Wednesday, December 28, 2011

শেখার কোন শেষ নেই

I have learnt silence from the talkative, toleration from the intolerant, and kindness from the unkind; yet strange, I am ungrateful to these teachers. 

Kahlil Gibran এর এই কোট টা আমি প্রথম শুনি যখন ইউনিভার্সিটির এক ফ্যাকাল্টির খুব বাজে ব্যবহার পেয়ে আমার মন অসম্ভব খারাপ। এই কথার অপরিমিত শক্তি বোঝার অবস্থা তখন আমার ছিলনা। আমি তখন দুঃখের সাগরে ডুবছি। কিন্তু এর পর থেকে, গত দেড় বছরে, এই কথাগুলো একদিনের জন্যেও ভুলিনি। প্রতিদিন অল্প অল্প করে, একটু আধটু করে নিজের অভিজ্ঞতা দিয়ে বার বার অনুভব করেছি এর প্রয়োজন।

আমরা কি আমাদের চারপাশ থেকে শিখি? সবাই বলবে শিখি। কেমন করে? এই যেমন ভাল জীবনাচরণের উদাহরণ দেখলে তার মত করে চলার শিক্ষা নেই, কারো আত্মবিশ্বাস আমাদের উদ্বুদ্ধ করে, কারো সৃষ্টিশীলতায় মুগ্ধ হয়ে আমরা অনুপ্রাণিত হই, আমাদের আগামী প্রজন্মও যেন এমন হয় - ইত্যাদি ইত্যাদি। নিজের জীবনে ঠেকে শিখি সবাই। অনেকে অনেক ঠকেও ধরতে পারেনা ঠিক আর বেঠিকের ফারাক। শিখছি আমরা প্রতিদিনই। কিন্তু কাজে লাগাতে পারছি কতটুকু? 

আমরা মানুষেরা বোধহয় জন্মগতভাবেই ভুলোমনা। বড় হওয়ার সাথে সাথে ভুলে যাই কৈশোরের আমাদের মনটা কেমন ছিল। আমরা বোধহয় স্বার্থপরও, নিজেকে আরেকজনের অবস্থানে বসিয়ে কিছুতেই বিচার করতে পারিনা কেন একজন মানুষ ভুল করে। আমার জন্য যেটা খুব সহজ, অপরজনের জন্য তাই হয়ত নিত্যদিনের স্ট্রাগল। আমার এক কাছের মানুষ সময়ের ব্যাপারে খুব বিচক্ষণ, অন্য কেউ সময়ের নড়চড় করলে তার থেকে কর্কশ মন্তব্য শুনতে হবেই। তার কথা হচ্ছে আমি ত কোন কমিটমেন্ট করলে আর সব কিছু সেভাবে প্ল্যান করে নেই, তুমি পার না কেন? সেই একই মানুষ নিত্যনিয়ত স্ট্রাগল করে যাচ্ছে তার বাকযন্ত্র কে সংযত রাখার। প্রতিদিন সে হেরে যায় এখানে, বার বার হারে, একই ভুল প্রতিদিন করে। তবু সে শেখেনি - স্ট্রাগল প্রত্যেকেরই আছে, যার যার নিজের মত, সময়ের হোক অথবা সংযমের। 

নিজের সংসার হওয়ার পর থেকে আমি প্রত্যেকটা পরিবারকে খুব ভালভাবে পর্যবেক্ষণ করি। প্রবাসে থাকি, বাবা মা, শ্বশুরবাড়ি ত নেই, এরাই সব। বেশ অনেকদিন ধরে সংসার করছেন এমন বড়বোনদের সংসর্গে থাকার চেষ্টা করি, যাতে তাদের অভিজ্ঞতালব্ধ শিক্ষা অল্প আয়াসে অর্জন করে ফেলতে পারি। শিক্ষার ধরণটাই এমন, না ছেঁকে নেয়ার উপায় নেই কোন কিছুই। গ্র্যাড স্কুলে এতদিন ধরে আমাদের এটাই অনেক কষ্টে শেখানোর চেষ্টা করছে, কোন পাবলিকেশন বিশ্বাস করবে না, ডাটা যাচাই না করে। একটা সময় বুঝলাম, এই পদ্ধতি শুধু একাডেমিক লাইফে না, সোশ্যাল লাইফেও খুব জরুরি। ছোটবেলা থেকে শিখে এসেছি বাবা মা সবসময় ঠিক, স্কুল কলেজ ইউনিভার্সিটিতে শিক্ষক মানে অবিসংবাদিত চরিত্রের অধিকারী, তাদের একটু চ্যুতি দেখলে মুষড়ে পড়তাম। আশ্চর্য ব্যাপার, কেন কখনও কেউ বলে দেয়নি, তাদেরও ভুল হয়, ভুল করতে দেখলে হতাশ না, শিখতে হয়। তেমনি এখনও, সুপারভাইজর কে মাথায় তুলে রাখি, আত্মীয়, বন্ধুবান্ধব সহ নিজেদের পরিবারকে ভাবি সব ভুলের ঊর্ধ্বে, যখন দেখি ভীষণ নীতিবাগিশ মানুষটি জীবনের কোন একটা জায়গায় এসে অন্যায় করে ফেলছে, তখন তার উপর বিশ্বাসটাই চলে যায়। কেন, সে কি ভুল করতে পারেনা? অন্যায় করলেই আমি তার থেকে শেখা বন্ধ করে দেব কেন? তার ভুলটা ত আমিও করতে পারতাম! 

অনেকদিন ধরে পরিচয় থাকলে মানুষের ভাল খারাপ সবকিছুই চোখে পড়ে। সমস্যা হচ্ছে, আমি কিছুদিন যাওয়ার পরেই তাকে লেবেল করে ফেলি, 'আমি একে পছন্দ করি, আমি একে পছন্দ করি না।' তারপর যাদের পছন্দ করি, তাদের ভাল গুণগুলি খুঁটিয়ে দেখে শিখতে থাকি, আর যাদের পছন্দ করি না, তাদের দোষগুলিও মনের মধ্যে জমা রেখে শিখতে থাকি। উল্টোটা সচেতনভাবে কখনই করতে পারিনা। বিশেষ করে যাকে পছন্দ করিনা, তার গুণগুলো দেখতে আমার ভীষণ এলার্জি। কিন্তু এটা কি ঠিক পথ? আমি না আল্লাহর কাছে দুআ করি উনি যাতে আমাকে সরল পথে রাখেন সঠিক পথে রাখেন? নাস্তিকরা যা বলে তার কি সব খারাপ? ইসলামের দোহাই দিয়ে গালিগালাজ থেকে শুরু করে আর যা কিছু করা হয় তার কি সব ভাল? আমরা ছাঁকতে শিখিনি। বাইনারি ডিজিট এর মত 'All or none' এই জায়গাতে এসে থেমে গেছি। 

আমি শিখছি, সবই শিখছি, সাইকোলজিক্যাল ডিজঅর্ডার থেকে শুরু করে স্ট্রিং থিওরি - তত্ত্বকথা যত আছে, জীবনের সাথে সামঞ্জস্যহীন - তার সবকিছুতেই আমার খুব আগ্রহ। কিন্তু শিখিনি গৃহস্থালির খুব বেসিক কিছু বিষয়ও, শাক সবজি কীভাবে তাজা রাখা যায়, ঘরকে পরিচ্ছন্ন রাখার জন্য কী কী রুটিন মেনে চলা জরুরি - এগুলো কোন কিছুই আমার কাছে জরুরি মনে হয়নি কোনদিন। একদিন ব্লগে দেখলাম এক ছেলে অহংকার করে বলছে, 'আমি জীবনে কোনদিন ভাত বেড়ে খাইনি।' আমরা না পারা, না জানা - এসবও অহংকার করার বিষয় মনে করি। শিক্ষার কী অদ্ভুত বিকলাঙ্গ রূপ! 

