লিফটে পাশের ফ্ল্যাটের এক বড় আপুর সাথে স্নিগ্ধার প্রায়ই দেখা হয়। আপুটা একটু কেমন জানি। হুট করে একদিন ডেকে বলে, এই, আমি ফুচকা খেতে যাচ্ছি, যাবে আমার সাথে? এই সামনেই। কি মনে করে জানি রাজি হয়ে যায়। ফুটপাথের ওপর বিছানো টিনের বেঞ্চে বসে আপন মনে বকবক করতেই থাকে মেয়েটা, কথার মাঝখানেই বলে, আমার এত বড় নাম 'প্রতীতি' বলে ডাকার দরকার নাই। আর আমি ত মোটে দুই বছরের বড়, দুই বছর পর ত তুমি আমার সমানই হয়ে যাবে, তুমি বরং আমাকে পৃতিপু বলে ডেক। আর আপনি ফাপনি বলার দরকার নাই। আমি মোটে ইউনিভার্সিটিতে ভর্তি হলাম। আমাকে কেউ আপনি বলেনা। ওর কথার ধরণ শুনে স্নিগ্ধার খুব হাসি পায়, ওকে দেখে যেন মনে হয় পৃথিবীর কোন কিছু নিয়েই পৃতিপুর কোন টেনশন নেই। একটু মনোযোগ দিয়ে শোনার চেষ্টা করে আপু কী বলছে, এই দেখ, এই যে কৃষ্ণচূড়া গাছগুলি না, এর ফুলগুলির পাপড়ি গুলি কিন্তু চারটা হুবহু একরকম, একটা অন্যরকম, বড়, হলুদ। কুঁড়ি থাকতে আমি একবার পাপড়ি খুলে দেখেছিলাম, বড়টা বাকি চারটাকে ঢেকে রাখে। একবার একটা বিড়ালকেও দেখি চারটা বাচ্চাকে জড়ায় গোল করে ঘুমাচ্ছে। স্নিগ্ধার কানে অর্ধেক কথা ঢোকে, বাকিটা সময় সে আপুকে ভাল করে লক্ষ্য করে। উনার কি একেবারেই চিন্তা নেই মানুষজন কীভাবে তাকাচ্ছে, বা এরকম পোশাকে তাকে কেমন দেখাচ্ছে? আপুকে সে সবসময় এরকমই দেখে আসছে। বলি বলি করে বলেই ফেলল, পৃতিপু, তুমি ফ্রেন্ডদের সাথে বের হওনা? হবনা কেন? এইমাত্র এক ফ্রেন্ডের দাওয়াত থেকে আসলাম, বুঝলি, ব্যাটন রুজে মনে হয় ড্রেস কোড আছে, আমাকে যে কী লাগতেসিল, হি হি... সম্বোধনটা তুই এ নেমে এসেছে খেয়াল করলেও খুব স্বাভাবিকই লাগে স্নিগ্ধার। হঠাৎ করে ওর মনটা ভাল হয়ে যায়।
এরপর থেকে দুই সপ্তাহ পরপরই পৃতিপু একবার স্নিগ্ধার খোঁজে বাসায় হানা দিয়ে যায়। পড়ায় ব্যস্ত, জোর করে টেনে হিঁচড়ে বইয়ের দোকানে নিয়ে যাবে, নাহয় টংএর দোকানে বসে চা খাবে, সবসময় স্নিগ্ধার যেতেও ইচ্ছা করেনা, যেতে না চাইলে ও খুব শীতল হয়ে যায়, এই পদ্ধতি সে অনেকবার বাবা মায়ের উপর প্রয়োগ করেছে। কিন্তু প্রতীতি যেন কোন কিছুই গায়ে মাখবেনা। ওঠ, ওঠ... তোর কী পড়া, দে আমি বুঝিয়ে দেই। এক ঘন্টার জন্য চল, এক ঘন্টার মধ্যে ফেরত আসব, প্রমিজ। রুম থেকে তাকে বের করবেই। মনটা যখন ভয়ানক খারাপ থাকে স্নিগ্ধা প্রায় পুরোটা সময় মৃত মানুষের মত হয়ে থাকে, কিন্তু প্রতীতি বকবক করেই যায়।
