Thursday, July 5, 2012

সূরা নাবা ও আমার উপলব্ধি


এক অনলাইন স্টাডি গ্রুপে কিছু ছোট ভাইবোনের সাথে মিলে কুরআনের শেষ পারার সূরাগুলো পড়ছি উদ্দেশ্য, বিভিন্ন তাফসির পড়ে একেক জনের উপলব্ধি আলোচনা করা আমার কাছে এই উদ্যোগটা খুবই ভাল লেগেছে, কারণ ভাল কাজে তাগিদ দিলে যে দিচ্ছে তারও সওয়াব হয়, আর যে তাড়া খেয়ে পড়তে বসছে তার কথাই নেই এক সপ্তাহ সময়, প্রথম তিন দিনে যে 'টা তাফসির পাওয়া যায় পড়ে নিজের চিন্তাভাবনাগুলি লিখতে হবে, কারো কোন প্রশ্ন থাকলে ইমেইলে জানিয়ে দেবে সপ্তাহের বাকি দিনগুলি চলবে এই প্রশ্নের উত্তর খোঁজা, চিন্তাভাবনা, আর সপ্তাহান্তে একত্রিত হয়ে নিয়ে আলোচনা এই প্রয়াসের প্রথম পদক্ষেপ ছিল সূরা নাবা, যা কিনা শেষ পারার প্রথম সূরা আমি সবসময়ই তাফসির পড়তে গেলে গোগ্রাসে যা পাই সব পড়ি ইউটিউবে লেকচার পেলে সেগুলোও শুনি পড়তে পড়তে, শুনতে শুনতে একাগ্রচিত্তে অপেক্ষা করি কখন পুরোটুকু একটা ছবি হয়ে ধরা দেবে কুরআনের অল্প যে 'টা সূরা যত্ন করে পড়েছি, প্রত্যেকটাই তাফসিরের বাইরেও আমাকে অন্য কোন উপলব্ধি এনে দিয়েছে যতক্ষণ সেটা না আসে, আমার মনে হয়, আমি ঠিকমত পড়িনি, আরো পড়তে হবে তাছাড়া, কোন একটা সূরা নিয়ে পড়াশুনা করাটা আমার কাছে মনে হয় একটা ভ্রমণের মত শূণ্য থেকে শুরু করে পথের দু'ধারে যা পাই হাত বাড়িয়ে নিতে নিতে শেষ পর্যন্ত যখন গন্তব্যে পৌঁছাই, তখন মনে হয়, যতদূর এসেছি, আরো ততদূর হেঁটে গেলেও একটুকু ক্লান্তি আসবে না প্রতিবারই নতুন অনেক কিছু শিখব কিছু কাজে লাগাতে পারব, কিছু আজীবন চেষ্টা করে যাব কাজে লাগানোর

সূরা নাবা প্রথম দৃষ্টিতে আরো অনেকগুলো সূরার মতই পরকালের বর্ণনা, আল্লাহর মাহাত্ম্য, ভয় আশার সংকলন খুব তাড়াতাড়ি করে পড়ে গেলে মনে হবে, ' আর নতুন কী? জানিই !' কিন্তু কুরআনের বিশেষত্বই এই, একে নিয়ে যতই সময় কাটানো হয়, ততই এর নতুন নতুন রূপ ধরা পড়ে। একটু ধৈর্য নিয়ে সূরাটা আবারো পড়লে দেখা যাবে এখানে মানুষের দিন রাত্রি যাপনের সুন্দর একটা ছবি ফুটে উঠেছে পড়লে দৃশ্যগুলো যেন চোখের সামনে ভাসতে থাকে আল্লাহ কুরআনের অনেকগুলো সূরাতেই গল্পের মত প্রেক্ষাপট তৈরি করে ভাষার মাধুর্যে এমন মোহনীয় আবেশ তৈরি করেছেন যে পাঠক/শ্রোতারা নিজের অজান্তেই পুরো বিষয়টা কল্পনা করতে শুরু করে এটা হচ্ছে মনোযোগ আকর্ষণের খুব ভাল একটা পদ্ধতি একবার শুনতে শুরু করলে বিমোহিত না হয়ে উপায় নেই তাই রাসুলুল্লাহ () যখন কাফিরদের উদ্দেশ্যে সূরাগুলো পাঠ করতেন, তারা কানে আঙুল দিয়ে রাখত, শুনতে চাইত না আমি পড়তে পড়তে মনের মধ্যে নোট করে নিয়েছি, পরবর্তীতে আমার লেখায়ও আমি মনোযোগ টানার এই পদ্ধতিটি ব্যবহার করব

কুরআনের বর্ণনাগুলি শুধু মনে ছবিই আঁকে না, মনে ভীষণভাবে নাড়াও দেয় কারণ এখানে বৈপরীত্যগুলি এত কঠোরভাবে আসে, মনটা দু'রকমের চিন্তার মাঝে পড়ে ভীষণরকমের দুলতে থাকে এই যেমন, এই মাত্র আল্লাহ বললেন, ভূমিকে মায়ের কোলের মত নিশ্চিন্ত করে দিয়েছি, পর্বতকে পেরেক বানিয়ে গেঁথে দিয়েছি, যাতে একটুও ভয় না করে তোমাদের অথচ শেষ বিচারের বর্ণনায় তিনি বললেন কী - পর্বত নাকি ধুলার মত হয়ে যাবে, মনেই হবে না এখানে কিছু ছিল, আকাশ ফেটে অনেকগুলো দরজার মত হয়ে যাবে ওরে বাবা! পড়তে পড়তে আমার মনে হচ্ছিল, যেন আমাদেরই জ্ঞানের বড়াই, যা দিয়ে পর্বতের মত অটল হয়ে বসে থাকি - 'চাক্ষুষ না দেখলে বিশ্বাস করব না' - সেদিন সব গরিমা ধূলিস্যাৎ হয়ে যাবে যে জ্ঞানকে আমরা মনে করি আকাশ ছুঁয়েছে, এর উপরে কেউ যেতে পারবে না - সেদিন আকাশই দেখিয়ে দেবে, আমাদের জ্ঞানের অগম্যও আরো অনেক অজানা রয়েছে সূরা নাবায় শেষ বিচারের দিনের বর্ণনা যেন আমাদের অহংকার আর ক্ষুদ্রতাকেই চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়

কিয়ামতের বর্ণনার পরে ততোধিক ভয়ঙ্কর জাহান্নামের বর্ণনা শুরু হয়েছে ঠিক জায়গাটার বর্ণনা না, সে জায়গায় অবিশ্বাসীরা কী ধরণের ব্যবহার পাবে সে বর্ণনা আমি এগুলো পড়লে এত ভয় পাই, অংশগুলোর তাফসিরও ভাল করে পড়তে পারিনা নোংরা মেশানো ফুটন্ত পানি কীভাবে খাওয়া সম্ভব - ভাবতেই গা গুলিয়ে বমি আসে তাই তাড়াতাড়ি চলে যাই জান্নাতের বর্ণনায় সুন্দর বাগান, পানীয়.. আহা! এমন করে বর্ণনা দেয়া - ভয় আর আশায় দোদুল্যমান চিত্তে ছাপ না পড়ে উপায় কী? সবচেয়ে সুন্দর লেগেছে কথাটা - 'বেহেশতে কেউ অর্থহীন বাজে কথা শুনবে না, মিথ্যাচার শুনবে না'