যাই হোক, এত হতাশামার্কা কথা বলে লেখা শেষ করতে চাইনা। যারা ছাত্রজীবনে আছেন, বিশেষ করে যারা দেশে আছেন, তারা অবসর সময়ে হতাশা চর্চা না করে চলুন একটু বড় বড় চোখ করে চারপাশে তাকাই। যদি বৃষ্টির জন্য বাসা থেকে বের হতে না পারেন, একটু রান্নাঘরে যান, দেখুন মা কীভাবে চটপট রান্না, ধোয়ামোছা সবই খুব স্মার্টভাবে করে ফেলেন খুব অল্প সময়ে। এটা একটা স্কিল। দুপুরে বিছানায় অলস শুয়ে থাকলে চুপচাপ একটু ভাবুন আপনার অপছন্দের কোন মানুষের কথা। তার ভাল দিকগুলো, দোষগুলো - সবকিছু নিয়েই চিন্তা করুন। শেখার অ-নে-ক কিছু পাবেন। বাবাকে যদি সবসময় দেখেন ব্যাংকে বিল দিয়ে আসলেই মেজাজ খারাপ থাকে, তাহলে একদিন তার সাথে যান, শেখা হয়ে যাবে মেজাজ ঠিক রাখতে হলে কোন কোন জিনিসগুলো সহ্য করতে শিখতে হবে। শেখার কি শেষ আছে? অল্প কথায় কী করে অনেক কথা বলা যায় - তাও একটা শেখার মত জিনিস, আমাকে যেটা শিখতে হবে খুব শীঘ্রই।

Tuesday, December 13, 2011

আমাদের আড্ডা

গ্র্যাজুয়েট স্টুডেন্টদের জীবনটা বেশ পানসে টাইপ। বাসা, ল্যাব, ল্যাব, বাসা - এই করে করেই আড়াই বছর কাটিয়ে দিলাম। আন্ডারগ্র্যাডরা দেখি কত রকমের ক্লাব করে, কমনস্ এ নাচ প্র্যাক্টিস করে - আর ফ্রি মুভি, সোশ্যাল আওয়ার - এসব ত চলছেই। অনার্স পড়াকালে আমারও কতকিছুতে উৎসাহ ছিল, এখন কেবল চশমা এঁটে ভারিক্কি চেহারা করে ল্যাবে গিয়ে ডেস্কে বসে থাকি। ছুটির দিনগুলোতেও ভারি আলিস্যি, ঝিমিয়ে ঘুমিয়ে আর virtual socializing করে করেই দেখি দুই দিন পার হয়ে গেছে। 

আমাদের মতই আলস্যপ্রিয়, উদ্যমহীন, ভাবুক শ্রেণীর আরও কিছু গ্র্যাড স্টুডেন্ট এর পরিচয় হয়েছে এই দু'বছরে। দেশীয় স্টাইলের আড্ডার নেশা ঢুকিয়ে দিয়েছি ওদের মধ্যেও। মনে যত কথা আসে, ভাঙা ইংরেজিতে তার অর্ধেকও প্রকাশ করতে পারিনা, তাতে কী হয়েছে? আন্তরিকতা আর হৃদ্যতার বোধ করি ভাষা প্রয়োজন হয়না। কারও একজনের পরীক্ষা ভাল হলে বা প্রেজেন্টেশন/প্রজেক্ট শেষ হলে মহানন্দে রান্না করে সবাইকে আমন্ত্রণ জানায় খেয়ে যাবার জন্য। প্রতি সপ্তাহেই এই মুখগুলো দেখি, মাঝে মধ্যে মনেও হয়, এত কী কথা বলব? সেদিনই ত দেখা হল! 

কিন্তু মজা হচ্ছে এদের সাথে কথা বলার টপিক কখনও ফুরায় না। পৃথিবীর যাবতীয় নিয়মকানুনের গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে আমাদের প্রশ্ন। রাজনীতি নিয়ে আমাদের তর্ক, সাদার সাথে শুভ্রতা আর কালোর সাথে কেন মন্দকে মেলানো হবে তাই নিয়ে আপত্তি। আফ্রিকান আমেরিকানরা কতটা নির্যাতিত হয়েছে (এখনও হচ্ছে) এ বিষয়ে বিশেষজ্ঞজনের মতামত ইত্যাদি ইত্যাদি। দর্শন হচ্ছে প্রত্যেকের প্রিয় বিষয়বস্তু। আমরা কীভাবে বিভিন্ন ঘটনাকে দেখি, কীভাবে সিদ্ধান্ত নেই, কোনটা শিক্ষণীয়, কোনটা মিডিয়ার প্রভাব - এসব নিয়ে সূক্ষ্মাতিসূক্ষ পর্যালোচনা চলছেই। 

আরেকটা অতিপ্রিয় বিষয় হচ্ছে মানুষের ব্যক্তিত্ব কীভাবে গড়ে ওঠে, সম্পর্কগুলোর প্রতি দৃষ্টিভঙ্গি কীভাবে ঘাত প্রতিঘাতে নতুন রূপ নেয়, সম্পর্কের প্রতি দায়িত্বশীলতা gender ও culture ভেদে কতটুকু ভিন্ন হয়, আদর্শ ব্যক্তিত্ব ও আদর্শ পরিবার কেমন হওয়া উচিৎ এসব। বলা বাহুল্য, এধরণের চিন্তাভাবনার অফুরন্ত খোরাক আছে ধর্মে। তাই ঘুরে ফিরে আমাদের তর্কে বারবারই আসে ধর্ম। যেহেতু সবাই মুসলিম, অল্প বিস্তর প্রত্যেকেরই আগ্রহ আছে ইসলামকে জানার, আর অন্য ধর্মগুলো নিয়ে জ্ঞানের পরিধি ভয়ঙ্কর রকমের কম, তাই ইসলামকে নানা দৃষ্টিকোণ থেকে আলোচনা করা হয় প্রায়ই। 

একটা সময় আমরা খেয়াল করলাম আমাদের আলোচনাগুলো, প্রশ্নগুলো একই জায়গায় ঘুরপাক খাচ্ছে। কারণ আমরা কুরআন ভাল জানিনা, হাদীস গল্পের মত পড়েছিলাম কোন এক কালে, সীরাহ (রাসুলুল্লাহ (স) এর জীবনী) সম্পর্কে ত অতল অন্ধকারে। আমাদের আড্ডায় চিন্তা করার মত অসাধারণ মাথা আছে অনেক, কিন্তু জ্ঞানের সীমাবদ্ধতার কারণে হিরা কাটার ছুরি দিয়ে ঘাঁটছি কাদামাটি। এর মধ্যে তারিক রামাদানের লেকচার শুনতে Johns Hopkins এ গেলাম, উনি বারবার জোর দিয়ে বললেন, মুসলিমদের তার মূল রেফারেন্সে আসতে হবে। কুরআন ও হাদীস বুঝতে হবে, কিন্তু একই সাথে intellectual humilityর চর্চাও করতে হবে। সব শুনে মনে হল ইসলামকে বিভিন্ন আঙ্গিকে বুঝতে চাওয়ার আমাদের এই প্রয়াসটা ঠিকই আছে, কিন্তু রেফারেন্স অংশটুকু অনুপস্থিত। 

ঐ দিনই লেকচারের পর আমরা একটা রেস্টুরেন্ট এ খেতে গিয়েছিলাম, ওখানে বসে ঠিক করলাম, প্রতি শুক্রবার সন্ধ্যায় আমরা কারও বাসায় একত্রিত হব, শুধুমাত্র কুরআন, হাদীস এবং সীরাহ নিয়ে methodically জ্ঞান অর্জন করতে। কীভাবে methodically জ্ঞান অর্জন করা যায়? আমাদের ৮-৯ জনের মধ্যে ৩ জন প্রতি সপ্তাহে ৩টা পার্ট আলোচনা করবে। কুরআন ৩০ মিনিট, হাদীস ৫-১০ মিনিট, সীরাহ ২০ মিনিট। মাগরিবের পর শুরু হবে, খাওয়া দাওয়া হবে, আলোচনার যে কোন অংশে যে কেউ প্রশ্ন এবং তর্ক বিতর্ক শুরু করতে পারে। তবে একজন (আমাদের মধ্যে ওরই পড়াশুনা সবচেয়ে বেশি) খেয়াল রাখবে আলোচনা যেন বেশি অফট্র্যাক হয়ে না যায়, বা অতি উত্তপ্ত হয়ে না যায়। 

গত ছয় সাত মাস ধরে অনিয়মিত ভাবে এই স্টাডি সার্কেল চলে আসছে। 

আমাদের মধ্যে কেউই স্কলার না হওয়ায়, আর খুব ঘনিষ্ঠ বন্ধু হওয়ায়, ধর্ম নিয়ে যত রকমের বিব্রতকর প্রশ্ন আছে সবই উঠে আসে। আমরা যে যেটুকু জানি, বুঝি শেয়ার করি, অথবা পরে খুঁজে পেলে কমন মেইল করে জানিয়ে দেই। শুক্রবার ছাড়াও অন্যান্য সময় ওদের সাথে আড্ডা হলে এই রেফারেন্সগুলো চলেই আসে। আমাদের প্রত্যেকেই অনেক অল্প আয়াসে ৯-১০ গুণ বেশি শিখে ফেলছি। আমার সবচেয়ে ভাল লাগে রাসুলুল্লাহ (স) এর জীবনী অংশটুকু, এ বিষয়ে জানি তুলনামূলকভাবে অনেক কম, তাই সবই শিখছি, আর মুসলিম, নন-মুসলিম বিভিন্ন লেখকের ভিন্ন ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি থেকে ব্যাখ্যা পড়তে পড়তে মনে হয় আমি যেন ঐ পরিবেশেই আছি, এমন ঘটনা আমারও চারপাশে ঘটছে, আমিও রাসুলুল্লাহ (স) এর মত সবচেয়ে অশান্ত সময়ে শান্ত আছি, মানুষের বিদ্রুপের উত্তর দিচ্ছি দু'আর মাধ্যমে। যুদ্ধক্ষেত্রে দাঁড়িয়ে নামাজে মনসংযোগ করে ভুলে যাচ্ছি চারপাশের আর সব প্রতিকূলতা। শুনতে গল্পের মত, তার উপর আছে পারিবারিক, সামাজিক, রাজনৈতিক, ধর্মীয় - সব কিছুরই সংমিশ্রণ, তাই এ সময় সবার মুখে প্রশ্নের ফুলঝুরি ফোটে, সবাই চেষ্টা করে নিজের জীবনে প্রয়োগ করা যায় এমন উদাহরণ মনের লাইব্রেরিতে তুলে রাখতে। 