একদিন প্রতীতি ওকে বলে, জানিস, আব্বু আজকে চা ভাল হয় নাই দেখে ছুড়ে কাপ ভেঙে ফেলসে, আমাদের ত বুয়া নাই, আম্মু অফিস থেকে এসে রেস্ট ও নিতে পারে নাই, তাড়াহুড়ায় চা বানায় দিসে.. স্নিগ্ধার চকিতে এমন অনেক ঘটনাই মনে পড়ে যায়। ও চুপ করে থাকে। প্রতীতি আবার বলে, আব্বুর জন্য খুব মায়া লাগসে আমার। স্নিগ্ধা অবাক হয়ে যায়, 'আব্বুর জন্য? কেন?' ত লাগবে না? এত বড় মানুষটা কীরকম দুর্বল.. 'দুর্বল? মানে কী?' প্রতীতি তখন বোঝায়, দ্যাখ, আম্মু কী না করে আমাদের সবার জন্য, আব্বু এই যে রাগ দেখাল, আম্মুর এখন মনে হবে না, এত কষ্টের মূল্যায়ন এই? তখন তার মনটা খারাপ হবে না? এর চেয়ে যদি রাগটা কে কন্ট্রোল করত, আর বলত, তুমি পাতিলটা ধুয়ে দাও, আমি আরেকবার চা বসাই, আজকে ভাল চা খেতে ইচ্ছা করছে, আম্মু সুন্দর হাসিমুখে আবার চা বানায় দিত। যে মানুষ ফল ভাল হবে জেনেও দুই মিনিটের জন্য নিজেকে কন্ট্রোল করতে পারেনা তাকে দুর্বল বলব না ত কী? স্নিগ্ধা খুব মজা পেল শুনে। তাই ত! ওর বাবার রাগের মাথায় চেঁচামেচি দেখে তাহলে ভয় পাওয়ার কিছু নেই, করুণা করা উচিৎ? এভাবে দেখলে কিন্তু আবার কেমন জানি বিতৃষ্ণা ব্যাপারটাও আসেনা।
কিন্তু আম্মু? স্নিগ্ধা সন্তর্পণে জানতে চায়, আন্টি খুব আপসেট, তাই না? আংকেল শুধু শুধু এমন করল? প্রতীতি হেসে বলে, 'না রে, আমার আম্মু মানুষটা অনেক সেনসিটিভ হলেও আব্বুর সাথে কখনও ইয়ে হয়না। স্নিগ্ধা হতবাক। মানে? কেন? কারণ আম্মু সবসময় বলে সংসারে মেয়েদের ক্ষমতা কতখানি এটা মেয়েরা বোঝেনা। একটা ছেলে ঘরে কমফোর্ট আর একটু সুপেরিয়রিটি ছাড়া কিন্তু আর কিছু চায়না। তুই যদি আপাতদৃষ্টিতে একটু ঝাড়ি বা রাগ হজম করিস, আর একটু যত্ন করিস, তোকে মাথায় তুলে রাখবে। তুই বছরের পর বছর ঝগড়া করেও যেটা আদায় করতে পারবিনা, রাগ হজম করলে অনেক সহজে পেরে যাবি। কারণ হঠাৎ অযৌক্তিক রাগ করে ফেলার পর একটা অপরাধবোধ হয়, তাইনা? তখন যদি পার্টনারের কাছে ডিফেন্ড করতে না হয়, উল্টো আরো কেয়ার পায়, তখন আপনি মনটা অনেক ঝুঁকে যাবে। চাই কি প্রায়শ্চিত্ত করতে একটু বাড়তি খাতিরও করতে পারে কয়েক দিন।
স্নিগ্ধার তাও ভাল লাগলনা। বলল, তা না হয় বুঝলাম, কিন্তু তাই বলে আংকেল এরকম যখন ইচ্ছা করবে, আর আন্টি সহ্য করবে? প্রতীতি বলে, নাহ! বললাম না, আম্মু অনেক সেনসিটিভ। আমি শিওর তিন চার দিন পর আব্বু কে চা দেয়ার সময় আম্মু আমাকে বলবে, 'এ্যাই পৃতু, এইদিক এসে দাঁড়া ত! ক্যাচ ধরিস, তোর বাবাকে চা দিচ্ছি।' ব্যাস! সাপও মরল, লাঠিও ভাঙল না। স্নিগ্ধা হেসে ফেলল, আন্টির ত খুব বুদ্ধি তাহলে! প্রতীতি বলে, আম্মু এসব মহানবীর জীবন থেকে শিখেছে। আমাদের মহানবী কে উমর একবার কড়া কড়া কথা বলেছিল, সব সাহাবীদের সামনে। ঐটা খুবই ক্রুশিয়াল টাইম ছিল মুসলিমদের এক হয়ে থাকার জন্য। কিন্তু মহানবী উমর কে কিছু বলেন নি। পরে উমর ভুল বুঝতে পেরে