Wednesday, May 30, 2012

প্রকৃতি থেকে শেখা

আমার সবসময়েই পাহাড়ের প্রতি অদ্ভুত টান। অনার্স সেকেন্ড ইয়ারে যখন আমাদের প্রিয় ম্যাডাম স্যারদের সঙ্গে সিলেট বেড়াতে গেছি, মাধবকুন্ড ঝর্ণার সামনে আমার একটা ছবি আছে, সবাই ঝর্ণার সামনে হাসিমুখে বসে আছে, আমি উল্টোদিকে ফিরে হা করে পাহাড় দেখছি। অনার্স শেষ বর্ষে স্টাডি ট্যুরে ইন্ডিয়া না নেপাল যাব - এই তর্কে আমার আর ব্লগার মনপবনের প্রবল আপত্তিতে ইন্ডিয়ার প্রস্তাব ধোপেই টেকেনি। দশদিন ধরে পাহাড় দেখতে পারব - এই আনন্দেই আমি অধীর হয়ে ছিলাম। 

পাহাড় নিয়ে আমার অতি আগ্রহের কথা আমার স্বামী খুব ভালভাবেই জানে। জানে, কেবলমাত্র হাইকিং এর সুযোগ থাকলেই আমাকে বেড়াতে নিয়ে খুশি করা যাবে। তাই সেমিস্টারটা শেষ হতেই চলে এসেছি আমেরিকার পশ্চিম উপকূলে, উদ্দেশ্য পর্বত দর্শন ও আরোহণ, তার পাশাপাশি আরো যা কিছু বোনাস হিসেবে পাওয়া যায়.. 

এখনও ট্রিপ শেষ হয়নি। গত সাত দিনের প্রতিটি দিন পাহাড়ে চড়েছি। অ্যাজমার জন্য শরীরে কুলোয়নি, তবু থেমে থেমে যে করেই হোক, পাড়ি দিয়েছি - যতটুকু পথ নিয়ে যায়। এর মধ্যে পাহাড় চুড়া থেকে কত... যে রূপ দেখলাম.. আল্লাহর সৃষ্টির মধ্যে হারিয়ে গিয়ে চিনলাম সর্বশ্রেষ্ঠ স্থপতি, সর্বশ্রেষ্ঠ শিল্পী, সর্বশ্রেষ্ঠ সংগঠক কে। 

59:24 He is God, the Creator, the Maker who shapes all forms and appearances! His [alone] are the attributes of perfection. All that is in the heavens and on earth extols His limitless glory: for He alone is almighty, truly wise! 


আমাদের পাঁচজনের এই গ্রুপের অনন্য দিক হল, কমবেশি মাত্রায় প্রত্যেকেই আল্লাহভক্ত, এবং উঁচুমাত্রার দর্শন আলোচনায় কারো কোন ক্লান্তি নেই। তাই পাহাড়ের উপর দাঁড়িয়ে জামাতে নামাজ বা লং ড্রাইভে স্কলারদের লেকচার শোনাই কেবল নয়, কার দৃষ্টিতে এইসব সৌন্দর্য কী উপলব্ধি এনে দিয়েছে, তা শোনারও সুযোগ হয়েছে অনেক। এর অল্প কিছু এখানে বলি - 


ইয়োসিমিটি ন্যাশনাল পার্ক (ক্যালিফোর্নিয়া) তে অর্ধবৃত্তাকার এক পাহাড় আছে, একে হাফ ডোম বলে। এ পাহাড়ের উত্তল অংশটাতে দশফুট পরপর স্টিক গুঁজে চেইন দিয়ে ট্রেইল করা হয়েছে। অবিশ্বাস্য রকমের কঠিন হাইক। কঠিন বলেই হয়ত, মানুষের আকর্ষণও বেশি। তাছাড়া আশপাশের সবকিছু মিলিয়ে এই পাহাড়ের নান্দনিক সৌন্দর্য বলে বোঝানো যাবে না। হাফ ডোম একটা সেলিব্রিটি পর্যায়ের পাহাড়, তাকে নিয়ে বিভিন্ন গল্পও চালু আছে শুনেছি। ত যাই হোক, আমাদের মধ্যে একজন বলল, এই পাহাড়টার যদি এমন করে প্রচার প্রসার করা না হত, একে কি এতটাই সুন্দর লাগত? আমরা বললাম, লাগত, কারণ পাহাড়টা ইউনিক। ও তখন একটা গল্প শোনাল, নিউইয়র্কের সাবওয়ে স্টেশনে এক নামকরা মিউজিশিয়ান এককোণে দাঁড়িয়ে পারফর্ম করছিল, কেউ ফিরেও তাকায়নি। আমরা আসলে উপযুক্ত জায়গায় উপযুক্ত ব্যাকআপ ছাড়া সৌন্দর্যটাও ঠিক মত এপ্রিসিয়েট করতে পারিনা। তখন আমার ব্লগার মনপবনের এভারেস্ট বিজয় নোটটার কথা মনে পড়ে গেল - কে-২ পর্বতচুড়ায় আরোহন অনেক বেশি কঠিন হলেও তা নিয়ে মানুষ এত হইচই করেনা, যতটা করে এভারেস্ট নিয়ে। 


সে হাফ ডোম দূর থেকে দেখবার জন্য একটা 'গ্লেসিয়ার পয়েন্ট' নামে একটা জায়গা আছে, সেখানে ভীষণ মানুষের ভিড়। আমরা 'দুত্তোরি ছাই' বলে চলে গেলাম একটু দূরে, অল্প কিছু পাথরের আড়ালে। হইচই, ভিড়বাট্টা সব দূরে চলে গেল। চোখের সামনে শুধু কালো গ্রানাইট পাথরের রূক্ষ উঁচু উঁচু পাহাড়ের মাঝখান দিয়ে একে বেঁকে যাওয়া শীর্ণ গিরিপথ, অনেকের মধ্যে থেকেও সগৌরবে অনন্য হাফ ডোমের আত্মগরিমা, আর একটু দূরে প্রচন্ড গর্জনে ধেয়ে আসা সফেন নাম না জানা এক ঝর্ণা। কোন মানুষের শব্দ নেই, শুধু ঝর্ণার গর্জন, পাখির ডাক, পাথরের ওপর ছড়িয়ে ছিটিয়ে বসে থাকা আমরা কজন। ওপাশে সূর্য আজকার মত বিদায় নেবার প্রস্তুতি নিচ্ছে। পাশে তাকিয়ে দেখি আমার প্রিয় এক আপুর চোখে পানি, আপন মনেই বলল, এসবের কাছে নিজেকে কতটা ছোট মনে হয়! এই এতসব সৃষ্টির মাঝে আমরা কত তুচ্ছ! আর তার চেয়েও কত.. কত... তুচ্ছ আমাদের সমস্যাগুলো.... 

আপুর থেকে দৃষ্টি ফিরিয়ে চোখ রাখলাম পাহাড়সীমায়। চিরচেনা কথাগুলো আবারও নিজের জীবনের সাথে মিলিয়ে নতুন মনে হল। 


ইউটাহ থেকে ইয়োসিমিটি পার্ক এ যাওয়ার পথে গিরিসংকুল এক পথ পড়ে, তিয়োগা রোড। বছরের অধিকাংশ সময় সে রাস্তা তুষারের কারণে বন্ধ থাকে। আমরা ইউটাহ থেকে মরুভূমি দেখতে দেখতে আসছি, হঠাৎ কথা নেই বার্তা নেই তুষারপাত শুরু হয়ে গেল। যে মোটেলে উঠব সেখানকার মালিক ফোন করে জানাল তিয়োগা পাস বন্ধ হয়ে গেছে, আমরা যেন প্ল্যান করে আসি। আমাদের ত আর ফেরার উপায় নেই, সে কি রাস্তা! অন্ধকারে একটা গাড়ি নেই, একেবেঁকে পিচ্ছিল রাস্তার উপর দিয়ে বর্ষার ফলার মত গাড়ির শিল্ডে এসে ফুটছে বরফকণা - আমরা সমানে আল্লাহকে ডাকতে ডাকতে এগোচ্ছি। কোনমতে এসে পৌঁছলাম হোটেলে। পরদিন তিয়োগা খুললে ইযোসিমিটি যাত্রা। আমাদের হোটেল তিয়োগার অল্প একটু আগেই। ট্যুর এর হোটেল বুকিং, গাড়ি বুকিং, ফ্লাইট বুকিং সব করেছে আমার স্বামী। তাকে এই ইয়োসিমিটির হোটেল নিয়ে খুব যন্ত্রণা সহ্য করতে হয়েছে, কোথাও কোন হোটেল খালি নেই, তিন দিন ধরে সাধ্যসাধনা করে যে একটা পেল, সেটাও তারা শেষ মুহূর্তে ওকে মানা করে দিল। অবশেষে তিয়োগার আগে এই একটা দু'কামরার চিলেকোঠা। 