আল্লাহর দ্বীন জানার উদ্দেশ্যে যারা একত্রিত হয় ফেরেশতারা নাকি তাদের উপর রহমতের ডানা বিছিয়ে দেন, তাদের উপর 'সুকুন' নাযিল হয় (সুকুনের মানে আমি বুঝিয়ে বলতে পারব না, মুভিতে যেমন দেখায় চারপাশে সব স্লো মোশনে চলছে, সবকিছু সুন্দর, নায়কের মুখে স্মিত হাসি ... ঐ ধরণের শান্তি, স্থিরতা, কৃতজ্ঞতার মিশ্র রূপ হচ্ছে 'সুকুন'; দেশে ঝিরি ঝিরি বৃষ্টির মাঝে কৃষ্ণচুড়ায় লাল হয়ে থাকা পথের উপর খালি পায়ে হাঁটলে মনটা যেমন হালকা.. হয়ে যায়, সুকুন তেমনই।) অন্যদের কথা জানিনা, আমি প্রায়ই এরকম 'সুকুন' স্টেট এ থাকি। শরীরটা এত.. হালকা লাগে, হাত পা কোন কিছুর ওজন টের পাইনা। মনের মধ্যে কে যেন বলতে থাকে, সবকিছু এত সুন্দর কেন? এত সুন্দর কেন? আলহামদুলিল্লাহ..., আলহামদুলিল্লাহ ... সত্যি! ঐ সময়টায় আমি যদি মরেও যাই, মনে হয় কেবল চোখটুকু বন্ধ করা ছাড়া আর কোন কিছু করতে হবেনা। 

আমি নিজেকে খুবই ভাগ্যবান মনে করি আমার এই বন্ধুদের জন্য। ওদের সাথে থেকে আমি এত কিছু শিখেছি... আসলে আল্লাহর অনেকগুলি রহমতের মধ্যে এটাও একটা, আমার বন্ধুরা প্রত্যেকের মন এত এত সুন্দর - ওদের সাথে যত সময় কাটাই ততই শিখি। এখন আফসোস হয়, কেন দেশে থাকতে বন্ধুরা মিলে এমন স্টাডি সার্কেল করলাম না! আমি ত চাই আমার প্রিয় মানুষগুলোর প্রত্যেকের উপর ফেরেশতারা রহমতের ডানা বিছিয়ে রাখুক, সবসময়।

ডমেস্টিক ভায়োলেন্স নিয়ে কিছু কথা

'ডমেস্টিক ভায়োলেন্স' শব্দটার সাথে আমার পরিচয়ই ছিল না। আবছা একটা ধারণা ছিল, যেসব নরপশু স্ত্রীর চোখ উপড়ে প্রথম আলোর প্রথম পাতা দখল করে তারাই ওসব ভায়োলেন্স টায়োলেন্স এর সাথে জড়িত। কিন্তু ভায়োলেন্স এর অসংখ্য দিক আছে, যা আমার জানা ছিলনা। জানতাম না ইমোশনাল ভায়োলেন্স বলে একটা কিছু আছে, যেখানে একপক্ষ সারাক্ষণ ভয়ে কাঁটা হয়ে থাকে অপরপক্ষ 'মাইন্ড' করবে দেখে। তাকে খুশি করার জন্য সে যা বলে তাই মেনে নেয়, আপত্তি করলে অবস্থা আরো খারাপের দিকেই যাবে, তাই যা বলে মুখ বুজে মেনে নেয়। ইমোশনাল অ্যাবিউজ একটা চক্র মেনে চলে। প্রথম ধাপে চাপা টেনশন তৈরি হবে, দ্বিতীয় ধাপে তা বার্স্ট করবে, রাগ, কান্না, দোষারোপ - যেভাবেই হোক - আর তৃতীয় ধাপে অনুশোচনা, ক্ষমা প্রার্থনা - যাকে বলে 'হানিমুন পিরিয়ড', অ্যাবিউজার ভীষণ ভাল ব্যবহার করবে, আদর যত্ন হাসি খুশি - অ্যাবিউজড যখন ভাবতে শুরু করবে, সব ঠিক হয়ে গেছে, তখনই প্রথম ধাপের পুনরাবৃত্তি হবে। 

ইমোশনাল অ্যাবিউজের মধ্যে আছে এক পক্ষের অন্য পক্ষকে পূর্ণ কন্ট্রোলের মধ্যে রাখার চেষ্টা, কার সাথে মিশবে, কোথায় যাবে - সে ব্যাপারে সার্বক্ষণিক নজর (লক্ষ্য করুন, কোথায় কার সাথে মিশছে তা খোঁজ নেয়াতে কোন সমস্যা নেই, অভিভাবক হিসেবে তা করাও উচিৎ, কিন্তু) জানার বাইরে কারো সাথে পরিচয় হলে অস্থির হয়ে যাওয়া, রেগে যাওয়া - এসব অ্যাবিউসিভ কনডাক্ট। এছাড়া মানুষের সামনে অপমানজনক নাম ধরে ডাকবে, সমালোচনা করবে, হাসাহাসি করবে, পরিবারের অন্যদের কাছে তার ভুল নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করবে ও পরিবারের অন্যদেরও নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি আনতে উস্কে দেবে - যাতে করে সেই মানুষটা একই সাথে ঘরে কোনঠাসা মনে করে, ও নিজেকে সবকিছুর জন্য অপরাধী ভাবতে থাকে। 

ইমোশনাল অ্যাবিউজ আর খাঁটি দোষের শাস্তি অনেকটা একই রকম, তাই অ্যাবিউজড হচ্ছে যে, সে ভেবে নেয়, এটা ত আমার ভালর জন্যই করা। কিন্তু অ্যাবিউজিভ রিলেশনে মূল উদ্দেশ্য থাকে ডমিনেট করার ইচ্ছা, আর তাকে জাস্টিফাই করার জন্য অ্যাবিউজার বিভিন্ন সামাজিক ও ধর্মীয় অজুহাত দেখায়। 

ধর্মীয় অজুহাতের কথা যখন আসলোই, তখন স্পিরিচুয়াল অ্যাবিউজ নিয়েও বলি। তুমি 'ভাল মুসলিম' এর মত কাজ করছ না, এই অজুহাতে স্বামী/স্ত্রী বা তার আত্মীয় স্বজন অন্যায় সব দাবি চাপিয়ে দিতে পারে, এমনকি মেয়েদের বেলায় বাবার বাড়ি যাওয়ার উপরেও নিষেধাজ্ঞা দিতে পারে। প্যারেন্ট-চাইল্ড রিলেশনশিপেও অমন দেখা যায়। ছেলে মেয়েকে অন্যদের সামনে স্টুপিড, গাধা ইত্যাদি বলে অ্যাবিউজ করলেও, সন্তানের অবাধ্যতা বা অসন্তোষ দেখলে কুরআনের আয়াত টেনে আনবে, জাহান্নামের শাস্তির ভয় দেখাবে। 

যেহেতু এই বিষয়গুলো খুবই স্পর্শকাতর, বিশেষত আমাদের দেশের প্রেক্ষাপটে, তাই কয়েকটা বিষয় স্পষ্ট করে নেয়া ভাল। 

১. সন্তান বাবা মা কে জান্নাতের দরজা হিসেবে ট্রিট করা উচিৎ, এতে কোন মতভেদ নেই, কিন্তু বাবা মা স্বেচ্ছাচারিতা করার অধিকার রাখেন না। আল্লাহর থেকে প্রত্যেকে নিজ নিজ বিবেক ও সিদ্ধান্ত নেয়ার স্বাধীনতা নিয়ে এসেছে। বাবা মা একটা বয়স পর্যন্ত সেই বিবেক কে মজবুত করবেন, এবং সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষমতাটাকে ঘষে মেজে ধারালো করবেন। এবং অবশ্যই মূল লক্ষ্য থাকবে সে যেন নিজের বিচারবুদ্ধির প্রতি আস্থাশীল হয়। রাসুলুল্লাহ (স) নিজের সন্তানের সাথে কেমন আচরণ করতেন বা কিশোর বয়সী সাহাবীদেরও কতটা মর্যাদা দিয়ে কথা বলতেন তা লক্ষ্য করলেই ইসলামে বড়দের প্রতি ছোটদের অধিকার কী এটা পরিষ্কার হয়ে যাবে। 

২. বৈবাহিক সম্পর্কে ছোটখাট অসন্তোষ এড়িয়ে গিয়ে ঘরে শান্তি রাখার চেষ্টা করা, আর নিজের স্বাধীনতা পুরোপুরি ত্যাগ করা - এ দুটো এক জিনিস না। অনেক ছেলেই আছে মায়ের সব রকমের ইমোশনাল অ্যাবিউজ চুপচাপ মেনে নিয়ে নিজের উপরেও জুলুম করছেন, স্ত্রীর উপরেও করছেন। যেটা অন্যায় সেটাকে উপেক্ষা করতে ইসলাম আমাদের শেখায় নি। আমরা মুসলিমরা একে অপরকে ধৈর্য ধরতে উপদেশ দিতে পারি, ধৈর্য ধরতে বাধ্য করতে পারিনা। সুতরাং এ ধরণের সমস্যাকে অন্তত সমস্যা হিসেবে স্বীকার করতেই হবে। 

