Monday, June 27, 2011

আত্মতুষ্টি


ব্লগপাড়ায় আমি পুরোপুরিই নতুন। কিন্তু তারপরেও শুভাকাঙ্ক্ষী পেতে সময় লাগেনি। তাদেরই একজন বললেন নোটের কমেন্ট পেলে ছোট্ট করে জবাব দিতে। এতে পাঠক খুশি হয়। আমি অকূল পাথারে পড়ে গেলাম। কেন, একটু পরে বলছি। 

গত শুক্রবারে জুম্মায় intention নিয়ে কথা বলছিল। অনেকেই বোধহয় ইমাম নববীর ৪০ হাদিস এর কথা জানেন। ইমাম নববী অনেক বাছাই করে শত শত হাদিস থেকে মাত্র চল্লিশটা হাদিস নিয়ে একটা সংকলন বের করেছিলেন। এতে এমন হাদিসগুলোই জায়গা পেয়েছিল যেগুলো মানুষের জীবনে খুবই কাজে লাগবে বলে তিনি মনে করেছিলেন। ইয়া মোটা বই, তিনটা খণ্ড। এক লাইনের হাদিসএর উপর দশ-বার পৃষ্ঠা বিশ্লেষণ। ত সেই বইয়ের প্রথম হাদিস হচ্ছে, 

'প্রত্যেক কাজের ফলাফল তার নিয়্যতের উপর নির্ভরশীল। প্রত্যেক ব্যক্তি তাই পাবে যা সে নিয়্যত করেছে।..' 

শুনতে খুব ছোট, কিন্তু চিন্তা করতে থাকলে এই দুইটা লাইন থেকে অনেক কিছু বের হয়। এই যেমন, 'প্রত্যেক কাজ।' প্রত্যেক কাজ? সকাল বেলা উঠে চা বানালাম, ল্যাব মিটিং এ প্রেজেন্ট করলাম, আমার স্বামীর সাথে কিছুক্ষণ বসে বার্সেলোনার খেলা দেখলাম - এই সব জিনিসের নিয়্যত? খাইসে! এর ত কোন নিয়্যতই করি নাই! ভাল্লাগসে, করসি, দরকার ছিল, করসি। 

এই হাদিসটার আমি মনে করি বেস্ট পার্ট হচ্ছে এই 'প্রত্যেক কাজ' অংশটা। এতে করে হবে কী, আমরা আমাদের কাজে আরো অনেক বেশি চিন্তা ইনভলভ করব। দোকানে নারকেল তেল কিনতে গেলে প্যারাসুট ই প্রথমে হাতে লাগে। কেন? কারণ টিভিতে অ্যাড এ বলেছে এটা খাঁটি। বছরের পর বছর গুলশান এভিনিউ ফলো করব। কেন? (উত্তরটা আমি জানিনা।) নিজের কাজকে যত বেশি প্রশ্ন করতে অভ্যস্ত হব, তত আমরা ইন্‌সটিংকট এর দাসত্ব থেকে বের হয়ে বুদ্ধিমান প্রাণীর মত আচরণ করব। 

তেমনি কথা বলার ক্ষেত্রেও। জিহ্বার (অথবা কীবোর্ডের) উপর কড়া কন্ট্রোল আছে এমন মানুষ কমই আছে। আমাকে কেউ গীবত করতে আসলে আমি জিজ্ঞাসা করি, 'এই কথাটা কেন বললা?' বেচারা থতমত খেয়ে যায়। মিনমিন করে বলে, 'না জানায় রাখলাম আর কি!' মেজাজ খারাপ থাকলে তখন আরো ধরে বসি, 'এই ইনফরমেশনটা আমাকে কীভাবে হেল্প করবে?' খিক্ খিক্! আর এই বুঝে শুনে কথা বলার অভ্যাসটা অন্যদের থামাতে যত না সাহায্য করেছে, আমার আমাকে থামাতে তার দশগুণ বেশি কাজে লেগেছে। আমি এখনও জিহ্বাকে নিয়ন্ত্রণে আনার যুদ্ধ করে যাচ্ছি। 

এরপর আসছে ফলাফল। ফলাফলকে দুই ভাগে ভাগ করা যায়। জাগতিক ফলাফল, আধ্যাত্মিক ফলাফল। খুব জাগতিক কাজকেও টেনে আধ্যাত্মিক ফলাফল বানায় ফেলা যায়। আবার আধ্যাত্মিক কর্মকান্ডও জাগতিক স্তরে নেমে আসে যদি নিয়্যতে গোলমাল থাকে। 

দ্বিতীয় ঘটনার উদাহরণ ত আমাদের চারপাশে অহরহ দেখি। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে আমরা কোন স্টেটমেন্ট শুনলে চারপাশে উদাহরণ খুঁজি, নিজের মধ্যে খুঁজি না। এই লেখাটা লিখতে লিখতেই খুব খিদে পেয়েছিল। রুটিতে জেলী মাখতে মাখতে মনে হল, আচ্ছা, এই কাজটাকে কি নিয়্যতের মাধ্যমে আধ্যাত্মিক স্তরে তোলা যায়? অনেক কায়দা কসরত করে বের করলাম, রুটিটা খেলে একটু ভাল্লাগবে। ব্রেনে গ্লুকোজ যাবে। লেখাটা লিখতে সুবিধা হবে। আর এই লেখায় আমি আল্লাহর কথা লিখব। 

