Showing posts with label Relationship. Show all posts
Showing posts with label Relationship. Show all posts

Sunday, May 13, 2012

দাম্পত্য - ৮

স্বামী স্ত্রীর মধ্যে সম্পর্কের কোন না কোন সময়ে একটা জটিলতা সামনে আসেই, তা হচ্ছে আর্থিক দ্বন্দ্ব। হয় স্বামী যথেষ্ট খোরপোস দেয়না, অথবা স্ত্রী প্রয়োজন ও বিলাসিতার মধ্যে পার্থক্য বোঝে না, অথবা বাবার বাড়িতে টাকা পাঠানো নিয়ে সমস্যা হয়, অথবা দেনমোহর এখনও কেন দেয়নি - তা নিয়ে অসন্তুষ্টি... টাকাপয়সাজনিত দ্বন্দ্বের উদাহরণ দিয়ে শেষ করা যাবে না। এই বিষয়টার সবচেয়ে কঠিন দিক হচ্ছে, আলোচনাটা খুব দ্রুত উত্তপ্ত রূপ নেয়, এবং এক পর্যায়ে স্বামী/স্ত্রী এমন কোন মন্তব্য করে বসে যে অপরজন প্রায় বাকি জীবন সে দগদগে ঘা বয়ে বেড়ায়। আমার এক বন্ধু খুব সুন্দর একটা কথা বলে, (যদিও আমি তার সাথে একমত না,) সম্পর্ক হচ্ছে একটা ভাস্কর্যের মত, প্রতিটা ঘটনা একটা একটা ছাপ রেখে দেয়, এবং তা ভাস্কর্যটাকে নতুন রূপ দেয়। ওর কথা মত ধরলে আমি বলব, টাকাপয়সাজনিত উত্তপ্ত এই মন্তব্যগুলো হচ্ছে হাতুড়ির এক ঘায়ে নাক মুখ খসিয়ে দেয়ার মত। একবার মেরে ফেললে পরে গড়ে তুলতে অনেক বেগ পেতে হয়। 

এই সমস্যা নিয়ে লেখা খুব কঠিন ব্যাপার, কারণ এত ডালপালা ছড়ানো যে, কাকে দিয়ে কোথা থেকে শুরু করব, সেটা বোঝাই দায়। মোটা দাগে কয়েকটা দিক আলোচনা করি, বাকিগুলো আশা করি একই ছাঁচে ফেলা যাবে। 

১. মাসিক খরচের সাথে বরাদ্দকৃত অর্থের ব্যবধান: যে কোন কারণেই হোক, মাস শেষে আয় ও ব্যয়ের হিসাব মেলেনা। এ অবস্থায় একজন অপরজনকে অতিরিক্ত খরুচেপনা বা অতিরিক্ত কিপ্টেমির জন্য দোষারোপ করতে পারে। 


২. আয়ের উপর একচেটিয়া অধিকার: স্বামী স্ত্রী দু'জনেই চাকুরিজীবি হলে নিজের আয়ের উপর কতটুকু কর্তৃত্ব থাকবে - এটা নিয়েও চলতে পারে মনোমালিন্য। এমন দেখেছি, স্ত্রী এর চাকুরির বিশ ত্রিশ বছর পরেও বেতনের টাকাটা নিজ চোখে দেখার সুযোগ হয়না, স্বামী প্রবর হিসেব মত ব্যাংক থেকে তুলে আনেন, এবং তাঁর বিচার বিবেচনায় খরচ করেন। আবার এমনও দেখেছি, একজনের ব্যাংক ব্যালেন্স অপরজন জানেন না, সংসারের খরচের কতভাগ কে দেবে তা নির্ধারিত হয় আয়ের উপর নির্ভর করে... এ ছাড়া কার টাকা কোথায় খরচ হচ্ছে - এ বিষয়ে জিজ্ঞাসা করার অধিকারটাও অপরজন রাখেন না। 

৩. আত্মীয়স্বজনদের সাহায্য বা দান খয়রাত করার ব্যাপারে উভয়পক্ষের সমর্থন না থাকা: হিংসা হোক, স্বার্থপরতাবশতঃ হোক, ক্ষোভ হোক, যথাযথ হোক - যে কোন কারণেই স্ত্রী বা স্বামী অপরপক্ষের আত্মীয় স্বজনের জন্য যে টুকু অর্থ বরাদ্দ করা হয়েছে তা নিয়ে স্বচ্ছন্দ বোধ করছেন না। 

৪. অনেক আগে শ্বশুরবাড়ি থেকে ধার নেয়া টাকা আর কখনও পরিশোধ করেন নি, বা বিয়ের দেনমোহর এখনও শোধ করেন নি, এবং এ অভিযোগগুলো উঠে আসছে জীবনের বিভিন্ন ঘাত প্রতিঘাতে, কেবলই প্রতারণার অভিযোগ হয়ে। 


বিষয়গুলো লেখার সময় আমি যেন চোখের সামনে অনেক উদাহরণ দেখতে পাচ্ছি, কিন্তু লেখার ভাষায় যখন প্রকাশ করছি, নিজের কাছেই ছোট লাগছে, মনে হচ্ছে, দাম্পত্যের মধ্যে এমন সংকীর্ণতা চিন্তা করাই পাপ। কিন্তু দুঃখজনকভাবে সত্যি, সংসারের প্রথম দিকে না হলেও, কোন না কোন সময় এমন অনেক দুঃখজনক ঘটনাই ঘটে, যা কিনা হৃদয় কে স্তব্ধ করে দেয়, অপরজনের প্রতি সম্মান নামিয়ে দেয় শূন্যের কোঠায়, এর রেশ চলে বছরের পর বছর, প্রকাশ্যে, অপ্রকাশ্যে, শ্লেষাত্মক কথায় বা নির্লিপ্ত উদাসীনতায়। 



সমাধান? আমি আমার ক্ষুদ্র অভিজ্ঞতা থেকে বলার যোগ্যতা তেমন রাখিনা। যখন সমাধান বলতে যাব তা হয়ত জটিলতার তুলনায় হাস্যকরই শোনাবে। তবু লিখছি, কারণ দাম্পত্য সিরিজের পুরোটুকুই নতুন দম্পতিদের জন্য, যারা এখনও এসব সমস্যার তুঙ্গে ওঠেন নি। তবে সচেতন না হলে একদিন যে উঠবেন, তা বলার অপেক্ষা রাখে না। 


বর্তমান সময়ে চাহিদার সাথে সঙ্গতির সামঞ্জস্য রাখা প্রতিটা পরিবারের জন্যই খুব কঠিন। এ জন্য যেটা করা যেতে পারে, স্বামী স্ত্রী একটা সময় করে বসে নিজেদের মাসিক আয় কতটুকু সেটার সাথে সাথে কোন খাতে আয়ের কতটুকু খরচ করবেন এমন একটা বাজেট করতে পারেন। সেখানে মুদি খরচ, কাপড়, বাসা ভাড়া, চিকিৎসা - এমন নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিসগুলোর হিসেব করে, বাকি যে টাকাটা থাকে তার কত পার্সেন্ট উপহার, বিনোদন ইত্যাদিতে খরচ করবেন সেটা দু'জনে মিলে ঠিক করতে পারেন। খুব স্বাভাবিক ভাবেই, এসব বিভিন্ন খাতে দু'জনের চাওয়ার পার্থক্য থাকতে পারে। স্বামী হয়ত চাইছেন আধুনিকতম ইলেক্ট্রনিক্স যন্ত্রটা কিনবেনই, যত টাকাই লাগুক। স্ত্রী হয়ত ভাবছেন, আর যাই হোক, ফেসিয়ালের খরচটা বাদ দেয়ার কোন উপায়ই নেই। সুতরাং, প্রথমবার বাজেট তৈরি করতে গেলে এরকম খুঁটিনাটি প্রায় সবকিছু নিয়েই তাদের দৃষ্টিভঙ্গির পার্থক্যটা স্পষ্ট হবে। এবং মজার ব্যাপার হচ্ছে, কেনাকাটা বা খরচের ব্যাপারে বড়রাও ছেলেমানুষের মতই গোঁ ধরেন। ত, সেক্ষেত্রে উষ্ণ বাক্ বিতন্ডায় না জড়িয়ে অন্যজনকে তখন খুবই ঠান্ডামাথায় বোঝাতে হবে। কথোপকথনটা চাই কি এমনও হতে পারে - 

'বুঝলাম, এই মুহুর্তে একটা এস এল আর না থাকলেই নয়। কিন্তু তুমি চিন্তা কর, আমরা প্রতি মাসে সঞ্চয় করি আয়ের মাত্র বিশ শতাংশ। একটা এসএলআর প্রায় আমাদের পাঁচ মাসের সঞ্চয়ের সমান। আর সঞ্চয়ে তোমার খরচের জন্য বরাদ্দ আছে অর্ধেক, তার মানে, তুমি এখন একটা এস এল আর কিনলে আগামী দশ মাস আর কিছু কিনতে পারছ না। তুমি যদি মনে কর, এস এল আরটা দশ মাসের আর সব কিছুর ছাড়ের সমান, তাহলে কিনতে পার। 


বা স্ত্রীর ক্ষেত্রে কাজিনের বিয়ের দাওয়াত উপলক্ষে পার্লারে তিন হাজার টাকা খরচ করা যদি সত্যিই প্রয়োজনীয় মনে হয়, তিনি স্বচ্ছন্দে করতে পারেন, যদি তাঁর জন্য বরাদ্দ খরচের মধ্যেই থাকে। বরাদ্দের বাইরে গিয়ে করতে হলে কান্নাকাটি বা রাগারাগি নয়, যুক্তিপূর্ণভাবে আয়ের উৎসটা দেখিয়ে তারপরই করতে হবে। 


শুধু বাজেট করেই ক্ষান্ত হওয়া যাবে না, প্রতিমাসের নির্দিষ্ট দিনে বসতে হবে হিসাব নিয়ে, এ মাসে লক্ষ্যের কতটুকু অর্জন করতে পেরেছি। যে খাতে পারিনি, সেখানে আর কী কী পরিবর্তন আনতে হবে। এ পর্যায়ে চলবে আরেক দফা দোষারোপ.. কিন্তু তার পরেও, শেষ পর্যন্ত যে সিদ্ধান্তটা নেয়া হবে, সেটা নিয়ে বাকি মাস আর কোন অভিযোগ থাকবে না। একই ভাবে, তিন চার মাস পর আবারো বিশদভাবে রিভিউ করা যেতে পারে, আদৌ আমাদের বাজেট টা বাস্তবসম্মত ছিল কি না। যদি না হয়, আনা যেতে পারে আরো বড় পরিবর্তন, চাই কি কোন মাসে সব রকমের বিনোদন কাট ছাঁট করে দিলেন, অন্য মাসগুলোর সাথে ব্যালেন্স করার জন্য। এরকম অনেক আইডিয়াই আসবে, যদি প্রতি মাসে নিয়ম করে স্বামী স্ত্রী খরচের বিষয়টা আলাপ করেন। 


আরেকটা বিষয় হচ্ছে, নিজের আয়ের উপর কতটুকু অধিকার থাকবে সেটাও অনেক সময় স্বামী স্ত্রীর মধ্যে স্পষ্ট থাকে না। নতুন দম্পতিদের মধ্যে অনেকে এটাই বুঝে উঠতে পারেন না, জয়েন্ট একাউন্ট না রেখে আলাদা একাউন্ট করতে চাওয়াটা অপরাধের পর্যায়ে পড়ে কি না। আবার 'আমি রোজগার করি, আমি খরচ করি - এখানে তুমি বলার কে?' এমন ভাবভঙ্গিও থাকে অনেকের। আমি বলছি না, এর কোনটাতেই কোন সমস্যা আছে। যদি স্বামী স্ত্রী উভয়েই কোন একটা নির্দিষ্ট সেটিং এ স্বচ্ছন্দ বোধ করেন, তাহলে এখানে বলার কিছু নেই। তবে আমার মনে হয়, সংসারের গোড়ার দিকেই এ বিষয়ে কার দৃষ্টিভঙ্গি কী - সেটা স্পষ্ট জেনে নেওয়া ভাল, তা না হলে অকারণে দুঃখ পেতে হবে। 


শেষ যে ব্যাপারটায় জোর না দিলেই নয় - স্বামীর বা স্ত্রীর উপর নির্ভরশীল অনেক আত্মীয় থাকতে পারেন, বিশেষ করে বাবা মা ভাই বোন - এদের জন্য খরচ করাটা কর্তব্যের মধ্যে পড়ে। কিন্তু এই ন্যায়সঙ্গত কাজটাকেও রীতিমত জুলুমের পর্যায়ে নিয়ে যেতে পারেন অনেকে, যদি আগে থেকেই এখানে সীমারেখা টানা না হয়। কীভাবে এই ভাল কাজটি জুলুম হয়ে যেতে পারে? যদি আপনি এ কাজগুলোতে আপনার জীবনসঙ্গীকে অংশীদার না করেন, তবে একটা সময় তার মনে অভিমান হতে পারে, 'আমি কি এতই খারাপ, যে আমাকে জানিয়ে করলে আমি বাধা দিতাম?' তারপর এই অভিমান থেকেই শুরু হবে মুখ গোমড়া করা, অকারণে কঠোর বাক্য বিনিময় - ইত্যাদি ইত্যাদি। ভাল কাজ মিলে মিশে করার মধ্যে খুব বড় রকমের আনন্দ আছে, এবং তা পরস্পরের প্রতি শ্রদ্ধাও বাড়িয়ে দেয় বহুগুণ। তাই বলি, রোজগার আপনার নিজের হলেও, আত্মীয় আপনার রক্তের সম্পর্কের হলেও, জীবনসঙ্গীর অনুমতি চান, এতে করে সে সম্মানিত বোধ করবে। আর আপত্তি করলে, আপত্তির কারণ জেনে তা নিয়ে কথা বলতে পারেন, বা আপনার কাছে যুক্তিসঙ্গত মনে না হলে পাত্তা না দিতে পারেন, তবু যে আপনি অনুমতি চাইলেন, এটাই অনেক বড় প্রভাব রাখবে আশা করি।


সত্যি বলতে কী, দাম্পত্যের আনন্দগুলোর অনে...ক রকমের রং, রস, রূপ রয়েছে। কেন জানি আমরা অস্বচ্ছলতাকে অজুহাত বানিয়ে এরকম সব আনন্দের অস্তিত্বকেই অস্বীকার করতে চাই। মানি, অর্থ না থাকলে অনেক স্বপ্নই পূরণ হয়না, অভিযোগের ঝুলিটাও ভারি হতে থাকে। কিন্তু সরবরাহ যেখানে সীমিত, ব্যবস্থাপনার ত সেখানেই সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন। সফল ব্যবস্থাপনার প্রথম ধাপ হচ্ছে ম্যাচিউর কমিউনিকেশন। আর্থিক ব্যাপারস্যাপারগুলো নিয়ে বসলেই এ জিনিসটা সবচেয়ে বেশি প্রকট হয়। তাই বলি, এধরণের আলোচনার প্রয়োজনীয়তাটা শুধু টাকাকড়ির মধ্যেই সীমাবদ্ধ না, পরস্পরকে বুঝতেও অনেক বড় ভূমিকা রাখে।

Tuesday, April 24, 2012

একটি গল্প

ইরার দু'টো বন্ধু আছে। একজনের নাম বঙ্কু আরেকটার নাম ছুঁচো। ইরার বয়স যখন পাঁচ, তখন একদিন টেবিলের উপর চকলেটের প্যাকেট দেখে কে যেন বলে ওঠে, 'কী মজা! সব খেয়ে ফেলব! ইয়াম ইয়াম!!' সাথে সাথে আরেকজন বলে, 'না! মামনি বলেছে বেশি চকলেট খেলে দাঁতে পোকা হয়, পেট ব্যথা করে... মামনি না বললে চকলেট খাইনা।' তারপর দু'জন ঝগড়া করতে থাকে। ইরা বড় হতে হতে বুঝে, ওর এক বন্ধু শুধু বকাঝকা করে, তাই ওর নাম দিয়েছে বঙ্কু। আরেকজন চকলেট, ফাস্ট ফুড, কার্টুন - যা পায় তাই খেতে চায়, তাই ওর নাম ছুঁচো। 

ইরা এখন অনেক বড় হয়ে গিয়েছে। পড়াশুনা শেষ করে চাকরি করে। বঙ্কু আর ছুঁচোও বড় হয়েছে ওর সাথে সাথে, কিন্তু ওদের ঝগড়া থামেনি। এই যেমন সেদিন, মতিঝিল থেকে বের হয়ে শাহবাগ এ আসার জন্য রিকশায় ওঠে, রিকশাওলা বলে বসে তাকে চল্লিশ টাকা দিতে হবে। ইরার মাথায় রক্ত চড়ে যায়। ছুঁচো বলতে থাকে, 'ফাইজলামির আর জায়গা পায়না? একটা কষে চড় দেয়া দরকার। দাও ত ইরা, আচ্ছাসে গালি কয়েকটা!!' বঙ্কু বলে, 'না না.. কিছু করার দরকার নাই। সুন্দর করে কথা বল, বল, চল্লিশ টাকা অনেক বেশি, তুমি পঁচিশ টাকা দেবে।' ইরা সেদিন ছুঁচোর কথাই শোনে। অনেক চেঁচামেচি করে রিকশা থেকে নেমে যায়। তবে, মাঝে মধ্যে মনে হয়, সেদিন বঙ্কুর কথা শুনলেই ভাল হত। 