অ্যাবিউজিভ রিলেশনশিপের শিকার যারা তাদের ব্যক্তিত্ব গঠন চরমভাবে বাধাগ্রস্ত হয়। বিভিন্ন সামাজিক পরিবেশে তারা স্বচ্ছন্দভাবে অংশগ্রহণ করতে ভয় পায়। সমালোচনার প্রতি অতিরিক্ত নাজুক হয়। আত্মবিশ্বাসে ঘাটতি থাকে, কারণ নিজের সিদ্ধান্ত কে বাধাহীন ভাবে প্রয়োগ করার সুযোগ সে খুব একটা পায়নি, পেলেও গঠনমূলক বা উৎসাহব্যঞ্জক প্রতিক্রিয়া পায়নি। সমাজে খুব একটা মেশার সুযোগ হয়না বলে অ্যাবিউজিভ পরিবেশেই বেশির ভাগ সময় কাটাতে হয় - পরিণতিতে মানসিক এই দৈন্যের ব্যাপারটা বহুগুণে বেড়ে যায়। সবচেয়ে ভয়াবহ ব্যাপার হচ্ছে, যারা ডমেস্টিক ভায়োলেন্স এর মধ্যে বড় হয়েছে, তারা এই পরিবেশে অভ্যস্ত হয়ে ওঠে বলে তারাও নিজের জীবনে অ্যাবিউজার হওয়ার সম্ভাবনা বেশি থাকে। 

এই বিষয়গুলো নিয়ে আমাদের সবার সচেতন হওয়া দরকার। পরে হয়ত কখনো আরো গুছিয়ে এ বিষয়ে লিখব।

Wednesday, November 16, 2011

বদরাগ ও সূরা নাস

'রাগ হলে আমার লজিক্যাল সেন্স হারিয়ে যায়। অদ্ভুত সব কারণ একটার উপর একটা যোগ হতে থাকে। আমি নিজের মধ্যে বুঝতে পারি, আমি রাগ করছি কারণ আমার মধ্যে একটা হেরে যাওয়া অনুভূতি হচ্ছে। আমি নিজের মত করে একটা কিছু ভেবে রেখেছিলাম, কিন্তু বাস্তবে তেমন করে হয়নি। আমি হেরে যাচ্ছি, আমার কথা কেউ পাত্তা দিচ্ছেনা, আমার সুযোগ সুবিধার দিকে কারো খেয়াল নেই... আমার উপর অন্যায় হলে দেখার কেউ নেই..'

উপরের কথাগুলো একটু অদল বদল করে দিলে প্রত্যেকেই নিজের ছায়া খুঁজে পাবেন। রাগ এমন এক জিনিস, তখন কে যে কী থেকে কী হয়ে যায়, কোন ঠিকঠিকানা থাকেনা। রাগ আর মাতাল অবস্থার মধ্যে আমি কোন পার্থক্য দেখি না। যে মাদক নেয়া থামাতে পারে না, তাকে আমরা বলি, ওর নিজের উপর কন্ট্রোল নেই। যে রাগ হলে শান্ত হতে পারেনা, তাকেও আমরা বলি, ওর কন্ট্রোল থাকেনা। আফসোস, মাদকাসক্ত কে আমরা দেখি ঘৃণার চোখে, আর বদরাগ কে দেখি কিঞ্চিৎ প্রশ্রয়ের চোখে।

কেন এভাবে রেগে যাই আমরা? আগের কোন রাগকে ট্র্যাক করতে পারবেন? এখানে রাগ বলতে আমি কিন্তু 'অযৌক্তিক রাগ' বুঝাচ্ছি। নিজের উপর অন্যায় হলে যে রাগ হয়, সে রাগের কথা বলছি। যে রাগ কমানোর জন্য মানুষ মেডিটেশনের দ্বারস্থ হয়, ডাক্তারের কাছে মুখ কাঁচুমাচু করে বলে, 'দেখেন ত ডাক্তার সাহেব, আমার প্রেশারটা কি বেশি দেখে এত রাগ উঠে?', সেই রাগের কথা বলছি। আমার রাগের ৯০%ই তৈরি হয় 'এটা অন্যায়' - এই চিন্তা থেকে। এই যেমন বন্ধুরা সবাই মিলে বেড়াতে যাওয়ার প্ল্যান করছি, এর মাঝে একজন বলা নাই কওয়া নাই শেষ মুহূর্তে পিছু হটল। হয়ে গেলাম রাগ, 'তার কি এইটা উচিৎ হইসে?' বাসায় গুরূত্বপূর্ণ কোন সিদ্ধান্ত আমাকে জিজ্ঞাসা ছাড়াই নিয়ে ফেলল। রাগ, 'আমি কি কেউ না?' গ্রুপে মিলে কোন কাজ করছি, একজন ফাঁকিবাজি করল। হয়ে গেল মেজাজ খারাপ, 'ফাইজলামি পাইসে?' প্রত্যেকবারই হয় 'আমার' কমফোর্ট নষ্ট হয়েছে, নয়ত 'আমার' ইগো হার্ট হয়েছে, অথবা 'আমার' তৈরি করা প্ল্যান অনুযায়ী কাজ হয়নি। প্রত্যেকটাই খুব আত্মকেন্দ্রিক কারণ, কিন্তু আমি যখন রেগে যাচ্ছি, তখন আর স্বার্থপরতার ওই দিকটা আর চোখে পড়ছে না, মনে হচ্ছে, আমি বৃহত্তর স্বার্থে অন্যায়ের প্রতি জিরো টলারেন্স দেখাতে রাগ দেখাচ্ছি। অথচ এই ঘটনাটাই অন্যের বেলায় ঘটলে হয়ত আমি মিষ্টি মিষ্টি হেসে ধৈর্য ধরার উপদেশ দিতাম। এ রকম ডাবল স্ট্যান্ডার্ড, হীন একটা চিন্তাকে মনের ভেতর মহৎ বানিয়ে ফেলছে কে?

সূরা নাস এ আল্লাহ আমাদের শিখিয়েছেন শয়তানের অনিষ্টকর কুমন্ত্রণা থেকে আল্লাহর কাছে আশ্রয় চাইতে (মিন শাররিল ওয়াসওয়াসিল খান্নাস।) শয়তান আমাদের কুমন্ত্রণা দেয় - এটা কি আমরা আসলেই বিশ্বাস করতে পারি? মাঝে মধ্যে পারি, কিন্তু বেশির ভাগ সময়ই আমাদের যুক্তিবাদী মন বিশ্বাস করতে চায়না কোন জ্বীন ভূত এসে কুবুদ্ধি দিচ্ছে, আর সেটার ফল আমাদের কাজে এসে পড়ছে। শয়তানকে নিয়ে কারো সাথে রিয়েলিস্টিক আলোচনা করার চেষ্টা করে দেখুন, হাসতে হাসতে আপনাকে উড়ায় ফেলবে, স্কিজোফ্রেনিক রোগীও বানায় ফেলতে পারে। শয়তানকে নিয়ে আমি প্রায়ই চিন্তাভাবনা করি, তারপরেও, এশার নামাজ একটু দেরি করে ফেললে যখন ভী-ষ-ণ আলসেমি লাগে, ঘুমে মনে হয় পড়েই যাব, আর কষ্ট করে নামাজ পড়ে ফেলার সাথে সাথে ঘুমও পালায় - তখনও আমার মনে হয়না এটা শয়তানের কারসাজি। শয়তান এখনও আমার কাছে সামহোয়াট ইমাজিনারি কিছু। আমার বাসা, ল্যাব, ল্যাপটপ - এরা যেমন খুব বাস্তব, শয়তানকে ততটা বাস্তব ধরতে মনের মধ্যে কেমন কেমন যেন লাগে।

