Friday, July 20, 2012

দাম্পত্য - ৯


আজকে দাম্পত্যের সবচাইতে স্পর্শকাতর বিষয়টা নিয়ে লিখব, যেটা নিয়ে কেউ কথা বলে না। যা নিয়ে অভিযোগ মনে আনাও পাপ, মুখে আনলে ত শেষ! এ বিষয়টা বাদ দিয়ে দাম্পত্য নিয়ে বুলি কপচানো রীতিমত হঠকারিতা, কারণ বিয়ের আগ পর্যন্ত এ নিয়ে মানুষের জল্পনা কল্পনার শেষ থাকে না।




অন্তরঙ্গতা। সোজা ভাষায় শারীরিক সান্নিধ্য। যা নিয়ে বিয়ের আগে  মেয়েদের উদ্বেগ, শংকা, লজ্জা মেশানো আকাঙ্ক্ষা, আর ছেলেদের কল্পনা, পরিকল্পনা - কোন কিছুই বাধা মানতে চায়না - তা নিয়েও যে বিয়ের পরে দ্বন্দ্ব অভিযোগের অবকাশ থাকতে পারে, তা বিশ্বাস করা অবিবাহিতদের জন্য কঠিন বৈকি। বিবাহিতদের মধ্যেও অভিযোগগুলো দানা বাঁধলে তারা একরকম ধামা চাপা দিয়েই রাখতে চান। এর মূল কারণ, এসব বিষয়ে লজ্জার বাঁধ ভেঙে কথা বলা রীতিমত অসম্ভব, কারণ নিজের স্বামী/স্ত্রীর সম্পর্কে এতটা খোলামেলা আলোচনা করা তাঁকে অসম্মান করারই সামিল। তাছাড়া এমন মানুষ আশপাশে পাওয়াও বেশ কঠিন যে একই সাথে উদার মনের, সমাধান জানে, গোপনীয়তা বজায় রাখবে এবং যার সম্পর্কে বলা তাকে আগের মতই সম্মান করবে।


শারীরিক অন্তরঙ্গতা দম্পতির মাঝে এক নিগূঢ় যোগাযোগের মাধ্যম। এ যেন ছোটবেলার 'কোড ওয়ার্ড' দিয়ে কথা বলার মত। আশপাশে আরো অনেকে থাকলেও তাদের নিজস্ব হাসি, ঠাট্টা, ছেলেমানুষি আনন্দের ভাগ দিতে হবে না কাউকেই। শরীরি আনন্দের মূর্ছনাকে তুলনা করা যায় অনন্য সাধারণ সঙ্গীতের সাথে - যার বোদ্ধা সমঝদার পুরো পৃথিবীতে মাত্র দু'জন। শরীরের সান্নিধ্য তাই অনেক সময় মনকে আরো কাছাকাছি এনে দেয়।


কিন্তু, আর সব পার্থিব সৌন্দর্যের মতই এতেও কদাকার কুচ্ছিত বেসুরো তান ঢুকে যেতে পারে। বিয়ের আগে মিডিয়ার কল্যাণে ভালবাসার যে রূপটি আমাদের মধ্যে গাঁথা হয়ে যায়, তা ভীষণ রোমান্টিক, ভীষণ সুন্দর। সত্যিকারের জীবনে দৈহিক ভালবাসা সবসময় তেমনি করে নাও আসতে পারে। বইয়ের পাতায় বা রূপালি পর্দায় অন্তরঙ্গতা যেভাবে আসে ভালবাসার চিত্ররূপ হয়ে - বাস্তব সবসময় তেমন নাও হতে পারে। দৈহিক মিলন শুধুই কাছে আসার আকুতির প্রকাশ না, এটি একটি জৈবিক চাহিদাও। আর সব সাইকেল এর মত নির্দিষ্ট সময়ের ব্যবধানে এই চাহিদাও পূরণ করা প্রয়োজন। কিন্তু সমস্যা এখানে না। সমস্যা হয়ে দাঁড়ায় যখন স্বামী/স্ত্রী বিয়ের আগের ধরে রাখা এক মাইন্ডসেট নিয়ে আশা করে থাকেন প্রতিবারই ভালবাসা তার পূর্ণরূপ নিয়ে মহাকাব্য রচনা করবে। চাহিদা কিন্তু তার প্রয়োজন পূরণের দিকেই নিবদ্ধ থাকে, আর তার কারণে উপক্রমণিকার অংশটুকু খুব অল্প, বা অনুপস্থিত থাকতে পারে কখনও কখনও। যে মানুষটি স্বপ্নে এই সময়টুকু কে নিয়ে অনেক কাব্যগাঁথা রচনা করেছে, সে বাস্তবতার এই ধাক্কায় বিমূঢ় হয়ে যেতে পারে।


ফলাফল, 'আমি কেবলই তার প্রয়োজন পূরণের মাধ্যম, আমার প্রতি তার কোন আকর্ষণ নেই...' এ ধরণের উপসংহার টানা। এমনকি, হীনম্মন্যতা, অতিরিক্ত সন্দেহপ্রবণতা, তুচ্ছ কারণে অভিযোগ - এধরণের ব্যাখ্যাতীত আচরণের অনেকটাও এ ধরণের অতৃপ্তি থেকে আসে।


