Monday, September 24, 2012

রিলে রেস্ (একটি আটপৌরে কথোপকথন)

আজকে সকালে নাস্তার পর চা খেতে খেতে স্বামী স্ত্রীতে আলাপ হচ্ছিল। প্রসঙ্গ, যাকাতের টাকাটা কোথায় খরচ করলে ভাল হয়। আমাদের সাধ্য অল্পই, তাই যাকাত ছাড়া অন্য সময় এতটা অর্থ একবারে দান করার সুযোগ হয়না। তাই এ সময় আমরা আমাদের ইচ্ছার/স্বপ্নের সর্বোত্তম প্রয়োগ করার চেষ্টা করি। আমার স্বামীর ইচ্ছা সেল্ফ সাস্টেইনেবল প্রজেক্ট চালাবে, এবং একটা পরিবারকে হলেও স্বনির্ভর করে দেবে, আমার ইচ্ছা জ্ঞান ও মেধার বিকাশ হয় এমন যে কোন প্রজেক্টে, যত সামান্যই হোক, অবদান রাখব। 

এভাবেই কথা বলতে বলতে আমেরিকায় হামজা ইউসুফ পরিচালিত জয়তুনা কলেজের কথা আসল। এটি একটি লিবারেল আর্টস কলেজ। সেখান থেকে ভবিষ্যতের ইবনে তাইমিয়্যা, ইমাম গাজ্জালি, তারিক রামাদান বের হবেন, এমনই স্বপ্ন দেখি আমি। আমার স্বামী বরাবরই বাস্তবমুখি চিন্তা ভাবনার মানুষ। উনি বললেন, "ঠিক আছে। মুসলিম দার্শনিকের দরকার আছে, যারা ধর্মের সাথে জীবনাচারের সামঞ্জস্যের নতুন নতুন রূপরেখা নির্দেশ করবে। কিন্তু একটা আন্ডারগ্র্যাজুয়েট কলেজ খুলে তার কতদূর হবে? সদ্য হাইস্কুল পাশ করা একটা ছেলের/মেয়ের ম্যাচিউরিটি ত কখনই এতখানি হবে না যে সে তারিক রামাদানের লেভেলের চিন্তাভাবনা করবে। আর জয়তুনা কলেজের কারিকুলামে যা আছে, তা মদীনা ইউনিভার্সিটি বল, আল আজহার বল... এসব প্রতিষ্ঠিত বিশ্ববিদ্যালয়ে ত চলে আসছেই। আমার মতে ওদের উচিৎ মাস্টার্স বা পিএইচডি চালু করা, যেখান থেকে একেবারে ফাইনাল প্রোডাক্ট হয়ে থিংকাররা বের হবে, যারা সরাসরি কমিউনিটি তে কাজ করার উপযোগিতা নিয়ে আসবে। আবার দিনরাত্রি চিন্তাভাবনা করে, এমন লোকজনই বা ক'টা পাবে? আমার ত ভাল লাগেনা, তোমার হয়ত তাও কিছুটা ভাল লাগে।" 

চুপচাপ চায়ের কাপে চুমুক দিতে দিতে কথাগুলো মনের মধ্যে আনাগোনা করলাম। তারপর বললাম, "তারিক রামাদানদের তাত্ত্বিক কথাবার্তা সমাজ পর্যন্ত পৌঁছাতে এক ধাপে হবে না। তার আর সমাজের মাঝখানে অনেকগুলো ধাপ আছে। আমি হয়ত রামাদানের কথা কিছুটা বুঝি, আমার সোশ্যাল সায়েন্সে পড়া বান্ধবী আরো ভাল বোঝে। তুমি যদি আরো কম বোঝ তাতেও ত কোন সমস্যা নেই। কারণ তোমাকে দেখেছি, যে কোন তত্ত্বীয় দিকের প্রয়োগটা খুব সুন্দর করে প্ল্যান করে ফেলতে পার। আমি যেমন তত্ত্বকথা নিয়ে পড়ে থাকতে ভালবাসি, তুমি সে আইডিয়াটা ভাল হলে সর্বোচ্চ প্রয়োগ কীভাবে করা যায় সাথে সাথে বের করে ফেলতে পার। সুতরাং তুমি সরাসরি ওদের কথা বোঝনা মানে কিন্তু এই না, তোমাকে ছাড়াও মুসলিম উম্মাহর চলবে, বা তোমার মুসলিম কমিউনিটি কে দেয়ার মত কিছু নেই।" 


