Showing posts with label spiritual. Show all posts
Showing posts with label spiritual. Show all posts

Thursday, July 5, 2012

সূরা নাবা ও আমার উপলব্ধি


এক অনলাইন স্টাডি গ্রুপে কিছু ছোট ভাইবোনের সাথে মিলে কুরআনের শেষ পারার সূরাগুলো পড়ছি উদ্দেশ্য, বিভিন্ন তাফসির পড়ে একেক জনের উপলব্ধি আলোচনা করা আমার কাছে এই উদ্যোগটা খুবই ভাল লেগেছে, কারণ ভাল কাজে তাগিদ দিলে যে দিচ্ছে তারও সওয়াব হয়, আর যে তাড়া খেয়ে পড়তে বসছে তার কথাই নেই এক সপ্তাহ সময়, প্রথম তিন দিনে যে 'টা তাফসির পাওয়া যায় পড়ে নিজের চিন্তাভাবনাগুলি লিখতে হবে, কারো কোন প্রশ্ন থাকলে ইমেইলে জানিয়ে দেবে সপ্তাহের বাকি দিনগুলি চলবে এই প্রশ্নের উত্তর খোঁজা, চিন্তাভাবনা, আর সপ্তাহান্তে একত্রিত হয়ে নিয়ে আলোচনা এই প্রয়াসের প্রথম পদক্ষেপ ছিল সূরা নাবা, যা কিনা শেষ পারার প্রথম সূরা আমি সবসময়ই তাফসির পড়তে গেলে গোগ্রাসে যা পাই সব পড়ি ইউটিউবে লেকচার পেলে সেগুলোও শুনি পড়তে পড়তে, শুনতে শুনতে একাগ্রচিত্তে অপেক্ষা করি কখন পুরোটুকু একটা ছবি হয়ে ধরা দেবে কুরআনের অল্প যে 'টা সূরা যত্ন করে পড়েছি, প্রত্যেকটাই তাফসিরের বাইরেও আমাকে অন্য কোন উপলব্ধি এনে দিয়েছে যতক্ষণ সেটা না আসে, আমার মনে হয়, আমি ঠিকমত পড়িনি, আরো পড়তে হবে তাছাড়া, কোন একটা সূরা নিয়ে পড়াশুনা করাটা আমার কাছে মনে হয় একটা ভ্রমণের মত শূণ্য থেকে শুরু করে পথের দু'ধারে যা পাই হাত বাড়িয়ে নিতে নিতে শেষ পর্যন্ত যখন গন্তব্যে পৌঁছাই, তখন মনে হয়, যতদূর এসেছি, আরো ততদূর হেঁটে গেলেও একটুকু ক্লান্তি আসবে না প্রতিবারই নতুন অনেক কিছু শিখব কিছু কাজে লাগাতে পারব, কিছু আজীবন চেষ্টা করে যাব কাজে লাগানোর

সূরা নাবা প্রথম দৃষ্টিতে আরো অনেকগুলো সূরার মতই পরকালের বর্ণনা, আল্লাহর মাহাত্ম্য, ভয় আশার সংকলন খুব তাড়াতাড়ি করে পড়ে গেলে মনে হবে, ' আর নতুন কী? জানিই !' কিন্তু কুরআনের বিশেষত্বই এই, একে নিয়ে যতই সময় কাটানো হয়, ততই এর নতুন নতুন রূপ ধরা পড়ে। একটু ধৈর্য নিয়ে সূরাটা আবারো পড়লে দেখা যাবে এখানে মানুষের দিন রাত্রি যাপনের সুন্দর একটা ছবি ফুটে উঠেছে পড়লে দৃশ্যগুলো যেন চোখের সামনে ভাসতে থাকে আল্লাহ কুরআনের অনেকগুলো সূরাতেই গল্পের মত প্রেক্ষাপট তৈরি করে ভাষার মাধুর্যে এমন মোহনীয় আবেশ তৈরি করেছেন যে পাঠক/শ্রোতারা নিজের অজান্তেই পুরো বিষয়টা কল্পনা করতে শুরু করে এটা হচ্ছে মনোযোগ আকর্ষণের খুব ভাল একটা পদ্ধতি একবার শুনতে শুরু করলে বিমোহিত না হয়ে উপায় নেই তাই রাসুলুল্লাহ () যখন কাফিরদের উদ্দেশ্যে সূরাগুলো পাঠ করতেন, তারা কানে আঙুল দিয়ে রাখত, শুনতে চাইত না আমি পড়তে পড়তে মনের মধ্যে নোট করে নিয়েছি, পরবর্তীতে আমার লেখায়ও আমি মনোযোগ টানার এই পদ্ধতিটি ব্যবহার করব

কুরআনের বর্ণনাগুলি শুধু মনে ছবিই আঁকে না, মনে ভীষণভাবে নাড়াও দেয় কারণ এখানে বৈপরীত্যগুলি এত কঠোরভাবে আসে, মনটা দু'রকমের চিন্তার মাঝে পড়ে ভীষণরকমের দুলতে থাকে এই যেমন, এই মাত্র আল্লাহ বললেন, ভূমিকে মায়ের কোলের মত নিশ্চিন্ত করে দিয়েছি, পর্বতকে পেরেক বানিয়ে গেঁথে দিয়েছি, যাতে একটুও ভয় না করে তোমাদের অথচ শেষ বিচারের বর্ণনায় তিনি বললেন কী - পর্বত নাকি ধুলার মত হয়ে যাবে, মনেই হবে না এখানে কিছু ছিল, আকাশ ফেটে অনেকগুলো দরজার মত হয়ে যাবে ওরে বাবা! পড়তে পড়তে আমার মনে হচ্ছিল, যেন আমাদেরই জ্ঞানের বড়াই, যা দিয়ে পর্বতের মত অটল হয়ে বসে থাকি - 'চাক্ষুষ না দেখলে বিশ্বাস করব না' - সেদিন সব গরিমা ধূলিস্যাৎ হয়ে যাবে যে জ্ঞানকে আমরা মনে করি আকাশ ছুঁয়েছে, এর উপরে কেউ যেতে পারবে না - সেদিন আকাশই দেখিয়ে দেবে, আমাদের জ্ঞানের অগম্যও আরো অনেক অজানা রয়েছে সূরা নাবায় শেষ বিচারের দিনের বর্ণনা যেন আমাদের অহংকার আর ক্ষুদ্রতাকেই চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়

কিয়ামতের বর্ণনার পরে ততোধিক ভয়ঙ্কর জাহান্নামের বর্ণনা শুরু হয়েছে ঠিক জায়গাটার বর্ণনা না, সে জায়গায় অবিশ্বাসীরা কী ধরণের ব্যবহার পাবে সে বর্ণনা আমি এগুলো পড়লে এত ভয় পাই, অংশগুলোর তাফসিরও ভাল করে পড়তে পারিনা নোংরা মেশানো ফুটন্ত পানি কীভাবে খাওয়া সম্ভব - ভাবতেই গা গুলিয়ে বমি আসে তাই তাড়াতাড়ি চলে যাই জান্নাতের বর্ণনায় সুন্দর বাগান, পানীয়.. আহা! এমন করে বর্ণনা দেয়া - ভয় আর আশায় দোদুল্যমান চিত্তে ছাপ না পড়ে উপায় কী? সবচেয়ে সুন্দর লেগেছে কথাটা - 'বেহেশতে কেউ অর্থহীন বাজে কথা শুনবে না, মিথ্যাচার শুনবে না'

