দোস্ত, তোর প্রশ্নের উত্তর ভাবতে ভাবতে গতকাল ঘুমাতে দেরি হয়ে গিয়েছিল। (আমার এক বান্ধবীর কাছে জানতে চেয়েছিলাম আল্লাহ সম্পর্কে তার ধারণা কী? সেও তিনদিন ধরে ভেবে কূলকিনারা করতে পারেনি।) ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে চমৎকার কিছু কথা মাথায় এসেছিল, এখন কতটুকু লিখতে পারব কে জানে!
প্রথমেই বলে রাখি, আল্লাহ পুরোপুরি আমার নিজস্ব সম্পত্তি। আল্লাহ কেবল আমার। আল্লাহ আমার, আমার এবং পুরোপুরি আমি ছাড়া আর কোন কিছু নিয়ে আল্লাহর কোন মাথাব্যথা আছে এটা আমি ভাবতে চাইনা। আমরা সিজদায় যে 'সুবহানা রাব্বিআল আলা' বলি এর মানে কী জানিস? Glory be to MY lord, the most high. আমার আল্লাহ, যিনি সবচাইতে উপরে, সব কিছুর উপরে - আমি তার প্রশংসা করি। এবার চিন্তা করে দ্যাখ, আমরা জামাতে নামায পড়ছি, একসাথে রুকু সিজদা, ঘাড় ঘোরানো - সব এক, অথচ বলছি আমার আল্লাহ, আমাদের আল্লাহ না! কারণ টা কী?
উত্তরটা দেখি ধীরে ধীরে স্পষ্ট হয় কিনা!
আল্লাহ আমার সাথে কথা বলার জন্য যে একটা বই বানিয়েছে - সেখানে সে আমার বোঝার সুবিধার জন্য তার বেশকিছু স্বভাব চরিত্র লিখে রেখেছে, যাতে আমি বুঝতে পারি তার সাথে আমার সম্পর্ক টা কী, ধর, একজন বয়স্ক ভদ্রমহিলা, তিনি আমার নানী হলে যে রকম আহ্লাদ করব, স্কুলের হেড মিস্ট্রেস হলে ত সেরকম করব না। আল্লাহর সাথে আমার সম্পর্ক টা unique, এবং অনেক রকম শাখা প্রশাখা ছড়ানো, আমি বুঝতে ভুল করে ফেলতে পারি, তাই সে পরিষ্কার বলে দিয়েছে তুমি আমার থেকে এটা এটা এটা আশা করতে পার। চল্ কয়েকটা আলোচনা করি।
আল্লাহ নাকি আমার creator. তাই নাকি? ও আচ্ছা, থ্যাংক ইউ। কিন্তু মানে কী কথাটার? আচ্ছা বুঝলাম কোন ভাবে আমাকে বানিয়েছে, ত আমি কী করব? এই বার ভেবে দ্যাখ, তোর একটা ছোট্ট কুকুর ছানা আছে, সে তোর চোখের সামনে বড় হল, তোর বাসার সবাইকে চিনল, তুই ওকে ফ্রিজবি খেলা শিখালি, বাথরুম করা শিখালি, চার পাঁচ বছর তুই তাকে পাললি, তার আগা টু গোড়া সব তোর চেনা হয়ে যাবে না? এমনকি লেজ নাড়ালেও তুই বুঝে যাবি না সে কী বলতে চায়? মায়েরা পাগলের মত দিন নাই রাত নাই ছোট বাচ্চা নিয়ে পড়ে থাকে, টিন এজ আসতে আসতে সেই বাচ্চার প্রতিটা মুভমেন্ট তার মুখস্ত হয়ে যায় না? আল্লাহ আমাকে বার বার বলেছে আমি তোমার সব তৈরি করেছি, আমার চিন্তা, ইন্টেলেক্ট, কথা বলার ধরণ - সব সে নিজে বানিয়েছে, তারপর বানিয়ে রাস্তার মধ্যে ছেড়ে দিয়ে চলে যায় নাই, আমাকে নাকি পালছেও। তাইলে সে আমাকে কীরকম ভাল মত চিনে! আর আমার জন্য তার স্নেহ কী রকম উপচায় পড়ার কথা!
আরেক ভাবে চিন্তা কর, বাইরে কাজ করতে গেলি, তোর সুপারভাইজর/কলিগ/টিচার - কেউ একজন তোকে অপমান করতে করতে মাটির সাথে মিশায় দিল, তখন মনে হয়না, এক ছুটে বাসায় চলে যাই? গোল পাকায় গুটি সুটি মেরে মায়ের (অথবা বয়ফ্রেণ্ড) এর বুকের মধ্যে ঢুকে যাই? আমার মা চাদর দিয়ে পেঁচায়, গালের মধ্যে মুখ ঠেকায় বলবে "কেউ না জানুক, আমি ত জানি তুমি কত precious, তুমি কত ভাল, কত সুন্দর। তোমার মত আর কেউ নাই। YOU ARE SPECIAL TO ME, YOU ARE SPECIAL, YOU ARE UNIQUE." কত ভাল্লাগবে তখন? সব কষ্ট দূর হয়ে যাবে না? মনে হবে না? আমার আর কিছু দরকার নাই, আমার মা আছে, আমার মা কখনো মিথ্যা বলে না...
আল্লাহ আমাকে আমি জন্মানোর ও আগে বইতে প্রতিশ্রুতি দিয়ে রেখেছে, আর কাউকে না পেলেও আমি আছি। আমি নিজে তোমাকে তৈরি করেছি, তোমাকে যে জ্ঞান, চরিত্র, পারিপার্শ্বিকতা দিয়ে বড় করেছি সেখানে তোমার সমকক্ষ আর কেউ নেই। তুমি আমার কাছে unique, আমি অনেক আশা নিয়ে তোমাকে তৈরি করেছি, আমি জানি তোমার potential কোথায়, তুমি হতাশ হয়ো না! তোমার মত আর কেউ নাই, তুমি হারায় গেলে কীভাবে হবে? তোমার জায়গা ত আর কেউ নিতে পারবে না!
আবার ভেবে দ্যাখ, ছোট বেলা বাইরে খেলতে গিয়ে নতুন জুতা টা ছিড়ে আসলি, বড় বেলায় লোভ সামলাতে না পেরে টাকা চুরি করে বসলি, অথবা অসতর্ক হয়ে এক্সিডেন্ট এ একটা মানুষকেই মেরে বসলি। কত অনুতপ্ত লাগতে থাকে, মনের মধ্যে কেউ বলতে থাকেনা, আমি আসলে এরকম না, একবার হয়ে গেছে, আর হবে না। বিশ্বাস কর! কেউ বিশ্বাস করুক না করুক, আল্লাহ কিন্তু ঠিকই বলবে, থাক, কিছু হবে না, আর কখনো কর না, কেমন? তারপর তুই একই ভুল আরো দশ বারো বার করলি, ইচ্ছা করে যে, তা না, কেমনে কেমনে যেন হয়ে যায়, তুই চেষ্টা করছিস, কিন্তু পারছিস না - দুনিয়া কোন চীজ আছে যে তার পরেও তোকে বিশ্বাস করবে? আল্লাহ করবে। আল্লাহ বলেই রেখেছে Allah is the most forgiving and most patient!
তারপর আছে সে প্রতিশোধ গ্রহণকারী এবং সূক্ষ্ম ন্যায় বিচারক। শুনলেই ত বুকে কাঁপাকাঁপি লেগে যায়। কিন্তু ব্যাপারটা যে উল্টা দিক থেকেও সত্যি এটা কি খেয়াল করেছিস? তোর সাথে অন্যায় হলে এর প্রতিশোধ আল্লাহ নিবে, তোর শুধু শুধু জ্বলে পুড়ে খাক হওয়ার কোন দরকার নাই। তার ন্যায় বিচার এমনই সূক্ষ্ম যে তোর কোন সূক্ষ্ম কষ্টের বিচার করতে সে বাদ রাখবে না। তাহলে কেন বাপু মিছেমিছি এসব নিয়ে মাথা ঘামানো? আরো কত ভাল ভাল কাজে বুদ্ধি খরচ করা যায়!
