Wednesday, November 16, 2011

বদরাগ ও সূরা নাস

'রাগ হলে আমার লজিক্যাল সেন্স হারিয়ে যায়। অদ্ভুত সব কারণ একটার উপর একটা যোগ হতে থাকে। আমি নিজের মধ্যে বুঝতে পারি, আমি রাগ করছি কারণ আমার মধ্যে একটা হেরে যাওয়া অনুভূতি হচ্ছে। আমি নিজের মত করে একটা কিছু ভেবে রেখেছিলাম, কিন্তু বাস্তবে তেমন করে হয়নি। আমি হেরে যাচ্ছি, আমার কথা কেউ পাত্তা দিচ্ছেনা, আমার সুযোগ সুবিধার দিকে কারো খেয়াল নেই... আমার উপর অন্যায় হলে দেখার কেউ নেই..'

উপরের কথাগুলো একটু অদল বদল করে দিলে প্রত্যেকেই নিজের ছায়া খুঁজে পাবেন। রাগ এমন এক জিনিস, তখন কে যে কী থেকে কী হয়ে যায়, কোন ঠিকঠিকানা থাকেনা। রাগ আর মাতাল অবস্থার মধ্যে আমি কোন পার্থক্য দেখি না। যে মাদক নেয়া থামাতে পারে না, তাকে আমরা বলি, ওর নিজের উপর কন্ট্রোল নেই। যে রাগ হলে শান্ত হতে পারেনা, তাকেও আমরা বলি, ওর কন্ট্রোল থাকেনা। আফসোস, মাদকাসক্ত কে আমরা দেখি ঘৃণার চোখে, আর বদরাগ কে দেখি কিঞ্চিৎ প্রশ্রয়ের চোখে।

কেন এভাবে রেগে যাই আমরা? আগের কোন রাগকে ট্র্যাক করতে পারবেন? এখানে রাগ বলতে আমি কিন্তু 'অযৌক্তিক রাগ' বুঝাচ্ছি। নিজের উপর অন্যায় হলে যে রাগ হয়, সে রাগের কথা বলছি। যে রাগ কমানোর জন্য মানুষ মেডিটেশনের দ্বারস্থ হয়, ডাক্তারের কাছে মুখ কাঁচুমাচু করে বলে, 'দেখেন ত ডাক্তার সাহেব, আমার প্রেশারটা কি বেশি দেখে এত রাগ উঠে?', সেই রাগের কথা বলছি। আমার রাগের ৯০%ই তৈরি হয় 'এটা অন্যায়' - এই চিন্তা থেকে। এই যেমন বন্ধুরা সবাই মিলে বেড়াতে যাওয়ার প্ল্যান করছি, এর মাঝে একজন বলা নাই কওয়া নাই শেষ মুহূর্তে পিছু হটল। হয়ে গেলাম রাগ, 'তার কি এইটা উচিৎ হইসে?' বাসায় গুরূত্বপূর্ণ কোন সিদ্ধান্ত আমাকে জিজ্ঞাসা ছাড়াই নিয়ে ফেলল। রাগ, 'আমি কি কেউ না?' গ্রুপে মিলে কোন কাজ করছি, একজন ফাঁকিবাজি করল। হয়ে গেল মেজাজ খারাপ, 'ফাইজলামি পাইসে?' প্রত্যেকবারই হয় 'আমার' কমফোর্ট নষ্ট হয়েছে, নয়ত 'আমার' ইগো হার্ট হয়েছে, অথবা 'আমার' তৈরি করা প্ল্যান অনুযায়ী কাজ হয়নি। প্রত্যেকটাই খুব আত্মকেন্দ্রিক কারণ, কিন্তু আমি যখন রেগে যাচ্ছি, তখন আর স্বার্থপরতার ওই দিকটা আর চোখে পড়ছে না, মনে হচ্ছে, আমি বৃহত্তর স্বার্থে অন্যায়ের প্রতি জিরো টলারেন্স দেখাতে রাগ দেখাচ্ছি। অথচ এই ঘটনাটাই অন্যের বেলায় ঘটলে হয়ত আমি মিষ্টি মিষ্টি হেসে ধৈর্য ধরার উপদেশ দিতাম। এ রকম ডাবল স্ট্যান্ডার্ড, হীন একটা চিন্তাকে মনের ভেতর মহৎ বানিয়ে ফেলছে কে?

সূরা নাস এ আল্লাহ আমাদের শিখিয়েছেন শয়তানের অনিষ্টকর কুমন্ত্রণা থেকে আল্লাহর কাছে আশ্রয় চাইতে (মিন শাররিল ওয়াসওয়াসিল খান্নাস।) শয়তান আমাদের কুমন্ত্রণা দেয় - এটা কি আমরা আসলেই বিশ্বাস করতে পারি? মাঝে মধ্যে পারি, কিন্তু বেশির ভাগ সময়ই আমাদের যুক্তিবাদী মন বিশ্বাস করতে চায়না কোন জ্বীন ভূত এসে কুবুদ্ধি দিচ্ছে, আর সেটার ফল আমাদের কাজে এসে পড়ছে। শয়তানকে নিয়ে কারো সাথে রিয়েলিস্টিক আলোচনা করার চেষ্টা করে দেখুন, হাসতে হাসতে আপনাকে উড়ায় ফেলবে, স্কিজোফ্রেনিক রোগীও বানায় ফেলতে পারে। শয়তানকে নিয়ে আমি প্রায়ই চিন্তাভাবনা করি, তারপরেও, এশার নামাজ একটু দেরি করে ফেললে যখন ভী-ষ-ণ আলসেমি লাগে, ঘুমে মনে হয় পড়েই যাব, আর কষ্ট করে নামাজ পড়ে ফেলার সাথে সাথে ঘুমও পালায় - তখনও আমার মনে হয়না এটা শয়তানের কারসাজি। শয়তান এখনও আমার কাছে সামহোয়াট ইমাজিনারি কিছু। আমার বাসা, ল্যাব, ল্যাপটপ - এরা যেমন খুব বাস্তব, শয়তানকে ততটা বাস্তব ধরতে মনের মধ্যে কেমন কেমন যেন লাগে।

রাগের বেলায় শয়তানের ভূমিকা বলার আগে সূরা নাসের পরের লাইনটা আলোচনা করে নেই। আল্লাযি ইয়ুওয়াসয়িসু ফী সুদুরিন নাস, সেই শয়তান, যে মানুষের বুকের মধ্যে বসে কুমন্ত্রণা দেয়। 'ইয়ুওয়াসয়িসু' হচ্ছে ঘটমান বর্তমান ক্রিয়াপদ। চলতেই থাকবে, চলতেই থাকবে। কোন থামাথামি নেই। শয়তান বুকের মধ্যে বসে থাকবে, একটা ফুট কাটবে, আপনি তাকে ধমক দিয়ে থামাবেন, সে একটু দমে যাবে, তারপর মুখটা বাড়ায় আবার আরেকটা কিছু বলবে.. আবারও, আবার... ! আপনি যখন কোন কারণে অফেন্ডেড, আপনার মনের মধ্যে এমনিতেই কিছু নেগেটিভ চিন্তা আছে অফেন্ডারের প্রতি। এখন শয়তান করবে কি, ওই ভদ্রলোকের/ভদ্রমহিলার সাথে আপনার বিগত জীবনে যা যা খারাপ অভিজ্ঞতা হয়েছে সব ছবির মত সামনে তুলে ধরতে থাকবে। একটা করে ছবি দেখবেন, মেজাজ খারাপ বাড়তে থাকবে। শুধু এই না, ছবির নিচে ক্যাপশনের মত একটা এক্সপ্লানেশন ও থাকবে, ও এইটা করসিল, দেখ, সে তোমার জন্য কক্ষণো কেয়ার করে নাই। সবসময় তুমিই করে গেছ... ইত্যাদি ইত্যাদি। কারো উপর রাগ হওয়ার পর তার ভালমানুষির কথাগুলি কি আপনার কখনো মনে পড়ে? আমি কারো উপর রাগ হয়ে আমার স্বামীর কাছে ঝাল ঝাড়লে সে তার ভাল দিকগুলি মনে করিয়ে দেয়ার চেষ্টা করে, কিন্তু আমার তখন আরো রাগ হয়, 'আমি বলতেসি খারাপ আর তুমি ভাল দিক দেখাচ্ছ! আমার ত এখন নিজেকে আরো বেশি খারাপ মনে হচ্ছে!' কী ভয়ংকর ইগো!

