Sunday, April 15, 2012

আর্ট অব এপ্রিসিয়েশন - ১

মৌমিতার প্রাণের বন্ধু আসমার মুখ ভার, চোখমুখ কাল, প্রায় কাঁদকাঁদ মুখ। মৌমিতা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। আসমা যে অফিসে কাজ করে সেখানে এক উচ্ছ্বল, উদার হৃদয়ের যুবককে মনে ধরে গেছে আসমার। কিন্তু প্রাণে ধরে কখনই সে কল্পনা করতে পারেনা, তাকে কারও পছন্দ হতে পারে। হবেই বা কী করে? গায়ের রং, শারীরিক গঠন - সব কিছু নিয়ে কি কম কথা শুনতে হয়েছে সারা জীবন? তাও যদি দাঁতগুলো একটু সুন্দর হত! আসমার ভুসো মাখানো মুখটাতে রঙের খেলা বোঝা যায়না, তবু মৌমিতা বুঝতে পারে ফেরেশতাসম সুন্দর মনের এই মেয়েটার মনে কত দুঃখ। কী বলবে বুঝতে পারেনা। আসমাই এক সময় মুখ খোলে - 

'আমার মনে হয় কখনো বিয়ে হবে না রে!' 

কেন? 

কে বিয়ে করবে আমাকে? 

কেন? 

আমি কত কুচ্ছিত। 

তুই কুচ্ছিত হলি কোন দিক দিয়ে? 

ওমা! তোর কি চোখ নেই? আমার গায়ের রং দেখেছিস? চেহারা দেখেছিস? মানুষ হাসলে কত সুন্দর দেখায়... আমি হাসলে... কে বিয়ে করবে আমাকে? 

কী সব যা তা বলিস? তোকে ভালবাসবে না যে ছেলে সে আসলে তোকে পাওয়ার যোগ্যই না! 

ধ্যেৎ! শুরু হল তোর কথার খেলা। 

আচ্ছা, ঠিক আছে। আগে বল, সৈকত ভাই তোর সাথে কথা বলে? 

ম্... বলে ত! 

সুন্দর করে? 

হ্যা! ভালই ত, ভদ্র ব্যবহার। 

আচ্ছা! তাহলে বল, তোর সাথে কথা বলার আগে ত উনাকে তোর চেহারা দেখতে হয়েছে, এমন ত না যে চোখ বন্ধ করে কথা বলেছে। 

হ্যা, ত? 

ত, উনি ত তোকে ঘৃণা করেন না। করেন? 

ন্ না... 

ত, চেহারার আকর্ষণের পর্যায়টা ত উনি পার হয়েই এসেছেন, তাই না? 

হ্যা। তাতে কী? 

মানুষ ত চেহারা দেখে প্রথম পরিচয়ে, তারপর ত চেহারাটা কেবলই মুখ চেনার জন্য। বাকিটা চেনাজানা ত হয় মনের চেহারা দিয়ে। 

হু, কী বলতে চাচ্ছিস? 

দ্যাখ, তুই খুব গভীর চিন্তা চেতনার একটা মেয়ে। তোর মনটা খুব স্বচ্ছ। যখন কথা বলিস, ফালতু কথা বলিস না, আন্তরিকতা নিয়ে, চিন্তাভাবনা করে কথা বলিস। এতদিন হয়ে গেল, কখনও তোকে হিংসা করতে দেখলাম না, কাউকে নিয়ে খারাপ কথা বলতে দেখলাম না... তোর চালচলন, পোশাক আশাকে সুরুচির পরিচয় পাওয়া যায়। তুই শুধু গাধার মত পড়াশুনাই করিস নি দিন রাত, অনেক দায়িত্ব নিতে শিখেছিস, যে কোন কাজ দিলে গুছিয়ে টিপটপ করে করে ফেলতে পারিস। বল্, আমি কোন মিথ্যা বলেছি? 

 

তাহলে বল, সৈকত ভাই কি এতই অন্ধ যে এসব কিছুই উনার চোখে পড়বে না? 

আমি জানি না... 

তুই ত লুকিয়ে প্রেম করবি না, ভাল লাগলে বাসায় প্রস্তাব পাঠাতে বলবি। হলে হল, না হলে নাই। 

তাও... 

অ্যাই! তোর এসব ইয়ে বাদ দে ত! আমার কথাটা লিখে রাখ্, কোন মেয়েই তোর চেয়ে ভাল অপশন হতে পারে না। 

পাম্প মারিস? 

নাআআ... মানলাম তুই ডানাকাটা পরী না। ডানাকাটা পরী হলে কী হত? সৈকত ভাইয়ের চোখ ধাঁধাত, তারপর ভেতরটা বাইরের মত না হলে একসময় আগ্রহ হারিয়ে ফেলত। আর এখন? তোকে যদি একবার কাছ থেকে চেনে, তারপর থেকে যতই চিনবে, ততই আরও বেশি মুগ্ধ হবে। There is no way anyone will like you less over time. 

ইস্! তুই যে এসব কথা কোথায় পাস!!  

মিথ্যা বলেছি? বললে আমার কান কেটে নিস, যা! > 

Tuesday, April 10, 2012

কনফিউজড, কী করি?

যে বিষয়টা নিয়ে লিখতে শুরু করেছি তা নিয়ে লেখা আমাকে একেবারেই সাজে না। খুব ছোট বিষয়েও আমি এত বেশি চিন্তাভাবনা করা শুরু করে দেই যে মূল উদ্দেশ্য থেকে বেশ দূরে সরে আসি। এই যেমন, কয়েকদিন আগে আমার একটা বেশ কঠিন প্রেজেন্টেশন ছিল। প্রায় দেড় মাস ধরে এর জন্য দিন গুনছিলাম। একাডেমিক এসব টকগুলোতে মোটামুটি ফরমাল কাপড় পরে টক দিতে হয়। আমি সাধারণত এই ব্যাপারগুলো একেবারেই মাথায় রাখি না। কিন্তু এটা বড় পরীক্ষা হওয়ায় যেই না একটু মাথায় আনলাম, ওমা! একেবারে সিন্দাবাদের ভূত এর মত রাজ্যের চিন্তা ঘাড়ে চেপে বসল। ফরমাল কী? ফরমালিটির এ মাপকাঠি কে ঠিক করেছে? আমার প্রেজেন্টেশনে ওরা যাচাই করবে আমি কতটুকু জানি, কী পরলাম তাই নিয়ে গাত্রদাহের প্রয়োজন টা কী? আমি একটু কিছু পরে আমাকে খারাপ না দেখালেই ত হল। ওদের চোখে ফরমাল না ইনফরমাল তা দিয়ে কী এসে যায়? ইত্যাদি ইত্যাদি... 