লজ্জায়, ভয়ে শেষ, উনার কাছে গিয়ে সালাম দিতে মহানবী সুন্দর উনার সাথে নরমাল কথাবার্তা বললেন, যেন কিছুই হয় নি। আরেকবার আয়িশা উনার সাথে গলা উঁচায় কথা বলছিল, এই দেখে আয়িশার বাবা আবু বকর আয়িশাকে মারতে যায়। তখন মহানবী ঠেকায়, আর হেসে আয়িশা কে বলে, দেখলে ত, মিয়া সাহেবের থেকে তোমাকে কেমন করে বাঁচালাম? আমার আব্বু আম্মুও আর দশটা কাপলের মত ছিল। আমার বড় ফুফু উনাদের কুরআন হাদীসের সাথে পরিচয় করিয়ে দেন। এই যে আব্বা রাগ দেখাল, আমি নিশ্চিত জানি আব্বা দুই রাকআত নফল পড়ে এই কাজের জন্য মাফ চাবে।
স্নিগ্ধা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে। প্রতীতি সবই লক্ষ্য করে, কিছু বলে না। মনে মনে প্রার্থনা করে, আল্লাহ, তুমি এই মেয়েটিকে রক্ষা কর। ওর মাধ্যমে তুমি ওর বাবা মাকে সঠিক পথে ফেরাও।
এরপর থেকে দুই সপ্তাহ পরপরই পৃতিপু একবার স্নিগ্ধার খোঁজে বাসায় হানা দিয়ে যায়। পড়ায় ব্যস্ত, জোর করে টেনে হিঁচড়ে বইয়ের দোকানে নিয়ে যাবে, নাহয় টংএর দোকানে বসে চা খাবে, সবসময় স্নিগ্ধার যেতেও ইচ্ছা করেনা, যেতে না চাইলে ও খুব শীতল হয়ে যায়, এই পদ্ধতি সে অনেকবার বাবা মায়ের উপর প্রয়োগ করেছে। কিন্তু প্রতীতি যেন কোন কিছুই গায়ে মাখবেনা। ওঠ, ওঠ... তোর কী পড়া, দে আমি বুঝিয়ে দেই। এক ঘন্টার জন্য চল, এক ঘন্টার মধ্যে ফেরত আসব, প্রমিজ। রুম থেকে তাকে বের করবেই। মনটা যখন ভয়ানক খারাপ থাকে স্নিগ্ধা প্রায় পুরোটা সময় মৃত মানুষের মত হয়ে থাকে, কিন্তু প্রতীতি বকবক করেই যায়।
একদিন প্রতীতি ওকে বলে, জানিস, আব্বু আজকে চা ভাল হয় নাই দেখে ছুড়ে কাপ ভেঙে ফেলসে, আমাদের ত বুয়া নাই, আম্মু অফিস থেকে এসে রেস্ট ও নিতে পারে নাই, তাড়াহুড়ায় চা বানায় দিসে.. স্নিগ্ধার চকিতে এমন অনেক ঘটনাই মনে পড়ে যায়। ও চুপ করে থাকে। প্রতীতি আবার বলে, আব্বুর জন্য খুব মায়া লাগসে আমার। স্নিগ্ধা অবাক হয়ে যায়, 'আব্বুর জন্য? কেন?' ত লাগবে না? এত বড় মানুষটা কীরকম দুর্বল.. 'দুর্বল? মানে কী?' প্রতীতি তখন বোঝায়, দ্যাখ, আম্মু কী না করে আমাদের সবার জন্য, আব্বু এই যে রাগ দেখাল, আম্মুর এখন মনে হবে না, এত কষ্টের মূল্যায়ন এই? তখন তার মনটা খারাপ হবে না? এর চেয়ে যদি রাগটা কে কন্ট্রোল করত, আর বলত, তুমি পাতিলটা ধুয়ে দাও, আমি আরেকবার চা বসাই, আজকে ভাল চা খেতে ইচ্ছা করছে, আম্মু সুন্দর হাসিমুখে আবার চা বানায় দিত। যে মানুষ ফল ভাল হবে জেনেও দুই মিনিটের জন্য নিজেকে কন্ট্রোল করতে পারেনা তাকে দুর্বল বলব না ত কী? স্নিগ্ধা খুব মজা পেল শুনে। তাই ত! ওর বাবার রাগের মাথায় চেঁচামেচি দেখে তাহলে ভয় পাওয়ার কিছু নেই, করুণা করা উচিৎ? এভাবে দেখলে কিন্তু আবার কেমন জানি বিতৃষ্ণা ব্যাপারটাও আসেনা।
