Monday, August 1, 2011

একটি ছোট উদ্যোগ

আসসালামু আলাইকুম। লেখাটা একটা রিপোর্ট হিসেবে শুরু করলেও মনে হচ্ছে এটা নিছক এক রিপোর্টই না। কোন ফটোব্লগ ও না। বা নিজের কীর্তিকাহিনীর খোশগল্পও না। এগুলো জীবনের গল্প। শূন্য থেকে শুরু করে একটু একটু করে উঠে দাঁড়ানোর আশা নিরাশায় ভরা টুকরো টাকরা ঘটনা।

দুই বছর ধরে দেশের বাইরে আছি। দূরে থাকায় দেশের মানুষগুলোর প্রতি আবেগ যেন আরো বেড়ে গিয়েছিল। এই যে এদেশে এসে পড়ার সুযোগ পেয়েছি, এই অর্জনের পুরোটুকু কি আমার হতে পারে? আমার দেশ আমাকে পড়ার সুযোগ করে না দিলে আমি কি কোনদিন এখানে আসতে পারতাম? না। বিনিময়ে আমি কি দেশকে কিছু দিতে পেরেছি? না।

তাই খুব সামান্য একটুখানি টাকা জমিয়ে ঠিক করেছিলাম দেশে গিয়ে ডোনেট করব। শুধু এটাই প্ল্যান ছিল, টাকা এমন কোথাও দিব যাতে তা রোজার ঈদে নতুন কাপড় বিলানো বা জেয়াফতে খিচুড়ি খাওয়ানোর মত ক্ষণস্থায়ী কিছু না হয়। আমার সঞ্চয় খুব কম হতে পারে, কিন্তু এই অর্থটুকুই যদি একটা পরিবারকে মাথা তুলে দাঁড়ানোর ব্যবস্থা করে দিতে পারে তাই বা কম কী?

আমরা মূলতঃ দুটো গ্রামে নয়টি ভাগ্যহত পরিবারে সাহায্য করার চেষ্টা করেছি। জামালপুরের নদীভাঙন কবলিত একটি গ্রামে তিনটি কিশোরী মেয়ের কারোরই পরিবারে উপার্জনক্ষম কোন সদস্য নেই। এরা সেলাই শিখতে আগ্রহী, উপযুক্ত সরঞ্জাম পেলে টেইলরিং এর কাজ শিখে রোজগার করতে পারবে। একটি সেলাই মেশিন কত দাম? পাঁচ ছয় হাজার? এই অবলম্বনটুকু না করে দিলে এরা কি একসময় শহরের গার্মেন্টস এ জড়ো হত, পরিবারের সবাইকে ছেড়ে? এই স্বস্তি নিয়ে বছর পার করত, যে বস্তির অনিরাপদ ছাউনির তলে আরো একটা রাত নিরাপদে পার হল? 



কিছু পরিবারে উপার্জনক্ষম লোক আছে, উপার্জন করার পন্থা নেই। ক্ষেত এ দিনমজুরি সবার বেলায় জোটেনা, জুটলেও তার ব্যবস্থা মৌসুমভিত্তিক। বেশির ভাগ সময়ই চিকিৎসা, মেয়ের বিয়ে - এ ধরণের বড় খরচের সময় মোটা সুদে টাকা ধার নিতে হয়। কিন্তু বান্ধা কোন আয় না থাকায় এই নিঃস্ব মানুষগুলো একদিন ভিটেমাটি খুইয়ে সর্বহারা হয়। ফলস্বরূপ, ঢাকায় আগমন, রিকশা চালিয়ে পেটে ভাতে টিকে থাকার যুদ্ধ, আর আমাদের নাসিকা কুঞ্চন, 'ইস্! এত মানুষ ঢাকায় কী করে?' এরকম গুটিকয়েক পরিবারে ভ্যান কিনে দিয়েছি, দেখা যাক, জীবনের বোঝা টানতে কতটুকু সাহায্য করতে পারে এই ভ্যান। 


এর পরেও বেশ কিছু টাকা হাতে ছিল। মানিকগঞ্জের এক মফস্বল এলাকার মধ্যবয়স্ক এক পিতার কথা বলল আমার বন্ধু। ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী। বড় মেয়ের বিয়েতে সামাজিকতা রক্ষা করতে গিয়ে নিম্নবিত্তের কাতারে নেমে এসেছেন। বাকি ছেলে মেয়েরা সবাই স্কুলে পড়ছে। কিছু মূলধন পেলে ধ্বসে পড়া টিনের ব্যবসাটা আবার দাঁড় করাতে পারেন। আমি একটু দোনোমনায় ছিলাম, উনি আর যাই হোক, না খেয়ে মরবেন ত না। উনার চেয়ে আরো অনেক needy পরিবার আছে যাদের কাছে পৌঁছান আরো অনেক বেশি দরকার। কিন্তু যখন শুনলাম উনার ছেলেমেয়ের লেখাপড়া বন্ধ হয়ে যাচ্ছে, তখন আর প্রায়োরিটিটা টাকাভিত্তিক রইলনা।

উনাকে বারোহাজার টাকা এককালীন মূলধন হিসেবে দিয়েছি, এই শর্তে, ব্যবসা দাঁড়িয়ে গেলে এই টাকাটা ফেরত দিতে হবে। আমাকে না, অন্য এক পরিবারকে স্বনির্ভর করার জন্য বিনিয়োগ করতে হবে। আমি কোন লিখিত চুক্তিপত্র করিনি। টাকাটা সামান্য, এই জন্য না। টাকাটা আমি দান হিসেবেই উনাকে দিয়েছি। কিন্তু ব্যবসায়ের পাশাপাশি উনার মানুষের প্রতি বিশ্বাসটাও যেন দাঁড়িয়ে যায় সে চেষ্টা করেছি। জানিনা কতটুকু সম্ভব হবে, তবে আমার আশা, যদি উনার পরিবারটা আবার আগের অবস্থানে ফিরে আসতে পারে, উনার ছেলেমেয়েরা শিক্ষিত হয়ে এই বিশ্বাস আর সহানুভূতির শিক্ষাটুকু তাদের চারপাশে ছড়িয়ে দেবে। 



এই লেখায় আমি আমি অনেকবার এসেছে। আসলে আমি উদ্যোগটা শুরু করেছি কেবল, টাকা, সাপোর্টসহ সবকিছুর কৃতিত্ব প্রবাসী বাংলাদেশীদের আর আমার ছেলেবেলার বন্ধু মাহমুদুর রহমান নাজমুলের। দেশে গিয়ে বাবার হঠাৎ ওপেন হার্ট সার্জারি করাতে হয়েছিল, তাই ওর জিম্মায় টাকাটা ছিল। নাজমুল একাই ঘুরে ঘুরে লোকজন খুঁজে বের করেছে, জিনিসপত্র কিনে দিয়ে এসেছে। সবার আন্তরিকতায় খুব ছোট উদ্যোগও কত সুন্দর হয়ে উঠতে পারে! আপনাদের সবাইকে বিনীত অনুরোধ, এই শুভ্র অন্তরটাকে বাঁচিয়ে রাখবেন সবসময়, যত যাই হোক।

[শামস্ এর অনুরোধে তার ফান্ড রেইজিং এর উপর একটা ছোট্ট রিপোর্ট লেখার কথা ছিল। কিন্তু কখন যে এতবড় গল্প লিখে বসেছি, টেরই পাইনি। শামস্ কে তার উদ্যোগের জন্য স্যালুট।] 

No comments:

Post a Comment