উহ! প্রতিটা কাজের বেলায় এরকম করে নিয়্যত খুঁজে বের করা? কষ্ট একেবারে কম না! তবে ছোট্ট একটু চিন্তা করে যদি এত ভাল পুরস্কার পাওয়া যায় তাহলে কেন করবনা? এখন তাই জার্নাল আর্টিকেল পড়তেও খারাপ লাগেনা। চিন্তা ভাবনা করে এটাকেও ইবাদত বানিয়ে ফেলেছি। 

একই রকম কাজের অপর পিঠ হচ্ছে, জাগতিক ফল লাভের আশায় ইবাদত করা। জুম্মার খুতবায় এই বিষয়টা নিয়েই কথা বলছিল। সুন্দর করে নামাজ পড়ার একটা উদ্দেশ্য যদি হয় যারা দেখছে তারা মুগ্ধ হবে তাহলে আমি নিয়্যতে আল্লাহর সাথে মানুষকে শরীক করে ফেললাম। খালি আমার নামাজটারই বারটা বাজলনা, সম্ভবত একটা শিরক ও করে ফেললাম। 

জুম্মায় আরো বলল, এই হাদিসএ নাকি নিয়্যতের বহুবচন ব্যবহার করা হয়েছে। অর্থাৎ আমরা চাইলে একই কাজের অনেকগুলি নিয়্যত করে সেটার ফলাফল অনেকগুণ বাড়িয়ে নিতে পারি। আমার বন্ধু অপুও বলেছিল, 'প্রত্যেক ব্যক্তি তাই পাবে যা সে নিয়্যত করেছে' - এখানে আমরা যতগুলি নিয়্যত করব, ততগুলি পুরস্কার পাব। সুবহানাল্লাহ! একে ত খাওয়া, ঘুম - এগুলিও ইবাদত হয়ে যাচ্ছে, তার উপর আবার মাল্টিডাইমেনশনাল সওয়াব। মন টন ভাল না থাকলে মাঝে মধ্যে কলম পেন্সিল নিয়ে বসে যাই, গেম খেলার মত খুঁজে খুঁজে এক কাজ থেকে যতগুলি পারি নিয়্যত বের করি। 

এই হাদিসের আরো কয়েকটা ভাল দিক হচ্ছে, এতে করে মনে অনেক বেশি কনফিডেন্স আসে। এক ত আমি স্পষ্ট করে জানি আমি কেন এই কাজটা করতে যাচ্ছি, তারপর জানি কাজের ফলাফলের চেয়ে নিয়্যত বেশি গুরূত্বপূর্ণ, সুতরাং sincerely effort দিয়েই আমার দায়িত্ব শেষ, পরে মানুষ ভাল বলল না খারাপ বলল তাই নিয়ে এত মাথা ঘামাই না। তারও উপর জানি যে আল্লাহ এই ছোট্ট একটা কাজেই অনেকগুলো কাজের সমান সওয়াব দিবেন, যদি ঠিকমত চাইতে পারি। সুতরাং কিছুই করলামনা, বা আমি কোন কাজের না এরকম হতাশা বেশি আসবেনা। 

যাই হোক, ব্লগে মানুষের কমেন্টএর উত্তর দেয়ার ব্যাপারে এই নিয়্যতের প্রশ্নে আটকে গেছি। আল্লাহ যদি প্রশ্ন করে, তুমি ত আমার জন্য লিখেছ, কমেন্টগুলি কার জন্য লিখেছ? আমি যদি বলি, মানুষের জন্য, তাহলে ওরা খুশি হয়ে আমার ব্লগে আসবে। ওরা খুশি হয়ে ব্লগে আসলে তোমার কী হবে? আমার একটু ভাল লাগবে। তখন আল্লাহ যদি বলে বসে, তাহলে তোমার জন্য আত্মতুষ্টিই রইল, তাহলে? 

ইবাদত বনাম ক্রিয়েটিভিটি


আচ্ছা, আমাদের সৃষ্টিই আল্লাহর ইবাদতের জন্য। আমাদের জ্ঞান বুদ্ধি দেয়া হয়েছে যাতে তা চর্চা করে আমরা আল্লাহর নিদর্শনগুলি আরো ভাল বুঝতে পারি। প্রশ্ন, ক্রিয়েটিভিটি তাহলে কেন দেয়া হয়েছে? পেইন্টিং, মিউজিক, ছন্দ - এই জিনিসগুলি এপ্রিসিয়েট করার মত এতখানি ক্ষমতা দিয়ে তাহলে্ আমরা কী করব?

এর একটা উত্তর হতে পারে আমাদের সৃষ্টিশীলতা সেখানেই ব্যবহার করা যাবে যেখানে আল্লাহর নির্দেশিত পন্থায় আল্লাহর পছন্দসই কাজগুলো করা যায় (যেমন মিউজিক এর ক্ষেত্রে নাশীদ, ছবি আঁকার ক্ষেত্রে জীবন্ত প্রতিকৃতি বাদে যে কোন কিছু।) কিন্তু এরকম ক্ষেত্র ত খুব কম! ক্রিয়েটিভিটির কি কোন শেষ আছে? আমাদের ইউনিভার্সিটি কমনস এ গোটা কতক ছেলে হিপহপ ড্যান্স প্র্যাকটিস করে অনেক রাত পর্যন্ত। এদের কাজকর্ম দেখলে অবাক লাগে! এত আজব অঙ্গভঙ্গি মানুষের মাথায় আসে? ফিল্ম মেকিং এর কথা চিন্তা কর - প্রতিটা সিনের কোথায় খুঁটিনাটি কী হবে - এত ছোটছোট বিষয় জোড়া লাগিয়ে চমৎকার মুভি তৈরি হয় - এটা কি কম শৈল্পিক? ড্রেস ডিজাইন বল, ইন্টেরিয়র ডিজাইন বল - কোনটার চেয়ে কোনটা কম সুন্দর?