রাগের বেলায় শয়তানের ভূমিকা বলার আগে সূরা নাসের পরের লাইনটা আলোচনা করে নেই। আল্লাযি ইয়ুওয়াসয়িসু ফী সুদুরিন নাস, সেই শয়তান, যে মানুষের বুকের মধ্যে বসে কুমন্ত্রণা দেয়। 'ইয়ুওয়াসয়িসু' হচ্ছে ঘটমান বর্তমান ক্রিয়াপদ। চলতেই থাকবে, চলতেই থাকবে। কোন থামাথামি নেই। শয়তান বুকের মধ্যে বসে থাকবে, একটা ফুট কাটবে, আপনি তাকে ধমক দিয়ে থামাবেন, সে একটু দমে যাবে, তারপর মুখটা বাড়ায় আবার আরেকটা কিছু বলবে.. আবারও, আবার... ! আপনি যখন কোন কারণে অফেন্ডেড, আপনার মনের মধ্যে এমনিতেই কিছু নেগেটিভ চিন্তা আছে অফেন্ডারের প্রতি। এখন শয়তান করবে কি, ওই ভদ্রলোকের/ভদ্রমহিলার সাথে আপনার বিগত জীবনে যা যা খারাপ অভিজ্ঞতা হয়েছে সব ছবির মত সামনে তুলে ধরতে থাকবে। একটা করে ছবি দেখবেন, মেজাজ খারাপ বাড়তে থাকবে। শুধু এই না, ছবির নিচে ক্যাপশনের মত একটা এক্সপ্লানেশন ও থাকবে, ও এইটা করসিল, দেখ, সে তোমার জন্য কক্ষণো কেয়ার করে নাই। সবসময় তুমিই করে গেছ... ইত্যাদি ইত্যাদি। কারো উপর রাগ হওয়ার পর তার ভালমানুষির কথাগুলি কি আপনার কখনো মনে পড়ে? আমি কারো উপর রাগ হয়ে আমার স্বামীর কাছে ঝাল ঝাড়লে সে তার ভাল দিকগুলি মনে করিয়ে দেয়ার চেষ্টা করে, কিন্তু আমার তখন আরো রাগ হয়, 'আমি বলতেসি খারাপ আর তুমি ভাল দিক দেখাচ্ছ! আমার ত এখন নিজেকে আরো বেশি খারাপ মনে হচ্ছে!' কী ভয়ংকর ইগো!

যাই হোক, পার্সোনাল ডিসকমফোর্ট আর শয়তানের ওয়াসওয়াসা - এ দুটোই আমাদের জন্য অনেক, তার উপর আরো আছে পারিপার্শ্বিকতার চাপ। আশেপাশের মানুষের উস্কানিতে ঘটনা আরো খারাপের দিকে গেছে - এ রকম দেখেছেন কখনো? আল্লাহ সূরা নাস এর শেষ লাইনে বলেছেন 'মিনাল জিন্নাতি ওয়ান নাস', খারাপ জ্বীন ও মানুষের কুমন্ত্রণা। ওয়াসওয়াসা শুধু বুকের ধারেকাছে ওঁৎ পেতে থাকা বেহায়া শয়তানটাই দেয়না, তার সাঙ্গোপাঙ্গো যারা অন্যদের ভেতর বসে আছে, তারাও একযোগে বুদ্ধি দিতে থাকে, এটা বল, ওটা মনে করিয়ে দাও। ফলাফল... থাক, নাই বা বলি। রাগ করে মানুষ বাসনকোসন ভাঙে, হাত পা ভাঙে। সম্পর্ক ভাঙে, ভাঙে আল্লাহর উপর বিশ্বাসও। তারপর একটা সময় ফলাফল দেখে কান্নায়ও ভেঙে পড়ে।

ফেসবুকে এক ছোট বোন লিখেছিল, মানুষকে চেনার সবচেয়ে ভাল উপায় হল তাকে রাগিয়ে দেয়া। এমনিতে ফেরেশতা, আর রাগিয়ে দিলে মুখের ভাষা শয়তান টাইপ হয়ে যায়। আমি এই বক্তব্যের সাথে একমত না। রাগিয়ে দিলে মুখের ভাষা শয়তান টাইপ হয়, কারণ সে তখন শয়তান আর মানুষের ওয়াসওয়াসা দ্বারা প্রভাবিত হয়। রাসুলুল্লাহ (স) কখনোই মানুষের রাগের অবস্থা বিচার করতেন না। এমন ভাব করতেন, যেন এমন কোন ঘটনা ঘটেই নি। তিনি বুঝতেন, এটা অন্য যে কোন প্রবৃত্তির মতই মানুষের একটা দুর্বলতা। তাই উনি সবচেয়ে শক্তিশালী বলেছেন সেই ভাই বা বোনকে, যে রাগের সময় নিজেকে সংযত রাখতে পারে।

রাগ হলে কী করতে হবে? বলব না। যে সত্যিকারের আন্তরিক সে খুঁজে বের করে নিক। আমি চাই মানুষ বদরাগ কে মাদকাসক্তির মতই এক সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করুক। বদরাগের কারণে যাদের সম্পর্কে ফাটল ধরেছে তারা বিষয়টার ভয়াবহতা নিয়ে অন্যদের সাথে কথা বলুক, মানুষ যেন আরো সচেতন হয়। Domestic violence এর অনেকটুকুই আসে বদরাগ থেকে। ঠান্ডা, সুস্থ মাথায় ভায়োলেন্স করে যাচ্ছে, এরকম কেস আপনি কমই পাবেন। রাগ নিয়ে চিন্তা করুন। যে বদরাগী, সেও, যে ভুক্তভোগী, সেও। চট করে রেগে যাওয়া, লম্বা সময় রাগ ধরে রাখা - এগুলো পরিবার, সমাজের বড়সর ক্ষতি করে ফেলছে। এখন শুনি রিকশাওয়ালার সাথে ঝগড়া হলেই কষে চড় লাগিয়ে দেয় স্কুল কলেজের ছেলেমেয়েরা। রাগ কি কেবল স্টুডেন্টদেরই আছে? আল্লাহ না করুক, এইসব অন্যায় আর অসম্মানের খেসারত যদি আপনার কোন ভাই/বোনের জীবন/সম্মানের বিনিময়ে দিতে হয়, তখন কি একচেটিয়া রিকশাওয়ালাদের দোষারোপ করে পার পাওয়া যাবে?

লেখাটা শেষ করি আমার খুব প্রিয় একটা হাদীস বলে। রাসুলুল্লাহ (স) এর সামনে এক সাহাবীর সাথে আরেকজনের ঝগড়া হচ্ছিল। সাহাবী নম্রভাবে জবাব দিচ্ছিলেন আর ওইপক্ষ একনাগাড়ে গালিগালাজ করেই যাচ্ছিল। তাই দেখে রাসুলুল্লাহ (স) মুচকি মুচকি হাসছিলেন। একটা সময় আর টিকতে না পেরে সাহাবীও উঁচু গলায় জবাব দিতে থাকল, তখন রাসুলুল্লাহ (স) সে জায়গা থেকে সরে গেলেন। ব্যাপারটা সেই সাহাবী লক্ষ করলেন, উনি এসে রাসুলুল্লাহ (স) এর কাছে জানতে চাইলেন, উনি অসন্তুষ্ট হওয়ার কারণ কী। রাসুলুল্লাহ (স) তখন উনাকে জানালেন, তুমি যখন চুপ ছিলে তখন এক ফেরেশতা তোমার হয়ে জবাব দিচ্ছিল। আর তুমি যখন গলা উঁচু করলে, তখন ফেরেশতার বদলে শয়তান এসে জায়গা করে নিল, আর তোমার হয়ে জবাব দিতে থাকল। তাই দেখে আমি চলে এলাম।

Ref:

http://www.youtube.com/watch?v=TTWn8CSM7Vw
http://www.youtube.com/watch?v=BLMHjWz7X-E
http://www.youtube.com/view_play_list?p=15B78B2B348C0A7D
http://bayyinah.com/podcast/ (sura nas)

Tuesday, October 25, 2011

ভালবাসার অদ্ভুত রূপ

ভালবাসা জন্ম নেয় ভালবাসার মৃত্যু দিনে
ভালবাসা শুদ্ধ হয় ভালবাসার স্পর্শ চিনে

গানের রচয়িতা কী বুঝে এই লাইন ক'টি লিখেছেন তিনিই জানেন। ভালবাসা নিয়ে কীই বা লিখব? আজ প্রায় আড়াই যুগ পার করে দিয়েও ভালবাসার জন্য আকুতি একটুও কমাতে পারিনি। আমার জানা ছিলনা, বয়স বাড়লেও ভালবাসা পাওয়ার মনটা বুড়ো হয় না। ছ' বছর বয়সে যেভাবে একটু আদর বা মনোযোগ পাওয়ার জন্য কাতর হয়ে থাকতাম, এতদিন পরে এসেও আকুতিটা প্রায় একই রকম রয়ে গেছে। আমি কোনদিন বুঝিনি, আমার যেমন করে অভিমান হয়, আমার মায়েরও তেমনি করে ভালবাসার অভাবে অসহায় লাগে। আমার ফোকলা দাদী, রোগে শোকে জীর্ণ নানু - জানি না বুকের ভেতর তাদের কত হাজার অভিমান জমা আছে।

ভালবাসা না পেলে কি সবারই বুকের ভেতরটায় একটা খালি খালি ভাব হয়? কণ্ঠনালীর কাছটায় কেমন যেন কাঁপতে থাকে সারাটাক্ষণ। শক্ত করে বালিশটা বুকের মধ্যে চেপে ধরলে মনে হয়, আরও একটু জোরে চাপ দিলে পাঁজরদুটো কাছাকাছি আসবে তখন ফাঁকা জায়গাটা একটু কমবে। আবার অভিমানে চু...প হয়ে স...ব কিছু থেকে নিজেকে গুটিয়ে নিতে ইচ্ছে হয়, যেন পৃথিবীর সাথে আমার যোগাযোগ এতটুকুই, নিঃশ্বাস নেয়া আর দীর্ঘশ্বাস ছাড়া।