ইরার এখন নতুন সংসার হয়েছে। আরিব বেশ আধুনিক মনের ছেলে। তারা মন খুলে কথা বলতে পারে, ইরার কখনও ভয় করে না, 'আমি এটা বললে ও কী ভাববে', তাই কখনও মনোমালিন্য হলে ইরা জানে, যুক্তি দিয়ে বোঝাতে পারলে আরিব ঠিকই বুঝবে। সেজন্য ঝগড়া হলেও, একটা সময় সেটা কোন সিদ্ধান্তে এসে তবেই থামে। রাগ, অভিমান নিয়ে শীতল যুদ্ধে এসে আটকে যায় না। 

সেদিন অফিসে যাওয়ার জন্য তৈরি হতে হতে ইরা শুনতে পেল আরিব বাসায় কথা বলছে, ফোন রাখার পর আরিব কে একটু চিন্তিত মনে হল। 'কী ব্যাপার? কোন খারাপ খবর নাকি?' 'নাআ.. খারাপ খবর না, একটু সমস্যা।' 'কী সমস্যা?' 'আফিয়ার হাজবেন্ড জমি কিনবে, পার্টনার রা সহ ব্যবসা করার জন্য, আমার থেকে পাঁচ লাখ টাকা ধার চাইছে। পরে কথা বলব, আমি যাই, দেরি হয়ে যাচ্ছে' 

ইরাকে একরাশ এলোমেলো চিন্তার মধ্যে ডুবিয়ে দিয়ে আরিব অফিসের জন্য বের হয়ে গেল। আফিয়া ইরার ননদ, নিজের পছন্দের ছেলেকে বিয়ে করতে চাওয়ায় বাসায় খুব আপত্তি করে, ছেলের আর্থিক অবস্থা ভাল না। আরিবই তখন নিজে দায়িত্ব নিয়ে ওর বিয়ে দেয়। ছেলেটা ভাল, দায়িত্বশীল। কিন্তু এই মুহূর্তে ধার নিয়ে শোধ করার মত অবস্থা ওর নেই। আপাতত টাকা দেয়া মানে দিয়ে দেয়াই। 

এধরণের সমস্যায় বঙ্কু আর ছুঁচো খুব বাচাল হয়ে যায়। আফিয়া তার মাথার ভেতর ছুঁচোর বকবকানি শুনতে শুনতে অফিসে যেতে থাকে। 

'পাঁ..চ লা..খ টাকা! এইটা কোন কথা? ব্যাঙ্কে সাকুল্যে জমেছে সাড়ে চার লাখ টাকা। ওকে দিয়ে দিলে ত আর কিছুই থাকে না। আমাদের নিজেদের ভবিষ্যৎ আছে না? বিপদ আপদ কত কিছু আসতে পারে। আর টাকাটা কি একা আরিবের নাকি? আমরা দুইজন মিলে জমিয়েছি। ওর বোনকে আমার টাকা দিব কেন? না না... এসব হবে না। আরিব কে আমি বাসায় গিয়ে বলব ও নিজেরটা থেকে দিলে দিবে, আমার টাকায় যেন হাত না দেয়। আর এইটা কী? আফিয়ার আক্কেল জ্ঞান নেই? কী বুঝে এরকম আব্দার করে বসে? আমাদের টাকা কি আকাশ থেকে আসে? আর একবার শুরু করলে এর কোন শেষ নাই। চাইতেই থাকবে। যা বলার এখনই ক্লিয়ার করে ফেলা উচিৎ, দেখ বাপু! বাবা মাকে বোঝানোর জন্য যা করা দরকার করেছি। এখন নিজের টা নিজে দেখ। ওসব ধার ফার দিতে পারবনা। আরিবের বেশি খারাপ লাগলে পঞ্চাশ হাজার টাকা সাহায্য হিসেবে দিক, এর বেশি এক পাই পয়সাও না।' 

ইরার মুখে চোখেও বেশ একটা বিরক্তির ছাপ পড়ে। অফিসে পৌঁছে একটা হিসাব ভুল দেখে অধস্তন কর্মচারী কে আচ্ছাসে বকে মেজাজটা একটু শান্ত হয়। 

লাঞ্চ টাইমে নামাজ পড়ে একটু চোখ বন্ধ করে। শুনতে পায় বঙ্কুর কণ্ঠ - 

'ইরা! ইতু কেমন আছে?' 

ইরা জবাব দেয়, হুঁ, ভাল ত। অনার্স শেষ হবে কিছুদিন পর। 

'ইতুর জন্য মায়া লাগে না?' 

হ্যা.... খুব! 

'ওর কোন কষ্ট আসলে ওকে সাপোর্ট দেবে না?' 

দেব না মানে? বুকে করে রাখব। আমার আদরের ছোট্ট বোন টা! 

আফিয়াও ত ছোট্ট বোন, তাই না? 

ঝট্ করে চোখ খুলে গেল ইরার। সকাল থেকে পুরো ঘটনাটা সে রিওয়াইন্ড করে দেখতে থাকল। শুধু আরিবের জায়গায় নিজেকে, আর আফিয়ার জায়গায় ইতুকে বসিয়ে। ঝর ঝর করে চোখ দিয়ে পানি পড়তে থাকল। এসব কী ভাবছিল সে? যদি আরিব কে বলে বসত সব? কী হত? বঙ্কু আবার কথা বলে উঠল, 

কী? দেবে টাকা? 

হ্যাঁ, অবশ্যই। 

তুমি কিন্তু এখনও ইমোশনাল, ইরা! একটু চিন্তা করে দেখ ত, ব্যাঙ্ক খালি করে একজনকে সব টাকা দিয়ে দেয়া কোন ভাল বুদ্ধি কী না! ছুঁচো কিন্তু খারাপ কথা বলে নি, তোমাদের সমস্যা আসলে টাকা কোথায় পাবে? 

তাই ত! তাহলে কি দিব না? 

তুমি চিন্তা করে দেখ। 

বিকেলে ফেরার পথে ইরা খুব করে চিন্তা করল। খুব করে। 

রাতে খাওয়ার টেবিলে আরিব বেশ চুপচাপ। বোঝা যাচ্ছে, ও ও সিদ্ধান্ত নিতে ইতস্ততঃ করছে। বা হয়ত সিদ্ধান্ত নিয়েছে, ইরা কীভাবে নেবে সেই চিন্তা করে বলতে দ্বিধা করছে। ইরাই মুখ খুলল - 

'আফিয়ার ব্যাপারটা চিন্তা করলাম, বুঝছ?' 

'হুম' 

'দেখ, তুমি ওর একমাত্র বড় ভাই। বাবা ত বিয়ের সময়ই মুখ ফিরিয়ে নিয়েছেন, তাই অভিভাবক বলতে এখন তুমিই। তুমি সব দায়িত্ব নিয়ে ওকে বিয়ে দিয়েছ, এই বলে, যে ও এখানে সুখে থাকবে। তুমি সাহায্য না করলে ওর আজকে হয়ত বাবার পছন্দ অনুযায়ী খুব বড়লোকের সাথে বিয়ে হত, হত না?' 

'হুঁ' 

'ত, তোমার বোনকে ত তুমি এই অবস্থায় ছেড়ে যেতে পার না। ওরা যেন দাঁড়িয়ে যায় সেটা নিশ্চিত করা অবশ্যই তোমার উচিৎ।' 

'না, আমার ত ইচ্ছা করেই ওকে হেল্প করতে। কিন্তু আমাদের টাকা কোথায়?' 

'তুমি রিজভীর সাথে কথা বল, দেখ, তিন লাখ এর মত দিলে বাকিটা ম্যানেজ করতে পারবে কি না।' 

'দুপুরেই বলেছি, ও আরও দশ লাখ ব্যাংক থেকে লোন নিচ্ছে' 

'ঠিক আছে, তুমি একাউন্ট থেকে তিন লাখ এর মত দাও, বাকি দুই লাখ আমি ম্যানেজ করে দিব।' 

'তুমি কোত্থেকে ম্যানেজ করবে?' 

'বাহ! আমার বিয়ের গয়না আছে না? আমি গয়না পরি? একটা এখন ছেড়ে দেই, পরে আল্লাহ দিলে অনেক হবে।' 

আরিব কোন কথা না বলে চুপচাপ খেতে থাকে। ওর চোখ ঝাপসা হয়ে আসে, ভাবে আল্লাহ এই মেয়েটিকে বোধহয় খাঁটি হীরে দিয়ে বানিয়েছেন, তাই টাকা, অলংকার - কোন কিছুই ওর গায়ে লাগে না। 

ইরাও চুপচাপ খেতে থাকে, আর মনে মনে বলে, 'বঙ্কু, আমাকে কখনও ছেড়ে যেও না।'

Friday, April 20, 2012

আর্ট অব এপ্রিসিয়েশন - ৪

অপ্রিয় সত্যটাকে অস্বীকার না করেও কীভাবে ভাল দিকগুলো তুলে আনা যায় - সেটা বোঝাতেই এই সত্য/অর্ধসত্য/কাল্পনিক ঘটনাগুলোর অবতারণা 


আজকে নাহিয়ান আর আসাদের গল্প করার দিন। দু'জনেরই বেশ খানিকটা অবসর, তাই গল্পের ডালি খুলে বসেছে দু'জনে। ওদের বিয়ে হয়েছে দুই তিন মাস হল। এখনও অনেক কিছু জানার বাকি, তাই একথা সেকথা থেকে দু'জনেই ফিরে গেল শৈশবে। 

(নাহিয়ান): আমি ছোটবেলা খুব বাবার ভক্ত ছিলাম। বাবা বাইরে যেতে নিলে পা জড়িয়ে ধরে রাখতাম। ঘরে আসলেই আবার বাবার কোলে। 

(আসাদ): আমি ছিলাম প্রচন্ড মায়ের ন্যাওটা। আম্মুর সাথে সাথেই ঘুরতাম, আম্মু ঘরের কাজ করত, আমি তার সাথে বসে থাকতাম। আমার যন্ত্রণায় কাজই করতে পারত না। 

(নাহিয়ান): হ্যা, আম্মুও আদর করত, কিন্তু বাবা সবসময় থাকত না ত, বাসায় আসলে আমার সাথে খেলা করত... তারপর বিকেল বেলা আব্দার করলে শিশুপার্ক, নিউমার্কেট - এসব জায়গায় নিয়ে যেত - খুব মজা! তারপর একবার আব্বু ঢাকায় গিয়েছিল, আসার সময় আমার জন্য ৩-৪ টা পুতুল, গল্পের বই, রং - অনেক কিছু এনে দিয়েছিল। এই জন্য আমার কাছে বাবা মানেই আনন্দ ছিল। 

(আসাদ): শাসন করত না? 

(নাহিয়ান): নাহ্! বড় হওয়ার পরে করেছে, কিন্তু এমনিতে খালি আদরই করত। 

আসাদের মুখটা আস্তে আস্তে কাল হয়ে গেল। ধীরে ধীরে বলল, 'তুমি খুব লাকি, নাহিয়ান! তোমার শৈশব খুব সুন্দর ছিল।' 

- কেন, তোমার ছিল না? 

- আমার সারা জীবনে কোনদিন কোন খেলনা ছিলনা। 

- তো কী হয়েছে? কত বাচ্চারই ত থাকেনা। তোমাদের ত কিছুটা অস্বচ্ছলতা ছিল, খেলনা কেনার মত বিলাসিতাটা হয়ত উনারা করতে পারেন নি। এতে মন খারাপ কর কেন? 

আসাদ মৃদু হাসে, 'তোমার কি মনে হয়, আমি এত অকৃতজ্ঞ যে আমার বাবা মায়ের অক্ষমতা নিয়ে অভিযোগ করব? ব্যাপারটা তা ছিলনা।' 

- তাহলে? 

- আমার বাবা কোনদিন আমাকে বাবার আদর দিয়ে বড় করেন নি। 

- কী বল তুমি? আমার শ্বশুরের মত ভাল মানুষ কয়টা হয়? আমাকেই ত কীরকম আদর করেন!! 

- হ্যা, উনি পৃথিবীর সবার কাছে ভাল মানুষ। কেবল স্ত্রী, সন্তানদের জন্য উনার কোন দায়িত্ব আছে, এটা তিনি মনে করতেন না, এখনও করেন না। খেলনা বল, বেড়ানো বল, কাপড় চোপড় বল.. কোন কিছুই উনার কাছে মনে হতনা যে এটা আমার পরিবারের মানুষদের জন্য দরকার। সামান্য যে ক'টা টাকা আয় করতেন, বাসায় বাজারটা করে দিয়ে বাকি টাকা নিজের ভাই ভাবীর পরিবারে খরচ করতেন। 

- উনাদের হয়ত আরো বেশি দরকার ছিল! 

- মোটেই না, উনারা খুবই স্বচ্ছল, নিজেদের ব্যবসাপাতি আছে। 

- তাহলে? 

- জানি না। একবার আমার মনে পড়ে বাজার থেকে বেশ কিছু খেলনা, বাচ্চাদের জিনিস কিনে আনেন। সব আমার চাচাত ভাই বোনদের জন্য, আমার বয়স তখন সাত। 

- কেন? 

- জানিনা। 

আসাদের মুখের বিমর্ষতা কেটে আস্তে আস্তে ভর করে ক্ষোভ। অস্ফুট স্বরে বলতে থাকে, 'আম্মু চাচাদের বাসায় কত অসম্মান পেয়েছে, আমার বাবা পাত্তাও দেয়নি। বড় হওয়ার আগ পর্যন্ত বাবা আমাদের কাছে কেবলই ভয়ের ব্যাপার ছিল। পড়ার টেবিলে না পেলে মারবেন, এ ছাড়া বাবার সাথে আমার আর কোন শৈশব নেই।' 

বলতে বলতে নাহিয়ানের দিকে তাকিয়ে দেখে ওর চোখে টলটল করছে পানি। 'আরে! এ্যই মেয়ে, কান্না করছ কেন? তোমাকে ত আর কিছু বলাই যাবে না দেখি।' আসাদ মুখোমুখি বসে চোখের পানি মুছিয়ে দিতে থাকে। নাহিয়ান একটু ধাতস্থ হলে আবার কথা শুরু করে - 

- কান্না কর কেন? এটা এমন কী কষ্ট? মানুষ আরো কত কষ্টে থাকে না? কারো ত বাবাই থাকে না! 

- তারপরেও, যার যার স্ট্রাগল তার তার। তুমি যে কষ্ট পাওনি তা ত না। 

- না, কষ্ট পেয়েছি এটা অস্বীকার করব না। কিন্তু দেখ, এতদিন পরে পেছনে তাকিয়ে মনে হয়, আমি আজকে যে মানুষটা হয়েছি, তার জন্য এ ঘটনাগুলোর অবদান আছে। 

- কীরকম? 

- আমি এগুলো পাইনি দেখেই বুঝি বাবা হিসেবে, স্বামী হিসেবে দায়িত্বগুলো পালন করা কত জরুরি। আমার বন্ধুবান্ধবদের অনেকের মধ্যেই বিয়ে মানে একটা ফ্যান্টাসি, একটা মেয়ের সাথে ২৪ ঘন্টা থাকা - এটুকুই। তোমার মনে আছে, তোমার বাবা যখন তোমার হাতটা আমার হাতে তুলে দিল, আমি কী বলেছিলাম? 

- হুঁ, বলেছিলে, 'আপনারা যে বিশ্বাস নিয়ে ওকে আমার হাতে দিলেন, দোয়া করবেন যেন তার সবটুকু মর্যাদা রাখতে পারি।' 

- আমি সত্যিই মনে প্রাণে এটাই বিশ্বাস করি। 

- আমি জানি। 

- তারপর দেখ, তোমরা অনেক নিরাপত্তা পেয়ে বড় হয়েছ। তোমার বাবা ছিল বিপদ আপদ দেখার জন্য, মা তোমাদের মানসিক শক্তি দিয়েছেন, সে তুলনায়, আমরা ভাইবোনেরা অনেক ছোট থেকেই জানি, আমাদের জন্য মাথার উপর কেউ নেই। আমার মা এত সরল, উনি আমাদের সামলাবেন কী, আমাদেরই উনাকে মানসিক শক্তি দিতে হয়েছে। সে জন্য আমরা ভাইবোনেরা, মা - সবাই একটা ইউনিট এর মত ছিলাম। এখনও ত তুমি বল, আমাদের মধ্যে বন্ধনটা অনেক বেশি। 

- হ্যাঁ, তোমরা ভাইবোনেরা যেভাবে একাত্মা হয়ে আছ, এটা এখন আর অত দেখা যায় না। 

- তাছাড়া, তোমাকে ত বললামই, আত্মীয়দের থেকেও অনেক সময় কষ্ট পেয়েছি। তাই বন্ধুবান্ধব, প্রতিবেশী, যেই হাত বাড়িয়ে দিয়েছে, আপন মানুষের মত দেখেছি। 

- হুঁ, তুমি মানুষকে খুব দ্রুত আপন করে নিতে পার। 

- কী করব বল, আমাদের একমাত্র আনন্দ ত ছিল হিউম্যান ইন্টারঅ্যাকশনেই। টিভি নেই, গল্পের বই কেনার টাকা নেই, ঘুরতে যাওয়ার উপায় নেই... আড্ডা দিতাম, ওটাই আনন্দ। 

- হ্যা, আমি নতুন জায়গায় গেলে ভয় লাগে, মানুষের সাথে মিশতে ভয় পাই, তুমি পাওনা, দেখেছি। 

- প্লাস সবসময় মাথায় ছিল ভাল পড়াশুনা না করলে এই অবস্থা থেকে কোনদিন বের হতে পারব না। দাঁতে দাঁত চেপে কেবল পড়াশুনা করেছি। আমার মধ্যে একটা বাধনছেঁড়া ভাব আছে। এখন মনে হয়, পরিবারের এই চাপটা না থাকলে আমি মনে হয় ঠিক থাকতাম না। 

- কী জানি! 

