আমি চিরকাল শুধু বড় বড় দুঃখ কষ্টের কল্পনাই করে আসলাম। আমার দুঃখ কষ্টের কাহিনী পড়লে মানুষ হাসবে, বলবে আহ্লাদী মেয়ের দুঃখ বিলাসিতা। তবু জানি, ছোট হলেও আমার দুঃখ পাওয়ার পরিমাণ ছোট ছিলনা। তাতে রিঅ্যাক্ট করার ধরণও ছোটখাট ছিলনা।
প্রথম ইউ এস এ তে আসার পর তিনটা ল্যাব ঘুরে যে ল্যাব এ থিতু হব ভেবেছিলাম, সে ল্যাবের সুপারভাইজর একটা আজব মানুষ। নেহাত তার কাজটা পছন্দ বলে মুখ বুজে সয়ে যাচ্ছিলুম। কিন্তু তবুও হলনা। রোটেশন শেষে ইভালু্যয়েশনএ যাচ্ছেতাই কথাবার্তা লিখে দিল। এমনই সিরিয়াল মার্কা ভঙ্গিতে গায়ে জ্বালা ধরানো কথাবার্তা বলছিল, একটা সময় আমি হেসে ফেললাম, এরকম খাঁটি সিরিয়াল রিয়েল লাইফে দেখা যায়? ত মোটামুটি ঘন্টাখানেক তার বক্তব্য শুনলাম, হাসি হাসি মুখ করে। বেচারি আর কিছুতেই বাগে না পেয়ে আমাকে বলল, পিএইচডি তে থাকতে হলে ত একটা ল্যাব এ অ্যাক্সেপ্টেড হতে হবে। তোমাকে ত শুনলাম কোন ল্যাবই নিতে চায় না। আমি আকাশ থেকে পড়লাম। কে বলেছে? আগের দুটো ল্যাবের ইভালুয়েশন এ সব ভাল কথা, কোন ইয়ে ছাড়াই জয়েন করতে বলেছে... সে রেগেমেগে বলল, you know what, it's not even my headache to tell you what you r, you'd better go and ask them.
হ্যা, আমার ত খেয়ে দেয়ে কাজ নেই, জনে জনে জিজ্ঞাসা করে বেড়াব 'এই, তুমি কি আমার সম্পর্কে ঐ ফ্যাকাল্টিকে কিছু বলেছ? এমনভাবে আমার কনফিডেন্স মেরে দিল, এত সাধের পিএইচডি, সবাই যখন একটা না একটা ল্যাব ঠিক করে ফেলেছে আমি তখনও ভাসমান। তার মধ্যে জানি ও না এ দেশের হালচাল কেমন। আসলেও কি স্কুল থেকে বের করে দিবে নাকি! নতুন জীবনযাত্রা, এর মধ্যে কেবল মেধা কে পুঁজি করে মাটি কামড়ে পড়ে আছি। এই যদি হয় তার ফল, তাহলে দেশ ছেড়ে আসারই বা কী দরকার ছিল? এর মধ্যে এটা নিয়েও সন্দেহ জাগল, আদৌ কি আমি গ্র্যাড স্কুলে টিকে থাকতে পারব? দৈবক্রমে জাস্ট চান্স পেয়ে যাইনি ত? মানে যাকে বলে অস্তিত্ব নিয়েই সন্দেহ - এই রকম অবস্থা। সে কি আমার দুঃখ! অনেকে বলবে 'এইটা কিছু হইল? এর কথা পাত্তা না দিলেই ত হয়!' আরে পাত্তা না দিয়ে থাকতে পারলে ত সব ঝামেলাই শেষ। তাই যদি পারতাম তাহলে কি ছাই এত বছর কচ্ছপ হয়ে কাটাতাম!
স্কুলে থাকি কি না থাকি সেটা ত এক কথা, আমার পঙ্গু হয়ে যাওয়া আত্মবিশ্বাসএর কী হবে? শোয়া থেকে উঠতে পারিনা, মনে হয় শরীরে শক্তি নাই, বসলে দূরে... তাকায় থাকতে থাকতে চোখ ঝাপসা হয়ে আসে। জীবনে কেউ আমাকে এত খারাপ কথা বলে নাই। শুধু চোখে পানি আসে। আস্তে আস্তে একটু ধাতস্থ হয়ে চিন্তা করলাম, আল্লাহও কি আমাকে এমন মনে করে? নাহ! পান থেকে চুন খসলে কি আল্লাহ ডিসমিস করে দেয়? নাহ! তাহলে আমি বোধহয় মানুষটা পুরোপুরি অকাজের না। ইনার কাছে হতে পারি, আল্লাহর কাছে না। আল্লাহকে বললাম, আল্লাহ, তুমি যদি আমাকে সম্মান দাও তাহলে আর কারো অপমান আমার গায়েই লাগবেনা। আর সারা দুনিয়ার সম্মানের বদলেও আমি তোমার অসম্মান কিনতে চাইনা তার চেয়ে তুমি বরং আমাকে ঐ মহিলাকে দিয়ে ঝাটু পেটা করাও, তাও ভাল।
আত্মবিশ্বাস একটু হইল। বাকিটা ভাল করে কাজ করলে হয়ে যাবে। এখন সমস্যা হচ্ছে এই ভদ্রমহিলার চিন্তা ত মাথা থেকে দূর করতে পারছিনা। যত মনে হয় গা জ্বলে যায়, এর একটা কথাও সত্যি না... সে নিজে কী, নিজে আমার সাথে কী কী করসে... ইত্যাদি ইত্যাদি। ওমা! এর ত দেখি শেষ ই নাই! বাজে কথা মনে আসতেসে ত আসতেসেই। খেয়াল করে দেখি আমার ইগো বুস্ট করার জন্য আমি তার নামে একটার পর একটা দোষ বের করেই যাচ্ছি। ইমা! তাহলে আর লাভ হল কী? সে আমার সাথে ঝগড়ার কারণে কষ্ট দিতে আমার যোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে, আমি আমার যোগ্যতা যে আছে এটা প্রমাণ করার জন্য তার কমেন্ট করার যোগ্যতা নিয়ে চিন্তা ভাবনা করছি। সাত পাঁচ ভেবে দেখলাম এরে মাফ করে না দিলে মনের মধ্যে খোঁচাখুঁচি চলতেই থাকবে। কিন্তু আমার মন কি আর রাসুলুল্লাহ (স) এর মত? বললাম আর মাফ করে দিলাম? তাহলে ত কথাই ছিল!
আল্লাহর কাছে চুপিচুপি বললাম, আল্লাহ, আমি ওকে মাফ করে দিচ্ছি, কিন্তু তুমি জান আমি কত কষ্ট পেয়েছি। আল্লাহ তুমি ওকে মাফ করনা, এই কষ্টের বিচার তোমার জন্যই তুলে রাখলাম।
এখন যে কী ভাল্লাগতেসে! রাগ হইলেই মনে মনে চিন্তা করি আল্লাহ কীভাবে কীভাবে তারে এই কাজের জন্য শাস্তি দিতেসে। হে হে!
ও! সে ভদ্রমহিলাকে দেখলে এখনও গা জ্বলে, কিন্তু আমি খারাপ ব্যবহার করলে ত তার দোষ কাটাকাটি হয়ে যাবে। তাই তার সাথে আমার এখন আর কোন শত্রুতা নেই।
No comments:
Post a Comment