মোটেল মালিকের ফোন পেয়ে আমার স্বামী উচ্ছ্বসিত হয়ে বলে উঠল, আল্লাহকে অশেষ অশেষ ধন্যবাদ। যে হোটেলটা না পেয়ে আমি মন খারাপ করেছিলাম ওটা ছিল ইয়োসিমিটি পার্কের ভেতরে। ওটা পেলে আজকে রাতে তিয়োগা পারও হতে পারতামনা, এই বরফের মধ্যে আমাদের গাড়িতে রাত কাটাতে হত। আল্লাহ আমাদের জন্য কী নির্ধারণ করে রেখেছেন তা বুঝতে না পেরে আমরা অকারণেই হতাশ হই। নিকষ কালো পথে হেডলাইটের আলোয় তুষারের ঝিলিক দেখতে দেখতে আবারও মনে পড়ল, আল্লাহ ইজ দা বেস্ট প্ল্যানার। 


লেখাটা লিখতে লিখতে হাসিই পাচ্ছে, কারণ, সে রাতেই আমি আর আমাদের আরেক বন্ধু তর্ক করছিলাম প্রকৃতি কুরআনের বিকল্প হতে পারে কিনা। আমার সে বন্ধু বলছিল, কুরআন যেমন আল্লাহর উপহার, প্রকৃতিও তাই। তুমি যদি চোখকান খোলা রাখ, এবং চিন্তা করতে পার, প্রকৃতির সবকিছুই তোমাকে একই মেসেজ দিবে। আমি বলছিলাম, হতে পারে, কিন্তু কুরআনের প্রয়োজনিয়তা অস্বীকার উপায় নেই। আর প্রকৃতি খুব প্যাঁচালো, কে জানে আমরা কতটুকু ঠিক শিক্ষা পাব। এখন লিখতে গিয়ে দেখি আল্লাহর অন্তত পাঁচ ছয়টা নাম আমার অন্তরে গাঁথা হয়ে গেছে কেবল মাত্র এই ট্যুর থেকে। 

যাই হোক, আরো একটা গল্প বলি। আমরা ইউটাহ তে জায়ন ন্যাশনাল পার্ক এ একরাত থেকেছিলাম, সে পার্কটা বেশ মজার, নবীদের (আ) দের নামে পাহাড়ের নাম, এক পাহাড় চুড়ার নাম অ্যাঞ্জেল'স ল্যান্ডিং (অর্থাৎ যেখানে কিনা ফেরেশতাদের আড্ডা বসে) - সে পার্কে হাইক করতে গিয়ে মনে হচ্ছিল, ইনশাআল্লাহ জান্নাতে আমাদের প্রত্যেকের এরকম ঝর্ণাওয়ালা পার্সোনালাইজড পাহাড় থাকবে, সেখানে সত্যিকারের অ্যাঞ্জেলরা ল্যান্ড করবে। ত সে পার্কে বিরা.....ট বিরা.....ট সব রেডউড ট্রি, ইয়া মোটা মোটা তার গুঁড়ি। একেকটার ভেতর দিয়ে টানেল বানিয়ে গাড়ি চলতে পারবে। তেমন এক গাছ শেকড়সুদ্ধ উপড়ে মাটিতে পড়ে আছে। পৌনে দুই তলা সমান উঁচু একপাশের বেড়। আমি অবাক হয়ে সে গাছের শেকড়ের দিকে তাকিয়ে থাকলাম, এ ত রীতিমত আধুনিক ভাস্কর্য! সিমেন্ট দিয়ে বানিয়ে এ জিনিস প্রদর্শনীতে দিলে বাহবা পড়ে যাবে। আল্লাহ সত্যিই সেরা আর্কিটেক্ট। তখন মনে পড়ল, একটা সময় আমি কনফিউজড ছিলাম, আল্লাহ আমাদের ক্রিয়েটিভিটি কেন দিয়েছেন। তা নিয়ে নোট লিখেছি, প্রশ্নের আকারে, ইবাদত বনাম ক্রিয়েটিভিটি নামে। এই জিনিস দেখে বুঝলাম, আর্কিটেকচার কী না জানলে ত এই জিনিসের মহিমা বুঝতেও পারতাম না। যেমন করে অ্যাবস্ট্রাক্ট পেইন্টিং না দেখলে বুঝতাম না বালির পাহাড়ে এত রংয়ের মহিমা কোথা থেকে আসে! আবারও প্রকৃতির মধ্য দিয়ে আমি পেলাম আমার প্রশ্নের উত্তর। 


আমাদের গ্রুপের সবচাইতে ভাবুক সবচাইতে দার্শনিক মানুষটি হচ্ছে আমাদের সেই জ্যামাইকান বন্ধু, যার কথা ঘুরে ফিরে বারবারই লিখি। আমার সবচেয়ে কঠিন প্রশ্নগুলো আমি তার জন্য তুলে রাখি। এতসব পাহাড় দেখে আমাদের মনে আর কোন সন্দেহের অবকাশ নেই যে পাহাড় চড়ার মত আপাত অর্থহীন কাজটাও আমাদের স্রষ্টার সান্নিধ্যে নিয়ে যায়। আমি তাকে জিজ্ঞাসা করলাম, কেন? একটা ত জানি, এত বিশালতার মধ্যে নিজের ক্ষমতার ক্ষুদ্রতা বোঝা যায়। আর কী? সে বলল, এ ধরণের কাজে তোমার মন ফোকাস হয়, সবধরণের ডিস্ট্রাকশন দূর হয়ে যায়। আবারও জিজ্ঞাসা করলাম, কেন? শারীরিক পরিশ্রম, এমনকি জিম করলেও শুনেছি মন ফোকাস হয়, কীভাবে? 

সে তখন বোঝাল, তোমার মধ্যে তোমার শরীর আর তোমার আত্মা, দু'টোরই অস্তিত্ব আছে। ওর মুখের কথা কেড়ে নিয়ে বললাম, ও.... তার মানে শারীরিক পরিশ্রমে আমার শরীর ট্যাঁ ফো করার সুযোগ পায়না, কন্ট্রোল এ থাকে, তখন আত্মা মুক্তভাবে চিন্তা করার সুযোগ পায়? যেমনটি তারিক রামাদান তার লেকচারে বলেছেন, spirituality is the most demanding among all of your religious requirements? সে বলল, শুধু তাই না, মনকে মুক্ত করার দু'টো উপায় আছে, এক হচ্ছে, নির্বিঘ্নে চিন্তা করতে করতে এমন পর্যায়ে চলে যাওয়া যেখানে তোমার সব চিন্তা থিতিয়ে যাবে, এবং হঠাৎ করে মন পরিষ্কার হয়ে যাবে। যেমনটি রাসুলুল্লাহ (স) করেছিলেন, হেরা গুহায়। আরেকটা হচ্ছে শর্টকাট মেথড, যেখানে তুমি আর সব কিছু বাদ দিয়ে শরীরকে মনকে কেবল একদিকে ফোকাস করে রাখবে, যেমন হাইকিং এ - তখন সব বাজে চিন্তা দূর হয়ে তোমার মন পরিষ্কার হয়ে যাবে। সত্যিকার অর্থে রাসুলুল্লাহ (স) এর দু'টোই একসাথে করেছিলেন। হেরা গুহায় যাওয়া চাট্টিখানি কথাটা না, আমার মামা দেখতে গিয়েছিলেন, তিনি বলেছেন। আর আত্মাকে পরিশুদ্ধ করতে চিন্তা করার ত কোন বিকল্পই নেই। আমরা হাফ ডোমের ওখানে মানুষজন থেকে দূরে গিয়ে প্রকৃতিতে চোখ রাখতেই হারিয়ে গিয়েছিলাম আপন আপন জগতে। এ এমন এক অনুভূতি, যেখানে আটপৌরে জীবনের ক্লান্তিকর ভারগুলো আপনা থেকেই লঘু হয়ে আসে। মন চায় বড় কিছু করতে, ভাল কিছু ভাবতে। ফিরে আসতে ইচ্ছে করেনা, এ যেন একটুকরো স্বর্গের থেকে মনকে টেনে হিঁচড়ে পৃথিবীতে নামিয়ে আনা। ফিরে এসেছি এই আশা নিয়ে, এই পৃথিবীর ডিজাইনার যিনি, জান্নাতের ডিজাইনারও তিনি; ওখানে গেলে সময় আর কখনও ফুরাবে না। 


সবকিছু মিলিয়ে আমি আবারও আল্লাহর কাছে কৃতজ্ঞ, আমাকে এ পথ দিয়ে এভাবে জীবনটাকে চেনার সুযোগ করে দেবার জন্য। কৃতজ্ঞ, পথচলায় এমন মানুষদের বন্ধু হিসেবে পাইয়ে দেবার জন্য। কৃতজ্ঞ মনপবনের কাছেও, তার 'এভারেস্ট বিজয়' নোটে পাহাড় আরোহণের অসারতা নিয়ে কথা হয়েছিল বলেই এসব নিয়ে এতটা চিন্তা করেছিলাম। আল্লাহ সত্যিই মানুষের মনকে মুক্ত করেন, তার নিদর্শনের মাধ্যমে। কোন নিদর্শন কাকে কতটুকু প্রভাবিত করবে সেটা একজন আরেকজনের উপর চাপিয়ে দিতে পারেনা, তাই নিজের বোধটুকু চাঙা রাখার পাশাপাশি অন্যদের পথকে শ্রদ্ধা করাও খুব দরকার।