কিছুক্ষণ বিরতি। বোধহয় কথাগুলো মনে ধরল। তারপর বলল, "আমি চাই মুসলিমরা জাগতিক উৎকর্ষের দিক থেকে ইহুদিদের মত হবে। ছোট্ট একটা জাতি, কী নেই তাদের? বিজ্ঞানে এগিয়ে আছে, মিডিয়া তাদের দখলে, প্রচুর টাকা.." আমি থামিয়ে দিয়ে বললাম, "কেন, আমাদের মুসলিমদের কি ব্যক্তি পর্যায়ে টাকাপয়সা নেই?" "আছে! ডাক্তারদের আছে! কিন্তু তারা গিয়ে টাকা ঢালে মসজিদে। মসজিদগুলিও দানের টাকা তার সৌন্দর্যবর্ধনের কাজেই লাগিয়ে খুশি থাকে! অথচ হওয়া উচিৎ ছিল এমন, বাল্টিমোর একটা কমিউনিটি, এখানে এতজন মুসলিম ডাক্তার থাকতে হবে, এতজন লইয়্যার থাকতে হবে, সিনেটে লোকজন থাকতে হবে। তারপর হিসাব করতে হবে, এর কতটুকু এখন আছে। তারপর মসজিদভিত্তিক স্কুলগুলোতে ছাত্রবৃত্তির ব্যবস্থা করতে হবে, তুমি যদি হাইস্কুলের পর এই লাইনে যাও, বৃত্তি পাবে।" 

কথাগুলো এত ভাল লাগল, বলে ফেললাম, "ইনশাআল্লাহ! আমরা আমাদের ছেলে/মেয়েকে ল' পড়াব, যদি তার যোগ্যতা ও ইচ্ছা থাকে। আর সাধ্যের মধ্যে থাকলে এমন মেধাকে বিকাশে সাহায্যও করব।" তারপর বললাম, "দেখ, তুমি মসজিদ কমিটিকে দোষ দিতে পারনা। তারা তাদের যোগ্যতার মধ্যে থেকে যা করার করেছে। তাদের লিমিটেশন আছে। কমিউনিটি কে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার প্রথম ধাপ ছিল মসজিদ তৈরি করা, সে মসজিদে মানুষকে আকৃষ্ট করা। সেটা উনারা করেছেন। ভবিষ্যতের চিন্তা করে এভাবে প্ল্যান করাটা উনাদের যোগ্যতায় কুলাবে না।" কী বলতে চাইছি, বুঝতে পেরে বলল, "কিন্তু আমার মত মানুষ ত কেবল প্ল্যান দিয়ে আর সংগঠকদের একটু সমালোচনা করেই সারা। আমরা ত এগিয়ে গিয়ে কাজ করব না। কাজ করার জন্য আরো অনেক বেশি কর্মঠ, গোছানো, ডেডিকেটেড হতে হয়। আমি প্ল্যান দিলেই কী আর না দিলেই কী?" 

চুপ করে থাকলাম। এভাবেই সুন্দর ভাবনার চারাগুলো আলো, পানি, হাওয়া না পেয়ে মারা যায়। এই মানুষটাকে যদি ঠিকভাবে বলতে না পারি, সে হয়ত কখনোই বুঝবে না, এভাবে চিন্তা করার মত আন্তরিক মনের সংখ্যা কত কম! 

