Saturday, July 16, 2011

আলোর দিশারী

আমার নোট লেখার শুরু মোটামুটি এক বছর আগে। অপুর নোট পড়ে খুব ভাল লাগত, কত সহজ ভাষায় কত দরকারি কথাগুলো বলে ফেলছে। আমারও মনে হত আমিও যদি ওর মত লেখালেখির মাধ্যমে অনেক মানুষের কাছে পৌঁছাতে পারতাম! কিন্তু ইসলাম নিয়ে লেখার দুঃসাহস করার আগে ত তা সম্পর্কে জানতে হবে! একটা ঢোঁক গিললাম। আমি কি কখনও 'যথেষ্ট জেনেছি' বলতে পারব? কেউই ত পারবেনা! তাহলে কি কোনদিনই লিখতে পারবনা? কতটা পথ পেরুলে তারে পথিক বলা যায়? কতটা বাধা ডিঙালে আলোর দিশারী হওয়া যায়? 

আমার বাবার একটা স্বভাব হচ্ছে সব অসম্ভবের মধ্যে সে সম্ভাবনা দেখে। অন্যরা সাহায্য করুক আর সমালোচনাই করুক। বাবার এই ইয়ে আমার ভেতরেও চলে এসেছে। ভেবে দেখলাম, অদূর বা সুদূর ভবিষ্যতে স্কলার হওয়ার মত প্রস্তুতি আমার নেই। সুতরাং শুরু করতে হলে যা আছে তা দিয়েই করতে হবে। আমি একেবারেই মধ্যবিত্ত পড়াশুনা-সম্বল একটা আধুনিক পরিবারে বড় হয়েছি, আমার মত মন মানসিকতার হাজার হাজার ছেলেমেয়ে পাবলিক আর প্রাইভেট ইউনিভার্সিটিতে আছে। ফ্যামিলি কালচারে ভিন্নতা থাকার কারণে স্বাধীনতা কারো একটু বেশি ছিল, কারো কম। কিন্তু সবারই লক্ষ্য ভাল রেজাল্ট করে বের হতে হবে, ভালভাবে সেটলড হতে হবে। এই গতানুগতিক 'এইম ইন লাইফের' স্রোতে আমিও চলছি, তাই আমি জানি এই মানুষগুলো ভালভাবে বাঁচতে চায়, শান্তিতে থাকতে চায়। কিন্তু শান্তি রক্ষা করার জন্য যে স্ট্রাগলটুকু করতে হয় সেটার ট্রেইনিং পাওয়ার সুযোগ তাদের হয়নি। এখন সত্যিকারের সমস্যায় এসে যে যার যার বিবেকবুদ্ধি অনুযায়ী সলভ করার চেষ্টা করছে। অথবা নিজের চিন্তাভাবনাগুলি বদলে নতুনভাবে সবকিছু দেখার চেষ্টা করছে। 

আলহামদুলিল্লাহ এই প্রসেসের মধ্যে পড়ে আমি বরাতজোরে ইসলামের মধ্যে সলিউশন খুঁজেছি। একবার বাসায় গল্পের বই পাচ্ছিলাম না তাই হাদীসের বই নামিয়ে পড়ে ফেলেছিলাম - ঐ একবারের পড়া থেকেই টুকটাক বিভিন্ন কাজে এক একটা প্রাসঙ্গিক হাদীস মনে পড়ে যেত। যেমন একবার খুব ঠান্ডা লাগায় আম্মু বিদেশ থেকে কলিগের দেয়া একটা ঠান্ডার ওষুধ আমাকে খেতে বলেছে। আমি খাইনি, পরে আম্মু বলল, 'তুমি এখনই একটা ওষুধ খেয়ে ফেল।' খেলাম। আধ ঘন্টার মধ্যে এলার্জিতে সারা মুখ, হাত পা ফুলে একাকার। আম্মু পরে আমাকে বলছিল, আমি বললাম আর তুই তক্ষুণি খালি পেটে খেয়ে ফেললি? তখন আম্মুকে এই হাদীসটা শোনালাম যে, রাসুলুল্লাহ বলেছেন, বাবা মা যেন সাধারণ বিষয়ে সন্তানদের সরাসরি আদেশ না দেন। কারণ কোন কারণে সন্তান যদি সে আদেশ পালন না করে তাহলে আল্লাহর কাছে জবাবদিহি করতে হবে। সে জন্য বাবা মায়ের উচিৎ উপদেশ এর মত করে বলা। এই রকম আরো, রাসুলুল্লাহ (স) যেভাবে খুব নরম আচরণ করতেন, সবাই কথা বলতে কমফোর্ট ফিল করত, স্ত্রীরা মেজাজ খারাপ থাকলে চিল্লাচিল্লি করতেও ভয় পেতনা - এইসব ছোট ছোট অনেক কথা মনে পড়ে যেত। ওখান থেকেই ইসলাম - ওয়ে অব লাইফ - এর ব্যাপারটা কী জানার আগ্রহ হল। 