যাই হোক, পার্সোনাল ডিসকমফোর্ট আর শয়তানের ওয়াসওয়াসা - এ দুটোই আমাদের জন্য অনেক, তার উপর আরো আছে পারিপার্শ্বিকতার চাপ। আশেপাশের মানুষের উস্কানিতে ঘটনা আরো খারাপের দিকে গেছে - এ রকম দেখেছেন কখনো? আল্লাহ সূরা নাস এর শেষ লাইনে বলেছেন 'মিনাল জিন্নাতি ওয়ান নাস', খারাপ জ্বীন ও মানুষের কুমন্ত্রণা। ওয়াসওয়াসা শুধু বুকের ধারেকাছে ওঁৎ পেতে থাকা বেহায়া শয়তানটাই দেয়না, তার সাঙ্গোপাঙ্গো যারা অন্যদের ভেতর বসে আছে, তারাও একযোগে বুদ্ধি দিতে থাকে, এটা বল, ওটা মনে করিয়ে দাও। ফলাফল... থাক, নাই বা বলি। রাগ করে মানুষ বাসনকোসন ভাঙে, হাত পা ভাঙে। সম্পর্ক ভাঙে, ভাঙে আল্লাহর উপর বিশ্বাসও। তারপর একটা সময় ফলাফল দেখে কান্নায়ও ভেঙে পড়ে।

ফেসবুকে এক ছোট বোন লিখেছিল, মানুষকে চেনার সবচেয়ে ভাল উপায় হল তাকে রাগিয়ে দেয়া। এমনিতে ফেরেশতা, আর রাগিয়ে দিলে মুখের ভাষা শয়তান টাইপ হয়ে যায়। আমি এই বক্তব্যের সাথে একমত না। রাগিয়ে দিলে মুখের ভাষা শয়তান টাইপ হয়, কারণ সে তখন শয়তান আর মানুষের ওয়াসওয়াসা দ্বারা প্রভাবিত হয়। রাসুলুল্লাহ (স) কখনোই মানুষের রাগের অবস্থা বিচার করতেন না। এমন ভাব করতেন, যেন এমন কোন ঘটনা ঘটেই নি। তিনি বুঝতেন, এটা অন্য যে কোন প্রবৃত্তির মতই মানুষের একটা দুর্বলতা। তাই উনি সবচেয়ে শক্তিশালী বলেছেন সেই ভাই বা বোনকে, যে রাগের সময় নিজেকে সংযত রাখতে পারে।

রাগ হলে কী করতে হবে? বলব না। যে সত্যিকারের আন্তরিক সে খুঁজে বের করে নিক। আমি চাই মানুষ বদরাগ কে মাদকাসক্তির মতই এক সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করুক। বদরাগের কারণে যাদের সম্পর্কে ফাটল ধরেছে তারা বিষয়টার ভয়াবহতা নিয়ে অন্যদের সাথে কথা বলুক, মানুষ যেন আরো সচেতন হয়। Domestic violence এর অনেকটুকুই আসে বদরাগ থেকে। ঠান্ডা, সুস্থ মাথায় ভায়োলেন্স করে যাচ্ছে, এরকম কেস আপনি কমই পাবেন। রাগ নিয়ে চিন্তা করুন। যে বদরাগী, সেও, যে ভুক্তভোগী, সেও। চট করে রেগে যাওয়া, লম্বা সময় রাগ ধরে রাখা - এগুলো পরিবার, সমাজের বড়সর ক্ষতি করে ফেলছে। এখন শুনি রিকশাওয়ালার সাথে ঝগড়া হলেই কষে চড় লাগিয়ে দেয় স্কুল কলেজের ছেলেমেয়েরা। রাগ কি কেবল স্টুডেন্টদেরই আছে? আল্লাহ না করুক, এইসব অন্যায় আর অসম্মানের খেসারত যদি আপনার কোন ভাই/বোনের জীবন/সম্মানের বিনিময়ে দিতে হয়, তখন কি একচেটিয়া রিকশাওয়ালাদের দোষারোপ করে পার পাওয়া যাবে?

লেখাটা শেষ করি আমার খুব প্রিয় একটা হাদীস বলে। রাসুলুল্লাহ (স) এর সামনে এক সাহাবীর সাথে আরেকজনের ঝগড়া হচ্ছিল। সাহাবী নম্রভাবে জবাব দিচ্ছিলেন আর ওইপক্ষ একনাগাড়ে গালিগালাজ করেই যাচ্ছিল। তাই দেখে রাসুলুল্লাহ (স) মুচকি মুচকি হাসছিলেন। একটা সময় আর টিকতে না পেরে সাহাবীও উঁচু গলায় জবাব দিতে থাকল, তখন রাসুলুল্লাহ (স) সে জায়গা থেকে সরে গেলেন। ব্যাপারটা সেই সাহাবী লক্ষ করলেন, উনি এসে রাসুলুল্লাহ (স) এর কাছে জানতে চাইলেন, উনি অসন্তুষ্ট হওয়ার কারণ কী। রাসুলুল্লাহ (স) তখন উনাকে জানালেন, তুমি যখন চুপ ছিলে তখন এক ফেরেশতা তোমার হয়ে জবাব দিচ্ছিল। আর তুমি যখন গলা উঁচু করলে, তখন ফেরেশতার বদলে শয়তান এসে জায়গা করে নিল, আর তোমার হয়ে জবাব দিতে থাকল। তাই দেখে আমি চলে এলাম।

Ref:

http://www.youtube.com/watch?v=TTWn8CSM7Vw
http://www.youtube.com/watch?v=BLMHjWz7X-E
http://www.youtube.com/view_play_list?p=15B78B2B348C0A7D
http://bayyinah.com/podcast/ (sura nas)

Tuesday, October 25, 2011

ভালবাসার অদ্ভুত রূপ

ভালবাসা জন্ম নেয় ভালবাসার মৃত্যু দিনে
ভালবাসা শুদ্ধ হয় ভালবাসার স্পর্শ চিনে

গানের রচয়িতা কী বুঝে এই লাইন ক'টি লিখেছেন তিনিই জানেন। ভালবাসা নিয়ে কীই বা লিখব? আজ প্রায় আড়াই যুগ পার করে দিয়েও ভালবাসার জন্য আকুতি একটুও কমাতে পারিনি। আমার জানা ছিলনা, বয়স বাড়লেও ভালবাসা পাওয়ার মনটা বুড়ো হয় না। ছ' বছর বয়সে যেভাবে একটু আদর বা মনোযোগ পাওয়ার জন্য কাতর হয়ে থাকতাম, এতদিন পরে এসেও আকুতিটা প্রায় একই রকম রয়ে গেছে। আমি কোনদিন বুঝিনি, আমার যেমন করে অভিমান হয়, আমার মায়েরও তেমনি করে ভালবাসার অভাবে অসহায় লাগে। আমার ফোকলা দাদী, রোগে শোকে জীর্ণ নানু - জানি না বুকের ভেতর তাদের কত হাজার অভিমান জমা আছে।

ভালবাসা না পেলে কি সবারই বুকের ভেতরটায় একটা খালি খালি ভাব হয়? কণ্ঠনালীর কাছটায় কেমন যেন কাঁপতে থাকে সারাটাক্ষণ। শক্ত করে বালিশটা বুকের মধ্যে চেপে ধরলে মনে হয়, আরও একটু জোরে চাপ দিলে পাঁজরদুটো কাছাকাছি আসবে তখন ফাঁকা জায়গাটা একটু কমবে। আবার অভিমানে চু...প হয়ে স...ব কিছু থেকে নিজেকে গুটিয়ে নিতে ইচ্ছে হয়, যেন পৃথিবীর সাথে আমার যোগাযোগ এতটুকুই, নিঃশ্বাস নেয়া আর দীর্ঘশ্বাস ছাড়া।

আমার নানুরও বোধহয় এমন লাগে, ছোট বাচ্চাদের সাথে উনার পার্থক্য এটুকুই, তারা ডাক ছেড়ে কাঁদতে পারে, আর উনি কেবলই স্থবির হয়ে থাকেন। হয়ত উনার ইচ্ছে হয়, কেউ উনার চুলে তেল দিযে দেবে, রাতে ঘুম না আসলে গল্প করবে - আমার নানুর স্মৃতির এলবামে নানার কোন ছবি নেই। আমার স্বামী নানাশ্বশুরের গল্প শুনতে চেয়েছিল, উনি বলেছিলেন, 'মানুষটা যে কেমন আছিল - রাগী না সরল সোজা, হাসিখুশি না কী.. আমি ত কিসু কইতে পারতাম না।' আমার নানুর কৈশোর, যৌবন সব কেটেছে ছেলে মেয়ে মানুষ করে আর গেরস্থালি করে। নয়টা বাচ্চার একটা দুষ্টুমি করলে সব ক'টাকে লাগাতার পেটাতেন। অসম্ভব গল্পের বই পড়ার নেশা ছিল উনার। বাচ্চারা ঘুমালে নাকি রাতে কেরোসিনের কুপি জ্বালিয়ে মশারির মধ্যে গল্পের বই পড়তেন। আমাদের বাসায় আসলেও, রান্না আর বই পড়া - এই দেখেছি কেবল উনার।