Sunday, May 13, 2012

দাম্পত্য - ৮

স্বামী স্ত্রীর মধ্যে সম্পর্কের কোন না কোন সময়ে একটা জটিলতা সামনে আসেই, তা হচ্ছে আর্থিক দ্বন্দ্ব। হয় স্বামী যথেষ্ট খোরপোস দেয়না, অথবা স্ত্রী প্রয়োজন ও বিলাসিতার মধ্যে পার্থক্য বোঝে না, অথবা বাবার বাড়িতে টাকা পাঠানো নিয়ে সমস্যা হয়, অথবা দেনমোহর এখনও কেন দেয়নি - তা নিয়ে অসন্তুষ্টি... টাকাপয়সাজনিত দ্বন্দ্বের উদাহরণ দিয়ে শেষ করা যাবে না। এই বিষয়টার সবচেয়ে কঠিন দিক হচ্ছে, আলোচনাটা খুব দ্রুত উত্তপ্ত রূপ নেয়, এবং এক পর্যায়ে স্বামী/স্ত্রী এমন কোন মন্তব্য করে বসে যে অপরজন প্রায় বাকি জীবন সে দগদগে ঘা বয়ে বেড়ায়। আমার এক বন্ধু খুব সুন্দর একটা কথা বলে, (যদিও আমি তার সাথে একমত না,) সম্পর্ক হচ্ছে একটা ভাস্কর্যের মত, প্রতিটা ঘটনা একটা একটা ছাপ রেখে দেয়, এবং তা ভাস্কর্যটাকে নতুন রূপ দেয়। ওর কথা মত ধরলে আমি বলব, টাকাপয়সাজনিত উত্তপ্ত এই মন্তব্যগুলো হচ্ছে হাতুড়ির এক ঘায়ে নাক মুখ খসিয়ে দেয়ার মত। একবার মেরে ফেললে পরে গড়ে তুলতে অনেক বেগ পেতে হয়। 

এই সমস্যা নিয়ে লেখা খুব কঠিন ব্যাপার, কারণ এত ডালপালা ছড়ানো যে, কাকে দিয়ে কোথা থেকে শুরু করব, সেটা বোঝাই দায়। মোটা দাগে কয়েকটা দিক আলোচনা করি, বাকিগুলো আশা করি একই ছাঁচে ফেলা যাবে। 

১. মাসিক খরচের সাথে বরাদ্দকৃত অর্থের ব্যবধান: যে কোন কারণেই হোক, মাস শেষে আয় ও ব্যয়ের হিসাব মেলেনা। এ অবস্থায় একজন অপরজনকে অতিরিক্ত খরুচেপনা বা অতিরিক্ত কিপ্টেমির জন্য দোষারোপ করতে পারে। 


২. আয়ের উপর একচেটিয়া অধিকার: স্বামী স্ত্রী দু'জনেই চাকুরিজীবি হলে নিজের আয়ের উপর কতটুকু কর্তৃত্ব থাকবে - এটা নিয়েও চলতে পারে মনোমালিন্য। এমন দেখেছি, স্ত্রী এর চাকুরির বিশ ত্রিশ বছর পরেও বেতনের টাকাটা নিজ চোখে দেখার সুযোগ হয়না, স্বামী প্রবর হিসেব মত ব্যাংক থেকে তুলে আনেন, এবং তাঁর বিচার বিবেচনায় খরচ করেন। আবার এমনও দেখেছি, একজনের ব্যাংক ব্যালেন্স অপরজন জানেন না, সংসারের খরচের কতভাগ কে দেবে তা নির্ধারিত হয় আয়ের উপর নির্ভর করে... এ ছাড়া কার টাকা কোথায় খরচ হচ্ছে - এ বিষয়ে জিজ্ঞাসা করার অধিকারটাও অপরজন রাখেন না। 

৩. আত্মীয়স্বজনদের সাহায্য বা দান খয়রাত করার ব্যাপারে উভয়পক্ষের সমর্থন না থাকা: হিংসা হোক, স্বার্থপরতাবশতঃ হোক, ক্ষোভ হোক, যথাযথ হোক - যে কোন কারণেই স্ত্রী বা স্বামী অপরপক্ষের আত্মীয় স্বজনের জন্য যে টুকু অর্থ বরাদ্দ করা হয়েছে তা নিয়ে স্বচ্ছন্দ বোধ করছেন না। 

৪. অনেক আগে শ্বশুরবাড়ি থেকে ধার নেয়া টাকা আর কখনও পরিশোধ করেন নি, বা বিয়ের দেনমোহর এখনও শোধ করেন নি, এবং এ অভিযোগগুলো উঠে আসছে জীবনের বিভিন্ন ঘাত প্রতিঘাতে, কেবলই প্রতারণার অভিযোগ হয়ে। 


বিষয়গুলো লেখার সময় আমি যেন চোখের সামনে অনেক উদাহরণ দেখতে পাচ্ছি, কিন্তু লেখার ভাষায় যখন প্রকাশ করছি, নিজের কাছেই ছোট লাগছে, মনে হচ্ছে, দাম্পত্যের মধ্যে এমন সংকীর্ণতা চিন্তা করাই পাপ। কিন্তু দুঃখজনকভাবে সত্যি, সংসারের প্রথম দিকে না হলেও, কোন না কোন সময় এমন অনেক দুঃখজনক ঘটনাই ঘটে, যা কিনা হৃদয় কে স্তব্ধ করে দেয়, অপরজনের প্রতি সম্মান নামিয়ে দেয় শূন্যের কোঠায়, এর রেশ চলে বছরের পর বছর, প্রকাশ্যে, অপ্রকাশ্যে, শ্লেষাত্মক কথায় বা নির্লিপ্ত উদাসীনতায়। 



সমাধান? আমি আমার ক্ষুদ্র অভিজ্ঞতা থেকে বলার যোগ্যতা তেমন রাখিনা। যখন সমাধান বলতে যাব তা হয়ত জটিলতার তুলনায় হাস্যকরই শোনাবে। তবু লিখছি, কারণ দাম্পত্য সিরিজের পুরোটুকুই নতুন দম্পতিদের জন্য, যারা এখনও এসব সমস্যার তুঙ্গে ওঠেন নি। তবে সচেতন না হলে একদিন যে উঠবেন, তা বলার অপেক্ষা রাখে না। 


বর্তমান সময়ে চাহিদার সাথে সঙ্গতির সামঞ্জস্য রাখা প্রতিটা পরিবারের জন্যই খুব কঠিন। এ জন্য যেটা করা যেতে পারে, স্বামী স্ত্রী একটা সময় করে বসে নিজেদের মাসিক আয় কতটুকু সেটার সাথে সাথে কোন খাতে আয়ের কতটুকু খরচ করবেন এমন একটা বাজেট করতে পারেন। সেখানে মুদি খরচ, কাপড়, বাসা ভাড়া, চিকিৎসা - এমন নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিসগুলোর হিসেব করে, বাকি যে টাকাটা থাকে তার কত পার্সেন্ট উপহার, বিনোদন ইত্যাদিতে খরচ করবেন সেটা দু'জনে মিলে ঠিক করতে পারেন। খুব স্বাভাবিক ভাবেই, এসব বিভিন্ন খাতে দু'জনের চাওয়ার পার্থক্য থাকতে পারে। স্বামী হয়ত চাইছেন আধুনিকতম ইলেক্ট্রনিক্স যন্ত্রটা কিনবেনই, যত টাকাই লাগুক। স্ত্রী হয়ত ভাবছেন, আর যাই হোক, ফেসিয়ালের খরচটা বাদ দেয়ার কোন উপায়ই নেই। সুতরাং, প্রথমবার বাজেট তৈরি করতে গেলে এরকম খুঁটিনাটি প্রায় সবকিছু নিয়েই তাদের দৃষ্টিভঙ্গির পার্থক্যটা স্পষ্ট হবে। এবং মজার ব্যাপার হচ্ছে, কেনাকাটা বা খরচের ব্যাপারে বড়রাও ছেলেমানুষের মতই গোঁ ধরেন। ত, সেক্ষেত্রে উষ্ণ বাক্ বিতন্ডায় না জড়িয়ে অন্যজনকে তখন খুবই ঠান্ডামাথায় বোঝাতে হবে। কথোপকথনটা চাই কি এমনও হতে পারে - 

'বুঝলাম, এই মুহুর্তে একটা এস এল আর না থাকলেই নয়। কিন্তু তুমি চিন্তা কর, আমরা প্রতি মাসে সঞ্চয় করি আয়ের মাত্র বিশ শতাংশ। একটা এসএলআর প্রায় আমাদের পাঁচ মাসের সঞ্চয়ের সমান। আর সঞ্চয়ে তোমার খরচের জন্য বরাদ্দ আছে অর্ধেক, তার মানে, তুমি এখন একটা এস এল আর কিনলে আগামী দশ মাস আর কিছু কিনতে পারছ না। তুমি যদি মনে কর, এস এল আরটা দশ মাসের আর সব কিছুর ছাড়ের সমান, তাহলে কিনতে পার। 