অর্থহীন বাজে কথা শুনবে না? তাই ! আমি কখনও এভাবে ভাবি নি যে, অর্থহীন বাজে কথা শুনলে মনের ভেতর যে একটা চাপ চাপ ভাব লাগতে থাকে, সেটা আমাদের আত্মারই সহজাত বৈশিষ্ট্য যে মানুষটা হাসতে হাসতে অন্যের নামে বাজে কথা বলে বসে, সে শত ভাল কাজ করলেও তার জন্য আর শ্রদ্ধাটা ফিরে আসে না কেন আসেনা, তাই নিয়ে খুব অপরাধবোধে ভুগতাম এখন আর ভুগিনা, কারণ আল্লাহ নিন্দা পরচর্চাকারীকে জাহান্নামের সবচেয়ে ভয়াবহ জায়গায় রাখবেন বলে প্রতিজ্ঞা করে আস্ত একটা সূরাই নাযিল করেছেন তখন আরো ভাবলাম, যদি বেহেশতে যেতে চাই, তাহলে ধরনের কথা বলার অভ্যাস পুরোপুরি বাদ দিতে হবে কিন্তু এতই কি সহজ? বন্ধুদের সাথে আড্ডায় ত চলে কেবল রসিকতার ছলে বদনাম আর বিরামহীন বাগাড়ম্বর এর থেকে বেরিয়ে এসে সত্যিকারের ভাল কথা বলার চর্চা করতে চাইলে হঠাৎ করেই কাছের বন্ধুরা দূরে চলে যায়, আত্মীয়স্বজন পাকনামো দেখে বিরক্ত হয়, সবকিছুর মাঝে নিজেকে খুব আঁতেল আর রাশভারী মনে হতে থাকে কিন্তু অন্যভাবে চিন্তা করতে গেলে, বাজে কথা, মিথ্যা কথা - এসব না থাকলে সে পরিবেশটা কিন্তু জান্নাতেরই একটা প্রতিচ্ছবি হয়ে দাঁড়াবে, আর সে জন্য কি একটু পরিশ্রম করা যায়না?

এমনি করে আয়াতের পর আয়াত, একের পর এক প্রসঙ্গের পরিবর্তন পড়তে পড়তে সূরার শেষ পর্যন্ত এলাম মনে হল, এখনও যেন গন্তব্যস্থলে পৌঁছাই নি আরো কী যেন জানার ছিল! তাই পড়লাম সূরা নাযিলের প্রেক্ষাপট জানলাম, অবিশ্বাসীরা শেষ বিচারের দিন নিয়ে হাসাহাসি করায় আল্লাহ এই উত্তর পাঠিয়েছেন তখন সূরাটা আবারো পড়লাম কই! ঠিক উত্তরের মত লাগেনা? তার উপর এক প্রসঙ্গ থেকে আরেক প্রসঙ্গে এত তাড়াতাড়ি মোড় নিয়েছে, মূল ভাবটায় মনোযোগ রাখাই কঠিন তখন কুরআন বন্ধ করে চোখ বন্ধ করে একটা ঘটনা চিন্তা করতে শুরু করলাম আমি একটা স্কুলের প্রধান শিক্ষিকা, আমার ছাত্রছাত্রীরা ভীষণ বেয়াদবি করছে তাদের ধারণা, এসব করে তারা দিব্যি পার পেয়ে যাবে, আমি কিছুই করতে পারবনা আমার নাকি এত ক্ষমতাই নেই আমি এসব শুনে প্রচন্ড রেগে গেছি, ক্লাশ মনিটর কে ডেকে ধমক দিয়ে বলছি, 'ওরা এসব কী শুরু করেছে? ওরা জানে, ওরা কার নামে কথা বলছে? যে ক্লাশরুমটাতে বসে এসব বলছে, সে রুমটাও আমার তৈরি! ওদের এখনই সাবধান করে দাও, নাহয় এমন শাস্তি দেব.. যে আর কোনদিন সোজা হয়ে দাঁড়াতে পারবে না' তারপর এই কথাগুলি যেন ভালমত মাথায় ঢোকে, সেজন্য পরিণতিরও একটা ছোটখাট ফিরিস্তি দিলাম, যাতে ক্লাশ মনিটর গিয়ে ওদেরকে শোনায় আমি এতই রেগে আছি যে ওদের কে ডেকে সরাসরি কথা বলারও রূচি হচ্ছেনা পুরো ঘটনাটা এভাবে যখন দেখলাম, তখন আল্লাহ কেন তিন চার আয়াতের পরেই প্রসঙ্গ পাল্টে অন্য প্রসঙ্গে চলে যাচ্ছেন, সেটা বুঝতে বেশ সুবিধা হল কিন্তু সূরা নাবায় আরো একটা অংশ আছে, তা হচ্ছে, মুত্তাক্বীন বা আল্লাহভীরুদের পুরস্কার আমি নিজেকে হেডমিস্ট্রেসের জায়গায় বসিয়ে যখন ছাত্রদের ধমক দিচ্ছিলাম (মনে মনে), তখন আমার অবস্থান বোঝাতে চাইলে আমি কেবল উপরের কথাগুলোই বলতাম পুরস্কারের কথা বলতাম না, কারণ তাতে সুরটা নরম হয়ে আসে, ছাত্ররা আমার কথায় ভয় নাও পেতে পারে আমি যখন খুব রেগে আছি, তখন কথার সুর বদলে, নরম হয়ে ভাল ভাল কথা বলাটা আমার আসে না, এটাই স্বাভাবিক

তখন বুঝলাম, আল্লাহ যতই রাগ হোন, উনার একটা অংশ ক্ষমা দয়া দেখিয়েই যাবে আমরা সংকীর্ণমনা হতে পারি, আমাদের উদারতা আমাদের রাগের কাছে পরাজিত হতে পারে, কিন্তু আল্লাহ তাঁর নিজস্ব বৈশিষ্ট্যে অতুলনীয়, এবং আশ্চর্য রকমের ভারসাম্যপূর্ণ এই সূরায় আল্লাহ যাদের উদ্দেশ্য করে কথা বলছেন, তাদের অপরাধ কিন্তু কম না তবুও, তিনি শাস্তির বর্ণনা করেই শেষ করেননি, আশার বাণীও শুনিয়েছেন জান্নাতের অপূর্ব সুন্দর বর্ণনা দিয়েছেন, তার চেয়েও বড় কথা, তিনি নিজেকে তাদের প্রতিপালক হিসেবে পরিচয় দিয়েছেন চল্লিশ আয়াতের এই বিরাট সূরাটায় শেষের চার আয়াতে পাঁচবার 'রব' (প্রতিপালক) আর 'আর-রহমান' (সবচেয়ে বেশি দয়ালু) উল্লেখের মাধ্যমে আল্লাহ যেন মনে করিয়ে দিচ্ছেন, "আমার কঠোরতা দেখে দূরে সরে যেওনা, আমি তোমাদের শাসন করলেও, প্রতিপালন আর দয়া থেকে কখনও সরে যাবনা"

আমি প্রধান শিক্ষিকা হয়ত হব না, কিন্তু মা হব! আমার সন্তানদের উপর অসম্ভব রকমের রাগও হবে কখনও কখনও তখন শাস্তি দিলেও, করুণা বা মায়ার এই অংশটুকু দেখাতে যেন না ভুলি তা না হলে আমার মনের কঠোরতা ওদের দূরে ঠেলে দেবে