এখানে উভয়পক্ষকেই বুঝতে হবে, শারীরিক সান্নিধ্যের উৎস দুইটি। ভালবাসা/ কাছে আসার আকুলতা, এবং পিওর বায়োলজিক্যাল নিড। সম্পর্ক যত পুরনো হয়, প্রতিটা আবেগ প্রকাশের পেছনে মূল কারণটা বোঝা সহজ হয়ে যায়। অনেক দম্পতিই করেন কি, শরীরের প্রয়োজনে কাছে আসার আহ্বান কে শ্রদ্ধা করেন না। ভেতরে জমে থাকা রাগের ঝাল মেটান অপরজনের প্রয়োজন কে উপেক্ষা করে। ক্লান্তি, ব্যস্ততার অজুহাত দেখান। এই প্রয়োজনটুকু পূরণ করতে যেহেতু অপরজনের সহযোগিতা অপরিহার্য, তাই উপেক্ষা অনুরোধকারীকে একই সাথে আহত ও অপমানিত করে।


আমাদের দম্পতিরা অনেক সময়ই জানেন না, সাড়া না দেয়াটা কি আদৌ অপরাধের পর্যায়ে পড়ে কিনা। একজন হয়ত ব্যাপারটাকে গুরূত্বই দিচ্ছেনা, আর অন্যজন আহত অহংবোধ নিয়ে মনে মনে দূরে সরে যাচ্ছে। আজকালকার দিনে অহর্নিশ মানুষকে ব্যস্ত রাখার অনেক উপকরণ আছে, তাই সঙ্গ না থাকলেও অনেক কিছুর মাঝে ডুবে থাকা যায়, সঙ্গী হয়ত টেরও পাবে না কবে সে অনেক দূরে চলে গেছে। তার মানে এই না যে, নিজের ইচ্ছা অনিচ্ছার কোন দাম থাকবে না। উপেক্ষাকে একটু বদলে 'সম্মান ও কারণ দর্শনপূর্বক অসম্মতি' তে বদলে দিলেই দূরত্বের ভয়টা ঘুচে যাবে।


বিবাহিত মেয়েদের কমন অভিযোগ, ও আমার প্রতি আগের মত আকর্ষণ বোধ করেনা। ছেলেদের অভিযোগ ও গৃহিণী হতে গিয়ে প্রেমিকা হতে ভুলে গেছে। ভাল কাপড় পরে না, সুগন্ধি মাখে না... কিছু বললে ঘরকন্নার দশটা অজুহাত দেখায়।


এসব সমস্যার সমাধান বাইরের কারো কাছ থেকে আশা করা বোকামি। প্রতিটা দম্পতির যোগাযোগের ধরণ স্বতন্ত্র। তাই স্ত্রীকে নিজে নিজেই বুঝতে হবে, তার দাম্পত্যের জন্য কোনটা বেশি প্রয়োজন, পরিচ্ছন্ন ঘরদোর, না পরিচ্ছন্ন পোশাক আশাক। স্বামীর ও তেমনি বুঝতে হবে, একজন লেখক কেবল নিজের খেয়াল খুশিমত লিখে গেলেই পাঠকের কাছে গ্রহণীয় হয়না, পাঠকের চাহিদারও মূল্যায়ন করতে হয়। তাছাড়া সাহিত্যে ছোটগল্পের প্রয়োজন যেমন আছে, তেমনি উপন্যাসের ও আছে। একটি সার্থক উপন্যাস অনেক ছোটগল্পের প্লট তৈরিতে সাহায্য করতে পারে।




(আমার লেখায় স্থূলতা প্রকাশ পেলে একান্তভাবে ক্ষমা চাচ্ছি।)

Monday, July 16, 2012

রোজার মাসে নিজেকে নিয়ে চিন্তাভাবনা

রোজার মাস আসলেই পত্রিকায় রোজার ফযিলত নিয়ে যে কথাটা আসে, এ মাসটি বরকতময়, এ মাসে কুরআন নাযিল হয়েছে, কুরআন আমাদের সমস্ত জীবনবিধান, সুতরাং এ মাসের শুকরিয়া আদায় কর অধিক কুরআন পাঠ ও নফল ইবাদতের মাধ্যমে। কথাটা ঠিকই আছে, কিন্তু মাসটার মাহাত্ম্য কিন্তু এর মাঝেই সীমাবদ্ধ না। তারাবী নামায ও কুরআন খতম দেয়ার পাশাপাশি আমাদের এই খেয়ালটুকুও রাখতে হবে, এর সাথে আত্মার যোগাযোগ যেন থাকে, এগুলো কেবলই যেন বাৎসরিক অভ্যাসে পরিণত না হয়। রমজান মাসের সুফল বলতে গেলে ঘুরেফিরে বারবারই পরকালের মুক্তির কথা আসে। কিন্তু আমাদের প্রাত্যহিক জীবনে এর প্রতিফলন কই? 

রমজান মাসকে বলা হয় আত্মশুদ্ধির মাস। আত্মশুদ্ধি - এ কথাটার মানে কী? মানে আমাদের যেসব খারাপ দিক আছে সেগুলো ঝেড়ে মুছে ফেলব এই মাসে, তাই ত? কিন্তু কীভাবে? 