আমার নানুরও বোধহয় এমন লাগে, ছোট বাচ্চাদের সাথে উনার পার্থক্য এটুকুই, তারা ডাক ছেড়ে কাঁদতে পারে, আর উনি কেবলই স্থবির হয়ে থাকেন। হয়ত উনার ইচ্ছে হয়, কেউ উনার চুলে তেল দিযে দেবে, রাতে ঘুম না আসলে গল্প করবে - আমার নানুর স্মৃতির এলবামে নানার কোন ছবি নেই। আমার স্বামী নানাশ্বশুরের গল্প শুনতে চেয়েছিল, উনি বলেছিলেন, 'মানুষটা যে কেমন আছিল - রাগী না সরল সোজা, হাসিখুশি না কী.. আমি ত কিসু কইতে পারতাম না।' আমার নানুর কৈশোর, যৌবন সব কেটেছে ছেলে মেয়ে মানুষ করে আর গেরস্থালি করে। নয়টা বাচ্চার একটা দুষ্টুমি করলে সব ক'টাকে লাগাতার পেটাতেন। অসম্ভব গল্পের বই পড়ার নেশা ছিল উনার। বাচ্চারা ঘুমালে নাকি রাতে কেরোসিনের কুপি জ্বালিয়ে মশারির মধ্যে গল্পের বই পড়তেন। আমাদের বাসায় আসলেও, রান্না আর বই পড়া - এই দেখেছি কেবল উনার।

বাইরে আসার পরে নানুর জন্য যে কত... বার করে মন খারাপ হয়েছে - কীভাবে কীভাবে যেন উনার সাথে আমার মনের একটা মিল পেতাম। শহরে থাকতে ভাল লাগে না - তাই গ্রামে এই বয়সেও একা থাকেন। উনার কাছে কিন্তু বুকের মধ্যে করে নিয়ে ভালবাসা দেয়ার মত কেউ নেই। একা একা না জানি কতবার করে পুরনো দিনের কথা ভাবেন। আর আমি? স্বামীর সাথে আছি, অনেকের জন্য ঈর্ষণীয় অবস্থানে আছি - তারপরেও শীতের রাতে একলা বাস স্ট্যাণ্ডে দাঁড়িয়ে যত দূর পর্যন্ত চোখ যায় - আপন কাউকে দেখিনা। হঠাৎ করে ঘুম ভেঙে যায়, আম্মুর মাথাব্যথা - আমার হাতটা আম্মুর কপালে - এই স্বপ্ন দেখে। আমার ত আম্মু একটাই, নানুর নয় নয়টা সন্তান -- জানিনা, বুকের পাঁজর কতটুকু দোমড়ালে শূন্যতাটুকু আড়াল করা যায়।

দেশের বাইরে বুকের মধ্যে নিয়ে আগলে রাখার কেউ নেই। ভালবাসা না পেয়ে একটা একটা করে যেন কোমলতাগুলো কোথায় হারিয়ে যায়। কণ্ঠস্বরে আবেগের পরিমাণ কমে আসে, নস্টালজিয়া ঢাকতে দেশের ব্যাপারে উপেক্ষা - আর সারাটাক্ষণ চাপা উদ্বেগ, কোন দুঃসংবাদ এল কি? তাই ভাবি, যে বাচ্চাটা বড় হওয়ার আগেই মাকে হারিয়েছে, তার জীবনটা কেমন হয়? যে মেয়েটা খুব খুব শুদ্ধ অনুভূতি দিয়ে কাউকে আপন করার স্বপ্ন দেখেছে - স্বপ্ন ভাঙার পরে তার দিনগুলো কেমন হয়? প্রতারণা, স্বার্থপরতা - পরিবারের আপন মানুষগুলোর থেকে এসব দেখার পর একটা যুবক কোথায় গিয়ে আশ্রয় নেয়? প্রিয় মানুষগুলোর থেকে আমার ত তবু বাধা দূরত্বের, কারো হয়ত সে বাধা বিশ্বাসের, কারো হয়ত জীবন আর মৃত্যুর।

ভালবাসা ছাড়া মানুষ বাঁচে কী করে? ভালবাসা একটা প্রয়োজন, যে কাছের মানুষের কাছে না পায়, সে দূরের মানুষের কাছে খুঁজতে যায়। আর দূরের মানুষও যখন কাছে আসেনা - তখন না জানি কত কত কিছুতে নিস্ফল ভালবাসার আকুতি নিয়ে ঠুকরে মরে।

একটা অদ্ভুত ভালবাসার কথা অনেকেই জানেনা। মনটার মধ্যে যখন কোন খারাপ চিন্তা থাকেনা, কোন উদ্ধতভাব না, কোন দুশ্চিন্তা না - যখন মনের ভেতর থেকে অনেক অনেক গভীর থেকে আলহামদুলিল্লাহ মনে আসে, মাথাটা এলিয়ে দিয়ে চুপ করে সময়টাকে ভালবাসতে ইচ্ছে করে - তখন কেমন যেন অদ্ভুউ..ত এক অনুভূতি হয়। আস্তে আস্তে নিঃশ্বাসটা ভারি হয়ে আসে, মনে হয় একটা ভারি চাদরের মত কিছু একটা আমাকে ঢেকে দিচ্ছে। মনে হয় এই আবরণ আমাকে সব কষ্ট থেকে আড়াল করে রাখবে, কোন কষ্ট নেই, কোন একাকীত্ব না। আমার যাই হারিয়ে যাক, আমি কখনও একা হব না। এই অদ্ভুত ভাললাগাটা আমার চোখ ভিজিয়ে দেয়, আমার গলা ভারি হয়ে আসে .. সারাটা শরীর খুউব হালকা লাগে। আর বুকের ভেতরটা - আমার প্রাণের স্পন্দন আমি টের পাই। উচ্ছ্বল এক ছন্দ। ঝর্ণার শব্দের মত। আমি জানিনা আগের সাথে পরের কী এমন ঘটে যায়, আমি শুধু টের পাই, আমার জীবনটা অনেক সুন্দর। আমার ভালবাসার একটুকু অভাব নেই কোথাও। আল্লাহ আমাকে খুব ভালবাসে। আমি তাঁর কাছে ছোট্ট অবুঝ এক শিশু। আমার জীবনটা এই মাত্র শুরু হল। আমি মাত্র হাঁটতে শিখেছি, পেছনে তাকানোর আমার কিছু নেই। আমি হাঁটব, সামনের দিকে। আমাকে যারা ভালবাসে তারা অনেক প্রত্যাশা নিয়ে হাত বাড়িয়ে আছে, আর একটু পথ সামনে এগোলেই বুকে জড়িয়ে নেবে।

এমনি অদ্ভুত এই ভালবাসার অনুভূতিটা বুঝতে আমার অনেক সময় লেগেছিল, কিন্তু যখন বুঝতে পারলাম, মনে হল, এই অনুভূতির মত সুন্দর কিছু হয়না। এই একটা বোধ নিয়ে জীবন কাটানো যায়। কখনও মনে হবেনা, যে আমাকে ভালবাসার কেউ নেই। খুব কাছের মানুষটার অবহেলায়ও মনে হবে - 'আমার এত এত ভালবাসাকে ও হারিয়ে দিল, আজ আমি পৃথিবীর সবাইকে ভালবেসে জয়ী হব।'

Thursday, October 6, 2011

আসরের চারটি উপদেশ

সূরা আসর এর তাফসির শুনে আমি এতই মুগ্ধ, এর মূল বক্তব্য স্পর্শ না করেও আরো অনেক খুঁটিনাটি নিয়ে লেখালেখি করতে ইচ্ছে করছে। এই যেমন এই সূরার শেষ আয়াতটা। এখানে আগের দুই আয়াতের (চাইলে আগের লেখাটা পড়ে আসতে পারেন) বিপরীত কথা লেখা হয়েছে। অর্থাৎ আল্লাহর এত শক্ত সতর্কবাণী শুনে আমরা যখন পুরোপুরি নিজের মধ্যে নিশ্চিত হব যে খুসর এ পতিত আর কেউ না, আমি। তারপর দিশেহারা হয়ে এর পথ খুঁজব, তখন আল্লাহরই নির্দেশিত পথে আমরা নিজেদের বাঁচানোর চেষ্টা করব। আল্লাহর নির্দেশিত পথ কী কী? আমানু (বিশ্বাস), আমিলুস সালিহা (ভাল করা), তাওয়াসাও বিল হাক্ক (consult with/to truth), তাওয়াসাও বিস সাবর (consult with/to patience).