আমার প্রশ্ন এখানেই। শিল্প, রচনা - এই কাজগুলি অনেক অনেক বেশি সুন্দর। এই বোধটা স্বর্গীয় না হয়ে পারেনা। তাহলে ক্রিয়েটিভিটি ব্যাপারটা কুরআনে ততটা উৎসাহিত করা হয়নি কেন? চিন্তা বা ইন্টেলেক্ট যেমন আমাদের প্রতি আল্লাহর স্পেশাল দয়ার একটি, সৃষ্টির বোধটাও ত তাই। কুরআনে কতশত বার বলা হয়েছে, 'তারা কেন চিন্তা করে দেখেনা?' - কই! আমাদেরকে ত এই ক্রিয়েটিভিটির ব্যাপারে স্পষ্ট করে কিছু বলা হয়নি! 

রাসুলুল্লাহ (স) এর সময়ে যেসব কবি ছিল (কাহিন) তাদের তিনি একদমই পছন্দ করতেন না। কেন? তারা মানুষের বন্দনা গাইত বলে? তারা জ্বীনের আসর আছে দাবি করত বলে? নাকি তাদের সৃষ্টির এক গুণ ছিল এটাই অপছন্দ করত? কিন্তু তা ত হওয়ার কথা না! সৃষ্টির ক্ষমতা পুরোপুরি আল্লাহর দেয়া একটা স্পেশাল ব্লেসিং। আমি কপালগুণে লেখালেখির গুণটা পেলাম, তাই আমি ওটা চালিয়ে যাব, আর কেউ প্রশংসা করলে আলহামদুলিল্লাহ বলে আল্লাহর কাছে কৃতজ্ঞতা জানাব - আর যে বেচারির পায়ে পায়ে ছন্দ ঘোরে সে কোনদিন তার চর্চা করতে পারবেনা - এটা কেমন হল? এ আর রেহমান কে মানুষ বলে গড গিফটেড ট্যালেন্ট। আল্লাহর এই গিফট টা তাহলে কিসের জন্য দেয়া? এর চর্চা কি তাকে বা অন্য কাউকে আল্লাহর কাছে নিয়ে আসছে?

আমার এই লেখা কোন স্টেটমেন্ট দেয়ার উদ্দেশ্যে লেখা না। আমি জানতে চাই। কারণ আল্লাহর দেয়া কোন নিয়ামত কে আমি অজ্ঞানতাবশত অস্বীকার করতে চাইনা। আল্লাহ আমাকে একটা নিয়ামত দিল, সারাজীবন জুজুর ভয়ে ওটাকে ঢেকে রাখলাম - তাতে করে কি আল্লাহর সম্মান বাড়ল? আলহামদুলিল্লাহ আল্লাহ আমাকে একটা সুস্থ সবল মানুষ বানিয়েছে, পড়াশুনা, পরিবার, দিক নির্দেশনা দিয়েছে - এই দয়ার ভারেই আমি ন্যুব্জ। তার ওপর আরো দয়া, আরো, আরো - চোখে অন্ধকার দেখি, ভয় লাগে, আমি কি আসলে জানি আল্লাহ আমার থেকে কী চাচ্ছে? আল্লাহর সব ব্লেসিং কে যখন পাজল এর মত জোড়া লাগাই, ক্রিয়েটিভিটির জায়গায় এসে কেমন যেন থমকে যাই। সবাই বলে ওটাকে ছুঁড়ে ফেলে দিতে, অথবা কেটেকুটে ছোট্ট একটা মনমত টুকরো বানিয়ে তারপর বসাতে। সত্যি কি তাই হওয়ার কথা? আল্লাহ! তুমি কোনদিন এমন হয়নাই যে আমি কিছু জানতে চেয়েছি আর তুমি জানাওনাই। এই স্বগতোক্তিমূলক নোটটা নিজের ডায়রিতে না লিখে পোস্ট করার উদ্দেশ্য এটাই, তুমি আবারো তোমার আলো দিয়ে আমার অন্ধকার দূর করে দেবে।

সম্পর্কের টানাপোড়েন - ১


ক্যারিয়ার ও প্রযুক্তি নির্ভর জীবনে খুব দ্রুত যে জিনিসটা বদলে যাচ্ছে তা হচ্ছে মানুষের সাথে মানুষের পারস্পরিক সম্পর্ক। মানুষ এখন তার গন্ডি থেকে বের হয়ে সহজেই নতুন জায়গায়, নতুন পরিবেশে আসন গাড়ছে। এই বদলে যাওয়া ফ্রেমে যখন সে সম্পর্কের পুরনো ছবিটা বসাতে যায় তখন মেলাতে পারেনা। পরিবেশ পরিস্থিতির সাথে বদল হয় একজনের প্রতি আরেকজনের চাহিদা, আশা আকাঙ্ক্ষা - অনেক সময়ই দেখা যায় এই পরিবর্তনটা একজন অনুভব করতে পারলেও অপরজনের কাছে স্পষ্টভাবে প্রকাশ করতে পারেনা। ফলে একজন হয়ত পুরনো দিন, পুরনো চাওয়া আঁকড়ে ধরে হা হুতাশে ব্যস্ত, অপরজন হয়ত নতুন জীবনের নতুন চ্যালেঞ্জ একা একা মোকাবেলা করতে করতে ত্যক্ত। 