অর্থহীন বাজে কথা শুনবে না? তাই ! আমি কখনও এভাবে ভাবি নি যে, অর্থহীন বাজে কথা শুনলে মনের ভেতর যে একটা চাপ চাপ ভাব লাগতে থাকে, সেটা আমাদের আত্মারই সহজাত বৈশিষ্ট্য যে মানুষটা হাসতে হাসতে অন্যের নামে বাজে কথা বলে বসে, সে শত ভাল কাজ করলেও তার জন্য আর শ্রদ্ধাটা ফিরে আসে না কেন আসেনা, তাই নিয়ে খুব অপরাধবোধে ভুগতাম এখন আর ভুগিনা, কারণ আল্লাহ নিন্দা পরচর্চাকারীকে জাহান্নামের সবচেয়ে ভয়াবহ জায়গায় রাখবেন বলে প্রতিজ্ঞা করে আস্ত একটা সূরাই নাযিল করেছেন তখন আরো ভাবলাম, যদি বেহেশতে যেতে চাই, তাহলে ধরনের কথা বলার অভ্যাস পুরোপুরি বাদ দিতে হবে কিন্তু এতই কি সহজ? বন্ধুদের সাথে আড্ডায় ত চলে কেবল রসিকতার ছলে বদনাম আর বিরামহীন বাগাড়ম্বর এর থেকে বেরিয়ে এসে সত্যিকারের ভাল কথা বলার চর্চা করতে চাইলে হঠাৎ করেই কাছের বন্ধুরা দূরে চলে যায়, আত্মীয়স্বজন পাকনামো দেখে বিরক্ত হয়, সবকিছুর মাঝে নিজেকে খুব আঁতেল আর রাশভারী মনে হতে থাকে কিন্তু অন্যভাবে চিন্তা করতে গেলে, বাজে কথা, মিথ্যা কথা - এসব না থাকলে সে পরিবেশটা কিন্তু জান্নাতেরই একটা প্রতিচ্ছবি হয়ে দাঁড়াবে, আর সে জন্য কি একটু পরিশ্রম করা যায়না?

এমনি করে আয়াতের পর আয়াত, একের পর এক প্রসঙ্গের পরিবর্তন পড়তে পড়তে সূরার শেষ পর্যন্ত এলাম মনে হল, এখনও যেন গন্তব্যস্থলে পৌঁছাই নি আরো কী যেন জানার ছিল! তাই পড়লাম সূরা নাযিলের প্রেক্ষাপট জানলাম, অবিশ্বাসীরা শেষ বিচারের দিন নিয়ে হাসাহাসি করায় আল্লাহ এই উত্তর পাঠিয়েছেন তখন সূরাটা আবারো পড়লাম কই! ঠিক উত্তরের মত লাগেনা? তার উপর এক প্রসঙ্গ থেকে আরেক প্রসঙ্গে এত তাড়াতাড়ি মোড় নিয়েছে, মূল ভাবটায় মনোযোগ রাখাই কঠিন তখন কুরআন বন্ধ করে চোখ বন্ধ করে একটা ঘটনা চিন্তা করতে শুরু করলাম আমি একটা স্কুলের প্রধান শিক্ষিকা, আমার ছাত্রছাত্রীরা ভীষণ বেয়াদবি করছে তাদের ধারণা, এসব করে তারা দিব্যি পার পেয়ে যাবে, আমি কিছুই করতে পারবনা আমার নাকি এত ক্ষমতাই নেই আমি এসব শুনে প্রচন্ড রেগে গেছি, ক্লাশ মনিটর কে ডেকে ধমক দিয়ে বলছি, 'ওরা এসব কী শুরু করেছে? ওরা জানে, ওরা কার নামে কথা বলছে? যে ক্লাশরুমটাতে বসে এসব বলছে, সে রুমটাও আমার তৈরি! ওদের এখনই সাবধান করে দাও, নাহয় এমন শাস্তি দেব.. যে আর কোনদিন সোজা হয়ে দাঁড়াতে পারবে না' তারপর এই কথাগুলি যেন ভালমত মাথায় ঢোকে, সেজন্য পরিণতিরও একটা ছোটখাট ফিরিস্তি দিলাম, যাতে ক্লাশ মনিটর গিয়ে ওদেরকে শোনায় আমি এতই রেগে আছি যে ওদের কে ডেকে সরাসরি কথা বলারও রূচি হচ্ছেনা পুরো ঘটনাটা এভাবে যখন দেখলাম, তখন আল্লাহ কেন তিন চার আয়াতের পরেই প্রসঙ্গ পাল্টে অন্য প্রসঙ্গে চলে যাচ্ছেন, সেটা বুঝতে বেশ সুবিধা হল কিন্তু সূরা নাবায় আরো একটা অংশ আছে, তা হচ্ছে, মুত্তাক্বীন বা আল্লাহভীরুদের পুরস্কার আমি নিজেকে হেডমিস্ট্রেসের জায়গায় বসিয়ে যখন ছাত্রদের ধমক দিচ্ছিলাম (মনে মনে), তখন আমার অবস্থান বোঝাতে চাইলে আমি কেবল উপরের কথাগুলোই বলতাম পুরস্কারের কথা বলতাম না, কারণ তাতে সুরটা নরম হয়ে আসে, ছাত্ররা আমার কথায় ভয় নাও পেতে পারে আমি যখন খুব রেগে আছি, তখন কথার সুর বদলে, নরম হয়ে ভাল ভাল কথা বলাটা আমার আসে না, এটাই স্বাভাবিক

তখন বুঝলাম, আল্লাহ যতই রাগ হোন, উনার একটা অংশ ক্ষমা দয়া দেখিয়েই যাবে আমরা সংকীর্ণমনা হতে পারি, আমাদের উদারতা আমাদের রাগের কাছে পরাজিত হতে পারে, কিন্তু আল্লাহ তাঁর নিজস্ব বৈশিষ্ট্যে অতুলনীয়, এবং আশ্চর্য রকমের ভারসাম্যপূর্ণ এই সূরায় আল্লাহ যাদের উদ্দেশ্য করে কথা বলছেন, তাদের অপরাধ কিন্তু কম না তবুও, তিনি শাস্তির বর্ণনা করেই শেষ করেননি, আশার বাণীও শুনিয়েছেন জান্নাতের অপূর্ব সুন্দর বর্ণনা দিয়েছেন, তার চেয়েও বড় কথা, তিনি নিজেকে তাদের প্রতিপালক হিসেবে পরিচয় দিয়েছেন চল্লিশ আয়াতের এই বিরাট সূরাটায় শেষের চার আয়াতে পাঁচবার 'রব' (প্রতিপালক) আর 'আর-রহমান' (সবচেয়ে বেশি দয়ালু) উল্লেখের মাধ্যমে আল্লাহ যেন মনে করিয়ে দিচ্ছেন, "আমার কঠোরতা দেখে দূরে সরে যেওনা, আমি তোমাদের শাসন করলেও, প্রতিপালন আর দয়া থেকে কখনও সরে যাবনা"

আমি প্রধান শিক্ষিকা হয়ত হব না, কিন্তু মা হব! আমার সন্তানদের উপর অসম্ভব রকমের রাগও হবে কখনও কখনও তখন শাস্তি দিলেও, করুণা বা মায়ার এই অংশটুকু দেখাতে যেন না ভুলি তা না হলে আমার মনের কঠোরতা ওদের দূরে ঠেলে দেবে

মনের এতদূর উপলব্ধি পর্যন্ত এসে আমি চোখ খুললাম আপন মনেই হাসলাম আমার যাত্রা ফুরিয়েছে, সূরা নাবা আমাকে মায়ের শাসন ভালবাসার প্রকৃত ভারসাম্য শিখিয়েছে, আর মায়ের চেয়েও লক্ষ কোটি গুণ ভালবাসা যাঁর মাঝে, তাঁর প্রতি কৃতজ্ঞতায় মনটা ভরিয়ে দিয়েছে সূরা নাবা এখন শুধুই আমার কাছে আরো একটি সূরা না, আল্লাহর ভালবাসার অগুণতি নিদর্শনভান্ডারে আরো একটি সংযোজন


বাংলানিউজ২৪ এ প্রকাশিত:

Monday, June 11, 2012

কর্তব্য - শরীরের প্রতি

কিছুদিন আগে মোখতার মাগরুবির এক লেকচারে শুনছিলাম, আখলাক্ব শব্দের উৎপত্তি 'খ ল ক্ব' থেকে দু'টো শব্দ আসে, খালক্ব এবং খুলক্ব। এর একটির মানে শরীর, অপরটির অর্থ আত্মা। আখলাক্ব বা সর্বোত্তম চরিত্র নিশ্চিত করতে খালক্ব ও খুলক্ব - দুটোরই নিয়মিত পরিচর্যা প্রয়োজন। তিনি আরো একটা কথা বলেছিলেন, আমরা নিয়মিত শরীর পরিচ্ছন্ন রাখতে গোসল করি, আমাদের মধ্যে কতজন নিয়মিত 'স্পিরিচুয়াল শাওয়ার' নেন? অনেক দিনের ময়লা জমে জমে তাদের আত্মা যে দুর্গন্ধযুক্ত হয়ে যায়, সেটা আশপাশের সবাই টের পায় - কেবল তারাই টের পান না। 

যা হোক, আত্মা, স্পিরিট - এসব নিয়ে আমার আগ্রহের কমতি নেই, তাই স্পিরিচুয়াল শাওয়ার জাতীয় ব্যাপার স্যাপার আমি ঘেঁটে দেখেছি মোটামুটি (Click this link...,Click this link..., Click this link...); কিন্তু বারবারই যে অংশটা আমার মনোযোগের বাইরে ছিল - তা হল শরীর, শরীরের যত্ন - সুন্দর চরিত্র গঠনের জন্য শরীরের যত্নের প্রয়োজনিয়তা। আমার মা সারাজীবনই অভিযোগ করে এসেছেন আমার মত শরীরের হেলাফেলা করা মানুষ নাকি তিনি আর একটি দেখেন নি। সকালে না খেয়ে বের হয়ে যাওয়া, কাঠফাটা রোদ মাথায় নিয়ে শুধুশুধু ঘুরে বেড়ান, ফচফচে নাক নিয়ে ঝুপ করে বৃষ্টিতে ভেজা, সারারাত বাতি নিভিয়ে কম্পিউটারের মনিটরে তাকিয়ে থাকা - আর কত বলব? কেন জানিনা, নিজের যত্ন নেয়াটা আমার কাছে আদিখ্যেতা মনে হত। শরীরকে আদু আদু করাটা মনে হত বিলাসিতা। 

মোখতার মাগরুবির এই টক শুনে নতুন করে শরীরটার কথা একটু মনে করলাম। মনে পড়ল, শেষ বিচারের দিনে আমার অঙ্গ প্রত্যঙ্গ আমার বিরূদ্ধে নালিশ জানাবে, যে আমি তাদের প্রতি অন্যায় করেছি, তাদের দিয়ে আল্লাহর অপ্রিয় কাজ করিয়েছি। আমারই হাতের আঙুল কিনা বলবে আমি কী বোর্ডে অলস হাত বুলিয়েছি, যখন এতিম কারো মুখে ভাত তুলে দেয়ার কথা ছিল? 

আমি জানিনা, নালিশ বলতে আমি দু'টো পক্ষ বুঝি, বাদী আর বিবাদী। এক পক্ষ অন্যায় করে, অপর পক্ষ সে অন্যায়ের বিরূদ্ধে নালিশ করে। আমার চোখ যখন বাদী হয়ে যাবে - তখন ত সে আর আমার না, সে ত 'আমার' চোখ না। সে একটা নিজস্ব এনটিটি, যার কিনা নিজের মত করে ন্যায় অন্যায় বোঝার ক্ষমতা আছে। এই চিন্তাটা হঠাৎ করেই আমাকে ভয় পাইয়ে দিয়েছে। এভাবে এক এক করে আমি যদি চোখ, নাক, কান, মুখ, হাত, পা সবাইকে বাদ দিতে থাকি, তাহলে আমি আর 'আমি' রইলাম কই? 

বুঝতে অসুবিধা হচ্ছে? চোখটা বন্ধ করুন, করে নিজের শরীরের দিকে তাকান (মনে মনে); তারপর পা দুটো বাদ দিয়ে বাকি অংশটাকে নিজের মনে করুন, তারপর কোমরের নিচ থেকে সবটুকু বাদ দিয়ে বাকিটাকে নিজের মনে করুন... এভাবে সব বাদ দিতে দিতে শেষ পর্যন্ত এসে দাঁড়াবে আমার মস্তিষ্কটুকু কেবল আমার, বাকি সব আল্লাহর থেকে বর্গা দেয়া কিছু কর্মচারি। ওহো! না না! মস্তিষ্কও ত বলে বসতে পারে, সে আমাকে মানুষের নামে খারাপ চিন্তা করতে বাধ্য করত... তাহলে আসলে কেবল মাত্র রয়ে যায় আমার স্বাধীন ইচ্ছা - যা কিনা আর সব... সব কিছুকে নিয়ন্ত্রণ করছে। আমার স্বাধীন ইচ্ছার বিরূদ্ধে সাক্ষ্য দেবে আমার প্রত্যেকটা ইন্দ্রিয়, প্রত্যেকটা অঙ্গ - আমার আত্মা, আমার নফস ... শেষ পর্যন্ত ভয় পেয়ে আবিষ্কার করলাম, যত বেশি দয়া, তত বেশি আমানত। আমি আমার পায়ের প্রতি ইহসান দেখাচ্ছি ত? কিডনীর প্রতি? মাথার চুলগুলোর প্রতি? আল্লাহ কি জানতে চাইবেন না, তোমাকে তাহলে দু' দুটো ভাল কিডনী দেয়ার দরকার কী ছিল, যদি একুশ বছর বয়সেই সেগুলো ড্যামেজ করে বসে থাক? 

এই প্রচন্ড ভয়ের অনুভূতিটা থেকে আমি ঠিক করলাম আল্লাহর এই আমানতগুলির যত্নআত্তি শুরু করব। কোন ফ্যাক্টরি যুগের পর যুগ এমনি এমনি চলে আসার পর হঠাৎ করে মেইনটেন্যান্সের প্রয়োজন পড়লে একটা প্রাথমিক সার্ভে করে নিতে হয়। তাই আমি ঠিক করলাম, ওদের সাথে কথা বলব। সত্যি সত্যি, একদিন ঘুমোতে যাওয়ার আগে চোখকে জিজ্ঞাসা করলাম, ও চোখ! তুমি কেমন আছ? চোখ ধমকের সুরে উত্তর দিল, ভাল থাকব কীভাবে? তুমি জীবনে আমাদের কোন যত্ন নাও? আমি মাথা চুলকে বললাম, কী মুশকিল! কেন কেন? চোখ ঠিক মধ্যবয়সী ঘেঁয়ো কুকুরের মত একঘেঁয়ে সুরে বলল, দুই বছর হয়ে যাচ্ছে একটা ভুল পাওয়ারের চশমা পরে কাটিয়ে দিচ্ছ, আমার লেন্স এডজাস্ট করতে কত কষ্ট হয় তা জান? তারপর কথা নাই বার্তা ল্যাব এ কাজ করার মধ্যে হাত না ধুয়ে চোখ রগড়ানো শুরু করলে, তোমার হাতে সেদিন কী রিএজেন্ট লেগে ছিল জান? 

