৃতিতে চোখ রাখতেই হারিয়ে গিয়েছিলাম আপন আপন জগতে। এ এমন এক অনুভূতি, যেখানে আটপৌরে জীবনের ক্লান্তিকর ভারগুলো আপনা থেকেই লঘু হয়ে আসে। মন চায় বড় কিছু করতে, ভাল কিছু ভাবতে। ফিরে আসতে ইচ্ছে করেনা, এ যেন একটুকরো স্বর্গের থেকে মনকে টেনে হিঁচড়ে পৃথিবীতে নামিয়ে আনা। ফিরে এসেছি এই আশা নিয়ে, এই পৃথিবীর ডিজাইনার যিনি, জান্নাতের ডিজাইনারও তিনি; ওখানে গেলে সময় আর কখনও ফুরাবে না। 


সবকিছু মিলিয়ে আমি আবারও আল্লাহর কাছে কৃতজ্ঞ, আমাকে এ পথ দিয়ে এভাবে জীবনটাকে চেনার সুযোগ করে দেবার জন্য। কৃতজ্ঞ, পথচলায় এমন মানুষদের বন্ধু হিসেবে পাইয়ে দেবার জন্য। কৃতজ্ঞ মনপবনের কাছেও, তার 'এভারেস্ট বিজয়' নোটে পাহাড় আরোহণের অসারতা নিয়ে কথা হয়েছিল বলেই এসব নিয়ে এতটা চিন্তা করেছিলাম। আল্লাহ সত্যিই মানুষের মনকে মুক্ত করেন, তার নিদর্শনের মাধ্যমে। কোন নিদর্শন কাকে কতটুকু প্রভাবিত করবে সেটা একজন আরেকজনের উপর চাপিয়ে দিতে পারেনা, তাই নিজের বোধটুকু চাঙা রাখার পাশাপাশি অন্যদের পথকে শ্রদ্ধা করাও খুব দরকার।

Saturday, February 25, 2012

একদিন.. নিশ্চয়ই!

এ পর্যন্ত যে কয়েকজন স্কলার/দা'ঈর লেকচার শুনে ইসলামের প্রেমে পড়েছি তাদের একেক জনের কথার শৈলীতে মনে একেক রকম প্রভাব পড়েছে। উয়িসাম শেরীফ, অতি..রিক্ত ফানি, কথা শুনে হাসতে হাসতে পেটে খিল ধরে যায়... কিন্তু কোথা থেকে যে কোথায় চলে যায়, খেই রাখা যায় না। নোমান আলী খান, প্রাণবন্ত, কথা শুনতে ভাল লাগে, পাশাপাশি প্রতিটা লেকচারেই কুরআনের আরো নতুন কিছু মিরাকল শেয়ার করেন, তখন মনে হয়, বাহ! এত কিছু শিখে ফেললাম! তারিক রামাদান, উনার কণ্ঠস্বরে, শব্দচয়নে কী যেন আছে। শোনার পরপরই আত্মবিশ্বাস বেড়ে যায় অনেক! চিন্তাভাবনার আরো অনেকগুলো দুয়ার খুলে যায়, আবারো হিসেব কষতে বসি আমাদের বিচারবুদ্ধির কতটুকু সত্যিই কাজে লাগাচ্ছি। মোখতার মাগরুবি - উনার কথা কী আর বলব! কানে না, মগজে না, সোজাসুজি যেন হৃদয়ে এসে ঠাঁই করে নেয় কথাগুলো। উনার লেকচার শোনার পরে একটা বাক্যও আমার মনে থাকে না, একটাও না! কিন্তু মনের মধ্যে কী জানি হয়ে যায়, আত্মার সাথে বোঝাপড়া করে নেয় মনে হয় কথাগুলো। 

আরো আছে আমিনাহ আস্ সিলমি। কী শান্ত, মিষ্টি, পুরো পৃথিবীটা যেন ভালবাসা দিয়ে ভরিয়ে দেবেন। জ্ঞানের আধিক্যের চাকচিক্য নেই, তবু মনে হয় ইসলাম যেন উনার আত্মার উপলব্ধি। এই প্রশান্তি যেন আল্লাহ ইসলাম গ্রহণের পুরস্কার হিসেবে দু'হাত ভরে উনাকে উপহার দিয়েছেন। 