বাইরে আসার পরে নানুর জন্য যে কত... বার করে মন খারাপ হয়েছে - কীভাবে কীভাবে যেন উনার সাথে আমার মনের একটা মিল পেতাম। শহরে থাকতে ভাল লাগে না - তাই গ্রামে এই বয়সেও একা থাকেন। উনার কাছে কিন্তু বুকের মধ্যে করে নিয়ে ভালবাসা দেয়ার মত কেউ নেই। একা একা না জানি কতবার করে পুরনো দিনের কথা ভাবেন। আর আমি? স্বামীর সাথে আছি, অনেকের জন্য ঈর্ষণীয় অবস্থানে আছি - তারপরেও শীতের রাতে একলা বাস স্ট্যাণ্ডে দাঁড়িয়ে যত দূর পর্যন্ত চোখ যায় - আপন কাউকে দেখিনা। হঠাৎ করে ঘুম ভেঙে যায়, আম্মুর মাথাব্যথা - আমার হাতটা আম্মুর কপালে - এই স্বপ্ন দেখে। আমার ত আম্মু একটাই, নানুর নয় নয়টা সন্তান -- জানিনা, বুকের পাঁজর কতটুকু দোমড়ালে শূন্যতাটুকু আড়াল করা যায়।

দেশের বাইরে বুকের মধ্যে নিয়ে আগলে রাখার কেউ নেই। ভালবাসা না পেয়ে একটা একটা করে যেন কোমলতাগুলো কোথায় হারিয়ে যায়। কণ্ঠস্বরে আবেগের পরিমাণ কমে আসে, নস্টালজিয়া ঢাকতে দেশের ব্যাপারে উপেক্ষা - আর সারাটাক্ষণ চাপা উদ্বেগ, কোন দুঃসংবাদ এল কি? তাই ভাবি, যে বাচ্চাটা বড় হওয়ার আগেই মাকে হারিয়েছে, তার জীবনটা কেমন হয়? যে মেয়েটা খুব খুব শুদ্ধ অনুভূতি দিয়ে কাউকে আপন করার স্বপ্ন দেখেছে - স্বপ্ন ভাঙার পরে তার দিনগুলো কেমন হয়? প্রতারণা, স্বার্থপরতা - পরিবারের আপন মানুষগুলোর থেকে এসব দেখার পর একটা যুবক কোথায় গিয়ে আশ্রয় নেয়? প্রিয় মানুষগুলোর থেকে আমার ত তবু বাধা দূরত্বের, কারো হয়ত সে বাধা বিশ্বাসের, কারো হয়ত জীবন আর মৃত্যুর।

ভালবাসা ছাড়া মানুষ বাঁচে কী করে? ভালবাসা একটা প্রয়োজন, যে কাছের মানুষের কাছে না পায়, সে দূরের মানুষের কাছে খুঁজতে যায়। আর দূরের মানুষও যখন কাছে আসেনা - তখন না জানি কত কত কিছুতে নিস্ফল ভালবাসার আকুতি নিয়ে ঠুকরে মরে।

একটা অদ্ভুত ভালবাসার কথা অনেকেই জানেনা। মনটার মধ্যে যখন কোন খারাপ চিন্তা থাকেনা, কোন উদ্ধতভাব না, কোন দুশ্চিন্তা না - যখন মনের ভেতর থেকে অনেক অনেক গভীর থেকে আলহামদুলিল্লাহ মনে আসে, মাথাটা এলিয়ে দিয়ে চুপ করে সময়টাকে ভালবাসতে ইচ্ছে করে - তখন কেমন যেন অদ্ভুউ..ত এক অনুভূতি হয়। আস্তে আস্তে নিঃশ্বাসটা ভারি হয়ে আসে, মনে হয় একটা ভারি চাদরের মত কিছু একটা আমাকে ঢেকে দিচ্ছে। মনে হয় এই আবরণ আমাকে সব কষ্ট থেকে আড়াল করে রাখবে, কোন কষ্ট নেই, কোন একাকীত্ব না। আমার যাই হারিয়ে যাক, আমি কখনও একা হব না। এই অদ্ভুত ভাললাগাটা আমার চোখ ভিজিয়ে দেয়, আমার গলা ভারি হয়ে আসে .. সারাটা শরীর খুউব হালকা লাগে। আর বুকের ভেতরটা - আমার প্রাণের স্পন্দন আমি টের পাই। উচ্ছ্বল এক ছন্দ। ঝর্ণার শব্দের মত। আমি জানিনা আগের সাথে পরের কী এমন ঘটে যায়, আমি শুধু টের পাই, আমার জীবনটা অনেক সুন্দর। আমার ভালবাসার একটুকু অভাব নেই কোথাও। আল্লাহ আমাকে খুব ভালবাসে। আমি তাঁর কাছে ছোট্ট অবুঝ এক শিশু। আমার জীবনটা এই মাত্র শুরু হল। আমি মাত্র হাঁটতে শিখেছি, পেছনে তাকানোর আমার কিছু নেই। আমি হাঁটব, সামনের দিকে। আমাকে যারা ভালবাসে তারা অনেক প্রত্যাশা নিয়ে হাত বাড়িয়ে আছে, আর একটু পথ সামনে এগোলেই বুকে জড়িয়ে নেবে।

এমনি অদ্ভুত এই ভালবাসার অনুভূতিটা বুঝতে আমার অনেক সময় লেগেছিল, কিন্তু যখন বুঝতে পারলাম, মনে হল, এই অনুভূতির মত সুন্দর কিছু হয়না। এই একটা বোধ নিয়ে জীবন কাটানো যায়। কখনও মনে হবেনা, যে আমাকে ভালবাসার কেউ নেই। খুব কাছের মানুষটার অবহেলায়ও মনে হবে - 'আমার এত এত ভালবাসাকে ও হারিয়ে দিল, আজ আমি পৃথিবীর সবাইকে ভালবেসে জয়ী হব।'

Thursday, October 6, 2011

আসরের চারটি উপদেশ

সূরা আসর এর তাফসির শুনে আমি এতই মুগ্ধ, এর মূল বক্তব্য স্পর্শ না করেও আরো অনেক খুঁটিনাটি নিয়ে লেখালেখি করতে ইচ্ছে করছে। এই যেমন এই সূরার শেষ আয়াতটা। এখানে আগের দুই আয়াতের (চাইলে আগের লেখাটা পড়ে আসতে পারেন) বিপরীত কথা লেখা হয়েছে। অর্থাৎ আল্লাহর এত শক্ত সতর্কবাণী শুনে আমরা যখন পুরোপুরি নিজের মধ্যে নিশ্চিত হব যে খুসর এ পতিত আর কেউ না, আমি। তারপর দিশেহারা হয়ে এর পথ খুঁজব, তখন আল্লাহরই নির্দেশিত পথে আমরা নিজেদের বাঁচানোর চেষ্টা করব। আল্লাহর নির্দেশিত পথ কী কী? আমানু (বিশ্বাস), আমিলুস সালিহা (ভাল করা), তাওয়াসাও বিল হাক্ক (consult with/to truth), তাওয়াসাও বিস সাবর (consult with/to patience).

আল্লাহ নির্দিষ্ট করে বলেননি কীসে বিশ্বাস, কী ভাল করা, কাকে পরামর্শ দেয়া, কোন ক্ষেত্রে পরামর্শ দেয়া। সুতরাং আল্লাহর দেখানো পথের ক্ষেত্র অনেক অনেক বিস্তৃত। খুসর থেকে বাঁচতে চাইলে উপরের চারটি কাজের যে কোন একটি বা দুটি বেশি করে করলেই হবে না। চারটিই করতে হবে। বিশ্বাস এনে ভাল ভাল কাজ করে কারো সাতে পাঁচে না থাকলেই বেঁচে গেলাম - এরকম সুবিধাবাদী এপ্রোচের সুযোগ নেই। নতুন নতুন ইসলামপন্থী হয়ে পরিবারে দাওয়াহ দিতে গিয়ে চরম ঝাড়ি খেয়ে - এদের সাথে কোন সম্পর্ক রাখব না - এত সহজ সমীকরণে অঙ্ক কষারও উপায় নেই। সৎ কাজের পরামর্শ দিয়ে যেতেই হবে, আন্তরিকভাবে, ধৈর্যের সাথে।

