Wednesday, August 29, 2012

সেল্ফ এস্টিম পর্ব ৫: এস্টিম ধ্বংসকারী চিন্তাগুলো

গত কয়েক পর্ব মন দিয়ে পড়লে আশা করা যায় ক্রিটিক কে ভাল করে চেনা, ও তার সাথে ফাইট করার একটা মোটামুটি আন্দাজ হয়ে যাবে। ক্রিটিক কে চেনার ও বোঝার শেষ নেই। যতই চেনা যাবে, ততই মাথায় হাত দিয়ে ভাবতে হবে, হায় আল্লাহ! আমি ত এগুলোর সবগুলোই করি! হ্যা, ক্রিটিক অমনই চতুর। কখনও লজিক, কখনও ইনটুইশন, কখনও পর্যবেক্ষণের ভেক ধরে মনের ভেতর হানা দেয়। বস্তুতঃ একটা বাস্তব ঘটনাকে অবাস্তব পন্থায় বিশ্লেষণ করার এই পুরো প্রক্রিয়াটাই ক্রিটিক ভদ্রলোকের ছলচাতুরি ছাড়া আর কিছু না। এই পর্বে ক্রিটিকের কয়েকটা অতিপরিচিত কৌশল আলোচনা করা হবে। 

১. ওভারজেনারালাইজেশন: একটা ঘটনা থেকে পুরো পৃথিবীর সমুদয় ঘটনার প্রতি জেনারেল ধারণা করা। একটা ইন্টারভিউ খারাপ হল, ধরে নেয়া, আমি জীবনেও ভাল ইন্টারভিউ দিতে পারব না। একবার প্রেজেন্টেশনে হাঁটু কাঁপল, ঘোষণা করে দেয়া, বক্তৃতা আমার জন্য না। 

ক্রিটিক ওভারজেনারালাইজেশন টেকনিক ব্যবহার করছে কিনা তা বুঝতে পারবেন যদি সে ঘন ঘন 'never', 'always', 'all', 'every', 'none', 'nobody', 'everyone', 'everybody' - এই শব্দগুলো ব্যবহার করতে থাকে। 


২. গ্লোবাল লেবেলিং: একটা ঘটনা থেকে পুরো ব্যক্তিত্বটার উপরে একটা জেনারেল ধারণা করা। যেমন, ভাইভা বোর্ডে ভাল উত্তর দিতে পারলাম না, 'আমি একটা স্টুপিড, আনস্মার্ট গাধা।' ওভারজেনারালাইজেশনের মতই, তবে এখানে ঘটনার বদলে মানুষটাকে বাজে বাজে বিশেষণ দেয়া হয়। 

গ্লোবাল লেবেলিং হচ্ছে কিনা বুঝতে পারবেন, যদি আপনার ক্রিটিক আপনার চেহারা, পারফর্মেন্স, বুদ্ধিমত্তা, সোশ্যাল স্কিল নিয়ে কমন, আজেবাজে মন্তব্য করতে থাকে। এই যেমন, 'আমি একটা অকর্মণ্য কুঁড়ে অলস', 'আমি কিছুই পারিনা', 'আমাকে দিয়ে কিছু হবেনা', 'আমি একটা স্পাইনলেস', 'আমার ফ্যামিলি একটা আজাব।' 


৩. ফিল্টারিং: এই প্রক্রিয়ায় ক্রিটিক বাস্তব ঘটনার সবগুলো আলো শুষে নিয়ে কেবল অন্ধকারটাই দেখায়। আপনি কেবল বিশেষ কয়েকটা মন্তব্যই শুনতে পাবেন, বাকিগুলো কর্ণকুহরে প্রবেশও করবে না। একটা ফাটাফাটি প্রেজেন্টেশন দিলেন, বস একফাঁকে বলল, তোমার বক্তব্যে coherence কম। ব্যাস! এত বছর ধরে প্রেজেন্টেশন দিয়েও যদি একটা গুছানো প্রেজেন্টেশন দিতে না পারি, তাহলে করছি টা কী? এই নিয়ে মন খারাপ, ছোট হয়ে থাকা, আপসেট থাকা, লেবেলিং করা... ইত্যাদি ইত্যাদি। এদিকে বস যে এতগুলো তথ্যের উপস্থাপনকে প্রশংসা করলেন, প্ল্যানটা সুন্দর বললেন, এত পরিশ্রমের জন্য ধন্যবাদ দিলেন - এগুলো মনের কোথাও ঠাঁই পেলনা। 

ফিল্টারিং হতে থাকলে প্রশংসাগুলো মনে হতে থাকে বানিয়ে বানিয়ে বলা, আর সমালোচনাগুলো অনেক মৃদু আকারে বলা। এক ফোঁটা সমালোচনা তখন বড় একটা কাজের ফলাফলকে ম্লান করে ঐ অতটুকুর মধ্যেই নিয়ে আসে। 


৪. পোলারাইজড থিংকিং: পোলারাইজড চিন্তাভাবনায় পৃথিবীটা আপনার কাছে সম্পূর্ণ সাদা আর কালো। প্রতিটা ঘটনা, কাজ হয় মন্দ নাহয় ভালো। আপনি নিজেকে সাধু নয় চোর, সফল বা লুজার, হিরো বা ভিলেইন - এভাবে চিত্রিত করে ফেলেন। 

মনের ভেতর ভাবনাগুলো যদি এমন হয়, 'স্কলারশিপটা না পেলে আমার জীবন শেষ', 'বউ ভাল না বাসলে বেঁচে থেকে আর লাভটা কী'... তবে বুঝবেন আপনি পোলারাইজেশন জ্বরে আক্রান্ত। 


৫. সেল্ফ ব্লেইম: সব ঘটনার দোষ আপনার। সবকিছুর জন্য আপনি পরোক্ষভাবে হলেও দায়ী। নিদেনপক্ষে আপনার ভাগ্য দায়ী। রাস্তায় অভাবনীয় জ্যামের কারণে মিটিং এ দেরি হল, আপনার দোষ। আপনার স্বামী আপনার সাধের এক্সপেরিমেন্টের রান্নাটা পছন্দ করল না, আপনার দোষ। 

সেল্ফ ব্লেইম আপনার ভাল দিকগুলোর ব্যাপারে আপনাকে পুরোপুরি অন্ধ করে দেয়। আপনার চালানো তিনটি প্রজেক্টের দুটি সফল আর একটি চরমভাবে ব্যর্থ হলে আপনি আজীবন তৃতীয়টির জন্য নিজেকে দায়ী করে গেলে, আর বাকি দুটোর জন্য সমভাবে গর্ববোধ না করলে আপনার মাঝে সেল্ফ ব্লেইম রোগ আছে। 