আমরা অনেক সময়ই সম্পর্ক জিনিসটাকে খুব গ্র্যান্টেড ধরে নেই। মা আছে - আমি মায়ের সাথে যাই করি না কেন, মাকে গালিগালাজ, অবহেলা, অসম্মান, যা খুশি - তবু মায়ের যা যা করণীয় তার থেকে এক কণা কম দেখলে মায়ের উপর রাগ। মা এক সন্তানকে বেশি ভালবাসবে এ ব্যাপারটা আমরা অনেকেই মানতে পারিনা। অথচ যে সন্তান সবসময় মায়ের সেবা করে আসছে, ছোট্ট ছোট্ট খুশিগুলোকেও যত্নের সাথে পূরণ করে আসছে - তার প্রতি মায়ের সন্তুষ্টি বেশি থাকবে - এটাই ত স্বাভাবিক, তাই না? যে উদ্দেশ্যে এই কথাটা বলা - আমরা 'মা ত মাই, বন্ধু ত চিরকালই বন্ধু, স্বামী ত দলিল করা অধিকার' - এই মানসিকতা থেকে নিজেকে সরিয়ে যদি মনে করতে পারি, এটা একটা সম্পদ, এটাকে রক্ষা করার জন্য আমার শ্রম দিতে হবে - তাহলেই কেবল মাত্র আমার নোটটা পড়ে আপনারা উপকৃত হতে পারেন। 

এখন নেটওয়ার্কিং খুব সহজ হয়ে যাওয়ায় আমরা একটা সম্পর্কই ঘাত প্রতিঘাতের মধ্য দিয়ে পাকাপোক্ত করার থেকে নতুন নতুন সম্পর্ক ট্রাই করার প্রতি মনোযোগি হয়েছি। একই সাথে আমাদের বিনোদনগুলি এখন এমন যে তা উপভোগ করার জন্য অন্য কেউ পাশে থাকার প্রয়োজন নেই। এতে করে যেটা হয়েছে, আমরা প্রথম থেকেই কম ইন্টারএকশন করে বড় হচ্ছি। সুতরাং আমরা একটু অন্যরকম ব্যবহার দেখলেই ইরিটেটেড হয়ে যাচ্ছি।দ্বিতীয়ত, মানুষের থেকে মুখ ঘুরিয়ে শান্তি পাওয়ার জন্য অফুরন্ত বিনোদনের ব্যবস্থা আছে। সুতরাং প্রবলেম আসলেই আমরা মুখোমুখি না দাঁড়িয়ে নিজেকে আপন জগতে গুটিয়ে নিচ্ছি। 

তৃতীয়, সম্পর্কের প্রতি দায়িত্ববোধের ব্যাপারটা আমাদের কাছে স্পষ্ট না। একটা সম্পর্ক গড়লে (সেটা কলিগই হোক, প্রতিবেশীই হোক, শাশুড়ি বউই হোক, আর বাবা ছেলেই হোক) সেটার সাথে যেসব এক্সপেক্টেশন জড়িত থাকে সেসবের ব্যাপারে উদাসীন হয়েও আমরা দিব্যি জীবন কাটিয়ে দিতে পারছি। খুব কাছের মানুষও এসব ব্যাপারে আঙুল তুলে চোখে দেখিয়ে দেয়ার অধিকার রাখেনা, যেহেতু আমরা পার্সোনাল ব্যাপারের সীমাটা বাড়াতে বাড়াতে সব কিছুই তার মধ্যে এনে ফেলেছি। 

চতুর্থ, সাফল্যের মাপকাঠিটা এখন পুরোপুরিই ক্যারিয়ারভিত্তিক হওয়াতে এ বিষয়গুলো এখন অনেকটাই গৌণ। মানুষ ব্যালেন্সড লাইফ অর্জন করার বদলে জিনিয়াস হওয়ার দিকে ঝুঁকে পড়েছে। তাই ফ্যামিলি লাইফে বা সোস্যাল লাইফে কে কতটুকু ইনভলভড, এ ব্যাপারটা যেন আজকাল পাত্তাই পেতে চায়না। ক'টা বাবা মা এখন সন্তানকে পড়াশুনার বাইরে অন্য কিছু করতে উত্সাহ দেন? এতে করে সন্তানেরা ছোটবেলা থেকেই একটা মেসেজ পেয়ে যায় যে পড়াশুনা (নামান্তরে ক্যারিয়ার) এর সাথে কোন আপোষ চলবেনা। এই দৃষ্টিভঙ্গি পরবর্তিতে একটা মানুষকে খুব আত্মকেন্দ্রিক, স্বার্থপর করে তোলে।

সম্পর্কের টানাপোড়েন - ২


একটা সম্পর্কের মধ্যে সমস্যা আসলে আমরা বিভিন্নভাবে রিঅ্যাক্ট করি। 

১. অপরপক্ষ যখন একটা অন্যায় করে তখন বেশিরভাগ মানুষই আত্মসম্মান ঠিক রাখার জন্য ডিফেন্সিভ মোডে চলে যায়। ব্যাপারটা খুব সহজ, "তুমি আমাকে কষ্ট দিয়েছ, আমি এটা ডিজার্ভ করিনা। আর তুমিও আমার ভালবাসা, আমার কেয়ার পাওয়ার যোগ্যতা হারিয়েছ। অতএব এখন থেকে তুমি আমার সাথে যেমন, আমিও তেমন হব। কারণ তুমি নিজেই আমার এই অসন্তুষ্টি অর্জন করেছ।" 