আল্লাহ নির্দিষ্ট করে বলেননি কীসে বিশ্বাস, কী ভাল করা, কাকে পরামর্শ দেয়া, কোন ক্ষেত্রে পরামর্শ দেয়া। সুতরাং আল্লাহর দেখানো পথের ক্ষেত্র অনেক অনেক বিস্তৃত। খুসর থেকে বাঁচতে চাইলে উপরের চারটি কাজের যে কোন একটি বা দুটি বেশি করে করলেই হবে না। চারটিই করতে হবে। বিশ্বাস এনে ভাল ভাল কাজ করে কারো সাতে পাঁচে না থাকলেই বেঁচে গেলাম - এরকম সুবিধাবাদী এপ্রোচের সুযোগ নেই। নতুন নতুন ইসলামপন্থী হয়ে পরিবারে দাওয়াহ দিতে গিয়ে চরম ঝাড়ি খেয়ে - এদের সাথে কোন সম্পর্ক রাখব না - এত সহজ সমীকরণে অঙ্ক কষারও উপায় নেই। সৎ কাজের পরামর্শ দিয়ে যেতেই হবে, আন্তরিকভাবে, ধৈর্যের সাথে।

তাওয়াসাও শব্দটি ওয়াসিয়ত শব্দের ক্রিয়ারূপ। আমরা জানি ওয়াসিয়ত মানে উইল করে যাওয়া বা সম্পত্তি হ্যান্ডওভার করে যাওয়া। মানুষ তার প্রিয় জিনিস উইল করে যায় তাকেই যাকে সে ভালবাসে ও তার উন্নতি চায়। আপনি যদি জানেন আগামীকালের পর আপনি আর পৃথিবীতে থাকবেন না, তখন আপনার প্রিয় মানুষগুলোকে যা যা বলে যেতে চাইবেন - যতটা উদ্বেগের সাথে, তাওয়াসাও বিল হাক্ক ও যেন ততটাই আন্তরিক হয়। ওয়াসিয়ত শুধু মূল্যবান সম্পদ প্রিয় মানুষকে সমর্পণ করাই নয়, এর মধ্যে উভয়পক্ষের সম্মতি থাকতে হবে। একটা সমঝোতা থাকতে হবে। সংশোধন বা পরামর্শ এমনভাবে দিতে হবে যাতে সে মানুষটা ছোট না মনে করে। আসলেও, আপনি যদি একজনকে খুব ভালবাসেন, তাকে ছোট করতে বা তার মনটায় কষ্ট দিতে আপনার ইচ্ছে হবেনা। কিন্তু আপনি এটাও চান না আল্লাহর সামনে তার কোন দোষের জন্য সে ছোট হোক। সুতরাং সত্যি কথাটা তাকে উইল হিসেবে দেয়ার জন্য আপনার পূর্ণ আন্তরিকতা দেখাতে হবে। আপনার বক্তব্যের কমনীয়তায়, আপনার ব্যবহারের উদারতায় যেন অপর মানুষটা আপনার উদ্দেশ্য সম্পর্কে পুরোপুরি নিশ্চিত হয়।

যদি আপনার সকল চেষ্টার পরেও উদ্দেশ্য সফল না হয়? যদি সে মানুষটা আপনাকে ভুল বোঝে? যদি মুখের উপর বলে বসে, তুমি আমার ব্যাপারে কথা বলার কে? যদি তিনি আপনার বাবা হন, ভাই হন, স্বামী হন? আপনি কষ্ট পাবেন, সেটাই স্বাভাবিক। কিন্তু আল্লাহ প্রদত্ত মুশকিল আসানের চার নম্বর টিপ, তাওয়াসাও বিস সাবর ব্যবহার করা আপনার এখনো বাকি আছে।

দাম্পত্য সিরিজ টা লিখতে গিয়ে বারবারই মনে হত, এত কথার দরকার কী? সূরা আসর এর চারটা উপদেশ মনে করিয়ে দিলেই ত হয়। আসলে ইনিয়ে বিনিয়ে ঘুরিয়ে পেঁচিয়ে আমরা কোন না কোন ভাবে এই চারটা কাজই করার চেষ্টা করি। কখনও আল্লাহর প্রতি আন্তরিক আস্থা রেখে সহ্য করা, কখনও নিজের ব্যবহার অটুট রেখে উদাহরণ তৈরি করা, কখনও সুন্দরভাবে ভুল শুধরে দেয়া, কখনও শুধুই ধৈর্য ধরতে বলা। সম্পর্কগুলোতে চিড় ধরে যখন আমরা এর কোন একটা স্টেজ এ এসে ব্যর্থ হয়ে পড়ি।

কেউ কেউ বলেন এই চারটি কাজ হচ্ছে ধাপের মত। প্রথম ধাপ বিশ্বাস আনা, আপনার বিশ্বাস শক্ত হলে সে অনুযায়ী আমল করা, তারপর ধীরে ধীরে বাকি দুটো। কেউ কেউ বলেন চেয়ারের চারটি পায়ের মত। একটা ছাড়া অন্যগুলি টিকতে পারবেনা। তবে এটুকু বুঝি, একটা থেকে পরের টাতে যেতে গেলে পিঠের চামড়া শক্ত করে করে এগুতে হবে। ইসলামের মূল কনসেপ্টটা একটু বোঝার পর গতানুগতিক চিন্তাধারার সাথে এর শকিং কনট্রাস্ট দেখে নিজের সাথে বেশ অনেকটা যুদ্ধ করতে হয়েছে। কারণ এর জন্য আমাকে অনেক মোহই মন থেকে মুছে ফেলতে হয়েছে। সবচেয়ে কঠিন লেগেছিল আল্লাহ ও রাসুল (স) কে অন্য যে কারো চেয়ে বেশি ভালবাসতে হবে। তার মানে আমার বয়ফ্রেণ্ড এর কথা যতক্ষণ ভাবব তার চেয়ে বেশিক্ষণ মনের মধ্যে থাকবে আল্লাহর কথা। আম্মুর মন খারাপ দেখলে যতটুকু অস্থির হই, রাসুলুল্লাহ (স) কষ্ট পেতে পারেন এমন সব ব্যাপারে তার চেয়েও অনেক বেশি যত্নবান হতে হবে। আমিলুস সালিহাও প্রথম প্রথম খুব সহজ কিছু ছিলনা। এখনও পাঁচ ওয়াক্ত নামাজের জন্য প্রবৃত্তির সাথে যুদ্ধ করতে হয়। আচরণে, বেশভূষায় পরিবর্তন আসাতে আশপাশের মানুষগুলোকেও অভ্যস্ত করতে সময় দিতে হয়। এটুকু পর্যন্ত তাও চলে। তৃতীয় আর চতুর্থ ধাপ যে কতটা ভয়াবহ রকমের কঠিন তা আমি জানি প্রত্যেকে নিজেকে দিয়ে বোঝেন। আমি ভুলেই গিয়েছিলাম প্রায় যে আমার চাচা কে নসীহত করা আমার দায়িত্ব, আমার বান্ধবীদের সাথে এসব অস্বস্তিকর আলোচনাগুলো আনতে হবে। মনের কোন এক কোণে বিশ্বাস হয়ে গিয়েছিল যার যার ব্যাপার তার তার থাকাই ভাল, কিন্তু না! জাহান্নামের আগুন থেকে আমি বাঁচতে চাইলে তাদের প্রতি আমার দায়িত্ব আমি এড়াতে পারবনা।

এই সূরার বক্তব্যের একটা প্রতিকী গল্প এমন -

আপনি ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে চমৎকার সব স্বপ্ন দেখছেন। হঠাৎ ঘুম চটে গিয়ে দেখলেন আপনি পানিতে ডুবে যাচ্ছেন। আপনার হাতে সময় নেই। আপনি প্রবলভাবে হাত পা ছোড়াছুড়ি করে ডুবে যাওয়া থেকে বাঁচার চেষ্টা করছেন, আস্তে আস্তে শিখে গেলেন এভাবে পা নাড়ালে ভেসে থাকা যায়। তারপরেও কী করে যেন একটু একটু করে তলিয়ে যাচ্ছেন। চারপাশে তাকিয়ে দেখলেন আপনার পায়ে শেকল বাঁধা, তার সাথে জোড়া লাগানো রয়েছে আপনার কাজিন, আপনি তাকেও ঘুম থেকে জাগালেন, দু'জন মিলে সাঁতরাতে শুরু করলেন, এবারে আপনাকে টেনে ধরছে আপনার দাদী, আপনার মা, বাবা, বন্ধুরা। তারা বলল, রিয়েলিটি অনেক কঠিন, এর চেয়ে আমার ঘুমই ভাল। তারা আবার ঘুমিয়ে যেতে চাইল। কিন্তু আপনি কিছুতেই তাদের ঘুমোতে যেতে দিতে পারেন না। সজ্ঞানে সবাইকে নিয়ে ডুবে যাওয়ার মত বুদ্ধিহীন আপনি নন। আপনাকে বাঁচতেই হবে। যে করেই হোক।

আসর (সময়)

এই ছোট্ট তিন আয়াতের সূরাটা সম্পর্কে লিখতে বসে কোথা থেকে শুরু করব ভেবে কূল কিনারা করতে পারছিনা। একবার মনে হচ্ছে যা শিখেছি সব লিখি, আবার ভাবছি যার আগ্রহ আছে সে ত নিজেই শিখে নিতে পারবে, বরং আমাদের জীবনে কীভাবে কাজে লাগাতে পারি তাই নিয়ে লিখি। আল্লাহর উপর সম্পূর্ণ ভরসা করে শুরু করলাম, জানিনা শেষ পর্যন্ত আল্লাহর আয়াতের কতটুকু মর্যাদা দিতে পারব।