- সবকিছু মিলিয়ে আমার এখন আর কোন দুঃখ নেই, জান! আমার মনে হয় দুঃখের সময়গুলো আমার জন্য ট্রেইনিং পিরিয়ড ছিল। উৎরে যেতে পেরেছি বলেই এখন এখানে আছি এবং তোমাকে পেয়েছি। 

নাহিয়ানের ভেজা গালে খুশি আর লজ্জা মিলে অদ্ভুত এক রং দেখা দিল। আসাদ আরও একবার মেয়েটার সরলতা দেখে অবাক হল।

Tuesday, December 13, 2011

ডমেস্টিক ভায়োলেন্স নিয়ে কিছু কথা

'ডমেস্টিক ভায়োলেন্স' শব্দটার সাথে আমার পরিচয়ই ছিল না। আবছা একটা ধারণা ছিল, যেসব নরপশু স্ত্রীর চোখ উপড়ে প্রথম আলোর প্রথম পাতা দখল করে তারাই ওসব ভায়োলেন্স টায়োলেন্স এর সাথে জড়িত। কিন্তু ভায়োলেন্স এর অসংখ্য দিক আছে, যা আমার জানা ছিলনা। জানতাম না ইমোশনাল ভায়োলেন্স বলে একটা কিছু আছে, যেখানে একপক্ষ সারাক্ষণ ভয়ে কাঁটা হয়ে থাকে অপরপক্ষ 'মাইন্ড' করবে দেখে। তাকে খুশি করার জন্য সে যা বলে তাই মেনে নেয়, আপত্তি করলে অবস্থা আরো খারাপের দিকেই যাবে, তাই যা বলে মুখ বুজে মেনে নেয়। ইমোশনাল অ্যাবিউজ একটা চক্র মেনে চলে। প্রথম ধাপে চাপা টেনশন তৈরি হবে, দ্বিতীয় ধাপে তা বার্স্ট করবে, রাগ, কান্না, দোষারোপ - যেভাবেই হোক - আর তৃতীয় ধাপে অনুশোচনা, ক্ষমা প্রার্থনা - যাকে বলে 'হানিমুন পিরিয়ড', অ্যাবিউজার ভীষণ ভাল ব্যবহার করবে, আদর যত্ন হাসি খুশি - অ্যাবিউজড যখন ভাবতে শুরু করবে, সব ঠিক হয়ে গেছে, তখনই প্রথম ধাপের পুনরাবৃত্তি হবে। 

ইমোশনাল অ্যাবিউজের মধ্যে আছে এক পক্ষের অন্য পক্ষকে পূর্ণ কন্ট্রোলের মধ্যে রাখার চেষ্টা, কার সাথে মিশবে, কোথায় যাবে - সে ব্যাপারে সার্বক্ষণিক নজর (লক্ষ্য করুন, কোথায় কার সাথে মিশছে তা খোঁজ নেয়াতে কোন সমস্যা নেই, অভিভাবক হিসেবে তা করাও উচিৎ, কিন্তু) জানার বাইরে কারো সাথে পরিচয় হলে অস্থির হয়ে যাওয়া, রেগে যাওয়া - এসব অ্যাবিউসিভ কনডাক্ট। এছাড়া মানুষের সামনে অপমানজনক নাম ধরে ডাকবে, সমালোচনা করবে, হাসাহাসি করবে, পরিবারের অন্যদের কাছে তার ভুল নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করবে ও পরিবারের অন্যদেরও নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি আনতে উস্কে দেবে - যাতে করে সেই মানুষটা একই সাথে ঘরে কোনঠাসা মনে করে, ও নিজেকে সবকিছুর জন্য অপরাধী ভাবতে থাকে। 

ইমোশনাল অ্যাবিউজ আর খাঁটি দোষের শাস্তি অনেকটা একই রকম, তাই অ্যাবিউজড হচ্ছে যে, সে ভেবে নেয়, এটা ত আমার ভালর জন্যই করা। কিন্তু অ্যাবিউজিভ রিলেশনে মূল উদ্দেশ্য থাকে ডমিনেট করার ইচ্ছা, আর তাকে জাস্টিফাই করার জন্য অ্যাবিউজার বিভিন্ন সামাজিক ও ধর্মীয় অজুহাত দেখায়। 

ধর্মীয় অজুহাতের কথা যখন আসলোই, তখন স্পিরিচুয়াল অ্যাবিউজ নিয়েও বলি। তুমি 'ভাল মুসলিম' এর মত কাজ করছ না, এই অজুহাতে স্বামী/স্ত্রী বা তার আত্মীয় স্বজন অন্যায় সব দাবি চাপিয়ে দিতে পারে, এমনকি মেয়েদের বেলায় বাবার বাড়ি যাওয়ার উপরেও নিষেধাজ্ঞা দিতে পারে। প্যারেন্ট-চাইল্ড রিলেশনশিপেও অমন দেখা যায়। ছেলে মেয়েকে অন্যদের সামনে স্টুপিড, গাধা ইত্যাদি বলে অ্যাবিউজ করলেও, সন্তানের অবাধ্যতা বা অসন্তোষ দেখলে কুরআনের আয়াত টেনে আনবে, জাহান্নামের শাস্তির ভয় দেখাবে। 

যেহেতু এই বিষয়গুলো খুবই স্পর্শকাতর, বিশেষত আমাদের দেশের প্রেক্ষাপটে, তাই কয়েকটা বিষয় স্পষ্ট করে নেয়া ভাল। 

১. সন্তান বাবা মা কে জান্নাতের দরজা হিসেবে ট্রিট করা উচিৎ, এতে কোন মতভেদ নেই, কিন্তু বাবা মা স্বেচ্ছাচারিতা করার অধিকার রাখেন না। আল্লাহর থেকে প্রত্যেকে নিজ নিজ বিবেক ও সিদ্ধান্ত নেয়ার স্বাধীনতা নিয়ে এসেছে। বাবা মা একটা বয়স পর্যন্ত সেই বিবেক কে মজবুত করবেন, এবং সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষমতাটাকে ঘষে মেজে ধারালো করবেন। এবং অবশ্যই মূল লক্ষ্য থাকবে সে যেন নিজের বিচারবুদ্ধির প্রতি আস্থাশীল হয়। রাসুলুল্লাহ (স) নিজের সন্তানের সাথে কেমন আচরণ করতেন বা কিশোর বয়সী সাহাবীদেরও কতটা মর্যাদা দিয়ে কথা বলতেন তা লক্ষ্য করলেই ইসলামে বড়দের প্রতি ছোটদের অধিকার কী এটা পরিষ্কার হয়ে যাবে। 

২. বৈবাহিক সম্পর্কে ছোটখাট অসন্তোষ এড়িয়ে গিয়ে ঘরে শান্তি রাখার চেষ্টা করা, আর নিজের স্বাধীনতা পুরোপুরি ত্যাগ করা - এ দুটো এক জিনিস না। অনেক ছেলেই আছে মায়ের সব রকমের ইমোশনাল অ্যাবিউজ চুপচাপ মেনে নিয়ে নিজের উপরেও জুলুম করছেন, স্ত্রীর উপরেও করছেন। যেটা অন্যায় সেটাকে উপেক্ষা করতে ইসলাম আমাদের শেখায় নি। আমরা মুসলিমরা একে অপরকে ধৈর্য ধরতে উপদেশ দিতে পারি, ধৈর্য ধরতে বাধ্য করতে পারিনা। সুতরাং এ ধরণের সমস্যাকে অন্তত সমস্যা হিসেবে স্বীকার করতেই হবে। 

অ্যাবিউজিভ রিলেশনশিপের শিকার যারা তাদের ব্যক্তিত্ব গঠন চরমভাবে বাধাগ্রস্ত হয়। বিভিন্ন সামাজিক পরিবেশে তারা স্বচ্ছন্দভাবে অংশগ্রহণ করতে ভয় পায়। সমালোচনার প্রতি অতিরিক্ত নাজুক হয়। আত্মবিশ্বাসে ঘাটতি থাকে, কারণ নিজের সিদ্ধান্ত কে বাধাহীন ভাবে প্রয়োগ করার সুযোগ সে খুব একটা পায়নি, পেলেও গঠনমূলক বা উৎসাহব্যঞ্জক প্রতিক্রিয়া পায়নি। সমাজে খুব একটা মেশার সুযোগ হয়না বলে অ্যাবিউজিভ পরিবেশেই বেশির ভাগ সময় কাটাতে হয় - পরিণতিতে মানসিক এই দৈন্যের ব্যাপারটা বহুগুণে বেড়ে যায়। সবচেয়ে ভয়াবহ ব্যাপার হচ্ছে, যারা ডমেস্টিক ভায়োলেন্স এর মধ্যে বড় হয়েছে, তারা এই পরিবেশে অভ্যস্ত হয়ে ওঠে বলে তারাও নিজের জীবনে অ্যাবিউজার হওয়ার সম্ভাবনা বেশি থাকে। 

এই বিষয়গুলো নিয়ে আমাদের সবার সচেতন হওয়া দরকার। পরে হয়ত কখনো আরো গুছিয়ে এ বিষয়ে লিখব।

Wednesday, November 16, 2011

বদরাগ ও সূরা নাস

'রাগ হলে আমার লজিক্যাল সেন্স হারিয়ে যায়। অদ্ভুত সব কারণ একটার উপর একটা যোগ হতে থাকে। আমি নিজের মধ্যে বুঝতে পারি, আমি রাগ করছি কারণ আমার মধ্যে একটা হেরে যাওয়া অনুভূতি হচ্ছে। আমি নিজের মত করে একটা কিছু ভেবে রেখেছিলাম, কিন্তু বাস্তবে তেমন করে হয়নি। আমি হেরে যাচ্ছি, আমার কথা কেউ পাত্তা দিচ্ছেনা, আমার সুযোগ সুবিধার দিকে কারো খেয়াল নেই... আমার উপর অন্যায় হলে দেখার কেউ নেই..'

উপরের কথাগুলো একটু অদল বদল করে দিলে প্রত্যেকেই নিজের ছায়া খুঁজে পাবেন। রাগ এমন এক জিনিস, তখন কে যে কী থেকে কী হয়ে যায়, কোন ঠিকঠিকানা থাকেনা। রাগ আর মাতাল অবস্থার মধ্যে আমি কোন পার্থক্য দেখি না। যে মাদক নেয়া থামাতে পারে না, তাকে আমরা বলি, ওর নিজের উপর কন্ট্রোল নেই। যে রাগ হলে শান্ত হতে পারেনা, তাকেও আমরা বলি, ওর কন্ট্রোল থাকেনা। আফসোস, মাদকাসক্ত কে আমরা দেখি ঘৃণার চোখে, আর বদরাগ কে দেখি কিঞ্চিৎ প্রশ্রয়ের চোখে।

কেন এভাবে রেগে যাই আমরা? আগের কোন রাগকে ট্র্যাক করতে পারবেন? এখানে রাগ বলতে আমি কিন্তু 'অযৌক্তিক রাগ' বুঝাচ্ছি। নিজের উপর অন্যায় হলে যে রাগ হয়, সে রাগের কথা বলছি। যে রাগ কমানোর জন্য মানুষ মেডিটেশনের দ্বারস্থ হয়, ডাক্তারের কাছে মুখ কাঁচুমাচু করে বলে, 'দেখেন ত ডাক্তার সাহেব, আমার প্রেশারটা কি বেশি দেখে এত রাগ উঠে?', সেই রাগের কথা বলছি। আমার রাগের ৯০%ই তৈরি হয় 'এটা অন্যায়' - এই চিন্তা থেকে। এই যেমন বন্ধুরা সবাই মিলে বেড়াতে যাওয়ার প্ল্যান করছি, এর মাঝে একজন বলা নাই কওয়া নাই শেষ মুহূর্তে পিছু হটল। হয়ে গেলাম রাগ, 'তার কি এইটা উচিৎ হইসে?' বাসায় গুরূত্বপূর্ণ কোন সিদ্ধান্ত আমাকে জিজ্ঞাসা ছাড়াই নিয়ে ফেলল। রাগ, 'আমি কি কেউ না?' গ্রুপে মিলে কোন কাজ করছি, একজন ফাঁকিবাজি করল। হয়ে গেল মেজাজ খারাপ, 'ফাইজলামি পাইসে?' প্রত্যেকবারই হয় 'আমার' কমফোর্ট নষ্ট হয়েছে, নয়ত 'আমার' ইগো হার্ট হয়েছে, অথবা 'আমার' তৈরি করা প্ল্যান অনুযায়ী কাজ হয়নি। প্রত্যেকটাই খুব আত্মকেন্দ্রিক কারণ, কিন্তু আমি যখন রেগে যাচ্ছি, তখন আর স্বার্থপরতার ওই দিকটা আর চোখে পড়ছে না, মনে হচ্ছে, আমি বৃহত্তর স্বার্থে অন্যায়ের প্রতি জিরো টলারেন্স দেখাতে রাগ দেখাচ্ছি। অথচ এই ঘটনাটাই অন্যের বেলায় ঘটলে হয়ত আমি মিষ্টি মিষ্টি হেসে ধৈর্য ধরার উপদেশ দিতাম। এ রকম ডাবল স্ট্যান্ডার্ড, হীন একটা চিন্তাকে মনের ভেতর মহৎ বানিয়ে ফেলছে কে?

সূরা নাস এ আল্লাহ আমাদের শিখিয়েছেন শয়তানের অনিষ্টকর কুমন্ত্রণা থেকে আল্লাহর কাছে আশ্রয় চাইতে (মিন শাররিল ওয়াসওয়াসিল খান্নাস।) শয়তান আমাদের কুমন্ত্রণা দেয় - এটা কি আমরা আসলেই বিশ্বাস করতে পারি? মাঝে মধ্যে পারি, কিন্তু বেশির ভাগ সময়ই আমাদের যুক্তিবাদী মন বিশ্বাস করতে চায়না কোন জ্বীন ভূত এসে কুবুদ্ধি দিচ্ছে, আর সেটার ফল আমাদের কাজে এসে পড়ছে। শয়তানকে নিয়ে কারো সাথে রিয়েলিস্টিক আলোচনা করার চেষ্টা করে দেখুন, হাসতে হাসতে আপনাকে উড়ায় ফেলবে, স্কিজোফ্রেনিক রোগীও বানায় ফেলতে পারে। শয়তানকে নিয়ে আমি প্রায়ই চিন্তাভাবনা করি, তারপরেও, এশার নামাজ একটু দেরি করে ফেললে যখন ভী-ষ-ণ আলসেমি লাগে, ঘুমে মনে হয় পড়েই যাব, আর কষ্ট করে নামাজ পড়ে ফেলার সাথে সাথে ঘুমও পালায় - তখনও আমার মনে হয়না এটা শয়তানের কারসাজি। শয়তান এখনও আমার কাছে সামহোয়াট ইমাজিনারি কিছু। আমার বাসা, ল্যাব, ল্যাপটপ - এরা যেমন খুব বাস্তব, শয়তানকে ততটা বাস্তব ধরতে মনের মধ্যে কেমন কেমন যেন লাগে।

রাগের বেলায় শয়তানের ভূমিকা বলার আগে সূরা নাসের পরের লাইনটা আলোচনা করে নেই। আল্লাযি ইয়ুওয়াসয়িসু ফী সুদুরিন নাস, সেই শয়তান, যে মানুষের বুকের মধ্যে বসে কুমন্ত্রণা দেয়। 'ইয়ুওয়াসয়িসু' হচ্ছে ঘটমান বর্তমান ক্রিয়াপদ। চলতেই থাকবে, চলতেই থাকবে। কোন থামাথামি নেই। শয়তান বুকের মধ্যে বসে থাকবে, একটা ফুট কাটবে, আপনি তাকে ধমক দিয়ে থামাবেন, সে একটু দমে যাবে, তারপর মুখটা বাড়ায় আবার আরেকটা কিছু বলবে.. আবারও, আবার... ! আপনি যখন কোন কারণে অফেন্ডেড, আপনার মনের মধ্যে এমনিতেই কিছু নেগেটিভ চিন্তা আছে অফেন্ডারের প্রতি। এখন শয়তান করবে কি, ওই ভদ্রলোকের/ভদ্রমহিলার সাথে আপনার বিগত জীবনে যা যা খারাপ অভিজ্ঞতা হয়েছে সব ছবির মত সামনে তুলে ধরতে থাকবে। একটা করে ছবি দেখবেন, মেজাজ খারাপ বাড়তে থাকবে। শুধু এই না, ছবির নিচে ক্যাপশনের মত একটা এক্সপ্লানেশন ও থাকবে, ও এইটা করসিল, দেখ, সে তোমার জন্য কক্ষণো কেয়ার করে নাই। সবসময় তুমিই করে গেছ... ইত্যাদি ইত্যাদি। কারো উপর রাগ হওয়ার পর তার ভালমানুষির কথাগুলি কি আপনার কখনো মনে পড়ে? আমি কারো উপর রাগ হয়ে আমার স্বামীর কাছে ঝাল ঝাড়লে সে তার ভাল দিকগুলি মনে করিয়ে দেয়ার চেষ্টা করে, কিন্তু আমার তখন আরো রাগ হয়, 'আমি বলতেসি খারাপ আর তুমি ভাল দিক দেখাচ্ছ! আমার ত এখন নিজেকে আরো বেশি খারাপ মনে হচ্ছে!' কী ভয়ংকর ইগো!