বা স্ত্রীর ক্ষেত্রে কাজিনের বিয়ের দাওয়াত উপলক্ষে পার্লারে তিন হাজার টাকা খরচ করা যদি সত্যিই প্রয়োজনীয় মনে হয়, তিনি স্বচ্ছন্দে করতে পারেন, যদি তাঁর জন্য বরাদ্দ খরচের মধ্যেই থাকে। বরাদ্দের বাইরে গিয়ে করতে হলে কান্নাকাটি বা রাগারাগি নয়, যুক্তিপূর্ণভাবে আয়ের উৎসটা দেখিয়ে তারপরই করতে হবে। 


শুধু বাজেট করেই ক্ষান্ত হওয়া যাবে না, প্রতিমাসের নির্দিষ্ট দিনে বসতে হবে হিসাব নিয়ে, এ মাসে লক্ষ্যের কতটুকু অর্জন করতে পেরেছি। যে খাতে পারিনি, সেখানে আর কী কী পরিবর্তন আনতে হবে। এ পর্যায়ে চলবে আরেক দফা দোষারোপ.. কিন্তু তার পরেও, শেষ পর্যন্ত যে সিদ্ধান্তটা নেয়া হবে, সেটা নিয়ে বাকি মাস আর কোন অভিযোগ থাকবে না। একই ভাবে, তিন চার মাস পর আবারো বিশদভাবে রিভিউ করা যেতে পারে, আদৌ আমাদের বাজেট টা বাস্তবসম্মত ছিল কি না। যদি না হয়, আনা যেতে পারে আরো বড় পরিবর্তন, চাই কি কোন মাসে সব রকমের বিনোদন কাট ছাঁট করে দিলেন, অন্য মাসগুলোর সাথে ব্যালেন্স করার জন্য। এরকম অনেক আইডিয়াই আসবে, যদি প্রতি মাসে নিয়ম করে স্বামী স্ত্রী খরচের বিষয়টা আলাপ করেন। 


আরেকটা বিষয় হচ্ছে, নিজের আয়ের উপর কতটুকু অধিকার থাকবে সেটাও অনেক সময় স্বামী স্ত্রীর মধ্যে স্পষ্ট থাকে না। নতুন দম্পতিদের মধ্যে অনেকে এটাই বুঝে উঠতে পারেন না, জয়েন্ট একাউন্ট না রেখে আলাদা একাউন্ট করতে চাওয়াটা অপরাধের পর্যায়ে পড়ে কি না। আবার 'আমি রোজগার করি, আমি খরচ করি - এখানে তুমি বলার কে?' এমন ভাবভঙ্গিও থাকে অনেকের। আমি বলছি না, এর কোনটাতেই কোন সমস্যা আছে। যদি স্বামী স্ত্রী উভয়েই কোন একটা নির্দিষ্ট সেটিং এ স্বচ্ছন্দ বোধ করেন, তাহলে এখানে বলার কিছু নেই। তবে আমার মনে হয়, সংসারের গোড়ার দিকেই এ বিষয়ে কার দৃষ্টিভঙ্গি কী - সেটা স্পষ্ট জেনে নেওয়া ভাল, তা না হলে অকারণে দুঃখ পেতে হবে। 


শেষ যে ব্যাপারটায় জোর না দিলেই নয় - স্বামীর বা স্ত্রীর উপর নির্ভরশীল অনেক আত্মীয় থাকতে পারেন, বিশেষ করে বাবা মা ভাই বোন - এদের জন্য খরচ করাটা কর্তব্যের মধ্যে পড়ে। কিন্তু এই ন্যায়সঙ্গত কাজটাকেও রীতিমত জুলুমের পর্যায়ে নিয়ে যেতে পারেন অনেকে, যদি আগে থেকেই এখানে সীমারেখা টানা না হয়। কীভাবে এই ভাল কাজটি জুলুম হয়ে যেতে পারে? যদি আপনি এ কাজগুলোতে আপনার জীবনসঙ্গীকে অংশীদার না করেন, তবে একটা সময় তার মনে অভিমান হতে পারে, 'আমি কি এতই খারাপ, যে আমাকে জানিয়ে করলে আমি বাধা দিতাম?' তারপর এই অভিমান থেকেই শুরু হবে মুখ গোমড়া করা, অকারণে কঠোর বাক্য বিনিময় - ইত্যাদি ইত্যাদি। ভাল কাজ মিলে মিশে করার মধ্যে খুব বড় রকমের আনন্দ আছে, এবং তা পরস্পরের প্রতি শ্রদ্ধাও বাড়িয়ে দেয় বহুগুণ। তাই বলি, রোজগার আপনার নিজের হলেও, আত্মীয় আপনার রক্তের সম্পর্কের হলেও, জীবনসঙ্গীর অনুমতি চান, এতে করে সে সম্মানিত বোধ করবে। আর আপত্তি করলে, আপত্তির কারণ জেনে তা নিয়ে কথা বলতে পারেন, বা আপনার কাছে যুক্তিসঙ্গত মনে না হলে পাত্তা না দিতে পারেন, তবু যে আপনি অনুমতি চাইলেন, এটাই অনেক বড় প্রভাব রাখবে আশা করি।


সত্যি বলতে কী, দাম্পত্যের আনন্দগুলোর অনে...ক রকমের রং, রস, রূপ রয়েছে। কেন জানি আমরা অস্বচ্ছলতাকে অজুহাত বানিয়ে এরকম সব আনন্দের অস্তিত্বকেই অস্বীকার করতে চাই। মানি, অর্থ না থাকলে অনেক স্বপ্নই পূরণ হয়না, অভিযোগের ঝুলিটাও ভারি হতে থাকে। কিন্তু সরবরাহ যেখানে সীমিত, ব্যবস্থাপনার ত সেখানেই সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন। সফল ব্যবস্থাপনার প্রথম ধাপ হচ্ছে ম্যাচিউর কমিউনিকেশন। আর্থিক ব্যাপারস্যাপারগুলো নিয়ে বসলেই এ জিনিসটা সবচেয়ে বেশি প্রকট হয়। তাই বলি, এধরণের আলোচনার প্রয়োজনীয়তাটা শুধু টাকাকড়ির মধ্যেই সীমাবদ্ধ না, পরস্পরকে বুঝতেও অনেক বড় ভূমিকা রাখে।

Tuesday, April 24, 2012

একটি গল্প

ইরার দু'টো বন্ধু আছে। একজনের নাম বঙ্কু আরেকটার নাম ছুঁচো। ইরার বয়স যখন পাঁচ, তখন একদিন টেবিলের উপর চকলেটের প্যাকেট দেখে কে যেন বলে ওঠে, 'কী মজা! সব খেয়ে ফেলব! ইয়াম ইয়াম!!' সাথে সাথে আরেকজন বলে, 'না! মামনি বলেছে বেশি চকলেট খেলে দাঁতে পোকা হয়, পেট ব্যথা করে... মামনি না বললে চকলেট খাইনা।' তারপর দু'জন ঝগড়া করতে থাকে। ইরা বড় হতে হতে বুঝে, ওর এক বন্ধু শুধু বকাঝকা করে, তাই ওর নাম দিয়েছে বঙ্কু। আরেকজন চকলেট, ফাস্ট ফুড, কার্টুন - যা পায় তাই খেতে চায়, তাই ওর নাম ছুঁচো। 

ইরা এখন অনেক বড় হয়ে গিয়েছে। পড়াশুনা শেষ করে চাকরি করে। বঙ্কু আর ছুঁচোও বড় হয়েছে ওর সাথে সাথে, কিন্তু ওদের ঝগড়া থামেনি। এই যেমন সেদিন, মতিঝিল থেকে বের হয়ে শাহবাগ এ আসার জন্য রিকশায় ওঠে, রিকশাওলা বলে বসে তাকে চল্লিশ টাকা দিতে হবে। ইরার মাথায় রক্ত চড়ে যায়। ছুঁচো বলতে থাকে, 'ফাইজলামির আর জায়গা পায়না? একটা কষে চড় দেয়া দরকার। দাও ত ইরা, আচ্ছাসে গালি কয়েকটা!!' বঙ্কু বলে, 'না না.. কিছু করার দরকার নাই। সুন্দর করে কথা বল, বল, চল্লিশ টাকা অনেক বেশি, তুমি পঁচিশ টাকা দেবে।' ইরা সেদিন ছুঁচোর কথাই শোনে। অনেক চেঁচামেচি করে রিকশা থেকে নেমে যায়। তবে, মাঝে মধ্যে মনে হয়, সেদিন বঙ্কুর কথা শুনলেই ভাল হত। 