খারাপ দিক ঝেড়ে ফেলার ব্যাপারে বলতে হলে আগে বলতে হবে খারাপ বৈশিষ্ট্য আমাদের মাঝে কোথা থেকে আসে। কুরআনে আদম সৃষ্টির ঘটনাটা যদি কারো মনে থাকে, তবে মনে পড়বে, শয়তান আল্লাহর কাছে শপথ করে বলেছিল, আমি আদম সন্তানদের চারিদিক থেকে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করব। সুতরাং বিভ্রান্তি, বা আল্লাহর পছন্দ না, এমন স্বভাবগুলোর একটা মূল কারণ শয়তান। কিন্তু শয়তানের কোন ক্ষমতা নেই আমাদের মধ্যে কিছু সৃষ্টি করার। আমাদের ভেতরেই খারাপ চিন্তাগুলোর বীজ আছে, শয়তান সেগুলোকে উস্কে দেয় কেবল। ভালবাসার তীব্রতাকে শয়তান ঈর্ষা, সন্দেহপরায়নতায় বদলে দিতে পারে, আবার জ্ঞানপিপাসাকে একটু ঘুরিয়ে বদলে দিতে পারে সন্দেহবাতিকতা ও উন্নাসিকতায়। খারাপ চিন্তার উৎসটা আমাদের ভেতরেই। মোটা দাগে একে নফস বলা যেতে পারে। সারা বছর শয়তান আমাদের বুকের ভেতরে বসে নফসকে খুঁচিয়ে যেতে থাকে, আর নফস ও খেয়ালে বেখেয়ালে তাতে সাড়া দিয়ে বসে। 

আত্মশুদ্ধির এই মাসটাতে আল্লাহ আমাদের প্রতি বিরাট এক রহম করেন, তিনি শয়তানকে দোজখে বেঁধে রাখেন পুরোটা মাস। তার মানে নফস কে জ্বালাতন করার এখন আর কেউ নেই! তার মানে, আমি যদি চাই, আত্মসমালোচনা করার এটাই সবচেয়ে ভাল সময়। কারণ আমি জানি, যা কিছু খারাপ আসছে, তা পুরোপুরিভাবে আমার থেকেই আসছে, সুতরাং নিজেকে বদলাতে হলে আমার নফস এর সাথে আমার বোঝাপড়া করতে হবে। 

নফস এর সাথে বোঝাপড়া - সেও কিন্তু রমজান মাসে আল্লাহ অনেক সহজ করে দিয়েছেন। নফস বলতে মোটা দাগে আমাদের শারীরিক মানসিক প্রয়োজনগুলিকে বোঝানো যেতে পারে। শারীরিক প্রয়োজনগুলি অতিমাত্রায় চর্চায় খারাপ অভ্যাসে রূপ নিতে পারে। যেমন, প্রয়োজনীয় বিশ্রামের অত্যধিক ব্যবহারে সেটা হয় আলস্য, ক্ষুধানিবৃত্তির প্রয়োজন নিয়ে বাড়াবাড়ি গিয়ে ঠেকে টেবিলভর্তি ইফতারে। তেমনি মানসিক প্রয়োজন, যেমন আবেগ ভালবাসার অনিয়ন্ত্রিত রূপ কতটা কদর্য হতে পারে, সে ত আমরা সবাই জানি। 

রোজার মাসে শরীরের মনের এই সবগুলো প্রয়োজনকেই খুব নিয়ন্ত্রিত অবস্থায় রাখতে হয়। এত সংযম করেও আমরা যখন মারা পড়িনা, দিব্যি হেলেদুলে বেড়াই, তখনই বোঝা যায়, আমাদের মানুষের সত্যিকারের প্রয়োজনটা আসলে কত কম! 

তা হলে ব্যাপারটা কী দাঁড়াচ্ছে? শয়তান নেই, প্রবৃত্তির বাড়াবাড়ি নেই - বাকিটুকু যেটুক থাকে, তা কেবলই 'আমি', মানে আমার ভাল অংশটুকু। একে নিয়ে যত চিন্তাভাবনা করব, ততই একে চিনতে পারব। তখন রোজার মাস শেষ হয়ে গেলেও শয়তান একে আড়াল করে ফেলতে পারবে না। 

একটা ছোট্ট উদাহরণ দিচ্ছি - 

আমি লেখালেখির সুবাদে সামাজিক ওয়েবসাইটগুলোতে অনেকটা সময় কাটাই। উদ্দেশ্যটা ভাল, লেখার মাধ্যমে ভাল চিন্তার প্রসার ঘটাব - কিন্তু আমার সুযোগসন্ধানী নফস করে কি, একে সব রকমের কঠিন কাজ থেকে পালিয়ে বেড়ানোর উপলক্ষ বানিয়ে ফেলে। যেমন গবেষণার কাজের জন্য একটা আর্টিকেল পড়তে হবে, একটু কঠিন লাগলেই ফেলে দিয়ে ব্লগিং এ ঢুকে পড়ি। এখানে উদ্দেশ্যটা ভাল হলেও আমার যথেচ্ছ ব্যবহার এর ভাল দিকটা নষ্ট করে দিচ্ছে। তারপর ফাঁকি দিচ্ছি - এই বোধটা আসামাত্রই শয়তান যুক্তি দিতে থাকে, ‘না! এটা ত ভাল কাজ, পড়াশুনা ত পরেও করতে পারবে, এই মুহুর্তে এই লেখাটা না লিখলে পরে আর লেখা হবেনা...’ 