তাওয়াসাও শব্দটি ওয়াসিয়ত শব্দের ক্রিয়ারূপ। আমরা জানি ওয়াসিয়ত মানে উইল করে যাওয়া বা সম্পত্তি হ্যান্ডওভার করে যাওয়া। মানুষ তার প্রিয় জিনিস উইল করে যায় তাকেই যাকে সে ভালবাসে ও তার উন্নতি চায়। আপনি যদি জানেন আগামীকালের পর আপনি আর পৃথিবীতে থাকবেন না, তখন আপনার প্রিয় মানুষগুলোকে যা যা বলে যেতে চাইবেন - যতটা উদ্বেগের সাথে, তাওয়াসাও বিল হাক্ক ও যেন ততটাই আন্তরিক হয়। ওয়াসিয়ত শুধু মূল্যবান সম্পদ প্রিয় মানুষকে সমর্পণ করাই নয়, এর মধ্যে উভয়পক্ষের সম্মতি থাকতে হবে। একটা সমঝোতা থাকতে হবে। সংশোধন বা পরামর্শ এমনভাবে দিতে হবে যাতে সে মানুষটা ছোট না মনে করে। আসলেও, আপনি যদি একজনকে খুব ভালবাসেন, তাকে ছোট করতে বা তার মনটায় কষ্ট দিতে আপনার ইচ্ছে হবেনা। কিন্তু আপনি এটাও চান না আল্লাহর সামনে তার কোন দোষের জন্য সে ছোট হোক। সুতরাং সত্যি কথাটা তাকে উইল হিসেবে দেয়ার জন্য আপনার পূর্ণ আন্তরিকতা দেখাতে হবে। আপনার বক্তব্যের কমনীয়তায়, আপনার ব্যবহারের উদারতায় যেন অপর মানুষটা আপনার উদ্দেশ্য সম্পর্কে পুরোপুরি নিশ্চিত হয়।

যদি আপনার সকল চেষ্টার পরেও উদ্দেশ্য সফল না হয়? যদি সে মানুষটা আপনাকে ভুল বোঝে? যদি মুখের উপর বলে বসে, তুমি আমার ব্যাপারে কথা বলার কে? যদি তিনি আপনার বাবা হন, ভাই হন, স্বামী হন? আপনি কষ্ট পাবেন, সেটাই স্বাভাবিক। কিন্তু আল্লাহ প্রদত্ত মুশকিল আসানের চার নম্বর টিপ, তাওয়াসাও বিস সাবর ব্যবহার করা আপনার এখনো বাকি আছে।

দাম্পত্য সিরিজ টা লিখতে গিয়ে বারবারই মনে হত, এত কথার দরকার কী? সূরা আসর এর চারটা উপদেশ মনে করিয়ে দিলেই ত হয়। আসলে ইনিয়ে বিনিয়ে ঘুরিয়ে পেঁচিয়ে আমরা কোন না কোন ভাবে এই চারটা কাজই করার চেষ্টা করি। কখনও আল্লাহর প্রতি আন্তরিক আস্থা রেখে সহ্য করা, কখনও নিজের ব্যবহার অটুট রেখে উদাহরণ তৈরি করা, কখনও সুন্দরভাবে ভুল শুধরে দেয়া, কখনও শুধুই ধৈর্য ধরতে বলা। সম্পর্কগুলোতে চিড় ধরে যখন আমরা এর কোন একটা স্টেজ এ এসে ব্যর্থ হয়ে পড়ি।

কেউ কেউ বলেন এই চারটি কাজ হচ্ছে ধাপের মত। প্রথম ধাপ বিশ্বাস আনা, আপনার বিশ্বাস শক্ত হলে সে অনুযায়ী আমল করা, তারপর ধীরে ধীরে বাকি দুটো। কেউ কেউ বলেন চেয়ারের চারটি পায়ের মত। একটা ছাড়া অন্যগুলি টিকতে পারবেনা। তবে এটুকু বুঝি, একটা থেকে পরের টাতে যেতে গেলে পিঠের চামড়া শক্ত করে করে এগুতে হবে। ইসলামের মূল কনসেপ্টটা একটু বোঝার পর গতানুগতিক চিন্তাধারার সাথে এর শকিং কনট্রাস্ট দেখে নিজের সাথে বেশ অনেকটা যুদ্ধ করতে হয়েছে। কারণ এর জন্য আমাকে অনেক মোহই মন থেকে মুছে ফেলতে হয়েছে। সবচেয়ে কঠিন লেগেছিল আল্লাহ ও রাসুল (স) কে অন্য যে কারো চেয়ে বেশি ভালবাসতে হবে। তার মানে আমার বয়ফ্রেণ্ড এর কথা যতক্ষণ ভাবব তার চেয়ে বেশিক্ষণ মনের মধ্যে থাকবে আল্লাহর কথা। আম্মুর মন খারাপ দেখলে যতটুকু অস্থির হই, রাসুলুল্লাহ (স) কষ্ট পেতে পারেন এমন সব ব্যাপারে তার চেয়েও অনেক বেশি যত্নবান হতে হবে। আমিলুস সালিহাও প্রথম প্রথম খুব সহজ কিছু ছিলনা। এখনও পাঁচ ওয়াক্ত নামাজের জন্য প্রবৃত্তির সাথে যুদ্ধ করতে হয়। আচরণে, বেশভূষায় পরিবর্তন আসাতে আশপাশের মানুষগুলোকেও অভ্যস্ত করতে সময় দিতে হয়। এটুকু পর্যন্ত তাও চলে। তৃতীয় আর চতুর্থ ধাপ যে কতটা ভয়াবহ রকমের কঠিন তা আমি জানি প্রত্যেকে নিজেকে দিয়ে বোঝেন। আমি ভুলেই গিয়েছিলাম প্রায় যে আমার চাচা কে নসীহত করা আমার দায়িত্ব, আমার বান্ধবীদের সাথে এসব অস্বস্তিকর আলোচনাগুলো আনতে হবে। মনের কোন এক কোণে বিশ্বাস হয়ে গিয়েছিল যার যার ব্যাপার তার তার থাকাই ভাল, কিন্তু না! জাহান্নামের আগুন থেকে আমি বাঁচতে চাইলে তাদের প্রতি আমার দায়িত্ব আমি এড়াতে পারবনা।

এই সূরার বক্তব্যের একটা প্রতিকী গল্প এমন -

আপনি ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে চমৎকার সব স্বপ্ন দেখছেন। হঠাৎ ঘুম চটে গিয়ে দেখলেন আপনি পানিতে ডুবে যাচ্ছেন। আপনার হাতে সময় নেই। আপনি প্রবলভাবে হাত পা ছোড়াছুড়ি করে ডুবে যাওয়া থেকে বাঁচার চেষ্টা করছেন, আস্তে আস্তে শিখে গেলেন এভাবে পা নাড়ালে ভেসে থাকা যায়। তারপরেও কী করে যেন একটু একটু করে তলিয়ে যাচ্ছেন। চারপাশে তাকিয়ে দেখলেন আপনার পায়ে শেকল বাঁধা, তার সাথে জোড়া লাগানো রয়েছে আপনার কাজিন, আপনি তাকেও ঘুম থেকে জাগালেন, দু'জন মিলে সাঁতরাতে শুরু করলেন, এবারে আপনাকে টেনে ধরছে আপনার দাদী, আপনার মা, বাবা, বন্ধুরা। তারা বলল, রিয়েলিটি অনেক কঠিন, এর চেয়ে আমার ঘুমই ভাল। তারা আবার ঘুমিয়ে যেতে চাইল। কিন্তু আপনি কিছুতেই তাদের ঘুমোতে যেতে দিতে পারেন না। সজ্ঞানে সবাইকে নিয়ে ডুবে যাওয়ার মত বুদ্ধিহীন আপনি নন। আপনাকে বাঁচতেই হবে। যে করেই হোক।

আসর (সময়)

এই ছোট্ট তিন আয়াতের সূরাটা সম্পর্কে লিখতে বসে কোথা থেকে শুরু করব ভেবে কূল কিনারা করতে পারছিনা। একবার মনে হচ্ছে যা শিখেছি সব লিখি, আবার ভাবছি যার আগ্রহ আছে সে ত নিজেই শিখে নিতে পারবে, বরং আমাদের জীবনে কীভাবে কাজে লাগাতে পারি তাই নিয়ে লিখি। আল্লাহর উপর সম্পূর্ণ ভরসা করে শুরু করলাম, জানিনা শেষ পর্যন্ত আল্লাহর আয়াতের কতটুকু মর্যাদা দিতে পারব।

কারো যদি সূরা আসর টা পড়া না হয়ে থাকে তার সুবিধার জন্য মোটামুটি একটা তর্জমা দিচ্ছি।

১. শপথ সময়ের (ওয়াল আসর)
২. নিশ্চয়ই প্রত্যেকটি মানুষ নি:সন্দেহে ক্ষতির মধ্যে রয়েছে (ইন্নাল ইনসানা লা ফী খুসর)
৩. শুধুমাত্র তারা ব্যতীত, যারা (ইল্লাল্লাযীনা)
- বিশ্বাস করেছে এবং (আ'মানু ওয়া)
- সৎকর্ম করেছে এবং (আ'মিলুস সালিহাতি ওয়া)
- উপদেশ দিয়েছে সত্যের দিকে / সততার সাথে এবং (তাওয়াসাও বিল হাক্ব ওয়া)
- উপদেশ দিয়েছে ধৈর্যের দিকে / ধৈর্যের সাথে (তাওয়াসাও বিস সাবর)