ত যা হয়, এত রকমের চিন্তায় খেই হারিয়ে ছোট বিষয়ও অনেক বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়ায়। তবে এই প্রক্রিয়ার মধ্যে পড়ে একটা বিষয় আমার ভালভাবে শেখা হয়ে গেছে - কীভাবে সিদ্ধান্ত নিতে হয়। খুবই সহজ একটা উপলব্ধি, পাঠকদের প্রত্যেকে আশা করি সিদ্ধান্ত নিতে সিদ্ধহস্ত, তবু লিখছি। শার্লক হোমস তার রহস্যের সমাধান নিজে নিজে করলেও ওয়াটসন কে তার এত প্রয়োজন ছিল কেন জানেন? ওয়াটসনকে বুঝিয়ে বলার জন্য হোমস কে ধাপে ধাপে ব্যাখ্যা করতে হত। যে কোন জটিল বিষয়ই ছোট ছোট ভাগ করে নিলে সমাধান করাটা অনেক সহজ হয়ে যায়। সিদ্ধান্ত নেয়ার এই প্রক্রিয়াটা তাই লিখছি, যাতে আমরা প্রত্যেকেই নিজের সাথে ঝালাই করে নিতে পারি। 

ফিরে যাই আবারো সেই কাপড়ের বিষয়ে। যেহেতু ফরমাল বলতে কী বুঝায় সেটা নিয়েই একটু সন্দেহ ছিল, নেট এ একটু ঘাঁটাঘাঁটি করে বুঝলাম এর কোন ধরে দেয়া মানদণ্ড নেই। যে ক'টা উদাহরণ পেলাম, তার কোনটাই আমার জন্য খাটে না। তবে ধরণ দেখে মোটামুটি একটা আন্দাজ পেয়ে আমার নিজের যে কাপড়গুলো ছিল সেগুলো দিয়ে ট্রায়াল দিলাম। দেখে শুনে দুই তিনটা বাছাই করে রাখলাম। তারপর আমার বেচারা বান্ধবীদের মতামত জানতে চাইলাম, কারো পছন্দ কারো সাথে মিলল না। বুঝলাম, এর যে কোনটাই মোটামুটি উতরে যাওয়ার যোগ্যতা রাখে। 

এই ঘটনাটায় সিদ্ধান্ত নেয়ার দু'টো গুরূত্বপূর্ণ ধাপ মেনে চলা হয়েছে। যে কোন সমস্যায় প্রথম কাজ হচ্ছে সেটা নিয়ে নিজে ব্রেইনস্টর্ম করা। সরাসরি সিদ্ধান্তে চলে না গিয়ে মোটামুটি সমস্যাটা কী, কেন হচ্ছে, আমার জানায় কোন গ্যাপ আছে কি না, এ ধরণের সমস্যায় অন্যরা কী করে - এ সব গুলো বিষয়ে একটা মোটামুটি হোমওয়ার্ক করে রাখলে সুবিধা হয়। তারপর যা যা জানলাম, তার উপর ভিত্তি করে কিছু সম্ভাব্য অগ্রগতি চিন্তা করে রাখা যায়, এই ধাপে 'কী' ফলাফল ঠিক করলাম সেটা গুরূত্বপূর্ণ না, গুরূত্বপূর্ণ হচ্ছে 'কেন' আমি এই ফলাফল টা পছন্দ করলাম। এই যেমন জামাগুলোর ক্ষেত্রে কোনটাই আমি শেষ পর্যন্ত পরি নি, কিন্তু রং, ফিটিং, প্যাটার্ণ - সবকিছু নিয়েই কিছুটা সময় বাছ বিচার করেছি। 

নিজে নিজে হোমওয়ার্ক শেষে বিষয়টা নিয়ে অন্যদের সাথে আলাপ করেছি। এই ধাপটা খুবই, খুবই গুরূত্বপূর্ণ, কেন একটু পরে বলছি। আলাপ করাতে কী হল, একেকজন একেকটার পক্ষে রায় দিল। এতে করে আমার বিচারটা যে মোটামুটি ঠিক আছে সে আত্মবিশ্বাসটা পেলাম। কাপড় না হয়ে বিষয়টা যদি আরো গুরুতর হত (এই যেমন সুপারভাইজরের সাথে সমস্যা), তখন আমার আগে থেকে করা হোমওয়ার্কের ভিত্তিতে তা নিয়ে আরো বিশদ আলোচনা করা যেত। এতে করে শুধু যে আরো শক্তপোক্ত সিদ্ধান্ত নেয়া যেত তাই না, সে মানুষটার দৃষ্টিভঙ্গি সম্পর্কেও আরো ভাল জানা যেত। মেডিটেশন কোর্সে একটা কথা বারবার বলত, 'পয়েন্ট অব রেফারেন্স' বাড়াতে হবে। একটা নতুন মানুষের সমস্যাকে সমাধান করার ধরণ একটা নতুন পয়েন্ট অব রেফারেন্স। কে জানে, ভবিষ্যৎ জীবনে কোন একটা পর্যায়ে গিয়ে হয়ত আমি তার মত করে সমস্যাগুলো কে দেখতে চাইব! 

এছাড়া এর কিছু সেকেন্ডারি সুবিধা আছে। মতামত চাওয়া মানেই একজনের বিচার বুদ্ধির প্রতি সম্মান প্রদর্শন। আমি ব্যাপারটা মনে না রাখলেও অপরজন এটা মনে রাখবে বহুদিন। সম্মান, নির্ভরতা - ব্যাপারগুলো এমনই, হৃদ্যতা বাড়িয়ে দেয় বহুগুণে। তাছাড়া পুরো বিষয়টিতে আন্তরিকভাবে একজনকে অংশীদার করে নিলে তার দোয়ারও অংশীদার হয়ে যেতে পারি। 

আলোচনায় প্রত্যেকে একটা করে মতামত দেবে। কেউ কেউ তার মতের ক্ষেত্রে অত্যন্ত জোরালো হবে। এদের মধ্যে কারও কারও প্রভাব আমার উপর অত্যন্ত প্রবল (যেমন আমার পরিবারের মানুষগুলো), হয়ত আমি একজন সফল মানুষ হিসেবে তার মত হতে চাই, বা তাকে এত ভালবাসি যে তার কোন কথা সমালোচনা করতে আমি প্রস্তুত নই। তখন আমি কী করব? আর কিছু কানে না নিয়ে সে যা বলল, অন্ধভাবে পালন করব। না! কোনভাবেই না। যে যাই বলুক, নিজে বিবেচনা না করে কোন কাজ করা যাবে না। সূরা ত্বীন এ আল্লাহ বলেছেন, 

নিশ্চয়ই আমি মানুষকে সর্বোৎকৃষ্ট রূপে তৈরি করেছি 

সর্বোৎকৃষ্ট কেন জানেন? সিদ্ধান্ত নেয়ার স্বাধীন ক্ষমতা আর কারো নেই (জ্বীন ছাড়া); এই আয়াতে 'ইনসান' শব্দ টা একবচন, তার মানে এটা আমার পরিবারের মানুষগুলোর জন্য যতটা সত্যি, আমার জন্যেও ততটা সত্যি। অন্ধভাবে কোন পথ বেছে নেয়ার পথ আমাদের জন্য আল্লাহ বন্ধ করে দিয়েছেন। 

And We have certainly honored the children of Adam.. (17:70) 

এই honor বা dignity কোথা থেকে আসছে? আল্লাহরই দেয়া বিবেক বোধ ও স্বাধীন বিবেচনা বোধ থেকে। আমি কাউকে যতই ভালবাসি, তাকে অনুসরণ করার আগে আমি যেন আমার বিচার বিবেচনায় নিশ্চিত হয়ে নেই যে আমি ঠিক। 