আমার এইভাবে দা'ঈ দের আলোচনা সমালোচনা করা ঠিক হচ্ছে না। উনারা আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য ইসলাম প্রচার করছেন। কারো উপর কী প্রভাব পড়বে এটা উনার বা আমাদের দেখার বিষয় না। তবু আমার ভাল লাগে উনাদের পরিবেশনশৈলী, বক্তব্যের গভীরতা - এসব নিয়ে চিন্তা করতে। তাছাড়া এটাও চিন্তা করি, উনারা সংসারের প্রয়োজন মিটিয়ে ইসলামের কাজে এত সময় কী করে দেন.. এত কিছু গুছিয়ে করেন কী করে... নোমান আলী খান এর বায়্যিনাহ ইনস্টিটিউট দশমাস ব্যাপী আবাসিক কুরআন কোর্স করায়। উনি প্রতি সপ্তাহেই ট্যুর করছেন, এ দিকে ছয় সন্তানের জনক, মাশাআল্লাহ। 

ইউসুফ এস্টিস, বৃদ্ধ পক্ককেশ দাদু, কিন্তু মাশাআল্লাহ, দু দু'টো টিভি চ্যানেল চালান। উনার চ্যানেলে কেবল উনার প্রোগ্রামই দেখায়, তার মানে প্রচুর প্রোগ্রাম বানাতে হয়েছে, হচ্ছে - এগুলো চালানোর জন্য। তারপর আছেন, আব্দুর রহিম গ্রীন, উনার নাকি ১১ সন্তান। ১১! স্কলাররা, দা'ঈরা আর কিছু না হোক, সন্তানদের ভাল মুসলিম করে গড়ে তুলবেন - এ প্রত্যয় নিশ্চয়ই থাকে। তার অর্থ উনারা এত কাজের মধ্যেও এ দায়িত্বটুকু নিতে ভয় করেন নি। ইনাদের প্রত্যেকেই আমাকে ইন্সপায়ার করে, সফল জীবন বলতে উনাদেরকেই চোখের সামনে দেখি। 

আমার খুব ইচ্ছে করে সময়টাকে কষে বাঁধ দিয়ে টুপ করে ডুব দেই জ্ঞানের অতল সাগরে। যত সময় নষ্ট করেছি, সবগুলোর পাপ ধুয়ে আলোকিত, স্বচ্ছ হয়ে আসি। যখন বেরিয়ে আসব, আলোকচ্ছটায় কারো চোখ ঝলসে যাবে না, নরম এক স্নিগ্ধ আবেশে মন্ত্রমুগ্ধের মত কাছে আসবে সকলে। সূর্য না, চাঁদ না, আমি হব মোম.. আমার জ্ঞানের উত্তাপ আমাকেই গলিয়ে আরো নত করবে.. আর যেই হাত বাড়াবে, তার সাথেই ভাগ করে নেব.. তাতে আমার ঐশ্বর্য কিছুমাত্র কমবে না... 

জানিনা কখনও হবে কিনা... তবে আমি স্বপ্ন দেখতে ভালবাসি। আমি অল্পতে খুশি হয়ে যেতে ভালবাসি। আমি আজকে যেখানে আছি সেখানে কখনও আসতে চাইনি। যা হয়েছি, তা হতে চাইনি। তবু আমি বিশ্বাস করি, ঠিক এভাবেই আল্লাহ চেয়েছিলেন আমি গড়ে উঠি। আমার ধীরগতির বেড়ে ওঠা, চিন্তার জগতে একাকিত্ব, বিকলাঙ্গ সামাজিকতাবোধ, বিষণ্নতা - এ সব কিছুরই দরকার ছিল। আরো সামনে যা আসবে - তারও খুব খুব প্রয়োজন আছে। একদিন আমি আবিষ্কার করব জীবন হঠাৎ খুব তীব্র বাঁক নিয়েছে, আরও অবাক হয়ে আবিষ্কার করব, এই পথটুকু চলবার জন্যই এক পা এক পা করে আমি হাঁটতে শিখেছিলাম। সময়ের নিষ্ঠুরতায় হতোদ্যম হয়ে যখন কেবল ভাগ্যকে দোষারোপ করেছি, তখন মেঘেরও ওপারে, অনেক দূর থেকে ভাগ্যনিয়ন্তা আমার অস্থিরতা দেখে হেসেছেন। 

আমি যা, ঠিক তাই আমার হওয়ার কথা ছিল। আর কোন কিছু না। অন্য কিছুই না। ধন্যবাদ আল্লাহ! আমি জানি, একদিন আমি দেখতে পাব; ততদিন পর্যন্ত আমার অকৃতজ্ঞতার জন্য আমাকে ক্ষমা করে দিও প্লীজ!