বললাম, "দেখ! তুমি এই যে চিন্তাটা করলে, এইটাই কিন্তু তোমার স্বকীয়তা ছিল। অর্গানাইজ করা, এক্সিকিউট করা - এসব না করার দোষ তোমার উপর চাপিয়ে দিলে তোমার উপর অন্যায় করা হবে। মসজিদ কমিটির লোকদের লিমিটেশন আছে সুদূরপ্রসারী চিন্তা করতে পারেনা। সে অভাবটা তুমি পূরণ করছ। তোমার আমার লিমিটেশন আছে, আমরা কোন কিছুর জন্যই সময় বের করতে পারিনা। আমরা কী করব - বড়জোর মসজিদ কমিটির যে বড় ভাই কে চিনি, উনাকে গিয়ে বলব। উনি অন্যদের থেকে একটু আলাদা, কিন্তু উনারও সীমাবদ্ধতা আছে। উনিও কাজটা একা করতে পারবেন না। এজন্যই সবাই মিলে কাজ করাটা খুব বেশি দরকার। সামুদ্রিক কোরালের মত এক কণা এক কণা ইনপুট দিয়ে পুরো জিনিসটা গড়ে উঠবে। আর যে যেখানে পায়, তার যোগ্য মত জায়গাটা খুঁজে নেবে। তার পক্ষে যেটুকু করা সম্ভব, সেটুকু করে আসবে। তোমার কাজ ছিল আইডিয়া দেয়া। তুমি দিয়েছ। তোমার ত মন খারাপ করার দরকার নেই, তুমি এক্সিকিউট করতে পারনা বলে। এক্সিকিউট করা তোমার কাজ না। এক্সিকিউট করার মানুষ বের হয়ে যাবে ইনশাআল্লাহ।" 


কাপের চা শেষ হয়ে ঘড়ির কাঁটা বেয়াড়া রকমের সামনে চলে গেল। আমাদেরও ল্যাবে যাওয়ার জন্য উঠতে হল। বের হওয়ার প্রস্তুতি নিতে নিতে মনে হল, আমরা সবাই একটা সুদীর্ঘ রিলে রেস এ অংশ নিয়েছি। রেস এ কার দৌড় আগে, কার পরে, সেটা জরুরি না, যে দায়িত্বটা দেয়া হয়েছে, সেটা অন্যজনের তুলনায় সম্মানের না অসম্মানের - সেটাও জরুরি না। ব্যাটনটা এখন আমার হাতে, সেটা নিয়ে সময়ের মধ্যেই পরের জনের হাতে তুলে দিতে হবে - এটাই কেবল জরুরি।

Wednesday, September 5, 2012

বিজ্ঞানীদের সম্মেলনে বসে দার্শনিক চিন্তাভাবনা

সায়েন্সের নাকি অদ্ভুত সৌন্দর্য আছে। আমার এক সহপাঠী বিজ্ঞানের নিত্য নিত্য সৌন্দর্য আবিষ্কার করে গদগদ্ হয়ে আমাকে বলে। আমি মুখ ব্যাদান করে শুনি আর নিজের এক্সপেরিমেন্ট কে একশ' বার গাল দেই। কেন ঈস্ট ভদ্রলোকগুলি হঠাৎ করেই কাজ করা বন্ধ করে দেয়, কেন যে তুচ্ছ থেকে তুচ্ছতম পরীক্ষাগুলিও সমাধা করতে গলদঘর্ম হতে হয়, কে দেবে তার জবাব! ক্যালেন্ডারের পাতায় তাকিয়ে হা পিত্যেস করি, কে তুলে দিল দিনগুলিকে রেসের ঘোড়ায়? কেন পাঁচটা কাঁচের বোতল আর ছ'টা পেট্রিডিশ এলোমেলো করে দিল আমার দিনরাত্রির সব হিসাব? 

