Monday, August 1, 2011

দাম্পত্য - ২

দাম্পত্য জীবনে হারমনি প্রতিষ্ঠা করা এমন না যে একটা তুড়ি বাজালাম আর হয়ে গেল। ইনফ্যাক্ট প্রতিদিনের কাজকর্মের মুখ্য উদ্দেশ্যই আমাদের হয়ে গেছে হারমনি আনা, যতক্ষণ এক সুরে সুর বাজে, মনে হয় এর বেশি আর কী চাওয়ার আছে জীবনে? কিন্তু মানুষ ত অনেক ভাবেই দুজনে মিলে সুখে থাকতে পারে, তাই না? স্বার্থপরের মত, ভোগবিলাসীর মত, অন্যায়কারীর মত - এদের হারমনিও ত হারমনি। কিন্তু তাতে স্বর্গীয় সুখ কই? ফেরেশতাদের ডানা বিছানো 'সুকুন' কই? আল্লাহ যে বলেছেন অমন পরিবারে তিনি রহমত নাযিল করেন, ফেরেশতারা সে পরিবারের জন্য আল্লাহর কাছে দোয়া করতে থাকেন?

আস্তে আস্তে মনে হল, দাম্পত্য নিয়ে মানুষ তিন স্তরে সন্তুষ্ট থাকতে পারে। এক, একজন আরেকজনের কমফোর্ট হবে। তা শুধু খাবার দাবার, আর অন্যান্য শারীরিক কমফোর্ট ই না। দু'জনের নিজস্ব জগতের অশান্তি শেয়ার করে হালকা হবে, বাইরে অনেক অপমান সহ্য করে ঘরে এসে নিশ্চিন্তে মাথা গুঁজতে পারবে। এমন নিরাপত্তা আর প্রশান্তি পেলে একটা সংসারে আসলে আর কিছু লাগেনা। রাসুলুল্লাহ (স) তাঁর পনের বছরের বড় (এ নিয়ে দ্বিমত চলছে আজকাল) স্ত্রীর কাছে এতটাই নিরাপত্তা, সম্মান আর ভালবাসা পেয়েছিলেন, খাদিজা (রা) মারা যাওয়ার অনেক বছর পরেও তাঁর কথা ভেবে রাসুলুল্লাহ (স) এর চোখে পানি চলে আসত। আসবেই ত। জিবরাইল (আ) কে প্রথমবার দেখে উনি ভয়ে এত উপর থেকে নেমে ঘরের মধ্যে এসে চাদর দিয়ে মুড়িয়ে টুড়িয়ে স্ত্রীকে বলেছিলেন 'আমাকে কি জ্বীন এ ধরেছে?' উনার স্ত্রী কোত্থেকে জানবে উনার কী হয়েছে? উনি কি ফেরেশতা মারফত আগে খবর পেয়েছিলেন? উনি যা জানতেন তা হল, মুহম্মদ (স) কত অসাধারণ মানুষ। এরকম একটা ঘটনার প্রেক্ষিতে উনি রেফারেন্স টানলেন রাসুলুল্লাহ (স) এতিমদের কত যত্ন করেন, কত সত্যবাদী ইত্যাদি ইত্যাদি। এসব কথা এখানে বলা কি খুব প্রাসঙ্গিক ছিল? খাদিজা (রা) যা করেছেন তা হল উনি রাসুলুল্লাহ (স) এর নিজের সম্পর্কে ভয়, শঙ্কা দূর করে দিয়েছেন তাঁর সম্পর্কে অনেক পজিটিভ কথা বলে। আমরা আমাদের পার্টনারের ভঙ্গুর সময়ে কতটুকু ভাল কথা বলি? আর আউট অব কনটেক্সট প্রশংসা? অসম্ভব! আউট অব কনটেক্সট অভিযোগ করা যায়, কিন্তু প্রশংসা? কদ্যপি নহে!

আমার বাসায় হিটার ঠিক করতে এক ইলেক্ট্রিশিয়ান এসেছিল, ভদ্রলোক খুব কথা বলতে পছন্দ করেন, কথায় কথায় বলেছিলেন, তোমাদের মেয়েদের আমি হিংসা করি। you don't know the power of your words. শুধু মুখের কথা দিয়ে you can bring a lion out of a mouse.

খাদিজা (রা) এর মত প্রজ্ঞা যদি সব ছেলেমেয়ের থাকত, শুধু কথা দিয়েই কত শান্তি তৈরি করতে পারত ঘরে। একই ভাবে মন খারাপ হলে তার টেক কেয়ার করা, বাইরে অপমান জনক একটা কিছু ঘটলে ঘরের মানুষটা আরো অনেক বেশি kindness দিয়ে তার মনের জোর ফিরিয়ে আনা - এ বিষয়গুলোতে অনেক বেশি যত্নশীল হওয়ার দরকার আছে। ছেলেরা বোঝে না মেয়েদের কমফোর্ট কেবল ভাল শপিং করতে পারার স্বাধীনতার মধ্যেই না। এপ্রিসিয়েশন একটা ছেলের জন্য যতটা ইন্সপায়ারিং, একটা মেয়ের জন্য তার চেয়েও বেশি। অনেক সময়ই মেয়েটার চিন্তাভাবনা বা বাইরের কাজে ম্যাচিউরিটি ছেলেটার মত হয়না, তখনও বিভিন্ন বিষয়ে পরামর্শ নেয়া মেয়েটার মানসিক শক্তি বাড়াতে অনেক সাহায্য করে। ঘরের কাজে ব্যস্ত থাকায় মেয়েটার বাইরে এক্সপ্লোর করার সুযোগ সমানভাবে হয়না। এর প্রভাব যদি তার চিন্তায়, আচরণে পড়ে, আর তার কারণে স্বামীর থেকে তিরস্কৃত হতে হয়, তাহলে মেয়েটার কী দায় পড়েছে সংসারের ঘানি টানতে? সে ও ত স্মার্ট হওয়ার, আধুনিক হওয়ার জন্য সময় ব্যয় করতে পারে, ঘরে সময় না দিয়ে। এই সব খুঁটিনাটি অনেক কিছুই দুই পক্ষে মনের মধ্যে জমা হয়। তার কিছু কথা বলে, কিছু ক্ষমা করে, আর পুরোটা আল্লাহর থেকে রিটার্ণ পাওয়ার আশায় মন থেকে মুছে ফেলে কমফোর্ট বাড়ানোর চেষ্টা করতে হবে।

ও! কমফোর্ট এর কথা এতবার বলেছি, একটা কথা বলিনি, পুরোনো জামার awesome উদাহরণটা খুব সংক্ষেপে কুরআনে আছে। husband and wife are garments for each other. তাও রোজার নিয়মের দুইটা আয়াতের মাঝখানে দেয়া। নোমান আলি খান এর ব্যাখ্যা করেছেন খুব সুন্দর করে, রোজায় ইফতার, সেহরি, তারাবী, কুরআন পড়া - এসব রুটিনের মধ্যে স্বামী স্ত্রী একে অপরকে যেন কভার করে যাতে দুজনই সমানভাবে স্পিরিচুয়ালি এগোতে পারে। লিংক টা এখানে পাবেন।

http://www.youtube.com/watch?v=t6Cd08mUjvU

দাম্পত্য - ১

আমার বিয়ের পর থেকে বিবাহ নামক সম্পর্কের বাঁধনটা নিয়ে অনেক ভেবেছি। ধুম ধাম করে বড় করে মেহেদী, বিয়ে, রিসেপশন এর পরে কী হয়? জমকালো সাজে বউটা বেশ আনন্দের সাথে নতুন ঘরে পা রাখে। তারপর কী হয়? আনুষ্ঠানিকতার লৌকিকতা যত ফিকে হয়ে আসে, মেহেদীর নকশা যত মিলিয়ে যেতে থাকে, বউটাও কি তত মেয়ের মত হয়ে মিশে যায় এই পরিবারে? অচেনা বা অর্ধচেনা মানুষটি কি তার বাকি সব বন্ধনের অভার ভুলিয়ে দিতে পারে?