যাই হোক। অন্যদের মতামত চাওয়ার পর আমার অনেকগুলো পয়েন্ট অব রেফারেন্স থাকবে। তারা কেন এ মতামত দিল তাও জানা হবে। তখন তৃতীয় ধাপ হচ্ছে আবারও চিন্তা করা, নিজে নিজে। আমার আগের চিন্তার সাথে এখনের চিন্তার পার্থক্য কী? আগে একটা বিস্তৃত ভাসাভাসা ধারণা ছিল, এখন সমমনা/অভিজ্ঞ ব্যক্তিদের সাথে কথা বলে পক্ষে বিপক্ষে আরো খুঁটিনাটি জানা গেছে। এখন ইনশাআল্লাহ, আমি যা সিদ্ধান্ত নেব তা খারাপ হবে না। এই যে একটা ছোট্ট ইনশাআল্লাহ, এরও খুব প্রয়োজন আছে। সব কিছুর পরেও, আমরা মানুষ হিসেবে আমাদের সীমাবদ্ধতাকে অতিক্রম করতে পারিনা। আমি আমার সীমিত ক্ষমতায় যা কিছু করা সম্ভব, সব করেছি, সিদ্ধান্ত নিয়েছি, কিন্তু আগামী একশ বছরের পরিপ্রেক্ষিতে এই কাজের কী প্রভাব পড়বে আমি জানি না। একশ কেন, কিছুক্ষণ পরেও কী হবে আমি জানি না। সুতরাং, আমাদের সীমাবদ্ধতাকে মনে রেখেই আল্লাহর উপর নির্ভর করে আমি আমার সিদ্ধান্ত নিচ্ছি। আশা করি আল্লাহ আমার সহায় হবেন। 

সিদ্ধান্তের চতুর্থ বা সর্বশেষ ধাপ হচ্ছে ইস্তিখারা। আমি দুই রাকআত নফল নামায পড়ব, নামাযে দু'আ করব, যদি আমার দ্বীন ও দুনিয়ার জন্য এটি ভাল হয়, তাহলে এটি আমার জন্য সহজ করে দাও, নয়ত আমাকে এর থেকে দূরে সরিয়ে দাও। ইস্তিখারা এমন না যে সমস্যায় পড়লেই নামায পড়ে স্বপ্নের তালাশ করব। নামাযের আগে/পাশাপাশি এই ধাপগুলো পার হতে হবে। 

ইস্তিখারার দু'টো প্রচলিত ভুল ধারণা আছে - 

ইস্তিখারার উত্তর স্বপ্নেই দেখা যাবে: সব সময় না। ইস্তিখারার দুয়ায় আল্লাহর কাছে আমরা চাই যেন সর্বাঙ্গীন মঙ্গলময় একটা পথ আমরা বেছে নিতে পারি। আমার এক বান্ধবী তার প্রিয় মানুষটিকে বিয়ে করার জন্য ইস্তিখারা করে স্বপ্ন দেখে যে তাদের বিয়ে হবে না। হয়ও নি। আরেক বান্ধবী ইস্তিখারা করল অনেকবার। কিছুই দেখল না স্বপ্নে। কিন্তু ধীরে ধীরে তার পছন্দের মানুষটি এমনিতেই অনেক দূরে চলে গেল। আমার বেলায় ইস্তিখারায় আমি খুব সুন্দর একটা স্বপ্ন দেখি। আমাদের বন্ধু অপুর সাথে ভার্সিটিতে পড়াকালেই রনির প্ল্যান ছিল বিয়ের পর দুই বন্ধু বউ নিয়ে কাশ্মীর বেড়াতে যাবে। আমি ইস্তিখারায় স্বপ্নে দেখি আমরা একটা পাহাড়ের উপর বেড়াতে গেছি, নিচে খুব সুন্দর একটা শহর, রনি বলছে, 'ওটা কাশ্মীর'... এর মধ্যেই আমার ঘুম ভেঙে যায় একটা ফোনের শব্দে। রনি ফোন করে আমাকে জানায় আমার ইউনিভার্সিটি থেকে ওরও এডমিশন কনফার্ম হয়েছে। 

জানি না এই গল্প কেন বললাম। আমি যতবার ভাবি আমার হৃদয় ছুঁয়ে যায়, সেজন্য বোধ হয়। তবে ইস্তিখারা থেকে কোন উত্তর না পেলে, বা নিজের সিদ্ধান্তে খুব নিশ্চিন্ত না বোধ করলে ইস্তিখারা আবারো করতে পারেন। ইস্তিখারার কোন সর্বোচ্চ সীমা নেই। আর স্পষ্ট হ্যা বা না নিশ্চিত না হলে কাজ থামিয়ে রাখতে হবে, এমনও কোন কথা নেই। ইস্তিখারা এক অর্থে আল্লাহর অনুমতি চাওয়া। 

আমাদের দেশে পীর, আলেম, ইমামদের দিয়ে ইস্তিখারা করানোর প্রচলন আছে। ভাবনাটা এমন, আমি ত অত প্র্যাকটিস করি না, আমার ইস্তিখারা বোধহয় হবে না। তার চেয়ে যে ভাল নামায রোজা করে, তাকে দিয়ে করালে ঠিকঠাক মত হবে। এটা খুব ভুল ধারণা। আল্লাহর সাথে কথাবার্তায় কোন মাধ্যম নিলে তাতে বড়সর ভুল হয়ে যাবে। আল্লাহ ত এমনিতেই জানেন আমরা কে কেমন। যদি এমন মনে হয় যে আল্লাহ ভাববে, 'এতদিন খোঁজ নেই, এখন দরকারে আমাকে ডাকছে' - ব্যাপারটা কিন্তু মোটেও তা না। ফাঁকিবাজ স্টুডেন্ট পরীক্ষার আগে সিরিয়াস হয়ে গেলে টীচাররা আরো খুশি হন, সাহায্য করতে আরো আগ্রহী হন। আমরাই ভয়ে আল্লাহর সামনে দাঁড়াতে চাই না, শয়তান মনের মধ্যে হীনমন্ন্যতা ঢুকিয়ে দেয়, 'ছিঃ তোমার লজ্জাও নেই, কোন মুখে দাঁড়াও তুমি আল্লাহর সামনে?' তখন যতবার নামায মিস দিয়েছি, সব মনে পড়বে, মুভি দেখা, গালি দেয়া - সব মনে আসতে শুরু করবে। আসুক! তবু দাঁড়াই। মনে মনে বলি, আল্লাহ, তুমি ত জানই আমি কেমন, তোমার ইবাদতটাও ঠিক মত করি না। কিন্তু তারপরেও তুমি ছাড়া আমার কোন উপায় নেই। তুমি পথ না দেখালে, সাহায্য না করলে আমি আরো ভুলের মধ্যে তলিয়ে যাব। দেখ, শয়তান আমাকে কীভাবে ডাকছে! আমার উপর রাগ হয়ে থেক না আল্লাহ প্লীজ! 