৬. পারসোনালাইজেশন: পার্সোনালাইজড জগতে আপনি নিজেই আপনার জগত হয়ে বসে থাকেন। প্রতিটা ঘটনাই যেন আপনাকে ঘিরে আবর্তিত। কিন্তু আপনার হাতে কোন কন্ট্রোল নেই। আপনি হতভাগা, সবাই আপনাকে কষ্ট দেয়। 

পারসোনালাইজেশনের মধ্যে একধরণের সেল্ফ অবসেশন বা নার্সিসিজম আছে। ঘরভর্তি মানুষের মধ্যে ঢুকলেন, সাথে সাথে আর সবার সাথে তুলনা করা শুরু করে দিলেন, কে আমার চেয়ে বেশি স্মার্ট, কার চেহারা বেশি ভাল, ইত্যাদি ইত্যাদি। কেউ বলল, 'ভাল লাগছে না', আপনি ধরে নিলেন আপনার সাথে তার বিরক্ত লাগছে। 


৭. মাইন্ড রিডিং: আমি অন্যের ভাব বুঝতে পারি। সে কী ভাবছে আমি জানি। আমি থিসিস দেরি তে জমা দিলাম, সুপারভাইজরের থমথমে ভাব। পরিষ্কার বলে দেয়া যায় তিনি আমার উপর বিরক্ত। আমার শাশুড়ি জানতে চাইলেন এতক্ষণ কোথায় ছিলাম। তার মানে উনি হিসাব চাচ্ছেন আমি কোথায় কোথায় গিয়ে ঘরের কাজ ফাঁকি দিচ্ছি। 

মনের মধ্যে যদি, 'আমি জানি', 'আমি শিওর', 'আমার মনে হচ্ছে', 'আমি এগুলি ভাল বুঝি' - ইত্যাদি ইত্যাদি চিন্তা আসে, তাদের ঝেঁটিয়ে বিদেয় করে দিন। এসব আপনার সাইকিক পাওয়ার না, ক্রিটিকের হাতিয়ার। 


৮. ইমোশনাল রিজনিং: প্রবল দুঃখের সময় আবেগতাড়িত হয়ে সিদ্ধান্ত নেয়া। কোন ঘটনায় ক্রিটিক হয়ত এসে কানে কানে বলল, 'কুঁড়ে, অলস।' আপনার হালকা একটা মন খারাপের ভাব হল। মন খারাপ ভাবটা বাড়তেই থাকল। 

ক্রিটিক এইবার আবার এসে বলবে, 'তুমি যা মনে কর, তুমি ত তাই। তোমার নিজেকে অলস মনে হচ্ছে, তুমি ত আসলেই অলস।' এর মধ্যে আপনি হয়ত ভুলেই বসে আছেন, 'অলস' আপনি আপনাকে বলেন নি, ক্রিটিক বলেছে। এই পুরো চিন্তার শুরুটা ক্রিটিক কে দিয়ে। মাঝপথে মন খারাপকে পুঁজি করে ক্রিটিক আপনার সেল্ফ এস্টিমটাকে নাড়া দিয়ে গেল। 


Ref: Self Esteem by McKay and Fanning

সেল্ফ এস্টিম পর্ব ৪: ক্রিটিক কে মোকাবেলা

ক্রিটিকের সাথে ফাইট করার বেস্ট উপায় হচ্ছে তার উদ্দেশ্য, অভিসন্ধি বুঝে ফেলা। এই যেমন একটা সিগারেট কোম্পানি যদি গবেষণা টবেষণা করে বের করে যে তামাকের সাথে ফুসফুসের ক্যান্সারের কোন সম্পর্ক নেই, আমরা স্বভাবতই বিশ্বাস করতে চাইব না, কারণ তার উদ্দেশ্যই ভাল ছিলনা। আর উদ্দেশ্য অসাধু থাকলে কাজের মধ্যে কতরকমের ভুল জিনিস ঢোকানো যায়, তা সদ্য একটা প্রাইভেট ইউনির বিজ্ঞাপন দেখলেই বোঝা যায়। 

ত তৃতীয় পর্ব থেকে আমরা ত জেনেছিই ক্রিটিকের মূল উদ্দেশ্য কীভাবে খুঁজে বের করতে হবে। এবার আসি জানার পরেও মগজের ভেতর তার কথোপকথন কীভাবে বন্ধ করা যায়। 

প্রথমে সবচেয়ে কঠিন পন্থাটাই বলি। ক্রিটিকের সাথে কথা বলা। কীভাবে, একটা উদাহরণ দিচ্ছি: 

আমার পরিচিত এক ছোট আপু বিভিন্ন সমস্যার কারণে দু'বছরের মাস্টার্স কোর্সটায় সেরকম কাজ করতে পারেনি। সময় শেষ হওয়ার পর তার এখন এতই খারাপ লাগছে, সে ঠিক করেছিল দু'বছরে যত টাকা স্কলারশিপ হিসেবে পেয়েছে সেটা ফেরত দেয়ার অফার করবে। তাছাড়া যতবারই পুরনো নিজের সাথে এখনকার নিজেকে মেলায়. মন থেকে ক্রিটিক বারবার করে বলে, 'আমি কিচ্ছু পারব না, আমার সব শেষ হয়ে গেছে, আমার কত সখ ছিল পিএইচডি করব, সোশ্যাল ওয়ার্ক করব, আমি কিছুই করতে পারিনা, আমার কোন যোগ্যতাই নেই... ইত্যাদি ইত্যাদি।' তার অবস্থা এমন হয়ে গিয়েছিল, যে কোন ব্যাপারে উদ্যোগ নেয়ার সাহসটাই তার চলে গিয়েছিল, নিজের সম্পর্কে ভাল চিন্তা করতে, একটু খুশি হতেও তার অপরাধবোধ হত। হতাশার চেয়েও বেশি অপরাধবোধ আর আত্মবিশ্বাসের অভাব তাকে শেষ করে দিচ্ছিল। 

ক্রিটিক কে মোকাবেলা করার জন্য তাকে কিছু টিপস দিয়েছিলাম - 

প্রথমেই পারিবারিক সমস্যাগুলোতে সে যেভাবে হাল ধরেছে সেদিকে উল্লেখ করে বললাম, এগুলো তোমার মানসিক শক্তি নির্দেশ করে। এ বিষয়টা নিয়ে মোটামুটি তার সাথে বেশ খানিকটা কথা বলে তাকে কনভিন্স করলাম যে একজন স্বাবলম্বী মানুষ হিসেবে তার অনেক গুণ আছে এপ্রিসিয়েট করার মত। একাডেমিক লাইফে এই গুণগুলোর অনেকগুলিই দরকার পড়ে। এরপর তাকে কিছু মেন্টাল এক্সারসাইজ দিলাম, নিজেকে প্রশ্ন করতে - 