মনের এতদূর উপলব্ধি পর্যন্ত এসে আমি চোখ খুললাম আপন মনেই হাসলাম আমার যাত্রা ফুরিয়েছে, সূরা নাবা আমাকে মায়ের শাসন ভালবাসার প্রকৃত ভারসাম্য শিখিয়েছে, আর মায়ের চেয়েও লক্ষ কোটি গুণ ভালবাসা যাঁর মাঝে, তাঁর প্রতি কৃতজ্ঞতায় মনটা ভরিয়ে দিয়েছে সূরা নাবা এখন শুধুই আমার কাছে আরো একটি সূরা না, আল্লাহর ভালবাসার অগুণতি নিদর্শনভান্ডারে আরো একটি সংযোজন


বাংলানিউজ২৪ এ প্রকাশিত:

Wednesday, November 16, 2011

বদরাগ ও সূরা নাস

'রাগ হলে আমার লজিক্যাল সেন্স হারিয়ে যায়। অদ্ভুত সব কারণ একটার উপর একটা যোগ হতে থাকে। আমি নিজের মধ্যে বুঝতে পারি, আমি রাগ করছি কারণ আমার মধ্যে একটা হেরে যাওয়া অনুভূতি হচ্ছে। আমি নিজের মত করে একটা কিছু ভেবে রেখেছিলাম, কিন্তু বাস্তবে তেমন করে হয়নি। আমি হেরে যাচ্ছি, আমার কথা কেউ পাত্তা দিচ্ছেনা, আমার সুযোগ সুবিধার দিকে কারো খেয়াল নেই... আমার উপর অন্যায় হলে দেখার কেউ নেই..'

উপরের কথাগুলো একটু অদল বদল করে দিলে প্রত্যেকেই নিজের ছায়া খুঁজে পাবেন। রাগ এমন এক জিনিস, তখন কে যে কী থেকে কী হয়ে যায়, কোন ঠিকঠিকানা থাকেনা। রাগ আর মাতাল অবস্থার মধ্যে আমি কোন পার্থক্য দেখি না। যে মাদক নেয়া থামাতে পারে না, তাকে আমরা বলি, ওর নিজের উপর কন্ট্রোল নেই। যে রাগ হলে শান্ত হতে পারেনা, তাকেও আমরা বলি, ওর কন্ট্রোল থাকেনা। আফসোস, মাদকাসক্ত কে আমরা দেখি ঘৃণার চোখে, আর বদরাগ কে দেখি কিঞ্চিৎ প্রশ্রয়ের চোখে।

কেন এভাবে রেগে যাই আমরা? আগের কোন রাগকে ট্র্যাক করতে পারবেন? এখানে রাগ বলতে আমি কিন্তু 'অযৌক্তিক রাগ' বুঝাচ্ছি। নিজের উপর অন্যায় হলে যে রাগ হয়, সে রাগের কথা বলছি। যে রাগ কমানোর জন্য মানুষ মেডিটেশনের দ্বারস্থ হয়, ডাক্তারের কাছে মুখ কাঁচুমাচু করে বলে, 'দেখেন ত ডাক্তার সাহেব, আমার প্রেশারটা কি বেশি দেখে এত রাগ উঠে?', সেই রাগের কথা বলছি। আমার রাগের ৯০%ই তৈরি হয় 'এটা অন্যায়' - এই চিন্তা থেকে। এই যেমন বন্ধুরা সবাই মিলে বেড়াতে যাওয়ার প্ল্যান করছি, এর মাঝে একজন বলা নাই কওয়া নাই শেষ মুহূর্তে পিছু হটল। হয়ে গেলাম রাগ, 'তার কি এইটা উচিৎ হইসে?' বাসায় গুরূত্বপূর্ণ কোন সিদ্ধান্ত আমাকে জিজ্ঞাসা ছাড়াই নিয়ে ফেলল। রাগ, 'আমি কি কেউ না?' গ্রুপে মিলে কোন কাজ করছি, একজন ফাঁকিবাজি করল। হয়ে গেল মেজাজ খারাপ, 'ফাইজলামি পাইসে?' প্রত্যেকবারই হয় 'আমার' কমফোর্ট নষ্ট হয়েছে, নয়ত 'আমার' ইগো হার্ট হয়েছে, অথবা 'আমার' তৈরি করা প্ল্যান অনুযায়ী কাজ হয়নি। প্রত্যেকটাই খুব আত্মকেন্দ্রিক কারণ, কিন্তু আমি যখন রেগে যাচ্ছি, তখন আর স্বার্থপরতার ওই দিকটা আর চোখে পড়ছে না, মনে হচ্ছে, আমি বৃহত্তর স্বার্থে অন্যায়ের প্রতি জিরো টলারেন্স দেখাতে রাগ দেখাচ্ছি। অথচ এই ঘটনাটাই অন্যের বেলায় ঘটলে হয়ত আমি মিষ্টি মিষ্টি হেসে ধৈর্য ধরার উপদেশ দিতাম। এ রকম ডাবল স্ট্যান্ডার্ড, হীন একটা চিন্তাকে মনের ভেতর মহৎ বানিয়ে ফেলছে কে?

সূরা নাস এ আল্লাহ আমাদের শিখিয়েছেন শয়তানের অনিষ্টকর কুমন্ত্রণা থেকে আল্লাহর কাছে আশ্রয় চাইতে (মিন শাররিল ওয়াসওয়াসিল খান্নাস।) শয়তান আমাদের কুমন্ত্রণা দেয় - এটা কি আমরা আসলেই বিশ্বাস করতে পারি? মাঝে মধ্যে পারি, কিন্তু বেশির ভাগ সময়ই আমাদের যুক্তিবাদী মন বিশ্বাস করতে চায়না কোন জ্বীন ভূত এসে কুবুদ্ধি দিচ্ছে, আর সেটার ফল আমাদের কাজে এসে পড়ছে। শয়তানকে নিয়ে কারো সাথে রিয়েলিস্টিক আলোচনা করার চেষ্টা করে দেখুন, হাসতে হাসতে আপনাকে উড়ায় ফেলবে, স্কিজোফ্রেনিক রোগীও বানায় ফেলতে পারে। শয়তানকে নিয়ে আমি প্রায়ই চিন্তাভাবনা করি, তারপরেও, এশার নামাজ একটু দেরি করে ফেললে যখন ভী-ষ-ণ আলসেমি লাগে, ঘুমে মনে হয় পড়েই যাব, আর কষ্ট করে নামাজ পড়ে ফেলার সাথে সাথে ঘুমও পালায় - তখনও আমার মনে হয়না এটা শয়তানের কারসাজি। শয়তান এখনও আমার কাছে সামহোয়াট ইমাজিনারি কিছু। আমার বাসা, ল্যাব, ল্যাপটপ - এরা যেমন খুব বাস্তব, শয়তানকে ততটা বাস্তব ধরতে মনের মধ্যে কেমন কেমন যেন লাগে।

