Saturday, July 2, 2011

শিরোনামের প্রয়োজন নেই (শেষ)

প্রতীতির পড়ার ঘর। স্নিগ্ধার ঘরের চেয়ে কম অগোছালো না। জানে, মা এসে চিৎকার জুড়ে দেবে, কিন্তু মাকে ঠান্ডা করার উপায় ওর জানা আছে। এই যে মা ঢুকল, মুখ নরমাল, এ..ই যে খাটের দিকে তাকাল, মুখের এক্সপ্রেশন চেঞ্জ... অ্যাকশন!

'মা! থ্যাংকিউ! তোমার চায়ের গল্পটা খুব কাজে দিয়েছে।' মার চোখ ঘুরে গেল মেয়ের দিকে, চোখে উৎসাহ, তাই? বলেছিস? 'হ্যা মা! দাড়ি কমা সহ।' পাপিয়া স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললেন, যাক, তোর বাবার অকাজের তাহলে ভাল দিক ও আছে। কী বলল স্নিগ্ধা? 'তেমন কিছু বলেনি মা, তবে চোখে আগ্রহ দেখলাম' তুই ত ওকে আস্তে আস্তে কুরআন পড়ার কথা বলতে পারিস। এবার বিরক্ত হল প্রতীতি, 'মা! আমার কাজ কি ওকে কুরআন পাতার পর পাতা বসে পড়ানো, না কুরআনের সাথে পরিচয় করিয়ে দেয়া? ওর সমস্যার সমাধান খুঁজে পেলে ও নিজে থেকেই আগ্রহ নিয়ে পড়বে। আমার পড়াতে হবেনা।' একটু দমে যান পাপিয়া, তবে মেয়েকে বুঝতে দেন না। 'তা অবশ্য ঠিক বলেছিস, তুই তাহলে ওর সাথে গল্পের মত করেই বলিস।'

- বাবা কই মা?
- রুমে, খেয়ে দেয়ে পেপার পড়তে পড়তে পা দুলাচ্ছে।
- আজকে ঘরের কাজ করেছে কোন?
- হুম, বাটিগুলি টেবিল থেকে সরিয়ে রান্নাঘরে নিয়ে গেছে।
- ইস মা, কবে যে বাবা মানুষ হবে! তোমার খুব কষ্ট হয়ে যাচ্ছে। অফিস করে রান্না বান্না, ঘর গুছানো..
- নাহ! কষ্ট হলে ত বুয়াই রেখে দিতাম। তুই ত জানিস, আমি বুয়া বিদায় করেছি, শুধুমাত্র যাতে কাজের ছুতায় আমাদের সবার আরো বেশি কথাবার্তা হয় - এই জন্য। এই যে কাজের অজুহাতে যখন তখন তোদের টিভি, কম্পিউটার থেকে উঠাতে পারি.. এইটাই বা কম কী? আর সবই ত সওয়াব, না রে? আর তোর বাবা এখন পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ রেগুলারলি পড়ছে, এর চেয়ে বেশি আর কী চাই বল?
- হুম....
- যাকগে! তুই ঘুমা। বিছানার জঞ্জাল পরিষ্কার করে ঘুমাবি। সকাল বেলা আমি যেন এগুলি না দেখি!

প্রতীতি একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে, এত প্ল্যান, কোন কাজেই লাগলনা। ঘরের কাজে মাকে ফাঁকি দেয়া ভারি কঠিন।

অন্য রুম -

- কী, মেয়ের সাথে আবার কী নতুন প্ল্যান আঁটলে?
- মেয়ে খুব চিন্তায় আছে স্নিগ্ধাকে নিয়ে।
- স্নিগ্ধা? ও! পাশের বাসার মেয়েটা? ওর সাথে এখনো যোগাযোগ রাখছে?
- হ্যা, ক্লাশ, ঘরের কাজ সব কিছুর মধ্যেও ঠিকই সময় বের করে ওকে নিয়ে বের হয়।
- ভাল ভাল। এই বয়সটাতে মানুষকে সাহায্য করার অভ্যাসটা করালে আখেরে ভাল হবে।
- হ্যাঁ, মেয়ে ত মাঝে মধ্যে হতাশ হয়ে ফিরে, বলে স্নিগ্ধাকে দেখলে মনে হয় ড্রাকুলা সব রক্ত চুষে নিয়ে গেছে। কথা বলেনা, কোন ব্যাপারে ওপিনিয়ন দেয়না... কোথাও গেলে একশবার মানুষের মুখের দিকে তাকায় কে ওকে দেখছে..
- লেগে থাকতে বল। ওর নিজের জীবনেও এরকম কত হতাশা আসবে, তখন এই মেয়েকে কীভাবে ঠিক করেছিল মনে পড়লে শক্তি পাবে।
- দেখতে দেখতে বড়ই হয়ে গেল, না? আর ক'দিন পর পরের ঘরে চলে যাবে।
- পরের ঘর বলছ কেন? বল মেয়ের নিজের ঘর হবে। আর তোমার মেয়ে কি যেমন তেমন? যে ঘরে যাবে ঘর আলো করে রাখবে।
- হুঁহ! ঘরের কাজ দেখলে ত মনে হয়না আমার মেয়ে। তখন পুরোই তোমার মেয়ে।
- আচ্ছা আচ্ছা ঠিক আছে। কালকে বাটি ধুয়ে রাখব যাও। (পুনরায় পেপারে মনোনিবেশ)


এ গল্পটার এখানেই ইতি। প্রতীতি স্নিগ্ধাকে কতটুকু বদলাতে পারল সেটা অনেক কিছুর উপর নির্ভর করে। প্রতীতির লেগে থাকার উদ্যম, প্রতীতির বাবা মায়ের উৎসাহ, প্রতীতির বলতে পারার ক্ষমতা.. স্নিগ্ধার গ্রহণ করার ক্ষমতা, সর্বোপরি আল্লাহর পক্ষ থেকে গাইডেন্স - এর সবকিছুর সঠিক সমন্বয়ে গল্পটি খুব সুন্দর পরিণতি নিতে পারে। আবার প্রতীতি হাল ছেড়ে দিলে স্নিগ্ধা নিজ তাগিদেও ঘুরে দাঁড়াতে পারে, জীবনের প্রয়োজনে নিজেই খুঁজে বের করতে পারে সর্বোত্তম জীবন ব্যবস্থা, সরলতম পন্থা। এই গল্পের মূল চরিত্র স্নিগ্ধা নয়, প্রতীতিও নয়। প্রতীতির বাবা মা, তাদের দূরদর্শিতা, তাদের আত্মত্যাগ। আসুন আমরা অঙ্গিকার করি আমাদের সন্তানকে তাদের অধিকার থেকে একটুকু বিচ্যুত করবনা। সন্তানের ভবিষ্যৎকে আমাদের নিজেদের স্বার্থের জন্য সস্তাদরে বিকিয়ে দেবনা।

No comments:

Post a Comment