যাই হোক, পার্সোনাল ডিসকমফোর্ট আর শয়তানের ওয়াসওয়াসা - এ দুটোই আমাদের জন্য অনেক, তার উপর আরো আছে পারিপার্শ্বিকতার চাপ। আশেপাশের মানুষের উস্কানিতে ঘটনা আরো খারাপের দিকে গেছে - এ রকম দেখেছেন কখনো? আল্লাহ সূরা নাস এর শেষ লাইনে বলেছেন 'মিনাল জিন্নাতি ওয়ান নাস', খারাপ জ্বীন ও মানুষের কুমন্ত্রণা। ওয়াসওয়াসা শুধু বুকের ধারেকাছে ওঁৎ পেতে থাকা বেহায়া শয়তানটাই দেয়না, তার সাঙ্গোপাঙ্গো যারা অন্যদের ভেতর বসে আছে, তারাও একযোগে বুদ্ধি দিতে থাকে, এটা বল, ওটা মনে করিয়ে দাও। ফলাফল... থাক, নাই বা বলি। রাগ করে মানুষ বাসনকোসন ভাঙে, হাত পা ভাঙে। সম্পর্ক ভাঙে, ভাঙে আল্লাহর উপর বিশ্বাসও। তারপর একটা সময় ফলাফল দেখে কান্নায়ও ভেঙে পড়ে।

ফেসবুকে এক ছোট বোন লিখেছিল, মানুষকে চেনার সবচেয়ে ভাল উপায় হল তাকে রাগিয়ে দেয়া। এমনিতে ফেরেশতা, আর রাগিয়ে দিলে মুখের ভাষা শয়তান টাইপ হয়ে যায়। আমি এই বক্তব্যের সাথে একমত না। রাগিয়ে দিলে মুখের ভাষা শয়তান টাইপ হয়, কারণ সে তখন শয়তান আর মানুষের ওয়াসওয়াসা দ্বারা প্রভাবিত হয়। রাসুলুল্লাহ (স) কখনোই মানুষের রাগের অবস্থা বিচার করতেন না। এমন ভাব করতেন, যেন এমন কোন ঘটনা ঘটেই নি। তিনি বুঝতেন, এটা অন্য যে কোন প্রবৃত্তির মতই মানুষের একটা দুর্বলতা। তাই উনি সবচেয়ে শক্তিশালী বলেছেন সেই ভাই বা বোনকে, যে রাগের সময় নিজেকে সংযত রাখতে পারে।

রাগ হলে কী করতে হবে? বলব না। যে সত্যিকারের আন্তরিক সে খুঁজে বের করে নিক। আমি চাই মানুষ বদরাগ কে মাদকাসক্তির মতই এক সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করুক। বদরাগের কারণে যাদের সম্পর্কে ফাটল ধরেছে তারা বিষয়টার ভয়াবহতা নিয়ে অন্যদের সাথে কথা বলুক, মানুষ যেন আরো সচেতন হয়। Domestic violence এর অনেকটুকুই আসে বদরাগ থেকে। ঠান্ডা, সুস্থ মাথায় ভায়োলেন্স করে যাচ্ছে, এরকম কেস আপনি কমই পাবেন। রাগ নিয়ে চিন্তা করুন। যে বদরাগী, সেও, যে ভুক্তভোগী, সেও। চট করে রেগে যাওয়া, লম্বা সময় রাগ ধরে রাখা - এগুলো পরিবার, সমাজের বড়সর ক্ষতি করে ফেলছে। এখন শুনি রিকশাওয়ালার সাথে ঝগড়া হলেই কষে চড় লাগিয়ে দেয় স্কুল কলেজের ছেলেমেয়েরা। রাগ কি কেবল স্টুডেন্টদেরই আছে? আল্লাহ না করুক, এইসব অন্যায় আর অসম্মানের খেসারত যদি আপনার কোন ভাই/বোনের জীবন/সম্মানের বিনিময়ে দিতে হয়, তখন কি একচেটিয়া রিকশাওয়ালাদের দোষারোপ করে পার পাওয়া যাবে?

লেখাটা শেষ করি আমার খুব প্রিয় একটা হাদীস বলে। রাসুলুল্লাহ (স) এর সামনে এক সাহাবীর সাথে আরেকজনের ঝগড়া হচ্ছিল। সাহাবী নম্রভাবে জবাব দিচ্ছিলেন আর ওইপক্ষ একনাগাড়ে গালিগালাজ করেই যাচ্ছিল। তাই দেখে রাসুলুল্লাহ (স) মুচকি মুচকি হাসছিলেন। একটা সময় আর টিকতে না পেরে সাহাবীও উঁচু গলায় জবাব দিতে থাকল, তখন রাসুলুল্লাহ (স) সে জায়গা থেকে সরে গেলেন। ব্যাপারটা সেই সাহাবী লক্ষ করলেন, উনি এসে রাসুলুল্লাহ (স) এর কাছে জানতে চাইলেন, উনি অসন্তুষ্ট হওয়ার কারণ কী। রাসুলুল্লাহ (স) তখন উনাকে জানালেন, তুমি যখন চুপ ছিলে তখন এক ফেরেশতা তোমার হয়ে জবাব দিচ্ছিল। আর তুমি যখন গলা উঁচু করলে, তখন ফেরেশতার বদলে শয়তান এসে জায়গা করে নিল, আর তোমার হয়ে জবাব দিতে থাকল। তাই দেখে আমি চলে এলাম।

Ref:

http://www.youtube.com/watch?v=TTWn8CSM7Vw
http://www.youtube.com/watch?v=BLMHjWz7X-E
http://www.youtube.com/view_play_list?p=15B78B2B348C0A7D
http://bayyinah.com/podcast/ (sura nas)

Tuesday, October 25, 2011

ভালবাসার অদ্ভুত রূপ

ভালবাসা জন্ম নেয় ভালবাসার মৃত্যু দিনে
ভালবাসা শুদ্ধ হয় ভালবাসার স্পর্শ চিনে

গানের রচয়িতা কী বুঝে এই লাইন ক'টি লিখেছেন তিনিই জানেন। ভালবাসা নিয়ে কীই বা লিখব? আজ প্রায় আড়াই যুগ পার করে দিয়েও ভালবাসার জন্য আকুতি একটুও কমাতে পারিনি। আমার জানা ছিলনা, বয়স বাড়লেও ভালবাসা পাওয়ার মনটা বুড়ো হয় না। ছ' বছর বয়সে যেভাবে একটু আদর বা মনোযোগ পাওয়ার জন্য কাতর হয়ে থাকতাম, এতদিন পরে এসেও আকুতিটা প্রায় একই রকম রয়ে গেছে। আমি কোনদিন বুঝিনি, আমার যেমন করে অভিমান হয়, আমার মায়েরও তেমনি করে ভালবাসার অভাবে অসহায় লাগে। আমার ফোকলা দাদী, রোগে শোকে জীর্ণ নানু - জানি না বুকের ভেতর তাদের কত হাজার অভিমান জমা আছে।

ভালবাসা না পেলে কি সবারই বুকের ভেতরটায় একটা খালি খালি ভাব হয়? কণ্ঠনালীর কাছটায় কেমন যেন কাঁপতে থাকে সারাটাক্ষণ। শক্ত করে বালিশটা বুকের মধ্যে চেপে ধরলে মনে হয়, আরও একটু জোরে চাপ দিলে পাঁজরদুটো কাছাকাছি আসবে তখন ফাঁকা জায়গাটা একটু কমবে। আবার অভিমানে চু...প হয়ে স...ব কিছু থেকে নিজেকে গুটিয়ে নিতে ইচ্ছে হয়, যেন পৃথিবীর সাথে আমার যোগাযোগ এতটুকুই, নিঃশ্বাস নেয়া আর দীর্ঘশ্বাস ছাড়া।

আমার নানুরও বোধহয় এমন লাগে, ছোট বাচ্চাদের সাথে উনার পার্থক্য এটুকুই, তারা ডাক ছেড়ে কাঁদতে পারে, আর উনি কেবলই স্থবির হয়ে থাকেন। হয়ত উনার ইচ্ছে হয়, কেউ উনার চুলে তেল দিযে দেবে, রাতে ঘুম না আসলে গল্প করবে - আমার নানুর স্মৃতির এলবামে নানার কোন ছবি নেই। আমার স্বামী নানাশ্বশুরের গল্প শুনতে চেয়েছিল, উনি বলেছিলেন, 'মানুষটা যে কেমন আছিল - রাগী না সরল সোজা, হাসিখুশি না কী.. আমি ত কিসু কইতে পারতাম না।' আমার নানুর কৈশোর, যৌবন সব কেটেছে ছেলে মেয়ে মানুষ করে আর গেরস্থালি করে। নয়টা বাচ্চার একটা দুষ্টুমি করলে সব ক'টাকে লাগাতার পেটাতেন। অসম্ভব গল্পের বই পড়ার নেশা ছিল উনার। বাচ্চারা ঘুমালে নাকি রাতে কেরোসিনের কুপি জ্বালিয়ে মশারির মধ্যে গল্পের বই পড়তেন। আমাদের বাসায় আসলেও, রান্না আর বই পড়া - এই দেখেছি কেবল উনার।

বাইরে আসার পরে নানুর জন্য যে কত... বার করে মন খারাপ হয়েছে - কীভাবে কীভাবে যেন উনার সাথে আমার মনের একটা মিল পেতাম। শহরে থাকতে ভাল লাগে না - তাই গ্রামে এই বয়সেও একা থাকেন। উনার কাছে কিন্তু বুকের মধ্যে করে নিয়ে ভালবাসা দেয়ার মত কেউ নেই। একা একা না জানি কতবার করে পুরনো দিনের কথা ভাবেন। আর আমি? স্বামীর সাথে আছি, অনেকের জন্য ঈর্ষণীয় অবস্থানে আছি - তারপরেও শীতের রাতে একলা বাস স্ট্যাণ্ডে দাঁড়িয়ে যত দূর পর্যন্ত চোখ যায় - আপন কাউকে দেখিনা। হঠাৎ করে ঘুম ভেঙে যায়, আম্মুর মাথাব্যথা - আমার হাতটা আম্মুর কপালে - এই স্বপ্ন দেখে। আমার ত আম্মু একটাই, নানুর নয় নয়টা সন্তান -- জানিনা, বুকের পাঁজর কতটুকু দোমড়ালে শূন্যতাটুকু আড়াল করা যায়।

দেশের বাইরে বুকের মধ্যে নিয়ে আগলে রাখার কেউ নেই। ভালবাসা না পেয়ে একটা একটা করে যেন কোমলতাগুলো কোথায় হারিয়ে যায়। কণ্ঠস্বরে আবেগের পরিমাণ কমে আসে, নস্টালজিয়া ঢাকতে দেশের ব্যাপারে উপেক্ষা - আর সারাটাক্ষণ চাপা উদ্বেগ, কোন দুঃসংবাদ এল কি? তাই ভাবি, যে বাচ্চাটা বড় হওয়ার আগেই মাকে হারিয়েছে, তার জীবনটা কেমন হয়? যে মেয়েটা খুব খুব শুদ্ধ অনুভূতি দিয়ে কাউকে আপন করার স্বপ্ন দেখেছে - স্বপ্ন ভাঙার পরে তার দিনগুলো কেমন হয়? প্রতারণা, স্বার্থপরতা - পরিবারের আপন মানুষগুলোর থেকে এসব দেখার পর একটা যুবক কোথায় গিয়ে আশ্রয় নেয়? প্রিয় মানুষগুলোর থেকে আমার ত তবু বাধা দূরত্বের, কারো হয়ত সে বাধা বিশ্বাসের, কারো হয়ত জীবন আর মৃত্যুর।

ভালবাসা ছাড়া মানুষ বাঁচে কী করে? ভালবাসা একটা প্রয়োজন, যে কাছের মানুষের কাছে না পায়, সে দূরের মানুষের কাছে খুঁজতে যায়। আর দূরের মানুষও যখন কাছে আসেনা - তখন না জানি কত কত কিছুতে নিস্ফল ভালবাসার আকুতি নিয়ে ঠুকরে মরে।

একটা অদ্ভুত ভালবাসার কথা অনেকেই জানেনা। মনটার মধ্যে যখন কোন খারাপ চিন্তা থাকেনা, কোন উদ্ধতভাব না, কোন দুশ্চিন্তা না - যখন মনের ভেতর থেকে অনেক অনেক গভীর থেকে আলহামদুলিল্লাহ মনে আসে, মাথাটা এলিয়ে দিয়ে চুপ করে সময়টাকে ভালবাসতে ইচ্ছে করে - তখন কেমন যেন অদ্ভুউ..ত এক অনুভূতি হয়। আস্তে আস্তে নিঃশ্বাসটা ভারি হয়ে আসে, মনে হয় একটা ভারি চাদরের মত কিছু একটা আমাকে ঢেকে দিচ্ছে। মনে হয় এই আবরণ আমাকে সব কষ্ট থেকে আড়াল করে রাখবে, কোন কষ্ট নেই, কোন একাকীত্ব না। আমার যাই হারিয়ে যাক, আমি কখনও একা হব না। এই অদ্ভুত ভাললাগাটা আমার চোখ ভিজিয়ে দেয়, আমার গলা ভারি হয়ে আসে .. সারাটা শরীর খুউব হালকা লাগে। আর বুকের ভেতরটা - আমার প্রাণের স্পন্দন আমি টের পাই। উচ্ছ্বল এক ছন্দ। ঝর্ণার শব্দের মত। আমি জানিনা আগের সাথে পরের কী এমন ঘটে যায়, আমি শুধু টের পাই, আমার জীবনটা অনেক সুন্দর। আমার ভালবাসার একটুকু অভাব নেই কোথাও। আল্লাহ আমাকে খুব ভালবাসে। আমি তাঁর কাছে ছোট্ট অবুঝ এক শিশু। আমার জীবনটা এই মাত্র শুরু হল। আমি মাত্র হাঁটতে শিখেছি, পেছনে তাকানোর আমার কিছু নেই। আমি হাঁটব, সামনের দিকে। আমাকে যারা ভালবাসে তারা অনেক প্রত্যাশা নিয়ে হাত বাড়িয়ে আছে, আর একটু পথ সামনে এগোলেই বুকে জড়িয়ে নেবে।

এমনি অদ্ভুত এই ভালবাসার অনুভূতিটা বুঝতে আমার অনেক সময় লেগেছিল, কিন্তু যখন বুঝতে পারলাম, মনে হল, এই অনুভূতির মত সুন্দর কিছু হয়না। এই একটা বোধ নিয়ে জীবন কাটানো যায়। কখনও মনে হবেনা, যে আমাকে ভালবাসার কেউ নেই। খুব কাছের মানুষটার অবহেলায়ও মনে হবে - 'আমার এত এত ভালবাসাকে ও হারিয়ে দিল, আজ আমি পৃথিবীর সবাইকে ভালবেসে জয়ী হব।'

Thursday, October 6, 2011

দাম্পত্য - ৬

পরিবারে একজন পুরুষের সবচেয়ে প্রিয় দুইটি নারী - মা আর স্ত্রীর মধ্যকার বিবাদের অনেকটাই চলে ভালবাসার দাবি তে। নতুন দম্পতিরা সত্যিই বুঝতে পারেন না, একে অপরকে নিয়ে ব্যস্ত থাকতে গিয়ে তারা আর সবার থেকে কতটা আলাদা হয়ে গেছেন। একটা ফ্রেন্ড সার্কেলে দুজন জুটি বেঁধে গেলে অন্যদের কেমন হিংসে হয় এটা একটু কল্পনা করলে বুঝতে পারবেন 'কাছের মানুষটা পর হয়ে গেছে' - এই উপলব্ধি পরিবারের অন্যদের কতটা কষ্ট দেয়।

মানি, নতুন দম্পতির পরস্পরকে জানা ও চেনা প্রয়োজন। কিন্তু তা কি আর সব কিছু থেকে নিজেকে আলাদা করে তারপর? দুটো গাছ একজন আরেকজনের উপর ভর করে বেড়ে উঠবে। তার জন্য কি শেকড়গুলি সব উপড়ে তবেই এক হতে হবে? লতাগুলো হয়ত পরস্পরের বাহুডোরে থেকে কিছুই টের পাবেনা। কিন্তু মাটির কান্না? মাটি সে শূন্যতা ভরবে কী দিয়ে? তিল তিল করে বুক চিরে যে আদরের ফসল এত বড় হয়েছে, তার উপস্থিতি ছাড়া মাটির ত আর কিছুই নেই! সে বাঁচবে কী নিয়ে? আমরা সহজে বলি, বাবা মায়েরা আমাদের যথেষ্ট 'স্পেস' দেয়না। সত্যি কথা কী, স্পেস দেয়ার জন্য মায়ার বাঁধন একটা একটা করে ছিঁড়ে রিক্ত শূন্য হয়ে, তবেই স্পেস তৈরি করা যায়। স্পেস মানে ত খালি জায়গা, তাই না? যে জায়গাটা বাবা মা মনোযোগ দিয়ে যত্ন দিয়ে ঘিরে রেখেছিল, স্পেস দেয়ার জন্য সেখান থেকে তাদের নিজেদের গুটিয়ে নিতে হবে, তাই ত?