রোজার সময় আমি যেটা করার চেষ্টা করব, তা হচ্ছে, যতবারই কাজ ফেলে ব্লগিং এ মাথা গুঁজতে ইচ্ছা করবে, একটা খাতায় লিখে ফেলব, কেন এখনই ব্লগে যেতে হবে। পাশে সময়টাও লিখে রাখব, আর সে সময় কী কাজে ব্যস্ত ছিলাম, ওটাও! আশা করা যায় আমার নফস, যে কিনা সব রকমের নিয়ম কানুনের বিরূদ্ধে সদা বিদ্রোহী, সে রোজার সময় অনেক সংযত থাকবে, তালিকা বানানো নিয়ে বিদ্রোহ শুরু করে দেবে না। এবার দিন শেষে তালিকায় চোখ বুলিয়ে নিজেকেই জিজ্ঞাসা করব, এর মধ্যে সবগুলোই কি দরকারি, না কাজে ফাঁকি দেয়ার ছুতোও আছে? ভাগ্য ভাল, শয়তান নেই, থাকলে আমাকে বিশ্বাস করিয়েই ছাড়ত, যে এর চেয়ে জরুরি কিছু পৃথিবীতে হতেই পারেনা। শয়তানের যুক্তি বোধ ত আমার চেয়ে ভাল হবেই, তার কত যুগের অভিজ্ঞতা! 

এভাবে করে আমরা প্রত্যেকেই যার যার বদভ্যাসগুলি নিয়ে চিন্তাভাবনা করতে পারি। নামাযে আল্লাহর কাছে বেশি বেশি দু'আ করতে পারি, "আল্লাহ, এ মাসে নিজেকে বদলানো সবচেয়ে সহজ, তুমি আমার জন্য আরো সহজ করে দাও!" তারপর আল্লাহ রোজা রাখার মত সুস্থ শরীর আর মন দিয়েছেন, এই কৃতজ্ঞতায় দিনের বেলাটা যে যেই কাজই করিনা কেন, চাকুরি, পড়াশুনা, ঘরের কাজ - সেটা আরো যত্ন করে করতে পারি। এতে করে আমাদের প্রাত্যহিক কাজগুলিও ইবাদতের মর্যাদা পাবে। আল্লাহ খুশি হবেন, আমার বান্দা রোজাও রাখছে, কুরআন ও পড়ছে, শরীরের সদকাও করছে, আবার পৃথিবীর দায়িত্বগুলো ভুলে যায়নি, সেটাও করছে সুন্দর করে। আল্লাহ তা'আলা এমনিতেই রহমত আর মাগফিরাত দিয়ে পূর্ণ, এরকম একটা মাসে বান্দাদের এত সুন্দর ভারসাম্যপূর্ণ ইবাদত দেখলে তিনি কতটা খুশি হবেন, ফেরেশতাদের কত কতবার করে বলবেন… কল্পনা করতেই খুব ভাল লাগে!


Abbreviated form in Banglanews24.com http://www.banglanews24.com/detailsnews.php?nssl=065ccb934ccbd4c889cc390b1f1c88fe&nttl=20120716070002126799 

Saturday, July 7, 2012

আর্ট অব এপ্রিসিয়েশন - ৫

[অপ্রিয় সত্যটাকে অস্বীকার না করেও কীভাবে ভাল দিকগুলো তুলে আনা যায় - সেটা বোঝাতেই এই সত্য/অর্ধসত্য/কাল্পনিক ঘটনাগুলোর অবতারণা ] 


একটি জানালা। সামনে অনেক.. দূর পর্যন্ত সবুজ মাঠ। উপরে নীল আকাশ। সাদা মেঘ। আকাশ এত নীল হয়, এখানে না এলে রাসেলের কোন দিন জানাও হতনা। আত্মীয় স্বজন থেকে বহুদূরে প্রবাসে এই জানালাটাই তার দিন রাত্রির বন্ধু হয়ে আছে। এক কাপ চা বানিয়ে তাই জানালার ধারে বসে আপন মনে ভাবতে থাকে সেই অতি পুরনো ভাবনাগুলোই - 

"কেন এলাম এখানে? জন পরিচয়, বন্ধুহীন এই অদ্ভুত পরিবেশে? ডলারে থোক করা ছাত্রবৃত্তির মোহ কী করে স্ত্রী, সন্তান - সবকিছুর চেয়ে বড় হয়ে গেল?" বাড়ি ছেড়ে যেদিন এসেছে, সেদিন ছেলেটা নতুন শেখা হামাগুড়ি প্র্যাক্টিস করতে করতে বাবার কাছে আসে প্রথমবার। এ দৃশ্যটা মনে করে কত বার যে চোখের পানি ফেলেছে..! ওর স্ত্রী বার বার বলত, "কী হবে একটা মাস্টার্স করে? এখানেই যে চাকরি আছে, করো না!" 