বিয়ের আগে আমার একমাত্র বিবাহিত বান্ধবীর কাছে জানতে চেয়েছিলাম, বিয়েটা আসলে কী বল্ ত? তুই তোর বরকে কি মাথায় করে রাখিস? কোন কিছু পছন্দ না হলে কী করিস? বাবা মায়ের কথা যেমন আমরা পছন্দ না হলেও মেনে নেই, এখানেও কি তুই তাই করিস? নাকি বন্ধুর মত মতে না মেলা পর্যন্ত গলা ফাটিয়ে তর্ক করিস? ওর কোন একটা কাজ অন্যায় দেখলে তুই কীভাবে সামলাস? ইত্যাদি ইত্যাদি। আচ্ছা পাঠক, বলুন ত, আপনাদের মধ্যে কি একজনও আছে যে বিয়ের আগে এসব ব্যাপারে স্পষ্ট ধারণা নিয়ে আসে? একজনও কি আছে যে বলতে পারে, না, আমার মা আমাকে এগুলো শিখিয়ে দিয়েছেন? ছেলেদের অবস্থা ত আরো ভয়াবহ। ছেলেকে স্বামী হওয়ার জন্য প্রস্তুত করার দায়িত্ব বাবার, এইটাত বাবারা কল্পনাই করতে পারেন না। মাঝে মধ্যে মনে হয়, এ যুগের বাবারা কি জীবিকা ছাড়াও জীবনে শেখার কিছু আছে এটা জানেন?

বেশির ভাগ ছেলেমেয়েরই যেটা হয়, একগাদা অবাস্তব স্বপ্ন নিয়ে তারা সংসার শুরু করে। মেয়েটা মনে করে দিন রাত চব্বিশ ঘন্টা ছেলেটার চিন্তা জুড়ে থাকবে শুধু সে। তার চাওয়া পাওয়ার দিকে শতভাগ মনোযোগ থাকবে। অপর দিকে ছেলেটা দেখে কল্পনার পরী জোছ্না রাতে গল্প করতে আসলেই বেশ লাগে। সিন্দাবাদের ভুতের মত ঘাড়ে চেপে থাকলে অসহ্য বোধ হয়। ফলাফল, মেয়েটার অভিযোগ, আর ছেলেটার উদাসীনতা। স্বপ্নের নীড় স্বপ্নের দেশেই পড়ে থাকে। এর সাথে যদি অভিভাবকদের অন্যায় ব্যবহার যোগ হয়, তখন এই স্বপ্নকাতর কপোত কপোতীর কী যে দশা হয় বলাই বাহুল্য। একটা সময় হয়ত মেয়েটার মন কঠোর হয়ে যায়, ছেলেটা নিজের মত করে ভাল থাকতে শিখে যায়, দুজনেই কষ্টগুলোকে একা একা সামাল দিতে শিখে যায়। দূর দেশে কেঁদে মরে অপূর্ণ স্বপ্নগুলো। তার কান্না ভুলতেই বোধ করি এত এত বাস্তবতায় নিজেকে বেঁধে ফেলতে হয়।

যাই হোক। আমি কখনও চাইনি আমার বা আমার বন্ধুদের দাম্পত্য জীবন এমন হবে। তাই শুধু খুঁজতাম একটা তালিসমান, একটা ম্যাজিক স্পেল - যেটা ফলো করলে স-ব সমস্যা নিমিশেই ফিনিশ হয়ে যাবে।

স্বামী স্ত্রীর সম্পর্ক নিয়ে একটা মনে গেঁথে থাকার মত মন্তব্য শুনেছিলাম ড: মুহম্মদ জাফর ইকবালের মুখে, একটা অনুষ্ঠানে মনে আছে বলেছিলেন, যে এই সম্পর্কটা একটা পুরনো জামার মত। আমার এই তুলনাটা এত ভাল লেগেছিল! শুনেই মনে হয় কমফোর্ট আর কমফোর্ট। আমার বান্ধবীও বলল, প্রবলেম হলে মনে জমায় রাখবি না। কথা বলে সলভ করবি। বলে ফেললে দেখবি শান্তি।

আমি প্রথম প্রথম তাই করতাম। কিন্তু ফলাফল দেখে বুঝলাম এ পদ্ধতি সবসময় সবার জন্য না। কখনো কখনো একটু নিরবতা অনেক কথা বলে। দুজনের মতে না মিললে আমার মনে হাজার যুক্তি দাঁড়িয়ে যেত, তা বলার জন্যে আর ঠিকটাকে প্রতিষ্ঠা করার জন্যে যেন আর তর সইত না। অঙ্ক কষে দুইয়ে দুইয়ে চার না মিললে হতবুদ্ধি হয়ে যেতাম। আমি ত ঠিক ই বলেছি। ঠিক বললেই ঠিক হয় না কেন? আবার দেখলাম আমি ভুল করলে প্রাণপনে মনটা চায় একটু যেন রেহাই দেয় ও, কিছু যেন না বলে। বুঝলাম, আমার ন্যায়ের ঝাণ্ডার চেয়ে ওর নিরব সহিষ্ণুতা অনেক বেশি শক্তিশালী।

কিন্তু চুপচাপ থাকার পক্ষে কোন রেফারেন্স পাচ্ছি না ত! আর এটা কেমন কথা? দোষ দেখলে খালি চুপ করে থাকলে হবে? কত সময় কাজে ঝামেলা লেগে যায়, কথা পছন্দ হয়না, তখন শুধু চুপ থেকে চোখের পানি ফেলব নাকি? আর এভাবে আদৌ ত কোনদিন কেউ কাউকে উপরে তুলতে পারবনা, উল্টা মনে অনেক অভিমান জমা হবে। কী করি? উত্তরটা একদিন পেয়ে গেলাম কুরআনের পাতা উল্টাতে উল্টাতে। তাফসিরে একটা কোণে ছোট্ট করে লেখা, spouses are to establish peace and harmony.

এই হারমনি নিয়ে চিন্তা করতে থাকলাম, করতেই থাকলাম। হারমনি মানে কী? হারমনি মানে এক সুরে গাঁথা, ছন্দ মিলিয়ে চলা। একসাথে মিলে সুন্দর একটা গান রচনা করা। একসাথে, একই ছন্দে তালে তাল মিলিয়ে একটা কিছু তৈরি করা - এমনভাবে যেন কোথাও কর্কশ সুর না বাজে। আমার এই বিজ্ঞ জজ সাহেবের ভূমিকা কি হারমনি তৈরি করছে? মোটেও না। তার মানে কি যেভাবে চলে চলুক বলে তালে তাল মিলিয়েই যাব? অবশ্যই না।

দুটো ভিন্ন স্কেলের কম্পোজিশন কে এক জায়গায় আনতে হলে কখনও তর্ক, কখনও ধৈর্য, কখনও একটু অভিমান - অনেক কিছুই ব্যবহার করতে হয়। যা বুঝেছি, সায়েন্স এর জটিল বিষয়াদি বুঝতে যেটুকু বিদ্যা খরচ হয়, হিউম্যান সাইেকালজি বুঝতে তার চেয়ে অনেক বেশিই কসরত করতে হয়। কিন্তু সবশেষে যে তানটা বাঁধা হবে তার চমৎকারিত্বে আশ্চর্য হয়ে যেতে হবে। এ যেন একটা ঝড়ো হাওয়ার মত, শক্তিকে শক্তি দিয়ে বাধা দিয়ে প্রলয় আরো বাড়াতেও পারেন, বাঁশির মধ্য দিয়ে বইয়ে অপূর্ব সুর ও তুলতে পারেন।