রাগের বেলায় শয়তানের ভূমিকা বলার আগে সূরা নাসের পরের লাইনটা আলোচনা করে নেই। আল্লাযি ইয়ুওয়াসয়িসু ফী সুদুরিন নাস, সেই শয়তান, যে মানুষের বুকের মধ্যে বসে কুমন্ত্রণা দেয়। 'ইয়ুওয়াসয়িসু' হচ্ছে ঘটমান বর্তমান ক্রিয়াপদ। চলতেই থাকবে, চলতেই থাকবে। কোন থামাথামি নেই। শয়তান বুকের মধ্যে বসে থাকবে, একটা ফুট কাটবে, আপনি তাকে ধমক দিয়ে থামাবেন, সে একটু দমে যাবে, তারপর মুখটা বাড়ায় আবার আরেকটা কিছু বলবে.. আবারও, আবার... ! আপনি যখন কোন কারণে অফেন্ডেড, আপনার মনের মধ্যে এমনিতেই কিছু নেগেটিভ চিন্তা আছে অফেন্ডারের প্রতি। এখন শয়তান করবে কি, ওই ভদ্রলোকের/ভদ্রমহিলার সাথে আপনার বিগত জীবনে যা যা খারাপ অভিজ্ঞতা হয়েছে সব ছবির মত সামনে তুলে ধরতে থাকবে। একটা করে ছবি দেখবেন, মেজাজ খারাপ বাড়তে থাকবে। শুধু এই না, ছবির নিচে ক্যাপশনের মত একটা এক্সপ্লানেশন ও থাকবে, ও এইটা করসিল, দেখ, সে তোমার জন্য কক্ষণো কেয়ার করে নাই। সবসময় তুমিই করে গেছ... ইত্যাদি ইত্যাদি। কারো উপর রাগ হওয়ার পর তার ভালমানুষির কথাগুলি কি আপনার কখনো মনে পড়ে? আমি কারো উপর রাগ হয়ে আমার স্বামীর কাছে ঝাল ঝাড়লে সে তার ভাল দিকগুলি মনে করিয়ে দেয়ার চেষ্টা করে, কিন্তু আমার তখন আরো রাগ হয়, 'আমি বলতেসি খারাপ আর তুমি ভাল দিক দেখাচ্ছ! আমার ত এখন নিজেকে আরো বেশি খারাপ মনে হচ্ছে!' কী ভয়ংকর ইগো!

যাই হোক, পার্সোনাল ডিসকমফোর্ট আর শয়তানের ওয়াসওয়াসা - এ দুটোই আমাদের জন্য অনেক, তার উপর আরো আছে পারিপার্শ্বিকতার চাপ। আশেপাশের মানুষের উস্কানিতে ঘটনা আরো খারাপের দিকে গেছে - এ রকম দেখেছেন কখনো? আল্লাহ সূরা নাস এর শেষ লাইনে বলেছেন 'মিনাল জিন্নাতি ওয়ান নাস', খারাপ জ্বীন ও মানুষের কুমন্ত্রণা। ওয়াসওয়াসা শুধু বুকের ধারেকাছে ওঁৎ পেতে থাকা বেহায়া শয়তানটাই দেয়না, তার সাঙ্গোপাঙ্গো যারা অন্যদের ভেতর বসে আছে, তারাও একযোগে বুদ্ধি দিতে থাকে, এটা বল, ওটা মনে করিয়ে দাও। ফলাফল... থাক, নাই বা বলি। রাগ করে মানুষ বাসনকোসন ভাঙে, হাত পা ভাঙে। সম্পর্ক ভাঙে, ভাঙে আল্লাহর উপর বিশ্বাসও। তারপর একটা সময় ফলাফল দেখে কান্নায়ও ভেঙে পড়ে।

ফেসবুকে এক ছোট বোন লিখেছিল, মানুষকে চেনার সবচেয়ে ভাল উপায় হল তাকে রাগিয়ে দেয়া। এমনিতে ফেরেশতা, আর রাগিয়ে দিলে মুখের ভাষা শয়তান টাইপ হয়ে যায়। আমি এই বক্তব্যের সাথে একমত না। রাগিয়ে দিলে মুখের ভাষা শয়তান টাইপ হয়, কারণ সে তখন শয়তান আর মানুষের ওয়াসওয়াসা দ্বারা প্রভাবিত হয়। রাসুলুল্লাহ (স) কখনোই মানুষের রাগের অবস্থা বিচার করতেন না। এমন ভাব করতেন, যেন এমন কোন ঘটনা ঘটেই নি। তিনি বুঝতেন, এটা অন্য যে কোন প্রবৃত্তির মতই মানুষের একটা দুর্বলতা। তাই উনি সবচেয়ে শক্তিশালী বলেছেন সেই ভাই বা বোনকে, যে রাগের সময় নিজেকে সংযত রাখতে পারে।

রাগ হলে কী করতে হবে? বলব না। যে সত্যিকারের আন্তরিক সে খুঁজে বের করে নিক। আমি চাই মানুষ বদরাগ কে মাদকাসক্তির মতই এক সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করুক। বদরাগের কারণে যাদের সম্পর্কে ফাটল ধরেছে তারা বিষয়টার ভয়াবহতা নিয়ে অন্যদের সাথে কথা বলুক, মানুষ যেন আরো সচেতন হয়। Domestic violence এর অনেকটুকুই আসে বদরাগ থেকে। ঠান্ডা, সুস্থ মাথায় ভায়োলেন্স করে যাচ্ছে, এরকম কেস আপনি কমই পাবেন। রাগ নিয়ে চিন্তা করুন। যে বদরাগী, সেও, যে ভুক্তভোগী, সেও। চট করে রেগে যাওয়া, লম্বা সময় রাগ ধরে রাখা - এগুলো পরিবার, সমাজের বড়সর ক্ষতি করে ফেলছে। এখন শুনি রিকশাওয়ালার সাথে ঝগড়া হলেই কষে চড় লাগিয়ে দেয় স্কুল কলেজের ছেলেমেয়েরা। রাগ কি কেবল স্টুডেন্টদেরই আছে? আল্লাহ না করুক, এইসব অন্যায় আর অসম্মানের খেসারত যদি আপনার কোন ভাই/বোনের জীবন/সম্মানের বিনিময়ে দিতে হয়, তখন কি একচেটিয়া রিকশাওয়ালাদের দোষারোপ করে পার পাওয়া যাবে?

লেখাটা শেষ করি আমার খুব প্রিয় একটা হাদীস বলে। রাসুলুল্লাহ (স) এর সামনে এক সাহাবীর সাথে আরেকজনের ঝগড়া হচ্ছিল। সাহাবী নম্রভাবে জবাব দিচ্ছিলেন আর ওইপক্ষ একনাগাড়ে গালিগালাজ করেই যাচ্ছিল। তাই দেখে রাসুলুল্লাহ (স) মুচকি মুচকি হাসছিলেন। একটা সময় আর টিকতে না পেরে সাহাবীও উঁচু গলায় জবাব দিতে থাকল, তখন রাসুলুল্লাহ (স) সে জায়গা থেকে সরে গেলেন। ব্যাপারটা সেই সাহাবী লক্ষ করলেন, উনি এসে রাসুলুল্লাহ (স) এর কাছে জানতে চাইলেন, উনি অসন্তুষ্ট হওয়ার কারণ কী। রাসুলুল্লাহ (স) তখন উনাকে জানালেন, তুমি যখন চুপ ছিলে তখন এক ফেরেশতা তোমার হয়ে জবাব দিচ্ছিল। আর তুমি যখন গলা উঁচু করলে, তখন ফেরেশতার বদলে শয়তান এসে জায়গা করে নিল, আর তোমার হয়ে জবাব দিতে থাকল। তাই দেখে আমি চলে এলাম।