ইনশাআল্লাহ, আল্লাহ আমাদের সিদ্ধান্তে তাঁর রাহমাহ ও জ্ঞানের পরশ বুলিয়ে দেবেন। 

http://www.youtube.com/watch?v=EEcovFTsQ4E

Friday, April 6, 2012

স্বপ্নের দেশ

আমার পূর্ণ না হওয়া সব সাধ আমি খুঁজে বেড়াই স্বপ্নের দেশে। সত্যিকারের স্বপ্নের দেশ না, জেগে দেখা স্বপ্নের দেশ। সে দেশে ভালবাসায় টইটম্বুর হয়ে থাকে আকাশ বাতাস। সূর্যটা কোমল আলো হয়ে ঝুলে থাকে এক পশলা বৃষ্টির পর ঝকঝকে আকাশের এক কোণায়। তরতাজা ঘাসে পা ফেলে হাঁটি আমি, শরীরটা এত হালকা - ঘাসের ডগাগুলোই যেন বয়ে নিয়ে চলে। সামনে ঝিরিঝিরি ছোট্ট এক নালা। উপরে ছোট ছোট নুড়ি পাথর। ওপাশে উঁচু হয়ে উঠে গেছে ঘাসের নরম বিছানা, তাতে অসংখ্য উজ্জ্বল রংয়ের ফুল মুখ তুলে তাকিয়ে আছে। প্রজাপতির ওড়াওড়ি, গাছের ছায়ায় জোনাক পোকার লুকোচুরি, এই এত্তটুকুন লাল পিঁপড়ার তড়িঘড়ি চলে যাওয়া... ঘাসফড়িং এর একটানা ক্রং... ক্রং... শব্দ... সব..... সবকিছু আমার স্বপ্নে আসে ভালবাসা হয়ে। 

মানুষ? হ্যা, মানুষও আসে। এই পৃথিবীতে যাদের ভালবাসা আমার বুকের নিঃশ্বাসটা ভারি করে দেয়, চোখে শুধু শুধু একসার জল এনে দেয়... তারাও আসে আমার পাশে বসতে। এ পৃথিবীতে যাদের ভালবাসি, তারা সবাই আমার মত করে ভাবে না। আমার সব - সবচাইতে প্রিয় মানুষটাও পুরোপুরি আমার মত করে আনন্দগুলোকে দেখে না। কিন্তু স্বপ্নের দেশে... খুব আনন্দ... একটা ছোট্ট বাঁকানো লতার হেলে পড়া আমাকে যতটুকু উচ্ছ্বসিত করে... তার মুখের দিকে তাকিয়ে দেখি তার মুখও ততটুকু উজ্জ্বল হয়ে গেছে। 

স্বপ্নের দেশে আমাকে নিয়ে কেউ হাসে না। 'এটা ঠিক হয়নি, ওটা ঠিক না...' অমন বিচার করতে শুরু করে না। কেউ বলে না, 'এইটাও জান না?', বলে, 'এস, শিখিয়ে দেই।' মুখ যত না হাসে, চোখ হাসে তারও বেশি, আর চোখের দিকে তাকিয়ে দেখতে পাই হৃদয়ের গভীর...টুকু। সেখানে একটুও ঘৃণা নেই, সমালোচনা নেই, অহংকার নেই। যেন আমার সাথে থাকতে পারাই তাদের একমাত্র আনন্দ। 

'আমরা দু'জন একই গাঁয়ে থাকি, এই আমাদের একটি মাত্র সুখ' 

আমার স্বপ্নের দেশে আমার প্রিয় সব খাবার থাকে। স্ট্রবেরিগুলো টুকটুকে লাল, আর খুব মিষ্টি গন্ধ, টকটক মিষ্টি, পানসে টক না। পাকা রসালো আতা... মুখ ডুবিয়ে খেতে গেলে সারা মুখ ভরে যায়। বিচিগুলোও খেয়ে ফেলা যায়, বাছতে হয়না। ওখানে সব কিছু সুন্দর। সবাই সুন্দর কথা বলে। তাই ত সুরা গাশিয়াহ তে 'লা তাসমা'উ ফীহা লা'গীয়া' শুনে স্বপ্নের দেশটাতে চলে যাই। আল্লাহ কত মজার মজার স্বপ্ন দেখান! এমনকি পান করা নিয়েও, যারা সেই রকম ভাল মুসলিম, আল্লাহ নাকি নিজে তাদের পানপাত্রে পানীয় ঢেলে দেবেন। এ কথাটা শুনে বুক থেকে শুরু করে পায়ের পাতা পর্যন্ত কেঁপে উঠে। আমার কল্পনাতে আর ধরে না। 

তবে মেঘহীন পরিষ্কার আকাশের দিকে তাকালে কেমন যেন করে বুকের ভেতর। অদ্ভুত সেই আলো বার বার মনে করিয়ে দেয় 'Allah is the light of the heavens and the earth'. সে আলোয় সম্মোহিত হয়ে শুধু ভাবি, কেমন সেই আলো? জান্নাতের যারা অধিবাসী, তাদের জন্য নাকি সব পুরস্কারের সেরা পুরস্কার হবে আল্লাহ কে দেখতে পাওয়া। যারা বেশি ভাল কাজ করেছে, তারা সামনের সারি থেকে দেখতে পাবে। একবার দেখার পর নাকি শুধু মনে হবে আবার কখন দেখব? অধিক পূণ্যবান লোকেরা দিনে দুইবার দেখতে পাবে, আর কম যারা, তারা সপ্তাহে একবার দেখেই সন্তুষ্ট থাকতে হবে। আল্লাহর সান্নিধ্য পাওয়া - আমার কাছে শুধুই মনে হয় অনেক অনেক ভালবাসায় ভরা এক সত্ত্বা। যার সামনে গেলে এত এত বেশি সমর্পন করতে ইচ্ছে হবে যে আমি যে একটা পূর্ণাঙ্গ মানুষ, সেটাই আর মনে থাকবে না। কিছু চাইব, কী চাইব? তিনি ত সব জানেন। কিছু বলব, বলার জন্য যে চিন্তাটুকু করতে হয়, তারও আগেই ত তিনি জানেন আমি কি ভাবছি। তাঁকে আমি ভালবাসি... কিন্তু এ কেমন ভালবাসা, যার প্রকাশ কী দিয়ে হবে তাই ভাবতে ভাবতেই সময়টুকু ফুরিয়ে যায়? আল্লাহর কথা ভাবতে গেলে কেবলই আমার সব তালগোল পাকিয়ে যায়। 

তবু তাঁর কথা ভাবতে ভাল লাগে। আমার চারপাশের মানুষগুলোর কোন কারণ ছাড়া এত এত ভালবাসা বিলানো দেখে বুঝি, এ আর কেউ না, আল্লাহরই দেয়া। অনেকে ভ্রুকুটি করে জানতে চায়, তুমি এমন কি কেউকেটা যে নিজে নিজে জান্নাত, আল্লাহর দর্শন - সব নির্ধারণ করে ফেলেছ? আমি বলি, আমি যতটা ক্ষুদ্র, আল্লাহ ততটাই মহৎ। এতগুলো বছর আল্লাহ আমাকে যা কিছু দিয়েছেন, তা পাওয়ার জন্য আমার কেউকেটা হতে হয়নি। তাঁর রাহমাহ ই আমাকে সব দিয়েছে, যার কিঞ্চিৎ যোগ্যতাও আমার ছিল না। জান্নাত? না, আমি যোগ্য নই। তবে আমি আল্লাহর দর্শন পেতে উদগ্রীব। আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হব, এত বড় বোকা আমি নই। নিশ্চয়ই তাঁকে আমি দেখব, সেদিন তাঁর রাহমাহ তাঁর ক্রোধের উপর জয়ী হবে। 