কারো যদি সূরা আসর টা পড়া না হয়ে থাকে তার সুবিধার জন্য মোটামুটি একটা তর্জমা দিচ্ছি।

১. শপথ সময়ের (ওয়াল আসর)
২. নিশ্চয়ই প্রত্যেকটি মানুষ নি:সন্দেহে ক্ষতির মধ্যে রয়েছে (ইন্নাল ইনসানা লা ফী খুসর)
৩. শুধুমাত্র তারা ব্যতীত, যারা (ইল্লাল্লাযীনা)
- বিশ্বাস করেছে এবং (আ'মানু ওয়া)
- সৎকর্ম করেছে এবং (আ'মিলুস সালিহাতি ওয়া)
- উপদেশ দিয়েছে সত্যের দিকে / সততার সাথে এবং (তাওয়াসাও বিল হাক্ব ওয়া)
- উপদেশ দিয়েছে ধৈর্যের দিকে / ধৈর্যের সাথে (তাওয়াসাও বিস সাবর)

ছোট্ট সূরা। সিম্পল কথাবার্তা, কুরআনের অন্যান্য সব সূরায় যেমন সতর্কবাণী থাকে এখানেও তেমনই। কিন্তু এই সূরার গঠন, পূর্ণাঙ্গতা, শব্দচয়ন সবকিছু চিন্তা করলে রীতিমত ভয় লাগে। প্রথমেই বলি, আল্লাহ কুরআনে অনেক বস্তু নিয়েই শপথ করেছেন, (যেমন সূরা ত্বীন, সূরা শামস্, সূরা আদিয়াত), শপথ নিয়ে শুরু করা সূরার ধারাবাহিকতায় শেষ সূরা হচ্ছে সূরা আসর, এর পরে আর কোন সূরায় আল্লাহ কোন কিছুর শপথ করে কিছু বলেন নি। তিনি কিসের শপথ নিলেন? সময়ের। কেন? সময়কে এত সম্মান কেন? কারণ প্রত্যেকটি মানুষের জীবনে আল্লাহর দেয়া সবচেয়ে বড় অনুগ্রহ সময়। ধনী হোক, গরীব হোক, অ্যাথলিট হোক, পঙ্গু হোক - সবার জন্য সময়ের দয়া সমান পরিমাণে আছে। একটা জিনিসের মূল্য আরো বেশি মনে হয় যখন জানি একে ধরে রাখা যাবেনা। দেশের বাইরে থেকে তিন সপ্তাহের জন্য দেশে বেড়াতে গেলে এর মর্ম আমরা হাড়ে হাড়ে টের পাই। আল্লাহ সেই সময়ের শপথ করেছেন, ওয়াল আসর - যেখানে আসর এর শব্দগত উৎপত্তি 'আসীর' বা ফলের রস থেকে, নিংড়ে বের করতে গেলে যাকে কখনোই হাতের মুঠোয় ধরে রাখা যায়না।

এই আসর বা সময় শুধু সদা প্রবহমান - এটা বুঝাতেই ওয়াল আসর বলা হয়নি। আসর সাক্ষ্য দিচ্ছে যে প্রত্যেকটি মানুষ সত্যি সত্যি ক্ষতিগ্রস্ত। সময় একইসাথে গতিশীল, কিন্তু মহাকালের বিবেচনায় সবটুকু মিলিয়ে স্থানুও বটে। আমাদের হাসি খেলা, ইঁদুর দৌড়, পরষ্পরকে দোষারোপ, সামান্য অর্জনে আস্ফালন - তারপর একদিন নিরবে প্রস্থান - সব কিছুর সাক্ষী হয়ে আছে সময়। যে একই সাথে ছোট্ট শিশুর মত চঞ্চল, আবার শতবর্ষী ঋষির মত গম্ভীর। ইতিহাসের পাতার অসংখ্য সফল জাতির উত্থান ও পতন সময় দেখেছে, দেখেছে খুব সফল জননেতাকেও মৃত্যুর পরে ধূলোয় মিশে যেতে। আমাদের এত আয়োজন, এত আত্মম্ভরিতা - কিছুই সময়কে টানেনা, কারণ সে জানে এর শেষ হবে একটু পরেই।

এটা খুব অবাক করা ব্যাপার, আল্লাহ প্রত্যেকটা মানুষকে এত বড় একটা জিনিসের শপথ করে বলল ক্ষতিগ্রস্ত? আল্লাহ ইনসান না বলে কাফির বলতে পারত! মুশরিক বলতে পারত! ইনসান কেন? ইনসান দিয়ে ত বোঝায় পুরো পৃথিবীতে যত মানুষ আছে, বা যারা আগে চলে গেছে তাদের প্রত্যেকে আলাদা আলাদা করে। আমার ডিপার্টমেন্ট এর চেয়ারম্যান সব স্টুডেন্ট কে ডেকে যদি বলে, নূসরাত, you r in deep trouble, জেসি, you need to be careful, মমতা..., মারলন..., ব্রায়ান..., ক্যাথি - তাহলে যেমন ভয়ে আমাদের সবার আত্মা উড়ে যাবে, ইনসান ততটাই স্পেসিফিক। তাও একবার না, 'ইন্না' আর 'লা' একই বাক্যে দু দুটো অব্যয় ব্যবহার করে বাক্যটাকে খুবই জোরালো করা হয়েছে। প্রথমে 'আসর' দিয়ে শপথ, এক এক করে সবার দিকে অঙ্গুলি নির্দেশ, তারপর 'ইন্না' আর 'লা' দিয়ে এর গুরূত্ব দশ পনের গুণ বাড়িয়ে দেয়া - এই সূরায় আল্লাহ যেন মানুষের জন্য এক্সট্রিম এক্সট্রিম সতর্কবাণী দিয়েছেন।

আল্লাহ বললেন আমরা সবাই খুসর এর মধ্যে আছি। খুসর বলতে কিন্তু ছোটখাট ক্ষতি বোঝায় না। ব্যবসা করতে নেমে মূলধন সহ খুইয়ে নিঃস্ব হওয়া হচ্ছে 'খুসর।' আপনার পাঁচতলার ফ্ল্যাটে আগুনে আটকা পড়া হচ্ছে খুসর। অজ্ঞান অবস্থায় পানিতে পড়া খুসর। মোদ্দা কথা, সারভাইভাল এর প্রশ্ন যেখানে, যেখানে এই ক্ষতি থেকে উদ্ধার পাওয়া ছাড়া আর সব কিছু গৌণ হয়ে যায় - তাই খুসর। আল্লাহ কেন বললেন আমাদের জীবন নিয়ে টানাটানি? তিনি কি দেখেন না, আমরা দিব্যি বেঁচে বর্তে আছি? আমরা ত শেষ দিবসে বিশ্বাস করি, আর সাধ্যমত ইবাদত ও করি। তাহলে কেন তিনি ঘোর নাস্তিক এর সাথে আমাদের একই কাতারে ফেললেন?

উত্তর একটাই। সময়। আল্লাহ মানুষকে সৃষ্টি করে তাদের থেকে কমিটমেন্ট নিয়েছেন যে তারা নিজেদের 'আক্বল' বা ইন্টেলেক্ট ব্যবহার করে স্বেচ্ছায়, সজ্ঞানে আল্লাহর পছন্দসই কাজ করবে। আমরা পৃথিবীতে কতসময় থাকব সেটা অনেক আগেই ঠিক করা। এসময়টায় কী করব সেটাও হলফ করে আল্লাহর কাছে বলে এসেছি। ভাবতে গেলে মনে হয় সময়টাই যেন আমাদের একটা টুল। আল্লাহর কাছে প্রতিজ্ঞা করে ধার নিয়ে এসেছি। আল্লাহ দেখছেন তাঁর এই অনুগ্রহের কী সদ্ব্যবহার আমরা করছি। অনেকটা এমন, আমরা একটা বিশাল বালিঘড়ির নিচের অংশে আছি। একটা একটা করে বালি উপর থেকে পড়ছে, কথা ছিল তাই দিয়ে আমরা আল্লাহর নাম গুলি লিখব। কিন্তু সব ভুলে তাই দিয়ে আমরা ঘর বাড়ি বানাচ্ছি, ছাদটাকে ছোঁয়ার সিড়ি বানাচ্ছি। আল্লাহ সব দেখছেন, আমাদের মনে করিয়ে দেয়ার জন্য রাসুল পাঠাচ্ছেন, তাঁরা কাঁচের দেয়ালের বাইরে থেকে বারবার আমাদের নিষেধ করছেন, আমরা ফিরেও তাকাচ্ছিনা। বালিঘড়ির শেষ বালিটা যখন তার যাত্রা শেষ করবে, জীবনের দীপটা নিভে যাবে, আল্লাহর সামনে দাঁড়াব নতমুখে, তখন আমাদের হয়ে সাক্ষ্য দেবে আমাদেরই তৈরি বালির ঘর, নষ্ট করা সময়।

http://bayyinah.com/podcast/2010/01/19/103-asr-part-1/ 
http://bayyinah.com/podcast/2010/01/19/103-asr-part-2/