ঘুরিয়ে ফিরিয়ে বার বার ওসব মনে করে রাসেলের কেবল বিদ্বেষ বাড়তে থাকে। নিজের ওপরে, এই চাকচিক্যের ওপরে.. বিদেশ ফেরত তকমাটার লোভের ওপরে... প্রায় প্রতি রাতেই হতাশা আঁকড়ে ধরে, আর হিসেব মেলায়, কী ফেলে আসল, কী পেল! সবাই বলে, ধৈর্য ধর, আর ত ক'টা দিন! এক বছর পরেই ত ফিরে যাচ্ছ! কিন্তু রাসেল কেবল অনুশোচনায় দগ্ধ হয়, কেন এলাম, কেন? 

রাসেলের খুব ইচ্ছে ছিল দেশে নিজের মত করে ছোট্ট করে ব্যবসা বা জনকল্যাণমূলক প্রতিষ্ঠান করবে। নিজেকে সবসময় ওভাবেই তৈরি করেছে। হুট করে কথা নেই বার্তা নেই বাইরে পড়তে আসার এই সিদ্ধান্ত যে কেন নিল.. আসার পর থেকে এই প্রশ্নটাই শতশতবার ওলট পালট করেছে মনের মধ্যে। যত ভেবেছে, ততই জায়গাটার প্রতি মন বিষিয়ে উঠেছে। দিন যেন কাটতেই চায়না, চারপাশে নতুন যাই দেখে - মনে হয়, এর চেয়ে আমাদের দেশে কত ভাল! কেন পড়ে থাকে মানুষ এখানে? কী সুখ? 





রাসেলের সাথে কাজ করে ভাবুক এক ছেলে। ঋষি ঋষি চেহারা। কথাগুলোও অমন। তার সাথে প্রায়ই আলোচনা হয় দর্শন নিয়ে, সাহিত্য নিয়ে, বিশ্ব রাজনীতি নিয়ে। একদিন তার সাথে প্রবাসে আসা নিয়ে আফসোস করায় সে বলে - 

"তুমি পাওলো কোয়েলহোর 'দি আলকেমিস্ট' বইটা পড়েছ? ওখানে একটা রাখাল ছেলে আন্দালুসিয়ার এক ভাঙা চার্চের ছায়ায় একরাতে স্বপ্ন দেখে, মিশরের পিরামিডের কাছে গেলে সে গুপ্তধন পাবে। অনেক কষ্ট করে, কয়েক বছর ব্যয় করে ছেলেটা সেখানে পৌঁছায়। কিন্তু পৌঁছানোর পর জানতে পারে, গুপ্তধন পোঁতা আছে সেই আন্দালুসিয়ার চার্চের নিচেই! বাতাসকে সে জিজ্ঞাসা করে, 'তুমি আমাকে প্রথমবারই হদিস দিলে না কেন?' বাতাস বলে, 'তাহলে ত তুমি আর পিরামিড দেখতে যেতেনা। তারা কী সুন্দর! তাই না?' তুমি ত তারিক রামাদানকে চেন। সে এ গল্পটাকে এভাবে ব্যাখ্যা করেছে - যে মানুষটা আন্দালুসিয়া ছেড়ে গেছে, আর যে ফিরে এসেছে, সে এক মানুষ না। তাদের মধ্যে আছে মিশর সমান ব্যবধান। এই গুপ্তধনের মর্ম বুঝতে তাকে মিশর যেতে হতই।" 


রাসেল কেবল ভাবে আর ভাবে। হাতের চা ঠান্ডা হয়ে আসে। মাঠের দিকে আনমনে তাকিয়ে থেকে সে বুঝতে পারে, ছেলেটা তাকে কী বলেছিল। এই ছেলেটার থেকে সে অনেক শিখেছে, জীবনের সাথে দর্শনকে কীভাবে মেলানো যায়, অন্যদের চেয়ে অন্যরকম করে কীভাবে ভাবা যায়.. তাছাড়া নচ্ছার এই প্রবাসজীবনও কি কম দিয়েছে তাকে? একা থাকা মানেই স্বাবলম্বী হওয়া। কাজে কর্মে স্বচ্ছতার নতুন মাত্রা শিখেছে। অনেকগুলো দায়িত্ব অষ্টপ্রহর আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে রাখেনি, তাই চিন্তার দুয়ার খুলে দিতে পেরেছে। সব চেয়ে বড় কথা, গত এক বছরে লক্ষবার নিজের কাছে প্রতিজ্ঞা করেছে, সম্পর্কগুলোকে, দায়িত্বগুলোকে সবটুকু যত্ন দিয়ে পালন করবে এখন থেকে। আপন মানুষগুলোর কাছে আছে, এই আনন্দেই প্রতিটা মুহূর্ত ভাল চিন্তা, ভাল কাজ দিয়ে ভরিয়ে রাখার চেষ্টা করবে। আর নিজের প্রতিষ্ঠান? হ্যা, ওটাকেও দাঁড় করাতে হবে। কষ্ট হবে? হোক! নিজেকেই নিজে বলে, "কত কাজই ত দেশে করার কথা কল্পনাও করতে পারিনি, এখন করছি না? পারব!" 