চাবির রিং

আমি এক পরিচিত বড় ভাইকে দিয়ে কষ্টে মষ্টে আমার বোনের কাছে একটা চাবির রিং পাঠিয়েছি। সুদূর আমেরিকা থেকে বাংলাদেশ, তিন হাত ঘুরে একখানা চাবির রিং - বারো হাত কাঁকুড়ের একশ তের হাত বিচি। তাও জিনিসটা দেখতে সুন্দর হলে কথা ছিল। একটা অর্ধেক কাটা পাথর, আমাদের জাফলং এ গেলে হাত ভরে নিয়ে আসা যায়।

খনিজ পাথর যে কত রকমের হয়! ভার্জিনিয়ায় Luray Cavern নামে একটা গুহা আছে, উপর থেকে ফোটা ফোটা পানি পড়ে পড়ে ইয়া বড় বড় স্তম্ভ তৈরি হয়েছে। ছোট বেলা রকিব হাসানের তিন গোয়েন্দাতে স্ট্যালাকটাইট, স্ট্যালাগমাইট এর কথা পড়ে মোটামুটি একটা আইডিয়া ছিল এইগুলি কীরকম হয়, কিন্তু গিয়ে দেখি এলাহী কারবার! কত রকমের যে স্ট্রাকচার! সুবহানাল্লাহ, শুধু পানির ফোটার সাথের ক্যালসিয়াম কার্বনেট জমে জমে এরকম মিনারের মত, পর্দার মত, আলাদীনে আঁকা রাজপ্রাসাদের মত - কত কিছু তৈরি হয়ে বসে আছে - দেখে গায়ে কাঁটা দেয়। তবে লুরে তে সমস্যা হচ্ছে রঙের খুব বেশি বৈচিত্র নেই। হলদেটে লাল একটা রং, এইটাও অবাক লাগে, শুধু প্যাটার্ণ দিয়েই কত রকম ইয়ে করা যায়! এর সাথে যদি রং যোগ হয়, মাথা ঘুরে যায়। বিশ্বাস না হলে উইকি তে লিস্ট অব মিনারেলস এ ঢুকে দেখতে পারেন। আমার সবচেয়ে ভাল লাগে মালাকাইট। যেমন রং তেমন প্যাটার্ণ। সুবহানাল্লাহ!

এই পাথরদের আরো ভালবেসে ফেললাম আমিনাহ আস্সিলমির এক লেকচার দেখার পর। উনি বাচ্চাদের কাছে ডেকে একটা একটা করে পাথর দেখাচ্ছিলেন, বাচ্চারা ত খুব খুশি! উনি তখন বলছিলেন এগুলো আল্লাহ তৈরি করেছেন, আমাদের জন্য। একটা পাথর দেখালেন, সাদামাটা পাথর। কিন্ত মাঝখানে গোল মসৃণ একটা ফুটো। বছরের পর বছর ধরে এক ফোটা এক ফোটা করে পানি পড়ে এমন হয়েছে। উনি মা দের বলছিলেন, এটা হচ্ছে পেশেন্স। একবারে বদলাতে যান, ভেঙে যাবে, কিন্তু দীর্ঘ সময় ধরে অল্প অল্প করে বললে শক্ত পাথরও শেপ আপ হয়।

আরেকটা পাথর উপরটা খুব সাদামাটা। ভেতরের দিকে মুক্তো দানার মত ঝিকমিক করে। উনি বললেন ইসলাম বাইরে থেকে দেখতে এমনই, যত কাছ থেকে দেখবে, ততই এর সৌন্দর্য টের পাবে।

ঐ একটা লেকচার থেকে আমি অনেক কিছু শিখেছি। শিখেছি আল্লাহর ভালবাসাকে চিনিয়ে দিলে মানুষের আপনা থেকেই পরিবর্তন আসে। শিখেছি ছোট্ট ছোট্ট নিদর্শন থেকেও আল্লাহর স্মরণ করা সম্ভব। আল্লাহর সাথে প্রাথমিক পরিচয়ের জন্য কুরআনে এক্সপার্ট, আরবিতে তুখোড় হওয়ার দরকার নেই। নেচারের দিকে তাকালেই যথেষ্ট। আল্লাহ বলেন, তোমরা কি দেখনা কীভাবে পানিকে আকাশে উত্তোলিত করি, আর বৃষ্টি নামাই, আমরা পানি চক্র আবিষ্কার করে বলি, তাই ত! তাই ত! উনি বলেন, পর্বতকে পেরেক বানিয়েছি, ভূগোলে পর্বতের গঠন পড়ে আমরা মাথা চুলকাই, 'জানল কেমনে?' একাডেমিক পড়ার সাথে আমরা কুরআনের সম্পর্ক করতে শিখিনি। অথচ এগুলো আল্লাহর পারফেকশনের উদাহরণ - এটা মাথায় রাখলেই অনেক কিছু স্পষ্ট হয়ে যেত। শুধু বিজ্ঞানের বেলায় না, রিয়োল লাইফে একটা প্রবলেম আসুক, নিজের বুদ্ধিমত সলভ করে দেখুন, শেষ পর্যন্ত আবিষ্কার করবেন আল্লাহর দেয়া সলিউশন টা বেস্ট ছিল। আল্লাহ কুরআনে এক লাইনে স্বামী স্ত্রীর সম্পর্ককে 'garments for each other' বলে খালাস। এটাকে টানতে টানতে কমফোর্ট বের হয়, প্রটেকশন বের হয়, কমপ্লিমেন্ট করা বের হয়, ফ্লেক্সিবিলিটি ইত্যাদি ইত্যাদি।

পড়তে হবে, পড়ার কোন বিকল্প নাই। আমার খুব ইচ্ছা যদি আল্লাহ সুযোগ দেন সাইকোলজি, স্পিরিচূয়ালিটি, ফিলসফি নিয়ে পড়াশুনা করব। এসব সম্পর্কে কিছুই ত জানিনা, শুধু মনে হয় একটা খনিভর্তি না জানি কত রত্ন লুকানো আছে। নেট এ এখন কত ইনফরমেশন, পছন্দের টপিক নিয়ে পড়াশুনা করার কি কোন অসুবিধা আছে? ফেসবুকিং, আড্ডা, টিভি, মেয়ে মেয়ে, ছেলে ছেলে - এসব করতে কতক্ষণ ভাল লাগে সত্যি করে বলেন ত? একটা সময় 'দুচ্ছাই!' বলে সব ঝেড়েঝুড়ে উঠে পড়তে ইচ্ছ্া করে না? তখন প্লিজ একটু পড়াশুনা করেন, যেইটা নিয়ে মনে চায়, দেখবেন খুব ভাল্লাগবে।

আমিনাহ আস্সিলমির সেই ভিডিও আমাকে এত মুগ্ধ করেছে, আমি একটা চাবির রিং এ ওরকম সাদা এবড়ো খেবড়ো পাথর দেখে আমার বোনকে পাঠিয়েছি। জিনিসটা ওর হাতে পৌছানোর পর ওকে আমিনাহ আসসিলমির এই লেকচারের গল্প শোনালাম। ওকে বললাম, পাথরটা রোদে নিয়ে দেখিস একটা পিঠ কেমন রোদে ঝিলমিল করে। জিনিসটা কেনার পর আমি শুধু দোয়া করছিলাম, আল্লাহ, এই পাথরটার মতই আমার বোনের ভেতরটা সুন্দর করে দাও, বাইরে সে যেমনই হোক। তোমার দেয়া জ্ঞানের আলোয় ওও যেন ঠিক এমনি করেই ঝিকমিক করে।