যে ভাইটি অনুশোচনায় দগ্ধ হয়ে নিজেকে সবকিছু থেকে গুটিয়ে নিয়েছে, তাকে স্বান্তনা দেয়ার মত ভাষা আমার জানা নেই। শুধু তাকে মনে করিয়ে দিতে চাই, আল্লাহ বলেছেন, 'আমার বান্দা যদি হেঁটে আমার দিকে আসে, আমি দৌড়ে তার দিকে যাই। আমার বান্দা এক পৃথিবী সমান পাপ নিয়ে আমার সামনে দাঁড়ালে আমিও এক পৃথিবী সমান ক্ষমা নিয়ে তার সামনে দাঁড়াই।' 

মানুষের ক্ষুদ্রতা দেখে নিরাশ হয়ে আল্লাহর থেকে সরে গেলে হবে? আল্লাহর ক্ষমার কোন তুলনা হয়? না তাঁর ভালবাসার কোন তুলনা হয়?

Sunday, March 4, 2012

আমার যখন মন খারাপ

আমার মন খারাপ হয় দু'টো কারণে। কিছু একটা মনে মনে আশা করে থাকি, সেরকম করে সব না হলে; আর মন খারাপ হয় কেউ অন্যায় আচরণ করলে। অন্যায় আচরণ করলে আমি খুব করে হিসেব মেলানোর চেষ্টা করি, কেন এমন করল? তাহলে কি আমার কোন ভুল ছিল? আমি এই কাজটা এভাবে না করে ওভাবে করলে কি ও আর অমন করত না? তারপর যদি বুঝি যে আমারই দোষ ছিল, তখন মনে হয়, আচ্ছা, আমি না হয় দোষ করেছিই, সে কেন আরো একটু উদার হয়ে দেখতে পারল না? সে কেন ক্ষমা করে দিল না? আমার সাথে ওর হৃদ্যতার উছিলায় কেন আমার এই দোষটা উপেক্ষা করতে পারল না? তবে কি ও আমাকে ততটা পছন্দ করে না, যতটা করে ওর নিজের ইগোকে? 

আর যদি আমার কোন দোষ না থাকে, তখন রীতিমত বিমর্ষ হয়ে পড়ি, মানুষ এত স্বার্থপর কেন? এত ইগোনির্ভর কেন? এইভাবে কেন দেখল ঘটনাটাকে, কেন আমি যেভাবে দেখেছি সেভাবে দেখল না? আচ্ছা, ও কি তাহলে সবসময় সবকিছুকে এভাবেই দেখে? ওর পুরনো কাজগুলোও কি তাই মিন করে? তাহলে ত ও আমার মত না। নাকি ওর আত্মসম্মানবোধ প্রচন্ড বেশি, অথবা ইনসিকিউরিটি এত বেশি, যে তার চাওয়া অনুযায়ী কিছু না হলেই চোখ বুজে ঢাল তলোয়ার নিয়ে নিজেকে রক্ষা করতে লেগে যায় - আর কাকে কী দিয়ে আঘাত করল সেটা দেখতে পায়না? 

আচ্ছা, সে যে অন্যায় করল, সেটা কি সে কোনদিন বুঝতে পারবে? আমি কি ধৈর্য ধরব, না কি এই দন্ডেই তার সাথে সম্পর্ক শেষ করে দিব? আমি কি মাফ করে দিব, না রাগ ধরে বসে থাকব? মাফ করে দিয়ে পুরো স্বাভাবিক হয়ে গেলে ও ত বুঝতেই পারবে না যে সে অন্যায় করেছিল। রাগ সারাজীবন ধরে রাখব? আল্লাহ রাগ হবে যে! আচ্ছা, এখন ভুলে যাই, পরে মনে করিয়ে দেব। কিন্তু আমি ত ভুলতে পারছি না। বুকের ভেতরে খচখচ করে লাগছে। (আচ্ছা, ও কেন এমন করল? ও কি এমনই? ও কি আমাকে পছন্দ করে না? ও কি বোঝেনা যে এটা অন্যায়?) তার চেয়ে এখন মন খারাপ করেই থাকি, বিষন্নতার আবরণে নিজেকে ঢেকে রাখলে এই মুহূর্তে আর কোন কিছুর মুখোমুখি হতে হবে না। 

একটু ঠিক হওয়ার পর... 

ও আমাকে এত কষ্ট দিল? আমিও বোকা, আমি ভুল মানুষের থেকে ভুল আশা করেছিলাম, দোষ আমারই। আমার সত্যিকারের শুভাকাঙ্ক্ষী যারা আছে, তাদের প্রতি এখন থেকে আরো মনোযোগী হব। তাদেরকেই আত্মার সাথে বেঁধে রাখার চেষ্টা করব, যাতে কখনও কষ্ট পেতে না হয়। 

এভাবেই আমি বিলিয়ার্ড বলের মত এক পকেট থেকে আরেক পকেটে মুখ গোঁজার চেষ্টা করে যাব। এই জনের ব্যবহারে দুঃখ পেলে অন্যজনকে আরো বেশি করে আঁকড়ে ধরব, তার প্রতি অতি দয়ার্দ্র হয়ে যাব, যাতে সে আমাকে ভুলেও কষ্ট না দেয়। বন্ধুরা কষ্ট দিলে পরিবারে ফিরে যাব, পরিবারে কষ্ট পেলে বন্ধুদের কাছে। আদর, ভালবাসা, সম্মান পাওয়ার জন্য প্রায়োরিটি ওলট পালট করে দিয়ে যার যা প্রাপ্য তা না দিয়ে যে ভালবাসবে তার জন্য সব উজাড় করে দেব, যতদিন ভালবাসবে, কেবল ততদিনই। 

অন্তঃসারশূন্যতার এই বিরাট ফাঁকি থেকে কবে বের হতে পারব?

Saturday, February 25, 2012

একদিন.. নিশ্চয়ই!