এই দৃষ্টিভঙ্গির মধ্যে কোন দোষ নাই। যে কোন প্র্যাকটিক্যাল মানুষই এই অ্যাপ্রোচ নেবে। এতে সুবিধাও আছে। এখন থেকে তার প্রতি আগের চেয়ে কম যত্ন নিলেও হবে। ইগো হার্ট হওয়ার রিস্কটাও নিতে হবে কম। আবার তার প্রতি কর্তব্যে ঢিল দেয়ার দায়টাও আমার ঘাড়ে না, আগেই যুক্তি দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছি যে আমার এই উদাসীনতা তোমারই কারণে, দোষ আমার, কিন্তু দোষী তুমি। 

এই ব্যাপারে আমার বলার কিছু নাই। এটা এখনকার পপুলার অ্যাপ্রোচ। এর ভাল দিক সবাই দেখতে পায় যখন সে নিজে এটা ব্যবহার করে, আর তার উপরে দেখানো হলে আর মানতে পারেনা। আর এভাবে আসলে প্রতিটা মানুষ নিজের চারপাশে একটা ডিফেন্সিভ শিল্ড নিয়ে রাখলে সেখানে সত্যিকারের কোন সম্পর্ক থাকেনা। ব্যাপারটা একটা যুদ্ধ, একটা কূটনৈতিক সম্পর্ক হয়ে যায়। (বিশ্বাস করুন, আমাকে অনেকে বোঝানোর চেষ্টা করেছে, বিয়ে নাকি পুরোপুরিই কূটনীতি, এই সম্পর্ক ভালবাসা না, দেনাপাওনার কড়া হিসাবের উপরে টিকে থাকে!) 

২. দ্বিতীয় অ্যাপ্রোচ হচ্ছে কচ্ছপ অ্যাপ্রোচ। তুমি আমাকে কষ্ট দিয়েছ, আমি কষ্ট পেয়েছি। কিন্তু আমি তোমাকে এতই ভালবাসি যে আমি তোমাকে উল্টো আঘাত করবনা। চুপ করে সহ্য করব, নিজের মধ্যে গুটিয়ে থাকব, তারপর একটা সময় ভুলে আবার আগের মতই ভালবাসব। 

এটাও খুব ভাল। খুব কম মানুষই ভালবাসার জোরে অন্যায় কে উপেক্ষা করে ক্ষমা করে দিতে পারে। কিন্তু এটা ভাল তখনই, যখন অপরপক্ষ জানে যে সে যা করছে সেটা অন্যায় করেছে। তখন এই ওভারলুক করা ওকে নিজের মত অনুতপ্ত হওয়ার স্পেস দিবে। ঐ মানুষটার মহানুভবতা দেখে আরো ভালভাবে তার কাছে ফিরে আসবে। 

কিন্তু যে ক্ষেত্রে উভয় পক্ষই মনে করছে যে সে ঠিক, সেখানে এই অ্যাপ্রোচ কিন্তু কাজে আসেনা। সম্পর্ক একটা সিঁড়ির মত। এটাকে প্রতি ধাপে ধাপে তৈরি করতে হয়, মজবুত করতে হয়। কচ্ছপ হয়ে গেলে কিছুদিনের জন্য এই কাজটা বন্ধ থাকে। কিন্তু এই ক্ষমা, নীরবতা যদি অপরপক্ষকে কোন পজিটিভ মেসেজ না দেয়, তাহলে কিন্তু একই ঘটনা ঘটতেই থাকবে। আস্তে আস্তে সিঁড়ি গড়ার কাজটা এতটাই ঢিলে হয়ে যাবে যে তার অস্তিত্ব নিয়েও সন্দেহ তৈরি হবে। তাছাড়া একপক্ষ বার বার এভাবে ছাড় দিতে দিতে ভাববে, "সবসময় কেন আমিই স্যাক্রিফাই করব?" যেখানে সে মনে করছে সম্পর্ক রক্ষার কাজে সবটুকু স্যাক্রিফাইস সে করছে, অন্যজন হয়ত একই সময় তার কচ্ছপ মনোভাব দেখতে দেখতে ক্ষুব্ধ। 

সম্পর্কের টানাপোড়েন - ৩


ডিফেন্স, কচ্ছপ - সবই ভাল, কিন্তু এগুলো সবই সাময়িক স্বস্তি আনে। ডিফেন্ড করলে নিজের ইগোকে ঠিকঠাক রাখা যায়, আর গুটিয়ে থাকলে অপরপক্ষকে জয়ী করে নির্বিবাদে থাকা যায়। সত্যিকার অর্থে সম্পর্ক দৃঢ় করতে এ ধরণের অ্যাপ্রোচ কতটুকু কাজে আসে? উত্তরটা পাঠকের কাছ থেকেই জানার অপেক্ষায় থাকলাম। 

৩. তৃতীয় অ্যাপ্রোচের কোন যুতসই নাম আমি খুঁজে বের করতে পারিনি। এটা অনেকটা, "আমি তোমার কাজে কষ্ট পেয়েছি, কিন্তু তোমাকে ভালবাসি বলে কিছু বললাম না। কিন্তু আমি জানি কখনোই না বললে তুমি বুঝবেনা যে আমি কষ্ট পেয়েছি।" সোজা ভাষায়, প্রবলেম আসলে তাকে ঠান্ডা মাথায় ডিল করতে হবে। তাকে জানিয়ে দিতে হবে যে এ ব্যাপারটা আমার কাছে ন্যায়সঙ্গত লাগেনি। 