আসছে রোজায় নতুন রেসিপি

রোজার সময় ত সবাই একটু আধটু কুরআন তিলাওয়াত করেন, এইবার একটু অন্যভাবে পড়ি চলেন।

কুরআনটা কিন্তু আর কিছুনা, আল্লাহর আমাদের সাথে কথোপকথন। কুরআন পড়ার আগে খুব ভাব নিয়ে অজু করে ভয়ে ভয়ে খুলে সুন্দর করে তিলাওয়াত করে আবার কাপড় দিয়ে মোড়ায় শোকেসের উপর তুলে রাখার বদলে এই কাজটা করতে পারেন (যেটা আমি করি) - বেশ আরাম করে কোথাও বসি যাতে পড়তে গিয়ে পিঠ ব্যথা না করে। আউযুবিল্লাহি মিনাশ ... এই দুআটা করে কুরআন খুলে অর্থ পড়া শুরু করি। আউযুবিল্লাহি দুআটা করা উচিৎ কারণ কুরআন থেকে যা শিখব তা যেন ঠিকমত বুঝি আর ইমপ্লিমেন্ট করতে পারি তার জন্যেও ত আল্লাহর সাহায্য লাগবে! এই দুআটায় আমরা শয়তানের কুমন্ত্রণা থেকে আল্লাহর আশ্রয় চেয়ে আল্লাহর নামে শুরু করছি বলি। ত আশা করা যায় আল্লাহ তখন আমাদের পড়ায় আরো অনেক বেশি blessing দিবেন।

যে কোন একটা সূরা পড়া শুরুর আগে একটু দেখে নিলেন তার সম্পর্কে summary তে কী লেখা আছে। বড় সুরাগুলির জন্য এই অংশটা খুব সাহায্য করে। যেমন সূরা বাকারা এত বড়... কোত্থেকে কই চলে যাচ্ছে তাল রাখতে পারিনা। এই আদম (আ) এর কাহিনী বলল, তারপর কতক্ষণ বনি ইসরায়েল তারপর কী কী... সব মিলায় আমি ফুল কোন মেসেজ পাইনা। লাইন বাই লাইন পড়ি, কোথাও আল্লাহ বকা দিসে, কোথাও বলসে যাকাত দাও, কোথাও গল্প শুনাইসে... পড়তে পড়তে আমার হাই উঠতে থাকে। ট্র্যাকই রাখতে পারিনা, শিখব কী? ত আমার কাছে যে কুরআন টা আছে তার ইন্ট্রো টা আগে কখনও পড়া হয়নাই। সেদিন পড়ে দেখি এই সূরাটা বিভিন্ন প্যারায় ভাগ করা। প্রথম পর্বে তিন রকম human psyche নিয়ে কথা বলেছে। সেখানে আবার সেই রকম কিছু উদাহরণ। তার পরের অংশে আল্লাহ আদম (আ) কে সৃষ্টি, তার সামনে সবাই সিজদা করা -এই কাহিনী বলেছে, এর পরেই ৪৭ আয়াত ধরে বনি ইসরায়েল। তারপর ঈসা (আ), মুসা (আ)।

মজার ব্যাপার হচ্ছে, it starts making sense when you take the organization of the sura as a continuation of the previous one. প্রথম সূরা হচ্ছে ফাতিহা। সেখানে সুন্দর করে আল্লাহর কাছে কীভাবে গাইডেন্স চাইতে হয় সেটা শেখানো হয়েছে। তুমি একটা বই পড়তে শুরু করলা গাইডেন্স পাওয়ার জন্য, সবার প্রথমে ত ঠিক এরকম কিছু থাকাই মানায়। তারপরের সূরাই বাকারা। সেখানে বলসে এই বইয়ে অস্পষ্ট কিছু নাই। কিন্তু এই সূরাটা শুরুই হইসে এমন তিনটা অক্ষর দিয়ে যার অর্থ কোন মানুষ কখনও বের করতে পারবেনা। হয়ত আল্লাহ চাইসে গাইড করার সাথে সাথে আমাদের লিমিটেশনটাও বুঝায় দিতে। তারপর উনি বলসে, কুরআনের শিক্ষা কে মানুষ তিনভাবে গ্রহণ করে। কেউ বিশ্বাস করে ও তা বোঝার চেষ্টা করে, কেউ যাই বলুক কানে তোলেনা, আবার কেউ কেউ যেটুকু পছন্দ সেটুকু নেয়, বাকিটুকু ফালায় দেয়। এরপর আদম (আ) এর সৃষ্টির কাহিনী বলসে আল্লাহ, কিন্তু পুরাটা বলে নাই। বলসে আমি পৃথিবীতে 'খলিফা' তৈরি করব। খলিফা শব্দটাই দুই রকমের অর্থ বহন করে। একটা মানে হচ্ছে যে ফলো করে, আরেকটা মানে যে প্রতিজ্ঞা ভঙ্গ করে। তারপর আদম (আ) এর জ্ঞানের বহর দেখিয়ে ফেরেশতাদের অভিভূত করা, তাদের সম্মান আদায়, বেহেশতে থাকা - এসব বলেছেন। কিন্তু ইবলিশ যে সিজদা করলনা - এইটা নিয়ে হালকার উপর ঝাপসা বলে গেছেন। তারপর বেহেশত থেকে কীভাবে প্রতিজ্ঞাভঙ্গ করে বিচ্যুত হল, সে কথা বলেছেন। এই প্যারার শেষ দুই লাইন হচ্ছে যারা আমার কথা শুনে, ফলো করে তাদের দুঃখ বা ভয় করার কোন কারণ নাই।

দেখেন, পুরাটাতেই একটা কনফ্লিকটিং নেচারের ছাপ। মানুষ বিশ্বাস করলে তার অন্তরে কী থাকে, অবিশ্বাস করলে কী হয়। খলিফা শব্দটায়, তারপর আদম (আ) এর ঘটনায়, আল্লাহ বলল তাকে শুরুতে আল্লাহ কত বড় করে তৈরি করসে, আর প্রতিজ্ঞা ভঙ্গ করে সে কই গেসে। এরপরে বনি ইসরায়েল এর কাহিনী ত আরো স্ট্রেইট ফরোয়ার্ড, তাদের কী কী নিয়ামত দেয়া হইসিল আর ওরা কী করসে তার ডিটেইল বর্ণনা আছে।

আল্লাহ আসলে একটা মেইন থিম কে বিভিন্ন ঘটনার মাধ্যমে আমাদের কাছে ব্যাখ্যা করেছেন। সৃষ্টির সময় আল্লাহর কাছে আমাদের প্রতিজ্ঞাই ছিল আমরা তার দেয়া গাইডেন্স মেনে চলব, আর অন্য মানুষদের মধ্যে ছড়িয়ে দেব। সেটা ভঙ্গ করার কারণে আমরা তার অসন্তুষ্টির শিকার হই। তখন উনিই আবার বিভিন্ন পথ বলে দিয়েছেন এই থেকে ফিরে আসার। আমার কাছে ভাল লেগেছে এত বড় আপাতদৃষ্টিতে অসংলগ্ন সূরাটার এত চমৎকার coherence টা।

ত যেটা বলছিলাম, এরকম ইন্ট্রো পড়ে তারপর সূরাটা পড়া শুরু করলে বুঝতে আরো সহজ হয়। আরবিতে তিলাওয়াত করলে করেন, কিন্তু যখন শুধু বুঝার উদ্দেশ্যে পড়বেন তখন মোটামুটি একটা ধারাবাহিকতা রেখে পড়বেন, তাতে বুঝতে অনেক সুবিধা হয়।