Ref:

http://www.youtube.com/watch?v=TTWn8CSM7Vw
http://www.youtube.com/watch?v=BLMHjWz7X-E
http://www.youtube.com/view_play_list?p=15B78B2B348C0A7D
http://bayyinah.com/podcast/ (sura nas)

Tuesday, October 25, 2011

ভালবাসার অদ্ভুত রূপ

ভালবাসা জন্ম নেয় ভালবাসার মৃত্যু দিনে
ভালবাসা শুদ্ধ হয় ভালবাসার স্পর্শ চিনে

গানের রচয়িতা কী বুঝে এই লাইন ক'টি লিখেছেন তিনিই জানেন। ভালবাসা নিয়ে কীই বা লিখব? আজ প্রায় আড়াই যুগ পার করে দিয়েও ভালবাসার জন্য আকুতি একটুও কমাতে পারিনি। আমার জানা ছিলনা, বয়স বাড়লেও ভালবাসা পাওয়ার মনটা বুড়ো হয় না। ছ' বছর বয়সে যেভাবে একটু আদর বা মনোযোগ পাওয়ার জন্য কাতর হয়ে থাকতাম, এতদিন পরে এসেও আকুতিটা প্রায় একই রকম রয়ে গেছে। আমি কোনদিন বুঝিনি, আমার যেমন করে অভিমান হয়, আমার মায়েরও তেমনি করে ভালবাসার অভাবে অসহায় লাগে। আমার ফোকলা দাদী, রোগে শোকে জীর্ণ নানু - জানি না বুকের ভেতর তাদের কত হাজার অভিমান জমা আছে।

ভালবাসা না পেলে কি সবারই বুকের ভেতরটায় একটা খালি খালি ভাব হয়? কণ্ঠনালীর কাছটায় কেমন যেন কাঁপতে থাকে সারাটাক্ষণ। শক্ত করে বালিশটা বুকের মধ্যে চেপে ধরলে মনে হয়, আরও একটু জোরে চাপ দিলে পাঁজরদুটো কাছাকাছি আসবে তখন ফাঁকা জায়গাটা একটু কমবে। আবার অভিমানে চু...প হয়ে স...ব কিছু থেকে নিজেকে গুটিয়ে নিতে ইচ্ছে হয়, যেন পৃথিবীর সাথে আমার যোগাযোগ এতটুকুই, নিঃশ্বাস নেয়া আর দীর্ঘশ্বাস ছাড়া।

আমার নানুরও বোধহয় এমন লাগে, ছোট বাচ্চাদের সাথে উনার পার্থক্য এটুকুই, তারা ডাক ছেড়ে কাঁদতে পারে, আর উনি কেবলই স্থবির হয়ে থাকেন। হয়ত উনার ইচ্ছে হয়, কেউ উনার চুলে তেল দিযে দেবে, রাতে ঘুম না আসলে গল্প করবে - আমার নানুর স্মৃতির এলবামে নানার কোন ছবি নেই। আমার স্বামী নানাশ্বশুরের গল্প শুনতে চেয়েছিল, উনি বলেছিলেন, 'মানুষটা যে কেমন আছিল - রাগী না সরল সোজা, হাসিখুশি না কী.. আমি ত কিসু কইতে পারতাম না।' আমার নানুর কৈশোর, যৌবন সব কেটেছে ছেলে মেয়ে মানুষ করে আর গেরস্থালি করে। নয়টা বাচ্চার একটা দুষ্টুমি করলে সব ক'টাকে লাগাতার পেটাতেন। অসম্ভব গল্পের বই পড়ার নেশা ছিল উনার। বাচ্চারা ঘুমালে নাকি রাতে কেরোসিনের কুপি জ্বালিয়ে মশারির মধ্যে গল্পের বই পড়তেন। আমাদের বাসায় আসলেও, রান্না আর বই পড়া - এই দেখেছি কেবল উনার।

বাইরে আসার পরে নানুর জন্য যে কত... বার করে মন খারাপ হয়েছে - কীভাবে কীভাবে যেন উনার সাথে আমার মনের একটা মিল পেতাম। শহরে থাকতে ভাল লাগে না - তাই গ্রামে এই বয়সেও একা থাকেন। উনার কাছে কিন্তু বুকের মধ্যে করে নিয়ে ভালবাসা দেয়ার মত কেউ নেই। একা একা না জানি কতবার করে পুরনো দিনের কথা ভাবেন। আর আমি? স্বামীর সাথে আছি, অনেকের জন্য ঈর্ষণীয় অবস্থানে আছি - তারপরেও শীতের রাতে একলা বাস স্ট্যাণ্ডে দাঁড়িয়ে যত দূর পর্যন্ত চোখ যায় - আপন কাউকে দেখিনা। হঠাৎ করে ঘুম ভেঙে যায়, আম্মুর মাথাব্যথা - আমার হাতটা আম্মুর কপালে - এই স্বপ্ন দেখে। আমার ত আম্মু একটাই, নানুর নয় নয়টা সন্তান -- জানিনা, বুকের পাঁজর কতটুকু দোমড়ালে শূন্যতাটুকু আড়াল করা যায়।

দেশের বাইরে বুকের মধ্যে নিয়ে আগলে রাখার কেউ নেই। ভালবাসা না পেয়ে একটা একটা করে যেন কোমলতাগুলো কোথায় হারিয়ে যায়। কণ্ঠস্বরে আবেগের পরিমাণ কমে আসে, নস্টালজিয়া ঢাকতে দেশের ব্যাপারে উপেক্ষা - আর সারাটাক্ষণ চাপা উদ্বেগ, কোন দুঃসংবাদ এল কি? তাই ভাবি, যে বাচ্চাটা বড় হওয়ার আগেই মাকে হারিয়েছে, তার জীবনটা কেমন হয়? যে মেয়েটা খুব খুব শুদ্ধ অনুভূতি দিয়ে কাউকে আপন করার স্বপ্ন দেখেছে - স্বপ্ন ভাঙার পরে তার দিনগুলো কেমন হয়? প্রতারণা, স্বার্থপরতা - পরিবারের আপন মানুষগুলোর থেকে এসব দেখার পর একটা যুবক কোথায় গিয়ে আশ্রয় নেয়? প্রিয় মানুষগুলোর থেকে আমার ত তবু বাধা দূরত্বের, কারো হয়ত সে বাধা বিশ্বাসের, কারো হয়ত জীবন আর মৃত্যুর।

ভালবাসা ছাড়া মানুষ বাঁচে কী করে? ভালবাসা একটা প্রয়োজন, যে কাছের মানুষের কাছে না পায়, সে দূরের মানুষের কাছে খুঁজতে যায়। আর দূরের মানুষও যখন কাছে আসেনা - তখন না জানি কত কত কিছুতে নিস্ফল ভালবাসার আকুতি নিয়ে ঠুকরে মরে।