- আমাকে দিয়ে কিছু হবেনা, এই কথার ভিত্তি কী? 
- আমি দুই বছর কোন রিসার্চ করি নি। 

- কেন করনি? পারনা দেখে? 
- না, বিভিন্ন সমস্যার কারণে 

- এখন সমস্যা না থাকলে করতে পারবে? 
- মনে হয় পারব। 

- তার মানে তুমি পারনা এই কথাটা ঠিক না, বলতে পার সুযোগ হারিয়েছ। 

তারপর আবারো প্রশ্ন কর - 

- আমার পক্ষে কি পাগলের মত কাজ করে ডিগ্রীটা নেয়া সম্ভব? 
- হ্যা/ না 

- যদি সম্ভব না হয়, তাহলে অন্য জায়গায় মাস্টার্স/পিএইচডির জন্য চেষ্টা করা সম্ভব? 
- হ্যা/ না 

- যদি মাস্টার্স/পিএইচডি না করি, তাহলে কি আমার পক্ষে মানুষের জন্য কাজ করার সব সুযোগ শেষ হয়ে যাবে? আমার জন্য কোনটা বেশি হতাশার? ডিগ্রী না পাওয়া, নাকি মানুষের জন্য কাজ করতে না পারা? যদি ডিগ্রী না থাকে তাহলে অন্যান্য আর কী কী উপায়ে আমি কাজ করতে পারি? তার সুবিধা অসুবিধাগুলো কী? 



ত এই পরামর্শ অনুযায়ী সেই বোন আরো সুন্দর করে কাজটা করেছে। প্রথমেই ট্র্যাক করেছে তার কোন সিদ্ধান্ত কোন ঘটনার উপর ভিত্তি করে করা। এই যেমন বোর্ড পরীক্ষার সময় যে কোন সমস্যা উপেক্ষা করে ঠিকই ভাল করেছে, এখন পারছে না, তার মানে তার আগের গুণগুলো আর নেই। সে যখন বলতে গিয়েছে, এখন ত সমস্যা আগের চেয়ে অনেক বেশি ছিল, মন তাকে উল্টো বুঝিয়েছে, কাজ না পারলে সবাইই অমন বলে। 

দ্বিতীয়ত, কাজ করেনি, এই অপরাধবোধ থেকে তার এ ধারণা হয়ে গেল, সে শুধু টাকা নষ্ট করেছে, আর এখন এর প্রায়শ্চিত্ত করতে তাকে হন্যে হয়ে টাকা রোজগার করতে হবে, ফেরত দেয়ার জন্য। মাঝখান থেকে মাস্টার্স যে করা আর সম্ভবই না, সেটা নিশ্চিত করে ফেলল ক্রিটিক ভদ্রলোক। 


ত এবার যখন ক্রিটিক তাকে বলল, 'আমি কিছু পারবনা', তখন সে উল্টো বলল, আমার এই এই গুণগুলো আছে, কেন বলছ পারবনা? ক্রিটিক মিনমিন করে বলল, দুই বছর ত পারনি। সে উত্তর দিল, 'হুম! কিন্তু এই দুই বছরে আমি অনেক মানসিক শক্তি অর্জন করেছি। প্ল্যান না করে, চেষ্টা না করতে দিয়ে কেন আগে থেকেই বলছ পারব না?' 


ব্যাস! ক্রিটিক চুপ! 


এর পরের ঘটনা আরো চমৎকার, লেখার লোভ সামলাতে পারছি না। সেই আপু থিসিস এর পুরো প্রেশারটাকে ছোট ছোট ভাগ করে পাঁচটা জার্নাল পেপার লেখার মত করে নিল। রিয়েলিস্টিক প্ল্যান, কবে কোথায় সাবমিট করবে, এরকম করে প্ল্যান। 

গুছিয়ে সুপারভাইজরের কাছে প্রেজেন্ট করল, কীভাবে কোন কাজটা করতে চাইছে। সুপারভাইজর এরকম এপ্রোচ দেখে জানাল কন্সেপ্টটা বুঝতে ও বেশ খানিকটা সময় নিলেও, উনি ওর প্ল্যানিং এ খুবই খুশি। আগ বাড়িয়ে বললেন তার কাছে পিএইচডি করার জন্য। শুধু তাই না, এরই মধ্যে ওর দুটো কনফারেন্সে পেপার অ্যাক্সেপ্টেড হয়েছে, অন্যসময় হলে সে হয়ত ভাবত, কনফারেন্স পেপারই ত, জার্নাল পেপার ত আর না - কাজের কাজ না করে এসব করে কী হবে? কিন্তু এখন সে এই ঘটনাগুলোকে স্টেপিং স্টোন হিসেবে নিচ্ছে। 


ক্রিটিক এত নাজুক, যে ঘুরে দাঁড়ালে তার ক্ষুদ্রতা দেখে রীতিমত দুঃখ হয়। হ্যারি পটার এ অমন ছিল না - যার যার ভয়গুলো এক একটা রূপ নিয়ে আসে, তারপর মন্ত্র পড়ে রুখে দাঁড়ালেই হাস্যকর হয়ে যায় - ঠিক একই কাহিনী। আমরা সবাই ক্রিটিকের সাথে ফাইট করার যোগ্যতা রাখি, এতে কোন সন্দেহ নেই। সাহসটা রাখি ত?

সেল্ফ এস্টিম পর্ব ৩: ক্রিটিক কে জানা

আগের দুটো পর্বে ক্রিটিক কে এবং আমরা কেন ক্রিটিক কে প্রশ্রয় দেই তা নিয়ে আলোচনা করেছি। ক্রিটিক কে প্রশ্রয় দেয়ার আরেকটা প্রচ্ছন্ন কারণ হচ্ছে, সে সবসময় আমাদের স্ট্যান্ডার্ডটাকে সর্বোচ্চ ধরে তার চেয়ে একটু কম হলেই বকাবকি শুরু করে। আমরা সেই বকুনি খেয়ে সচেতন হয়ে মাঝে মধ্যে যদি সে স্ট্যান্ডার্ড কে ছুঁতে পারি, তখন মনে খুব শান্তি হয়। ক্রিটিক আমাদের অবাস্তব পারফেকশনিস্ট হওয়ার আকাঙ্ক্ষাকে পুঁজি করে অল্প অল্প করে সেল্ফ এস্টিমের বারোটা বাজায়। 


ক্রিটিক কে মোকাবেলা করার তাই প্রথম ধাপ, ক্রিটিক কে ভাল করে জানা, তার কথা মনোযোগ দিয়ে শোনা। অনেক সময় এই চিন্তাগুলি বিদ্যুতের মত এক ঝলকে আসে আর মনে এত গভীর ছাপ রেখে যায়, যে আমরা বুঝেই উঠতে পারিনা এই চিন্তাটা আরোপিত। 