পিএইচডির অন্য স্টুডেন্টদের এসব বললে তারা মুখ টিপে হাসে। সবাই নাকি অমন হতাশার মধ্য দিয়ে যায়। অন্যদের তখন জিজ্ঞাসা করি, তখন কী কর তোমরা? বলে, 'কী আর করব? বাসায় ফোন করে ঘ্যানঘ্যান করি, বলি সব ছেড়েছুড়ে যাব গিয়ে।' কেউ বলে, সব বাদ দিয়ে ঘুরে আসি বা ইচ্ছেমত গিলি। তারপর আবার সুস্থ হলে ফিরে আসি। আমি ত এগুলো কাজে লাগাতে পারিনা। আমি কেবলই হন্যে হয়ে খুঁজে ফিরি প্যাশন, পারস্পেক্টিভ, মিশন, গোল... বার বার জিজ্ঞাসা করি, কেন করছি? কী হবে করে? এছাড়া আর কিছু কি পাওয়া গেল না করার? 

আমার এক দার্শনিক বন্ধু, যার জীবনের লক্ষ্যই হচ্ছে বিজ্ঞানের মাঝে দর্শন খুঁজে বেড়ানো - সে একদিন বলল, গুরুর কাছে দীক্ষা নিতে গেলে প্রথমে তাকে অনেকগুলো অর্থহীন আচার পালনের মধ্য দিয়ে যেতে হয়। জীবনের সৌন্দর্য এখানেই, আপাত অর্থহীন কাজের মধ্যেও সৌন্দর্য খুঁজে পাওয়া। তুমি গবেষণার মাঝে এখন আর মানবকল্যাণ খুঁজে পাওনা, তুমি পুরো প্রক্রিয়াটার মাঝে সুন্দর খুঁজতে থাক! মানুষ ফিলোসফি দিয়ে বিজ্ঞানকে উন্নত করে, তুমি না হয় বিজ্ঞানের মাঝে ফিলোসফি খুঁজলে!

অর্ধেক বুঝলাম, অর্ধেক বুঝলাম না। কষে কতক্ষণ কটুকাটব্য করলাম। 

এর মাঝে জীবনে প্রথমবার ভীনদেশে একটা কনফারেন্সে যাওয়ার সুযোগ হল। ভিসা জোগাড় থেকে শুরু করে স্বামীর ক্যান্ডিডেসি পরীক্ষা সহ পোস্টার বানানোর বিভিন্ন হ্যাপা সামলে শেষ পর্যন্ত যখন প্লেনে চড়লাম, পাশে বসা কলিগ কাম স্বামীকে বললাম, আল্লাহ যে আমাদের কী পরিমাণ স্ট্রেস সহ্য করার ক্ষমতা দিয়েছেন তা আজকে বুঝলাম। আর কোনদিন কাজের চাপ নিয়ে অনুযোগ করব না। এই কনফারেন্সের জন্য পোস্টার বানাতে গিয়ে যখন একটার পর একটা পেপার ঘাঁটছি পাগলের মত, হঠাৎ করেই দেখলাম, আগে সায়েন্টিফিক পেপারের প্রতি যেমন একটা পূজনীয় শ্রদ্ধা ছিল, এখন আর তা নেই। এখন কেবল আমার দরকারি তথ্যটা কেটে ছেঁটে নিয়ে বাকিটা সম্পর্কে নিরপেক্ষ একটা মনোভাব দেখিয়ে রেখে দেই। তখনই মনে হল, মানুষের সাথে মানুষের সম্পর্কটাও ত ঠিক এমনটাই হওয়ার কথা। এক্সপ্লোর করব, এক্সপ্লোর করব... যেটুকু কাজে লাগে নিব... তারপর বাকিটা নিয়ে ভাল না খারাপ ওসব বাছবিচারেই যাব না। (হ্যা, সৎ কাজের উপদেশ, অসৎ কাজ থেকে বিরত থাকতে বলা এসব আছে... কিন্তু সে অন্য প্রসঙ্গ) 

এত বড় আর নামী দামী কনফারেন্সে আগে যাইনি, তাই একটু ভয়ে ভয়ে ছিলাম। পোশাক আশাক না জানি কেমন পরতে হয়.. দেখলাম খুব ক্যাজুয়াল কাপড়েও বড় বড় বিজ্ঞানীরা টক দিচ্ছে। কী পরল এটা কোন ব্যাপারই না। ভাল লাগল দেখে। হ্যা, রুচিশীলতার ছাপ আছে মোটামুটি সবার পোশাকে, কিন্তু মেকি ভাবটা নেই। 