একটা অদ্ভুত ভালবাসার কথা অনেকেই জানেনা। মনটার মধ্যে যখন কোন খারাপ চিন্তা থাকেনা, কোন উদ্ধতভাব না, কোন দুশ্চিন্তা না - যখন মনের ভেতর থেকে অনেক অনেক গভীর থেকে আলহামদুলিল্লাহ মনে আসে, মাথাটা এলিয়ে দিয়ে চুপ করে সময়টাকে ভালবাসতে ইচ্ছে করে - তখন কেমন যেন অদ্ভুউ..ত এক অনুভূতি হয়। আস্তে আস্তে নিঃশ্বাসটা ভারি হয়ে আসে, মনে হয় একটা ভারি চাদরের মত কিছু একটা আমাকে ঢেকে দিচ্ছে। মনে হয় এই আবরণ আমাকে সব কষ্ট থেকে আড়াল করে রাখবে, কোন কষ্ট নেই, কোন একাকীত্ব না। আমার যাই হারিয়ে যাক, আমি কখনও একা হব না। এই অদ্ভুত ভাললাগাটা আমার চোখ ভিজিয়ে দেয়, আমার গলা ভারি হয়ে আসে .. সারাটা শরীর খুউব হালকা লাগে। আর বুকের ভেতরটা - আমার প্রাণের স্পন্দন আমি টের পাই। উচ্ছ্বল এক ছন্দ। ঝর্ণার শব্দের মত। আমি জানিনা আগের সাথে পরের কী এমন ঘটে যায়, আমি শুধু টের পাই, আমার জীবনটা অনেক সুন্দর। আমার ভালবাসার একটুকু অভাব নেই কোথাও। আল্লাহ আমাকে খুব ভালবাসে। আমি তাঁর কাছে ছোট্ট অবুঝ এক শিশু। আমার জীবনটা এই মাত্র শুরু হল। আমি মাত্র হাঁটতে শিখেছি, পেছনে তাকানোর আমার কিছু নেই। আমি হাঁটব, সামনের দিকে। আমাকে যারা ভালবাসে তারা অনেক প্রত্যাশা নিয়ে হাত বাড়িয়ে আছে, আর একটু পথ সামনে এগোলেই বুকে জড়িয়ে নেবে।

এমনি অদ্ভুত এই ভালবাসার অনুভূতিটা বুঝতে আমার অনেক সময় লেগেছিল, কিন্তু যখন বুঝতে পারলাম, মনে হল, এই অনুভূতির মত সুন্দর কিছু হয়না। এই একটা বোধ নিয়ে জীবন কাটানো যায়। কখনও মনে হবেনা, যে আমাকে ভালবাসার কেউ নেই। খুব কাছের মানুষটার অবহেলায়ও মনে হবে - 'আমার এত এত ভালবাসাকে ও হারিয়ে দিল, আজ আমি পৃথিবীর সবাইকে ভালবেসে জয়ী হব।'

Thursday, October 6, 2011

আসরের চারটি উপদেশ

সূরা আসর এর তাফসির শুনে আমি এতই মুগ্ধ, এর মূল বক্তব্য স্পর্শ না করেও আরো অনেক খুঁটিনাটি নিয়ে লেখালেখি করতে ইচ্ছে করছে। এই যেমন এই সূরার শেষ আয়াতটা। এখানে আগের দুই আয়াতের (চাইলে আগের লেখাটা পড়ে আসতে পারেন) বিপরীত কথা লেখা হয়েছে। অর্থাৎ আল্লাহর এত শক্ত সতর্কবাণী শুনে আমরা যখন পুরোপুরি নিজের মধ্যে নিশ্চিত হব যে খুসর এ পতিত আর কেউ না, আমি। তারপর দিশেহারা হয়ে এর পথ খুঁজব, তখন আল্লাহরই নির্দেশিত পথে আমরা নিজেদের বাঁচানোর চেষ্টা করব। আল্লাহর নির্দেশিত পথ কী কী? আমানু (বিশ্বাস), আমিলুস সালিহা (ভাল করা), তাওয়াসাও বিল হাক্ক (consult with/to truth), তাওয়াসাও বিস সাবর (consult with/to patience).

আল্লাহ নির্দিষ্ট করে বলেননি কীসে বিশ্বাস, কী ভাল করা, কাকে পরামর্শ দেয়া, কোন ক্ষেত্রে পরামর্শ দেয়া। সুতরাং আল্লাহর দেখানো পথের ক্ষেত্র অনেক অনেক বিস্তৃত। খুসর থেকে বাঁচতে চাইলে উপরের চারটি কাজের যে কোন একটি বা দুটি বেশি করে করলেই হবে না। চারটিই করতে হবে। বিশ্বাস এনে ভাল ভাল কাজ করে কারো সাতে পাঁচে না থাকলেই বেঁচে গেলাম - এরকম সুবিধাবাদী এপ্রোচের সুযোগ নেই। নতুন নতুন ইসলামপন্থী হয়ে পরিবারে দাওয়াহ দিতে গিয়ে চরম ঝাড়ি খেয়ে - এদের সাথে কোন সম্পর্ক রাখব না - এত সহজ সমীকরণে অঙ্ক কষারও উপায় নেই। সৎ কাজের পরামর্শ দিয়ে যেতেই হবে, আন্তরিকভাবে, ধৈর্যের সাথে।

তাওয়াসাও শব্দটি ওয়াসিয়ত শব্দের ক্রিয়ারূপ। আমরা জানি ওয়াসিয়ত মানে উইল করে যাওয়া বা সম্পত্তি হ্যান্ডওভার করে যাওয়া। মানুষ তার প্রিয় জিনিস উইল করে যায় তাকেই যাকে সে ভালবাসে ও তার উন্নতি চায়। আপনি যদি জানেন আগামীকালের পর আপনি আর পৃথিবীতে থাকবেন না, তখন আপনার প্রিয় মানুষগুলোকে যা যা বলে যেতে চাইবেন - যতটা উদ্বেগের সাথে, তাওয়াসাও বিল হাক্ক ও যেন ততটাই আন্তরিক হয়। ওয়াসিয়ত শুধু মূল্যবান সম্পদ প্রিয় মানুষকে সমর্পণ করাই নয়, এর মধ্যে উভয়পক্ষের সম্মতি থাকতে হবে। একটা সমঝোতা থাকতে হবে। সংশোধন বা পরামর্শ এমনভাবে দিতে হবে যাতে সে মানুষটা ছোট না মনে করে। আসলেও, আপনি যদি একজনকে খুব ভালবাসেন, তাকে ছোট করতে বা তার মনটায় কষ্ট দিতে আপনার ইচ্ছে হবেনা। কিন্তু আপনি এটাও চান না আল্লাহর সামনে তার কোন দোষের জন্য সে ছোট হোক। সুতরাং সত্যি কথাটা তাকে উইল হিসেবে দেয়ার জন্য আপনার পূর্ণ আন্তরিকতা দেখাতে হবে। আপনার বক্তব্যের কমনীয়তায়, আপনার ব্যবহারের উদারতায় যেন অপর মানুষটা আপনার উদ্দেশ্য সম্পর্কে পুরোপুরি নিশ্চিত হয়।

যদি আপনার সকল চেষ্টার পরেও উদ্দেশ্য সফল না হয়? যদি সে মানুষটা আপনাকে ভুল বোঝে? যদি মুখের উপর বলে বসে, তুমি আমার ব্যাপারে কথা বলার কে? যদি তিনি আপনার বাবা হন, ভাই হন, স্বামী হন? আপনি কষ্ট পাবেন, সেটাই স্বাভাবিক। কিন্তু আল্লাহ প্রদত্ত মুশকিল আসানের চার নম্বর টিপ, তাওয়াসাও বিস সাবর ব্যবহার করা আপনার এখনো বাকি আছে।