রাসেলের বুক থেকে হঠাৎ করে বিরাট এক পাথর নেমে যায়। "এ দেশ আমার জন্য না", মনে মনে ভাবে, "আমার রত্নভান্ডার দেশেই। কিন্তু তার মূল্যায়ন করতে এই নির্বাসনটার আমার দরকার ছিল।"

Thursday, July 5, 2012

সূরা নাবা ও আমার উপলব্ধি


এক অনলাইন স্টাডি গ্রুপে কিছু ছোট ভাইবোনের সাথে মিলে কুরআনের শেষ পারার সূরাগুলো পড়ছি উদ্দেশ্য, বিভিন্ন তাফসির পড়ে একেক জনের উপলব্ধি আলোচনা করা আমার কাছে এই উদ্যোগটা খুবই ভাল লেগেছে, কারণ ভাল কাজে তাগিদ দিলে যে দিচ্ছে তারও সওয়াব হয়, আর যে তাড়া খেয়ে পড়তে বসছে তার কথাই নেই এক সপ্তাহ সময়, প্রথম তিন দিনে যে 'টা তাফসির পাওয়া যায় পড়ে নিজের চিন্তাভাবনাগুলি লিখতে হবে, কারো কোন প্রশ্ন থাকলে ইমেইলে জানিয়ে দেবে সপ্তাহের বাকি দিনগুলি চলবে এই প্রশ্নের উত্তর খোঁজা, চিন্তাভাবনা, আর সপ্তাহান্তে একত্রিত হয়ে নিয়ে আলোচনা এই প্রয়াসের প্রথম পদক্ষেপ ছিল সূরা নাবা, যা কিনা শেষ পারার প্রথম সূরা আমি সবসময়ই তাফসির পড়তে গেলে গোগ্রাসে যা পাই সব পড়ি ইউটিউবে লেকচার পেলে সেগুলোও শুনি পড়তে পড়তে, শুনতে শুনতে একাগ্রচিত্তে অপেক্ষা করি কখন পুরোটুকু একটা ছবি হয়ে ধরা দেবে কুরআনের অল্প যে 'টা সূরা যত্ন করে পড়েছি, প্রত্যেকটাই তাফসিরের বাইরেও আমাকে অন্য কোন উপলব্ধি এনে দিয়েছে যতক্ষণ সেটা না আসে, আমার মনে হয়, আমি ঠিকমত পড়িনি, আরো পড়তে হবে তাছাড়া, কোন একটা সূরা নিয়ে পড়াশুনা করাটা আমার কাছে মনে হয় একটা ভ্রমণের মত শূণ্য থেকে শুরু করে পথের দু'ধারে যা পাই হাত বাড়িয়ে নিতে নিতে শেষ পর্যন্ত যখন গন্তব্যে পৌঁছাই, তখন মনে হয়, যতদূর এসেছি, আরো ততদূর হেঁটে গেলেও একটুকু ক্লান্তি আসবে না প্রতিবারই নতুন অনেক কিছু শিখব কিছু কাজে লাগাতে পারব, কিছু আজীবন চেষ্টা করে যাব কাজে লাগানোর

সূরা নাবা প্রথম দৃষ্টিতে আরো অনেকগুলো সূরার মতই পরকালের বর্ণনা, আল্লাহর মাহাত্ম্য, ভয় আশার সংকলন খুব তাড়াতাড়ি করে পড়ে গেলে মনে হবে, ' আর নতুন কী? জানিই !' কিন্তু কুরআনের বিশেষত্বই এই, একে নিয়ে যতই সময় কাটানো হয়, ততই এর নতুন নতুন রূপ ধরা পড়ে। একটু ধৈর্য নিয়ে সূরাটা আবারো পড়লে দেখা যাবে এখানে মানুষের দিন রাত্রি যাপনের সুন্দর একটা ছবি ফুটে উঠেছে পড়লে দৃশ্যগুলো যেন চোখের সামনে ভাসতে থাকে আল্লাহ কুরআনের অনেকগুলো সূরাতেই গল্পের মত প্রেক্ষাপট তৈরি করে ভাষার মাধুর্যে এমন মোহনীয় আবেশ তৈরি করেছেন যে পাঠক/শ্রোতারা নিজের অজান্তেই পুরো বিষয়টা কল্পনা করতে শুরু করে এটা হচ্ছে মনোযোগ আকর্ষণের খুব ভাল একটা পদ্ধতি একবার শুনতে শুরু করলে বিমোহিত না হয়ে উপায় নেই তাই রাসুলুল্লাহ () যখন কাফিরদের উদ্দেশ্যে সূরাগুলো পাঠ করতেন, তারা কানে আঙুল দিয়ে রাখত, শুনতে চাইত না আমি পড়তে পড়তে মনের মধ্যে নোট করে নিয়েছি, পরবর্তীতে আমার লেখায়ও আমি মনোযোগ টানার এই পদ্ধতিটি ব্যবহার করব