ক্রিটিক কে চিনতে হবে, বুঝতে হবে। কোন উদ্দেশ্যে সে কোন কথা বলে, সেটাও ভাল করে জানতে হবে। এর জন্য একটা ছোট্ট এক্সারসাইজ দিচ্ছি। শুধু পড়ে রেখে দিলে হবে না, খাতা কলমে বসে সত্যি সত্যি করতে হবে। 


এক দিনে সকাল থেকে ঘুমাতে যাওয়ার আগ পর্যন্ত আত্মধিক্কার টাইপ কী কী চিন্তা আসে ভাল করে খেয়াল করুন, তারপর কাগজে সময় দিয়ে লিখে রাখুন। যেমন, আমি যে বইটা থেকে পড়ছি, সেখানে একটা উদাহরণ আছে, ২৪বছর বয়সী এক স্কুল টিচারের একটা লিস্ট: 


১. সকাল ৮:১৫ প্রত্যেকটা দিন দেরি করে আসি, হেডমাস্টার আমাকে নিয়ে পুরাই হতাশ 

২. ৮:৪০ লেসন প্ল্যানের কী ছিরি! আল্লাহ! আমি এত্ত অলস কেন? 

৩. ৯:৩০ বাচ্চারা ত কিছুই শিখছে না... আমি করছিটা কী? 

৪. ৯:৪৫ টিফিন ব্রেকে বাচ্চাদের সাথে আমিনার মা কে না পাঠিয়ে জমিলাকে পাঠালাম কী বুঝে? জমিলা বাচ্চাদের হ্যান্ডেল করতে পারেনা এটা আমি জানিনা? 

৫. ১০:০০ আমি কীরকম টিচার? বাচ্চারা ত কিসুই শিখতেসেনা। 

৬. ১২:১৫ কলিগদের সাথে এরকম উজবুকের মত কমেন্ট করলাম? 

৭. ১২:২০ আমি এত্ত ছাগল কেন? 

৮. ২:২০ ক্লাশ ত না, পাগলা গারদ সামলালাম। আমি কবে ক্লাশ ম্যানেজ করা শিখব? 

৯. ২:৩৫ ছুটির পরে বাচ্চাদের কয়েকটা ড্রয়িং ওয়ালে ঝুলালে ত পারি! এরকম অগোছালো কেন আমি? 

১০. ৩:১০ পুরা ইডিয়টের মত গাড়িটা পার্ক করলাম, বাঁকা করে। 

১১. ৩.৪০ বাসার অবস্থাটা দেখ! নাইস হাউজকিপিং!! 


যত বেশি খেয়াল করবেন, তত ভাল লিখতে পারবেন। দিনে অন্তত দশবার ক্রিটিককে চিনে লিখতে পারলে নিজেকে বাহবা দিন। 


তারপর ঘুমাতে যাওয়ার আগে আরেকটা ছোট্ট কাজ করুন। কোন চিন্তাটা কোন উদ্দেশ্যে এসেছে সেটা লিখে ফেলুন। এই যেমন এই উদাহরণে ২,৩,৪,৫,৮,১০,১১ আপনার পারফর্মেন্স আরো ভাল করার হতে পারত - এই চিন্তা থেকে এসেছে (এই যেমন ৮ নম্বর পয়েন্টের ক্রিটিসিজম এর কারণে আপনি হয়ত একসময় অন্য টিচারদের সাথে ক্লাশ ম্যানেজ করা নিয়ে কথাবার্তা বলবেন।) ১,৬,৭, ৯ হচ্ছে মূলত আপনি যাতে কারো কোন মন্তব্যে আঘাত না পান, তার জন্য আগে থেকেই প্রস্তুত করে রাখা। যেমন ৬ আর ৭ এসেছে অন্যেরা কী বলবে সে ভয় থেকে। 


এভাবে ক্রিটিক কে তার উৎসের একেবারে মূল থেকে চেনা শুরু করলে লড়াই করা সহজ হয়ে যায়। 


Ref: Self Esteem by McKay and Fanning

সেল্ফ এস্টিম পর্ব ২: সুহৃদ ক্রিটিক

রূমানার আজকে ক্লাসে প্রথম প্রেজেন্টেশন। তার উপর নিয়ম শাড়ি পরে যেতে হবে। এমনিতেই শরীরের আকার প্রকৃতি নিয়ে তার চরম লজ্জা, তার মধ্যে শাড়ি পরে কী বেঢপই না দেখাবে তাকে। আবার জীবনে সে কোনদিন ইংরেজিতে বকবক করেনি, কী বিদঘুটে একটা ভজঘট পাকাবে... ভাবতে ভাবতে গলা শুকিয়ে, চোখে পানি এসে, কথাবার্তা সব গুলিয়ে ভীষণ বাজে অবস্থা। এই অবস্থায় ক্লাসে পৌছতে ছয় মিনিট লেট হল। ক্লাসে ঢোকার সময় পঁয়তাল্লিশ জোড়া চোখ তার দিকে ঘুরে গেল। 
"হায় আল্লাহ! আমি একটা 'লুজার', আমি কিচ্ছু পারি না, আমি বিশ্রী, আনস্মার্ট, কথাই ঠিকমত বলতে পারিনা, একটা শব্দ বলে দুইবার 'আম.. আম...' করি। কী? আমার সমস্যাটা কী? আমাকে দিয়ে কিচ্ছু হবে না, কিচ্ছু না! যত চেষ্টাই করি না কেন, আমি এরকম জলজ্যান্ত ফেইলিউর হয়েই থাকব। আমার বাবা মার অযোগ্য সন্তান আমি। তারা যে আমাকে পেলেপুষে বড় করেছে সেই অনেক বেশি। তাদের জন্য জীবনে ত কিছু করতে পারব না, তার চেয়ে ওনাদের চোখের সামনে যেন বেশি পড়তে না হয়, এমন করে থাকি' 


রূমানার এই চিন্তাগুলো সবই সেল্ফ ক্রিটিক থেকে আসা। সেল্ফ ক্রিটিক একটু একটু করে আত্মবিশ্বাসটুকু ধ্বসিয়ে দেয়। তারপরেও মানুষ অবচেতনভাবে তার কথা বিশ্বাস করে। সেল্ফ ক্রিটিক চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিলেও অনেকে এর থেকে বের হয়ে আসতে অস্বীকৃতি জানায়। কারণ ক্রিটিক ভদ্রলোক খারাপ বোধ করালেও এর একটা সুবিধাজনক দিক আছে। আপনার মনের না জানা হিসাব নিকাশ আপনাকে না জানিয়েই তাই ক্রিটিক কে পরম সুহৃদ গণ্য করে নেয়। 