প্রতিটা টক শেষে প্রশ্নোত্তর পর্বে অন্যান্য বিজ্ঞানী, বা ছাত্রছাত্রীরা প্রশ্ন করে। হয়ত কিছু অংশ বুঝতে পারেনি, এভাবে অনুরোধ করে, 'তুমি বোধহয় আগেই বলেছ, আমি মিস করে গেছি... তুমি কি এই অংশটা আবার একটু বলবে?' কেউ বলে না যে, 'তোমার কথার মাথামুন্ডু বোঝা যাচ্ছেনা' - যেমনটি আমরা নন-একাডেমিক আলোচনায় বলি। আবার কিছু প্রশ্ন হয় এমন, 'তুমি ত বললে এই এই কারণে এটা এটা হয়। অন্য কোন কারণ কি থাকতে পারে? এই যেমন...' তখন আবার সবাই মিলে মাথা ঘামায়। উত্তরদাতা হয় বলে, হ্যা, তোমার কথায় যুক্তি আছে, আমাদের এটা পরীক্ষা নিরীক্ষা করে দেখতে হবে। অথবা বলে, 'ভাল প্রশ্ন, আসলে আমরা ইতিমধ্যে পরীক্ষা করেছি, পরীক্ষায় দেখেছি যে এটা আসলে হয় না।' পুরো ব্যাপারটার মধ্যে এত বিনয়, অন্যের জ্ঞানের প্রতি এত শ্রদ্ধা, নিজের জ্ঞানের সীমাবদ্ধতার প্রতি এত সচেতন... এত যে ভাল লেগেছে, কেবলই মনে হয়েছে, আহা! আমরা ইসলাম বোঝার বেলায় কবে এমন করে কথা বলতে পারব? 

ভালর সাথে খারাপও যে নেই তা কিন্তু নয়। বেশির ভাগ বিজ্ঞানীই নিজের করা এক্সপেরিমেন্টের রেজাল্টকে অন্যের রেজাল্টের চেয়ে বেশি গুরূত্ব দেয়। বয়স একটু বেশি হলে সে বোধটা গোয়ার্তুমির পর্যায়ে চলে যায়। আরেক বিজ্ঞানীর বহুকাল আগে দাঁড় করানো এক্সপেরিমেন্ট তার চেয়ে বয়সে অনেক ছোট, অন্য এক বিজ্ঞানী নিজের নামে চালিয়ে দিচ্ছে। এখন আর উনি সেই নতুন বিজ্ঞানীর কোন ডাটা, কোন পেপার বিশ্বাস করতে চান না। 

সে যাই হোক। কনফারেন্সের লাঞ্চ, ডিনার এ কে কোথায় বসছে কোন বিধি নিষেধ নেই। ইয়াব্বড় আইনস্টাইন মার্কা স্বপ্নের বিজ্ঞানীর সাথে কথা বলতে চাইলে টুক করে প্লেটটা নিয়ে পাশে বসে পড়লেই হল। এর পরে আর মনে হবে না যে সে কেউকেটা একজন। একদম কলিগের মত স্বাভাবিকভাবে কথা বলবে। পোস্টার সেশনেও তাই। আমার কাজ প্রেজেন্ট করা মানে আমি সবচেয়ে ভাল জানি। এ বিষয়ে কারো কোন মতবিরোধ নেই। তুমি যত বাঘা বিজ্ঞানীই হওয়া কেন, আমার পোস্টারের সামনে তুমি ছাত্র, আমি শিক্ষক। কেউ বক্তার যোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তুলবে না, বলবে না, আমার ল্যাব থেকে বছরে পাঁচটা পিএইচডি বের হয়, তুই কোথাকার চুনোপুঁটি রে! বড়জোর বলবে, আরো বেশি মেটারিয়াল থাকলে জিনিসটা আরো ভাল হত। আইডিয়া শেয়ার করবে.. ভবিষ্যতে কী কী করার প্ল্যান শুনে নিজেদের কোন আইডিয়া থাকলে বলবে ইত্যাদি ইত্যাদি। 