গাছের উপমায় আবারো ফিরে আসি। শেকড় আর লতানো বাহু - দুটোর টানই তীব্র। দুটোর জন্যই তার আকর্ষণ অসীম। মমতাময়ী মা যেভাবে খাবার জন্য পীড়াপীড়ি করত, অসুখ হলে অস্থির হত - ওই আনন্দগুলি ত অন্যরকম! অমনি করে ভালবাসা পাওয়ার ইচ্ছে ত কোনদিন মরে না। আর স্ত্রী? তার জন্য একটা পুরুষ জীবন দিতে পারে। তার যা আছে সবকিছু বিনিয়োগ করতে পারে। ভুল হয়ে যায় তখনই, যখন ভালবাসায় অবুঝ হয়ে এই মানুষগুলো তাদের আপন আপন গন্ডি ছেড়ে আরও অনেকটা দখল করে নিতে চায়। তাই পুরুষটিকে হতে হবে খুবই সচেতন। মা যেন কখনও না ভাবে ছেলেটা বদলে গেছে। আগের মত করে সময় দিতে না পারলেও আদুরে গলায় 'মা তোমার ঐ রান্নাটা অনেকদিন খাইনা', বা 'মা আমার মাথায় একটু হাত রাখ' - এ ধরণের কথা বলে ছোট ছেলেটা হয়ে গেলে মায়ের অনেক দুঃখ দূর হয়ে যাবে।

মায়ের বয়স হয়েছে, তিনি চান বউ সংসারের দায়িত্ব নিক, কিন্তু এত যত্নে গড়ে তোলা সিস্টেম একটা আনাড়ি মেয়ের হাতে তুলে দেয়ার আগে তিনি চাইবেন মেয়েটাকে তার সিস্টেমে অভ্যস্ত করিয়ে নিতে। কিন্তু সুপারভাইজিং, ট্রেনিং বেশ কঠিন কাজ। অনেক ধৈর্য আর সহনশীলতা দরকার হয়। বিভিন্ন কারণে গুরুজনেরা এই বয়সে অনেক সময় বুঝতেও পারেন না কোন কথাটায় কতটুকু কষ্ট পেতে পারে ছেলেমেয়েরা। এক প্রজন্ম থেকে অন্য প্রজন্মে সেনসিটিভিটি এর মাত্রা বদলায়। যুক্তি দিয়ে সরাসরি ভুল ধরাটা আমাদের প্রজন্মে কমন, উনারা হয়ত খুবই আহত হন। আবার স্বভাব চরিত্র নিয়ে একটু খোঁচা মেরে কথা বলাটা উনাদের কাছে হয়ত নিছক রসিকতা, আমরা ভীষণ অফেন্ডেড হই।

যাই হোক, নতুন বউয়ের এ ধরণের আচরণে কষ্ট লাগবে। স্বভাবতই সে সবার আগে স্বামীকে খুলে বলবে। স্বামীর দায়িত্ব এখানে রিঅ্যাক্ট না করে পুরোটা শোনা, মা যদি অন্যায় করে থাকে তাহলে অকপটে স্বীকার করা, তারপর মায়ের দোষগুলোর পিছনে ওনার ভাল নিয়ত টুকু দেখানোর চেষ্টা করা, বা বুঝিয়ে বলা যে এটা জেনারেশন গ্যাপ ইত্যাদি। এতে দুটো সুবিধা আছে। স্ত্রী বুঝবে এটা একটা সমস্যা, আর তা সমাধান করার জন্য সে একা নয়, আরেকটি সহানুভূতিশীল মন তার পাশে আছে। মায়ের দোষ ছেলে স্বীকার করলে স্ত্রী তখন ব্যাপারটাকে একটা সমস্যা হিসেবেই দেখবে, অন্যায় হিসেবে না। এতে করে সমস্যার সমাধান না হোক, সমস্যাটা আপনাদের মধ্যকার বন্ধন আরো দৃঢ় করতেই সাহায্য করবে।

আবার এদিকে মা খুবই কষ্ট পাবেন যদি ছেলে এসে তার দোষ ধরিয়ে দেয় বা বউয়ের দোহাই দেয়। আগে থেকে বাবা মা সমালোচনা গ্রহণ করতে অভ্যস্ত না হলে বিয়ের পরে সে চেষ্টা করতে যাবেন না। বরং এভাবে শুরু করতে পারেন, 'কী মা, তোমার বউ নাকি এটা এটা করেছে!' মায়ের প্রতি আপনার আবেগ যেন প্রকাশ পায়, বউয়ের নাম ধরে না বলে 'তোমার বউ' বলার মাধ্যমে তাদের দুজনের সম্পর্কের উপর জোর দিন (নিজেকে আড়াল করে), এটা করেছে - বলার মাধ্যমে হালকা একটা দোষারোপের ভঙ্গি করুন। এতে করে মায়ের মনে 'ছেলে আমার কথা শুনবে না' এই ধরণের ডিফেন্সিভ ভাবটা থাকবেনা। উনি মন খুলে কথা বলতে পারবেন। আপনি আন্তরিকভাবে শুনলেই উনার মনটা অনেক শান্ত হয়ে যাবে। সমস্যা যদি ঘরের কাজ সংক্রান্ত হয় তাহলে কাজটা আপনি শুরু করুন, স্ত্রীকে আগে থেকেই রাজি করিয়ে রাখবেন যাতে সেও জয়েন করে।

বউ শাশুড়ি ঘটিত সমস্যা ত আর হাদীস এ নেই, কিন্তু তার সূত্রপাত যেখানে, ভালবাসা জনিত ঈর্ষা, তার উদাহরণ কিন্তু ঠিকই আছে। আয়িশা (রা) এর ঘরে মেহমানদের জন্য রাসুলুল্লাহ (স) এর অপর স্ত্রী খাবার পাঠিয়েছিলেন। আয়িশা (রা) রাগে খাবার সহ বাটি মাটিতে ফেলে দেন। কী অস্বস্তিকর অবস্থা! রাসুলুল্লাহ (স) করলেন কী, 'তোমাদের মা ঈর্ষায় পড়েছেন' বলে নিজেই ভাঙা টুকরাগুলো মাটি থেকে তুলতে লাগলেন। মেহমানদের সামনে অপমান করা হয়েছে মনে করে রাগ করলেন না, শাস্তি দিলেন না, মেহমানদের কাছে বললেন 'তোমাদের মা'; আবার অপর স্ত্রীর বাটি ভেঙে তার উপর অন্যায় করা হয়েছে, এ জন্য আয়িশা (রা) এর ঘর থেকে একটা বাটি নিয়ে উনাকে ফেরত দিলেন।

কে ঠিক আর কে বেঠিক সে বিচার করতে যাবেন না ভুলেও। দুজনেই অবুঝ, দুজনেই আপনাকে খুব ভালবাসে, দুজনেই চায় আপনার ঘরটাকে সুখ দিয়ে ভরিয়ে তুলতে। আপনার কাজ শান্তিপূর্ণ মধ্যস্থতা করা। শেকড় থেকে জীবনীশক্তি আর সঙ্গী গাছের থেকে দৃঢ়তা পেলে একটি গাছ ফুলে ফলে ছায়ায় কত মানুষের মুখে হাসি ফোটাতে পারবে চিন্তা করে দেখেছেন?

দাম্পত্য - ৫

দম্পতি মানে কী? আভিধানিক অর্থে জায়া আর পতি - সুখী দম্পতি মানে তাহলে একজোড়া সুখী চড়াই চড়ানি - সমীকরণটা যদি এত সহজ হত, তাহলে চারপাশে শুধু সুখেরই বন্যা বইত।

বিয়ের সাথে সাথে অবিচ্ছেদ্যভাবে চলে আসে শ্বশুরবাড়ি, আত্মীয় স্বজন। বিয়ে হলে একটা ছেলেকে বা একটা মেয়েকে একই সাথে অনেকগুলো বন্ধন তৈরি করতে হয়। এদের একেকটার ডাইমেনশন একেক রকম। যেমন শ্বশুর শাশুড়ির চাহিদার সাথে শ্যালক সম্বন্ধীয় আত্মীয়ের চাহিদার মিল নেই। একটা নতুন বউ বা নতুন জামাই, বিয়ের অনুষ্ঠানে যেমন হাসি খুশি, লাজুক একটা ভাব নিয়ে সম্পর্কের বাঁধনে জড়ায়, নানা ধরণের আত্মীয়ের চাহিদা পূরণ করতে গিয়ে তা থেকে একটু সরে আসলেই অনেক সমালোচনার শিকার হতে হয়।

আজকের লেখাটা শুধু ছেলেদের উদ্দেশ্য করে লিখব। আমি জানি, বিয়ের আগে ছেলেরা খুবই ভয় পেয়ে যায় তার সবচেয়ে প্রিয় দু'জন মানুষ, মা আর স্ত্রীর মধ্যকার সম্পর্ক কেমন হবে তাই নিয়ে। অনেক ছেলেই এই অশান্তির ভয়ে বিয়ে করতেও চায়না। তারা বুঝেও উঠতে পারেনা কী এমন হয়ে গেল সকাল থেকে সন্ধ্যার মধ্যে, যে ঘরে পা দিয়েই মায়ের ছলছল চোখ, স্ত্রীর অগ্নিবর্ষণ (অথবা উল্টোটা) দেখতে হচ্ছে। প্রথম প্রথম হয়ত আপনি আসাতে পরিস্থিতি বদলাবে, কিন্তু মনটাকে বদলাবে কে? মায়ের কাছে বউয়ের নামে অসন্তোষ, বউয়ের কাছে মায়ের নামে গঞ্জনা - এসব শুনে শুনে ছেলেটার ত মানুষের উপর থেকে সম্মানটাই উঠে যাওয়ার কথা। প্রথম প্রথম ছেলেটার মন খারাপ থাকে, নিজেকে ব্যর্থ মনে হয়, একটা সময় বুঝতে পারে, উপেক্ষা করাটাই সহজতম পন্থা। দুইজন কে আলাদা আলাদা তাল দিয়ে মন রক্ষা করলেই সুন্দর শান্তি থাকবে ঘরে। আর সব মেয়েলি ব্যাপার নিয়ে ছেলেদের মাথা ঘামাতে নেই। তাদের সমস্যা তারাই সমাধান করুক, এ সময়টা বরং আমি একটু ঘুমিয়ে নেই।

আমি দুঃখিত, সত্যিই দুঃখিত ছেলেদের এই টানাপোড়েন দেখে। শ্যাম রাখি না কুল রাখি - এই করে করে ছেলেটার বেড়ে ওঠাই বন্ধ হয়ে যায়। যে ছেলেটা পরিবার নিয়ে অনেক প্ল্যান করে সুন্দরের পথে এগোনোর দিকে পথ প্রদর্শক হতে পারত, হোম পলিটিক্স এর জটিলতায় পড়ে শেষ পর্যন্ত সংসারে তার ভূমিকা হয় নিরব দর্শকের। হয় তখন আপনার স্ত্রী কে নিয়ে আলাদা হয়ে যেতে হবে, নাহয় স্ত্রীর মুখ কড়া শাসন করে বন্ধ রাখতে হবে, বলতে হবে, মা কে মাথায় করে রাখবা - আমি আমার মায়ের নামে কোন কথা শুনতে চাইনা। তোমার যা লাগে আমি দিব কিন্তু সংসারে আমি কোন অশান্তি চাইনা।

আমি দাবি করছিনা আমি এই হাজার বছরের সমস্যার কোন ইনস্ট্যান্ট সমাধান নিয়ে এসেছি। আমি চাই আপনি আপনার ভূমিকাটাকে একটু যাচাই করুন। একজন সন্তান হিসেবে, একজন স্বামী হিসেবে, একটা পরিবারের প্রধান হিসেবে (শ্বশুরেরা সাধারণত মৌনী ঋষি হন - সময় মত খাবার, গরম পানি আর সংবাদপত্র পেলেই তাদের চলে - তাই ফ্যামিলি ম্যানেজমেন্ট এর হর্তাকর্তা হিসেবে) আপনার কি আরো কিছু করার ছিল? আমি জানি এটা এমন এক সমস্যা যা নিয়ে অফিসের কলিগের সাথে আলাপ করা যায়না। বন্ধুরাও হয়ত ধৈর্য ধরার উপদেশ দিয়েই দায় সারবে। কিন্তু আপনি কি আরো একটু বুদ্ধি খরচ করে আরো একটু বেশি ইফোর্ট দিয়ে পরিবেশটাকে বদলাতে পারতেন? নিদেনপক্ষে আপনার মা ও স্ত্রীর মধ্যে দূরত্বটা একটু ঘুচাতে পারতেন?

প্রথমেই বলি, ছেলেরা ভুল আশা করে যে তার স্ত্রী তার মাকে ঠিক তার মত করেই ভালবাসবে। যদি না পারে, তাহলে দীর্ঘশ্বাস ফেলে, মেয়েরা এত সংকীর্ণমনা কেন? কিন্তু ব্যাপারটা যে অসম্ভব যে কোন মানুষের জন্যই! মায়ের সাথে সম্পর্কটা গড়ে ওঠে অনেক বছরের আদর ভালবাসার উপর ভিত্তি করে। সন্তানের দোষ মায়ের চোখে ধরা পড়ে না, তেমনি বাবা মায়েরও অনেক অন্যায় ছেলে মেয়েরা দেখেও না দেখার ভান করে। অন্য মানুষের জন্য ত এটা করা যায়না। একটা ছেলে কি পারবে তার স্ত্রীর মাকে আপন মায়ের সমান ভালবাসতে? হ্যা, সার্ভিস হয়ত আপন মায়ের সমান দেয়া যায়, কিন্তু দোষ ক্ষমা করার বা উদারতার রেঞ্জটা কিন্তু এখানে কমই হবে, আর এটা খুবই ন্যাচারাল। মানতে কষ্ট হলে নিজেকে দিয়ে একটা এক্সপেরিমেন্ট করে দেখতে পারেন। শ্বশুরবাড়িতে এক মাসের জন্য থেকে আসুন। জামাই হিসেবে না, ছেলে হিসেবে। বাজার করে দিন, বিল দিন, শ্যালিকাকে পড়ান, সংসারের খরচপাতির ব্যবস্থা করুন, শাশুড়িকে ডাক্তারের কাছে নিয়ে যান, তখনই বুঝতে পারবেন অন্য একটা পরিবারে গিয়ে ব্যক্তিত্ব বজায় রেখে দিনের পর দিন সবাইকে খুশি রাখা কত কঠিন।

দ্বিতীয়ত, একজন ভাল মা মানেই একজন ভাল শাশুড়ি না। একজন চমৎকার মানুষ মানেই একজন ভাল বৌমা না। একজন ভাল লেখক যেমন ভাল প্রশাসক না - তেমনি একেকটা সম্পর্কের ডাইমেনশন একেকরকম, দায়িত্বগুলিও ভিন্ন। সেজন্য আপনার ফেরেশতাসম মা শাশুড়ি হিসেবে ব্যর্থ হলে বুক ভেঙে যাওয়ার কোন কারণ নেই। যে মেয়েটা ফুল দেখত, গান গাইত, চিঠি লিখত, বিয়ের পর ঘরে এসে চরম পলিটিক্স শুরু করলে ঘৃণায় মুখ ফিরিয়ে নেয়ার দরকার নেই।

তৃতীয়ত, মা আর স্ত্রী - এদের মধ্যে যে বন্ধন তা আপনাকে কেন্দ্র করেই রচিত। এই সম্পর্ক কোন খাতে বইবে - সেটাও অনেকটা নির্ভর করছে আপনার সাথে তাদের সম্পর্ক কেমন তার উপর। এটা একটা টাগ অব ওয়ারের মত, দুটো নারী তাদের সমস্ত কিছু দিয়ে একটা প্রতিযোগিতায় নেমেছে, পুরস্কার আর কিছু না, আপনার অখন্ড মনোযোগ। বাস্তবিক, আমার মনে হয়, ছেলেটার একটা ক্লোন করে যদি দু'জনের হাতে দুটো ধরিয়ে দেয়া যেত - তাহলে বেশ হত।

চতুর্থ, এরকম সিলি বিষয় নিয়ে এরা এমন করে কেন - এরকম একটা উঁচুদরের চিন্তা করে গা বাঁচিয়ে চলার অবকাশ নেই। সিলি বিষয়গুলি মোটেও সিলি না, কারণ এর কারণে পরিবার নামক দেয়ালটায় বড়সড় ফাটল দেখা দিচ্ছে। আপনি কি শুধু এক কোণে দাঁড়িয়ে দেখবেন, আর মাঝে মধ্যে দুই পক্ষেই হাত লাগাবেন? এর বেশি কি আপনার কিছু করার নেই?