কুরআনের কনটেক্সট বা flow of thought যেমন মজার, word by word অর্থগুলিও অনেক মজার। যেমন সূরা মু'মিনুন এ মু'মিনের বৈশিষ্ট্য হিসেবে বলা হয়েছে 'আল্লাযিনা হুম লিয যাকাতি ফা'ইলুন'
আল্লাযিনাহুম (যারা) লি (এর মধ্যে) যাকাতি (যাকাত) ফা'ইলুন (করা) - সোজা ভাষায় যারা রেগুলার যাকাত দেয়। কিন্তু এই ফা'ইলুন হচ্ছে করা এর আরবি ভার্সন। করা এর আরেকটা আরবি হচ্ছে 'আমল। ফা'ল আর 'আমল এর মধ্যে পার্থক্য হচ্ছে ফা'ল স্বতঃস্ফূর্ত, নিঃশ্বাস নেয়ার মত, এইটার জন্য কোন ইফোর্ট দিতে হয়না। আর 'আমল হচ্ছে উদ্যোগ নিয়ে করা। যাকাত এর আরেকটা মানে যে নিজেকে পরিশুদ্ধ করা এটা ত আগেও বলেছি। তাহলে সব মিলায় কথাটা কী দাঁড়াল? যারা নিজেদের খারাপ স্বভাব কে ছেঁটে ফেলে সবসময় পরিশুদ্ধ করার চেষ্টাটাকেই স্বভাব বানিয়ে ফেলেছে তারাই মুমিন।

ত এসব মজার মজার কথাগুলি একটা বইয়েই পাওয়া গেলে খুব ভাল হত। দুঃখের বিষয়, প্রতি ওয়ার্ডের বিশদ ব্যাখ্যা করতে গেলে ছাপানো, বিলি করা - এসব কঠিন হয়ে যাবে। তাছাড়া তাফসির যারা করেন তারা একেকজন একেক অ্যাঙ্গেল থেকে গবেষণা করেন। তাই সব একজায়গায় পাওয়াও সহজ হয়না। আমার কাছে এই ভাষাগত ব্যাখ্যাটা খুব ভাল লেগেছে। নোমান আলি খান এই কাজটা খুব সুন্দর করেছেন। উনার এখন পর্যন্ত করা তাফসির bayyinah.com/podcast এ পাওয়া যাবে। তাফসির ইবন কাসিরও বেশ ডিটেইল। আরেকজনের তাফসির বেশ ভাল লাগল, www.quran-tafsir.org, word for word নিজে বুঝতে চাইলে এই লিংক টা তে যেতে পারেন।http://www.studyquran.co.uk/Quran_ArabicEnglish_WordforWord_Translation.htm

এসব দেখে ভয় পাওয়ার দরকার নাই। আমি জানি রোজার সময় সবারই একটু আধটু কুরআন পড়তে ভাল লাগে, তাই একটু নতুন এপ্রোচ এ পড়তে বললাম। আর রাসুলুল্লাহ (স) এর সময় খতমে তারাবির কোন কাহিনী ছিল না কিন্তু। যে টাইমটা কুরআন খতম করার জন্য বরাদ্দ রেখেছিলেন সেটা একটা সূরা বোঝার জন্য ব্যয় করে দেখতে পারেন, ঠকবেন না।

আসছে রোজায় নতুন রেসিপি

রোজার সময় ত সবাই একটু আধটু কুরআন তিলাওয়াত করেন, এইবার একটু অন্যভাবে পড়ি চলেন।

কুরআনটা কিন্তু আর কিছুনা, আল্লাহর আমাদের সাথে কথোপকথন। কুরআন পড়ার আগে খুব ভাব নিয়ে অজু করে ভয়ে ভয়ে খুলে সুন্দর করে তিলাওয়াত করে আবার কাপড় দিয়ে মোড়ায় শোকেসের উপর তুলে রাখার বদলে এই কাজটা করতে পারেন (যেটা আমি করি) - বেশ আরাম করে কোথাও বসি যাতে পড়তে গিয়ে পিঠ ব্যথা না করে। আউযুবিল্লাহি মিনাশ ... এই দুআটা করে কুরআন খুলে অর্থ পড়া শুরু করি। আউযুবিল্লাহি দুআটা করা উচিৎ কারণ কুরআন থেকে যা শিখব তা যেন ঠিকমত বুঝি আর ইমপ্লিমেন্ট করতে পারি তার জন্যেও ত আল্লাহর সাহায্য লাগবে! এই দুআটায় আমরা শয়তানের কুমন্ত্রণা থেকে আল্লাহর আশ্রয় চেয়ে আল্লাহর নামে শুরু করছি বলি। ত আশা করা যায় আল্লাহ তখন আমাদের পড়ায় আরো অনেক বেশি blessing দিবেন।

যে কোন একটা সূরা পড়া শুরুর আগে একটু দেখে নিলেন তার সম্পর্কে summary তে কী লেখা আছে। বড় সুরাগুলির জন্য এই অংশটা খুব সাহায্য করে। যেমন সূরা বাকারা এত বড়... কোত্থেকে কই চলে যাচ্ছে তাল রাখতে পারিনা। এই আদম (আ) এর কাহিনী বলল, তারপর কতক্ষণ বনি ইসরায়েল তারপর কী কী... সব মিলায় আমি ফুল কোন মেসেজ পাইনা। লাইন বাই লাইন পড়ি, কোথাও আল্লাহ বকা দিসে, কোথাও বলসে যাকাত দাও, কোথাও গল্প শুনাইসে... পড়তে পড়তে আমার হাই উঠতে থাকে। ট্র্যাকই রাখতে পারিনা, শিখব কী? ত আমার কাছে যে কুরআন টা আছে তার ইন্ট্রো টা আগে কখনও পড়া হয়নাই। সেদিন পড়ে দেখি এই সূরাটা বিভিন্ন প্যারায় ভাগ করা। প্রথম পর্বে তিন রকম human psyche নিয়ে কথা বলেছে। সেখানে আবার সেই রকম কিছু উদাহরণ। তার পরের অংশে আল্লাহ আদম (আ) কে সৃষ্টি, তার সামনে সবাই সিজদা করা -এই কাহিনী বলেছে, এর পরেই ৪৭ আয়াত ধরে বনি ইসরায়েল। তারপর ঈসা (আ), মুসা (আ)।

মজার ব্যাপার হচ্ছে, it starts making sense when you take the organization of the sura as a continuation of the previous one. প্রথম সূরা হচ্ছে ফাতিহা। সেখানে সুন্দর করে আল্লাহর কাছে কীভাবে গাইডেন্স চাইতে হয় সেটা শেখানো হয়েছে। তুমি একটা বই পড়তে শুরু করলা গাইডেন্স পাওয়ার জন্য, সবার প্রথমে ত ঠিক এরকম কিছু থাকাই মানায়। তারপরের সূরাই বাকারা। সেখানে বলসে এই বইয়ে অস্পষ্ট কিছু নাই। কিন্তু এই সূরাটা শুরুই হইসে এমন তিনটা অক্ষর দিয়ে যার অর্থ কোন মানুষ কখনও বের করতে পারবেনা। হয়ত আল্লাহ চাইসে গাইড করার সাথে সাথে আমাদের লিমিটেশনটাও বুঝায় দিতে। তারপর উনি বলসে, কুরআনের শিক্ষা কে মানুষ তিনভাবে গ্রহণ করে। কেউ বিশ্বাস করে ও তা বোঝার চেষ্টা করে, কেউ যাই বলুক কানে তোলেনা, আবার কেউ কেউ যেটুকু পছন্দ সেটুকু নেয়, বাকিটুকু ফালায় দেয়। এরপর আদম (আ) এর সৃষ্টির কাহিনী বলসে আল্লাহ, কিন্তু পুরাটা বলে নাই। বলসে আমি পৃথিবীতে 'খলিফা' তৈরি করব। খলিফা শব্দটাই দুই রকমের অর্থ বহন করে। একটা মানে হচ্ছে যে ফলো করে, আরেকটা মানে যে প্রতিজ্ঞা ভঙ্গ করে। তারপর আদম (আ) এর জ্ঞানের বহর দেখিয়ে ফেরেশতাদের অভিভূত করা, তাদের সম্মান আদায়, বেহেশতে থাকা - এসব বলেছেন। কিন্তু ইবলিশ যে সিজদা করলনা - এইটা নিয়ে হালকার উপর ঝাপসা বলে গেছেন। তারপর বেহেশত থেকে কীভাবে প্রতিজ্ঞাভঙ্গ করে বিচ্যুত হল, সে কথা বলেছেন। এই প্যারার শেষ দুই লাইন হচ্ছে যারা আমার কথা শুনে, ফলো করে তাদের দুঃখ বা ভয় করার কোন কারণ নাই।