ইরার এখন নতুন সংসার হয়েছে। আরিব বেশ আধুনিক মনের ছেলে। তারা মন খুলে কথা বলতে পারে, ইরার কখনও ভয় করে না, 'আমি এটা বললে ও কী ভাববে', তাই কখনও মনোমালিন্য হলে ইরা জানে, যুক্তি দিয়ে বোঝাতে পারলে আরিব ঠিকই বুঝবে। সেজন্য ঝগড়া হলেও, একটা সময় সেটা কোন সিদ্ধান্তে এসে তবেই থামে। রাগ, অভিমান নিয়ে শীতল যুদ্ধে এসে আটকে যায় না। 

সেদিন অফিসে যাওয়ার জন্য তৈরি হতে হতে ইরা শুনতে পেল আরিব বাসায় কথা বলছে, ফোন রাখার পর আরিব কে একটু চিন্তিত মনে হল। 'কী ব্যাপার? কোন খারাপ খবর নাকি?' 'নাআ.. খারাপ খবর না, একটু সমস্যা।' 'কী সমস্যা?' 'আফিয়ার হাজবেন্ড জমি কিনবে, পার্টনার রা সহ ব্যবসা করার জন্য, আমার থেকে পাঁচ লাখ টাকা ধার চাইছে। পরে কথা বলব, আমি যাই, দেরি হয়ে যাচ্ছে' 

ইরাকে একরাশ এলোমেলো চিন্তার মধ্যে ডুবিয়ে দিয়ে আরিব অফিসের জন্য বের হয়ে গেল। আফিয়া ইরার ননদ, নিজের পছন্দের ছেলেকে বিয়ে করতে চাওয়ায় বাসায় খুব আপত্তি করে, ছেলের আর্থিক অবস্থা ভাল না। আরিবই তখন নিজে দায়িত্ব নিয়ে ওর বিয়ে দেয়। ছেলেটা ভাল, দায়িত্বশীল। কিন্তু এই মুহূর্তে ধার নিয়ে শোধ করার মত অবস্থা ওর নেই। আপাতত টাকা দেয়া মানে দিয়ে দেয়াই। 

এধরণের সমস্যায় বঙ্কু আর ছুঁচো খুব বাচাল হয়ে যায়। আফিয়া তার মাথার ভেতর ছুঁচোর বকবকানি শুনতে শুনতে অফিসে যেতে থাকে। 

'পাঁ..চ লা..খ টাকা! এইটা কোন কথা? ব্যাঙ্কে সাকুল্যে জমেছে সাড়ে চার লাখ টাকা। ওকে দিয়ে দিলে ত আর কিছুই থাকে না। আমাদের নিজেদের ভবিষ্যৎ আছে না? বিপদ আপদ কত কিছু আসতে পারে। আর টাকাটা কি একা আরিবের নাকি? আমরা দুইজন মিলে জমিয়েছি। ওর বোনকে আমার টাকা দিব কেন? না না... এসব হবে না। আরিব কে আমি বাসায় গিয়ে বলব ও নিজেরটা থেকে দিলে দিবে, আমার টাকায় যেন হাত না দেয়। আর এইটা কী? আফিয়ার আক্কেল জ্ঞান নেই? কী বুঝে এরকম আব্দার করে বসে? আমাদের টাকা কি আকাশ থেকে আসে? আর একবার শুরু করলে এর কোন শেষ নাই। চাইতেই থাকবে। যা বলার এখনই ক্লিয়ার করে ফেলা উচিৎ, দেখ বাপু! বাবা মাকে বোঝানোর জন্য যা করা দরকার করেছি। এখন নিজের টা নিজে দেখ। ওসব ধার ফার দিতে পারবনা। আরিবের বেশি খারাপ লাগলে পঞ্চাশ হাজার টাকা সাহায্য হিসেবে দিক, এর বেশি এক পাই পয়সাও না।' 

ইরার মুখে চোখেও বেশ একটা বিরক্তির ছাপ পড়ে। অফিসে পৌঁছে একটা হিসাব ভুল দেখে অধস্তন কর্মচারী কে আচ্ছাসে বকে মেজাজটা একটু শান্ত হয়। 

লাঞ্চ টাইমে নামাজ পড়ে একটু চোখ বন্ধ করে। শুনতে পায় বঙ্কুর কণ্ঠ - 

'ইরা! ইতু কেমন আছে?' 

ইরা জবাব দেয়, হুঁ, ভাল ত। অনার্স শেষ হবে কিছুদিন পর। 

'ইতুর জন্য মায়া লাগে না?' 

হ্যা.... খুব! 

'ওর কোন কষ্ট আসলে ওকে সাপোর্ট দেবে না?' 

দেব না মানে? বুকে করে রাখব। আমার আদরের ছোট্ট বোন টা! 

আফিয়াও ত ছোট্ট বোন, তাই না? 

ঝট্ করে চোখ খুলে গেল ইরার। সকাল থেকে পুরো ঘটনাটা সে রিওয়াইন্ড করে দেখতে থাকল। শুধু আরিবের জায়গায় নিজেকে, আর আফিয়ার জায়গায় ইতুকে বসিয়ে। ঝর ঝর করে চোখ দিয়ে পানি পড়তে থাকল। এসব কী ভাবছিল সে? যদি আরিব কে বলে বসত সব? কী হত? বঙ্কু আবার কথা বলে উঠল, 

কী? দেবে টাকা? 

হ্যাঁ, অবশ্যই। 

তুমি কিন্তু এখনও ইমোশনাল, ইরা! একটু চিন্তা করে দেখ ত, ব্যাঙ্ক খালি করে একজনকে সব টাকা দিয়ে দেয়া কোন ভাল বুদ্ধি কী না! ছুঁচো কিন্তু খারাপ কথা বলে নি, তোমাদের সমস্যা আসলে টাকা কোথায় পাবে? 

তাই ত! তাহলে কি দিব না? 

তুমি চিন্তা করে দেখ। 

বিকেলে ফেরার পথে ইরা খুব করে চিন্তা করল। খুব করে। 

রাতে খাওয়ার টেবিলে আরিব বেশ চুপচাপ। বোঝা যাচ্ছে, ও ও সিদ্ধান্ত নিতে ইতস্ততঃ করছে। বা হয়ত সিদ্ধান্ত নিয়েছে, ইরা কীভাবে নেবে সেই চিন্তা করে বলতে দ্বিধা করছে। ইরাই মুখ খুলল - 

'আফিয়ার ব্যাপারটা চিন্তা করলাম, বুঝছ?' 

'হুম' 

'দেখ, তুমি ওর একমাত্র বড় ভাই। বাবা ত বিয়ের সময়ই মুখ ফিরিয়ে নিয়েছেন, তাই অভিভাবক বলতে এখন তুমিই। তুমি সব দায়িত্ব নিয়ে ওকে বিয়ে দিয়েছ, এই বলে, যে ও এখানে সুখে থাকবে। তুমি সাহায্য না করলে ওর আজকে হয়ত বাবার পছন্দ অনুযায়ী খুব বড়লোকের সাথে বিয়ে হত, হত না?' 

'হুঁ' 

'ত, তোমার বোনকে ত তুমি এই অবস্থায় ছেড়ে যেতে পার না। ওরা যেন দাঁড়িয়ে যায় সেটা নিশ্চিত করা অবশ্যই তোমার উচিৎ।' 

'না, আমার ত ইচ্ছা করেই ওকে হেল্প করতে। কিন্তু আমাদের টাকা কোথায়?' 

'তুমি রিজভীর সাথে কথা বল, দেখ, তিন লাখ এর মত দিলে বাকিটা ম্যানেজ করতে পারবে কি না।' 

'দুপুরেই বলেছি, ও আরও দশ লাখ ব্যাংক থেকে লোন নিচ্ছে' 

'ঠিক আছে, তুমি একাউন্ট থেকে তিন লাখ এর মত দাও, বাকি দুই লাখ আমি ম্যানেজ করে দিব।' 

'তুমি কোত্থেকে ম্যানেজ করবে?' 