আমি ভয় পেয়ে স্যরি টরি বলে প্রতিজ্ঞা করলাম, এক সপ্তাহের মধ্যে চোখ দেখিয়ে নতুন চশমা নেব। 

গেলাম দাঁতের কাছে। ভীষণ অভিমান করে দাঁত জানাল আমি নাকি ভুলেই যাই তাদের কোন রকমের চাহিদা থাকতে পারে। এমনি করে নাক, কান, ফুসফুস, হৃদপিন্ড, মস্তিষ্ক - সবার অভাব অভিযোগ শুনতে শুনতে আর নিজেকে গাল দিতে দিতে পৌঁছলাম পাকস্থলির কাছে। দিব্যদৃষ্টিতে দেখতে পাচ্ছিলুম, সে কী বিরাট অভিযোগের ডালি খুলে বসবে। তাই আর সেদিন সাহস করে পাকস্থলির সাথে কথা বলতে পারিনি। 

এমনি করে বাকহীন, বুদ্ধিহীন যন্ত্রগুলোকে একটা বড় ফ্যাক্টরির কর্মচারি ভেবে কথা বলতে বলতে আমি যেন সত্যি চোখের সামনে এদের অর্গানাইজেশনটা দেখতে পাচ্ছিলাম। এরা প্রত্যেকে নিজেদের কাজ সম্পর্কে খুব ভাল ধারণা রাখে, এবং নিজেদের কাজ নিখুঁতভাবে করতে ওয়াদাবদ্ধ। একজনের কাজ ঠিকমত না হলে অন্যজনও একটু সমস্যায় পড়ে যায়, কিন্তু তাই বলে অন্যের কাজের উপর সর্দারি করেনা মোটেও। প্রত্যেকেই জানে, তারা সবাই মিলে একটা মহান লক্ষ্যের অংশীদার, তা হচ্ছে, 'আমি' নামক এই মাথামোটা মানুষটিকে কর্মক্ষম রাখা। তাই এদের একজন ছোটখাট বিগড়ে গেলেও অন্যান্য সব অঙ্গ তাদের দায়িত্ব আরেকটু বাড়িয়ে দিয়ে মহান লক্ষ্যটাকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে। 

ফ্যাক্টরির রুট লেভেলের প্রত্যেকটা কর্মচারিই তাদের দাবিদাওয়া গুলো বিভিন্ন ভাবে পেশ করে। কিন্তু মাথামোটা কর্মকর্তা অনেক সময় ওসব পাত্তা না দিয়েই তার পছন্দমত যা ইচ্ছে করে যায়। যেমন দশ বারো ঘন্টা শরীরে গ্লুকোজ না দিয়ে হঠাৎ করে একগাদা চকলেট খেয়ে ইনসুলিন কোম্পানিকে ঝামেলায় ফেলে দেয়। প্রচন্ড রোদ্দুরে মস্তিষ্কের তাপমাত্রা ঠিক রাখার জন্য যেটুকু পানি খাওয়া দরকার - সেটুকু না দিয়েই আশা করে মস্তিষ্ক বাবাজি ঠিকঠাক মত কাজ করবে। এ যেন স্বেচ্ছাচারি শাসকের যাচ্ছেতাই ফরমায়েশ! আমার অন্যায় অত্যাচার তাদের চোখে দেখতে গিয়ে আমারই উপর আমার রাগ ধরে যাচ্ছিল। 

শুধু তাই নয়, এই অসম্ভব সিনসিয়ার, নিখুঁত, এত বড় একটা কর্মযজ্ঞ - কোন রকম বিশ্রাম না নিয়ে কাজ করে যাচ্ছে, করেই যাচ্ছে - কী জন্য? কেবলমাত্র 'আমি', অর্থাৎ হাত পা চোখ কান সব বাদ দিয়ে যে একরত্তি আমি থাকি - সেই 'আমি'র সব রকমের চাওয়া পূরণ করার জন্য। মনে হতেই মনে হয়, বাব্বাহ! আমি এত স্পেশাল? ঝানতাম নাহ! কিন্তু আত্মপ্রসাদের আনন্দটুকু থিতু হতে না হতেই নক নক করে মনের দরজায় টোকা মারে আরো একটি প্রশ্ন, কেন? 

সত্যিই, কেন? আমার স্বাধীন ইচ্ছা, যে ইচ্ছা আমাকে আট ঘন্টা ঘুমাতে বাধা দেয়না, ঘন্টার পর ঘন্টা ওয়েবসাইটগুলোতে শপিং ডিল খুঁজে বেড়ানোর সময় বাধা দেয়না, ভাত খাওয়ার সময় একটা টিভি সিরিয়াল দেখতে হবেই, আমারো ত বিশ্রাম প্রয়োজন - এমন অজুহাতে কাজের অকাজের সব রকমের চাওয়া চাপিয়ে দেয় আমার আজ্ঞাবহ শরীরটার উপর - শেষ বিচারের দিনে তা ঠিকঠাক মত আমার চাওয়া পূরণ করবে ত? ভাবতে ভয় হয়। 

মোকতার মাগরুবির সেই টক, আর উপরে লেখা হাদীসটা আমাকে খুব ভাল করে মনে করিয়ে দিয়েছে, এই পৃথিবীতে আমার সময় কেবলই কিছু কর্তব্যের সমষ্টি। আমি আমার কর্তব্যগুলো কত ভালভাবে পালন করতে পারি তা দিয়েই নির্ধারিত হবে আমার সাফল্য। এতদিন পর্যন্ত কর্তব্য বলতে ভাবতাম স্ত্রী হিসেবে কর্তব্য, কন্যা হিসেবে কর্তব্য. মুসলিম হিসেবে কর্তব্য। সেদিনের পর থেকে যোগ হয়েছে, রূহধারী দেহটার প্রতি কর্তব্যও। 


উৎসর্গ: মেয়েদের শরীরচর্চার প্রয়োজন আছে কি নেই, বা থাকলেও এর ব্যপ্তি কতটুকু - তা নিয়ে চিন্তা করেন এমন সকল ব্লগার ভাই ও বোনেরা।

Wednesday, May 30, 2012

প্রকৃতি থেকে শেখা

আমার সবসময়েই পাহাড়ের প্রতি অদ্ভুত টান। অনার্স সেকেন্ড ইয়ারে যখন আমাদের প্রিয় ম্যাডাম স্যারদের সঙ্গে সিলেট বেড়াতে গেছি, মাধবকুন্ড ঝর্ণার সামনে আমার একটা ছবি আছে, সবাই ঝর্ণার সামনে হাসিমুখে বসে আছে, আমি উল্টোদিকে ফিরে হা করে পাহাড় দেখছি। অনার্স শেষ বর্ষে স্টাডি ট্যুরে ইন্ডিয়া না নেপাল যাব - এই তর্কে আমার আর ব্লগার মনপবনের প্রবল আপত্তিতে ইন্ডিয়ার প্রস্তাব ধোপেই টেকেনি। দশদিন ধরে পাহাড় দেখতে পারব - এই আনন্দেই আমি অধীর হয়ে ছিলাম। 

পাহাড় নিয়ে আমার অতি আগ্রহের কথা আমার স্বামী খুব ভালভাবেই জানে। জানে, কেবলমাত্র হাইকিং এর সুযোগ থাকলেই আমাকে বেড়াতে নিয়ে খুশি করা যাবে। তাই সেমিস্টারটা শেষ হতেই চলে এসেছি আমেরিকার পশ্চিম উপকূলে, উদ্দেশ্য পর্বত দর্শন ও আরোহণ, তার পাশাপাশি আরো যা কিছু বোনাস হিসেবে পাওয়া যায়.. 

এখনও ট্রিপ শেষ হয়নি। গত সাত দিনের প্রতিটি দিন পাহাড়ে চড়েছি। অ্যাজমার জন্য শরীরে কুলোয়নি, তবু থেমে থেমে যে করেই হোক, পাড়ি দিয়েছি - যতটুকু পথ নিয়ে যায়। এর মধ্যে পাহাড় চুড়া থেকে কত... যে রূপ দেখলাম.. আল্লাহর সৃষ্টির মধ্যে হারিয়ে গিয়ে চিনলাম সর্বশ্রেষ্ঠ স্থপতি, সর্বশ্রেষ্ঠ শিল্পী, সর্বশ্রেষ্ঠ সংগঠক কে। 

59:24 He is God, the Creator, the Maker who shapes all forms and appearances! His [alone] are the attributes of perfection. All that is in the heavens and on earth extols His limitless glory: for He alone is almighty, truly wise! 


