Friday, July 8, 2011

কিছু করার পাইনা

আমার বোনের এইচ এস সি পরীক্ষা নিয়ে ভয়ঙ্কর টেনশন ছিল। এস এস সি তে ঝড়ে বক মরার মত গোল্ডেন পেয়ে ফেলেছে - এখন এইচ এস সি তে গিয়ে খারাপ করলে মানুষ কী বলবে.. মহা দুশ্চিন্তা! পরীক্ষার চার-পাঁচ দিন আগে ওকে ফোন করে বললাম, 'দ্যাখ, তুই ত স্কুল কলেজে পড়ার চাপে সময় করতে পারিস নাই, এতদিন শুধু পড়া নিয়েই ছিলি। পড়ার বাইরে একটা অনেক বড় পৃথিবী আছে, ওখানে টিকে থাকতে হলে আরো অনেক কিছু জানতে হয়, শিখতে হয়। তোর অনেক কাজ বাকি আছে, পরীক্ষার ঝামেলাটা তাড়াতাড়ি শেষ কর।' ও হেসেই বাঁচেনা, সবাইকে গল্প করে বলেছে, আপু আমাকে বলসে পরীক্ষার জ্বালায় নাকি আমি অনেক ইম্পরট্যান্ট কাজ করতে পারতেসি না, তাই তাড়াতাড়ি ঝামেলা শেষ করতে। 

যাই হোক, দেড় মাস ব্যাপী দীর্ঘ পরীক্ষার শুভ সমাপন হল, এখন আমি পড়লাম বিপদে। 'কী রে, তুই না বলসিলি, আমার কত কাজ? এখন ত পরীক্ষা শেষ, আমি ত কিসুই করার পাইনা।' তাই ত! কী কাজ দেয়া যায়? আমার ত কত শখ আমার বোন মানুষের জন্য কাজ করবে, ইসলাম নিয়ে পড়াশুনা করবে, নিজে প্র্যাক্টিস করার পাশাপাশি অন্যদেরও জানাবে - এতে করে ওর কনফিডেন্সটাও যেমন বাড়বে, তেমনি মানুষের কল্যাণে কাজ করার একটা অভ্যাস তৈরি হবে, পরবর্তী লাইফে যত টাকাই হাতে আসুক, সে টাকা অন্তরে জায়গা করে নেবে না। কিন্তু এইসব বড় বড় কথা মুখে বললে ত হবে না! তার জন্য সুযোগ সেট করে দেয়া চাই। ও ত চাইলেই যেখানে সেখানে যেতে পারেনা। তাছাড়া নিরাপত্তারও ত ব্যাপার আছে, যতটা না শারীরিক, তার চেয়ে বেশি মানসিক নিরাপত্তা নিয়ে আমার ভয়। এই অফুরন্ত অবসরে অলস সময় কাটানো এক টিন এজারের জন্য অদেখা পৃথিবীটায় এত বেশি ফাঁদ পাতা যে তা থেকে গা বাঁচিয়ে চলা রীতিমত এক যুদ্ধের মত। 

ওকে বললাম, 'তুই ছয় সাত বছর পরের সময়টার কথা চিন্তা কর, তোর জব থাকবে, নিজের সংসার থাকবে, আর আমাদের মত যদি বাইরে চলে আসিস তখন ঘরে বাইরে সবই দুই হাতে সামলাতে হবে। তখন কিছু কিছু গুণ খুব থাকা দরকার। যেমন, একটু আগে থেকে প্ল্যান করে কাজ সামলান। ধর আব্বু আম্মু অসুস্থ, বাসায় কাজের লোক নাই, তোর পরীক্ষা - তখনও ত সব সামলায় ক্লাশে যেতে হবে, তাই না? তুই কি এখন কয়েকটা কাজ একসাথে করতে পারিস?' না। 'বেশ, তাহলে একদিন তোর ফ্রেন্ডদের বাসায় দাওয়াত কর, সব রান্না তুই করবি, সার্ভ ও করবি আবার চলে যাওয়ার পর গুছায় রাখার কাজটাও করবি।' ধুর! রান্নাবান্না - এইটা কোন মজার কাজ হইল? 'আহা! একটা সময় গিয়ে এগুলি তোর জন্য অনেক সহজ হয়ে যাবে, কিন্তু তখনও এমন কাজ আসবে যেগুলো তোর কঠিন লাগবে। তোর করতে ভয় করবে। এখন যেমন একা গেস্ট সামলানো তোর জন্য খুব ভয়ের, পরে হয়ত জব আর বেবি, অথবা বাবা মা, সংসার, চাকরি, বেবি - এসব ভয় লাগবে। তোর রান্না বা দাওয়াতটা ত ইম্পরট্যান্ট না, এই যে সাধ্যের বাইরে একটা কঠিন কাজ করে ফেলতে পারলি - এটা ইম্পরট্যান্ট।' 

হুঁ। করলাম, আর কী? 