ছোট্ট সূরা। সিম্পল কথাবার্তা, কুরআনের অন্যান্য সব সূরায় যেমন সতর্কবাণী থাকে এখানেও তেমনই। কিন্তু এই সূরার গঠন, পূর্ণাঙ্গতা, শব্দচয়ন সবকিছু চিন্তা করলে রীতিমত ভয় লাগে। প্রথমেই বলি, আল্লাহ কুরআনে অনেক বস্তু নিয়েই শপথ করেছেন, (যেমন সূরা ত্বীন, সূরা শামস্, সূরা আদিয়াত), শপথ নিয়ে শুরু করা সূরার ধারাবাহিকতায় শেষ সূরা হচ্ছে সূরা আসর, এর পরে আর কোন সূরায় আল্লাহ কোন কিছুর শপথ করে কিছু বলেন নি। তিনি কিসের শপথ নিলেন? সময়ের। কেন? সময়কে এত সম্মান কেন? কারণ প্রত্যেকটি মানুষের জীবনে আল্লাহর দেয়া সবচেয়ে বড় অনুগ্রহ সময়। ধনী হোক, গরীব হোক, অ্যাথলিট হোক, পঙ্গু হোক - সবার জন্য সময়ের দয়া সমান পরিমাণে আছে। একটা জিনিসের মূল্য আরো বেশি মনে হয় যখন জানি একে ধরে রাখা যাবেনা। দেশের বাইরে থেকে তিন সপ্তাহের জন্য দেশে বেড়াতে গেলে এর মর্ম আমরা হাড়ে হাড়ে টের পাই। আল্লাহ সেই সময়ের শপথ করেছেন, ওয়াল আসর - যেখানে আসর এর শব্দগত উৎপত্তি 'আসীর' বা ফলের রস থেকে, নিংড়ে বের করতে গেলে যাকে কখনোই হাতের মুঠোয় ধরে রাখা যায়না।

এই আসর বা সময় শুধু সদা প্রবহমান - এটা বুঝাতেই ওয়াল আসর বলা হয়নি। আসর সাক্ষ্য দিচ্ছে যে প্রত্যেকটি মানুষ সত্যি সত্যি ক্ষতিগ্রস্ত। সময় একইসাথে গতিশীল, কিন্তু মহাকালের বিবেচনায় সবটুকু মিলিয়ে স্থানুও বটে। আমাদের হাসি খেলা, ইঁদুর দৌড়, পরষ্পরকে দোষারোপ, সামান্য অর্জনে আস্ফালন - তারপর একদিন নিরবে প্রস্থান - সব কিছুর সাক্ষী হয়ে আছে সময়। যে একই সাথে ছোট্ট শিশুর মত চঞ্চল, আবার শতবর্ষী ঋষির মত গম্ভীর। ইতিহাসের পাতার অসংখ্য সফল জাতির উত্থান ও পতন সময় দেখেছে, দেখেছে খুব সফল জননেতাকেও মৃত্যুর পরে ধূলোয় মিশে যেতে। আমাদের এত আয়োজন, এত আত্মম্ভরিতা - কিছুই সময়কে টানেনা, কারণ সে জানে এর শেষ হবে একটু পরেই।

এটা খুব অবাক করা ব্যাপার, আল্লাহ প্রত্যেকটা মানুষকে এত বড় একটা জিনিসের শপথ করে বলল ক্ষতিগ্রস্ত? আল্লাহ ইনসান না বলে কাফির বলতে পারত! মুশরিক বলতে পারত! ইনসান কেন? ইনসান দিয়ে ত বোঝায় পুরো পৃথিবীতে যত মানুষ আছে, বা যারা আগে চলে গেছে তাদের প্রত্যেকে আলাদা আলাদা করে। আমার ডিপার্টমেন্ট এর চেয়ারম্যান সব স্টুডেন্ট কে ডেকে যদি বলে, নূসরাত, you r in deep trouble, জেসি, you need to be careful, মমতা..., মারলন..., ব্রায়ান..., ক্যাথি - তাহলে যেমন ভয়ে আমাদের সবার আত্মা উড়ে যাবে, ইনসান ততটাই স্পেসিফিক। তাও একবার না, 'ইন্না' আর 'লা' একই বাক্যে দু দুটো অব্যয় ব্যবহার করে বাক্যটাকে খুবই জোরালো করা হয়েছে। প্রথমে 'আসর' দিয়ে শপথ, এক এক করে সবার দিকে অঙ্গুলি নির্দেশ, তারপর 'ইন্না' আর 'লা' দিয়ে এর গুরূত্ব দশ পনের গুণ বাড়িয়ে দেয়া - এই সূরায় আল্লাহ যেন মানুষের জন্য এক্সট্রিম এক্সট্রিম সতর্কবাণী দিয়েছেন।

আল্লাহ বললেন আমরা সবাই খুসর এর মধ্যে আছি। খুসর বলতে কিন্তু ছোটখাট ক্ষতি বোঝায় না। ব্যবসা করতে নেমে মূলধন সহ খুইয়ে নিঃস্ব হওয়া হচ্ছে 'খুসর।' আপনার পাঁচতলার ফ্ল্যাটে আগুনে আটকা পড়া হচ্ছে খুসর। অজ্ঞান অবস্থায় পানিতে পড়া খুসর। মোদ্দা কথা, সারভাইভাল এর প্রশ্ন যেখানে, যেখানে এই ক্ষতি থেকে উদ্ধার পাওয়া ছাড়া আর সব কিছু গৌণ হয়ে যায় - তাই খুসর। আল্লাহ কেন বললেন আমাদের জীবন নিয়ে টানাটানি? তিনি কি দেখেন না, আমরা দিব্যি বেঁচে বর্তে আছি? আমরা ত শেষ দিবসে বিশ্বাস করি, আর সাধ্যমত ইবাদত ও করি। তাহলে কেন তিনি ঘোর নাস্তিক এর সাথে আমাদের একই কাতারে ফেললেন?

উত্তর একটাই। সময়। আল্লাহ মানুষকে সৃষ্টি করে তাদের থেকে কমিটমেন্ট নিয়েছেন যে তারা নিজেদের 'আক্বল' বা ইন্টেলেক্ট ব্যবহার করে স্বেচ্ছায়, সজ্ঞানে আল্লাহর পছন্দসই কাজ করবে। আমরা পৃথিবীতে কতসময় থাকব সেটা অনেক আগেই ঠিক করা। এসময়টায় কী করব সেটাও হলফ করে আল্লাহর কাছে বলে এসেছি। ভাবতে গেলে মনে হয় সময়টাই যেন আমাদের একটা টুল। আল্লাহর কাছে প্রতিজ্ঞা করে ধার নিয়ে এসেছি। আল্লাহ দেখছেন তাঁর এই অনুগ্রহের কী সদ্ব্যবহার আমরা করছি। অনেকটা এমন, আমরা একটা বিশাল বালিঘড়ির নিচের অংশে আছি। একটা একটা করে বালি উপর থেকে পড়ছে, কথা ছিল তাই দিয়ে আমরা আল্লাহর নাম গুলি লিখব। কিন্তু সব ভুলে তাই দিয়ে আমরা ঘর বাড়ি বানাচ্ছি, ছাদটাকে ছোঁয়ার সিড়ি বানাচ্ছি। আল্লাহ সব দেখছেন, আমাদের মনে করিয়ে দেয়ার জন্য রাসুল পাঠাচ্ছেন, তাঁরা কাঁচের দেয়ালের বাইরে থেকে বারবার আমাদের নিষেধ করছেন, আমরা ফিরেও তাকাচ্ছিনা। বালিঘড়ির শেষ বালিটা যখন তার যাত্রা শেষ করবে, জীবনের দীপটা নিভে যাবে, আল্লাহর সামনে দাঁড়াব নতমুখে, তখন আমাদের হয়ে সাক্ষ্য দেবে আমাদেরই তৈরি বালির ঘর, নষ্ট করা সময়।

http://bayyinah.com/podcast/2010/01/19/103-asr-part-1/ 
http://bayyinah.com/podcast/2010/01/19/103-asr-part-2/

বাড়ি ফেরার প্রতীক্ষায়

নিউইয়র্কে সাবওয়ের এক লোকাল ট্রেনে বসে ঢুলছেন নাম না জানা ভদ্রলোক, অফিস ফেরত, মধ্যবয়সী। চেহারায় দেশী ছাপ স্পষ্ট। আমেরিকায় কত প্রজন্ম চলছে কে জানে। ন'টা পাঁচটা অফিস করে পৌনে এক ঘন্টা জার্নি করে পড়ন্ত বিকেলে বাড়ি ফিরছেন, সঙ্গী এক রাশ ক্লান্তি।

অফিস শেষ হলেই মুহিব সাহেবের মেজাজটা খারাপ হয়ে যায়। সেই ত ঘরে ফেরা, স্ত্রীর সাথে দূরত্ব, ছেলে মেয়েদের বেয়াদবি দেখেও না দেখার ভান করা। ধূউউউর.. কীসের জন্য এত কিছু করা? সারাদিন গাধার খাটনি খেটে ফিরি, কারো কোন খেয়াল আছে, মানুষটা বেঁচে আছে না মরে গেছে? খেয়াল হবে মাসের শেষে টাকা দিতে না পারলে। হালের গরুর সাথে আমার আর পার্থক্য কী?