কুরআনের বর্ণনাগুলি শুধু মনে ছবিই আঁকে না, মনে ভীষণভাবে নাড়াও দেয় কারণ এখানে বৈপরীত্যগুলি এত কঠোরভাবে আসে, মনটা দু'রকমের চিন্তার মাঝে পড়ে ভীষণরকমের দুলতে থাকে এই যেমন, এই মাত্র আল্লাহ বললেন, ভূমিকে মায়ের কোলের মত নিশ্চিন্ত করে দিয়েছি, পর্বতকে পেরেক বানিয়ে গেঁথে দিয়েছি, যাতে একটুও ভয় না করে তোমাদের অথচ শেষ বিচারের বর্ণনায় তিনি বললেন কী - পর্বত নাকি ধুলার মত হয়ে যাবে, মনেই হবে না এখানে কিছু ছিল, আকাশ ফেটে অনেকগুলো দরজার মত হয়ে যাবে ওরে বাবা! পড়তে পড়তে আমার মনে হচ্ছিল, যেন আমাদেরই জ্ঞানের বড়াই, যা দিয়ে পর্বতের মত অটল হয়ে বসে থাকি - 'চাক্ষুষ না দেখলে বিশ্বাস করব না' - সেদিন সব গরিমা ধূলিস্যাৎ হয়ে যাবে যে জ্ঞানকে আমরা মনে করি আকাশ ছুঁয়েছে, এর উপরে কেউ যেতে পারবে না - সেদিন আকাশই দেখিয়ে দেবে, আমাদের জ্ঞানের অগম্যও আরো অনেক অজানা রয়েছে সূরা নাবায় শেষ বিচারের দিনের বর্ণনা যেন আমাদের অহংকার আর ক্ষুদ্রতাকেই চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়

কিয়ামতের বর্ণনার পরে ততোধিক ভয়ঙ্কর জাহান্নামের বর্ণনা শুরু হয়েছে ঠিক জায়গাটার বর্ণনা না, সে জায়গায় অবিশ্বাসীরা কী ধরণের ব্যবহার পাবে সে বর্ণনা আমি এগুলো পড়লে এত ভয় পাই, অংশগুলোর তাফসিরও ভাল করে পড়তে পারিনা নোংরা মেশানো ফুটন্ত পানি কীভাবে খাওয়া সম্ভব - ভাবতেই গা গুলিয়ে বমি আসে তাই তাড়াতাড়ি চলে যাই জান্নাতের বর্ণনায় সুন্দর বাগান, পানীয়.. আহা! এমন করে বর্ণনা দেয়া - ভয় আর আশায় দোদুল্যমান চিত্তে ছাপ না পড়ে উপায় কী? সবচেয়ে সুন্দর লেগেছে কথাটা - 'বেহেশতে কেউ অর্থহীন বাজে কথা শুনবে না, মিথ্যাচার শুনবে না'

অর্থহীন বাজে কথা শুনবে না? তাই ! আমি কখনও এভাবে ভাবি নি যে, অর্থহীন বাজে কথা শুনলে মনের ভেতর যে একটা চাপ চাপ ভাব লাগতে থাকে, সেটা আমাদের আত্মারই সহজাত বৈশিষ্ট্য যে মানুষটা হাসতে হাসতে অন্যের নামে বাজে কথা বলে বসে, সে শত ভাল কাজ করলেও তার জন্য আর শ্রদ্ধাটা ফিরে আসে না কেন আসেনা, তাই নিয়ে খুব অপরাধবোধে ভুগতাম এখন আর ভুগিনা, কারণ আল্লাহ নিন্দা পরচর্চাকারীকে জাহান্নামের সবচেয়ে ভয়াবহ জায়গায় রাখবেন বলে প্রতিজ্ঞা করে আস্ত একটা সূরাই নাযিল করেছেন তখন আরো ভাবলাম, যদি বেহেশতে যেতে চাই, তাহলে ধরনের কথা বলার অভ্যাস পুরোপুরি বাদ দিতে হবে কিন্তু এতই কি সহজ? বন্ধুদের সাথে আড্ডায় ত চলে কেবল রসিকতার ছলে বদনাম আর বিরামহীন বাগাড়ম্বর এর থেকে বেরিয়ে এসে সত্যিকারের ভাল কথা বলার চর্চা করতে চাইলে হঠাৎ করেই কাছের বন্ধুরা দূরে চলে যায়, আত্মীয়স্বজন পাকনামো দেখে বিরক্ত হয়, সবকিছুর মাঝে নিজেকে খুব আঁতেল আর রাশভারী মনে হতে থাকে কিন্তু অন্যভাবে চিন্তা করতে গেলে, বাজে কথা, মিথ্যা কথা - এসব না থাকলে সে পরিবেশটা কিন্তু জান্নাতেরই একটা প্রতিচ্ছবি হয়ে দাঁড়াবে, আর সে জন্য কি একটু পরিশ্রম করা যায়না?