মজা হচ্ছে, এই যে আপনি ধৈর্য ধরলেন, পাল্টা শোধ নিলেন না, ক্ষমা করলেন, তারপরে আবার সব ঠিক হয়ে যাওয়ার পর ঠান্ডা মেজাজে ঘটনাটা তুলে বললেন যে এই ব্যাপারটা আপনি পছন্দ করেননি - অপর পক্ষ কিন্তু আপনার এতগুলি ভাল দিক দেখতে পাবেনা। ঐ ঘটনা উঠে আসার সাথে সাথে সেও নিজেকে ডিফেন্ড করতে শুরু করবে। সত্যি বলতে কি, সব ঠিক হয়ে যাওয়ার পরে পুনরায় ঐ প্রসঙ্গ তোলাটাকেই সে অপমান হিসেবে নিয়ে ফেলতে পারে। কারণ রাগত: অবস্থায় নিজের অন্যায়কে ডিফেন্ড করা যত সহজ, ঠান্ডা মেজাজে, সুন্দর সময়ে সেটার উল্লেখ ততটাই বিব্রতকর। এই অবস্থায় নিজেকে বাঁচাতে মানুষ সবচেয়ে সহজ উপায়টা বেছে নেয় - হয় রাগ করে, নাহয় কান্নাকাটি করে, তার সাথে পুরনো যত অন্যায় তার উপর করা হয়েছে সেসব বলা শুরু করে। অথবা এমন কোন মন্তব্য করে যাতে করে পুরনো লজ্জা ঢাকা পড়ে যায়। 

এই পর্যন্ত এসে মানুষ সবচেয়ে বেশি হাল ছেড়ে দেয়। মনে মনে বলে, "আমি আমার সাধ্যমত চেষ্টা করেছি, তার সাথে খারাপ ব্যবহার করি নাই, রাগ করি নাই, তাকে অবসর সময়ে বোঝানোর চেষ্টা করেছি - কিন্তু সে কিছুতেই কিছু শোনে না। আমার জায়গায় অন্য কেউ থাকলে কী করত?" সে দেখতে পায়না যে এই বোঝানোর মধ্যে তার ইফোর্টের কমতি ছিল। কীভাবে বললে সে অফেন্ডেড না হয়ে কথাগুলো শুনবে এবং মেনে নিবে সেটার উপর সে আরো অনেক মনোযোগ দিতে পারত। 

প্রত্যেকটা সম্পর্ক একেকটা খুউব দামী রত্নের মত - এটা রক্ষা করতেই হবে কারণ এটা মূল্যবান! এইখানে মানুষটার চেয়েও বেশি গুরূত্বপূর্ণ এই বন্ধনটা। মানুষটা খারাপ হলে তার মানে এইটার উপর বেশি কাজ করতে হবে, এমন না যে মানুষটা খারাপ তাই ঐ সম্পর্ককে আমি আর শ্রদ্ধাই করব না। বা ঐ সম্পর্কটা থেকে আমি কিছু পাওয়ার আশা চিরতরে বন্ধ করে দিব। 

বুঝলাম, একবারে না হলে বারবার কমিউনিকেট করার চেষ্টা করতে হবে। কিন্তু কীভাবে? একই ভাবে? এইখানেই দ্বিতীয় ভুলটা আমরা করি, আমরা একই মেসেজ বার বার একই ভাবে দিতে চাই। ধৈর্য ধরলাম, কথা বললাম, শুনলনা, আবারো ধৈর্য ধরলাম, আবারো কথা বললাম, আবারো, আবারো। ফলাফল হিসেবে আপনি কি অন্য কিছু দেখার আশা করছেন? 

সম্পর্ক টিকিয়ে রাখার জন্য এতক্ষণ পর্যন্ত ধৈর্য দিয়েই কাজ চলে যাচ্ছিল। এই স্টেজে এসে দরকার পড়বে আপনার ইন্টেলেক্ট এর। যেহেতু স্ট্রেইট ফরোয়ার্ড ডিসকাশন দুইজনের জন্য একইভাবে কাজ করেনা - আপনার এখন ঐ মানুষটিকে স্টাডি করা শুরু করতে হবে। সে কী ধরণের কথায় ইন্সপায়ার্ড হয়, কোন ধরণের অভিযোগ শোনার সাথে সাথে তার মনের মধ্যে বিদ্রোহ শুরু হয়ে যায়, কী ধরণের চিন্তা তার মধ্যে ভাল কাজ করার আগ্রহ জাগিয়ে তোলে, লজিক গ্রহণ করার ক্ষমতা তার মধ্যে কতটুকু (সবাই কিন্তু একভাবে হক্ কথা নিতে পারেনা) - এই সব ধরণের তথ্য আপনার ভেতর জমা করতে হবে। তারপর তার পছন্দসই উপায়ে কথাগুলো তাকে বোঝাতে হবে। 

অনেক সময় এমন হয়, কথা যত সুন্দর করেই অ্যাক্সেপ্ট করুক, কাজে তার প্রতিফলন হয়না। সাতকাহন গল্পে নায়িকাটার যার সাথে বিয়ে হয়েছিল সে ছেলেটা খাবারের টেস্ট ভাল না হলে ব্যঙ্গ করত, রেগে যেত। পরে হাজারবার সরি টরি বলে প্রমিজ করত যে আর করবেনা, কিন্তু কীভাবে কীভাবে যেন আবারো একই কাজ করত। এ রকম অবস্থায় মানুষ প্রায়ই পড়ে, আর তখন ক্ষমা করাটা সত্যি, সত্যিই অসম্ভব হয়ে যায়।