এ পর্যন্ত যে কয়েকজন স্কলার/দা'ঈর লেকচার শুনে ইসলামের প্রেমে পড়েছি তাদের একেক জনের কথার শৈলীতে মনে একেক রকম প্রভাব পড়েছে। উয়িসাম শেরীফ, অতি..রিক্ত ফানি, কথা শুনে হাসতে হাসতে পেটে খিল ধরে যায়... কিন্তু কোথা থেকে যে কোথায় চলে যায়, খেই রাখা যায় না। নোমান আলী খান, প্রাণবন্ত, কথা শুনতে ভাল লাগে, পাশাপাশি প্রতিটা লেকচারেই কুরআনের আরো নতুন কিছু মিরাকল শেয়ার করেন, তখন মনে হয়, বাহ! এত কিছু শিখে ফেললাম! তারিক রামাদান, উনার কণ্ঠস্বরে, শব্দচয়নে কী যেন আছে। শোনার পরপরই আত্মবিশ্বাস বেড়ে যায় অনেক! চিন্তাভাবনার আরো অনেকগুলো দুয়ার খুলে যায়, আবারো হিসেব কষতে বসি আমাদের বিচারবুদ্ধির কতটুকু সত্যিই কাজে লাগাচ্ছি। মোখতার মাগরুবি - উনার কথা কী আর বলব! কানে না, মগজে না, সোজাসুজি যেন হৃদয়ে এসে ঠাঁই করে নেয় কথাগুলো। উনার লেকচার শোনার পরে একটা বাক্যও আমার মনে থাকে না, একটাও না! কিন্তু মনের মধ্যে কী জানি হয়ে যায়, আত্মার সাথে বোঝাপড়া করে নেয় মনে হয় কথাগুলো। 

আরো আছে আমিনাহ আস্ সিলমি। কী শান্ত, মিষ্টি, পুরো পৃথিবীটা যেন ভালবাসা দিয়ে ভরিয়ে দেবেন। জ্ঞানের আধিক্যের চাকচিক্য নেই, তবু মনে হয় ইসলাম যেন উনার আত্মার উপলব্ধি। এই প্রশান্তি যেন আল্লাহ ইসলাম গ্রহণের পুরস্কার হিসেবে দু'হাত ভরে উনাকে উপহার দিয়েছেন। 

আমার এইভাবে দা'ঈ দের আলোচনা সমালোচনা করা ঠিক হচ্ছে না। উনারা আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য ইসলাম প্রচার করছেন। কারো উপর কী প্রভাব পড়বে এটা উনার বা আমাদের দেখার বিষয় না। তবু আমার ভাল লাগে উনাদের পরিবেশনশৈলী, বক্তব্যের গভীরতা - এসব নিয়ে চিন্তা করতে। তাছাড়া এটাও চিন্তা করি, উনারা সংসারের প্রয়োজন মিটিয়ে ইসলামের কাজে এত সময় কী করে দেন.. এত কিছু গুছিয়ে করেন কী করে... নোমান আলী খান এর বায়্যিনাহ ইনস্টিটিউট দশমাস ব্যাপী আবাসিক কুরআন কোর্স করায়। উনি প্রতি সপ্তাহেই ট্যুর করছেন, এ দিকে ছয় সন্তানের জনক, মাশাআল্লাহ। 

ইউসুফ এস্টিস, বৃদ্ধ পক্ককেশ দাদু, কিন্তু মাশাআল্লাহ, দু দু'টো টিভি চ্যানেল চালান। উনার চ্যানেলে কেবল উনার প্রোগ্রামই দেখায়, তার মানে প্রচুর প্রোগ্রাম বানাতে হয়েছে, হচ্ছে - এগুলো চালানোর জন্য। তারপর আছেন, আব্দুর রহিম গ্রীন, উনার নাকি ১১ সন্তান। ১১! স্কলাররা, দা'ঈরা আর কিছু না হোক, সন্তানদের ভাল মুসলিম করে গড়ে তুলবেন - এ প্রত্যয় নিশ্চয়ই থাকে। তার অর্থ উনারা এত কাজের মধ্যেও এ দায়িত্বটুকু নিতে ভয় করেন নি। ইনাদের প্রত্যেকেই আমাকে ইন্সপায়ার করে, সফল জীবন বলতে উনাদেরকেই চোখের সামনে দেখি। 

আমার খুব ইচ্ছে করে সময়টাকে কষে বাঁধ দিয়ে টুপ করে ডুব দেই জ্ঞানের অতল সাগরে। যত সময় নষ্ট করেছি, সবগুলোর পাপ ধুয়ে আলোকিত, স্বচ্ছ হয়ে আসি। যখন বেরিয়ে আসব, আলোকচ্ছটায় কারো চোখ ঝলসে যাবে না, নরম এক স্নিগ্ধ আবেশে মন্ত্রমুগ্ধের মত কাছে আসবে সকলে। সূর্য না, চাঁদ না, আমি হব মোম.. আমার জ্ঞানের উত্তাপ আমাকেই গলিয়ে আরো নত করবে.. আর যেই হাত বাড়াবে, তার সাথেই ভাগ করে নেব.. তাতে আমার ঐশ্বর্য কিছুমাত্র কমবে না... 

জানিনা কখনও হবে কিনা... তবে আমি স্বপ্ন দেখতে ভালবাসি। আমি অল্পতে খুশি হয়ে যেতে ভালবাসি। আমি আজকে যেখানে আছি সেখানে কখনও আসতে চাইনি। যা হয়েছি, তা হতে চাইনি। তবু আমি বিশ্বাস করি, ঠিক এভাবেই আল্লাহ চেয়েছিলেন আমি গড়ে উঠি। আমার ধীরগতির বেড়ে ওঠা, চিন্তার জগতে একাকিত্ব, বিকলাঙ্গ সামাজিকতাবোধ, বিষণ্নতা - এ সব কিছুরই দরকার ছিল। আরো সামনে যা আসবে - তারও খুব খুব প্রয়োজন আছে। একদিন আমি আবিষ্কার করব জীবন হঠাৎ খুব তীব্র বাঁক নিয়েছে, আরও অবাক হয়ে আবিষ্কার করব, এই পথটুকু চলবার জন্যই এক পা এক পা করে আমি হাঁটতে শিখেছিলাম। সময়ের নিষ্ঠুরতায় হতোদ্যম হয়ে যখন কেবল ভাগ্যকে দোষারোপ করেছি, তখন মেঘেরও ওপারে, অনেক দূর থেকে ভাগ্যনিয়ন্তা আমার অস্থিরতা দেখে হেসেছেন। 

আমি যা, ঠিক তাই আমার হওয়ার কথা ছিল। আর কোন কিছু না। অন্য কিছুই না। ধন্যবাদ আল্লাহ! আমি জানি, একদিন আমি দেখতে পাব; ততদিন পর্যন্ত আমার অকৃতজ্ঞতার জন্য আমাকে ক্ষমা করে দিও প্লীজ!

Thursday, February 2, 2012

দাম্পত্য - ৭

দাম্পত্য সিরিজটা আদৌ আর চালাব কি না তা নিয়ে সবসময়েই দোনোমনায় থাকি। কিন্তু পথ চলতে চলতে একেকটা বিষয় চোখে পড়ে, যা নিয়ে প্রায় প্রতি পরিবারেই কিছু না কিছু সমস্যা হয়, তখন মনে হয়, নাহ! লিখি। আর কিছু না হোক, বিষয়টা নিয়ে চিন্তা ত করা হবে। 

