পেটের মধ্যে ভুড়ভুড়ি দিয়ে লেখা ওঠে। ঠিক লেখা ওঠে তা না... অনেক কথা মাথায় আসে, কতক্ষণ পর আবার থাকেও না। এই জন্যই মানুষ বলে সৃষ্টি করার ক্ষমতা god-gifted. অনেক লেখকই দেখা যায় একটা সময় পরে আর আগের মত লিখতে পারেন না। এটা যদি আয়ত্ত করার জিনিস হত, তাহলে দিনে দিনে তা আরো ভালই হত। যেমন গান, নাচ। এর মধ্যে সৃষ্টি কম, নৈপুণ্য বেশি। একজন রাইটার আর একজন রিপোর্টারের মধ্যে পার্থক্য যে, রিপোর্টার পরিশ্রম করলে আরো ভাল লিখতে পারবে এটা নিশ্চিত। একজন রাইটার... বোধহয় না!
সৃষ্টি এতই মজার একটা জিনিস, নিজের সৃষ্টির উপর অ-স-ম্ভ-ব ভালবাসা জন্মে যায়। যারা ফেসবুকে নোট লিখে বেশ লাইক টাইক পেয়েছেন তারা বুঝবেন প্রশংসা পাওয়ার পর নিজের লেখা বারবার পড়তে কত ভাল লাগে। অথবা যারা নেচার বা মানুষের অভিব্যক্তির চমৎকার কিছু মুহূর্ত সাধের এসএলআর এ ধরে ফেলেছেন, তারা যেন আপন সন্তানের মত ভালবেসে ফেলেন ফটোগ্রাফি কে।
সৃষ্টিকে অনেক সময়ই তুলনা করা হয় প্রসব এর সাথে। (এই শব্দটা আমার কেন জানি কানে একটু খারাপ শোনায়, giving birth শুনতে আরেকটু ভাল।) এই কষ্টকর অধ্যায়টার মধ্য দিয়ে এখনও যাইনি, কিন্তু যখন মনে হয়, এইটুকু একটা জ্যান্ত পুতুল.. দুই হাতের তালুর উপর শোয়ায় রাখা যায়... শুধু শুধু হাত পা নাড়াচ্ছে, আলোর জন্য ঠিকমত তাকাতে পারছেনা... এত....... আদর লাগে! কিছুদিনের মধ্যে আবার আর কিছু বুঝুক না বুঝুক, মা কী সেটা বুঝে যায়। এক সেকেন্ডের জন্য মা চোখের আড়াল হলেই ক্যাঁ করে চিৎকার! এই মহা অসহায় ক্ষুদ্র জীবটার একমাত্র আশ্রয় আমি.... মনে হলে আর কিছু ভাল লাগে না। চাকরি, পড়াশুনা... সবই সেকেন্ডারি ইস্যু মনে হতে থাকে।
এই লিকলকে পিকপিকে প্রাণীটাই যখন চোখের সামনে আস্ত একটা মানুষ হয়ে যাবে তখন কী অবাকটাই না লাগবে! তার উপর যদি দেখি আমার দেয়া ছো্ট্ট একটুকরো আলোর রশ্মি তার মাঝে রংধনু হয়ে প্রতিফলিত হচ্ছে - আর মানুষ মুগ্ধ চোখে তাকে দেখছে... জীবনে কি আর কিছু্ পাওয়ার দরকার হবে? আমি এই মানুষটার মা - সে আমার কপি না, সে আমার চেয়ে আরো বহুগুণে পরিণত খাঁটি মনুষ্যত্বঅলা মানুষ - এই বোধের আনন্দ ত অন্যরকম! নিজের সৃষ্টি ত আমি যা বানাই তাই। কিন্তু এইখানে যেন আমি একটা আকাটা হিরেকে শত বর্ণচ্ছটায় উজ্জ্বল করে দিচ্ছি। কিংবা অনেকটা সখের বাগান করার মত। ফুলগুলো আমার সৃষ্টি না, কিন্তু তার সতেজ আভা আমার পরিশ্রম সার্থক করার জন্য যথেষ্ট।
সৃষ্টি আর পরিচর্যা ছাড়াও আনন্দের আরেকটা চমৎকার উৎস আছে। একজন মানুষ চিন্তাক্লিষ্ট, পথ খুঁজে খুঁজে দিশেহারা। তার সাথে কথা বলে যদি তার মুখে হাসি ফোটানো যায় - এত অদ্ভুত একটা ভাললাগা তৈরি হয়.... একটা সংসার বিবর্ণ হয়ে গিয়েছিল - আপনার মধ্যস্থতায় আবার জীবন ফিরে পেল। দূর থেকে সেই পরিবারটাকে দেখলে কেমন লাগবে আপনার?
আমার বোন আমার চেয়ে অনেক ছোট। অনেক সময় আমার মনে হয় আমাকে অন্ধকার থেকে তুলে আনার জন্যই আমার বোন পৃথিবীতে এসেছে। (কিশোর বয়সে কীভাবে কীভাবে যেন আমি একটু abnormal হয়ে গিয়েছিলাম। খালি সুইসাইড করতে ইচ্ছা করত। ) ওর যে কোন emotional প্রয়োজনে আমি থাকতাম, যতটা না ওর জন্য, তার চেয়ে বেশি নিজে বাঁচার জন্য। বাবা মায়ের ভাল সন্তানটা হয়ে থাকা ছাড়া আরও যে আমার কোন প্রয়োজন আছে পৃথিবীতে থাকার - এটা ও না আসলে কবে বুঝতাম কে জানে!