কিন্তু আম্মু? স্নিগ্ধা সন্তর্পণে জানতে চায়, আন্টি খুব আপসেট, তাই না? আংকেল শুধু শুধু এমন করল? প্রতীতি হেসে বলে, 'না রে, আমার আম্মু মানুষটা অনেক সেনসিটিভ হলেও আব্বুর সাথে কখনও ইয়ে হয়না। স্নিগ্ধা হতবাক। মানে? কেন? কারণ আম্মু সবসময় বলে সংসারে মেয়েদের ক্ষমতা কতখানি এটা মেয়েরা বোঝেনা। একটা ছেলে ঘরে কমফোর্ট আর একটু সুপেরিয়রিটি ছাড়া কিন্তু আর কিছু চায়না। তুই যদি আপাতদৃষ্টিতে একটু ঝাড়ি বা রাগ হজম করিস, আর একটু যত্ন করিস, তোকে মাথায় তুলে রাখবে। তুই বছরের পর বছর ঝগড়া করেও যেটা আদায় করতে পারবিনা, রাগ হজম করলে অনেক সহজে পেরে যাবি। কারণ হঠাৎ অযৌক্তিক রাগ করে ফেলার পর একটা অপরাধবোধ হয়, তাইনা? তখন যদি পার্টনারের কাছে ডিফেন্ড করতে না হয়, উল্টো আরো কেয়ার পায়, তখন আপনি মনটা অনেক ঝুঁকে যাবে। চাই কি প্রায়শ্চিত্ত করতে একটু বাড়তি খাতিরও করতে পারে কয়েক দিন।
স্নিগ্ধার তাও ভাল লাগলনা। বলল, তা না হয় বুঝলাম, কিন্তু তাই বলে আংকেল এরকম যখন ইচ্ছা করবে, আর আন্টি সহ্য করবে? প্রতীতি বলে, নাহ! বললাম না, আম্মু অনেক সেনসিটিভ। আমি শিওর তিন চার দিন পর আব্বু কে চা দেয়ার সময় আম্মু আমাকে বলবে, 'এ্যাই পৃতু, এইদিক এসে দাঁড়া ত! ক্যাচ ধরিস, তোর বাবাকে চা দিচ্ছি।' ব্যাস! সাপও মরল, লাঠিও ভাঙল না। স্নিগ্ধা হেসে ফেলল, আন্টির ত খুব বুদ্ধি তাহলে! প্রতীতি বলে, আম্মু এসব মহানবীর জীবন থেকে শিখেছে। আমাদের মহানবী কে উমর একবার কড়া কড়া কথা বলেছিল, সব সাহাবীদের সামনে। ঐটা খুবই ক্রুশিয়াল টাইম ছিল মুসলিমদের এক হয়ে থাকার জন্য। কিন্তু মহানবী উমর কে কিছু বলেন নি। পরে উমর ভুল বুঝতে পেরে লজ্জায়, ভয়ে শেষ, উনার কাছে গিয়ে সালাম দিতে মহানবী সুন্দর উনার সাথে নরমাল কথাবার্তা বললেন, যেন কিছুই হয় নি। আরেকবার আয়িশা উনার সাথে গলা উঁচায় কথা বলছিল, এই দেখে আয়িশার বাবা আবু বকর আয়িশাকে মারতে যায়। তখন মহানবী ঠেকায়, আর হেসে আয়িশা কে বলে, দেখলে ত, মিয়া সাহেবের থেকে তোমাকে কেমন করে বাঁচালাম? আমার আব্বু আম্মুও আর দশটা কাপলের মত ছিল। আমার বড় ফুফু উনাদের কুরআন হাদীসের সাথে পরিচয় করিয়ে দেন। এই যে আব্বা রাগ দেখাল, আমি নিশ্চিত জানি আব্বা দুই রাকআত নফল পড়ে এই কাজের জন্য মাফ চাবে।
স্নিগ্ধা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে। প্রতীতি সবই লক্ষ্য করে, কিছু বলে না। মনে মনে প্রার্থনা করে, আল্লাহ, তুমি এই মেয়েটিকে রক্ষা কর। ওর মাধ্যমে তুমি ওর বাবা মাকে সঠিক পথে ফেরাও।
No comments:
Post a Comment