দেখেন, পুরাটাতেই একটা কনফ্লিকটিং নেচারের ছাপ। মানুষ বিশ্বাস করলে তার অন্তরে কী থাকে, অবিশ্বাস করলে কী হয়। খলিফা শব্দটায়, তারপর আদম (আ) এর ঘটনায়, আল্লাহ বলল তাকে শুরুতে আল্লাহ কত বড় করে তৈরি করসে, আর প্রতিজ্ঞা ভঙ্গ করে সে কই গেসে। এরপরে বনি ইসরায়েল এর কাহিনী ত আরো স্ট্রেইট ফরোয়ার্ড, তাদের কী কী নিয়ামত দেয়া হইসিল আর ওরা কী করসে তার ডিটেইল বর্ণনা আছে।

আল্লাহ আসলে একটা মেইন থিম কে বিভিন্ন ঘটনার মাধ্যমে আমাদের কাছে ব্যাখ্যা করেছেন। সৃষ্টির সময় আল্লাহর কাছে আমাদের প্রতিজ্ঞাই ছিল আমরা তার দেয়া গাইডেন্স মেনে চলব, আর অন্য মানুষদের মধ্যে ছড়িয়ে দেব। সেটা ভঙ্গ করার কারণে আমরা তার অসন্তুষ্টির শিকার হই। তখন উনিই আবার বিভিন্ন পথ বলে দিয়েছেন এই থেকে ফিরে আসার। আমার কাছে ভাল লেগেছে এত বড় আপাতদৃষ্টিতে অসংলগ্ন সূরাটার এত চমৎকার coherence টা।

ত যেটা বলছিলাম, এরকম ইন্ট্রো পড়ে তারপর সূরাটা পড়া শুরু করলে বুঝতে আরো সহজ হয়। আরবিতে তিলাওয়াত করলে করেন, কিন্তু যখন শুধু বুঝার উদ্দেশ্যে পড়বেন তখন মোটামুটি একটা ধারাবাহিকতা রেখে পড়বেন, তাতে বুঝতে অনেক সুবিধা হয়।

কুরআনের কনটেক্সট বা flow of thought যেমন মজার, word by word অর্থগুলিও অনেক মজার। যেমন সূরা মু'মিনুন এ মু'মিনের বৈশিষ্ট্য হিসেবে বলা হয়েছে 'আল্লাযিনা হুম লিয যাকাতি ফা'ইলুন'
আল্লাযিনাহুম (যারা) লি (এর মধ্যে) যাকাতি (যাকাত) ফা'ইলুন (করা) - সোজা ভাষায় যারা রেগুলার যাকাত দেয়। কিন্তু এই ফা'ইলুন হচ্ছে করা এর আরবি ভার্সন। করা এর আরেকটা আরবি হচ্ছে 'আমল। ফা'ল আর 'আমল এর মধ্যে পার্থক্য হচ্ছে ফা'ল স্বতঃস্ফূর্ত, নিঃশ্বাস নেয়ার মত, এইটার জন্য কোন ইফোর্ট দিতে হয়না। আর 'আমল হচ্ছে উদ্যোগ নিয়ে করা। যাকাত এর আরেকটা মানে যে নিজেকে পরিশুদ্ধ করা এটা ত আগেও বলেছি। তাহলে সব মিলায় কথাটা কী দাঁড়াল? যারা নিজেদের খারাপ স্বভাব কে ছেঁটে ফেলে সবসময় পরিশুদ্ধ করার চেষ্টাটাকেই স্বভাব বানিয়ে ফেলেছে তারাই মুমিন।

ত এসব মজার মজার কথাগুলি একটা বইয়েই পাওয়া গেলে খুব ভাল হত। দুঃখের বিষয়, প্রতি ওয়ার্ডের বিশদ ব্যাখ্যা করতে গেলে ছাপানো, বিলি করা - এসব কঠিন হয়ে যাবে। তাছাড়া তাফসির যারা করেন তারা একেকজন একেক অ্যাঙ্গেল থেকে গবেষণা করেন। তাই সব একজায়গায় পাওয়াও সহজ হয়না। আমার কাছে এই ভাষাগত ব্যাখ্যাটা খুব ভাল লেগেছে। নোমান আলি খান এই কাজটা খুব সুন্দর করেছেন। উনার এখন পর্যন্ত করা তাফসির bayyinah.com/podcast এ পাওয়া যাবে। তাফসির ইবন কাসিরও বেশ ডিটেইল। আরেকজনের তাফসির বেশ ভাল লাগল, www.quran-tafsir.org, word for word নিজে বুঝতে চাইলে এই লিংক টা তে যেতে পারেন।http://www.studyquran.co.uk/Quran_ArabicEnglish_WordforWord_Translation.htm

এসব দেখে ভয় পাওয়ার দরকার নাই। আমি জানি রোজার সময় সবারই একটু আধটু কুরআন পড়তে ভাল লাগে, তাই একটু নতুন এপ্রোচ এ পড়তে বললাম। আর রাসুলুল্লাহ (স) এর সময় খতমে তারাবির কোন কাহিনী ছিল না কিন্তু। যে টাইমটা কুরআন খতম করার জন্য বরাদ্দ রেখেছিলেন সেটা একটা সূরা বোঝার জন্য ব্যয় করে দেখতে পারেন, ঠকবেন না।

একটি ছোট উদ্যোগ

আসসালামু আলাইকুম। লেখাটা একটা রিপোর্ট হিসেবে শুরু করলেও মনে হচ্ছে এটা নিছক এক রিপোর্টই না। কোন ফটোব্লগ ও না। বা নিজের কীর্তিকাহিনীর খোশগল্পও না। এগুলো জীবনের গল্প। শূন্য থেকে শুরু করে একটু একটু করে উঠে দাঁড়ানোর আশা নিরাশায় ভরা টুকরো টাকরা ঘটনা।

দুই বছর ধরে দেশের বাইরে আছি। দূরে থাকায় দেশের মানুষগুলোর প্রতি আবেগ যেন আরো বেড়ে গিয়েছিল। এই যে এদেশে এসে পড়ার সুযোগ পেয়েছি, এই অর্জনের পুরোটুকু কি আমার হতে পারে? আমার দেশ আমাকে পড়ার সুযোগ করে না দিলে আমি কি কোনদিন এখানে আসতে পারতাম? না। বিনিময়ে আমি কি দেশকে কিছু দিতে পেরেছি? না।

তাই খুব সামান্য একটুখানি টাকা জমিয়ে ঠিক করেছিলাম দেশে গিয়ে ডোনেট করব। শুধু এটাই প্ল্যান ছিল, টাকা এমন কোথাও দিব যাতে তা রোজার ঈদে নতুন কাপড় বিলানো বা জেয়াফতে খিচুড়ি খাওয়ানোর মত ক্ষণস্থায়ী কিছু না হয়। আমার সঞ্চয় খুব কম হতে পারে, কিন্তু এই অর্থটুকুই যদি একটা পরিবারকে মাথা তুলে দাঁড়ানোর ব্যবস্থা করে দিতে পারে তাই বা কম কী?