অন্যের জন্য বাঁচা - এটা যে মানুষ নিজেকেই বাঁচানোর জন্য করে সেটা বাইরে থেকে অন্যে বুঝবে না। বেঁচে থাকার একটা কিছু ত লাগবে! একটা কিছুর মাধ্যমে ত প্রমাণ করে যেতে হবে, আমি পৃথিবীতে ফেলনা না। আমি আসার যথেষ্ট প্রয়োজন ছিল। কেউ সেটা রেখে যেতে চায় সৃষ্টিতে, কেউ উত্তরসূরীতে, আবার কেউ পরের জন্য জীবনটা নি:শেষ করে।
সৃষ্টি, প্রতিপালন, বিপদ থেকে রক্ষা - এই কাজগুলো করে এত ভাল লাগে কেন তা নিয়ে বিজ্ঞানীরা যুগে যুগে মাথা ঘামিয়ে গেছেন। নিজের comfort নষ্ট করে কেন বোকা লোকগুলো এসব করে তার কোন স্পষ্ট ব্যাখ্যা দাঁড় করানো যায়নি। অথচ এই কাজগুলোর আনন্দের বোধটা এত সত্য, এত স্পষ্ট যে তাকে উপেক্ষা করারও উপায় নেই।
মোটা চোখে এসব 'বোকামো'র কোন মানে বের করা যায়না, কারণ এই আনন্দগুলি আসে spirituality থেকে। যে তাড়না আপনাকে ভাবতে শেখায়, খাওয়া ঘুম ছাড়াও পৃথিবীকে আপনার দেয়ার মত কিছু আছে - সেই তাড়নাই আপনাকে নিজের সীমা ছাড়িয়ে আরো বেশি কিছু হতে স্বপ্ন দেখায়। spiritualityর আনন্দ তথাকথিত ভোগের আনন্দের চেয়ে বেশি হবে এটাই স্বাভাবিক। ভোগ ত কেবল দেহটাকেই আরাম দিতে পারে। আর যত দেহের আরামের দিকে যাওয়া যায় মানুষের সাথে পশুর পার্থক্য তত কমে আসে। কারণ দেহ সব প্রাণীরই আছে, অপরদিকে soul বা spirit মানুষের অনন্য বৈশিষ্ট্য।
soul সবসময় চায় স্রষ্টার কাছাকাছি যেতে। সৃষ্টি, প্রতিপালন, বিপদ থেকে রক্ষা - এই কাজগুলো আমাদের কিছুটা সময়ের জন্য হলেও ultimate সৃষ্টিকর্তা, ultimate রক্ষাকর্তা, ultimate পালনকর্তার কথা ভাববার সুযোগ করে দেয়। এই পৃথিবীতে আমাদের ক্ষুদ্র অবদানের প্রতি আমাদের অসীম মমতা, অল্প কিছুক্ষণের জন্য হলেও আমাদের জন্য সৃষ্টিকর্তার অতুলনীয় দয়া ও মমতার কথা মনে করিয়ে দেয়। এটাই আত্মিক সুখ। দৈহিক সুখ যে এর কাছে পাত্তা পাবে না এতে আর আশ্চর্য কী?
মানুষ সচেতনভাবে চিন্তা করে বেছে নিতে পারে, সে কী চায়। body, না soul. আর রূদ্ধ চিন্তার পথ খুলে যায় পড়াশুনার মাধ্যমে। ফ্রান্সিস বেকন এর খুব চমৎকার একটা উক্তি আছে -
A little philosophy inclineth man's mind to atheism, but depth in philosophy bringeth men's minds about to religion.
অর্থাৎ স্বল্প জ্ঞান মানবমনকে ঔদ্ধত্যের দিকে ধাবিত করে, সত্যিকার জ্ঞানের গভীরতা তাকে স্রষ্টার আরো কাছাকাছি নিয়ে আসে।
আমি আক্ষরিক অনুবাদ করিনি, তবে philosophyর আদি অর্থ হচ্ছে love for knowledge, আর atheism বা নাস্তিকতা আমার কাছে ঔদ্ধত্য। ইসলাম এর আক্ষরিক অর্থ submission, একই রুট থেকে সালাম বা শান্তি শব্দটাও এসেছে। (এই শেষের লাইনটা আমি কারো কাছে ইসলাম প্রচার করার জন্য বলিনি, আরবি ভাষার আরো একটা শব্দে মুগ্ধ হয়েছি। তাই বললাম)
আমাদের ধর্মের স্রষ্টার চোখে যারা জানে আর যারা জানে না তারা কখনো সমান নয়। true knowledge acquire করে যারা soul কে উন্নত করেছে, আর স্বার্থপরের মত টাকা কামিয়ে যারা body কে সুখী করার চেষ্টায় ডুবে আছে - তারা আল্লাহর চোখে সমান না।
সম্ভাবনার কথা বলছিলাম। একটা মানুষকেও ষড়যন্ত্র করে মগজে কম জায়গা দেয়া হয়নি। কিন্তু মানুষ নিজেই বেছে নেয় এই মস্তিষ্কে সে কী জ্ঞান ভরে রাখবে। আশপাশ থেকে কোন জিনিসগুলি শিক্ষণীয় বিষয় হিসেবে গ্রহণ করবে। আহরিত জ্ঞান দিয়ে সে কী ধরণের সিদ্ধান্তে আসবে, আর কীভাবেই বা তা উদ্ভুত পরিস্থিতিতে প্রয়োগ করবে।
লাক্বাদ খালাকনাল ইনসানা ফী আহসানি তাকয়ীম
সুম্মা রাদাদনা হু আসফালা সাফীলিন
নিশ্চয়ই মানুষকে আমি সর্বোৎকৃষ্ট রূপে সৃষ্টি করেছি
তারপর সে নিকৃষ্টর চেয়েও নিকৃষ্টতর হয়ে যায়। (সূরা ত্বীন)
No comments:
Post a Comment