আমাদের পাঁচজনের এই গ্রুপের অনন্য দিক হল, কমবেশি মাত্রায় প্রত্যেকেই আল্লাহভক্ত, এবং উঁচুমাত্রার দর্শন আলোচনায় কারো কোন ক্লান্তি নেই। তাই পাহাড়ের উপর দাঁড়িয়ে জামাতে নামাজ বা লং ড্রাইভে স্কলারদের লেকচার শোনাই কেবল নয়, কার দৃষ্টিতে এইসব সৌন্দর্য কী উপলব্ধি এনে দিয়েছে, তা শোনারও সুযোগ হয়েছে অনেক। এর অল্প কিছু এখানে বলি - 


ইয়োসিমিটি ন্যাশনাল পার্ক (ক্যালিফোর্নিয়া) তে অর্ধবৃত্তাকার এক পাহাড় আছে, একে হাফ ডোম বলে। এ পাহাড়ের উত্তল অংশটাতে দশফুট পরপর স্টিক গুঁজে চেইন দিয়ে ট্রেইল করা হয়েছে। অবিশ্বাস্য রকমের কঠিন হাইক। কঠিন বলেই হয়ত, মানুষের আকর্ষণও বেশি। তাছাড়া আশপাশের সবকিছু মিলিয়ে এই পাহাড়ের নান্দনিক সৌন্দর্য বলে বোঝানো যাবে না। হাফ ডোম একটা সেলিব্রিটি পর্যায়ের পাহাড়, তাকে নিয়ে বিভিন্ন গল্পও চালু আছে শুনেছি। ত যাই হোক, আমাদের মধ্যে একজন বলল, এই পাহাড়টার যদি এমন করে প্রচার প্রসার করা না হত, একে কি এতটাই সুন্দর লাগত? আমরা বললাম, লাগত, কারণ পাহাড়টা ইউনিক। ও তখন একটা গল্প শোনাল, নিউইয়র্কের সাবওয়ে স্টেশনে এক নামকরা মিউজিশিয়ান এককোণে দাঁড়িয়ে পারফর্ম করছিল, কেউ ফিরেও তাকায়নি। আমরা আসলে উপযুক্ত জায়গায় উপযুক্ত ব্যাকআপ ছাড়া সৌন্দর্যটাও ঠিক মত এপ্রিসিয়েট করতে পারিনা। তখন আমার ব্লগার মনপবনের এভারেস্ট বিজয় নোটটার কথা মনে পড়ে গেল - কে-২ পর্বতচুড়ায় আরোহন অনেক বেশি কঠিন হলেও তা নিয়ে মানুষ এত হইচই করেনা, যতটা করে এভারেস্ট নিয়ে। 


সে হাফ ডোম দূর থেকে দেখবার জন্য একটা 'গ্লেসিয়ার পয়েন্ট' নামে একটা জায়গা আছে, সেখানে ভীষণ মানুষের ভিড়। আমরা 'দুত্তোরি ছাই' বলে চলে গেলাম একটু দূরে, অল্প কিছু পাথরের আড়ালে। হইচই, ভিড়বাট্টা সব দূরে চলে গেল। চোখের সামনে শুধু কালো গ্রানাইট পাথরের রূক্ষ উঁচু উঁচু পাহাড়ের মাঝখান দিয়ে একে বেঁকে যাওয়া শীর্ণ গিরিপথ, অনেকের মধ্যে থেকেও সগৌরবে অনন্য হাফ ডোমের আত্মগরিমা, আর একটু দূরে প্রচন্ড গর্জনে ধেয়ে আসা সফেন নাম না জানা এক ঝর্ণা। কোন মানুষের শব্দ নেই, শুধু ঝর্ণার গর্জন, পাখির ডাক, পাথরের ওপর ছড়িয়ে ছিটিয়ে বসে থাকা আমরা কজন। ওপাশে সূর্য আজকার মত বিদায় নেবার প্রস্তুতি নিচ্ছে। পাশে তাকিয়ে দেখি আমার প্রিয় এক আপুর চোখে পানি, আপন মনেই বলল, এসবের কাছে নিজেকে কতটা ছোট মনে হয়! এই এতসব সৃষ্টির মাঝে আমরা কত তুচ্ছ! আর তার চেয়েও কত.. কত... তুচ্ছ আমাদের সমস্যাগুলো.... 

আপুর থেকে দৃষ্টি ফিরিয়ে চোখ রাখলাম পাহাড়সীমায়। চিরচেনা কথাগুলো আবারও নিজের জীবনের সাথে মিলিয়ে নতুন মনে হল। 


ইউটাহ থেকে ইয়োসিমিটি পার্ক এ যাওয়ার পথে গিরিসংকুল এক পথ পড়ে, তিয়োগা রোড। বছরের অধিকাংশ সময় সে রাস্তা তুষারের কারণে বন্ধ থাকে। আমরা ইউটাহ থেকে মরুভূমি দেখতে দেখতে আসছি, হঠাৎ কথা নেই বার্তা নেই তুষারপাত শুরু হয়ে গেল। যে মোটেলে উঠব সেখানকার মালিক ফোন করে জানাল তিয়োগা পাস বন্ধ হয়ে গেছে, আমরা যেন প্ল্যান করে আসি। আমাদের ত আর ফেরার উপায় নেই, সে কি রাস্তা! অন্ধকারে একটা গাড়ি নেই, একেবেঁকে পিচ্ছিল রাস্তার উপর দিয়ে বর্ষার ফলার মত গাড়ির শিল্ডে এসে ফুটছে বরফকণা - আমরা সমানে আল্লাহকে ডাকতে ডাকতে এগোচ্ছি। কোনমতে এসে পৌঁছলাম হোটেলে। পরদিন তিয়োগা খুললে ইযোসিমিটি যাত্রা। আমাদের হোটেল তিয়োগার অল্প একটু আগেই। ট্যুর এর হোটেল বুকিং, গাড়ি বুকিং, ফ্লাইট বুকিং সব করেছে আমার স্বামী। তাকে এই ইয়োসিমিটির হোটেল নিয়ে খুব যন্ত্রণা সহ্য করতে হয়েছে, কোথাও কোন হোটেল খালি নেই, তিন দিন ধরে সাধ্যসাধনা করে যে একটা পেল, সেটাও তারা শেষ মুহূর্তে ওকে মানা করে দিল। অবশেষে তিয়োগার আগে এই একটা দু'কামরার চিলেকোঠা। 

মোটেল মালিকের ফোন পেয়ে আমার স্বামী উচ্ছ্বসিত হয়ে বলে উঠল, আল্লাহকে অশেষ অশেষ ধন্যবাদ। যে হোটেলটা না পেয়ে আমি মন খারাপ করেছিলাম ওটা ছিল ইয়োসিমিটি পার্কের ভেতরে। ওটা পেলে আজকে রাতে তিয়োগা পারও হতে পারতামনা, এই বরফের মধ্যে আমাদের গাড়িতে রাত কাটাতে হত। আল্লাহ আমাদের জন্য কী নির্ধারণ করে রেখেছেন তা বুঝতে না পেরে আমরা অকারণেই হতাশ হই। নিকষ কালো পথে হেডলাইটের আলোয় তুষারের ঝিলিক দেখতে দেখতে আবারও মনে পড়ল, আল্লাহ ইজ দা বেস্ট প্ল্যানার। 