দাম্পত্য সিরিজ টা লিখতে গিয়ে বারবারই মনে হত, এত কথার দরকার কী? সূরা আসর এর চারটা উপদেশ মনে করিয়ে দিলেই ত হয়। আসলে ইনিয়ে বিনিয়ে ঘুরিয়ে পেঁচিয়ে আমরা কোন না কোন ভাবে এই চারটা কাজই করার চেষ্টা করি। কখনও আল্লাহর প্রতি আন্তরিক আস্থা রেখে সহ্য করা, কখনও নিজের ব্যবহার অটুট রেখে উদাহরণ তৈরি করা, কখনও সুন্দরভাবে ভুল শুধরে দেয়া, কখনও শুধুই ধৈর্য ধরতে বলা। সম্পর্কগুলোতে চিড় ধরে যখন আমরা এর কোন একটা স্টেজ এ এসে ব্যর্থ হয়ে পড়ি।

কেউ কেউ বলেন এই চারটি কাজ হচ্ছে ধাপের মত। প্রথম ধাপ বিশ্বাস আনা, আপনার বিশ্বাস শক্ত হলে সে অনুযায়ী আমল করা, তারপর ধীরে ধীরে বাকি দুটো। কেউ কেউ বলেন চেয়ারের চারটি পায়ের মত। একটা ছাড়া অন্যগুলি টিকতে পারবেনা। তবে এটুকু বুঝি, একটা থেকে পরের টাতে যেতে গেলে পিঠের চামড়া শক্ত করে করে এগুতে হবে। ইসলামের মূল কনসেপ্টটা একটু বোঝার পর গতানুগতিক চিন্তাধারার সাথে এর শকিং কনট্রাস্ট দেখে নিজের সাথে বেশ অনেকটা যুদ্ধ করতে হয়েছে। কারণ এর জন্য আমাকে অনেক মোহই মন থেকে মুছে ফেলতে হয়েছে। সবচেয়ে কঠিন লেগেছিল আল্লাহ ও রাসুল (স) কে অন্য যে কারো চেয়ে বেশি ভালবাসতে হবে। তার মানে আমার বয়ফ্রেণ্ড এর কথা যতক্ষণ ভাবব তার চেয়ে বেশিক্ষণ মনের মধ্যে থাকবে আল্লাহর কথা। আম্মুর মন খারাপ দেখলে যতটুকু অস্থির হই, রাসুলুল্লাহ (স) কষ্ট পেতে পারেন এমন সব ব্যাপারে তার চেয়েও অনেক বেশি যত্নবান হতে হবে। আমিলুস সালিহাও প্রথম প্রথম খুব সহজ কিছু ছিলনা। এখনও পাঁচ ওয়াক্ত নামাজের জন্য প্রবৃত্তির সাথে যুদ্ধ করতে হয়। আচরণে, বেশভূষায় পরিবর্তন আসাতে আশপাশের মানুষগুলোকেও অভ্যস্ত করতে সময় দিতে হয়। এটুকু পর্যন্ত তাও চলে। তৃতীয় আর চতুর্থ ধাপ যে কতটা ভয়াবহ রকমের কঠিন তা আমি জানি প্রত্যেকে নিজেকে দিয়ে বোঝেন। আমি ভুলেই গিয়েছিলাম প্রায় যে আমার চাচা কে নসীহত করা আমার দায়িত্ব, আমার বান্ধবীদের সাথে এসব অস্বস্তিকর আলোচনাগুলো আনতে হবে। মনের কোন এক কোণে বিশ্বাস হয়ে গিয়েছিল যার যার ব্যাপার তার তার থাকাই ভাল, কিন্তু না! জাহান্নামের আগুন থেকে আমি বাঁচতে চাইলে তাদের প্রতি আমার দায়িত্ব আমি এড়াতে পারবনা।

এই সূরার বক্তব্যের একটা প্রতিকী গল্প এমন -

আপনি ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে চমৎকার সব স্বপ্ন দেখছেন। হঠাৎ ঘুম চটে গিয়ে দেখলেন আপনি পানিতে ডুবে যাচ্ছেন। আপনার হাতে সময় নেই। আপনি প্রবলভাবে হাত পা ছোড়াছুড়ি করে ডুবে যাওয়া থেকে বাঁচার চেষ্টা করছেন, আস্তে আস্তে শিখে গেলেন এভাবে পা নাড়ালে ভেসে থাকা যায়। তারপরেও কী করে যেন একটু একটু করে তলিয়ে যাচ্ছেন। চারপাশে তাকিয়ে দেখলেন আপনার পায়ে শেকল বাঁধা, তার সাথে জোড়া লাগানো রয়েছে আপনার কাজিন, আপনি তাকেও ঘুম থেকে জাগালেন, দু'জন মিলে সাঁতরাতে শুরু করলেন, এবারে আপনাকে টেনে ধরছে আপনার দাদী, আপনার মা, বাবা, বন্ধুরা। তারা বলল, রিয়েলিটি অনেক কঠিন, এর চেয়ে আমার ঘুমই ভাল। তারা আবার ঘুমিয়ে যেতে চাইল। কিন্তু আপনি কিছুতেই তাদের ঘুমোতে যেতে দিতে পারেন না। সজ্ঞানে সবাইকে নিয়ে ডুবে যাওয়ার মত বুদ্ধিহীন আপনি নন। আপনাকে বাঁচতেই হবে। যে করেই হোক।

আসর (সময়)

এই ছোট্ট তিন আয়াতের সূরাটা সম্পর্কে লিখতে বসে কোথা থেকে শুরু করব ভেবে কূল কিনারা করতে পারছিনা। একবার মনে হচ্ছে যা শিখেছি সব লিখি, আবার ভাবছি যার আগ্রহ আছে সে ত নিজেই শিখে নিতে পারবে, বরং আমাদের জীবনে কীভাবে কাজে লাগাতে পারি তাই নিয়ে লিখি। আল্লাহর উপর সম্পূর্ণ ভরসা করে শুরু করলাম, জানিনা শেষ পর্যন্ত আল্লাহর আয়াতের কতটুকু মর্যাদা দিতে পারব।

কারো যদি সূরা আসর টা পড়া না হয়ে থাকে তার সুবিধার জন্য মোটামুটি একটা তর্জমা দিচ্ছি।

১. শপথ সময়ের (ওয়াল আসর)
২. নিশ্চয়ই প্রত্যেকটি মানুষ নি:সন্দেহে ক্ষতির মধ্যে রয়েছে (ইন্নাল ইনসানা লা ফী খুসর)
৩. শুধুমাত্র তারা ব্যতীত, যারা (ইল্লাল্লাযীনা)
- বিশ্বাস করেছে এবং (আ'মানু ওয়া)
- সৎকর্ম করেছে এবং (আ'মিলুস সালিহাতি ওয়া)
- উপদেশ দিয়েছে সত্যের দিকে / সততার সাথে এবং (তাওয়াসাও বিল হাক্ব ওয়া)
- উপদেশ দিয়েছে ধৈর্যের দিকে / ধৈর্যের সাথে (তাওয়াসাও বিস সাবর)