'বাহ! আমার বিয়ের গয়না আছে না? আমি গয়না পরি? একটা এখন ছেড়ে দেই, পরে আল্লাহ দিলে অনেক হবে।' 

আরিব কোন কথা না বলে চুপচাপ খেতে থাকে। ওর চোখ ঝাপসা হয়ে আসে, ভাবে আল্লাহ এই মেয়েটিকে বোধহয় খাঁটি হীরে দিয়ে বানিয়েছেন, তাই টাকা, অলংকার - কোন কিছুই ওর গায়ে লাগে না। 

ইরাও চুপচাপ খেতে থাকে, আর মনে মনে বলে, 'বঙ্কু, আমাকে কখনও ছেড়ে যেও না।'

Friday, April 20, 2012

আর্ট অব এপ্রিসিয়েশন - ৪

অপ্রিয় সত্যটাকে অস্বীকার না করেও কীভাবে ভাল দিকগুলো তুলে আনা যায় - সেটা বোঝাতেই এই সত্য/অর্ধসত্য/কাল্পনিক ঘটনাগুলোর অবতারণা 


আজকে নাহিয়ান আর আসাদের গল্প করার দিন। দু'জনেরই বেশ খানিকটা অবসর, তাই গল্পের ডালি খুলে বসেছে দু'জনে। ওদের বিয়ে হয়েছে দুই তিন মাস হল। এখনও অনেক কিছু জানার বাকি, তাই একথা সেকথা থেকে দু'জনেই ফিরে গেল শৈশবে। 

(নাহিয়ান): আমি ছোটবেলা খুব বাবার ভক্ত ছিলাম। বাবা বাইরে যেতে নিলে পা জড়িয়ে ধরে রাখতাম। ঘরে আসলেই আবার বাবার কোলে। 

(আসাদ): আমি ছিলাম প্রচন্ড মায়ের ন্যাওটা। আম্মুর সাথে সাথেই ঘুরতাম, আম্মু ঘরের কাজ করত, আমি তার সাথে বসে থাকতাম। আমার যন্ত্রণায় কাজই করতে পারত না। 

(নাহিয়ান): হ্যা, আম্মুও আদর করত, কিন্তু বাবা সবসময় থাকত না ত, বাসায় আসলে আমার সাথে খেলা করত... তারপর বিকেল বেলা আব্দার করলে শিশুপার্ক, নিউমার্কেট - এসব জায়গায় নিয়ে যেত - খুব মজা! তারপর একবার আব্বু ঢাকায় গিয়েছিল, আসার সময় আমার জন্য ৩-৪ টা পুতুল, গল্পের বই, রং - অনেক কিছু এনে দিয়েছিল। এই জন্য আমার কাছে বাবা মানেই আনন্দ ছিল। 

(আসাদ): শাসন করত না? 

(নাহিয়ান): নাহ্! বড় হওয়ার পরে করেছে, কিন্তু এমনিতে খালি আদরই করত। 

আসাদের মুখটা আস্তে আস্তে কাল হয়ে গেল। ধীরে ধীরে বলল, 'তুমি খুব লাকি, নাহিয়ান! তোমার শৈশব খুব সুন্দর ছিল।' 

- কেন, তোমার ছিল না? 

- আমার সারা জীবনে কোনদিন কোন খেলনা ছিলনা। 

- তো কী হয়েছে? কত বাচ্চারই ত থাকেনা। তোমাদের ত কিছুটা অস্বচ্ছলতা ছিল, খেলনা কেনার মত বিলাসিতাটা হয়ত উনারা করতে পারেন নি। এতে মন খারাপ কর কেন? 

আসাদ মৃদু হাসে, 'তোমার কি মনে হয়, আমি এত অকৃতজ্ঞ যে আমার বাবা মায়ের অক্ষমতা নিয়ে অভিযোগ করব? ব্যাপারটা তা ছিলনা।' 

- তাহলে? 

- আমার বাবা কোনদিন আমাকে বাবার আদর দিয়ে বড় করেন নি। 

- কী বল তুমি? আমার শ্বশুরের মত ভাল মানুষ কয়টা হয়? আমাকেই ত কীরকম আদর করেন!! 

- হ্যা, উনি পৃথিবীর সবার কাছে ভাল মানুষ। কেবল স্ত্রী, সন্তানদের জন্য উনার কোন দায়িত্ব আছে, এটা তিনি মনে করতেন না, এখনও করেন না। খেলনা বল, বেড়ানো বল, কাপড় চোপড় বল.. কোন কিছুই উনার কাছে মনে হতনা যে এটা আমার পরিবারের মানুষদের জন্য দরকার। সামান্য যে ক'টা টাকা আয় করতেন, বাসায় বাজারটা করে দিয়ে বাকি টাকা নিজের ভাই ভাবীর পরিবারে খরচ করতেন। 

- উনাদের হয়ত আরো বেশি দরকার ছিল! 

- মোটেই না, উনারা খুবই স্বচ্ছল, নিজেদের ব্যবসাপাতি আছে। 

- তাহলে? 

- জানি না। একবার আমার মনে পড়ে বাজার থেকে বেশ কিছু খেলনা, বাচ্চাদের জিনিস কিনে আনেন। সব আমার চাচাত ভাই বোনদের জন্য, আমার বয়স তখন সাত। 

- কেন? 

- জানিনা। 

আসাদের মুখের বিমর্ষতা কেটে আস্তে আস্তে ভর করে ক্ষোভ। অস্ফুট স্বরে বলতে থাকে, 'আম্মু চাচাদের বাসায় কত অসম্মান পেয়েছে, আমার বাবা পাত্তাও দেয়নি। বড় হওয়ার আগ পর্যন্ত বাবা আমাদের কাছে কেবলই ভয়ের ব্যাপার ছিল। পড়ার টেবিলে না পেলে মারবেন, এ ছাড়া বাবার সাথে আমার আর কোন শৈশব নেই।' 

বলতে বলতে নাহিয়ানের দিকে তাকিয়ে দেখে ওর চোখে টলটল করছে পানি। 'আরে! এ্যই মেয়ে, কান্না করছ কেন? তোমাকে ত আর কিছু বলাই যাবে না দেখি।' আসাদ মুখোমুখি বসে চোখের পানি মুছিয়ে দিতে থাকে। নাহিয়ান একটু ধাতস্থ হলে আবার কথা শুরু করে - 

- কান্না কর কেন? এটা এমন কী কষ্ট? মানুষ আরো কত কষ্টে থাকে না? কারো ত বাবাই থাকে না! 

- তারপরেও, যার যার স্ট্রাগল তার তার। তুমি যে কষ্ট পাওনি তা ত না। 

- না, কষ্ট পেয়েছি এটা অস্বীকার করব না। কিন্তু দেখ, এতদিন পরে পেছনে তাকিয়ে মনে হয়, আমি আজকে যে মানুষটা হয়েছি, তার জন্য এ ঘটনাগুলোর অবদান আছে। 

- কীরকম? 

- আমি এগুলো পাইনি দেখেই বুঝি বাবা হিসেবে, স্বামী হিসেবে দায়িত্বগুলো পালন করা কত জরুরি। আমার বন্ধুবান্ধবদের অনেকের মধ্যেই বিয়ে মানে একটা ফ্যান্টাসি, একটা মেয়ের সাথে ২৪ ঘন্টা থাকা - এটুকুই। তোমার মনে আছে, তোমার বাবা যখন তোমার হাতটা আমার হাতে তুলে দিল, আমি কী বলেছিলাম? 

- হুঁ, বলেছিলে, 'আপনারা যে বিশ্বাস নিয়ে ওকে আমার হাতে দিলেন, দোয়া করবেন যেন তার সবটুকু মর্যাদা রাখতে পারি।' 

- আমি সত্যিই মনে প্রাণে এটাই বিশ্বাস করি। 

- আমি জানি। 

- তারপর দেখ, তোমরা অনেক নিরাপত্তা পেয়ে বড় হয়েছ। তোমার বাবা ছিল বিপদ আপদ দেখার জন্য, মা তোমাদের মানসিক শক্তি দিয়েছেন, সে তুলনায়, আমরা ভাইবোনেরা অনেক ছোট থেকেই জানি, আমাদের জন্য মাথার উপর কেউ নেই। আমার মা এত সরল, উনি আমাদের সামলাবেন কী, আমাদেরই উনাকে মানসিক শক্তি দিতে হয়েছে। সে জন্য আমরা ভাইবোনেরা, মা - সবাই একটা ইউনিট এর মত ছিলাম। এখনও ত তুমি বল, আমাদের মধ্যে বন্ধনটা অনেক বেশি। 

- হ্যাঁ, তোমরা ভাইবোনেরা যেভাবে একাত্মা হয়ে আছ, এটা এখন আর অত দেখা যায় না। 

- তাছাড়া, তোমাকে ত বললামই, আত্মীয়দের থেকেও অনেক সময় কষ্ট পেয়েছি। তাই বন্ধুবান্ধব, প্রতিবেশী, যেই হাত বাড়িয়ে দিয়েছে, আপন মানুষের মত দেখেছি। 

- হুঁ, তুমি মানুষকে খুব দ্রুত আপন করে নিতে পার। 

- কী করব বল, আমাদের একমাত্র আনন্দ ত ছিল হিউম্যান ইন্টারঅ্যাকশনেই। টিভি নেই, গল্পের বই কেনার টাকা নেই, ঘুরতে যাওয়ার উপায় নেই... আড্ডা দিতাম, ওটাই আনন্দ। 

- হ্যা, আমি নতুন জায়গায় গেলে ভয় লাগে, মানুষের সাথে মিশতে ভয় পাই, তুমি পাওনা, দেখেছি। 

- প্লাস সবসময় মাথায় ছিল ভাল পড়াশুনা না করলে এই অবস্থা থেকে কোনদিন বের হতে পারব না। দাঁতে দাঁত চেপে কেবল পড়াশুনা করেছি। আমার মধ্যে একটা বাধনছেঁড়া ভাব আছে। এখন মনে হয়, পরিবারের এই চাপটা না থাকলে আমি মনে হয় ঠিক থাকতাম না। 

- কী জানি! 