স্বামী স্ত্রীর সম্পর্কটা এত বেশি জড়ানো, একে অপরকে নিয়ে, আর তার মাঝে আবেগ ভালবাসার দাবি এত বেশি, যে কোন মূহুর্তে আবেগটুকু, চাওয়াটুকু বদলে যেতে পারে ঈর্ষায়। এরকম দম্পতি প্রচুর আছে, বোঝাপড়া খুব ভাল, একজন অপরজনকে ভালও বাসে অনেক, কিন্তু তাদেরই কোন এক বিপরীত লিঙ্গের বন্ধু বা সহকর্মীর সাথে হৃদ্যতাটা একটু বাড়াবাড়ি মনে হয়। সব ঠিকঠাক, কেবল ঐ বন্ধুটির সাথে মিশলেই স্ফুলিঙ্গের মত ভেতরে জ্বলে ওঠে কী যেন। এই ঈর্ষা বুঝিয়ে বলাও যায়না। ব্যাখ্যা করা যায়না, ঈর্ষান্বিত ব্যক্তিটি হয়ত 'আমি তোমাকে খুব ভালবাসি' এই যুক্তিতে সাফাই গাইতে চাইবে, কিন্তু অপরজন এটিকে দেখবে হীনমন্যতা, বিশ্বাসের অভাব - এভাবেই। এখানে অন্যান্যবারের মত উভয়পক্ষ নিজেকে খোলাখুলি ব্যক্ত করলেও সমস্যার সমাধান হচ্ছেনা। এবং অবধারিতভাবে পরস্পরের প্রতি শ্রদ্ধা কমে যাচ্ছে। 

আমি সবসময়েই কোন সমস্যা দেখলে তা সমাধান করার আগে উৎসটা খুঁজে বের করার চেষ্টা করি। আমার কাছে মনে হয়েছে সামাজিক মেলামেশার ক্ষেত্রে স্বামী আর স্ত্রীর সীমানাটা যদি ভিন্ন হয়, তখন এই সমস্যার সূত্রপাত হয়। ধরুন আপনি ঢাকা ইউনিভার্সিটি/বুয়েটে পড়েছেন, সহপাঠীর সাথে এক রিকশায় ওঠা আপনার জন্য খুবই সাধারণ ব্যাপার। আপনার স্বামী/স্ত্রী হয়ত এ ব্যাপারটায় অভ্যস্ত না, তার কাছে দৃষ্টিকটু লাগছে। মানসিক টানাপোড়েনে বন্ধুর সাথে কথা বললেন অবলম্বন চাইতে, বন্ধুর স্বামী/স্ত্রী হয়ত ব্যাপারটা স্বাভাবিক ভাবে নিল না। আপনার স্ত্রী সোশ্যালাইজ করতে পছন্দ করে, আপনি ভালবাসেন নিজের মত থাকতে, আপনার পছন্দকে সম্মান জানিয়ে স্ত্রী যদি একাই সোশ্যালাইজ করতে শুরু করে, কিছুদিনের মধ্যে একটু ঈর্ষা, একটু সন্দেহ মনে চলে আসতেই পারে। 

এজন্য এই বিষয়ে পরিষ্কারভাবে কথা বলা খুবই জরুরি, সমস্যা শুরুর আগেই। সবচেয়ে ভাল হয় বিয়ের আগেই না হলে সম্পর্কের শুরুর দিকেই কথা বলে নিলে। এমনি এমনি কোন প্রসঙ্গ ছাড়া আলোচনা করা ত কঠিন, আপনি চাইলে বানিয়ে বানিয়ে আপনার কোন বন্ধুর উদাহরণ দিতে পারেন, 'ওদের এমন হচ্ছে, তুমি কি মনে কর?' তখন এর পক্ষে বিপক্ষে যুক্তি আসবে, হয়ত অপরজন বলবে, 'বিয়ের পরে এত মেলামেশা কী?' অথবা, 'বিশ্বাস থাকলে এগুলো আবার কোন সমস্যা নাকি?' - এভাবে আপনি জানতে পারবেন নারী পুরুষের স্বাচ্ছন্দ্যের ঠিক কোথায় আপনার অবস্থান আর কোথায় আপনার সঙ্গীর। 

দ্বিতীয় যে কারণটা আমার মনে হয়েছে গুরূত্বপূর্ণ, তা হচ্ছে ইনসিকিউরিটি। আপনার সঙ্গী/সঙ্গিনীর সর্বাবস্থায় আপনিই একমাত্র অবলম্বন আর থাকছেন না - এই বোধটা খুব ভয়ের। আমি ছাড়া আরও কারো সান্নিধ্য তার ভাল লাগতে পারে - এ ব্যাপারটা মানতে যেন খুব কষ্ট হয়। এ ধরণের ঈর্ষা শুধু বিপরীত লিঙ্গের মানুষদের মধ্যেই সীমিত থাকে না, টেলিভিশন, বই, পোষা প্রাণী, এমনকি নিজের সন্তানদের প্রতিও ঈর্ষা আসতে পারে। এই ঈর্ষাটা মূলতঃ ওখান থেকে আসে, যেখানে আপনি স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছেন আপনার জন্য বরাদ্দকৃত সময়টুকু অন্য কেউ/ কিছু নিয়ে যাচ্ছে। 

এ সমস্যা প্রতিরোধের উপায় কী? প্রথমেই চেষ্টা করতে হবে ইনসিকিউরিটি বোধটা দূর করতে। ছোটখাট সারপ্রাইজ, উপহার, তার পছন্দের কোন কাজ (যা আপনি আগে কোনদিন করেন নি) - এসব তার কাছে এই মেসেজটা পৌছাবে যে আপনি তার ছোটখাট সব ভাললাগার দিকেই লক্ষ্য রাখেন। ঈর্ষার উৎস যদি হয় কোন অভ্যাস, বা কোন বন্ধু, সচেতনভাবে তার সামনে কাজ দিয়ে প্রমাণ করুন যে প্রায়োরিটি লিস্টে ওসব কখনোই তার উপরে না। যেমন টিভি দেখার সময় সে কোন কথা বললে টিভিটা বন্ধ করে তার দিকে ঘুরে কথাটা শুনুন। বই পড়ার বেলায় বই বন্ধ করে মুখ তুলে তাকান। কয়েকবার এমন করলে সে মেসেজ পেয়ে যাবে, এর পর থেকে আপনি নরম সুরে বললেই হবে, আমি একটু পরে করি? সহজ! আর যদি ঈর্ষাটা কোন মানুষের বিরূদ্ধে হয়, চেষ্টা করুন এমন কোন ঘটনা এড়িয়ে চলতে যেখানে আপনার স্বামী/স্ত্রী বনাম বন্ধু - এদের মধ্যে কোন একজনের প্রোগ্রাম বেছে নিতে হয়। একই ট্রিকস বাচ্চাদের জন্যেও প্রযোজ্য। বাচ্চারা ঠিকই বুঝে ফেলে বাবা মা তাদের চেয়ে টেলিভিশন কে বা অন্য কিছুকে বেশি প্রাধান্য দিচ্ছে কিনা। প্রতিশ্রুতি করে সেটা ভাঙলে কিছুতেই আপনার উপর শ্রদ্ধা বাড়বে না, এটা নিশ্চিত। 

ঈর্ষার প্রথম কারণটা আমি মনে করি সমাধান করা বেশি কঠিন। যে রক্ষণশীল তার যেমন নিজের পক্ষে অনেক ভাল ভাল যুক্তি আছে, যে উদার, তারও আছে। অনেক সময় দেখা যায় মানুষ রক্ষণশীল দৃষ্টিভঙ্গিটাকেই ন্যায্য বলে ধরে নেয়, অপরজন তখন একই সাথে অপমানিত ও অসহায় বোধ করে। এই বোধ স্বামী স্ত্রীর মধ্যে থাকা খুবই বিপদজনক। কারণ তখন স্বাভাবিক আবেগ ভালবাসার পথ রূদ্ধ হয়ে যায়। 