ল্যাব থেকে আজকে তাড়াতাড়ি বের হচ্ছে লুসিয়া। তার প্রিয় কুকুর স্প্রকেট কে নিয়ে বেড়াতে বের হবে। সামারটা স্প্রকেট এর খুব প্রিয়। সপ্তাহে দু'দিন অন্তত ওকে নিয়ে বেড়াতে না গেলে ভীষণ মাইন্ড করে। লুসিয়া ঘরে ফিরলেই ভৌ ভৌ, হুফ হুফ করে লাফালাফি করে আর রাখেনা। লুসিয়াও প্রাণ দিয়ে ভালবাসে স্প্রকেট কে।

ঘরে ফেরার সাথে কীভাবে কীভাবে যেন আমাদের খুব গভীরে গেড়ে থাকা একটা আকাঙ্ক্ষা জড়িয়ে আছে। আমরা কল্পনা করতে ভালবাসি এই যে আমি বাইরে - ঘরে গেলেই একটা বিরাট কিছু ঘটে যাবে। একটু চিন্তা করে দেখুন ত, কড়া জ্যামে আটকা পড়ে ঘরে ফিরতে দেরি হলে কেমন অস্থির লাগতে থাকে! তা কি শুধু বিশ্রাম পাওয়ার জন্যই? কাজের জায়গা থেকে বাসা বেশ দূরে হলে প্রতি সেকেন্ডে বাসার জন্য টান টা কেমন বাড়তে থাকে? কখনও কি ভাল করে চিন্তা করে দেখেছেন এই টানটার উৎস কোথায়? এর পরের বার বাড়ি ফেরার সময় একটা একটা করে জিনিস ধরে চিন্তা করে দেখেন, আলাদা আলাদা করে সবগুলোই মনে হবে এটার জন্যই ত যাই।

যেমন খাবার। ক্ষুধা লাগলে ঘরের টানে ফিরে আসা, কিন্তু খাবার টা এমন কী? বাইরে খেলে কী হয়? নিজের বিছানা। তাহলে গ্র্যাড স্টুডেন্টদের ঘরে ফিরতে এত অনীহা কেন? ঘরের মানুষ - তাহলে মুহিব সাহেবের ঘর নরক কেন? আর লুসিয়ার ঘরে কেউ না থেকেও এত আনন্দ কেন?

আমার মনে হয় ঘরে কেউ একজন অপেক্ষায় আছে - এই অনুভূতি টা ঘরের জন্য টান এত বাড়িয়ে দেয়। এই এক থিমের উপর কত গল্প উপন্যাস পড়ে ফেললাম। আপনারাও একটু চিন্তা করে দেখেন, ঘরে ঢুকে সবাইকে যার যার মত কাজে ব্যস্ত থাকতে দেখলে কেমন কষ্ট লাগে, অভিমান লাগে। তার বদলে কুকুরটাও ঝাঁপিয়ে পড়লে মনে হয় আমার এই ফেরার প্রয়োজন ছিল, আমি না আসলে একটা শূন্যতা থেকেই যেত।

ঘরটাকে ঘরের মত রাখার জন্য এই ছোট্ট বিষয়টা খেয়াল রাখা খুব গুরূত্বপূর্ণ। ছেলেমেয়েরা বাবা মায়ের বাসায় ফেরার জন্য অপেক্ষায় থাকে, বাবা মায়ের খুবই খুবই উচিৎ ফেরার পরপরই ছেলেমেয়ের সাথে গল্প করা, সারাদিন কী করেছ, কেমন গিয়েছে ইত্যাদি ইত্যাদি। স্ত্রী স্বামীর অপেক্ষায় থাকে, তার ইচ্ছে করে ঘরের খুঁটিনাটি বিষয়গুলি নিয়ে স্বামীর সাথে কথা বলতে, কারণ সে তার কাজের ক্ষণগুলোতে স্বামীর অভাব বোধ করেছে, সেটা প্রকাশ করার মত ভাষা তার নেই, তাই 'এইটা হয়েছে ওইটা হয়েছে' এসব বলে বলে সে চায় স্বামীকে তার দিনের সাথে রিলেট করতে, যেন স্বামী তার কষ্টগুলোর ভাগীদার হতে পারে। স্বামী স্ত্রীর কাছে তার অভাববোধটুকু দেখার অপেক্ষায় থাকে। তার চিন্তায় থাকে, এতটা সময় আমি ছিলাম না, আমাকে মিস করলে এখন নিশ্চয়ই তার প্রতিফলন হবে ভালবাসা, যত্ন দিয়ে!

একজন বাবার বা স্বামীর ঘরে ফেরা নিয়ে যে তাড়া বা উৎসাহ থাকে, ফেরার পর তার প্রতিফলন হওয়া উচিৎ কে কেমন ছিল তার খোঁজখবর নিয়ে, খুবই হালকা কথাবার্তা বলে, just to show that I really thought about you when I was away. স্ত্রী যদি বাইরে কাজ করে তারও একই ভাবে বাচ্চাদের আর স্বামীর সারাদিনের খোঁজ নেয়া উচিৎ। পাশাপাশি স্বামী বা স্ত্রী যেন ঘরে ফিরে অনুভব করে অন্যরা তার আসার অপেক্ষায় ছিল, সে ব্যাপারটা খুব যত্ন করে মেইনটেইন করা উচিৎ। এটা করা যায় আসার পর অন্তত পাঁচ দশ মিনিট তার দিকে পূর্ণ মনোযোগ দিয়ে। অফিস শেষে বাড়ি ফিরে পরিবারের মানুষগুলোকে বিনোদন এ ডুবে থাকতে দেখলে কী যে খারাপ লাগে সেটা বলে বোঝানো যায় না। মনে হয় টেলিভিশনের কাছে আমি হেরে গেলাম। আমার চেয়ে টেলিভিশনের/কম্পিউটারের আকর্ষণ বেশি। তাই বলে পরিবারের সদস্যরা কাজে ব্যস্ত থাকলেই যে খুশি তে মন ভরে যাবে তাও না। তখন মনে হয়, সবাই যার যার মত ব্যস্ত। আমি আসলেই কী আর না আসলেই কী। বেশি না, পাঁচ দশ মিনিট। তারপর ঐ মানুষটা নিজের মত ব্যস্ত হয়ে গেলে আর কিছু লাগবেনা।

আমাদের ডিপার্টমেন্টের গ্র্যাড স্টুডেন্ট জেফারি কে অনেক ধন্যবাদ, ওর একটা কথাই আমার জন্য eye opener ছিল। ওর সারাদিন ল্যাব এ পড়ে থাকা দেখে রনি দরদ দেখিয়ে বলছিল, তুমি ঘরে যাওনা কেন? সে দুষ্টুমি হাসি হেসে বলল, আমার তোমার মত ঘরে বউ নেই যে! এই দেশে বেড়ে ওঠা একটা ছেলের জন্য বউয়ের অল্টারনেটিভ খুঁজে পাওয়া ত এমন কঠিন না, ওর আর আমাদের ঘরের মধ্যে কমফোর্ট জনিত বেশি পার্থক্যও হবেনা। বোধহয় পার্থক্য এখানেই, প্রতীক্ষায়।

দাম্পত্য - ৬

পরিবারে একজন পুরুষের সবচেয়ে প্রিয় দুইটি নারী - মা আর স্ত্রীর মধ্যকার বিবাদের অনেকটাই চলে ভালবাসার দাবি তে। নতুন দম্পতিরা সত্যিই বুঝতে পারেন না, একে অপরকে নিয়ে ব্যস্ত থাকতে গিয়ে তারা আর সবার থেকে কতটা আলাদা হয়ে গেছেন। একটা ফ্রেন্ড সার্কেলে দুজন জুটি বেঁধে গেলে অন্যদের কেমন হিংসে হয় এটা একটু কল্পনা করলে বুঝতে পারবেন 'কাছের মানুষটা পর হয়ে গেছে' - এই উপলব্ধি পরিবারের অন্যদের কতটা কষ্ট দেয়।

মানি, নতুন দম্পতির পরস্পরকে জানা ও চেনা প্রয়োজন। কিন্তু তা কি আর সব কিছু থেকে নিজেকে আলাদা করে তারপর? দুটো গাছ একজন আরেকজনের উপর ভর করে বেড়ে উঠবে। তার জন্য কি শেকড়গুলি সব উপড়ে তবেই এক হতে হবে? লতাগুলো হয়ত পরস্পরের বাহুডোরে থেকে কিছুই টের পাবেনা। কিন্তু মাটির কান্না? মাটি সে শূন্যতা ভরবে কী দিয়ে? তিল তিল করে বুক চিরে যে আদরের ফসল এত বড় হয়েছে, তার উপস্থিতি ছাড়া মাটির ত আর কিছুই নেই! সে বাঁচবে কী নিয়ে? আমরা সহজে বলি, বাবা মায়েরা আমাদের যথেষ্ট 'স্পেস' দেয়না। সত্যি কথা কী, স্পেস দেয়ার জন্য মায়ার বাঁধন একটা একটা করে ছিঁড়ে রিক্ত শূন্য হয়ে, তবেই স্পেস তৈরি করা যায়। স্পেস মানে ত খালি জায়গা, তাই না? যে জায়গাটা বাবা মা মনোযোগ দিয়ে যত্ন দিয়ে ঘিরে রেখেছিল, স্পেস দেয়ার জন্য সেখান থেকে তাদের নিজেদের গুটিয়ে নিতে হবে, তাই ত?

