Saturday, July 2, 2011

শিরোনামের প্রয়োজন নেই

স্নিগ্ধার প্রতিটা দিন একই রকম। কলেজ যাওয়া, আসা, বাড়ি ফিরে একটু টিভি দেখা, পড়ার টেবিলে বসে থাকা। অগোছালো ঘরটার দিকে একটা বিতৃষ্ণা নিয়ে তাকায়। উদ্যমগুলি কোথায় যেন হারিয়ে গেছে, শরীরটা টেনে টেনে সব পরিপাটি করতে গিয়েও মাঝপথে থেমে যায়। কীসের জন্য করবে সে?

নিজের রুমের বাইরে এসে দাঁড়ালে আব্বু আম্মুর রুমটা দেখতে পায় সে। জানে, ওখান থেকে হাসির শব্দ ভেসে আসবে না কখনোই। বেশির ভাগ সময় ওঘরে যে কোন একজন থাকে। অপরজন টিভির রিমোট হাতে নিয়ে পার করে ঘন্টার পর ঘন্টা। ঘরে একমাত্র সচল মানুষ কাজের বুয়াই। নিজের মনে কাজ করে.. বুঝে গেছে কবরের মত এই বাড়িতে টিকে থাকতে হলে নিরব হয়েই কাটাতে হবে।

এ বাড়িতে তাই কোন প্রাণ নেই। প্রাণীগুলো বোধহীন রোবটের মত, কেবল নিজে নিজের কাজ নিয়ে থাকতে জানে। কবে তারা সবাই মিলে পিকনিক এ গিয়েছিল? বা কারো বাড়ি বেড়াতে গিয়েছিল? মনেও করতে পারেনা স্নিগ্ধা। কবে কোন কথায় আঘাত না করে একসাথে খাবার টেবিলে গল্প করেছিল? কবে আম্মু তার অনেক ব্যর্থতার গল্প শুনে বুকে টেনে বলেছিল. 'ইশ মা! তোকে সবাই এত কষ্ট দেয়?' আচ্ছা, আম্মু কবে 'মা' বলে ডেকেছিল? এতক্ষণে খেয়াল হল তার, অনেক বান্ধবীর মাকে তার এত ভাল লাগে কেন! ওরা মা বলে ডাকে, তাই।

ওর বাবা খুব ভালমানুষ, কিন্তু রাগলে কান্ডজ্ঞান থাকেনা। সে সময় বাবার মুখের কথা শুনে সে পাথর হয়ে থাকে, এটা তার বাবা? মাও খুব ভালমানুষ, শুধু তীব্র আত্মসম্মানবোধসম্পন্ন। একবার কেউ কষ্ট দিলে কখনো আর ভোলেনা। ওদের সব ভাল, শুধু কথাগুলো একটু শ্লেষ জড়ানো। শুনতে ভালই লাগে, কিন্তু বুকের মধ্যকার খচখচ ভাবটা যায়না। চোখদুটোও ওর ভারি বেয়াদব, যখন তখন ঢল নামে। তাই বিব্রতকর পরিস্থিতি এড়াতে সে পারতপক্ষে সবাই একসাথে থাকলে ওখানে যায়না।

ঘরটা তার কাছে একটা দামি খাঁচার মত, সবাই টিপটপ, সব ভাল, তবু মন চায়না ঘরে ফিরতে। কিন্তু বাইরেই বা সে কোথায় যাবে? বান্ধবীদের সাথে পাল্লা দিয়ে তাদের মত নিজেকে সাজাতে ত সে পারেনা। ওদের পাশে যে ওকে ভীষণ ম্যাড়মেড়ে লাগে! প্রায় প্রতিদিনই কেউ না কেউ উপদেশ দেয়, একটু পার্লারে যাও, ফেসিয়াল করে আস, স্মার্টভাবে চল। ও ভেতরে ভেতরে আরো কুঁকড়ে যায়, যদি পুরোপুরি স্মার্ট হতে না পারি? যদি টইটই সব ঠিকঠাক মত করতে না পারি? ওরা কি আমাকে নিয়ে আরো হাসাহাসি করবে? বারবার স্মার্ট হওয়ার উপদেশ শুনতে শুনতে সে বুঝে গেছে ওর আচার ব্যবহার, চালচলনে বড় কোন খুঁত আছে, যেটা খুব সহজেই চোখে লাগে। আজকাল তাই ওর চেষ্টা অদৃশ্য হওয়ার।

স্নিগ্ধা প্রাণপন চেষ্টা করে ভাল রেজাল্টটুকু করে যাচ্ছে, কারণ রেজাল্ট খারাপ হলে মানুষের আরো অপমান সহ্য করার শক্তিটা ওর নেই। আয়নায় দাঁড়িয়ে নিজেকে যখন সে দেখে তখন কেন জানি নিজের চোখ দিয়ে দেখতে পায়না। অপরের চোখ দিয়ে দেখে। মুহূর্তে মনে পড়ে যায় খুব কাছের মানুষেরা গল্পোচ্ছলে কী কী বলেছিল। আচ্ছা, কেউ কখনো কেন বলেনা, তুমি একটু বক্তৃতা দেয়ার প্র্যাক্টিস কর, আত্মবিশ্বাস বাড়বে, পনের বছর পর কার জন্য কী করবে, একটা স্বপ্ন দেখ, উৎসাহ পাবে। কেন কেউ বলেনা, পোশাক আশাক, রূপচর্চার বাইরেও একটা জিনিস আছে, তোমার আত্মা, তোমার মন। ওখানটায় তোমার মত সুন্দর আর কেউ নেই! তোমার সব বান্ধবীরা মানুষের প্রশংসা কুড়াতে হ্যাংলার মত দ্বারে দ্বারে ঘুরছে, আর তুমি তোমার সুন্দর মনটাকে খুব যত্ন করে আদর করে রেখেছ। হাজারটা মানুষের অপমানেও তুমি কিছু রিঅ্যাক্ট করনা। শুধু চোখটা বড় বড় করে তাকাও। তোমার চুপ করে থাকা দেখে মানুষ ভাবে তুমি বোধহয় বোধহীন। আরো শক্ত করে না বললে তোমার মগজে পৌঁছাবে না। তুমি মুখ ফুটে তবু ত বল না, 'আমার আত্মবিশ্বাস ত কবেই তোমরা শেষ করে দিয়েছ, আত্মাটাকেও কি মেরে ফেলতে চাও?'

স্নিগ্ধা সাতপাঁচ ভেবে আবার নিজের ঘরে ফিরে আসে। শূন্য দেয়ালগুলো তার বড় আপন। কেবল এই জায়গাটাতেই সে যখন তখন মুখ লুকাতে পারে।


(আমার কলেজ জীবনে দেখা প্রত্যেকটা হাত কাটা বান্ধবীর উদ্দেশ্যে লিখলাম। আজও আমার বোনের মুখে শুনি ঘুমের ওষুধ, হাতকাটার এই প্রচলন যায়নি। শুধু একটু আত্মবিশ্বাস আর বুকের মধ্যে জড়িয়ে ধরে আদর এই মেয়েগুলিকে কত সুন্দর জীবন দিতে পারত, সেটা অভিভাবকেরা কবে বুঝবে?)

No comments:

Post a Comment