কী ধরণের সুবিধা একটু বুঝিয়ে বলি। 


রূমানার জন্য শাড়ি পরা একটা নতুন ঘটনা। ক্লাশে প্রায় পঞ্চাশজন মানুষের সামনে প্রেজেন্ট করাও নতুন ব্যাপার। যে কোন নতুন পরিবেশে আমরা একটু ভয় পাই, কারণ আমরা জানি না সেখানে কী ধরণের ঘটনা ঘটবে। সাধারণ মানুষ বিচার বুদ্ধি দিয়ে হিসাব নিকাশ করে খারাপ কিছু ঘটবে এমন প্রস্তুতি নিয়ে, খারাপ ঘটলে কীভাবে ওভারকাম করবে.. এমন প্ল্যান ও করে রাখে। অপরদিকে সেল্ফ এস্টিম সেভাবে বেড়ে ওঠেনি যে মানুষটার, সে এই নতুন ঘটনার ভয়জনিত ধাক্কাটাকে পুরোপুরি অন্যভাবে সামলায়। ক্রিটিক ভদ্রলোক তাকে সবচেয়ে খারাপ যে ঘটনাটা ঘটবে সেটা বারবার বলতে বলতে তাকে এমনভাবে বিশ্বাস করিয়ে ফেলে, যে সে তখন মানসিকভাবে ঐ পরিস্থিতির জন্যই সবচেয়ে প্রস্তুত থাকে। অতএব পরিস্থিতিটা তখন আর তার জন্য নতুন থাকেনা, সুতরাং নতুন পরিবেশজনিত ভয়ও আর থাকেনা। 


ইংরেজী না জানা, আর দেরি করে আসা - এ দুটো ব্যর্থতার জন্য রূমানা কে আংশিক দায়ী করা গেলেও, প্রেজেন্টেশনের ব্যর্থতা এ দু'টো ঘটনার উপর চাপিয়ে দেয়া যায়না। এখানে অবচেতনভাবে রূমানা এমন দু'টো ঘটনাকে দোষী করছে, যা কিনা তাকে একই সাথে প্রচন্ড ছোট বোধ করাবে, কিন্তু আরেক দিক থেকে নিজেকে প্রবোধও দিবে, "আমার ভাগ্যটাই এমন। বাবা মা ইংরেজি স্কুল এ পড়ায়নি, আর সকালে দু'ঘন্টা আগে বেরিয়েও লাভ হয়নি, দেশের যা অবস্থা!" সাধারণ অবস্থায় হলে এ দু'টো ফ্যাক্টরকে তার প্রেজেন্টেশনে সম্ভাব্য ব্যর্থতার কারণ লিস্ট থেকে পুরোপুরি বাদ দেয়ার কথা ছিল। তা না করে মোটামুটি অপ্রয়োজনীয় দুটি কারণ যোগ করে ক্রিটিক মহাশয় তার নিজস্ব ব্যর্থতাকে ভাগ্যের সাথে জুড়ে দেয়ার স্বস্তিকর কাজটা সমাধা করল। 


ক্রিটিকের উদ্ভব কিন্তু খুব ছোটবেলায়। চার বছরের মধ্যেই নাকি সেল্ফ এস্টিমের একটা ভিত্তি তৈরি হয়ে যায়। শৈশব ও কৈশোরে বাবা মায়ের থেকে প্রশংসা ও ভালবাসা আদায় করে নেয়ার আকুতিটা অনেক বেশি থাকে। বাবা মা যদি সন্তানের ব্যাপারে কঠোর পারফেকশনিস্ট হন, ভুল সংশোধনের পন্থা যদি হয় কড়া শাসন আর উপেক্ষা, তার উপর যদি তারা শাসনের ব্যাপারে কনসিসটেন্ট না হন, তখন সন্তান বিশ্বাস করে বসে, দোষটা আমার কাজে না, দোষ আমার মধ্যেই। আমার স্বভাব চরিত্রেই সমস্যা। ত এই বিশ্বাস ছোটবেলা থেকে প্রোথিত হয়ে বড়বেলা যখন কোন ফেইলিওর আসে, তখন অত্যন্ত কঠোর সেল্ফ ক্রিটিক ছোটবেলার ধারণাটাকেই পাকাপোক্ত করে। আর এতে করে মনের একটা অংশ ভাবে, 'আমার বাবা মা ত ঠিকই ভাবতেন আমার ব্যাপারে, আমি আসলেই একটা স্টুপিড।' এই উপলব্ধি দুঃখজনক হলেও সত্য, তাদের মনে স্বান্তনা নিয়ে আসে, "অবশেষে আমি আমার বাবা মায়ের মত করে ভাবতে পারছি। আগে অকারণেই ভুল বুঝতাম।" 



এগুলো ছোট ছোট তথ্য। চিন্তা করতে থাকুন।

সেল্ফ এস্টিম পর্ব ১ : সেল্ফ ক্রিটিক

তাড়াহুড়া করে কাজ করছে তুহিন, এসাইনমেন্ট জমা দেয়ার আর এক ঘন্টা বাকি, কোনমতে শেষ করে দৌড়ে প্রিন্টআউট নিয়ে জমা দিয়ে আসল সময় শেষ হওয়ার এক মিনিট পরে। জমা দেয়ার সময় টিচারের মুখের দিকে খুটিয়ে খুটিয়ে দেখল। সে জানে টিচার কি ভাবছে, "এই অলস অকর্ম্মন্য ছেলেটাকে দিয়ে কিচ্ছু হবেনা! পড়াশুনা ভাল পারলে কী হবে, অকর্মার ধাড়ি। আমার কাছে রেকমেন্ডেশন লেটার চাইতে আসলে আচ্ছাসে একচোট নিব" 


তুহিনের মাথায় কেবলই ঘুরতে লাগল, আমি এত অলস? এই অলসতার জন্য জীবনে কিছুই করতে পারলাম না। কত ভাল ভাল কথা ভাবি, এই করব, সেই করব, শেষ পর্যন্ত কোনটাই করিনা। কারণ আমি আলসেমি করেই ত কূল পাইনা। আমার আলসেমি তে বাবা মাও বিরক্ত। ঐ যে সেদিন কী কী বলল! আমাকে দিয়ে কিচ্ছু হবেনা! আমার বন্ধুরা ভাল ভাল জব করবে, ভালভাবে সেটল হবে, আমার কিছুই হবে না। আমি কোনকাজই ভাল করে পারিনা। একটা এসাইনমেন্ট, সেটাও সময় নিয়ে ভাল করে শেষ করলাম না। কেন? কেন এমন করি? 