এই ত গেল বিজ্ঞানীদের সামাজিক আচার আচরণ। নিজেদের ল্যাবে আবার একেকজন একেক রকমের। গ্র্যাড স্টুডেন্টরা এক হলে সবচেয়ে বেশি কথা বলে নিজেদের রিসার্চ নিয়ে, আর একটু আপন হলে সুপারভাইজর নিয়ে। এই অসাধারণ সব গবেষণার পুরোধাদের মধ্যে অনেকেই হয়ত বস হিসেবে জঘন্য, আবার হয়ত যে ভাল বস্, তার কাজ হয়ত এমন কিছু না। আবার কেউ হয়ত ভাল গবেষক, ভাল সুপারভাইজর, কিন্তু পারিবারিক জীবনে দুঃখজনক রকমের এলোমেলো। এসব দেখি আর ভাবি, সম্মান জিনিসটা আস্ত মানুষটার প্রতি না দেখিয়ে খন্ড খন্ড আচরণের প্রতি দেখালে ভাল। আমি তোমাকে তোমার কাজের জন্য শ্রদ্ধা করি, কিন্তু উন্নাসিকতার জন্য অপছন্দ করি। তোমার ছোট মন দেখলে আমার গা জ্বলে যায়, তাই বলে তোমার রিসার্চ এর ডাটা গ্রহণ করতে আমার কোন আপত্তি নেই। 

তেমনি করে, অনেক বড় বিজ্ঞানীও যখন একটা ডাটা দেখিয়ে বড়সর উপসংহার টানতে চায়, সবাই তির্যক চোখে তাকায়। তুমি বাপু যত বড় বিজ্ঞানীই হওনা কেন, কথায় যুক্তি না থাকলে আমি তোমাকে ধুই না। এ থেকে বি হয়, বি থেকে সিতে না গিয়ে সোজা ডি তে চলে গেলে - এটা কি মগের মুল্লুক নাকি? আমি দেখি আর ভাবি, হায়! ইসলামিক স্কলারদের (বিশেষ করে নর্থ আমেরিকান চোস্ত ইংরেজি বলা স্কলারদের) প্রতি এই দৃষ্টিভঙ্গিটা আমাদের থাকলে কতই না ভাল হত! মানি, উনারা যা বলেন, সবই অনেক বেশি তথ্যনির্ভর। কিন্তু উনাদেরও ত কখনও সখনও বোঝায় ভুল হতে পারে! আমাদের চেয়ে অনেক কম ভুল হবে উনাদের, এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু টেক্সট এর পাশাপাশি তাদের নিজস্ব ইন্টারপ্রিটেশন ও যখন মানুষ চোখ বন্ধ করে নিতে চায়, তখন মন মানে না। 

যে কোন বক্তব্য শোনার পর নিজের বোধ বুদ্ধি, পরিস্থিতি অনুসারে যাচাই বাছাই করা, একই সাথে, আমি যেটা বুঝি, সেটাই সবসময় ঠিক নাও হতে পারে, অন্যরাও ঠিক হতে পারে - এই উদারতাটা থাকা - এই যে পারস্পরিক সম্মান ও আত্মসমালোচনার একটা সুন্দর পরিবেশ - সেটাই শিখে আসলাম 'ribosome synthesis' নামক খটোমটো কনফারেন্স থেকে। এখন একটু আধটু বুঝতে পারছি, সায়েন্স এ দর্শন এর প্র্যাক্টিসগুলি বহুকাল ধরে হচ্ছে, তাই জীবনের অন্যান্য ক্ষেত্রেও কিছু দরকার পড়লে সায়েন্স থেকে ধার করে নেয়া যেতে পারে। এ ব্যাপারটা আমার অনেক আগে আমার সেই বন্ধু ধরতে পেরেছিল বলেই বিজ্ঞানের প্রতি তার এত মোহ।