লেখাটা লিখতে লিখতে হাসিই পাচ্ছে, কারণ, সে রাতেই আমি আর আমাদের আরেক বন্ধু তর্ক করছিলাম প্রকৃতি কুরআনের বিকল্প হতে পারে কিনা। আমার সে বন্ধু বলছিল, কুরআন যেমন আল্লাহর উপহার, প্রকৃতিও তাই। তুমি যদি চোখকান খোলা রাখ, এবং চিন্তা করতে পার, প্রকৃতির সবকিছুই তোমাকে একই মেসেজ দিবে। আমি বলছিলাম, হতে পারে, কিন্তু কুরআনের প্রয়োজনিয়তা অস্বীকার উপায় নেই। আর প্রকৃতি খুব প্যাঁচালো, কে জানে আমরা কতটুকু ঠিক শিক্ষা পাব। এখন লিখতে গিয়ে দেখি আল্লাহর অন্তত পাঁচ ছয়টা নাম আমার অন্তরে গাঁথা হয়ে গেছে কেবল মাত্র এই ট্যুর থেকে। 

যাই হোক, আরো একটা গল্প বলি। আমরা ইউটাহ তে জায়ন ন্যাশনাল পার্ক এ একরাত থেকেছিলাম, সে পার্কটা বেশ মজার, নবীদের (আ) দের নামে পাহাড়ের নাম, এক পাহাড় চুড়ার নাম অ্যাঞ্জেল'স ল্যান্ডিং (অর্থাৎ যেখানে কিনা ফেরেশতাদের আড্ডা বসে) - সে পার্কে হাইক করতে গিয়ে মনে হচ্ছিল, ইনশাআল্লাহ জান্নাতে আমাদের প্রত্যেকের এরকম ঝর্ণাওয়ালা পার্সোনালাইজড পাহাড় থাকবে, সেখানে সত্যিকারের অ্যাঞ্জেলরা ল্যান্ড করবে। ত সে পার্কে বিরা.....ট বিরা.....ট সব রেডউড ট্রি, ইয়া মোটা মোটা তার গুঁড়ি। একেকটার ভেতর দিয়ে টানেল বানিয়ে গাড়ি চলতে পারবে। তেমন এক গাছ শেকড়সুদ্ধ উপড়ে মাটিতে পড়ে আছে। পৌনে দুই তলা সমান উঁচু একপাশের বেড়। আমি অবাক হয়ে সে গাছের শেকড়ের দিকে তাকিয়ে থাকলাম, এ ত রীতিমত আধুনিক ভাস্কর্য! সিমেন্ট দিয়ে বানিয়ে এ জিনিস প্রদর্শনীতে দিলে বাহবা পড়ে যাবে। আল্লাহ সত্যিই সেরা আর্কিটেক্ট। তখন মনে পড়ল, একটা সময় আমি কনফিউজড ছিলাম, আল্লাহ আমাদের ক্রিয়েটিভিটি কেন দিয়েছেন। তা নিয়ে নোট লিখেছি, প্রশ্নের আকারে, ইবাদত বনাম ক্রিয়েটিভিটি নামে। এই জিনিস দেখে বুঝলাম, আর্কিটেকচার কী না জানলে ত এই জিনিসের মহিমা বুঝতেও পারতাম না। যেমন করে অ্যাবস্ট্রাক্ট পেইন্টিং না দেখলে বুঝতাম না বালির পাহাড়ে এত রংয়ের মহিমা কোথা থেকে আসে! আবারও প্রকৃতির মধ্য দিয়ে আমি পেলাম আমার প্রশ্নের উত্তর। 


আমাদের গ্রুপের সবচাইতে ভাবুক সবচাইতে দার্শনিক মানুষটি হচ্ছে আমাদের সেই জ্যামাইকান বন্ধু, যার কথা ঘুরে ফিরে বারবারই লিখি। আমার সবচেয়ে কঠিন প্রশ্নগুলো আমি তার জন্য তুলে রাখি। এতসব পাহাড় দেখে আমাদের মনে আর কোন সন্দেহের অবকাশ নেই যে পাহাড় চড়ার মত আপাত অর্থহীন কাজটাও আমাদের স্রষ্টার সান্নিধ্যে নিয়ে যায়। আমি তাকে জিজ্ঞাসা করলাম, কেন? একটা ত জানি, এত বিশালতার মধ্যে নিজের ক্ষমতার ক্ষুদ্রতা বোঝা যায়। আর কী? সে বলল, এ ধরণের কাজে তোমার মন ফোকাস হয়, সবধরণের ডিস্ট্রাকশন দূর হয়ে যায়। আবারও জিজ্ঞাসা করলাম, কেন? শারীরিক পরিশ্রম, এমনকি জিম করলেও শুনেছি মন ফোকাস হয়, কীভাবে? 

সে তখন বোঝাল, তোমার মধ্যে তোমার শরীর আর তোমার আত্মা, দু'টোরই অস্তিত্ব আছে। ওর মুখের কথা কেড়ে নিয়ে বললাম, ও.... তার মানে শারীরিক পরিশ্রমে আমার শরীর ট্যাঁ ফো করার সুযোগ পায়না, কন্ট্রোল এ থাকে, তখন আত্মা মুক্তভাবে চিন্তা করার সুযোগ পায়? যেমনটি তারিক রামাদান তার লেকচারে বলেছেন, spirituality is the most demanding among all of your religious requirements? সে বলল, শুধু তাই না, মনকে মুক্ত করার দু'টো উপায় আছে, এক হচ্ছে, নির্বিঘ্নে চিন্তা করতে করতে এমন পর্যায়ে চলে যাওয়া যেখানে তোমার সব চিন্তা থিতিয়ে যাবে, এবং হঠাৎ করে মন পরিষ্কার হয়ে যাবে। যেমনটি রাসুলুল্লাহ (স) করেছিলেন, হেরা গুহায়। আরেকটা হচ্ছে শর্টকাট মেথড, যেখানে তুমি আর সব কিছু বাদ দিয়ে শরীরকে মনকে কেবল একদিকে ফোকাস করে রাখবে, যেমন হাইকিং এ - তখন সব বাজে চিন্তা দূর হয়ে তোমার মন পরিষ্কার হয়ে যাবে। সত্যিকার অর্থে রাসুলুল্লাহ (স) এর দু'টোই একসাথে করেছিলেন। হেরা গুহায় যাওয়া চাট্টিখানি কথাটা না, আমার মামা দেখতে গিয়েছিলেন, তিনি বলেছেন। আর আত্মাকে পরিশুদ্ধ করতে চিন্তা করার ত কোন বিকল্পই নেই। আমরা হাফ ডোমের ওখানে মানুষজন থেকে দূরে গিয়ে প্রকৃতিতে চোখ রাখতেই হারিয়ে গিয়েছিলাম আপন আপন জগতে। এ এমন এক অনুভূতি, যেখানে আটপৌরে জীবনের ক্লান্তিকর ভারগুলো আপনা থেকেই লঘু হয়ে আসে। মন চায় বড় কিছু করতে, ভাল কিছু ভাবতে। ফিরে আসতে ইচ্ছে করেনা, এ যেন একটুকরো স্বর্গের থেকে মনকে টেনে হিঁচড়ে পৃথিবীতে নামিয়ে আনা। ফিরে এসেছি এই আশা নিয়ে, এই পৃথিবীর ডিজাইনার যিনি, জান্নাতের ডিজাইনারও তিনি; ওখানে গেলে সময় আর কখনও ফুরাবে না। 


সবকিছু মিলিয়ে আমি আবারও আল্লাহর কাছে কৃতজ্ঞ, আমাকে এ পথ দিয়ে এভাবে জীবনটাকে চেনার সুযোগ করে দেবার জন্য। কৃতজ্ঞ, পথচলায় এমন মানুষদের বন্ধু হিসেবে পাইয়ে দেবার জন্য। কৃতজ্ঞ মনপবনের কাছেও, তার 'এভারেস্ট বিজয়' নোটে পাহাড় আরোহণের অসারতা নিয়ে কথা হয়েছিল বলেই এসব নিয়ে এতটা চিন্তা করেছিলাম। আল্লাহ সত্যিই মানুষের মনকে মুক্ত করেন, তার নিদর্শনের মাধ্যমে। কোন নিদর্শন কাকে কতটুকু প্রভাবিত করবে সেটা একজন আরেকজনের উপর চাপিয়ে দিতে পারেনা, তাই নিজের বোধটুকু চাঙা রাখার পাশাপাশি অন্যদের পথকে শ্রদ্ধা করাও খুব দরকার।