আর... ও হ্যাঁ, তোর বিভিন্ন লেভেলের মানুষের সাথে ভালভাবে মিশতে পারা শিখতে হবে। তুই যেন চায়ের দোকানদার মামার সাথে থেকে শুরু করে তোর টিচার, বয়স্ক আত্মীয় - কারো সাথে কথা বলতে অস্বস্তি না লাগে সে জন্য অনেক বেশি মানুষের সাথে গল্প করতে হবে। ইউনিভার্সিটি তে উঠলে সার্কেল বড় হবে, কিন্তু ওটাও ঐ ক্লাশমেট দের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। ওখানে বিভিন্ন ফ্যামিলি ব্যাকগ্্রাউন্ডের মানুষ হয়ত পাবি, কিন্তু বিভিন্ন বয়স বা পেশার মানুষ ত পাবিনা। তুই ইসলামের দাওয়াত দিতে গেলে তাদের কাছে যেতে হবেনা? বা গ্রামে গিয়ে কাজ করতে হলে তাদের একজন হতে হবে ত! ত এর জন্য ঢাকার বাইরে যত আত্মীয় আছে ফোন করে কথা বলবি, দূর সম্পর্কের চাচী, মামী, ফুফু - সবার সাথে যোগাযোগ রাখবি। এতে করে অনেক সময় যখন ফ্রেন্ডরা থাকেনা - তখন বোরড লাগবে না। ফ্রেন্ডদের অভাবও বোধ করবি না অনেক সময়। আর অনেক রকম মানুষ মানেই অনেক রকম টপিক - কত যে মজার মজার দিক জানা যায় মানুষের! দেখবি একটা ঘটনাই কত জন কত ভাবে দেখে। মানুষের সাইকোলজি বোঝার জন্য এর চেয়ে সহজ উপায় আর নেই। 

তারপর? 

তারপর... তোকে আমি কিছু টাকা পাঠাব। তুই কত টাকা একসাথে হাতে পেয়েছিস এই পর্যন্ত? উম... চার হাজার। আচ্ছা, আমি এমন পরিমাণ টাকা দিব যাতে তোর অনেক টাকা মনে হয়। তুই এই টাকা তিন ভাগে ভাগ করবি। একভাগ ফ্রেন্ডদের সাথে ফাস্ট ফুডে গিয়ে উড়াবি আর তোর শখের জিনিস কিনবি। একভাগ দিয়ে বই কিনবি। আর একভাগ চ্যারিটি করবি। চ্যারিটি জাস্ট হাতে টাকা ধরায় দিলেই হবে না। লং টার্ম কাজে লাগে এরকম জায়গায় চ্যারিটি করতে হবে। তারপর পুরা টাকা শেষ হলে আমাকে বলবি কোনভাবে টাকা খরচ করে তোর সবচেয়ে ভাল্লাগসে। 

কী দরকার? আমি টাকাটা রেখে দেই, একটা কোর্স করব ঐ টাকা দিয়ে! 

তার মানে আল্লাহ তোকে অর্থ দিয়ে পরীক্ষা করল, আর তুই পুরাটা নিজের ভবিষ্যতের জন্য হাপিশ করে দিলি? কঞ্জুস! স্বার্থপর! 

ইয়ে! আচ্ছা ঠিক আছে, দিস টাকা, চিন্তা করে দেখি কী করা যায়। 

হ্যা, আর আল্লাহ যে তোকে সময় দিয়ে পরীক্ষা করতেসে তার কী? পুরা টাইমটা নিজের ফিউচারের জন্য খরচ করতেসিস? নাইলে টিভি দেখতেসিস? চ্যারিটি অব মানি বুঝিস, চ্যারিটি অব টাইম বুঝিস না? ঘরের কাজ কর, আব্বা আম্মার সাথে সময় কাটা, নেট এ বসলে এডুকেশনাল ভিডিও কী পাওয়া যায় খুঁজে বের কর, ঐগুলি অনুবাদ করে বাংলায় ভয়েস দিয়ে ডিভিডি বানাবি। স্কুলে স্কুলে পাঠানোর ব্যবস্থা করতে হবে। নানু কে ফোন করে জিজ্ঞাসা কর ঢাকা থেকে কী কী পাঠাতে হবে। আমার এক ফ্রেন্ড এর বেবি হবে, ওকে গিফট কিনে দিয়ে আসবি। 

ধ্যুৎ! এত কাজ করতে বলিস, ভাল্লাগেনা! 


আমি হাসলাম। আমার কাজ এ পর্যন্তই। 

No comments:

Post a Comment