Monday, June 27, 2011

সম্পর্কের টানাপোড়েন - ১


ক্যারিয়ার ও প্রযুক্তি নির্ভর জীবনে খুব দ্রুত যে জিনিসটা বদলে যাচ্ছে তা হচ্ছে মানুষের সাথে মানুষের পারস্পরিক সম্পর্ক। মানুষ এখন তার গন্ডি থেকে বের হয়ে সহজেই নতুন জায়গায়, নতুন পরিবেশে আসন গাড়ছে। এই বদলে যাওয়া ফ্রেমে যখন সে সম্পর্কের পুরনো ছবিটা বসাতে যায় তখন মেলাতে পারেনা। পরিবেশ পরিস্থিতির সাথে বদল হয় একজনের প্রতি আরেকজনের চাহিদা, আশা আকাঙ্ক্ষা - অনেক সময়ই দেখা যায় এই পরিবর্তনটা একজন অনুভব করতে পারলেও অপরজনের কাছে স্পষ্টভাবে প্রকাশ করতে পারেনা। ফলে একজন হয়ত পুরনো দিন, পুরনো চাওয়া আঁকড়ে ধরে হা হুতাশে ব্যস্ত, অপরজন হয়ত নতুন জীবনের নতুন চ্যালেঞ্জ একা একা মোকাবেলা করতে করতে ত্যক্ত। 

আমরা অনেক সময়ই সম্পর্ক জিনিসটাকে খুব গ্র্যান্টেড ধরে নেই। মা আছে - আমি মায়ের সাথে যাই করি না কেন, মাকে গালিগালাজ, অবহেলা, অসম্মান, যা খুশি - তবু মায়ের যা যা করণীয় তার থেকে এক কণা কম দেখলে মায়ের উপর রাগ। মা এক সন্তানকে বেশি ভালবাসবে এ ব্যাপারটা আমরা অনেকেই মানতে পারিনা। অথচ যে সন্তান সবসময় মায়ের সেবা করে আসছে, ছোট্ট ছোট্ট খুশিগুলোকেও যত্নের সাথে পূরণ করে আসছে - তার প্রতি মায়ের সন্তুষ্টি বেশি থাকবে - এটাই ত স্বাভাবিক, তাই না? যে উদ্দেশ্যে এই কথাটা বলা - আমরা 'মা ত মাই, বন্ধু ত চিরকালই বন্ধু, স্বামী ত দলিল করা অধিকার' - এই মানসিকতা থেকে নিজেকে সরিয়ে যদি মনে করতে পারি, এটা একটা সম্পদ, এটাকে রক্ষা করার জন্য আমার শ্রম দিতে হবে - তাহলেই কেবল মাত্র আমার নোটটা পড়ে আপনারা উপকৃত হতে পারেন। 

এখন নেটওয়ার্কিং খুব সহজ হয়ে যাওয়ায় আমরা একটা সম্পর্কই ঘাত প্রতিঘাতের মধ্য দিয়ে পাকাপোক্ত করার থেকে নতুন নতুন সম্পর্ক ট্রাই করার প্রতি মনোযোগি হয়েছি। একই সাথে আমাদের বিনোদনগুলি এখন এমন যে তা উপভোগ করার জন্য অন্য কেউ পাশে থাকার প্রয়োজন নেই। এতে করে যেটা হয়েছে, আমরা প্রথম থেকেই কম ইন্টারএকশন করে বড় হচ্ছি। সুতরাং আমরা একটু অন্যরকম ব্যবহার দেখলেই ইরিটেটেড হয়ে যাচ্ছি।দ্বিতীয়ত, মানুষের থেকে মুখ ঘুরিয়ে শান্তি পাওয়ার জন্য অফুরন্ত বিনোদনের ব্যবস্থা আছে। সুতরাং প্রবলেম আসলেই আমরা মুখোমুখি না দাঁড়িয়ে নিজেকে আপন জগতে গুটিয়ে নিচ্ছি। 

তৃতীয়, সম্পর্কের প্রতি দায়িত্ববোধের ব্যাপারটা আমাদের কাছে স্পষ্ট না। একটা সম্পর্ক গড়লে (সেটা কলিগই হোক, প্রতিবেশীই হোক, শাশুড়ি বউই হোক, আর বাবা ছেলেই হোক) সেটার সাথে যেসব এক্সপেক্টেশন জড়িত থাকে সেসবের ব্যাপারে উদাসীন হয়েও আমরা দিব্যি জীবন কাটিয়ে দিতে পারছি। খুব কাছের মানুষও এসব ব্যাপারে আঙুল তুলে চোখে দেখিয়ে দেয়ার অধিকার রাখেনা, যেহেতু আমরা পার্সোনাল ব্যাপারের সীমাটা বাড়াতে বাড়াতে সব কিছুই তার মধ্যে এনে ফেলেছি। 

চতুর্থ, সাফল্যের মাপকাঠিটা এখন পুরোপুরিই ক্যারিয়ারভিত্তিক হওয়াতে এ বিষয়গুলো এখন অনেকটাই গৌণ। মানুষ ব্যালেন্সড লাইফ অর্জন করার বদলে জিনিয়াস হওয়ার দিকে ঝুঁকে পড়েছে। তাই ফ্যামিলি লাইফে বা সোস্যাল লাইফে কে কতটুকু ইনভলভড, এ ব্যাপারটা যেন আজকাল পাত্তাই পেতে চায়না। ক'টা বাবা মা এখন সন্তানকে পড়াশুনার বাইরে অন্য কিছু করতে উত্সাহ দেন? এতে করে সন্তানেরা ছোটবেলা থেকেই একটা মেসেজ পেয়ে যায় যে পড়াশুনা (নামান্তরে ক্যারিয়ার) এর সাথে কোন আপোষ চলবেনা। এই দৃষ্টিভঙ্গি পরবর্তিতে একটা মানুষকে খুব আত্মকেন্দ্রিক, স্বার্থপর করে তোলে।

No comments:

Post a Comment