সম্পর্কের টানাপোড়েন - ৪


আগের লেখাগুলি পড়লে দেখবেন আমরা টানাপোড়েনের এমন এক তিতিত্যাক্তকর অবস্থায় পৌঁছে গেছি যেখানে অনেক ধৈর্য ধরে নানাভাবে কমিউনিকেট করে মানুষটাকে কনভিন্স করার পরেও তার কাজে যথেষ্ট পরিবর্তন আসছেনা। নিজেকে ঐ অবস্থায় একটু চিন্তা করে দেখুন, রাগে গা চিড়বিড় করতে থাকবে। মনে হবে, কীসের জন্য এত কিছু করব? আমি কি এতই ফেলনা? আমার চাওয়াপাওয়ার কোন দাম নেই? আজকে আমি ওকে ফেলে গেলে সে কোথায় থাকবে? 

এই যে এই ন্যায়সঙ্গত, যুক্তিসঙ্গত বিচার বিশ্লেষণ - এই কাজটা শিকেয় তুলে রাখতে হবে যখন আপনি সত্যি সত্যিই সম্পর্কের উপর কাজ করছেন। প্রথমত: আপনি কাজ শুরুই করেছেন এটা নিশ্চিত হয়ে যে সমস্যাটা আপনার মধ্যে না। সে বোকা, সে ইমম্যাচিউর, সে গাধা, সে অহঙ্কারী, সে স্বার্থপর - কিন্তু এই মানুষটাই একটা সময় অন্যরকম ছিল যা দেখে আপনি মুগ্ধ হয়েছেন। কোন না কোনভাবে আপনার মন ছুঁয়ে যাওয়ার যোগ্যতা তার মধ্যে ছিল। এখন পারিপার্শ্বিকতার চাপে সে নিজেকে ভুলে গেছে, অথবা সে বেচারার বেড়ে ওঠাই এমন এক পরিবেশে যে এই অন্যায়টা তার কাছে লজিক্যাল। এই চিন্তা ধরে কাজ শুরু করলে আপনি বাই ডিফল্ট একটা উঁচু স্তর থেকে ঐ হতভাগা মানুষটাকে দেখছেন। তার কাজ আপনাকে কষ্ট দিচ্ছে কারণ সে মূর্খমানবের আপনার লেভেলে ওঠার যোগ্যতা নেই। আপনি মনুষ্যত্বের দিক থেকে নিচে পড়ে থাকা একটা প্রাণীকে হাত ধরে উপরে তোলার চেষ্টা করছেন, সে এতটাই উদ্ভট যে হাতটা ধরতে গেলে পর্যন্ত কামড়ে দিচ্ছে। এবার বিচারের ভার আপনার উপর। তাকে ওখানেই ছেড়ে আসবেন চিরকালের মত? আপনি হাতটা শক্ত করে না ধরলে কিন্তু কোনদিন সে আলোর মুখ দেখবে না! 

যাই হোক। মনটাকে স্থির করে নিয়েছেন ত? এবার ইন্টেলেক্টের সর্বোচ্চ ব্যবহার করতে হবে। আপনি নিজেকে তার জায়গায় বসান। তার মত করে চিন্তা করুন। তার পরিবেশ, বেড়ে ওঠা, স্ট্রেস ডিল করা, চিন্তা করা, ইন্সটিংক্ট এর দাসত্ব করা, ইগো নিয়ে চলা - সব অবজার্ভ করুন। এতটাই তাকে স্টাডি করুন যে একটা কিছু হলে আপনি সাথে সাথে বুঝে ফেলতে পারেন যে সে কী বলবে বা কী চিন্তা করবে। এর মধ্যে দেখবেন ওর আরো অনেক নেগেটিভ দিক আপনার সামনে চলে আসছে, ওভারলুক করুন, আপনি ড্যাটা কালেক্ট করছেন, সে ভাল না মন্দ সে বিচারে যাবেন না। 

এতখানি রিফ্লেক্ট করার পর আপনি এমনিতেই বুঝতে পারবেন, একটা দুটো বিশ্বাস, বা কোন একটা পুরনো ঘটনা তার মনে ঐ ব্যাপারটা শক্ত করে গেড়ে দিয়েছে, যার কারণে সে নিজের অজান্তেই ওটাকে ঘাঁটি করে সবসময় অন্যায় কাজটা করে যাচ্ছে। আমার এখানে এক পরিচিত ভদ্রলোক সবসময় সব পাকিস্তানিকে গালি দিয়ে কথা বলেন। উনার মনে মুক্তিযুদ্ধজনিত পাক-বিদ্বেষ এমনভাবে ঢুকেছে যে আস্ত জাত তুলে গালি দেয়া উনার কাছে খুবই লজিক্যাল মনে হয়। উনি এর মধ্যে দোষ দেখতে পাননা। আমরা যারা সাব-কন্টিনেন্ট থেকে এসেছি তারা সময়ের ব্যাপারে খুবই দায়সারা (সবাই না), এর কারণ আমরা যে সেটআপে বড় হয়েছি সেখানে এটা তেমন দোষের কিছু না। এখন আমার আমেরিকান সুপারভাইজর যদি এ ব্যাপারে খুবই অনমনীয় হয় তখন আমাদের সম্পর্কের অবনতি হবে। এরকম প্রত্যেকটা কাজের পিছনেই মানুষের নিজস্ব ফিলসফি বা মাইন্ড সেটআপ থাকে। সেটা বুঝে ধৈর্য ধরে সেই ব্যাকগ্রাউন্ডের উপর কাজ করলে হয়ত সমস্যার মূল ধরে তুলে আনা যাবে। 