এই ধরণের ভাবনাগুলো আমাদের সবার মাথায়ই খেলা করে। ক্রিটিক হচ্ছে মনের একটা দিক, যা সবসময় আপনাকে খুঁতগুলো চোখে আঙুল দিয়ে দেখাতে থাকবে, একটা খুঁতকে জেনারালাইজ করে আপনার পুরো চরিত্রের উপর একটা খারাপ মন্তব্য করবে, আপনি যেহেতু মন থেকেই এই ভাবনাটা আসছে, তাই অবচেতন মনে পুরোটুকু বিশ্বাস করে বসে থাকবেন। এখানেই শেষ না, একটা জেনারেল কমেন্ট করার পর সেই কমেন্ট এর উপর ভিত্তি করে আপনি আপনার জীবনের বাকি ব্যর্থতাগুলি কে জোড়া লাগাতে থাকবেন। পুরো ব্যাপারটা এত স্বাভাবিক ভাবে ঘটবে, আপনি টেরও পাবেন না, এই প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে আপনার আত্মবিশ্বাসে আরো একটু ধ্বস নেমেছে। 


সেল্ফ ক্রিটিক কিন্তু নতুন কিছু না। আমাদের প্রত্যেকের মনে একটা কণ্ঠ আমাদের নিচে টেনে ধরতে চায় সবসময়। যারা আত্মবিশ্বাসী, তারা সচেতনভাবে এই কণ্ঠটাকে চিনতে পারে, তারপর তার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে জিজ্ঞাসা করে, এই বক্তব্যের সারবত্তা কতটুকু। ক্রিটিক কে চিনতে পারা তাই সেল্ফ এস্টিম গড়ে তোলার প্রথম ধাপ। 


সেল্ফ ক্রিটিক চিনতে পারার একটা ছোট টিপ: 

আপনার এই মুহূর্তে নিজের সম্পর্কে কেমন লাগছে ভাবুন। কোন একটা বিষয় নিয়ে কি লজ্জিত, কুণ্ঠিত? কী সেই বিষয়? কেন এই মুহূর্তে নিজেকে নিয়ে খারাপ লাগছে? চিন্তা করুন। দেখবেন মনের ভেতর একটা কন্ঠস্বর চিনতে পারবেন, যে কিনা আপনার ব্যর্থতা, দোষ এগুলো দেখিয়ে দিচ্ছে বারবার। তার কথাগুলো অবচেতন মনে না শুনে সচেতন ভাবে শুনুন কী বলে। যত শুনবেন, তত বুঝতে পারবেন সেল্ফ ক্রিটিক নামক ভদ্রলোকের অস্তিত্ব। 


আমি বলছিনা, সেল্ফ ক্রিটিক খারাপ, একে পুরোপুরি ওভারলুক করতে হবে। সেল্ফ এস্টিম গড়ে তোলার প্রথম ধাপ 'ক্রিটিক' মহাশয় কে চিনতে পারা। এটা একটা মেন্টাল এক্সারসাইজ, চেষ্টা করে দেখুন।

প্রকৃতি আমায় যা মনে করিয়ে দেয়

পিঁপড়ার দল: 

পিঁপড়াদের আমার হিংসা হয়। জন্মের শুরু থেকেই তারা জানে, কোন কাজের জন্য তারা পৃথিবীতে এসেছে, এবং নিখুঁতভাবে করে যেতে থাকে। আমরা আমাদের স্বকীয়তা বুঝতেই অনেক দেরি করে ফেলি, আর আমাদের স্বকীয়তা সমাজের নির্দিষ্ট স্ট্যান্ডার্ডের বাইরে গেলে তা প্রকাশ করতে ভয় পাই। 

অথচ প্রতিটা মানুষের স্বকীয়তা যে ভিন্ন, আর খুব খুব গুরূত্বপূর্ণ, তা বলার অপেক্ষা রাখেনা। বিশেষ করে জ্ঞানের আলো ছড়িয়ে দেয়ার ব্যাপারে। এই যেমন, 'ইন্টেলেকচুয়াল হিউমিলিটি', এই বিষয়টা সমাজের প্রতিটা স্তরে পৌছে দেয়ার জন্য এক শ্রেণীর মানুষ তারস্বরে চেঁচালেই হবে না। প্রতিটা আইডিয়া সমাজে ইমপ্লিমেন্ট করার জন্য অনেকগুলো লেভেলের বক্তা লাগে। প্রথম স্তরের দার্শনিকরা এই হিউমিলিটির তত্ত্বীয় দিক নিয়ে ঘন্টার পর ঘন্টা আলোচনা করতে পারেন, আমি বুঝব না। কারণ আমি কর্মী শ্রেণীর পিঁপড়া। আমাকে আমার ফিলোসফি পড়া বন্ধুর সাহায্য নিয়ে সে আইডিয়া বুঝে সহজ ভাষায় লিখতে হবে। সে লেখা ফেসবুকে, ব্লগে ভাইবোনেরা পড়ে নিজের জীবনে কীভাবে কাজে লাগানো যায় তা মাথা খাটিয়ে বের করবে। তারা আবার আরেক ধাপ সহজ করে ছড়িয়ে দেবে মুরুব্বীদের কাছে, যাদের ইন্টারনেট, বা ব্লগের সাথে খুব একটা সংযোগ নেই। উনাদের কাছে এই কনসেপ্ট পৌছাতেই হবে, কারণ সমাজের, পরিবারের হর্তাকর্তা উনারাই। অবাধ তথ্যপ্রবাহের এত এত সুফল তাঁরা প্রয়োগ করতে পারছেন না কেবল নতুন প্রজন্মের প্রতি বিরাগমিশ্রিত অশ্রদ্ধার কারণে। 

কিন্তু সমস্যা হচ্ছে, এই যে একেকটা স্তর, এর প্রতিটা স্তরেই যোগ্য অনেক ভাইবোন আছেন। কিন্তু তাঁরা নিজেদের যোগ্যতা নিয়ে এতই সন্দিহান, আর চারপাশের ঋণাত্বক আবহাওয়া নিয়ে এতই অভিযোগমুখর, তাঁদের ধরে বেঁধে কোন এক শ্রেণীতে দাঁড় করিয়ে দিলেও বিনয়ে নত হয়ে আরো নিচের স্তরে নেমে যেতে চান। এতে করে কাজের কাজ কিছু হচ্ছেনা, পুরো প্রক্রিয়াটা স্থবির হয়ে যাচ্ছে। 