Sunday, May 13, 2012

দাম্পত্য - ৮

স্বামী স্ত্রীর মধ্যে সম্পর্কের কোন না কোন সময়ে একটা জটিলতা সামনে আসেই, তা হচ্ছে আর্থিক দ্বন্দ্ব। হয় স্বামী যথেষ্ট খোরপোস দেয়না, অথবা স্ত্রী প্রয়োজন ও বিলাসিতার মধ্যে পার্থক্য বোঝে না, অথবা বাবার বাড়িতে টাকা পাঠানো নিয়ে সমস্যা হয়, অথবা দেনমোহর এখনও কেন দেয়নি - তা নিয়ে অসন্তুষ্টি... টাকাপয়সাজনিত দ্বন্দ্বের উদাহরণ দিয়ে শেষ করা যাবে না। এই বিষয়টার সবচেয়ে কঠিন দিক হচ্ছে, আলোচনাটা খুব দ্রুত উত্তপ্ত রূপ নেয়, এবং এক পর্যায়ে স্বামী/স্ত্রী এমন কোন মন্তব্য করে বসে যে অপরজন প্রায় বাকি জীবন সে দগদগে ঘা বয়ে বেড়ায়। আমার এক বন্ধু খুব সুন্দর একটা কথা বলে, (যদিও আমি তার সাথে একমত না,) সম্পর্ক হচ্ছে একটা ভাস্কর্যের মত, প্রতিটা ঘটনা একটা একটা ছাপ রেখে দেয়, এবং তা ভাস্কর্যটাকে নতুন রূপ দেয়। ওর কথা মত ধরলে আমি বলব, টাকাপয়সাজনিত উত্তপ্ত এই মন্তব্যগুলো হচ্ছে হাতুড়ির এক ঘায়ে নাক মুখ খসিয়ে দেয়ার মত। একবার মেরে ফেললে পরে গড়ে তুলতে অনেক বেগ পেতে হয়। 

এই সমস্যা নিয়ে লেখা খুব কঠিন ব্যাপার, কারণ এত ডালপালা ছড়ানো যে, কাকে দিয়ে কোথা থেকে শুরু করব, সেটা বোঝাই দায়। মোটা দাগে কয়েকটা দিক আলোচনা করি, বাকিগুলো আশা করি একই ছাঁচে ফেলা যাবে। 

১. মাসিক খরচের সাথে বরাদ্দকৃত অর্থের ব্যবধান: যে কোন কারণেই হোক, মাস শেষে আয় ও ব্যয়ের হিসাব মেলেনা। এ অবস্থায় একজন অপরজনকে অতিরিক্ত খরুচেপনা বা অতিরিক্ত কিপ্টেমির জন্য দোষারোপ করতে পারে। 


২. আয়ের উপর একচেটিয়া অধিকার: স্বামী স্ত্রী দু'জনেই চাকুরিজীবি হলে নিজের আয়ের উপর কতটুকু কর্তৃত্ব থাকবে - এটা নিয়েও চলতে পারে মনোমালিন্য। এমন দেখেছি, স্ত্রী এর চাকুরির বিশ ত্রিশ বছর পরেও বেতনের টাকাটা নিজ চোখে দেখার সুযোগ হয়না, স্বামী প্রবর হিসেব মত ব্যাংক থেকে তুলে আনেন, এবং তাঁর বিচার বিবেচনায় খরচ করেন। আবার এমনও দেখেছি, একজনের ব্যাংক ব্যালেন্স অপরজন জানেন না, সংসারের খরচের কতভাগ কে দেবে তা নির্ধারিত হয় আয়ের উপর নির্ভর করে... এ ছাড়া কার টাকা কোথায় খরচ হচ্ছে - এ বিষয়ে জিজ্ঞাসা করার অধিকারটাও অপরজন রাখেন না। 

৩. আত্মীয়স্বজনদের সাহায্য বা দান খয়রাত করার ব্যাপারে উভয়পক্ষের সমর্থন না থাকা: হিংসা হোক, স্বার্থপরতাবশতঃ হোক, ক্ষোভ হোক, যথাযথ হোক - যে কোন কারণেই স্ত্রী বা স্বামী অপরপক্ষের আত্মীয় স্বজনের জন্য যে টুকু অর্থ বরাদ্দ করা হয়েছে তা নিয়ে স্বচ্ছন্দ বোধ করছেন না। 

৪. অনেক আগে শ্বশুরবাড়ি থেকে ধার নেয়া টাকা আর কখনও পরিশোধ করেন নি, বা বিয়ের দেনমোহর এখনও শোধ করেন নি, এবং এ অভিযোগগুলো উঠে আসছে জীবনের বিভিন্ন ঘাত প্রতিঘাতে, কেবলই প্রতারণার অভিযোগ হয়ে। 


বিষয়গুলো লেখার সময় আমি যেন চোখের সামনে অনেক উদাহরণ দেখতে পাচ্ছি, কিন্তু লেখার ভাষায় যখন প্রকাশ করছি, নিজের কাছেই ছোট লাগছে, মনে হচ্ছে, দাম্পত্যের মধ্যে এমন সংকীর্ণতা চিন্তা করাই পাপ। কিন্তু দুঃখজনকভাবে সত্যি, সংসারের প্রথম দিকে না হলেও, কোন না কোন সময় এমন অনেক দুঃখজনক ঘটনাই ঘটে, যা কিনা হৃদয় কে স্তব্ধ করে দেয়, অপরজনের প্রতি সম্মান নামিয়ে দেয় শূন্যের কোঠায়, এর রেশ চলে বছরের পর বছর, প্রকাশ্যে, অপ্রকাশ্যে, শ্লেষাত্মক কথায় বা নির্লিপ্ত উদাসীনতায়। 



সমাধান? আমি আমার ক্ষুদ্র অভিজ্ঞতা থেকে বলার যোগ্যতা তেমন রাখিনা। যখন সমাধান বলতে যাব তা হয়ত জটিলতার তুলনায় হাস্যকরই শোনাবে। তবু লিখছি, কারণ দাম্পত্য সিরিজের পুরোটুকুই নতুন দম্পতিদের জন্য, যারা এখনও এসব সমস্যার তুঙ্গে ওঠেন নি। তবে সচেতন না হলে একদিন যে উঠবেন, তা বলার অপেক্ষা রাখে না। 


বর্তমান সময়ে চাহিদার সাথে সঙ্গতির সামঞ্জস্য রাখা প্রতিটা পরিবারের জন্যই খুব কঠিন। এ জন্য যেটা করা যেতে পারে, স্বামী স্ত্রী একটা সময় করে বসে নিজেদের মাসিক আয় কতটুকু সেটার সাথে সাথে কোন খাতে আয়ের কতটুকু খরচ করবেন এমন একটা বাজেট করতে পারেন। সেখানে মুদি খরচ, কাপড়, বাসা ভাড়া, চিকিৎসা - এমন নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিসগুলোর হিসেব করে, বাকি যে টাকাটা থাকে তার কত পার্সেন্ট উপহার, বিনোদন ইত্যাদিতে খরচ করবেন সেটা দু'জনে মিলে ঠিক করতে পারেন। খুব স্বাভাবিক ভাবেই, এসব বিভিন্ন খাতে দু'জনের চাওয়ার পার্থক্য থাকতে পারে। স্বামী হয়ত চাইছেন আধুনিকতম ইলেক্ট্রনিক্স যন্ত্রটা কিনবেনই, যত টাকাই লাগুক। স্ত্রী হয়ত ভাবছেন, আর যাই হোক, ফেসিয়ালের খরচটা বাদ দেয়ার কোন উপায়ই নেই। সুতরাং, প্রথমবার বাজেট তৈরি করতে গেলে এরকম খুঁটিনাটি প্রায় সবকিছু নিয়েই তাদের দৃষ্টিভঙ্গির পার্থক্যটা স্পষ্ট হবে। এবং মজার ব্যাপার হচ্ছে, কেনাকাটা বা খরচের ব্যাপারে বড়রাও ছেলেমানুষের মতই গোঁ ধরেন। ত, সেক্ষেত্রে উষ্ণ বাক্ বিতন্ডায় না জড়িয়ে অন্যজনকে তখন খুবই ঠান্ডামাথায় বোঝাতে হবে। কথোপকথনটা চাই কি এমনও হতে পারে - 

