Tuesday, April 17, 2012

আর্ট অব এপ্রিসিয়েশন - ২

অপ্রিয় সত্যটাকে অস্বীকার না করেও কীভাবে ভাল দিকগুলো তুলে আনা যায় - সেটা বোঝাতেই এই সত্য/অর্ধসত্য/কাল্পনিক ঘটনাগুলোর অবতারণা 

অরিত্রার চোখে টলটল করছে পানি। ওর বাবা আবারও অকারণে রাগারাগি শুরু করেছে, সাথে অনেক অপমানজনক কথা। আজকে অন্যায় কথার প্রতিবাদ করতে গিয়েছিল একটু... ওর বাবা প্রায় মারতে এসেছিলেন। মাকে এসব কটু কথা শোনালে অরিত্রার একেবারেই সহ্য হয়না। কিছু বলতে গেলে উল্টো মা-ই নিষেধ করেন। অরিত্রা যতবারই এসব ভাবতে যায়, চোখে পানি এসে পড়ে। 

মা এসে বসলেন পাশে, গায়ে হাত বুলিয়ে দিলেন। অরিত্রা আরেকটু মুখ গুঁজে ফেলল বইয়ের ভেতর। 

কী রে মা, মন খারাপ? 

নাহ! 

তোর বাবার ব্যবহারে কষ্ট পেয়েছিস? 

(নীরব) 

তুই জানিস না তোর বাবা অমনই? কেন তর্ক করতে যাস? 

(মনে মনে..) অন্যায়টার প্রতিবাদ না করলে আমি বিবেকের কাছে কী বলব মা? 

কী রে, উত্তর দিবিনা কিছু? 

তুমি আমাকে আটকাও কেন? কথা বলতে দাও না কেন? 

দেখলি না, একটু বলতেই তোর গায়ে হাত তুলতে নিয়েছিল.. 

তুললে তুলবে, সবসময় এগুলা সহ্য করা যায় না কি? 

দ্যাখ, আজকে প্রায় তিরিশ বছর ধরে তোর বাবার সাথে আমার সংসার। আমার যখন বিয়ে হয় তখন আমার বয়স মাত্র একুশ। পড়াশুনা করতাম, দুনিয়ার কিচ্ছু চিনতাম না... তোর বাবার হাত ধরে বাবা মায়ের আদর ছেড়ে ঢাকায় চলে আসলাম। একা একা বাসা থেকে বেরোতেও ভয় করত। সারাদিন একা একা ঘরে বসে থাকতাম, তোর বাবা অনেক রাত করে বাসায় ফিরত, ঠিক মত কথা বলত না, খাবার ভাল না থাকলে রাগারাগি করত। 

এগুলো ত আমি জানিই... 

তারপরেও শোন। আমি মন খারাপ করে থাকতাম, কিন্তু কখনো এর বাইরে কিছু চিন্তা করিনি। তারপর তুই যখন পেটে আসলি, আমার শরীর ভাল না, একটা মানুষ নাই দেখার... তোর বাবার থেকে সহযোগিতা ত দূরে থাক, একটু ভাল ব্যবহারও পেতাম না। তারপর একটা হাতখরচ দিত না, ঈদে নতুন কাপড় পর্যন্ত না। 

মা, এসব আমাকে বলছ কেন? 

বলছি, কারণ, তুই এখন আমার সাথে তোর বাবা গলা উঁচু করে কথা বললে রাগ হয়ে যাস। আমি ত এর চেয়ে অনেক অনেক কঠিন সময় পার করে এসেছি। তখন বয়স কম ছিল, বাবা মা বেঁচে ছিল, চাইলে সংসার ছেড়ে চলে যেতে পারতাম। এখানে থাকব, এটা ত আমারই সিদ্ধান্ত। 

ত? 

পুরোটা শোন। তোর মুখ চেয়ে আমি যখন ঠিক করলাম, আমি থাকব, তখন সিদ্ধান্ত নিলাম, থাকলে সম্মানের সাথেই থাকব, মাথা উঁচু করে থাকব। ঘরে শান্তি, স্বস্তি রাখার জন্য যা যা করতে হয় করব। অনার্সে ভর্তি হলাম, তোকে, অর্ঘ্যকে নিয়ে অনার্স, মাস্টার্স করলাম। চাকরি তে ঢুকলাম। সব কি এত সহজে হয়েছে? তোর বাবা পড়ার বই দেখলে রাগ হয়ে যেত। চাকরি করা নিয়ে কত যুদ্ধ - এক বেলার খাবারে উনিশ বিশ হলে বাটি ছুঁড়ে ফেলে দিত। 

এত কিছু করে চাকরি করতে গেলা কেন? 

তোদের মুখের দিকে তাকিয়ে। আত্মসম্মান বল, শান্তি বল... কোনকিছুই ত তোর বাবার থেকে আমি পাইনি। এভাবে যদি আমাদের সংসার চলতে থাকত, তোরা অসুস্থ হয়ে যেতি। চাকরিটা আমাকে মনের জোর দিয়েছে। আমার যোগ্যতা কতটুকু, সেটা বোঝার সুযোগ দিয়েছে। 

ত এখন তুমি প্রতিবাদ করনা কেন? 

প্রতিবাদ করব কেন? আমি পুরো ব্যাপারটার জন্য তোর বাবার কাছে কৃতজ্ঞ! 

মানে???!!!! 

তুই চিন্তা কর, আমি কী ছিলাম! তোর বাবার এই অমানুষিক রাগই ত আমাকে পথ দেখিয়েছে। আমার দেয়ালে পিঠ ঠেকে গিয়েছিল, হয় আমি সংসার ছেড়ে চলে আসতে হবে, অথবা নিজের পায়ে দাঁড়াতে হবে। তোর বাবা অমন না করলে আমি ত পড়াশুনাটাও আর করতাম না। তোদের কে তখন কী শিক্ষা দিয়ে বড় করতাম? মোরালিটি বল, দায়িত্বজ্ঞান বল, সবই ত আমি যেটুকু পেরেছি শিখিয়েছি। এটুকু না হলে তোরা এমন আলোকিত মানুষ হতে পারতি? 

তারপরেও মা... 

তুই এখন বুঝবি না। প্রত্যেকটা কঠিন সময়ের পেছনেই কোন ভাল উদ্দেশ্য থাকে। আমরা ভাল টা ধরতে পারিনা দেখে কষ্ট পাই। আর তোর বাবারই বা দোষ কী? উনিও ত যে পরিবেশ থেকে বড় হয়েছে, ওসব শিখে আসতে পারে নি। এখন নিজে বুঝে বুঝে যতটুকু পেরেছে হয়েছে। এখন উনি গর্ব করেন যে ছেলেমেয়েগুলো ভাল মানুষ হয়েছে। উনি নিজের দোষটা দেখতে পান না, কিন্তু মানুষ হিসেবে ত উনি ভাল!

জানি না... 

জানবি। একটা সময় পরে। তখন ঠিকই এপ্রিশিয়েট করবি।

No comments:

Post a Comment