এ কারণেই এই অধমের 'আর্ট অব এপ্রিসিয়েশন' নিয়ে এত লেখালেখি। আমাদের ভাইয়া আপুরা যদি দ্বিধার খোলস থেকে বের হয়ে একটু সাহস করে এসে বলত, 'আমি আছি, কী করতে হবে বলেন।' তাহলে সমাজের চিত্রটা অন্যরকম হত। 


গিরগিটি: 

গিরগিটি তার চার হাত পা দিয়ে বিভিন্ন পাথর আঁকড়ে ধরে উপরে উঠে যায়। আমি পাহাড় চড়ার সময় প্রায় ওরকম করেই উঠতে হয়েছে। কোন আড্ডায় ঠিক মনমত পরিবেশ না পেলে সেখানে আমি এই গিরগিটি থেকে অনুপ্রেরণা নেই। অনেক কিছুই হয়ত ভাল লাগেনা, কিন্তু একটা না একটা ভাল দিক থাকেই, হয় একটা কথা, নাহয় একটা চিন্তা, না হয় অন্যের একটা দোষ দেখে নিজেকে সতর্ক করা - তখন এ আড্ডায় এলাম কেন - অমন না ভেবে, ভাবি, এ আমার নিজেকে পরিশুদ্ধ করার একটা ধাপ। এই পাথরটায় এক মুহূর্তের জন্য আমাকে থামতেই হত, আরো একটু শেখার জন্য, আত্মশুদ্ধির গন্তব্যটাতে পৌছানোর জন্য। 


হলদে পাতা: 

পেছন ফিরে সম্পর্কের জাল ঘাঁটতে গিয়ে দেখি, অনেক যোগাযোগই ফিকে হয়ে এসেছে সময়ের কারণে, বা চিন্তাভাবনার ভিন্নতার কারণে। কিছু বন্ধন ছেঁড়ায় নাড়ি ছেঁড়ার মত কষ্ট হয়েছে। তবু মনে হয়, গাছের পাতা চিরকাল থাকে না, সময় এলে তাকে বিদায় নিতে হয়ই। আমার প্রিয় মানুষগুলো, যাদের সাথে অনেক হাসির, অনেক ভালবাসার বাঁধন ছিল, তাদের অপরিচিত হওয়াকেও তাই মনে হয়, প্রয়োজনের দাবি ফুরাতে যে যার গন্তব্যে যাত্রা করেছি। এতে কষ্ট পাওয়ার কিছু নেই। জোর করে ধরে রাখতে গেলে অবাঞ্ছনীয় হবার বোধটাই আরো প্রকট হত। leaves don't stay. 


নিউরন: 

মস্তিষ্কের কোষগুলো বেশ আজব উপায়ে কাজ করে। একটির সাথে আরেকটি হাত পা ছড়িয়ে জালের মত তৈরি করে, যা দিয়ে মস্তিষ্ক কাজের জন্য সিগন্যাল পাঠায়। যত বেশি নেটওয়ার্ক, তত বেশি করিৎকর্মা হয়। 

নলেজ আর উইজডম (বাংলায় জ্ঞান আর প্রজ্ঞা) আমার কাছে মনে হয় আমাদের মস্তিষ্কের নিউরনের জালের মতই। আমরা যে জ্ঞান আর অভিজ্ঞতা আহরণ করি, তা একেকটা ছাড়া ছাড়া কোষের মত। প্রজ্ঞা বা উইজডম পেতে এর মধ্যে নেটওয়ার্ক করতে হয়। যে যত বেশি নেটওয়ার্ক করতে পারে, অর্থাৎ একটা অভিজ্ঞতার সাথে আরেকটা জ্ঞান - এভাবে জোড়া লাগিয়ে নতুন নতুন বিষয় শিখতে পারে, সে তত বেশি প্রজ্ঞাবান। উইজডম এর পুরো ব্যাপারটাই এই। সম্পূর্ণ অপ্রাসঙ্গিক পরিবেশেও কেবলমাত্র পর্যবেক্ষণ ও চিন্তার জোরে শেখার মত কিছু একটা খুঁজে বের করা সম্ভব। আর একবার এ ব্যাপারটা আয়ত্ত হয়ে গেলে সে মানুষটার উচিৎ নতুন নতুন পরিবেশে যাওয়া। একটা নতুন অভিজ্ঞতা মানে অনেক গুলো নতুন কোষ, আর তার মানে লক্ষ কোটি নতুন নতুন কানেকশন (উপলব্ধি।) এই প্রক্রিয়ায় পুরনো অনেক উপলব্ধি মুছে যাবে। কিন্তু সেগুলো মোছারই দরকার ছিল, কারণ তার বদলে আরো ভাল কিছু এসে জায়গা করে নিয়েছে যে!

Friday, July 20, 2012

দাম্পত্য - ৯


আজকে দাম্পত্যের সবচাইতে স্পর্শকাতর বিষয়টা নিয়ে লিখব, যেটা নিয়ে কেউ কথা বলে না। যা নিয়ে অভিযোগ মনে আনাও পাপ, মুখে আনলে ত শেষ! এ বিষয়টা বাদ দিয়ে দাম্পত্য নিয়ে বুলি কপচানো রীতিমত হঠকারিতা, কারণ বিয়ের আগ পর্যন্ত এ নিয়ে মানুষের জল্পনা কল্পনার শেষ থাকে না।




অন্তরঙ্গতা। সোজা ভাষায় শারীরিক সান্নিধ্য। যা নিয়ে বিয়ের আগে  মেয়েদের উদ্বেগ, শংকা, লজ্জা মেশানো আকাঙ্ক্ষা, আর ছেলেদের কল্পনা, পরিকল্পনা - কোন কিছুই বাধা মানতে চায়না - তা নিয়েও যে বিয়ের পরে দ্বন্দ্ব অভিযোগের অবকাশ থাকতে পারে, তা বিশ্বাস করা অবিবাহিতদের জন্য কঠিন বৈকি। বিবাহিতদের মধ্যেও অভিযোগগুলো দানা বাঁধলে তারা একরকম ধামা চাপা দিয়েই রাখতে চান। এর মূল কারণ, এসব বিষয়ে লজ্জার বাঁধ ভেঙে কথা বলা রীতিমত অসম্ভব, কারণ নিজের স্বামী/স্ত্রীর সম্পর্কে এতটা খোলামেলা আলোচনা করা তাঁকে অসম্মান করারই সামিল। তাছাড়া এমন মানুষ আশপাশে পাওয়াও বেশ কঠিন যে একই সাথে উদার মনের, সমাধান জানে, গোপনীয়তা বজায় রাখবে এবং যার সম্পর্কে বলা তাকে আগের মতই সম্মান করবে।