দাম্পত্য - ৪

আমার বিয়ের আগে একটা মাত্র উপদেশ পেয়েছিলাম আমার এক কাজিনের থেকে, সে বলেছিল, যত যাই হোক, তোদের একটা কমন পয়েন্ট অব ইন্টারেস্ট রাখবি। যাতে তোদের শখের জিনিসটা নিয়ে আলোচনা করতে পারিস, দেখবি অনেক ঝড়ের মধ্যেও ওটা তোদের কাছাকাছি রাখবে।

আমি এত ভাল বুঝি নাই। কমন পয়েন্ট অব ইন্টারেস্ট - আমাদের ত আনকমন ইন্টারেস্ট খুঁজে পাওয়াই কষ্ট বেশি। এক সাবজেক্টে পড়াশুনা করেছি, এখনও একই জায়গায় একসাথে পড়ি, কমন না কী? সবই ত কমন। যাই হোক, মূল্যবান উপদেশটার মাথা মুণ্ডু হদিস করতে না পেরে শিকেয় যত্ন করে তুলে রেখেছিলাম। ল্যাব এ জয়েন করার পর আমার সুপারভাইজর কাপলটাকে দেখে খুউব ভাল লাগত। ভদ্রলোক বেশ আলাভোলা সাইন্টিস্ট, ভদ্রমহিলা খুব কেয়ারিং, অর্গানাইজড। আমরা বাসায় এসে বলাবলি করতাম, আমরা ওদের মত কাপল হব, হ্যা? একই ওয়ার্কপ্লেসে কাজ করাটা অনেকটা ঘরের কাজ ভাগাভাগি করে করার মত। পারস্পরিক সমঝোতা তৈরি হওয়ার সুযোগ অনেক বেড়ে যায়। উল্টোটাও হতে পারে, ব্যক্তিত্বের সংঘাত আরো বেড়েও যেতে পারে, কারণ ভুলগুলো আরো বেশি চোখে পড়বে।

কিন্তু ভলান্টারি কাজ একসাথে করার মধ্যে যে আনন্দ তার কোন তুলনা হয়না। এতে ত কোন কিছু পার্থিব লাভ বা ক্ষতি নেই, তাই ভুলচুক হলেও অত গায়ে লাগেনা। আবার কাজটা না করলেও ত সে পারত - এরকম একটা মেন্টালিটি থাকে, তাই ছোট্ট কাজকেও খুব মহৎ লাগে। অন্যের জন্য স্বার্থ ছেড়ে কাজ করার একটা বাই ডিফল্ট ভাল অনুভূতি আছে, সেটা প্রিয় মানুষটার সাথে ভাগাভাগি হলে আনন্দটা বহুগুণ বেড়ে যায়। হয়ত কোনদিন ভাল করে চোখ মেলে দেখেন নি, যে তার ভেতর এত মহত্ত্ব আছে। আর কিছু না, ছোট্ট একটা চ্যারিটিও দুজন মিলে প্ল্যান করে করলে হঠাৎ একটা উপলব্ধি আসে, 'কীসের জন্য তেল নুন চাল ডাল নিয়ে ঝগড়া করছি? আমরা একসাথে ত আছি অ-নে-ক উপরের লেভেলের কাজ করার জন্য।' আমার সত্যিই মনে হয় আল্লাহ এরকম ইফোর্ট দেখলে এত খুশি হন যে নিজ উদ্যোগে তখন ঘরটা শান্তি দিয়ে ভরে দেন। আর ভাল কাজ একসাথে মিলে করলে খুব গর্বও হয়, আমার বউ/ স্বামী আর দশজনের মত না, সে অন্যদের কথা ভাবে, সে স্বার্থপর না।

অনেক দম্পতির নানা কারণে ঘরের বাইরে ভলান্টারি কাজ করার সুযোগ নেই। আসলে বাইরে যাওয়ার দরকারও নেই। সন্তান মানুষ করার কাজটাকে যদি কেউ জাস্ট আল্লাহ কে খুশি করার উদ্দেশ্যে পূর্ণ ইফোর্ট দিয়ে করে, তাহলে এর চেয়ে বড় চ্যারিটি আর হয়না। কিন্তু এই প্যারেন্টিং ইস্যু তে এসে দম্পতিরা সবচেয়ে বেশি ধরা খেয়ে যান। তারা এটাকে ঘাড়ের উপর চেপে বসা একটা বোঝা মনে করেন। যদি ভাবতেন একটা নতুন মানুষের জীবনের ট্র্যাক ঠিক করে দেয়ার জন্য আল্লাহ আমাদের দুজন কে এক করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন, তাহলেই হয়ে যেত। স্বামী স্ত্রী করেন কি, একজন আরেকজনের উপর রাগ উঠলে বাচ্চাদের সামনে বা বাচ্চাদেরই উপর প্রতিশোধ নেন। অথচ হওয়ার কথা ছিল উল্টো। বাচ্চারা শিখে ফেলবে এই ভয়ে রাগ টা কপ করে গিলে ফেলা, কারণ shaping up someone's personality is a far more prestigious task than winning in this psychological tug of war.

নিদেনপক্ষে অন্য মানুষটার শখের বিষয়টাতে আন্তরিকভাবে উৎসাহ দিলেও হয়। এই যে বিখ্যাত লেখকরা প্রায় সময়ই অদৈহিক ভালবাসার সম্পর্কে জড়িয়ে পড়েন, বেশির ভাগ সময় এটার শুরু হয় তাদের যার যার সৃষ্টি নিয়ে উঁচুমানের মত বিনিময় থেকে। জাগতিক বিষয়াদি হয়ত তার স্ত্রী সামলাচ্ছে, কিন্তু ভাবনার জগতে, সৃষ্টির জগতে সে একদম একা। অন্তত 'প্রথম আলো' উপন্যাসে রবীন্দ্রনাথের স্ত্রীর বর্ণনা পড়ে আমার ওরকমই মনে হয়েছে। এক জনপ্রিয় সাহিত্যিক তার স্ত্রী সম্পর্কে লিখেছিল, ওর অনেকগুলো মুগ্ধ করা গুণের মধ্যে একটা হল আমি টুকরো টাকরা কাগজে যাই লিখি ও যত্ন করে একটা বাক্সে গুছিয়ে তুলে রাখে, যদি পরে কাজে লাগে! এক অভিনেত্রী তার স্বামী এক্সিডেন্ট এ মারা যাওয়ার পর দুঃখ করে বলছিলেন, আমার সম্পর্কে কাগজে যত রিপোর্ট আসত সব সে সংগ্রহ করে লেমিনেট করে রাখত।

লেখার শুরুতে যে বলেছিলাম, ম্যাজিক স্পেল বা তালিসমান - আমি নিশ্চিত এটাই সে জিনিস। আপনাদের মধ্যে যত সমস্যাই থাকুক, খুঁজে এমন একটা কাজ বের করুন, যেটা দুজনের কাছেই নিঃস্বার্থ ভাল কাজ মনে হয়। যদি সেটা হয় ধর্মচর্চা বা প্রচার, তাহলে ত কথাই নেই। একসাথে করে দেখুন, সঙ্গের মানুষটার জন্য নতুন করে ভালবাসায় বুকটা ভরে যাবে। মনে হবে, s(he) may not be the perfect person of the world, but s(he) is perfect in my world.

Monday, August 1, 2011

দাম্পত্য - ৩

কমফোর্ট আর স্বস্তি একটা ঘরে সুখের ফোয়ারা বইয়ে দিতে পারে সত্যি, কিন্তু এর বাইরেও দাম্পত্য জীবনে অনেক কিছুই করার আছে। স্বামী স্ত্রী উত্তম বন্ধু রূপে শুধু একে অপরকে নিরাপত্তাই দিয়ে যাবে জীবনভর, এর বাইরে আর কিছু নয় - ব্যাপারটা এমন নয়। আর চাহিদা অনুযায়ী পরিপূর্ণ আরাম না পেলেই যে সংসার উচ্ছন্নে যাবে - তাও না। পুরোপুরি স্বতন্ত্র দু'জন মানুষের আচরণ সব সময়ই পছন্দ মত হবে - এমন ভাবাটা ঠিক না। পদে পদে কমফোর্ট নষ্ট হবে, কমিউনিকেশন এর সব চেষ্টা ব্যর্থ হবে, ক্ষুদ্রতা দেখে বুক ভেঙে যাবে - সম্মানের বদলে জায়গা করে নেবে করুণা - এমন অনেক কিছুই হতে পারে। তখন কি আল্লাহর প্রতিশ্রুত শান্তি সে ঘর থেকে হারিয়ে যাবে? বিয়ের উপর যে এত বার করে গুরূত্ব আরোপ করা হয়েছে, রাসুলুল্লাহ (স) যে বলেছেন, দ্বীন এর অর্ধেক হচ্ছে বিবাহ - তা কি দুটো ব্যক্তিত্বের অসামঞ্জস্যেই ভুল হয়ে যাবে? তা কী করে হয়?

আমার কাছে মনে হয় দাম্পত্যের দ্বিতীয় স্তরের পূর্ণতা আসে যখন স্বামী স্ত্রী সত্যি সত্যি একে অপরকে পূর্ণতা দেয়ার জন্য চেষ্টা করে। যখন একজন অপরজনের দোষত্রুটি গুলি চিহ্নিত করে সেগুলি বদলানোর জন্য কাজ করে। আমি ফাইন্যান্সিয়াল ব্যাপার কিচ্ছু বুঝি না, আমার স্বামী ধৈর্যের সাথে অল্প অল্প করে একটু করে কাজ দিয়ে আমাকে মানুষ করার চেষ্টা করছে। অপর দিকে তার লেখা নিয়ে একটা ভীষণ রিপালশন কাজ করে। আমি চেষ্টা করছি প্রতি সপ্তাহে ছলে বলে কৌশলে যে করেই হোক একটা করে তার কাছ থেকে লেখা আদায় করতে। ও লেখায় সরগর না হলে কি আমার ঘর ভেঙে যাবে? আমার কী দায় পড়েছে ওকে দিয়ে লেখাতে? কিন্তু আমরা ত আগামী অনেকগুলো বছর ইনশাল্লাহ একসাথে থাকব, আল্লাহ ছয়শ কোটি মানুষের মধ্যে থেকে আমাদের দুজন কেই এক সাথে জীবন কাটানোর সুযোগ দিয়েছেন। এর মধ্যে কি আল্লাহর এতটুকু প্ল্যান ছিলনা, যে আমার উইকনেস ও দূর করবে, ওর টা আমি?

একই কথা স্পিরিচুয়ালিটির বেলায়ও। স্পিরিচুয়ালিটি আর স্বামী স্ত্রী নিয়ে ভাবতে গেলে আমার কেবল একটা উদাহরণই মনে আসে। লতানো গাছ দেখেছেন, ঐ যে ছোট ছোট আঁকশির মত বের হয়ে একটা কিছু ধরে বেয়ে ওঠে? এমন দুটো গাছ যেন পরস্পরকে জড়িয়ে ধরে একজন আরেকজনের থেকে সাপোর্ট নিয়ে দ্রুত উপরের দিকে উঠে যাচ্ছে। এই গাছ দুটোর একটা শক্ত দৃঢ় ভিত্তির উপরে দাঁড়ানোও হতে পারে, আরেকটা তার উপর ভর দিয়ে উপরে উঠবে। অর্থাৎ স্বামী স্ত্রীর একজন বেশি প্র্যাক্টিসিং, অপরজন কমও হতে পারে, সেক্ষেত্রে সাপোর্ট দিয়ে দিয়ে টেনে তুলতে হবে। ভেবেই দেখুন না, কী একটা জুটল কপালে - এই ভেবে কপালকে দোষ না দিয়ে এভাবেও ত দেখা যায় - আল্লাহ আপনার স্ট্রেংথ জানেন, আল্লাহ পারফেক্ট কম্প্লিমেন্ট খুঁজে দিয়েছেন আপনার জন্য। এখনকার যে অশান্তি হচ্ছে, তা হচ্ছে এ কারণে যে আপনি আপনার করণীয় সবটুকু করছেন না। আপনার কথা ছিল অনেক বেশি নিজেকে উন্নত করার, আর উদাহরণের মাধ্যমে ধৈর্য ধরে অপরজন কে শেখানোর। আপনি তা না করে আরো ভাল কিছু পেতে পারতেন এই আফসোস এ মাথা কুটে মরছেন।

এমনকি ভাল, আরো ভাল - এই মাপকাঠিটাও ত মানুষের জন্য অসম্পূর্ণ। সে হয়ত বিচার করার সময় একটা স্বভাবের দোষ ধরে ভাগ্যকে ধিক্কার দিচ্ছে। অন্যদিক দিয়ে হয়ত তাদের মধ্যে এত সুন্দর সামঞ্জস্য - যেটা তার কাছে এতই ন্যাচারাল যে টেরও পাচ্ছেনা এর মূল্য কত। আগের লেখায় একটা পাথরের কথা বলেছিলাম না? আপনি হয়ত আপনার সম্পর্কের এবড়ো খেবড়ো অংশটাই শুধু দেখছেন, একটু সময় নিয়ে উল্টে দেখুন, তার অনেক ভালো দিকও চোখে পড়বে। রাসুলুল্লাহ (স) ত বলেছেন, স্ত্রীদের সাথে নরম আচরণ কর, কারণ তার এক আচরণ তোমার অসন্তুষ্টির কারণ হলেও, অন্য আচরণ তোমায় সন্তুষ্ট করবে। স্বামীদের জন্য এটা আরো বেশি সত্যি। কারণ আমরা স্ত্রীরা অভিযোগে মুখর হতে খুবই পারদর্শী।

আমি ঘরের কাজে অপটু, বাইরের কাজে অকর্মণ্য। ভাবনার জগতে ক্রীড়ণক, বাস্তব জীবনে জড়ভরত। আমার অতি প্র্যাক্টিকাল স্বামীর অভাবে আমি অর্ধেক না, এক চতুর্থাংশ হয়ে থাকতাম বোধহয়। কিন্তু আমার যেটুকু অগুণ আছে তাই দিয়ে ঠেলেঠুলে এমন একটা জায়গা করে নিয়েছি যে জানি ওই জায়গার দখল পাকাপাকি ভাবে আমার হয়ে গেছে। গুণ যেখানে কম, চাতুরির সেখানে পুরো ব্যবহার ত করতেই হবে, তাই না? তাই ওর অদক্ষতাগুলোতেই আমার যত জোর। আল্লাহকে ধন্যবাদ ও দেই, অন্তত একটা কিছু যোগ করার মত যোগ্যতা ত আমার আছে। যদি কমফোর্টই সুখের একমাত্র ইয়ে হত, তাহলে আমি ফেল করতাম নির্ঘাত।

এক রাতে প্রচণ্ড গরমে পুরো আড়াই ঘন্টা লোডশেডিং ছিল আমাদের এলাকায়। খুব দেশ দেশ লাগছিল সময়টাকে। আমরা অন্ধকার ঘরে মনের সুখে গপ্পো করেছি অনেকক্ষণ। লোডশেডিং হওয়াতে আমাদের মনে এতই ফুর্তি হয়েছিল, গল্পের ফাঁকে সে নিজে গান বানিয়ে সুর দিচ্ছিল। আমি তখন ওকে বললাম, Thanks to Allah, He joined a composer with a singer, a speaker with a writer, a philanthropist with a pure mind.

দাম্পত্য - ৩

কমফোর্ট আর স্বস্তি একটা ঘরে সুখের ফোয়ারা বইয়ে দিতে পারে সত্যি, কিন্তু এর বাইরেও দাম্পত্য জীবনে অনেক কিছুই করার আছে। স্বামী স্ত্রী উত্তম বন্ধু রূপে শুধু একে অপরকে নিরাপত্তাই দিয়ে যাবে জীবনভর, এর বাইরে আর কিছু নয় - ব্যাপারটা এমন নয়। আর চাহিদা অনুযায়ী পরিপূর্ণ আরাম না পেলেই যে সংসার উচ্ছন্নে যাবে - তাও না। পুরোপুরি স্বতন্ত্র দু'জন মানুষের আচরণ সব সময়ই পছন্দ মত হবে - এমন ভাবাটা ঠিক না। পদে পদে কমফোর্ট নষ্ট হবে, কমিউনিকেশন এর সব চেষ্টা ব্যর্থ হবে, ক্ষুদ্রতা দেখে বুক ভেঙে যাবে - সম্মানের বদলে জায়গা করে নেবে করুণা - এমন অনেক কিছুই হতে পারে। তখন কি আল্লাহর প্রতিশ্রুত শান্তি সে ঘর থেকে হারিয়ে যাবে? বিয়ের উপর যে এত বার করে গুরূত্ব আরোপ করা হয়েছে, রাসুলুল্লাহ (স) যে বলেছেন, দ্বীন এর অর্ধেক হচ্ছে বিবাহ - তা কি দুটো ব্যক্তিত্বের অসামঞ্জস্যেই ভুল হয়ে যাবে? তা কী করে হয়?

আমার কাছে মনে হয় দাম্পত্যের দ্বিতীয় স্তরের পূর্ণতা আসে যখন স্বামী স্ত্রী সত্যি সত্যি একে অপরকে পূর্ণতা দেয়ার জন্য চেষ্টা করে। যখন একজন অপরজনের দোষত্রুটি গুলি চিহ্নিত করে সেগুলি বদলানোর জন্য কাজ করে। আমি ফাইন্যান্সিয়াল ব্যাপার কিচ্ছু বুঝি না, আমার স্বামী ধৈর্যের সাথে অল্প অল্প করে একটু করে কাজ দিয়ে আমাকে মানুষ করার চেষ্টা করছে। অপর দিকে তার লেখা নিয়ে একটা ভীষণ রিপালশন কাজ করে। আমি চেষ্টা করছি প্রতি সপ্তাহে ছলে বলে কৌশলে যে করেই হোক একটা করে তার কাছ থেকে লেখা আদায় করতে। ও লেখায় সরগর না হলে কি আমার ঘর ভেঙে যাবে? আমার কী দায় পড়েছে ওকে দিয়ে লেখাতে? কিন্তু আমরা ত আগামী অনেকগুলো বছর ইনশাল্লাহ একসাথে থাকব, আল্লাহ ছয়শ কোটি মানুষের মধ্যে থেকে আমাদের দুজন কেই এক সাথে জীবন কাটানোর সুযোগ দিয়েছেন। এর মধ্যে কি আল্লাহর এতটুকু প্ল্যান ছিলনা, যে আমার উইকনেস ও দূর করবে, ওর টা আমি?

