Wednesday, August 29, 2012

সেল্ফ এস্টিম পর্ব ২: সুহৃদ ক্রিটিক

রূমানার আজকে ক্লাসে প্রথম প্রেজেন্টেশন। তার উপর নিয়ম শাড়ি পরে যেতে হবে। এমনিতেই শরীরের আকার প্রকৃতি নিয়ে তার চরম লজ্জা, তার মধ্যে শাড়ি পরে কী বেঢপই না দেখাবে তাকে। আবার জীবনে সে কোনদিন ইংরেজিতে বকবক করেনি, কী বিদঘুটে একটা ভজঘট পাকাবে... ভাবতে ভাবতে গলা শুকিয়ে, চোখে পানি এসে, কথাবার্তা সব গুলিয়ে ভীষণ বাজে অবস্থা। এই অবস্থায় ক্লাসে পৌছতে ছয় মিনিট লেট হল। ক্লাসে ঢোকার সময় পঁয়তাল্লিশ জোড়া চোখ তার দিকে ঘুরে গেল। 
"হায় আল্লাহ! আমি একটা 'লুজার', আমি কিচ্ছু পারি না, আমি বিশ্রী, আনস্মার্ট, কথাই ঠিকমত বলতে পারিনা, একটা শব্দ বলে দুইবার 'আম.. আম...' করি। কী? আমার সমস্যাটা কী? আমাকে দিয়ে কিচ্ছু হবে না, কিচ্ছু না! যত চেষ্টাই করি না কেন, আমি এরকম জলজ্যান্ত ফেইলিউর হয়েই থাকব। আমার বাবা মার অযোগ্য সন্তান আমি। তারা যে আমাকে পেলেপুষে বড় করেছে সেই অনেক বেশি। তাদের জন্য জীবনে ত কিছু করতে পারব না, তার চেয়ে ওনাদের চোখের সামনে যেন বেশি পড়তে না হয়, এমন করে থাকি' 


রূমানার এই চিন্তাগুলো সবই সেল্ফ ক্রিটিক থেকে আসা। সেল্ফ ক্রিটিক একটু একটু করে আত্মবিশ্বাসটুকু ধ্বসিয়ে দেয়। তারপরেও মানুষ অবচেতনভাবে তার কথা বিশ্বাস করে। সেল্ফ ক্রিটিক চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিলেও অনেকে এর থেকে বের হয়ে আসতে অস্বীকৃতি জানায়। কারণ ক্রিটিক ভদ্রলোক খারাপ বোধ করালেও এর একটা সুবিধাজনক দিক আছে। আপনার মনের না জানা হিসাব নিকাশ আপনাকে না জানিয়েই তাই ক্রিটিক কে পরম সুহৃদ গণ্য করে নেয়। 


কী ধরণের সুবিধা একটু বুঝিয়ে বলি। 


রূমানার জন্য শাড়ি পরা একটা নতুন ঘটনা। ক্লাশে প্রায় পঞ্চাশজন মানুষের সামনে প্রেজেন্ট করাও নতুন ব্যাপার। যে কোন নতুন পরিবেশে আমরা একটু ভয় পাই, কারণ আমরা জানি না সেখানে কী ধরণের ঘটনা ঘটবে। সাধারণ মানুষ বিচার বুদ্ধি দিয়ে হিসাব নিকাশ করে খারাপ কিছু ঘটবে এমন প্রস্তুতি নিয়ে, খারাপ ঘটলে কীভাবে ওভারকাম করবে.. এমন প্ল্যান ও করে রাখে। অপরদিকে সেল্ফ এস্টিম সেভাবে বেড়ে ওঠেনি যে মানুষটার, সে এই নতুন ঘটনার ভয়জনিত ধাক্কাটাকে পুরোপুরি অন্যভাবে সামলায়। ক্রিটিক ভদ্রলোক তাকে সবচেয়ে খারাপ যে ঘটনাটা ঘটবে সেটা বারবার বলতে বলতে তাকে এমনভাবে বিশ্বাস করিয়ে ফেলে, যে সে তখন মানসিকভাবে ঐ পরিস্থিতির জন্যই সবচেয়ে প্রস্তুত থাকে। অতএব পরিস্থিতিটা তখন আর তার জন্য নতুন থাকেনা, সুতরাং নতুন পরিবেশজনিত ভয়ও আর থাকেনা। 


ইংরেজী না জানা, আর দেরি করে আসা - এ দুটো ব্যর্থতার জন্য রূমানা কে আংশিক দায়ী করা গেলেও, প্রেজেন্টেশনের ব্যর্থতা এ দু'টো ঘটনার উপর চাপিয়ে দেয়া যায়না। এখানে অবচেতনভাবে রূমানা এমন দু'টো ঘটনাকে দোষী করছে, যা কিনা তাকে একই সাথে প্রচন্ড ছোট বোধ করাবে, কিন্তু আরেক দিক থেকে নিজেকে প্রবোধও দিবে, "আমার ভাগ্যটাই এমন। বাবা মা ইংরেজি স্কুল এ পড়ায়নি, আর সকালে দু'ঘন্টা আগে বেরিয়েও লাভ হয়নি, দেশের যা অবস্থা!" সাধারণ অবস্থায় হলে এ দু'টো ফ্যাক্টরকে তার প্রেজেন্টেশনে সম্ভাব্য ব্যর্থতার কারণ লিস্ট থেকে পুরোপুরি বাদ দেয়ার কথা ছিল। তা না করে মোটামুটি অপ্রয়োজনীয় দুটি কারণ যোগ করে ক্রিটিক মহাশয় তার নিজস্ব ব্যর্থতাকে ভাগ্যের সাথে জুড়ে দেয়ার স্বস্তিকর কাজটা সমাধা করল। 


ক্রিটিকের উদ্ভব কিন্তু খুব ছোটবেলায়। চার বছরের মধ্যেই নাকি সেল্ফ এস্টিমের একটা ভিত্তি তৈরি হয়ে যায়। শৈশব ও কৈশোরে বাবা মায়ের থেকে প্রশংসা ও ভালবাসা আদায় করে নেয়ার আকুতিটা অনেক বেশি থাকে। বাবা মা যদি সন্তানের ব্যাপারে কঠোর পারফেকশনিস্ট হন, ভুল সংশোধনের পন্থা যদি হয় কড়া শাসন আর উপেক্ষা, তার উপর যদি তারা শাসনের ব্যাপারে কনসিসটেন্ট না হন, তখন সন্তান বিশ্বাস করে বসে, দোষটা আমার কাজে না, দোষ আমার মধ্যেই। আমার স্বভাব চরিত্রেই সমস্যা। ত এই বিশ্বাস ছোটবেলা থেকে প্রোথিত হয়ে বড়বেলা যখন কোন ফেইলিওর আসে, তখন অত্যন্ত কঠোর সেল্ফ ক্রিটিক ছোটবেলার ধারণাটাকেই পাকাপোক্ত করে। আর এতে করে মনের একটা অংশ ভাবে, 'আমার বাবা মা ত ঠিকই ভাবতেন আমার ব্যাপারে, আমি আসলেই একটা স্টুপিড।' এই উপলব্ধি দুঃখজনক হলেও সত্য, তাদের মনে স্বান্তনা নিয়ে আসে, "অবশেষে আমি আমার বাবা মায়ের মত করে ভাবতে পারছি। আগে অকারণেই ভুল বুঝতাম।" 



এগুলো ছোট ছোট তথ্য। চিন্তা করতে থাকুন।

No comments:

Post a Comment