কী? খুব বেশি পরিশ্রম মনে হচ্ছে? আপনার কী ধারণা? সম্পর্ক এতই সস্তা? একটা সত্যিকার সুন্দর সম্পর্কের কথা চিন্তা করুন ত চোখ বুজে? যে সম্পর্কে শ্রদ্ধা আছে, বিশ্বাস আছে, ঠাট্টা করার মত ইলাস্টিসিটি আছে, আশ্রয় আছে, শান্তি আছে - এমন মধুর সম্পর্ক কি আমাদের এই পঙ্কিল পৃথিবীতেই স্বর্গের সান্নিধ্য দেবেনা?

সম্পর্কের টানাপোড়েন - ৫


এতদিন আমি আলোচনা করছিলাম সম্পর্কে তিক্ততা তৈরি হলে মানুষ কীভাবে প্রতিক্রিয়া দেখায়। আজকে চেষ্টা করব আমাদের বিভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে কথা বলতে - যা আমাদের ধৈর্য বা সহিষ্ণুতাকে কমিয়ে প্রায় শূন্যের কোঠায় নামিয়ে এনেছে। সোজা ভাষায়, তিক্ততা কেন তৈরি হয়? মানুষ তার প্রিয় মানুষটার উপর কেন বিরক্ত হয়? কেনই বা তা দীর্ঘ সময় পর্যন্ত জিইয়ে রাখে? 

সম্পর্কে আমরা কিছু অগ্রিম ধারণা করে বসে থাকি। যেমন - আমি তাকে যেভাবে ট্রিট করি, সেও ঠিক একইভাবে আমাকে দেখবে। এই যেমন, সে একটা কিছু অপছন্দ করলে আমি সাথে সাথে সেটা ত্যাগ করি, উল্টোভাবে সে কেন করেনা? অথবা, আমি তাকে আমার সব গোপন কথা বলি, সে কেন বলেনা? 

এইভাবে মানুষ চিন্তা করতেই পারে। কিন্তু তখন সে এটা ভুলে যায় যে সে তখন নিজের সেট করা মাপকাঠিতে অন্য মানুষটাকে মাপছে। অন্য মানুষটা যে অন্য রকম হতে পারে, তার ছাড় দেয়ার মাত্রা বা আবেগ অনুভূতি প্রকাশের ধরণ যে পুরোপুরি তার থেকে আলাদা হতে পারে - এ ব্যাপারটা সে উপেক্ষাই করে যাচ্ছে। এমন একটা ঝগড়ার কথা ভাবুন, যেখানে আপনি বলছেন, 'আমি এই এই করি, তুমি কী কর?' উত্তরে কেবল হয়ত সে একটা কথাই বলবে, 'আমি তোমার মত না। তুমি সবকিছু নিজের দিক থেকে চিন্তা কর। তুমি আমার দিকটা বোঝনা...।' আপনার কি তখন তাকে খুব জেদী মনে হবে? খুব অযৌক্তিক মনে হবে? সে কিন্তু একদম সত্যিকার সমস্যাটাই বলছে, যে তুমি আমার মত করে আমার কাছে কোনটা ভাল মনে হয় সেটা বোঝনা। বরং তোমার যা ভাল লাগে সেটাই চাপিয়ে দিতে চাও। এই ধরণের ক্ল্যাশ বাবা মায়ের সাথে ছেলেমেয়েদের খুব হয়! কারণ বেশির ভাগ ক্ষেত্রে বাবা মা বোঝা ত দূরের কথা, ছেলেমেয়েদের চিন্তার পিছনে যে কোন লজিক থাকতে পারে, এটাও বুঝতে চান না। উল্টোটাও ঠিক। ছেলেমেয়েরা মনে করে বাবা মা আদ্যিযুগের। তারা আমাদের সমস্যা বুঝবে না। 

যে মানুষগুলি নিজের গড়া স্ট্যান্ডার্ডএ অন্যদের বিচার করে তারা কিন্তু নিজেরাও প্রতিক্রিয়া দেখাতে গিয়ে 'ঢিল ভার্সাস পাটকেল' এর আশ্রয় নেয়। তারা করে কি, খারাপ ব্যবহার পেলে হুবহু একই রকম করে তাকে নকল করে। বোঝানোর জন্য না শাস্তি দেয়ার জন্য না নিজের ইগোকে ঠিকঠাক রাখার জন্য কে জানে! তবে এটা করলে পরস্পরের মধ্যে শ্রদ্ধা, ভালবাসার সম্পর্কটা কমে আসে। যদি আমার একটা দুর্বলতার জন্য অপর পক্ষ ঠিক একই ভাবে প্রতিক্রিয়া দেখায়, তখন হতাশা আসে। আর মনে হয়, 'আমার এতদিনের আদর, ভালবাসা, কেয়ার এর কি তাহলে কোনই মূল্য নেই?' কোন মানুষই খারাপ ব্যবহারের প্রতিদানে পাল্টা সমপরিমাণ খারাপ ব্যবহার পেলে 'সমানে সমান' মনে করে ভুলে যেতে পারেনা। অর্থাৎ, লজিক এর দিক থেকে জিনিসটা যতই ঠিক থাকুক, বাস্তব জীবনে তার প্রয়োগ ভাল ফল এনে দিতে পারেনা