একই কথা স্পিরিচুয়ালিটির বেলায়ও। স্পিরিচুয়ালিটি আর স্বামী স্ত্রী নিয়ে ভাবতে গেলে আমার কেবল একটা উদাহরণই মনে আসে। লতানো গাছ দেখেছেন, ঐ যে ছোট ছোট আঁকশির মত বের হয়ে একটা কিছু ধরে বেয়ে ওঠে? এমন দুটো গাছ যেন পরস্পরকে জড়িয়ে ধরে একজন আরেকজনের থেকে সাপোর্ট নিয়ে দ্রুত উপরের দিকে উঠে যাচ্ছে। এই গাছ দুটোর একটা শক্ত দৃঢ় ভিত্তির উপরে দাঁড়ানোও হতে পারে, আরেকটা তার উপর ভর দিয়ে উপরে উঠবে। অর্থাৎ স্বামী স্ত্রীর একজন বেশি প্র্যাক্টিসিং, অপরজন কমও হতে পারে, সেক্ষেত্রে সাপোর্ট দিয়ে দিয়ে টেনে তুলতে হবে। ভেবেই দেখুন না, কী একটা জুটল কপালে - এই ভেবে কপালকে দোষ না দিয়ে এভাবেও ত দেখা যায় - আল্লাহ আপনার স্ট্রেংথ জানেন, আল্লাহ পারফেক্ট কম্প্লিমেন্ট খুঁজে দিয়েছেন আপনার জন্য। এখনকার যে অশান্তি হচ্ছে, তা হচ্ছে এ কারণে যে আপনি আপনার করণীয় সবটুকু করছেন না। আপনার কথা ছিল অনেক বেশি নিজেকে উন্নত করার, আর উদাহরণের মাধ্যমে ধৈর্য ধরে অপরজন কে শেখানোর। আপনি তা না করে আরো ভাল কিছু পেতে পারতেন এই আফসোস এ মাথা কুটে মরছেন।

এমনকি ভাল, আরো ভাল - এই মাপকাঠিটাও ত মানুষের জন্য অসম্পূর্ণ। সে হয়ত বিচার করার সময় একটা স্বভাবের দোষ ধরে ভাগ্যকে ধিক্কার দিচ্ছে। অন্যদিক দিয়ে হয়ত তাদের মধ্যে এত সুন্দর সামঞ্জস্য - যেটা তার কাছে এতই ন্যাচারাল যে টেরও পাচ্ছেনা এর মূল্য কত। আগের লেখায় একটা পাথরের কথা বলেছিলাম না? আপনি হয়ত আপনার সম্পর্কের এবড়ো খেবড়ো অংশটাই শুধু দেখছেন, একটু সময় নিয়ে উল্টে দেখুন, তার অনেক ভালো দিকও চোখে পড়বে। রাসুলুল্লাহ (স) ত বলেছেন, স্ত্রীদের সাথে নরম আচরণ কর, কারণ তার এক আচরণ তোমার অসন্তুষ্টির কারণ হলেও, অন্য আচরণ তোমায় সন্তুষ্ট করবে। স্বামীদের জন্য এটা আরো বেশি সত্যি। কারণ আমরা স্ত্রীরা অভিযোগে মুখর হতে খুবই পারদর্শী।

আমি ঘরের কাজে অপটু, বাইরের কাজে অকর্মণ্য। ভাবনার জগতে ক্রীড়ণক, বাস্তব জীবনে জড়ভরত। আমার অতি প্র্যাক্টিকাল স্বামীর অভাবে আমি অর্ধেক না, এক চতুর্থাংশ হয়ে থাকতাম বোধহয়। কিন্তু আমার যেটুকু অগুণ আছে তাই দিয়ে ঠেলেঠুলে এমন একটা জায়গা করে নিয়েছি যে জানি ওই জায়গার দখল পাকাপাকি ভাবে আমার হয়ে গেছে। গুণ যেখানে কম, চাতুরির সেখানে পুরো ব্যবহার ত করতেই হবে, তাই না? তাই ওর অদক্ষতাগুলোতেই আমার যত জোর। আল্লাহকে ধন্যবাদ ও দেই, অন্তত একটা কিছু যোগ করার মত যোগ্যতা ত আমার আছে। যদি কমফোর্টই সুখের একমাত্র ইয়ে হত, তাহলে আমি ফেল করতাম নির্ঘাত।

এক রাতে প্রচণ্ড গরমে পুরো আড়াই ঘন্টা লোডশেডিং ছিল আমাদের এলাকায়। খুব দেশ দেশ লাগছিল সময়টাকে। আমরা অন্ধকার ঘরে মনের সুখে গপ্পো করেছি অনেকক্ষণ। লোডশেডিং হওয়াতে আমাদের মনে এতই ফুর্তি হয়েছিল, গল্পের ফাঁকে সে নিজে গান বানিয়ে সুর দিচ্ছিল। আমি তখন ওকে বললাম, Thanks to Allah, He joined a composer with a singer, a speaker with a writer, a philanthropist with a pure mind.

দাম্পত্য - ২

দাম্পত্য জীবনে হারমনি প্রতিষ্ঠা করা এমন না যে একটা তুড়ি বাজালাম আর হয়ে গেল। ইনফ্যাক্ট প্রতিদিনের কাজকর্মের মুখ্য উদ্দেশ্যই আমাদের হয়ে গেছে হারমনি আনা, যতক্ষণ এক সুরে সুর বাজে, মনে হয় এর বেশি আর কী চাওয়ার আছে জীবনে? কিন্তু মানুষ ত অনেক ভাবেই দুজনে মিলে সুখে থাকতে পারে, তাই না? স্বার্থপরের মত, ভোগবিলাসীর মত, অন্যায়কারীর মত - এদের হারমনিও ত হারমনি। কিন্তু তাতে স্বর্গীয় সুখ কই? ফেরেশতাদের ডানা বিছানো 'সুকুন' কই? আল্লাহ যে বলেছেন অমন পরিবারে তিনি রহমত নাযিল করেন, ফেরেশতারা সে পরিবারের জন্য আল্লাহর কাছে দোয়া করতে থাকেন?

আস্তে আস্তে মনে হল, দাম্পত্য নিয়ে মানুষ তিন স্তরে সন্তুষ্ট থাকতে পারে। এক, একজন আরেকজনের কমফোর্ট হবে। তা শুধু খাবার দাবার, আর অন্যান্য শারীরিক কমফোর্ট ই না। দু'জনের নিজস্ব জগতের অশান্তি শেয়ার করে হালকা হবে, বাইরে অনেক অপমান সহ্য করে ঘরে এসে নিশ্চিন্তে মাথা গুঁজতে পারবে। এমন নিরাপত্তা আর প্রশান্তি পেলে একটা সংসারে আসলে আর কিছু লাগেনা। রাসুলুল্লাহ (স) তাঁর পনের বছরের বড় (এ নিয়ে দ্বিমত চলছে আজকাল) স্ত্রীর কাছে এতটাই নিরাপত্তা, সম্মান আর ভালবাসা পেয়েছিলেন, খাদিজা (রা) মারা যাওয়ার অনেক বছর পরেও তাঁর কথা ভেবে রাসুলুল্লাহ (স) এর চোখে পানি চলে আসত। আসবেই ত। জিবরাইল (আ) কে প্রথমবার দেখে উনি ভয়ে এত উপর থেকে নেমে ঘরের মধ্যে এসে চাদর দিয়ে মুড়িয়ে টুড়িয়ে স্ত্রীকে বলেছিলেন 'আমাকে কি জ্বীন এ ধরেছে?' উনার স্ত্রী কোত্থেকে জানবে উনার কী হয়েছে? উনি কি ফেরেশতা মারফত আগে খবর পেয়েছিলেন? উনি যা জানতেন তা হল, মুহম্মদ (স) কত অসাধারণ মানুষ। এরকম একটা ঘটনার প্রেক্ষিতে উনি রেফারেন্স টানলেন রাসুলুল্লাহ (স) এতিমদের কত যত্ন করেন, কত সত্যবাদী ইত্যাদি ইত্যাদি। এসব কথা এখানে বলা কি খুব প্রাসঙ্গিক ছিল? খাদিজা (রা) যা করেছেন তা হল উনি রাসুলুল্লাহ (স) এর নিজের সম্পর্কে ভয়, শঙ্কা দূর করে দিয়েছেন তাঁর সম্পর্কে অনেক পজিটিভ কথা বলে। আমরা আমাদের পার্টনারের ভঙ্গুর সময়ে কতটুকু ভাল কথা বলি? আর আউট অব কনটেক্সট প্রশংসা? অসম্ভব! আউট অব কনটেক্সট অভিযোগ করা যায়, কিন্তু প্রশংসা? কদ্যপি নহে!

আমার বাসায় হিটার ঠিক করতে এক ইলেক্ট্রিশিয়ান এসেছিল, ভদ্রলোক খুব কথা বলতে পছন্দ করেন, কথায় কথায় বলেছিলেন, তোমাদের মেয়েদের আমি হিংসা করি। you don't know the power of your words. শুধু মুখের কথা দিয়ে you can bring a lion out of a mouse.

খাদিজা (রা) এর মত প্রজ্ঞা যদি সব ছেলেমেয়ের থাকত, শুধু কথা দিয়েই কত শান্তি তৈরি করতে পারত ঘরে। একই ভাবে মন খারাপ হলে তার টেক কেয়ার করা, বাইরে অপমান জনক একটা কিছু ঘটলে ঘরের মানুষটা আরো অনেক বেশি kindness দিয়ে তার মনের জোর ফিরিয়ে আনা - এ বিষয়গুলোতে অনেক বেশি যত্নশীল হওয়ার দরকার আছে। ছেলেরা বোঝে না মেয়েদের কমফোর্ট কেবল ভাল শপিং করতে পারার স্বাধীনতার মধ্যেই না। এপ্রিসিয়েশন একটা ছেলের জন্য যতটা ইন্সপায়ারিং, একটা মেয়ের জন্য তার চেয়েও বেশি। অনেক সময়ই মেয়েটার চিন্তাভাবনা বা বাইরের কাজে ম্যাচিউরিটি ছেলেটার মত হয়না, তখনও বিভিন্ন বিষয়ে পরামর্শ নেয়া মেয়েটার মানসিক শক্তি বাড়াতে অনেক সাহায্য করে। ঘরের কাজে ব্যস্ত থাকায় মেয়েটার বাইরে এক্সপ্লোর করার সুযোগ সমানভাবে হয়না। এর প্রভাব যদি তার চিন্তায়, আচরণে পড়ে, আর তার কারণে স্বামীর থেকে তিরস্কৃত হতে হয়, তাহলে মেয়েটার কী দায় পড়েছে সংসারের ঘানি টানতে? সে ও ত স্মার্ট হওয়ার, আধুনিক হওয়ার জন্য সময় ব্যয় করতে পারে, ঘরে সময় না দিয়ে। এই সব খুঁটিনাটি অনেক কিছুই দুই পক্ষে মনের মধ্যে জমা হয়। তার কিছু কথা বলে, কিছু ক্ষমা করে, আর পুরোটা আল্লাহর থেকে রিটার্ণ পাওয়ার আশায় মন থেকে মুছে ফেলে কমফোর্ট বাড়ানোর চেষ্টা করতে হবে।

ও! কমফোর্ট এর কথা এতবার বলেছি, একটা কথা বলিনি, পুরোনো জামার awesome উদাহরণটা খুব সংক্ষেপে কুরআনে আছে। husband and wife are garments for each other. তাও রোজার নিয়মের দুইটা আয়াতের মাঝখানে দেয়া। নোমান আলি খান এর ব্যাখ্যা করেছেন খুব সুন্দর করে, রোজায় ইফতার, সেহরি, তারাবী, কুরআন পড়া - এসব রুটিনের মধ্যে স্বামী স্ত্রী একে অপরকে যেন কভার করে যাতে দুজনই সমানভাবে স্পিরিচুয়ালি এগোতে পারে। লিংক টা এখানে পাবেন।

http://www.youtube.com/watch?v=t6Cd08mUjvU

Tuesday, July 12, 2011

দুই রকমের আলো

এক নববিবাহিত মেয়ের কথা শুনেছিলাম, একটা ছোট্ট শোপিস গুছিয়ে রাখতে গিয়ে ভেঙে ফেলে সে ভয়ে অস্থির হয়ে যায়, ওর স্বামী ওকে এসে কথা শোনাবে। ওর মা সে সময় সামনে ছিল, মেয়ের এই করুণ অবস্থা দেখে খুব কাঁদছিলেন আর বলছিলেন, এত আদরের মেয়েকে অনেক দেখেশুনে সেরা পাত্র, বড় পরিবারে বিয়ে দিলাম - এই তার পরিণতি? 

আমার খুব কষ্ট লেগেছিল। সত্যিই ত, সুন্দর চেহারা, দামি জামাকাপড়, পার্টি, ক্যারিয়ার - এ জিনিসগুলি ত এনজয় করা যায় যখন মনের সবটুকু স্বাধীনতা থাকে। একটা জিনিসের মূল্য কতটুকু, ফেললই না হয় ভেঙে, তার বদলে ওর নতুন পরিবার কী করল? তার মনোবলটা গুঁড়ো করে দিল। এরকম কত.. মানুষ দেখলাম, ভুল হলে খুব শক্ত কঠিন ভাষায় শাসন করে। আমি চিন্তা করি, এর পেছনে কারণটা কী? তার কি মনে হয় আত্মসম্মানের গোড়া ধরে টান দিলে সে আর কখনো কথার বাইরে যাবেনা, তখন ইচ্ছেমত এক্সপ্লয়েট করা যাবে? দাসপ্রথা যখন চালু ছিল তখন নাকি দাসদের কাপড় ছাড়া জনসম্মুখে যেতে বাধ্য করত, গোসল করতে দিত না - যাতে করে ওর নিজের ওপরে ঘেন্না চলে আসে। দাসদের কোন স্বাধীন ইচ্ছা বা চিন্তা থাকা খুব বিপদজনক। 

আমাদের আধুনিক পরিবারগুলো বুঝে না বুঝে প্রায় একই রকম কাজ করে। শারীরিক আকৃতি নিয়ে মজা করা, কাজে ভুল হলে 'এতদিনে এই শিখেছ..' টাইপ কথা বলা, কোন দায়িত্ব দেয়ার প্রস্তাব উঠলে 'ও পারবেনা' বলে আগেই ডিসমিস করে দেয়া - এসব দেখে মনে হয় এগুলো মানসিক দাসত্বের বেড়ি ছাড়া আর কিছু না। 

আরেকটা কারণ হতে পারে যারা এমন করে তারা নিজেরাও একই ধরণের ব্যবহার পেয়ে এসেছে, আর সময়ের সাথে সাথে কিছুটা অভ্যস্ত ও হয়ে পড়েছে। নতুন একটা মানুষকে এ ব্যবহার যে কষ্ট দিতে পারে, তা তার মাথায়ও আসেনি। কাজ বা কথা বলার আগে তার পরিণতি নিয়ে আরেকটু বেশি চিন্তা করলে এ সমস্যাটা থাকত না। আল্টিমেটলি এই কথাটা বা ব্যবহারটা যার উদ্দেশ্যে করা, তার সাথে ত সম্পর্ক একটু নষ্টই হবে, তাই না? এই সম্পর্ক কর্মকর্তা কর্মচারি হোক, পরিবারের মধ্যে হোক বা যেখানেই হোক। একটু যে খারাপ ব্যবহার করল তার উদ্দেশ্য কি অন্য মানুষটাকে শোধরানো, না নিজের ভেতরের রাগ ঝাড়া? 

অনেক স্মার্ট, আলোকিত মানুষকেই দেখি অন্যের ভুলের ব্যাপারে তাদের মনটা কত কঠোর! একটা ছোট্ট ভুল হলে হেসে উড়িয়েও দেয়া যায়, আবার এর সূত্র ধরে অনেক খোঁটাও দেয়া যায়। কেন যে মানুষ শুধু কর্পোরেট এটিকেটই শেখে, মনুষ্যত্ব শেখেনা - বুঝিনা। মনটা অহংকারের বদলে দয়া আর ক্ষমা দিয়ে ভরে দিলে কী হয়? কথা শুনিয়ে মানুষকে আরো বেশি সতর্ক করা যায়, যত্নবান ত করা যায় না। কত বাবা মা ছেলে মেয়ের অবাধ্যতা দেখলে যাচ্ছেতাই গালাগালি করেন, একবার কি চিন্তা করেন, এর এক পার্সেন্টও যদি বুড়ো বয়সে উনাদের কাছে ফিরে আসে তখন কেমন হবে? 

মন নরম করার কোন বিকল্প নাই। যে কোন কাজের বা রিলেশনের লং টার্ম বেনিফিট পেতে হলে শক্ত কথা, বিরক্তি - এসব বাদ দিতে হবে। সহানুভূতির সর্বোচ্চ লেভেল এ যেতে হবে। অন্য মানুষটা যেন আপনার কথা ভাবলে আপনার আদর, কেয়ারের কথাই ভাবে - এ ব্যাপারে খুব যত্নবান হতে হবে। তা না হলে এইসব শাসন কতটুকু পরিবর্তন আনে জানি না, ঘৃণা আনে অনেক, এটুকু জানি। 

ভাবতে খুব অবাক লাগে, প্র্যাক্টিক্যাল প্রবলেম এ পড়ে ঠেকে ঠেকে যে সিদ্ধান্তগুলিতে পৌছাই, হাদীস বই খুলে ওগুলোই দেখি সবার আগে লেখা। অন্তরের কাঠিন্য নিয়ে বিলাল ফিলিপস এর এক লেকচারের বাংলা অনুবাদ পেলাম, ওটা পড়তে পড়তে খেয়াল হল, এত এত ফ্যামিলি প্রবলেমের মূল কারণ ত এই কঠিন মন। কেউ কারো দোষ মাফ করেনা, নিজের আরাম কে স্যাক্রিফাই করেনা, যুক্তিতে ঠিক থাকলে বলে ফেলতে দুইবার চিন্তা করেনা। এগুলি কঠিন মন ছাড়া আর কী? মানুষের আত্মসম্মান কেন এত ঠুনকো হয়ে গেছে, যে অন্যকে ছোট না করে নিজেকে বড় ভাবতে পারেনা? একটু সুবিধা কম হয়ে গেলে তার প্রতিশোধ নিতে ছাড়েনা? আত্মসম্মানের স্ট্যান্ডার্ড টা যে একজন আরেকজনকে দেখে ঠিক করে, এ কারণেই বোধহয় এরকম। শাশুড়ি বউ কে ছোট করে প্রমাণ করতে চায় সংসার চালাতে কে বেশি পারদর্শী। নতুন বউ ঘরে এসেই শাশুড়ির সব বাতিল করে দিতে চায় দেখানোর জন্য যে সে আরো বেশি কোয়ালিফাইড। সম্পর্কের শুরুতে ইনটেনশন এমন না থাকলেও আস্তে আস্তে একটা প্রতিযোগিতা শুরু হয়েই যায় - নিজেকে প্রমাণ করার। এই লড়াই থেকে একজন বের হয়ে আসতে চাইলে যে পরিমাণ হেরে আসতে হয়, সেটা কভার করার মত মনের জোর ত তাকে কেউ দেয়না। তখন আশপাশ থেকে অন্য ভাল কাজ করে মনের জোর জোগাড় করতে হয়। এই ভয়ংকর যুদ্ধের মধ্যে পড়ে কত মন বিকলাঙ্গ হয়ে যাচ্ছে সে খোঁজ কে রাখে? 