'বুঝলাম, এই মুহুর্তে একটা এস এল আর না থাকলেই নয়। কিন্তু তুমি চিন্তা কর, আমরা প্রতি মাসে সঞ্চয় করি আয়ের মাত্র বিশ শতাংশ। একটা এসএলআর প্রায় আমাদের পাঁচ মাসের সঞ্চয়ের সমান। আর সঞ্চয়ে তোমার খরচের জন্য বরাদ্দ আছে অর্ধেক, তার মানে, তুমি এখন একটা এস এল আর কিনলে আগামী দশ মাস আর কিছু কিনতে পারছ না। তুমি যদি মনে কর, এস এল আরটা দশ মাসের আর সব কিছুর ছাড়ের সমান, তাহলে কিনতে পার। 


বা স্ত্রীর ক্ষেত্রে কাজিনের বিয়ের দাওয়াত উপলক্ষে পার্লারে তিন হাজার টাকা খরচ করা যদি সত্যিই প্রয়োজনীয় মনে হয়, তিনি স্বচ্ছন্দে করতে পারেন, যদি তাঁর জন্য বরাদ্দ খরচের মধ্যেই থাকে। বরাদ্দের বাইরে গিয়ে করতে হলে কান্নাকাটি বা রাগারাগি নয়, যুক্তিপূর্ণভাবে আয়ের উৎসটা দেখিয়ে তারপরই করতে হবে। 


শুধু বাজেট করেই ক্ষান্ত হওয়া যাবে না, প্রতিমাসের নির্দিষ্ট দিনে বসতে হবে হিসাব নিয়ে, এ মাসে লক্ষ্যের কতটুকু অর্জন করতে পেরেছি। যে খাতে পারিনি, সেখানে আর কী কী পরিবর্তন আনতে হবে। এ পর্যায়ে চলবে আরেক দফা দোষারোপ.. কিন্তু তার পরেও, শেষ পর্যন্ত যে সিদ্ধান্তটা নেয়া হবে, সেটা নিয়ে বাকি মাস আর কোন অভিযোগ থাকবে না। একই ভাবে, তিন চার মাস পর আবারো বিশদভাবে রিভিউ করা যেতে পারে, আদৌ আমাদের বাজেট টা বাস্তবসম্মত ছিল কি না। যদি না হয়, আনা যেতে পারে আরো বড় পরিবর্তন, চাই কি কোন মাসে সব রকমের বিনোদন কাট ছাঁট করে দিলেন, অন্য মাসগুলোর সাথে ব্যালেন্স করার জন্য। এরকম অনেক আইডিয়াই আসবে, যদি প্রতি মাসে নিয়ম করে স্বামী স্ত্রী খরচের বিষয়টা আলাপ করেন। 


আরেকটা বিষয় হচ্ছে, নিজের আয়ের উপর কতটুকু অধিকার থাকবে সেটাও অনেক সময় স্বামী স্ত্রীর মধ্যে স্পষ্ট থাকে না। নতুন দম্পতিদের মধ্যে অনেকে এটাই বুঝে উঠতে পারেন না, জয়েন্ট একাউন্ট না রেখে আলাদা একাউন্ট করতে চাওয়াটা অপরাধের পর্যায়ে পড়ে কি না। আবার 'আমি রোজগার করি, আমি খরচ করি - এখানে তুমি বলার কে?' এমন ভাবভঙ্গিও থাকে অনেকের। আমি বলছি না, এর কোনটাতেই কোন সমস্যা আছে। যদি স্বামী স্ত্রী উভয়েই কোন একটা নির্দিষ্ট সেটিং এ স্বচ্ছন্দ বোধ করেন, তাহলে এখানে বলার কিছু নেই। তবে আমার মনে হয়, সংসারের গোড়ার দিকেই এ বিষয়ে কার দৃষ্টিভঙ্গি কী - সেটা স্পষ্ট জেনে নেওয়া ভাল, তা না হলে অকারণে দুঃখ পেতে হবে। 


শেষ যে ব্যাপারটায় জোর না দিলেই নয় - স্বামীর বা স্ত্রীর উপর নির্ভরশীল অনেক আত্মীয় থাকতে পারেন, বিশেষ করে বাবা মা ভাই বোন - এদের জন্য খরচ করাটা কর্তব্যের মধ্যে পড়ে। কিন্তু এই ন্যায়সঙ্গত কাজটাকেও রীতিমত জুলুমের পর্যায়ে নিয়ে যেতে পারেন অনেকে, যদি আগে থেকেই এখানে সীমারেখা টানা না হয়। কীভাবে এই ভাল কাজটি জুলুম হয়ে যেতে পারে? যদি আপনি এ কাজগুলোতে আপনার জীবনসঙ্গীকে অংশীদার না করেন, তবে একটা সময় তার মনে অভিমান হতে পারে, 'আমি কি এতই খারাপ, যে আমাকে জানিয়ে করলে আমি বাধা দিতাম?' তারপর এই অভিমান থেকেই শুরু হবে মুখ গোমড়া করা, অকারণে কঠোর বাক্য বিনিময় - ইত্যাদি ইত্যাদি। ভাল কাজ মিলে মিশে করার মধ্যে খুব বড় রকমের আনন্দ আছে, এবং তা পরস্পরের প্রতি শ্রদ্ধাও বাড়িয়ে দেয় বহুগুণ। তাই বলি, রোজগার আপনার নিজের হলেও, আত্মীয় আপনার রক্তের সম্পর্কের হলেও, জীবনসঙ্গীর অনুমতি চান, এতে করে সে সম্মানিত বোধ করবে। আর আপত্তি করলে, আপত্তির কারণ জেনে তা নিয়ে কথা বলতে পারেন, বা আপনার কাছে যুক্তিসঙ্গত মনে না হলে পাত্তা না দিতে পারেন, তবু যে আপনি অনুমতি চাইলেন, এটাই অনেক বড় প্রভাব রাখবে আশা করি।


সত্যি বলতে কী, দাম্পত্যের আনন্দগুলোর অনে...ক রকমের রং, রস, রূপ রয়েছে। কেন জানি আমরা অস্বচ্ছলতাকে অজুহাত বানিয়ে এরকম সব আনন্দের অস্তিত্বকেই অস্বীকার করতে চাই। মানি, অর্থ না থাকলে অনেক স্বপ্নই পূরণ হয়না, অভিযোগের ঝুলিটাও ভারি হতে থাকে। কিন্তু সরবরাহ যেখানে সীমিত, ব্যবস্থাপনার ত সেখানেই সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন। সফল ব্যবস্থাপনার প্রথম ধাপ হচ্ছে ম্যাচিউর কমিউনিকেশন। আর্থিক ব্যাপারস্যাপারগুলো নিয়ে বসলেই এ জিনিসটা সবচেয়ে বেশি প্রকট হয়। তাই বলি, এধরণের আলোচনার প্রয়োজনীয়তাটা শুধু টাকাকড়ির মধ্যেই সীমাবদ্ধ না, পরস্পরকে বুঝতেও অনেক বড় ভূমিকা রাখে।