আমরা মূলতঃ দুটো গ্রামে নয়টি ভাগ্যহত পরিবারে সাহায্য করার চেষ্টা করেছি। জামালপুরের নদীভাঙন কবলিত একটি গ্রামে তিনটি কিশোরী মেয়ের কারোরই পরিবারে উপার্জনক্ষম কোন সদস্য নেই। এরা সেলাই শিখতে আগ্রহী, উপযুক্ত সরঞ্জাম পেলে টেইলরিং এর কাজ শিখে রোজগার করতে পারবে। একটি সেলাই মেশিন কত দাম? পাঁচ ছয় হাজার? এই অবলম্বনটুকু না করে দিলে এরা কি একসময় শহরের গার্মেন্টস এ জড়ো হত, পরিবারের সবাইকে ছেড়ে? এই স্বস্তি নিয়ে বছর পার করত, যে বস্তির অনিরাপদ ছাউনির তলে আরো একটা রাত নিরাপদে পার হল? 



কিছু পরিবারে উপার্জনক্ষম লোক আছে, উপার্জন করার পন্থা নেই। ক্ষেত এ দিনমজুরি সবার বেলায় জোটেনা, জুটলেও তার ব্যবস্থা মৌসুমভিত্তিক। বেশির ভাগ সময়ই চিকিৎসা, মেয়ের বিয়ে - এ ধরণের বড় খরচের সময় মোটা সুদে টাকা ধার নিতে হয়। কিন্তু বান্ধা কোন আয় না থাকায় এই নিঃস্ব মানুষগুলো একদিন ভিটেমাটি খুইয়ে সর্বহারা হয়। ফলস্বরূপ, ঢাকায় আগমন, রিকশা চালিয়ে পেটে ভাতে টিকে থাকার যুদ্ধ, আর আমাদের নাসিকা কুঞ্চন, 'ইস্! এত মানুষ ঢাকায় কী করে?' এরকম গুটিকয়েক পরিবারে ভ্যান কিনে দিয়েছি, দেখা যাক, জীবনের বোঝা টানতে কতটুকু সাহায্য করতে পারে এই ভ্যান। 


এর পরেও বেশ কিছু টাকা হাতে ছিল। মানিকগঞ্জের এক মফস্বল এলাকার মধ্যবয়স্ক এক পিতার কথা বলল আমার বন্ধু। ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী। বড় মেয়ের বিয়েতে সামাজিকতা রক্ষা করতে গিয়ে নিম্নবিত্তের কাতারে নেমে এসেছেন। বাকি ছেলে মেয়েরা সবাই স্কুলে পড়ছে। কিছু মূলধন পেলে ধ্বসে পড়া টিনের ব্যবসাটা আবার দাঁড় করাতে পারেন। আমি একটু দোনোমনায় ছিলাম, উনি আর যাই হোক, না খেয়ে মরবেন ত না। উনার চেয়ে আরো অনেক needy পরিবার আছে যাদের কাছে পৌঁছান আরো অনেক বেশি দরকার। কিন্তু যখন শুনলাম উনার ছেলেমেয়ের লেখাপড়া বন্ধ হয়ে যাচ্ছে, তখন আর প্রায়োরিটিটা টাকাভিত্তিক রইলনা।

উনাকে বারোহাজার টাকা এককালীন মূলধন হিসেবে দিয়েছি, এই শর্তে, ব্যবসা দাঁড়িয়ে গেলে এই টাকাটা ফেরত দিতে হবে। আমাকে না, অন্য এক পরিবারকে স্বনির্ভর করার জন্য বিনিয়োগ করতে হবে। আমি কোন লিখিত চুক্তিপত্র করিনি। টাকাটা সামান্য, এই জন্য না। টাকাটা আমি দান হিসেবেই উনাকে দিয়েছি। কিন্তু ব্যবসায়ের পাশাপাশি উনার মানুষের প্রতি বিশ্বাসটাও যেন দাঁড়িয়ে যায় সে চেষ্টা করেছি। জানিনা কতটুকু সম্ভব হবে, তবে আমার আশা, যদি উনার পরিবারটা আবার আগের অবস্থানে ফিরে আসতে পারে, উনার ছেলেমেয়েরা শিক্ষিত হয়ে এই বিশ্বাস আর সহানুভূতির শিক্ষাটুকু তাদের চারপাশে ছড়িয়ে দেবে। 



এই লেখায় আমি আমি অনেকবার এসেছে। আসলে আমি উদ্যোগটা শুরু করেছি কেবল, টাকা, সাপোর্টসহ সবকিছুর কৃতিত্ব প্রবাসী বাংলাদেশীদের আর আমার ছেলেবেলার বন্ধু মাহমুদুর রহমান নাজমুলের। দেশে গিয়ে বাবার হঠাৎ ওপেন হার্ট সার্জারি করাতে হয়েছিল, তাই ওর জিম্মায় টাকাটা ছিল। নাজমুল একাই ঘুরে ঘুরে লোকজন খুঁজে বের করেছে, জিনিসপত্র কিনে দিয়ে এসেছে। সবার আন্তরিকতায় খুব ছোট উদ্যোগও কত সুন্দর হয়ে উঠতে পারে! আপনাদের সবাইকে বিনীত অনুরোধ, এই শুভ্র অন্তরটাকে বাঁচিয়ে রাখবেন সবসময়, যত যাই হোক।

[শামস্ এর অনুরোধে তার ফান্ড রেইজিং এর উপর একটা ছোট্ট রিপোর্ট লেখার কথা ছিল। কিন্তু কখন যে এতবড় গল্প লিখে বসেছি, টেরই পাইনি। শামস্ কে তার উদ্যোগের জন্য স্যালুট।] 

Saturday, July 16, 2011

আলোর দিশারী

আমার নোট লেখার শুরু মোটামুটি এক বছর আগে। অপুর নোট পড়ে খুব ভাল লাগত, কত সহজ ভাষায় কত দরকারি কথাগুলো বলে ফেলছে। আমারও মনে হত আমিও যদি ওর মত লেখালেখির মাধ্যমে অনেক মানুষের কাছে পৌঁছাতে পারতাম! কিন্তু ইসলাম নিয়ে লেখার দুঃসাহস করার আগে ত তা সম্পর্কে জানতে হবে! একটা ঢোঁক গিললাম। আমি কি কখনও 'যথেষ্ট জেনেছি' বলতে পারব? কেউই ত পারবেনা! তাহলে কি কোনদিনই লিখতে পারবনা? কতটা পথ পেরুলে তারে পথিক বলা যায়? কতটা বাধা ডিঙালে আলোর দিশারী হওয়া যায়? 