এমনি করে আয়াতের পর আয়াত, একের পর এক প্রসঙ্গের পরিবর্তন পড়তে পড়তে সূরার শেষ পর্যন্ত এলাম মনে হল, এখনও যেন গন্তব্যস্থলে পৌঁছাই নি আরো কী যেন জানার ছিল! তাই পড়লাম সূরা নাযিলের প্রেক্ষাপট জানলাম, অবিশ্বাসীরা শেষ বিচারের দিন নিয়ে হাসাহাসি করায় আল্লাহ এই উত্তর পাঠিয়েছেন তখন সূরাটা আবারো পড়লাম কই! ঠিক উত্তরের মত লাগেনা? তার উপর এক প্রসঙ্গ থেকে আরেক প্রসঙ্গে এত তাড়াতাড়ি মোড় নিয়েছে, মূল ভাবটায় মনোযোগ রাখাই কঠিন তখন কুরআন বন্ধ করে চোখ বন্ধ করে একটা ঘটনা চিন্তা করতে শুরু করলাম আমি একটা স্কুলের প্রধান শিক্ষিকা, আমার ছাত্রছাত্রীরা ভীষণ বেয়াদবি করছে তাদের ধারণা, এসব করে তারা দিব্যি পার পেয়ে যাবে, আমি কিছুই করতে পারবনা আমার নাকি এত ক্ষমতাই নেই আমি এসব শুনে প্রচন্ড রেগে গেছি, ক্লাশ মনিটর কে ডেকে ধমক দিয়ে বলছি, 'ওরা এসব কী শুরু করেছে? ওরা জানে, ওরা কার নামে কথা বলছে? যে ক্লাশরুমটাতে বসে এসব বলছে, সে রুমটাও আমার তৈরি! ওদের এখনই সাবধান করে দাও, নাহয় এমন শাস্তি দেব.. যে আর কোনদিন সোজা হয়ে দাঁড়াতে পারবে না' তারপর এই কথাগুলি যেন ভালমত মাথায় ঢোকে, সেজন্য পরিণতিরও একটা ছোটখাট ফিরিস্তি দিলাম, যাতে ক্লাশ মনিটর গিয়ে ওদেরকে শোনায় আমি এতই রেগে আছি যে ওদের কে ডেকে সরাসরি কথা বলারও রূচি হচ্ছেনা পুরো ঘটনাটা এভাবে যখন দেখলাম, তখন আল্লাহ কেন তিন চার আয়াতের পরেই প্রসঙ্গ পাল্টে অন্য প্রসঙ্গে চলে যাচ্ছেন, সেটা বুঝতে বেশ সুবিধা হল কিন্তু সূরা নাবায় আরো একটা অংশ আছে, তা হচ্ছে, মুত্তাক্বীন বা আল্লাহভীরুদের পুরস্কার আমি নিজেকে হেডমিস্ট্রেসের জায়গায় বসিয়ে যখন ছাত্রদের ধমক দিচ্ছিলাম (মনে মনে), তখন আমার অবস্থান বোঝাতে চাইলে আমি কেবল উপরের কথাগুলোই বলতাম পুরস্কারের কথা বলতাম না, কারণ তাতে সুরটা নরম হয়ে আসে, ছাত্ররা আমার কথায় ভয় নাও পেতে পারে আমি যখন খুব রেগে আছি, তখন কথার সুর বদলে, নরম হয়ে ভাল ভাল কথা বলাটা আমার আসে না, এটাই স্বাভাবিক

তখন বুঝলাম, আল্লাহ যতই রাগ হোন, উনার একটা অংশ ক্ষমা দয়া দেখিয়েই যাবে আমরা সংকীর্ণমনা হতে পারি, আমাদের উদারতা আমাদের রাগের কাছে পরাজিত হতে পারে, কিন্তু আল্লাহ তাঁর নিজস্ব বৈশিষ্ট্যে অতুলনীয়, এবং আশ্চর্য রকমের ভারসাম্যপূর্ণ এই সূরায় আল্লাহ যাদের উদ্দেশ্য করে কথা বলছেন, তাদের অপরাধ কিন্তু কম না তবুও, তিনি শাস্তির বর্ণনা করেই শেষ করেননি, আশার বাণীও শুনিয়েছেন জান্নাতের অপূর্ব সুন্দর বর্ণনা দিয়েছেন, তার চেয়েও বড় কথা, তিনি নিজেকে তাদের প্রতিপালক হিসেবে পরিচয় দিয়েছেন চল্লিশ আয়াতের এই বিরাট সূরাটায় শেষের চার আয়াতে পাঁচবার 'রব' (প্রতিপালক) আর 'আর-রহমান' (সবচেয়ে বেশি দয়ালু) উল্লেখের মাধ্যমে আল্লাহ যেন মনে করিয়ে দিচ্ছেন, "আমার কঠোরতা দেখে দূরে সরে যেওনা, আমি তোমাদের শাসন করলেও, প্রতিপালন আর দয়া থেকে কখনও সরে যাবনা"

আমি প্রধান শিক্ষিকা হয়ত হব না, কিন্তু মা হব! আমার সন্তানদের উপর অসম্ভব রকমের রাগও হবে কখনও কখনও তখন শাস্তি দিলেও, করুণা বা মায়ার এই অংশটুকু দেখাতে যেন না ভুলি তা না হলে আমার মনের কঠোরতা ওদের দূরে ঠেলে দেবে

মনের এতদূর উপলব্ধি পর্যন্ত এসে আমি চোখ খুললাম আপন মনেই হাসলাম আমার যাত্রা ফুরিয়েছে, সূরা নাবা আমাকে মায়ের শাসন ভালবাসার প্রকৃত ভারসাম্য শিখিয়েছে, আর মায়ের চেয়েও লক্ষ কোটি গুণ ভালবাসা যাঁর মাঝে, তাঁর প্রতি কৃতজ্ঞতায় মনটা ভরিয়ে দিয়েছে সূরা নাবা এখন শুধুই আমার কাছে আরো একটি সূরা না, আল্লাহর ভালবাসার অগুণতি নিদর্শনভান্ডারে আরো একটি সংযোজন


বাংলানিউজ২৪ এ প্রকাশিত: