আগের লেখাগুলি পড়লে দেখবেন আমরা টানাপোড়েনের এমন এক তিতিত্যাক্তকর অবস্থায় পৌঁছে গেছি যেখানে অনেক ধৈর্য ধরে নানাভাবে কমিউনিকেট করে মানুষটাকে কনভিন্স করার পরেও তার কাজে যথেষ্ট পরিবর্তন আসছেনা। নিজেকে ঐ অবস্থায় একটু চিন্তা করে দেখুন, রাগে গা চিড়বিড় করতে থাকবে। মনে হবে, কীসের জন্য এত কিছু করব? আমি কি এতই ফেলনা? আমার চাওয়াপাওয়ার কোন দাম নেই? আজকে আমি ওকে ফেলে গেলে সে কোথায় থাকবে?
এই যে এই ন্যায়সঙ্গত, যুক্তিসঙ্গত বিচার বিশ্লেষণ - এই কাজটা শিকেয় তুলে রাখতে হবে যখন আপনি সত্যি সত্যিই সম্পর্কের উপর কাজ করছেন। প্রথমত: আপনি কাজ শুরুই করেছেন এটা নিশ্চিত হয়ে যে সমস্যাটা আপনার মধ্যে না। সে বোকা, সে ইমম্যাচিউর, সে গাধা, সে অহঙ্কারী, সে স্বার্থপর - কিন্তু এই মানুষটাই একটা সময় অন্যরকম ছিল যা দেখে আপনি মুগ্ধ হয়েছেন। কোন না কোনভাবে আপনার মন ছুঁয়ে যাওয়ার যোগ্যতা তার মধ্যে ছিল। এখন পারিপার্শ্বিকতার চাপে সে নিজেকে ভুলে গেছে, অথবা সে বেচারার বেড়ে ওঠাই এমন এক পরিবেশে যে এই অন্যায়টা তার কাছে লজিক্যাল। এই চিন্তা ধরে কাজ শুরু করলে আপনি বাই ডিফল্ট একটা উঁচু স্তর থেকে ঐ হতভাগা মানুষটাকে দেখছেন। তার কাজ আপনাকে কষ্ট দিচ্ছে কারণ সে মূর্খমানবের আপনার লেভেলে ওঠার যোগ্যতা নেই। আপনি মনুষ্যত্বের দিক থেকে নিচে পড়ে থাকা একটা প্রাণীকে হাত ধরে উপরে তোলার চেষ্টা করছেন, সে এতটাই উদ্ভট যে হাতটা ধরতে গেলে পর্যন্ত কামড়ে দিচ্ছে। এবার বিচারের ভার আপনার উপর। তাকে ওখানেই ছেড়ে আসবেন চিরকালের মত? আপনি হাতটা শক্ত করে না ধরলে কিন্তু কোনদিন সে আলোর মুখ দেখবে না!
যাই হোক। মনটাকে স্থির করে নিয়েছেন ত? এবার ইন্টেলেক্টের সর্বোচ্চ ব্যবহার করতে হবে। আপনি নিজেকে তার জায়গায় বসান। তার মত করে চিন্তা করুন। তার পরিবেশ, বেড়ে ওঠা, স্ট্রেস ডিল করা, চিন্তা করা, ইন্সটিংক্ট এর দাসত্ব করা, ইগো নিয়ে চলা - সব অবজার্ভ করুন। এতটাই তাকে স্টাডি করুন যে একটা কিছু হলে আপনি সাথে সাথে বুঝে ফেলতে পারেন যে সে কী বলবে বা কী চিন্তা করবে। এর মধ্যে দেখবেন ওর আরো অনেক নেগেটিভ দিক আপনার সামনে চলে আসছে, ওভারলুক করুন, আপনি ড্যাটা কালেক্ট করছেন, সে ভাল না মন্দ সে বিচারে যাবেন না।
এতখানি রিফ্লেক্ট করার পর আপনি এমনিতেই বুঝতে পারবেন, একটা দুটো বিশ্বাস, বা কোন একটা পুরনো ঘটনা তার মনে ঐ ব্যাপারটা শক্ত করে গেড়ে দিয়েছে, যার কারণে সে নিজের অজান্তেই ওটাকে ঘাঁটি করে সবসময় অন্যায় কাজটা করে যাচ্ছে। আমার এখানে এক পরিচিত ভদ্রলোক সবসময় সব পাকিস্তানিকে গালি দিয়ে কথা বলেন। উনার মনে মুক্তিযুদ্ধজনিত পাক-বিদ্বেষ এমনভাবে ঢুকেছে যে আস্ত জাত তুলে গালি দেয়া উনার কাছে খুবই লজিক্যাল মনে হয়। উনি এর মধ্যে দোষ দেখতে পাননা। আমরা যারা সাব-কন্টিনেন্ট থেকে এসেছি তারা সময়ের ব্যাপারে খুবই দায়সারা (সবাই না), এর কারণ আমরা যে সেটআপে বড় হয়েছি সেখানে এটা তেমন দোষের কিছু না। এখন আমার আমেরিকান সুপারভাইজর যদি এ ব্যাপারে খুবই অনমনীয় হয় তখন আমাদের সম্পর্কের অবনতি হবে। এরকম প্রত্যেকটা কাজের পিছনেই মানুষের নিজস্ব ফিলসফি বা মাইন্ড সেটআপ থাকে। সেটা বুঝে ধৈর্য ধরে সেই ব্যাকগ্রাউন্ডের উপর কাজ করলে হয়ত সমস্যার মূল ধরে তুলে আনা যাবে।
কী? খুব বেশি পরিশ্রম মনে হচ্ছে? আপনার কী ধারণা? সম্পর্ক এতই সস্তা? একটা সত্যিকার সুন্দর সম্পর্কের কথা চিন্তা করুন ত চোখ বুজে? যে সম্পর্কে শ্রদ্ধা আছে, বিশ্বাস আছে, ঠাট্টা করার মত ইলাস্টিসিটি আছে, আশ্রয় আছে, শান্তি আছে - এমন মধুর সম্পর্ক কি আমাদের এই পঙ্কিল পৃথিবীতেই স্বর্গের সান্নিধ্য দেবেনা?
No comments:
Post a Comment