ছোট্ট সূরা। সিম্পল কথাবার্তা, কুরআনের অন্যান্য সব সূরায় যেমন সতর্কবাণী থাকে এখানেও তেমনই। কিন্তু এই সূরার গঠন, পূর্ণাঙ্গতা, শব্দচয়ন সবকিছু চিন্তা করলে রীতিমত ভয় লাগে। প্রথমেই বলি, আল্লাহ কুরআনে অনেক বস্তু নিয়েই শপথ করেছেন, (যেমন সূরা ত্বীন, সূরা শামস্, সূরা আদিয়াত), শপথ নিয়ে শুরু করা সূরার ধারাবাহিকতায় শেষ সূরা হচ্ছে সূরা আসর, এর পরে আর কোন সূরায় আল্লাহ কোন কিছুর শপথ করে কিছু বলেন নি। তিনি কিসের শপথ নিলেন? সময়ের। কেন? সময়কে এত সম্মান কেন? কারণ প্রত্যেকটি মানুষের জীবনে আল্লাহর দেয়া সবচেয়ে বড় অনুগ্রহ সময়। ধনী হোক, গরীব হোক, অ্যাথলিট হোক, পঙ্গু হোক - সবার জন্য সময়ের দয়া সমান পরিমাণে আছে। একটা জিনিসের মূল্য আরো বেশি মনে হয় যখন জানি একে ধরে রাখা যাবেনা। দেশের বাইরে থেকে তিন সপ্তাহের জন্য দেশে বেড়াতে গেলে এর মর্ম আমরা হাড়ে হাড়ে টের পাই। আল্লাহ সেই সময়ের শপথ করেছেন, ওয়াল আসর - যেখানে আসর এর শব্দগত উৎপত্তি 'আসীর' বা ফলের রস থেকে, নিংড়ে বের করতে গেলে যাকে কখনোই হাতের মুঠোয় ধরে রাখা যায়না।

এই আসর বা সময় শুধু সদা প্রবহমান - এটা বুঝাতেই ওয়াল আসর বলা হয়নি। আসর সাক্ষ্য দিচ্ছে যে প্রত্যেকটি মানুষ সত্যি সত্যি ক্ষতিগ্রস্ত। সময় একইসাথে গতিশীল, কিন্তু মহাকালের বিবেচনায় সবটুকু মিলিয়ে স্থানুও বটে। আমাদের হাসি খেলা, ইঁদুর দৌড়, পরষ্পরকে দোষারোপ, সামান্য অর্জনে আস্ফালন - তারপর একদিন নিরবে প্রস্থান - সব কিছুর সাক্ষী হয়ে আছে সময়। যে একই সাথে ছোট্ট শিশুর মত চঞ্চল, আবার শতবর্ষী ঋষির মত গম্ভীর। ইতিহাসের পাতার অসংখ্য সফল জাতির উত্থান ও পতন সময় দেখেছে, দেখেছে খুব সফল জননেতাকেও মৃত্যুর পরে ধূলোয় মিশে যেতে। আমাদের এত আয়োজন, এত আত্মম্ভরিতা - কিছুই সময়কে টানেনা, কারণ সে জানে এর শেষ হবে একটু পরেই।

এটা খুব অবাক করা ব্যাপার, আল্লাহ প্রত্যেকটা মানুষকে এত বড় একটা জিনিসের শপথ করে বলল ক্ষতিগ্রস্ত? আল্লাহ ইনসান না বলে কাফির বলতে পারত! মুশরিক বলতে পারত! ইনসান কেন? ইনসান দিয়ে ত বোঝায় পুরো পৃথিবীতে যত মানুষ আছে, বা যারা আগে চলে গেছে তাদের প্রত্যেকে আলাদা আলাদা করে। আমার ডিপার্টমেন্ট এর চেয়ারম্যান সব স্টুডেন্ট কে ডেকে যদি বলে, নূসরাত, you r in deep trouble, জেসি, you need to be careful, মমতা..., মারলন..., ব্রায়ান..., ক্যাথি - তাহলে যেমন ভয়ে আমাদের সবার আত্মা উড়ে যাবে, ইনসান ততটাই স্পেসিফিক। তাও একবার না, 'ইন্না' আর 'লা' একই বাক্যে দু দুটো অব্যয় ব্যবহার করে বাক্যটাকে খুবই জোরালো করা হয়েছে। প্রথমে 'আসর' দিয়ে শপথ, এক এক করে সবার দিকে অঙ্গুলি নির্দেশ, তারপর 'ইন্না' আর 'লা' দিয়ে এর গুরূত্ব দশ পনের গুণ বাড়িয়ে দেয়া - এই সূরায় আল্লাহ যেন মানুষের জন্য এক্সট্রিম এক্সট্রিম সতর্কবাণী দিয়েছেন।

আল্লাহ বললেন আমরা সবাই খুসর এর মধ্যে আছি। খুসর বলতে কিন্তু ছোটখাট ক্ষতি বোঝায় না। ব্যবসা করতে নেমে মূলধন সহ খুইয়ে নিঃস্ব হওয়া হচ্ছে 'খুসর।' আপনার পাঁচতলার ফ্ল্যাটে আগুনে আটকা পড়া হচ্ছে খুসর। অজ্ঞান অবস্থায় পানিতে পড়া খুসর। মোদ্দা কথা, সারভাইভাল এর প্রশ্ন যেখানে, যেখানে এই ক্ষতি থেকে উদ্ধার পাওয়া ছাড়া আর সব কিছু গৌণ হয়ে যায় - তাই খুসর। আল্লাহ কেন বললেন আমাদের জীবন নিয়ে টানাটানি? তিনি কি দেখেন না, আমরা দিব্যি বেঁচে বর্তে আছি? আমরা ত শেষ দিবসে বিশ্বাস করি, আর সাধ্যমত ইবাদত ও করি। তাহলে কেন তিনি ঘোর নাস্তিক এর সাথে আমাদের একই কাতারে ফেললেন?

উত্তর একটাই। সময়। আল্লাহ মানুষকে সৃষ্টি করে তাদের থেকে কমিটমেন্ট নিয়েছেন যে তারা নিজেদের 'আক্বল' বা ইন্টেলেক্ট ব্যবহার করে স্বেচ্ছায়, সজ্ঞানে আল্লাহর পছন্দসই কাজ করবে। আমরা পৃথিবীতে কতসময় থাকব সেটা অনেক আগেই ঠিক করা। এসময়টায় কী করব সেটাও হলফ করে আল্লাহর কাছে বলে এসেছি। ভাবতে গেলে মনে হয় সময়টাই যেন আমাদের একটা টুল। আল্লাহর কাছে প্রতিজ্ঞা করে ধার নিয়ে এসেছি। আল্লাহ দেখছেন তাঁর এই অনুগ্রহের কী সদ্ব্যবহার আমরা করছি। অনেকটা এমন, আমরা একটা বিশাল বালিঘড়ির নিচের অংশে আছি। একটা একটা করে বালি উপর থেকে পড়ছে, কথা ছিল তাই দিয়ে আমরা আল্লাহর নাম গুলি লিখব। কিন্তু সব ভুলে তাই দিয়ে আমরা ঘর বাড়ি বানাচ্ছি, ছাদটাকে ছোঁয়ার সিড়ি বানাচ্ছি। আল্লাহ সব দেখছেন, আমাদের মনে করিয়ে দেয়ার জন্য রাসুল পাঠাচ্ছেন, তাঁরা কাঁচের দেয়ালের বাইরে থেকে বারবার আমাদের নিষেধ করছেন, আমরা ফিরেও তাকাচ্ছিনা। বালিঘড়ির শেষ বালিটা যখন তার যাত্রা শেষ করবে, জীবনের দীপটা নিভে যাবে, আল্লাহর সামনে দাঁড়াব নতমুখে, তখন আমাদের হয়ে সাক্ষ্য দেবে আমাদেরই তৈরি বালির ঘর, নষ্ট করা সময়।

http://bayyinah.com/podcast/2010/01/19/103-asr-part-1/ 
http://bayyinah.com/podcast/2010/01/19/103-asr-part-2/