- সবকিছু মিলিয়ে আমার এখন আর কোন দুঃখ নেই, জান! আমার মনে হয় দুঃখের সময়গুলো আমার জন্য ট্রেইনিং পিরিয়ড ছিল। উৎরে যেতে পেরেছি বলেই এখন এখানে আছি এবং তোমাকে পেয়েছি। 

নাহিয়ানের ভেজা গালে খুশি আর লজ্জা মিলে অদ্ভুত এক রং দেখা দিল। আসাদ আরও একবার মেয়েটার সরলতা দেখে অবাক হল।

Tuesday, April 17, 2012

আর্ট অব এপ্রিসিয়েশন - ৩


অপ্রিয় সত্যটাকে অস্বীকার না করেও কীভাবে ভাল দিকগুলো তুলে আনা যায় - সেটা বোঝাতেই এই সত্য/অর্ধসত্য/কাল্পনিক ঘটনাগুলোর অবতারণা 


আরও একটা কর্মব্যস্ত দিন। অনিকের এখন ছুট.. ছুট... ছুট করে কাজ নিয়ে ব্যস্ত থাকার কথা ছিল। কিন্তু সে অলস পড়ে আছে বিছানায়, জানালা দিয়ে আকাশ দেখছে। সামনের দিনগুলো কী হবে - কিছুই বলতে পারেনা। 

অনিক ভাবতেও পারেনা দেড় বছর পর এক কথায় তাকে ল্যাব থেকে বাদ দিয়ে দিতে পারে। তার শখের রিসার্চ, দেড় বছরের ডাটা - সব ফেলে দিয়ে আবার নতুন করে শুরু করতে হবে। অন্য কোন ল্যাবে গিয়ে ধর্ণা দিতে হবে, ওর কত প্রিয় ছিল এই কাজটা! কোন মুখে নতুন কোন ল্যাবে যাবে সে? নিশ্চয়ই পুরো ডিপার্টমেন্টে চাউর হয়ে গেছে, গত বছরের এই পিএইচডি স্টুডেন্টটা কিক্ আউট হয়েছে - সবাই কী ভাবছে.. সব শেষ হয়ে গেল... কীভাবে আবার শুরু করবে? পিএইচডির পাঁচ বছরের বেঁধে দেয়া সময়ে নতুন ল্যাবে ঢোকা, নতুন জিনিস নিয়ে আবার শিখতে শুরু করা, প্রজেক্ট গুছানো ... এত কিছু করে আদৌ কি সে আর শেষ করতে পারবে পিএইচডি? দেশে থাকা মায়ের মুখটা মনে পড়ে অনিকের। কী লজ্জা! কী লজ্জা!! কেউ নেই পাশে সাপোর্ট দেয়ার মত... কী অপ্রয়োজনীয়, অপদার্থ লাগছে! মাথা তুলে চারদিকে তাকাতেও লজ্জা, ঘেন্না হচ্ছে। 

ল্যাবটার কথা বারবারই মনে পড়ে তার। কাজটা ভাল হলেও, ল্যাবের মানুষগুলোর আসলে সাথে কখনোই তার বনিবনা হয়নি। ওরা বেশ উন্নাসিক, আড়ালে একজন আরেকজনের নামে বাজে কথাও বলে। ওর সুপারভাইজর, ব্যস্ত মানুষ, তার সাথে কোন অন্তরঙ্গতাই হয়নি কখনো, তিনিও ল্যাবের পুরনোদের কথা বেশ গুরূত্ব দেন, যাচাই না করেই। ল্যাবের অনেকেই পুরনো ল্যাব মেম্বারদের তোয়াজ করে চলত। পুরো পরিবেশটাই ওর খুব বাজে লাগত। এমনকি কাজটা... কাজের ফিল্ডটা এক্সাইটিং হলেও, ওকে একই কাজ বারবার করতে হচ্ছিল, নতুন কিছু শিখছিল না, সুপারভাইজর নতুন কোন কাজ করতে খুব একটা উৎসাহও দিত না। কাজটাও এত গোলমেলে, ঠিকঠাক মত কোন রেজাল্ট পাওয়া যায় না। 

নাহ! কাজটা যত সহজ আর আনন্দের মনে হত, আসলে ততটা ছিলনা, একই কাজ করতে করতে একঘেঁয়েমি পেয়ে বসত, তার উপর রেজাল্ট না পেলে হতাশ লাগত। তার উপর ল্যাবের মানুষগুলোর কারণে ওর ল্যাবের জন্য টানটাও ছিল না। মানুষ পিএইচডি করাকালে সুপারভাইজরের থেকে কত কিছু শেখে, ওর সুপারভাইজরের সময় কোথায়? সপ্তাহে দু'বার মিটিং ছাড়া আর কখনও তাকে দেখাই যায়না। আর তাকে সবাই এত ভয় পায়, যে সত্যিকারের মেন্টরশীপ আদৌ গড়ে উঠত কিনা সন্দেহ। যা হয়েছে ভালই হয়েছে, পাঁচ বছর এই বাজে পরিবেশে থাকতে হয়নি। 

কিন্তু দেড় বছর যে নষ্ট হল? আর মোটে সাড়ে তিন বছরে নতুন কাজ খুঁজে শুরু করা, প্রথম থেকে? পারবে ত সে? ভাবতে ভাবতে তার মনে পড়ল, গত বছর একটা কোর্সে এক ফ্যাকাল্টি কে দেখে ওর ভাল লেগেছিল, ভদ্রলোক খুব অমায়িক, ওদের কাজগুলোও মজার। তাছাড়া সে ল্যাবে ওর খুব কাছের একজন বন্ধু কাজ করে, পড়াশুনার গ্যাপটা বন্ধুর সাথে আলোচনা করেও অনেকটা পুষিয়ে নিতে পারবে। তাছাড়া, সে বন্ধু সবসময় বলে ওদের ল্যাবে অনেক ফ্লেক্সিবিলিটি। সুপারভাইজরের নতুন নতুন কাজ করতে খুব উৎসাহ! চেষ্টা করে দেখতে ক্ষতি কী? 

ভাবতে ভাবতে বিছানা থেকে উঠে বসল অনিক, নাহ! এক্ষুণি বন্ধুকে একটা ফোন দিতে হবে। আর সে ভদ্রলোকের সাথেও একটা এপয়েন্টমেন্ট নেয়া দরকার। অনেক কাজ, শুয়ে থাকলে হবে না।

আর্ট অব এপ্রিসিয়েশন - ২

অপ্রিয় সত্যটাকে অস্বীকার না করেও কীভাবে ভাল দিকগুলো তুলে আনা যায় - সেটা বোঝাতেই এই সত্য/অর্ধসত্য/কাল্পনিক ঘটনাগুলোর অবতারণা 

অরিত্রার চোখে টলটল করছে পানি। ওর বাবা আবারও অকারণে রাগারাগি শুরু করেছে, সাথে অনেক অপমানজনক কথা। আজকে অন্যায় কথার প্রতিবাদ করতে গিয়েছিল একটু... ওর বাবা প্রায় মারতে এসেছিলেন। মাকে এসব কটু কথা শোনালে অরিত্রার একেবারেই সহ্য হয়না। কিছু বলতে গেলে উল্টো মা-ই নিষেধ করেন। অরিত্রা যতবারই এসব ভাবতে যায়, চোখে পানি এসে পড়ে। 

মা এসে বসলেন পাশে, গায়ে হাত বুলিয়ে দিলেন। অরিত্রা আরেকটু মুখ গুঁজে ফেলল বইয়ের ভেতর। 

কী রে মা, মন খারাপ? 

নাহ! 

তোর বাবার ব্যবহারে কষ্ট পেয়েছিস? 

(নীরব) 

তুই জানিস না তোর বাবা অমনই? কেন তর্ক করতে যাস? 

(মনে মনে..) অন্যায়টার প্রতিবাদ না করলে আমি বিবেকের কাছে কী বলব মা? 

কী রে, উত্তর দিবিনা কিছু? 

তুমি আমাকে আটকাও কেন? কথা বলতে দাও না কেন? 

দেখলি না, একটু বলতেই তোর গায়ে হাত তুলতে নিয়েছিল.. 

তুললে তুলবে, সবসময় এগুলা সহ্য করা যায় না কি? 

দ্যাখ, আজকে প্রায় তিরিশ বছর ধরে তোর বাবার সাথে আমার সংসার। আমার যখন বিয়ে হয় তখন আমার বয়স মাত্র একুশ। পড়াশুনা করতাম, দুনিয়ার কিচ্ছু চিনতাম না... তোর বাবার হাত ধরে বাবা মায়ের আদর ছেড়ে ঢাকায় চলে আসলাম। একা একা বাসা থেকে বেরোতেও ভয় করত। সারাদিন একা একা ঘরে বসে থাকতাম, তোর বাবা অনেক রাত করে বাসায় ফিরত, ঠিক মত কথা বলত না, খাবার ভাল না থাকলে রাগারাগি করত। 

এগুলো ত আমি জানিই... 