গাছের উপমায় আবারো ফিরে আসি। শেকড় আর লতানো বাহু - দুটোর টানই তীব্র। দুটোর জন্যই তার আকর্ষণ অসীম। মমতাময়ী মা যেভাবে খাবার জন্য পীড়াপীড়ি করত, অসুখ হলে অস্থির হত - ওই আনন্দগুলি ত অন্যরকম! অমনি করে ভালবাসা পাওয়ার ইচ্ছে ত কোনদিন মরে না। আর স্ত্রী? তার জন্য একটা পুরুষ জীবন দিতে পারে। তার যা আছে সবকিছু বিনিয়োগ করতে পারে। ভুল হয়ে যায় তখনই, যখন ভালবাসায় অবুঝ হয়ে এই মানুষগুলো তাদের আপন আপন গন্ডি ছেড়ে আরও অনেকটা দখল করে নিতে চায়। তাই পুরুষটিকে হতে হবে খুবই সচেতন। মা যেন কখনও না ভাবে ছেলেটা বদলে গেছে। আগের মত করে সময় দিতে না পারলেও আদুরে গলায় 'মা তোমার ঐ রান্নাটা অনেকদিন খাইনা', বা 'মা আমার মাথায় একটু হাত রাখ' - এ ধরণের কথা বলে ছোট ছেলেটা হয়ে গেলে মায়ের অনেক দুঃখ দূর হয়ে যাবে।

মায়ের বয়স হয়েছে, তিনি চান বউ সংসারের দায়িত্ব নিক, কিন্তু এত যত্নে গড়ে তোলা সিস্টেম একটা আনাড়ি মেয়ের হাতে তুলে দেয়ার আগে তিনি চাইবেন মেয়েটাকে তার সিস্টেমে অভ্যস্ত করিয়ে নিতে। কিন্তু সুপারভাইজিং, ট্রেনিং বেশ কঠিন কাজ। অনেক ধৈর্য আর সহনশীলতা দরকার হয়। বিভিন্ন কারণে গুরুজনেরা এই বয়সে অনেক সময় বুঝতেও পারেন না কোন কথাটায় কতটুকু কষ্ট পেতে পারে ছেলেমেয়েরা। এক প্রজন্ম থেকে অন্য প্রজন্মে সেনসিটিভিটি এর মাত্রা বদলায়। যুক্তি দিয়ে সরাসরি ভুল ধরাটা আমাদের প্রজন্মে কমন, উনারা হয়ত খুবই আহত হন। আবার স্বভাব চরিত্র নিয়ে একটু খোঁচা মেরে কথা বলাটা উনাদের কাছে হয়ত নিছক রসিকতা, আমরা ভীষণ অফেন্ডেড হই।

যাই হোক, নতুন বউয়ের এ ধরণের আচরণে কষ্ট লাগবে। স্বভাবতই সে সবার আগে স্বামীকে খুলে বলবে। স্বামীর দায়িত্ব এখানে রিঅ্যাক্ট না করে পুরোটা শোনা, মা যদি অন্যায় করে থাকে তাহলে অকপটে স্বীকার করা, তারপর মায়ের দোষগুলোর পিছনে ওনার ভাল নিয়ত টুকু দেখানোর চেষ্টা করা, বা বুঝিয়ে বলা যে এটা জেনারেশন গ্যাপ ইত্যাদি। এতে দুটো সুবিধা আছে। স্ত্রী বুঝবে এটা একটা সমস্যা, আর তা সমাধান করার জন্য সে একা নয়, আরেকটি সহানুভূতিশীল মন তার পাশে আছে। মায়ের দোষ ছেলে স্বীকার করলে স্ত্রী তখন ব্যাপারটাকে একটা সমস্যা হিসেবেই দেখবে, অন্যায় হিসেবে না। এতে করে সমস্যার সমাধান না হোক, সমস্যাটা আপনাদের মধ্যকার বন্ধন আরো দৃঢ় করতেই সাহায্য করবে।

আবার এদিকে মা খুবই কষ্ট পাবেন যদি ছেলে এসে তার দোষ ধরিয়ে দেয় বা বউয়ের দোহাই দেয়। আগে থেকে বাবা মা সমালোচনা গ্রহণ করতে অভ্যস্ত না হলে বিয়ের পরে সে চেষ্টা করতে যাবেন না। বরং এভাবে শুরু করতে পারেন, 'কী মা, তোমার বউ নাকি এটা এটা করেছে!' মায়ের প্রতি আপনার আবেগ যেন প্রকাশ পায়, বউয়ের নাম ধরে না বলে 'তোমার বউ' বলার মাধ্যমে তাদের দুজনের সম্পর্কের উপর জোর দিন (নিজেকে আড়াল করে), এটা করেছে - বলার মাধ্যমে হালকা একটা দোষারোপের ভঙ্গি করুন। এতে করে মায়ের মনে 'ছেলে আমার কথা শুনবে না' এই ধরণের ডিফেন্সিভ ভাবটা থাকবেনা। উনি মন খুলে কথা বলতে পারবেন। আপনি আন্তরিকভাবে শুনলেই উনার মনটা অনেক শান্ত হয়ে যাবে। সমস্যা যদি ঘরের কাজ সংক্রান্ত হয় তাহলে কাজটা আপনি শুরু করুন, স্ত্রীকে আগে থেকেই রাজি করিয়ে রাখবেন যাতে সেও জয়েন করে।

বউ শাশুড়ি ঘটিত সমস্যা ত আর হাদীস এ নেই, কিন্তু তার সূত্রপাত যেখানে, ভালবাসা জনিত ঈর্ষা, তার উদাহরণ কিন্তু ঠিকই আছে। আয়িশা (রা) এর ঘরে মেহমানদের জন্য রাসুলুল্লাহ (স) এর অপর স্ত্রী খাবার পাঠিয়েছিলেন। আয়িশা (রা) রাগে খাবার সহ বাটি মাটিতে ফেলে দেন। কী অস্বস্তিকর অবস্থা! রাসুলুল্লাহ (স) করলেন কী, 'তোমাদের মা ঈর্ষায় পড়েছেন' বলে নিজেই ভাঙা টুকরাগুলো মাটি থেকে তুলতে লাগলেন। মেহমানদের সামনে অপমান করা হয়েছে মনে করে রাগ করলেন না, শাস্তি দিলেন না, মেহমানদের কাছে বললেন 'তোমাদের মা'; আবার অপর স্ত্রীর বাটি ভেঙে তার উপর অন্যায় করা হয়েছে, এ জন্য আয়িশা (রা) এর ঘর থেকে একটা বাটি নিয়ে উনাকে ফেরত দিলেন।

কে ঠিক আর কে বেঠিক সে বিচার করতে যাবেন না ভুলেও। দুজনেই অবুঝ, দুজনেই আপনাকে খুব ভালবাসে, দুজনেই চায় আপনার ঘরটাকে সুখ দিয়ে ভরিয়ে তুলতে। আপনার কাজ শান্তিপূর্ণ মধ্যস্থতা করা। শেকড় থেকে জীবনীশক্তি আর সঙ্গী গাছের থেকে দৃঢ়তা পেলে একটি গাছ ফুলে ফলে ছায়ায় কত মানুষের মুখে হাসি ফোটাতে পারবে চিন্তা করে দেখেছেন?