সে সবজান্তা। এর মানে সে যে খালি আমার ability টাই জানে তা না। সে ভুত ভবিষ্যত, সম্ভব অসম্ভব সব জানে। ধর তুই তোর অনার্স এর সাবজেক্ট ঠিক করতে চাস, অথবা একটা বিজনেস এর চিন্তা ভাবনা করছিস, অথবা নতুন কোন পরিবারে আত্মীয়তা করতে আগ্রহী। তুই জানিস না কী করতে হবে, তোর আশপাশের মানুষরাও তত ভাল জানেনা। আসলে ভবিষ্যতে কী হবে এইটা ত পুরাপুরি জানা সম্ভব ও না। কিন্তু আল্লাহ বলেছে সে নাকি সব জানে। তাহলে তাকেই জিজ্ঞাসা করি! ঝটপট দুই রাকাত ইশতেখারা নামায পড়ে ফেল। ইশতেখারা করা মানে পরামর্শ চাওয়া অনুমতি চাওয়া। ধর, তোর ছোট কেউ তোকে কোন কলেজ এ পড়বে জিজ্ঞাসা করল, তোর কতটা honored লাগবে না? তোর সাধ্যের মধ্যে যা আছে তা্র সবটুকু করতে ইচ্ছা করবে না? অন্যদিকে আল্লাহ ত সব জানেই প্লাস সে সব কাজের অনুমতি ও দেয়। তুই অনুমতি চাইলে উনি খূশি হবে, তোর জন্য ভাল হলে কাজটা অনেক সহজ করে দিবে, খারাপ হইলে হইতে দিবে না, এমনকি স্বপ্নেও জানায় দিতে পারে।
আল্লাহর আরো অনেক গুণ আছে, সবগুলি ত ভালমত বুঝিও না। তবে একটা গুণ মনে দাগ কেটে গেছে। He is the beginning and He is the end. আমার জীবন শুরুর অনেক আগে থেকেই সে আমার জন্য সব ঠিকঠাক করে রেখেছে, আমার জীবন শেষ হয়ে গেলেও তার সাথে আমার সম্পর্ক শেষ হবেনা। সে ত আর মরবে না! অতএব আমার কথা তার মনে থাকবে। একই ভাবে, কোন কাজ, কোন সিদ্ধান্ত নেয়ার সময় - At the beginning, He will be the one to be remembered - এর মানে খালি বিসমিল্লাহ বলে ঝাপায় পড়লাম তা না, কোন সিদ্ধান্ত নেয়ার আগে আল্লাহর সাথে আমার সম্পর্কে কী প্রভাব পড়বে সেটা চিন্তা করতে হবে। যদি দেখি যে এই মন্তব্য টা করলে বা এই মুভি টা দেখলে আল্লাহ খুশি হওয়ার কোন বিশেষ কারণ নাই, তাহলে সেটা থেকে দূরে থাকতে হবে। একই ভাবে, কোন কাজ শেষ হওয়ার পর প্রকৃত ফল টা আল্লাহর থেকে আশা করতে হবে। আমি ভাল ভাল নোট লিখলাম, আর মানুষ ধুমায়া গালিগালাজ করল, সেই জন্য গাল ফুলায় আর তাগো লগে কথাই কইলাম না - এরকম করলে ঠিক হবে না। আমি রান্না বান্না বিশেষ পারি না, কিন্তু প্রায়ই সিদ্দিকা কবীর এর বই দেখে এক ঘন্টার রান্না ছয় ঘন্টা ধরে করে ছেলেপেলেদের খেয়ে যেতে বলি। এই আশায় না যে এর পরের দিন ওরা আমার হয়ে বাজার করে দিয়ে যাবে, অথবা আরেক বেলা সে আমারে খাওয়াবে। আল্লাহ যদি একটু আধটু খুশি হয় এই আশায়।
যাই হোক, আল্লাহ অন্যের কাছে কী জানি না, আল্লাহ আমার জন্য এমন। আল্লাহ আমার খুব প্রিয়। সে আমার জন্য কী কী করে আমি মাঝে মধ্যে টের পাই, তখন চোখে পানি চলে আসে। তোদের ও নাকি আল্লাহ আছে? তোদের আল্লাহ মনে হয় আমার আল্লাহর মত এত ভাল না, তাই না?
No comments:
Post a Comment