তারপরেও শোন। আমি মন খারাপ করে থাকতাম, কিন্তু কখনো এর বাইরে কিছু চিন্তা করিনি। তারপর তুই যখন পেটে আসলি, আমার শরীর ভাল না, একটা মানুষ নাই দেখার... তোর বাবার থেকে সহযোগিতা ত দূরে থাক, একটু ভাল ব্যবহারও পেতাম না। তারপর একটা হাতখরচ দিত না, ঈদে নতুন কাপড় পর্যন্ত না। 

মা, এসব আমাকে বলছ কেন? 

বলছি, কারণ, তুই এখন আমার সাথে তোর বাবা গলা উঁচু করে কথা বললে রাগ হয়ে যাস। আমি ত এর চেয়ে অনেক অনেক কঠিন সময় পার করে এসেছি। তখন বয়স কম ছিল, বাবা মা বেঁচে ছিল, চাইলে সংসার ছেড়ে চলে যেতে পারতাম। এখানে থাকব, এটা ত আমারই সিদ্ধান্ত। 

ত? 

পুরোটা শোন। তোর মুখ চেয়ে আমি যখন ঠিক করলাম, আমি থাকব, তখন সিদ্ধান্ত নিলাম, থাকলে সম্মানের সাথেই থাকব, মাথা উঁচু করে থাকব। ঘরে শান্তি, স্বস্তি রাখার জন্য যা যা করতে হয় করব। অনার্সে ভর্তি হলাম, তোকে, অর্ঘ্যকে নিয়ে অনার্স, মাস্টার্স করলাম। চাকরি তে ঢুকলাম। সব কি এত সহজে হয়েছে? তোর বাবা পড়ার বই দেখলে রাগ হয়ে যেত। চাকরি করা নিয়ে কত যুদ্ধ - এক বেলার খাবারে উনিশ বিশ হলে বাটি ছুঁড়ে ফেলে দিত। 

এত কিছু করে চাকরি করতে গেলা কেন? 

তোদের মুখের দিকে তাকিয়ে। আত্মসম্মান বল, শান্তি বল... কোনকিছুই ত তোর বাবার থেকে আমি পাইনি। এভাবে যদি আমাদের সংসার চলতে থাকত, তোরা অসুস্থ হয়ে যেতি। চাকরিটা আমাকে মনের জোর দিয়েছে। আমার যোগ্যতা কতটুকু, সেটা বোঝার সুযোগ দিয়েছে। 

ত এখন তুমি প্রতিবাদ করনা কেন? 

প্রতিবাদ করব কেন? আমি পুরো ব্যাপারটার জন্য তোর বাবার কাছে কৃতজ্ঞ! 

মানে???!!!! 

তুই চিন্তা কর, আমি কী ছিলাম! তোর বাবার এই অমানুষিক রাগই ত আমাকে পথ দেখিয়েছে। আমার দেয়ালে পিঠ ঠেকে গিয়েছিল, হয় আমি সংসার ছেড়ে চলে আসতে হবে, অথবা নিজের পায়ে দাঁড়াতে হবে। তোর বাবা অমন না করলে আমি ত পড়াশুনাটাও আর করতাম না। তোদের কে তখন কী শিক্ষা দিয়ে বড় করতাম? মোরালিটি বল, দায়িত্বজ্ঞান বল, সবই ত আমি যেটুকু পেরেছি শিখিয়েছি। এটুকু না হলে তোরা এমন আলোকিত মানুষ হতে পারতি? 

তারপরেও মা... 

তুই এখন বুঝবি না। প্রত্যেকটা কঠিন সময়ের পেছনেই কোন ভাল উদ্দেশ্য থাকে। আমরা ভাল টা ধরতে পারিনা দেখে কষ্ট পাই। আর তোর বাবারই বা দোষ কী? উনিও ত যে পরিবেশ থেকে বড় হয়েছে, ওসব শিখে আসতে পারে নি। এখন নিজে বুঝে বুঝে যতটুকু পেরেছে হয়েছে। এখন উনি গর্ব করেন যে ছেলেমেয়েগুলো ভাল মানুষ হয়েছে। উনি নিজের দোষটা দেখতে পান না, কিন্তু মানুষ হিসেবে ত উনি ভাল!

জানি না... 

জানবি। একটা সময় পরে। তখন ঠিকই এপ্রিশিয়েট করবি।

Sunday, April 15, 2012

আর্ট অব এপ্রিসিয়েশন - ১

মৌমিতার প্রাণের বন্ধু আসমার মুখ ভার, চোখমুখ কাল, প্রায় কাঁদকাঁদ মুখ। মৌমিতা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। আসমা যে অফিসে কাজ করে সেখানে এক উচ্ছ্বল, উদার হৃদয়ের যুবককে মনে ধরে গেছে আসমার। কিন্তু প্রাণে ধরে কখনই সে কল্পনা করতে পারেনা, তাকে কারও পছন্দ হতে পারে। হবেই বা কী করে? গায়ের রং, শারীরিক গঠন - সব কিছু নিয়ে কি কম কথা শুনতে হয়েছে সারা জীবন? তাও যদি দাঁতগুলো একটু সুন্দর হত! আসমার ভুসো মাখানো মুখটাতে রঙের খেলা বোঝা যায়না, তবু মৌমিতা বুঝতে পারে ফেরেশতাসম সুন্দর মনের এই মেয়েটার মনে কত দুঃখ। কী বলবে বুঝতে পারেনা। আসমাই এক সময় মুখ খোলে - 

'আমার মনে হয় কখনো বিয়ে হবে না রে!' 

কেন? 

কে বিয়ে করবে আমাকে? 

কেন? 

আমি কত কুচ্ছিত। 

তুই কুচ্ছিত হলি কোন দিক দিয়ে? 

ওমা! তোর কি চোখ নেই? আমার গায়ের রং দেখেছিস? চেহারা দেখেছিস? মানুষ হাসলে কত সুন্দর দেখায়... আমি হাসলে... কে বিয়ে করবে আমাকে? 

কী সব যা তা বলিস? তোকে ভালবাসবে না যে ছেলে সে আসলে তোকে পাওয়ার যোগ্যই না! 

ধ্যেৎ! শুরু হল তোর কথার খেলা। 

আচ্ছা, ঠিক আছে। আগে বল, সৈকত ভাই তোর সাথে কথা বলে? 

ম্... বলে ত! 

সুন্দর করে? 

হ্যা! ভালই ত, ভদ্র ব্যবহার। 

আচ্ছা! তাহলে বল, তোর সাথে কথা বলার আগে ত উনাকে তোর চেহারা দেখতে হয়েছে, এমন ত না যে চোখ বন্ধ করে কথা বলেছে। 

হ্যা, ত? 

ত, উনি ত তোকে ঘৃণা করেন না। করেন? 

ন্ না... 

ত, চেহারার আকর্ষণের পর্যায়টা ত উনি পার হয়েই এসেছেন, তাই না? 

হ্যা। তাতে কী? 

মানুষ ত চেহারা দেখে প্রথম পরিচয়ে, তারপর ত চেহারাটা কেবলই মুখ চেনার জন্য। বাকিটা চেনাজানা ত হয় মনের চেহারা দিয়ে। 

হু, কী বলতে চাচ্ছিস? 

দ্যাখ, তুই খুব গভীর চিন্তা চেতনার একটা মেয়ে। তোর মনটা খুব স্বচ্ছ। যখন কথা বলিস, ফালতু কথা বলিস না, আন্তরিকতা নিয়ে, চিন্তাভাবনা করে কথা বলিস। এতদিন হয়ে গেল, কখনও তোকে হিংসা করতে দেখলাম না, কাউকে নিয়ে খারাপ কথা বলতে দেখলাম না... তোর চালচলন, পোশাক আশাকে সুরুচির পরিচয় পাওয়া যায়। তুই শুধু গাধার মত পড়াশুনাই করিস নি দিন রাত, অনেক দায়িত্ব নিতে শিখেছিস, যে কোন কাজ দিলে গুছিয়ে টিপটপ করে করে ফেলতে পারিস। বল্, আমি কোন মিথ্যা বলেছি? 

 

তাহলে বল, সৈকত ভাই কি এতই অন্ধ যে এসব কিছুই উনার চোখে পড়বে না? 

আমি জানি না... 

তুই ত লুকিয়ে প্রেম করবি না, ভাল লাগলে বাসায় প্রস্তাব পাঠাতে বলবি। হলে হল, না হলে নাই। 

তাও... 

অ্যাই! তোর এসব ইয়ে বাদ দে ত! আমার কথাটা লিখে রাখ্, কোন মেয়েই তোর চেয়ে ভাল অপশন হতে পারে না। 

পাম্প মারিস? 

নাআআ... মানলাম তুই ডানাকাটা পরী না। ডানাকাটা পরী হলে কী হত? সৈকত ভাইয়ের চোখ ধাঁধাত, তারপর ভেতরটা বাইরের মত না হলে একসময় আগ্রহ হারিয়ে ফেলত। আর এখন? তোকে যদি একবার কাছ থেকে চেনে, তারপর থেকে যতই চিনবে, ততই আরও বেশি মুগ্ধ হবে। There is no way anyone will like you less over time. 

ইস্! তুই যে এসব কথা কোথায় পাস!!  

মিথ্যা বলেছি? বললে আমার কান কেটে নিস, যা! >