দাম্পত্য - ৫

দম্পতি মানে কী? আভিধানিক অর্থে জায়া আর পতি - সুখী দম্পতি মানে তাহলে একজোড়া সুখী চড়াই চড়ানি - সমীকরণটা যদি এত সহজ হত, তাহলে চারপাশে শুধু সুখেরই বন্যা বইত।

বিয়ের সাথে সাথে অবিচ্ছেদ্যভাবে চলে আসে শ্বশুরবাড়ি, আত্মীয় স্বজন। বিয়ে হলে একটা ছেলেকে বা একটা মেয়েকে একই সাথে অনেকগুলো বন্ধন তৈরি করতে হয়। এদের একেকটার ডাইমেনশন একেক রকম। যেমন শ্বশুর শাশুড়ির চাহিদার সাথে শ্যালক সম্বন্ধীয় আত্মীয়ের চাহিদার মিল নেই। একটা নতুন বউ বা নতুন জামাই, বিয়ের অনুষ্ঠানে যেমন হাসি খুশি, লাজুক একটা ভাব নিয়ে সম্পর্কের বাঁধনে জড়ায়, নানা ধরণের আত্মীয়ের চাহিদা পূরণ করতে গিয়ে তা থেকে একটু সরে আসলেই অনেক সমালোচনার শিকার হতে হয়।

আজকের লেখাটা শুধু ছেলেদের উদ্দেশ্য করে লিখব। আমি জানি, বিয়ের আগে ছেলেরা খুবই ভয় পেয়ে যায় তার সবচেয়ে প্রিয় দু'জন মানুষ, মা আর স্ত্রীর মধ্যকার সম্পর্ক কেমন হবে তাই নিয়ে। অনেক ছেলেই এই অশান্তির ভয়ে বিয়ে করতেও চায়না। তারা বুঝেও উঠতে পারেনা কী এমন হয়ে গেল সকাল থেকে সন্ধ্যার মধ্যে, যে ঘরে পা দিয়েই মায়ের ছলছল চোখ, স্ত্রীর অগ্নিবর্ষণ (অথবা উল্টোটা) দেখতে হচ্ছে। প্রথম প্রথম হয়ত আপনি আসাতে পরিস্থিতি বদলাবে, কিন্তু মনটাকে বদলাবে কে? মায়ের কাছে বউয়ের নামে অসন্তোষ, বউয়ের কাছে মায়ের নামে গঞ্জনা - এসব শুনে শুনে ছেলেটার ত মানুষের উপর থেকে সম্মানটাই উঠে যাওয়ার কথা। প্রথম প্রথম ছেলেটার মন খারাপ থাকে, নিজেকে ব্যর্থ মনে হয়, একটা সময় বুঝতে পারে, উপেক্ষা করাটাই সহজতম পন্থা। দুইজন কে আলাদা আলাদা তাল দিয়ে মন রক্ষা করলেই সুন্দর শান্তি থাকবে ঘরে। আর সব মেয়েলি ব্যাপার নিয়ে ছেলেদের মাথা ঘামাতে নেই। তাদের সমস্যা তারাই সমাধান করুক, এ সময়টা বরং আমি একটু ঘুমিয়ে নেই।

আমি দুঃখিত, সত্যিই দুঃখিত ছেলেদের এই টানাপোড়েন দেখে। শ্যাম রাখি না কুল রাখি - এই করে করে ছেলেটার বেড়ে ওঠাই বন্ধ হয়ে যায়। যে ছেলেটা পরিবার নিয়ে অনেক প্ল্যান করে সুন্দরের পথে এগোনোর দিকে পথ প্রদর্শক হতে পারত, হোম পলিটিক্স এর জটিলতায় পড়ে শেষ পর্যন্ত সংসারে তার ভূমিকা হয় নিরব দর্শকের। হয় তখন আপনার স্ত্রী কে নিয়ে আলাদা হয়ে যেতে হবে, নাহয় স্ত্রীর মুখ কড়া শাসন করে বন্ধ রাখতে হবে, বলতে হবে, মা কে মাথায় করে রাখবা - আমি আমার মায়ের নামে কোন কথা শুনতে চাইনা। তোমার যা লাগে আমি দিব কিন্তু সংসারে আমি কোন অশান্তি চাইনা।

আমি দাবি করছিনা আমি এই হাজার বছরের সমস্যার কোন ইনস্ট্যান্ট সমাধান নিয়ে এসেছি। আমি চাই আপনি আপনার ভূমিকাটাকে একটু যাচাই করুন। একজন সন্তান হিসেবে, একজন স্বামী হিসেবে, একটা পরিবারের প্রধান হিসেবে (শ্বশুরেরা সাধারণত মৌনী ঋষি হন - সময় মত খাবার, গরম পানি আর সংবাদপত্র পেলেই তাদের চলে - তাই ফ্যামিলি ম্যানেজমেন্ট এর হর্তাকর্তা হিসেবে) আপনার কি আরো কিছু করার ছিল? আমি জানি এটা এমন এক সমস্যা যা নিয়ে অফিসের কলিগের সাথে আলাপ করা যায়না। বন্ধুরাও হয়ত ধৈর্য ধরার উপদেশ দিয়েই দায় সারবে। কিন্তু আপনি কি আরো একটু বুদ্ধি খরচ করে আরো একটু বেশি ইফোর্ট দিয়ে পরিবেশটাকে বদলাতে পারতেন? নিদেনপক্ষে আপনার মা ও স্ত্রীর মধ্যে দূরত্বটা একটু ঘুচাতে পারতেন?

প্রথমেই বলি, ছেলেরা ভুল আশা করে যে তার স্ত্রী তার মাকে ঠিক তার মত করেই ভালবাসবে। যদি না পারে, তাহলে দীর্ঘশ্বাস ফেলে, মেয়েরা এত সংকীর্ণমনা কেন? কিন্তু ব্যাপারটা যে অসম্ভব যে কোন মানুষের জন্যই! মায়ের সাথে সম্পর্কটা গড়ে ওঠে অনেক বছরের আদর ভালবাসার উপর ভিত্তি করে। সন্তানের দোষ মায়ের চোখে ধরা পড়ে না, তেমনি বাবা মায়েরও অনেক অন্যায় ছেলে মেয়েরা দেখেও না দেখার ভান করে। অন্য মানুষের জন্য ত এটা করা যায়না। একটা ছেলে কি পারবে তার স্ত্রীর মাকে আপন মায়ের সমান ভালবাসতে? হ্যা, সার্ভিস হয়ত আপন মায়ের সমান দেয়া যায়, কিন্তু দোষ ক্ষমা করার বা উদারতার রেঞ্জটা কিন্তু এখানে কমই হবে, আর এটা খুবই ন্যাচারাল। মানতে কষ্ট হলে নিজেকে দিয়ে একটা এক্সপেরিমেন্ট করে দেখতে পারেন। শ্বশুরবাড়িতে এক মাসের জন্য থেকে আসুন। জামাই হিসেবে না, ছেলে হিসেবে। বাজার করে দিন, বিল দিন, শ্যালিকাকে পড়ান, সংসারের খরচপাতির ব্যবস্থা করুন, শাশুড়িকে ডাক্তারের কাছে নিয়ে যান, তখনই বুঝতে পারবেন অন্য একটা পরিবারে গিয়ে ব্যক্তিত্ব বজায় রেখে দিনের পর দিন সবাইকে খুশি রাখা কত কঠিন।

দ্বিতীয়ত, একজন ভাল মা মানেই একজন ভাল শাশুড়ি না। একজন চমৎকার মানুষ মানেই একজন ভাল বৌমা না। একজন ভাল লেখক যেমন ভাল প্রশাসক না - তেমনি একেকটা সম্পর্কের ডাইমেনশন একেকরকম, দায়িত্বগুলিও ভিন্ন। সেজন্য আপনার ফেরেশতাসম মা শাশুড়ি হিসেবে ব্যর্থ হলে বুক ভেঙে যাওয়ার কোন কারণ নেই। যে মেয়েটা ফুল দেখত, গান গাইত, চিঠি লিখত, বিয়ের পর ঘরে এসে চরম পলিটিক্স শুরু করলে ঘৃণায় মুখ ফিরিয়ে নেয়ার দরকার নেই।

তৃতীয়ত, মা আর স্ত্রী - এদের মধ্যে যে বন্ধন তা আপনাকে কেন্দ্র করেই রচিত। এই সম্পর্ক কোন খাতে বইবে - সেটাও অনেকটা নির্ভর করছে আপনার সাথে তাদের সম্পর্ক কেমন তার উপর। এটা একটা টাগ অব ওয়ারের মত, দুটো নারী তাদের সমস্ত কিছু দিয়ে একটা প্রতিযোগিতায় নেমেছে, পুরস্কার আর কিছু না, আপনার অখন্ড মনোযোগ। বাস্তবিক, আমার মনে হয়, ছেলেটার একটা ক্লোন করে যদি দু'জনের হাতে দুটো ধরিয়ে দেয়া যেত - তাহলে বেশ হত।

চতুর্থ, এরকম সিলি বিষয় নিয়ে এরা এমন করে কেন - এরকম একটা উঁচুদরের চিন্তা করে গা বাঁচিয়ে চলার অবকাশ নেই। সিলি বিষয়গুলি মোটেও সিলি না, কারণ এর কারণে পরিবার নামক দেয়ালটায় বড়সড় ফাটল দেখা দিচ্ছে। আপনি কি শুধু এক কোণে দাঁড়িয়ে দেখবেন, আর মাঝে মধ্যে দুই পক্ষেই হাত লাগাবেন? এর বেশি কি আপনার কিছু করার নেই?