আল্লাহ, তুমি আমাদের সবাইকে মাফ কর। তোমার দেখান পথ বেস্ট জেনেও আমরা নিজেরা নিজেদের মত করে পথ খুঁজতে যাই। যারা তোমার পথের সন্ধান পেয়েছে তারা শুধু নিজের আলোটুকু বাঁচাতেই সারা জীবন ব্যস্ত থেকেছে। পথের পাশে এসে একটু দাঁড়ায়নি আমাদের আলোকিত করার জন্য। তুমি আমাদের মাফ কর আল্লাহ, তোমার আলোর মূল্যটাই উপলব্ধি করার মত বোধ আমাদের এখনো আসেনি। 

রেফারেন্স: http://sonarbangladesh.com/blog/uknews/47158

Saturday, July 2, 2011

শিরোনামের প্রয়োজন নেই (শেষ)

প্রতীতির পড়ার ঘর। স্নিগ্ধার ঘরের চেয়ে কম অগোছালো না। জানে, মা এসে চিৎকার জুড়ে দেবে, কিন্তু মাকে ঠান্ডা করার উপায় ওর জানা আছে। এই যে মা ঢুকল, মুখ নরমাল, এ..ই যে খাটের দিকে তাকাল, মুখের এক্সপ্রেশন চেঞ্জ... অ্যাকশন!

'মা! থ্যাংকিউ! তোমার চায়ের গল্পটা খুব কাজে দিয়েছে।' মার চোখ ঘুরে গেল মেয়ের দিকে, চোখে উৎসাহ, তাই? বলেছিস? 'হ্যা মা! দাড়ি কমা সহ।' পাপিয়া স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললেন, যাক, তোর বাবার অকাজের তাহলে ভাল দিক ও আছে। কী বলল স্নিগ্ধা? 'তেমন কিছু বলেনি মা, তবে চোখে আগ্রহ দেখলাম' তুই ত ওকে আস্তে আস্তে কুরআন পড়ার কথা বলতে পারিস। এবার বিরক্ত হল প্রতীতি, 'মা! আমার কাজ কি ওকে কুরআন পাতার পর পাতা বসে পড়ানো, না কুরআনের সাথে পরিচয় করিয়ে দেয়া? ওর সমস্যার সমাধান খুঁজে পেলে ও নিজে থেকেই আগ্রহ নিয়ে পড়বে। আমার পড়াতে হবেনা।' একটু দমে যান পাপিয়া, তবে মেয়েকে বুঝতে দেন না। 'তা অবশ্য ঠিক বলেছিস, তুই তাহলে ওর সাথে গল্পের মত করেই বলিস।'

- বাবা কই মা?
- রুমে, খেয়ে দেয়ে পেপার পড়তে পড়তে পা দুলাচ্ছে।
- আজকে ঘরের কাজ করেছে কোন?
- হুম, বাটিগুলি টেবিল থেকে সরিয়ে রান্নাঘরে নিয়ে গেছে।
- ইস মা, কবে যে বাবা মানুষ হবে! তোমার খুব কষ্ট হয়ে যাচ্ছে। অফিস করে রান্না বান্না, ঘর গুছানো..
- নাহ! কষ্ট হলে ত বুয়াই রেখে দিতাম। তুই ত জানিস, আমি বুয়া বিদায় করেছি, শুধুমাত্র যাতে কাজের ছুতায় আমাদের সবার আরো বেশি কথাবার্তা হয় - এই জন্য। এই যে কাজের অজুহাতে যখন তখন তোদের টিভি, কম্পিউটার থেকে উঠাতে পারি.. এইটাই বা কম কী? আর সবই ত সওয়াব, না রে? আর তোর বাবা এখন পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ রেগুলারলি পড়ছে, এর চেয়ে বেশি আর কী চাই বল?
- হুম....
- যাকগে! তুই ঘুমা। বিছানার জঞ্জাল পরিষ্কার করে ঘুমাবি। সকাল বেলা আমি যেন এগুলি না দেখি!

প্রতীতি একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে, এত প্ল্যান, কোন কাজেই লাগলনা। ঘরের কাজে মাকে ফাঁকি দেয়া ভারি কঠিন।

অন্য রুম -

- কী, মেয়ের সাথে আবার কী নতুন প্ল্যান আঁটলে?
- মেয়ে খুব চিন্তায় আছে স্নিগ্ধাকে নিয়ে।
- স্নিগ্ধা? ও! পাশের বাসার মেয়েটা? ওর সাথে এখনো যোগাযোগ রাখছে?
- হ্যা, ক্লাশ, ঘরের কাজ সব কিছুর মধ্যেও ঠিকই সময় বের করে ওকে নিয়ে বের হয়।
- ভাল ভাল। এই বয়সটাতে মানুষকে সাহায্য করার অভ্যাসটা করালে আখেরে ভাল হবে।
- হ্যাঁ, মেয়ে ত মাঝে মধ্যে হতাশ হয়ে ফিরে, বলে স্নিগ্ধাকে দেখলে মনে হয় ড্রাকুলা সব রক্ত চুষে নিয়ে গেছে। কথা বলেনা, কোন ব্যাপারে ওপিনিয়ন দেয়না... কোথাও গেলে একশবার মানুষের মুখের দিকে তাকায় কে ওকে দেখছে..
- লেগে থাকতে বল। ওর নিজের জীবনেও এরকম কত হতাশা আসবে, তখন এই মেয়েকে কীভাবে ঠিক করেছিল মনে পড়লে শক্তি পাবে।
- দেখতে দেখতে বড়ই হয়ে গেল, না? আর ক'দিন পর পরের ঘরে চলে যাবে।
- পরের ঘর বলছ কেন? বল মেয়ের নিজের ঘর হবে। আর তোমার মেয়ে কি যেমন তেমন? যে ঘরে যাবে ঘর আলো করে রাখবে।
- হুঁহ! ঘরের কাজ দেখলে ত মনে হয়না আমার মেয়ে। তখন পুরোই তোমার মেয়ে।
- আচ্ছা আচ্ছা ঠিক আছে। কালকে বাটি ধুয়ে রাখব যাও। (পুনরায় পেপারে মনোনিবেশ)


এ গল্পটার এখানেই ইতি। প্রতীতি স্নিগ্ধাকে কতটুকু বদলাতে পারল সেটা অনেক কিছুর উপর নির্ভর করে। প্রতীতির লেগে থাকার উদ্যম, প্রতীতির বাবা মায়ের উৎসাহ, প্রতীতির বলতে পারার ক্ষমতা.. স্নিগ্ধার গ্রহণ করার ক্ষমতা, সর্বোপরি আল্লাহর পক্ষ থেকে গাইডেন্স - এর সবকিছুর সঠিক সমন্বয়ে গল্পটি খুব সুন্দর পরিণতি নিতে পারে। আবার প্রতীতি হাল ছেড়ে দিলে স্নিগ্ধা নিজ তাগিদেও ঘুরে দাঁড়াতে পারে, জীবনের প্রয়োজনে নিজেই খুঁজে বের করতে পারে সর্বোত্তম জীবন ব্যবস্থা, সরলতম পন্থা। এই গল্পের মূল চরিত্র স্নিগ্ধা নয়, প্রতীতিও নয়। প্রতীতির বাবা মা, তাদের দূরদর্শিতা, তাদের আত্মত্যাগ। আসুন আমরা অঙ্গিকার করি আমাদের সন্তানকে তাদের অধিকার থেকে একটুকু বিচ্যুত করবনা। সন্তানের ভবিষ্যৎকে আমাদের নিজেদের স্বার্থের জন্য সস্তাদরে বিকিয়ে দেবনা।

শিরোনামের প্রয়োজন নেই - ৩

লিফটে পাশের ফ্ল্যাটের এক বড় আপুর সাথে স্নিগ্ধার প্রায়ই দেখা হয়। আপুটা একটু কেমন জানি। হুট করে একদিন ডেকে বলে, এই, আমি ফুচকা খেতে যাচ্ছি, যাবে আমার সাথে? এই সামনেই। কি মনে করে জানি রাজি হয়ে যায়। ফুটপাথের ওপর বিছানো টিনের বেঞ্চে বসে আপন মনে বকবক করতেই থাকে মেয়েটা, কথার মাঝখানেই বলে, আমার এত বড় নাম 'প্রতীতি' বলে ডাকার দরকার নাই। আর আমি ত মোটে দুই বছরের বড়, দুই বছর পর ত তুমি আমার সমানই হয়ে যাবে, তুমি বরং আমাকে পৃতিপু বলে ডেক। আর আপনি ফাপনি বলার দরকার নাই। আমি মোটে ইউনিভার্সিটিতে ভর্তি হলাম। আমাকে কেউ আপনি বলেনা। ওর কথার ধরণ শুনে স্নিগ্ধার খুব হাসি পায়, ওকে দেখে যেন মনে হয় পৃথিবীর কোন কিছু নিয়েই পৃতিপুর কোন টেনশন নেই। একটু মনোযোগ দিয়ে শোনার চেষ্টা করে আপু কী বলছে, এই দেখ, এই যে কৃষ্ণচূড়া গাছগুলি না, এর ফুলগুলির পাপড়ি গুলি কিন্তু চারটা হুবহু একরকম, একটা অন্যরকম, বড়, হলুদ। কুঁড়ি থাকতে আমি একবার পাপড়ি খুলে দেখেছিলাম, বড়টা বাকি চারটাকে ঢেকে রাখে। একবার একটা বিড়ালকেও দেখি চারটা বাচ্চাকে জড়ায় গোল করে ঘুমাচ্ছে। স্নিগ্ধার কানে অর্ধেক কথা ঢোকে, বাকিটা সময় সে আপুকে ভাল করে লক্ষ্য করে। উনার কি একেবারেই চিন্তা নেই মানুষজন কীভাবে তাকাচ্ছে, বা এরকম পোশাকে তাকে কেমন দেখাচ্ছে? আপুকে সে সবসময় এরকমই দেখে আসছে। বলি বলি করে বলেই ফেলল, পৃতিপু, তুমি ফ্রেন্ডদের সাথে বের হওনা? হবনা কেন? এইমাত্র এক ফ্রেন্ডের দাওয়াত থেকে আসলাম, বুঝলি, ব্যাটন রুজে মনে হয় ড্রেস কোড আছে, আমাকে যে কী লাগতেসিল, হি হি... সম্বোধনটা তুই এ নেমে এসেছে খেয়াল করলেও খুব স্বাভাবিকই লাগে স্নিগ্ধার। হঠাৎ করে ওর মনটা ভাল হয়ে যায়।

এরপর থেকে দুই সপ্তাহ পরপরই পৃতিপু একবার স্নিগ্ধার খোঁজে বাসায় হানা দিয়ে যায়। পড়ায় ব্যস্ত, জোর করে টেনে হিঁচড়ে বইয়ের দোকানে নিয়ে যাবে, নাহয় টংএর দোকানে বসে চা খাবে, সবসময় স্নিগ্ধার যেতেও ইচ্ছা করেনা, যেতে না চাইলে ও খুব শীতল হয়ে যায়, এই পদ্ধতি সে অনেকবার বাবা মায়ের উপর প্রয়োগ করেছে। কিন্তু প্রতীতি যেন কোন কিছুই গায়ে মাখবেনা। ওঠ, ওঠ... তোর কী পড়া, দে আমি বুঝিয়ে দেই। এক ঘন্টার জন্য চল, এক ঘন্টার মধ্যে ফেরত আসব, প্রমিজ। রুম থেকে তাকে বের করবেই। মনটা যখন ভয়ানক খারাপ থাকে স্নিগ্ধা প্রায় পুরোটা সময় মৃত মানুষের মত হয়ে থাকে, কিন্তু প্রতীতি বকবক করেই যায়।

একদিন প্রতীতি ওকে বলে, জানিস, আব্বু আজকে চা ভাল হয় নাই দেখে ছুড়ে কাপ ভেঙে ফেলসে, আমাদের ত বুয়া নাই, আম্মু অফিস থেকে এসে রেস্ট ও নিতে পারে নাই, তাড়াহুড়ায় চা বানায় দিসে.. স্নিগ্ধার চকিতে এমন অনেক ঘটনাই মনে পড়ে যায়। ও চুপ করে থাকে। প্রতীতি আবার বলে, আব্বুর জন্য খুব মায়া লাগসে আমার। স্নিগ্ধা অবাক হয়ে যায়, 'আব্বুর জন্য? কেন?' ত লাগবে না? এত বড় মানুষটা কীরকম দুর্বল.. 'দুর্বল? মানে কী?' প্রতীতি তখন বোঝায়, দ্যাখ, আম্মু কী না করে আমাদের সবার জন্য, আব্বু এই যে রাগ দেখাল, আম্মুর এখন মনে হবে না, এত কষ্টের মূল্যায়ন এই? তখন তার মনটা খারাপ হবে না? এর চেয়ে যদি রাগটা কে কন্ট্রোল করত, আর বলত, তুমি পাতিলটা ধুয়ে দাও, আমি আরেকবার চা বসাই, আজকে ভাল চা খেতে ইচ্ছা করছে, আম্মু সুন্দর হাসিমুখে আবার চা বানায় দিত। যে মানুষ ফল ভাল হবে জেনেও দুই মিনিটের জন্য নিজেকে কন্ট্রোল করতে পারেনা তাকে দুর্বল বলব না ত কী? স্নিগ্ধা খুব মজা পেল শুনে। তাই ত! ওর বাবার রাগের মাথায় চেঁচামেচি দেখে তাহলে ভয় পাওয়ার কিছু নেই, করুণা করা উচিৎ? এভাবে দেখলে কিন্তু আবার কেমন জানি বিতৃষ্ণা ব্যাপারটাও আসেনা।

কিন্তু আম্মু? স্নিগ্ধা সন্তর্পণে জানতে চায়, আন্টি খুব আপসেট, তাই না? আংকেল শুধু শুধু এমন করল? প্রতীতি হেসে বলে, 'না রে, আমার আম্মু মানুষটা অনেক সেনসিটিভ হলেও আব্বুর সাথে কখনও ইয়ে হয়না। স্নিগ্ধা হতবাক। মানে? কেন? কারণ আম্মু সবসময় বলে সংসারে মেয়েদের ক্ষমতা কতখানি এটা মেয়েরা বোঝেনা। একটা ছেলে ঘরে কমফোর্ট আর একটু সুপেরিয়রিটি ছাড়া কিন্তু আর কিছু চায়না। তুই যদি আপাতদৃষ্টিতে একটু ঝাড়ি বা রাগ হজম করিস, আর একটু যত্ন করিস, তোকে মাথায় তুলে রাখবে। তুই বছরের পর বছর ঝগড়া করেও যেটা আদায় করতে পারবিনা, রাগ হজম করলে অনেক সহজে পেরে যাবি। কারণ হঠাৎ অযৌক্তিক রাগ করে ফেলার পর একটা অপরাধবোধ হয়, তাইনা? তখন যদি পার্টনারের কাছে ডিফেন্ড করতে না হয়, উল্টো আরো কেয়ার পায়, তখন আপনি মনটা অনেক ঝুঁকে যাবে। চাই কি প্রায়শ্চিত্ত করতে একটু বাড়তি খাতিরও করতে পারে কয়েক দিন।

স্নিগ্ধার তাও ভাল লাগলনা। বলল, তা না হয় বুঝলাম, কিন্তু তাই বলে আংকেল এরকম যখন ইচ্ছা করবে, আর আন্টি সহ্য করবে? প্রতীতি বলে, নাহ! বললাম না, আম্মু অনেক সেনসিটিভ। আমি শিওর তিন চার দিন পর আব্বু কে চা দেয়ার সময় আম্মু আমাকে বলবে, 'এ্যাই পৃতু, এইদিক এসে দাঁড়া ত! ক্যাচ ধরিস, তোর বাবাকে চা দিচ্ছি।' ব্যাস! সাপও মরল, লাঠিও ভাঙল না। স্নিগ্ধা হেসে ফেলল, আন্টির ত খুব বুদ্ধি তাহলে! প্রতীতি বলে, আম্মু এসব মহানবীর জীবন থেকে শিখেছে। আমাদের মহানবী কে উমর একবার কড়া কড়া কথা বলেছিল, সব সাহাবীদের সামনে। ঐটা খুবই ক্রুশিয়াল টাইম ছিল মুসলিমদের এক হয়ে থাকার জন্য। কিন্তু মহানবী উমর কে কিছু বলেন নি। পরে উমর ভুল বুঝতে পেরে লজ্জায়, ভয়ে শেষ, উনার কাছে গিয়ে সালাম দিতে মহানবী সুন্দর উনার সাথে নরমাল কথাবার্তা বললেন, যেন কিছুই হয় নি। আরেকবার আয়িশা উনার সাথে গলা উঁচায় কথা বলছিল, এই দেখে আয়িশার বাবা আবু বকর আয়িশাকে মারতে যায়। তখন মহানবী ঠেকায়, আর হেসে আয়িশা কে বলে, দেখলে ত, মিয়া সাহেবের থেকে তোমাকে কেমন করে বাঁচালাম? আমার আব্বু আম্মুও আর দশটা কাপলের মত ছিল। আমার বড় ফুফু উনাদের কুরআন হাদীসের সাথে পরিচয় করিয়ে দেন। এই যে আব্বা রাগ দেখাল, আমি নিশ্চিত জানি আব্বা দুই রাকআত নফল পড়ে এই কাজের জন্য মাফ চাবে।

স্নিগ্ধা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে। প্রতীতি সবই লক্ষ্য করে, কিছু বলে না। মনে মনে প্রার্থনা করে, আল্লাহ, তুমি এই মেয়েটিকে রক্ষা কর। ওর মাধ্যমে তুমি ওর বাবা মাকে সঠিক পথে ফেরাও।