এই যে আগের সময়টার সাথে এখনকার সময়ে চিন্তা ভাবনার আকাশ পাতাল পার্থক্য, বা গতানুগতিক জীবনধারার সাথে ইসলামিক মতাদর্শের শার্প কনট্রাস্ট - এই জিনিসগুলি আমাকে খুব খুব প্রভাবিত করেছিল। আমার ডায়রিতে লেখা কয়েকটা কথা - 

"আমার আজকাল নিজেকে জন্মান্ধ মনে হয়, যার এই মাত্র অপারেশন করে চোখ দেয়া হয়েছে। পাগলের মত এই ওয়েবসাইট থেকে সেই ওয়েবসাইট ঘাটি, একদিন ব্যস্ততায় টক শুনতে না পারলে অস্থির লাগে। মনে মনে বলি, আল্লাহ, তোমার সৃ্ষ্টির সবচাইতে সুন্দর জিনিসটা বোধহয় নলেজ, জ্ঞানের সৌন্দর্যে আমি অন্ধ হয়ে গেছি। ।আল্লাহ! তুমি মানুষের জন্য এত সুন্দর একটা জিনিস তৈরি করে রেখেছ? in my mind, everything starts making sense, i see a problem, i try to understand, i try to look for a solution, and i find it, in my dreams, or during prayer, or while doing household works. আমি কী বলব? আমি সারাটাক্ষণ অভিভূত হয়ে থাকি, আমার চোখে পানি চলে আসে, মনে হয, সবাইকে ধরে ধরে বলি, তোমরাও দেখ, দেখতে পাচ্ছনা?" 

আস্তে আস্তে আরো অনেক প্র্যাক্টিসিং মুসলিমের সাথে মিশে দেখলাম, আমার ইউনিকনেস এটাই। আমি যেভাবে কমপেয়ার করে দেখছি, বা আগের থেকে এখনের ট্রানজিশনটা খুব ভাল করে ফিল করছি, সবসময়ই প্র্যাক্টিস করে আসা অনেক মুসলিম ভাই বোনদের মধ্যে ওই বোধটা ফিকে হয়ে গেছে। আমারো হয়ত হয়ে যাবে, সুতরাং আমাকে এখনই লিখতে হবে। এই চিন্তাগুলি কিছুদিন পরে নাও থাকতে পারে! 

আলহামদুলিল্লাহ, আমার ছাতা মাথা লেখার প্রতিক্রিয়া দেখে আবারো বুঝলাম আল্লাহ তিল থেকে শুধু তেল আর তাল না, তিলোত্তমাও বানায় ফেলতে পারে। গত একমাসে কত... আপু ভাইয়া যে মেসেজ করে আমাকে কৃতজ্ঞতা জানিয়েছেন - আমার ভয় লাগসে, এত এত ভালবাসা পাইতেসি, আমি কি এখন মরে টরে যাব? আই মিন দুনিয়ায় ত এর বেশি ভালবাসা পাওয়া সম্ভব না, তাইলে কি পৃথিবীর কাছে আমার পাওনা শেষ? বা যা পাওয়ার আল্লাহ সব এইখানেই দিয়ে দিল? কবরে ফড়ে ফক্কা? 

ইনশাল্লাহ, স্কলার হওয়ার চেষ্টা শুরু করব, কারণ মুসলিমের কাছে আল্লাহর প্রথম কমান্ডই আসছে পড়তে বসার (ঠিক যেন আম্মু, পড়, পড়, পড়...) কিন্তু ঐ ছুতায় আল্লাহ এখন পর্যন্ত যে জ্ঞান আর সুযোগ সুবিধা দিয়েছেন তার বিনিয়োগ ত বন্ধ রাখা যায়না! আমাদের সবার জন্যই ত একই কথা। ঠিক আপনার মত পড়াশুনা, আপনার মত ফ্যামিলি, আপনার মত ফ্রেন্ড সার্কেল, আপনার মত করে চিন্তা করা আর একজন মানুষ কি এই পৃথিবীতে আছে? 

ইয়াসির কাজী দাওয়াহ বিষয়ক একটা লেকচার এ খুব সুন্দর একটা কথা বলেছিলেন। 'এই রুমটাতে পাঁচ হাজার লোক আছে। ধরুন এই রুমের সব বাতি একটা সুইচ দিয়ে জ্বালান হয়, কোন কারণে সে সুইচটা অফ হয়ে গেল। এখন এই পাঁচ হাজার লোক কী করবে? সুইচ কই, কে জ্বালাবে - এসব বলে অপেক্ষা করতে থাকবে? আপনাদের প্রত্যেকেরই ত সেলফোন আছে। বাতি নিভে গেলে প্রত্যেকে তাদের সেলফোনটা মাথার উপর উঁচু করে ধরুন। পাঁচ হাজার মৃদু আলো এক হলে এই ঘরটায় কি আর অন্ধকার থাকবে?'

No comments:

Post a Comment