আমার বাবার একটা স্বভাব হচ্ছে সব অসম্ভবের মধ্যে সে সম্ভাবনা দেখে। অন্যরা সাহায্য করুক আর সমালোচনাই করুক। বাবার এই ইয়ে আমার ভেতরেও চলে এসেছে। ভেবে দেখলাম, অদূর বা সুদূর ভবিষ্যতে স্কলার হওয়ার মত প্রস্তুতি আমার নেই। সুতরাং শুরু করতে হলে যা আছে তা দিয়েই করতে হবে। আমি একেবারেই মধ্যবিত্ত পড়াশুনা-সম্বল একটা আধুনিক পরিবারে বড় হয়েছি, আমার মত মন মানসিকতার হাজার হাজার ছেলেমেয়ে পাবলিক আর প্রাইভেট ইউনিভার্সিটিতে আছে। ফ্যামিলি কালচারে ভিন্নতা থাকার কারণে স্বাধীনতা কারো একটু বেশি ছিল, কারো কম। কিন্তু সবারই লক্ষ্য ভাল রেজাল্ট করে বের হতে হবে, ভালভাবে সেটলড হতে হবে। এই গতানুগতিক 'এইম ইন লাইফের' স্রোতে আমিও চলছি, তাই আমি জানি এই মানুষগুলো ভালভাবে বাঁচতে চায়, শান্তিতে থাকতে চায়। কিন্তু শান্তি রক্ষা করার জন্য যে স্ট্রাগলটুকু করতে হয় সেটার ট্রেইনিং পাওয়ার সুযোগ তাদের হয়নি। এখন সত্যিকারের সমস্যায় এসে যে যার যার বিবেকবুদ্ধি অনুযায়ী সলভ করার চেষ্টা করছে। অথবা নিজের চিন্তাভাবনাগুলি বদলে নতুনভাবে সবকিছু দেখার চেষ্টা করছে। 

আলহামদুলিল্লাহ এই প্রসেসের মধ্যে পড়ে আমি বরাতজোরে ইসলামের মধ্যে সলিউশন খুঁজেছি। একবার বাসায় গল্পের বই পাচ্ছিলাম না তাই হাদীসের বই নামিয়ে পড়ে ফেলেছিলাম - ঐ একবারের পড়া থেকেই টুকটাক বিভিন্ন কাজে এক একটা প্রাসঙ্গিক হাদীস মনে পড়ে যেত। যেমন একবার খুব ঠান্ডা লাগায় আম্মু বিদেশ থেকে কলিগের দেয়া একটা ঠান্ডার ওষুধ আমাকে খেতে বলেছে। আমি খাইনি, পরে আম্মু বলল, 'তুমি এখনই একটা ওষুধ খেয়ে ফেল।' খেলাম। আধ ঘন্টার মধ্যে এলার্জিতে সারা মুখ, হাত পা ফুলে একাকার। আম্মু পরে আমাকে বলছিল, আমি বললাম আর তুই তক্ষুণি খালি পেটে খেয়ে ফেললি? তখন আম্মুকে এই হাদীসটা শোনালাম যে, রাসুলুল্লাহ বলেছেন, বাবা মা যেন সাধারণ বিষয়ে সন্তানদের সরাসরি আদেশ না দেন। কারণ কোন কারণে সন্তান যদি সে আদেশ পালন না করে তাহলে আল্লাহর কাছে জবাবদিহি করতে হবে। সে জন্য বাবা মায়ের উচিৎ উপদেশ এর মত করে বলা। এই রকম আরো, রাসুলুল্লাহ (স) যেভাবে খুব নরম আচরণ করতেন, সবাই কথা বলতে কমফোর্ট ফিল করত, স্ত্রীরা মেজাজ খারাপ থাকলে চিল্লাচিল্লি করতেও ভয় পেতনা - এইসব ছোট ছোট অনেক কথা মনে পড়ে যেত। ওখান থেকেই ইসলাম - ওয়ে অব লাইফ - এর ব্যাপারটা কী জানার আগ্রহ হল। 

এই যে আগের সময়টার সাথে এখনকার সময়ে চিন্তা ভাবনার আকাশ পাতাল পার্থক্য, বা গতানুগতিক জীবনধারার সাথে ইসলামিক মতাদর্শের শার্প কনট্রাস্ট - এই জিনিসগুলি আমাকে খুব খুব প্রভাবিত করেছিল। আমার ডায়রিতে লেখা কয়েকটা কথা - 

"আমার আজকাল নিজেকে জন্মান্ধ মনে হয়, যার এই মাত্র অপারেশন করে চোখ দেয়া হয়েছে। পাগলের মত এই ওয়েবসাইট থেকে সেই ওয়েবসাইট ঘাটি, একদিন ব্যস্ততায় টক শুনতে না পারলে অস্থির লাগে। মনে মনে বলি, আল্লাহ, তোমার সৃ্ষ্টির সবচাইতে সুন্দর জিনিসটা বোধহয় নলেজ, জ্ঞানের সৌন্দর্যে আমি অন্ধ হয়ে গেছি। ।আল্লাহ! তুমি মানুষের জন্য এত সুন্দর একটা জিনিস তৈরি করে রেখেছ? in my mind, everything starts making sense, i see a problem, i try to understand, i try to look for a solution, and i find it, in my dreams, or during prayer, or while doing household works. আমি কী বলব? আমি সারাটাক্ষণ অভিভূত হয়ে থাকি, আমার চোখে পানি চলে আসে, মনে হয, সবাইকে ধরে ধরে বলি, তোমরাও দেখ, দেখতে পাচ্ছনা?" 

আস্তে আস্তে আরো অনেক প্র্যাক্টিসিং মুসলিমের সাথে মিশে দেখলাম, আমার ইউনিকনেস এটাই। আমি যেভাবে কমপেয়ার করে দেখছি, বা আগের থেকে এখনের ট্রানজিশনটা খুব ভাল করে ফিল করছি, সবসময়ই প্র্যাক্টিস করে আসা অনেক মুসলিম ভাই বোনদের মধ্যে ওই বোধটা ফিকে হয়ে গেছে। আমারো হয়ত হয়ে যাবে, সুতরাং আমাকে এখনই লিখতে হবে। এই চিন্তাগুলি কিছুদিন পরে নাও থাকতে পারে! 

আলহামদুলিল্লাহ, আমার ছাতা মাথা লেখার প্রতিক্রিয়া দেখে আবারো বুঝলাম আল্লাহ তিল থেকে শুধু তেল আর তাল না, তিলোত্তমাও বানায় ফেলতে পারে। গত একমাসে কত... আপু ভাইয়া যে মেসেজ করে আমাকে কৃতজ্ঞতা জানিয়েছেন - আমার ভয় লাগসে, এত এত ভালবাসা পাইতেসি, আমি কি এখন মরে টরে যাব? আই মিন দুনিয়ায় ত এর বেশি ভালবাসা পাওয়া সম্ভব না, তাইলে কি পৃথিবীর কাছে আমার পাওনা শেষ? বা যা পাওয়ার আল্লাহ সব এইখানেই দিয়ে দিল? কবরে ফড়ে ফক্কা? 

ইনশাল্লাহ, স্কলার হওয়ার চেষ্টা শুরু করব, কারণ মুসলিমের কাছে আল্লাহর প্রথম কমান্ডই আসছে পড়তে বসার (ঠিক যেন আম্মু, পড়, পড়, পড়...) কিন্তু ঐ ছুতায় আল্লাহ এখন পর্যন্ত যে জ্ঞান আর সুযোগ সুবিধা দিয়েছেন তার বিনিয়োগ ত বন্ধ রাখা যায়না! আমাদের সবার জন্যই ত একই কথা। ঠিক আপনার মত পড়াশুনা, আপনার মত ফ্যামিলি, আপনার মত ফ্রেন্ড সার্কেল, আপনার মত করে চিন্তা করা আর একজন মানুষ কি এই পৃথিবীতে আছে? 

ইয়াসির কাজী দাওয়াহ বিষয়ক একটা লেকচার এ খুব সুন্দর একটা কথা বলেছিলেন। 'এই রুমটাতে পাঁচ হাজার লোক আছে। ধরুন এই রুমের সব বাতি একটা সুইচ দিয়ে জ্বালান হয়, কোন কারণে সে সুইচটা অফ হয়ে গেল। এখন এই পাঁচ হাজার লোক কী করবে? সুইচ কই, কে জ্বালাবে - এসব বলে অপেক্ষা করতে থাকবে? আপনাদের প্রত্যেকেরই ত সেলফোন আছে। বাতি নিভে গেলে প্রত্যেকে তাদের সেলফোনটা মাথার উপর উঁচু করে ধরুন। পাঁচ হাজার মৃদু আলো এক হলে এই ঘরটায় কি আর অন্ধকার থাকবে?'