শারীরিক অন্তরঙ্গতা দম্পতির মাঝে এক নিগূঢ় যোগাযোগের মাধ্যম। এ যেন ছোটবেলার 'কোড ওয়ার্ড' দিয়ে কথা বলার মত। আশপাশে আরো অনেকে থাকলেও তাদের নিজস্ব হাসি, ঠাট্টা, ছেলেমানুষি আনন্দের ভাগ দিতে হবে না কাউকেই। শরীরি আনন্দের মূর্ছনাকে তুলনা করা যায় অনন্য সাধারণ সঙ্গীতের সাথে - যার বোদ্ধা সমঝদার পুরো পৃথিবীতে মাত্র দু'জন। শরীরের সান্নিধ্য তাই অনেক সময় মনকে আরো কাছাকাছি এনে দেয়।


কিন্তু, আর সব পার্থিব সৌন্দর্যের মতই এতেও কদাকার কুচ্ছিত বেসুরো তান ঢুকে যেতে পারে। বিয়ের আগে মিডিয়ার কল্যাণে ভালবাসার যে রূপটি আমাদের মধ্যে গাঁথা হয়ে যায়, তা ভীষণ রোমান্টিক, ভীষণ সুন্দর। সত্যিকারের জীবনে দৈহিক ভালবাসা সবসময় তেমনি করে নাও আসতে পারে। বইয়ের পাতায় বা রূপালি পর্দায় অন্তরঙ্গতা যেভাবে আসে ভালবাসার চিত্ররূপ হয়ে - বাস্তব সবসময় তেমন নাও হতে পারে। দৈহিক মিলন শুধুই কাছে আসার আকুতির প্রকাশ না, এটি একটি জৈবিক চাহিদাও। আর সব সাইকেল এর মত নির্দিষ্ট সময়ের ব্যবধানে এই চাহিদাও পূরণ করা প্রয়োজন। কিন্তু সমস্যা এখানে না। সমস্যা হয়ে দাঁড়ায় যখন স্বামী/স্ত্রী বিয়ের আগের ধরে রাখা এক মাইন্ডসেট নিয়ে আশা করে থাকেন প্রতিবারই ভালবাসা তার পূর্ণরূপ নিয়ে মহাকাব্য রচনা করবে। চাহিদা কিন্তু তার প্রয়োজন পূরণের দিকেই নিবদ্ধ থাকে, আর তার কারণে উপক্রমণিকার অংশটুকু খুব অল্প, বা অনুপস্থিত থাকতে পারে কখনও কখনও। যে মানুষটি স্বপ্নে এই সময়টুকু কে নিয়ে অনেক কাব্যগাঁথা রচনা করেছে, সে বাস্তবতার এই ধাক্কায় বিমূঢ় হয়ে যেতে পারে।


ফলাফল, 'আমি কেবলই তার প্রয়োজন পূরণের মাধ্যম, আমার প্রতি তার কোন আকর্ষণ নেই...' এ ধরণের উপসংহার টানা। এমনকি, হীনম্মন্যতা, অতিরিক্ত সন্দেহপ্রবণতা, তুচ্ছ কারণে অভিযোগ - এধরণের ব্যাখ্যাতীত আচরণের অনেকটাও এ ধরণের অতৃপ্তি থেকে আসে।


এখানে উভয়পক্ষকেই বুঝতে হবে, শারীরিক সান্নিধ্যের উৎস দুইটি। ভালবাসা/ কাছে আসার আকুলতা, এবং পিওর বায়োলজিক্যাল নিড। সম্পর্ক যত পুরনো হয়, প্রতিটা আবেগ প্রকাশের পেছনে মূল কারণটা বোঝা সহজ হয়ে যায়। অনেক দম্পতিই করেন কি, শরীরের প্রয়োজনে কাছে আসার আহ্বান কে শ্রদ্ধা করেন না। ভেতরে জমে থাকা রাগের ঝাল মেটান অপরজনের প্রয়োজন কে উপেক্ষা করে। ক্লান্তি, ব্যস্ততার অজুহাত দেখান। এই প্রয়োজনটুকু পূরণ করতে যেহেতু অপরজনের সহযোগিতা অপরিহার্য, তাই উপেক্ষা অনুরোধকারীকে একই সাথে আহত ও অপমানিত করে।


আমাদের দম্পতিরা অনেক সময়ই জানেন না, সাড়া না দেয়াটা কি আদৌ অপরাধের পর্যায়ে পড়ে কিনা। একজন হয়ত ব্যাপারটাকে গুরূত্বই দিচ্ছেনা, আর অন্যজন আহত অহংবোধ নিয়ে মনে মনে দূরে সরে যাচ্ছে। আজকালকার দিনে অহর্নিশ মানুষকে ব্যস্ত রাখার অনেক উপকরণ আছে, তাই সঙ্গ না থাকলেও অনেক কিছুর মাঝে ডুবে থাকা যায়, সঙ্গী হয়ত টেরও পাবে না কবে সে অনেক দূরে চলে গেছে। তার মানে এই না যে, নিজের ইচ্ছা অনিচ্ছার কোন দাম থাকবে না। উপেক্ষাকে একটু বদলে 'সম্মান ও কারণ দর্শনপূর্বক অসম্মতি' তে বদলে দিলেই দূরত্বের ভয়টা ঘুচে যাবে।


বিবাহিত মেয়েদের কমন অভিযোগ, ও আমার প্রতি আগের মত আকর্ষণ বোধ করেনা। ছেলেদের অভিযোগ ও গৃহিণী হতে গিয়ে প্রেমিকা হতে ভুলে গেছে। ভাল কাপড় পরে না, সুগন্ধি মাখে না... কিছু বললে ঘরকন্নার দশটা অজুহাত দেখায়।


এসব সমস্যার সমাধান বাইরের কারো কাছ থেকে আশা করা বোকামি। প্রতিটা দম্পতির যোগাযোগের ধরণ স্বতন্ত্র। তাই স্ত্রীকে নিজে নিজেই বুঝতে হবে, তার দাম্পত্যের জন্য কোনটা বেশি প্রয়োজন, পরিচ্ছন্ন ঘরদোর, না পরিচ্ছন্ন পোশাক আশাক। স্বামীর ও তেমনি বুঝতে হবে, একজন লেখক কেবল নিজের খেয়াল খুশিমত লিখে গেলেই পাঠকের কাছে গ্রহণীয় হয়না, পাঠকের চাহিদারও মূল্যায়ন করতে হয়। তাছাড়া সাহিত্যে ছোটগল্পের প্রয়োজন যেমন আছে, তেমনি উপন্যাসের ও আছে। একটি সার্থক উপন্যাস অনেক ছোটগল্পের প্লট তৈরিতে সাহায্য করতে পারে।




(আমার লেখায় স্থূলতা প্রকাশ পেলে একান্তভাবে ক্ষমা চাচ্ছি।)