ত কী করতে হবে? যে রক্ষণশীল, তাকেই সহনশীল হতে হবে। কারণ জোর জবরদস্তি করে নিষ্পত্তি করার চেষ্টা করা বোকামি। সম্ভব হলে সরাসরি বলতে পারেন, 'এই কাজগুলো আমি সহজভাবে নিতে পারিনা। আমার মধ্যে প্রচণ্ড ঈর্ষা তৈরি হয়, যা আমি নিয়ন্ত্রণ এ রাখতে পারিনা।' তখন অপরপক্ষ স্বাভাবিকভাবেই বলতে পারে, 'এটা তোমার সমস্যা, আমি কেন তার জন্য বন্ধুত্ব নষ্ট করব?' আপনি তখন বুঝিয়ে বলতে পারেন যে 'একটা পরিবার খুব রক্ষণশীল থেকে খুব উদার - যে কোন অবস্থানে থেকেই চলতে পারে। এটা আমার বা তোমার সমস্যা নয়, এটা আমাদের দৃষ্টিভঙ্গির পার্থক্যের সমস্যা। আমি চেষ্টা করব তোমার মত করে চিন্তা করতে, কিন্তু তুমিও চেষ্টা কর এমন কোন সমস্যা যেন না হয় সেটা খেয়াল রাখতে।' এর পাশাপাশি আপনি যাকে নিয়ে ঈর্ষান্বিত হন, তাকে নিয়ে আরো বেশি বেশি চিন্তা করে দেখুন, সে মানুষটার সব কিছুই কি খারাপ? নাকি একটু দু'টো কাজ আপনার ভাল লাগেনা। তখন আপনার সঙ্গীকে আরো পরিষ্কার করে বলতে পারবেন, ঠিক এই বিষয়গুলো তে আমার আপত্তি। কেন আপত্তি সেটাও চিন্তা ভাবনা করে নিশ্চিত হয়ে নিন। আপনি যদি এতখানি পরিশ্রম করেন, আপনার সঙ্গী বুঝতে পারবে যে আপনি সত্যিই সমস্যা সমাধানে আন্তরিক। তখন তার তরফ থেকেও আন্তরিকতা বাড়বে। 

পরিশেষে, একটা চমৎকার দু'আ করুন দু'জনে মিলে, হে আল্লাহ! আমাদের মধ্যে যে ভুল পথে আছে তাকে তুমি শুধরে দাও, আর যে সঠিক পথে আছে তাকে ধৈর্য ধরার শক্তি দাও।

Wednesday, January 11, 2012

ক্বুল হুয়া আল্লাহু আহাদ

আমি কিছুদিন আগে আমাদের স্টাডি সার্কেলে সূরা ইখলাস আলোচনা করার দায়িত্ব পেয়েছিলাম। সূরা ইখলাস কুরআনের এক তৃতীয়াংশ - এটা হজম করতে আমার খুবই কষ্ট হত, আমার ক্ষুদ্র মস্তিষ্কে কিছুতেই ধরত না, চার লাইনের এক সূরা, যেটা এক নিঃশ্বাসে বলে বিশ সেকেন্ডের মধ্যে রূকু তে চলে যাওয়া যায় - তা কী করে এত ভারি হয়? 

সূরা ইখলাস যে কতটা আশ্চর্যকর, কত...টা তা আবিষ্কার করার পর আমার মাথা কিছুক্ষণ ঝিমঝিম করছিল। এই সূরার নামকরণই একটা বিস্ময়। এর নাম ইখলাস, অর্থাৎ sincerity. একটা উপদেশনামায় sincerity নামে চ্যাপ্টার পেলে তাতে কী বক্তব্য থাকা স্বাভাবিক? "ভাল থাক, ভাল কাজ কর, সদা সত্য কথা বল" - এসব ত? ঠিক সূরা আসরে যেমন আছে, (বিশ্বাস কর, ভাল কাজ কর, ধৈর্য ও সততার সাথে অন্যদের ভাল কাজের উপদেশ দাও....) এসব থাকলেই ত মানাত বেশ। তা না করে আল্লাহ নিজের সবচেয়ে পূর্ণাঙ্গ বর্ণনা দিলেন যে সূরায়, তার নাম দিলেন 'ইখলাস'; কেন? মানে টা কী? 

তার পরের বিস্ময় ছিল আমার জন্য, এক তৃতীয়াংশর হাদীস টা। আবু সাইদ খুদরি থেকে বর্ণিত, এক লোক নাকি সারা রাত নামাযে কেবলমাত্র 'ক্বুল হুয়া আল্লাহু আহাদ' পড়েছে, তা শুনে রাসুলুল্লাহ (স) শপথ করে বলেছেন, এটি কুরআনের এক তৃতীয়াংশ। এখানে লক্ষ্যণীয়, লোকটা কেবলমাত্র একটা আয়াত পড়েছে, পুরো সূরাটাও না। রাসুলুল্লাহ আরেক হাদীসে বলেছেন, 

'inna 'ala kuli shay'in noor , wa noor-ul Qur'ani; Qul huwwa Allahu ahad. ' 

'surely, for every thing is light, and the light of the Qur'an is; Say, He is Allah, the One' 

কুরআনের আলো জানার আগে এ সূরা নাযিলের প্রেক্ষাপট আর তাওহীদ সম্পর্কে কিছুটা জানতে হবে। তাওহীদ তিন প্রকার, খুব সংক্ষেপে এই - 

১. তাওহীদ আর রুবুবিয়্যাহ (রব হিসেবে আল্লাহর একত্ববাদ স্বীকার করা) 'রব' হওয়া চাট্টিখানি কথা নয়। লালন পালন, ভরণ পোষণ, ভূত ভবিষ্যৎ চিন্তাভাবনা করা সহ সামগ্রিক দেখভাল যিনি করেন, তিনিই রব হতে পারেন। আমাদের বাবা মাও এক অর্থে আমাদের রব। কিন্তু তাদেরও সীমাবদ্ধতা আছে। উনারা ভবিষ্যৎ দেখতে পান না। খাবার কেনার ক্ষমতা তাঁদের আছে, কিন্তু খাবার সৃষ্টি করার ক্ষমতা তাঁদের নেই। তাই সবকিছু মিলে 'দি রব' হচ্ছেন আল্লাহ। আর এটাকে বিশ্বাস করাই তাওহীদ আর রুবুবিয়্যাহ। 

২. তাওহীদ আল উলুহিয়্যাহ (ইলাহ হিসেবে আল্লাহর একত্ববাদ) যে কোন সমাজই শান্তিতে টিকে থাকার জন্য তার সদস্যদের উপর কিছু নিয়ম কানুন আরোপ করে। সমাজের সদস্যরা দল মত নির্বিশেষে তা মেনে চলে। এই যে একটা মানার ব্যাপার, নিজের একটা বোধ থেকে, যে এটা মানলে সব মিলিয়ে আমার জন্য ভালই হবে - এই বোধ থেকে নিজের ছন্নছাড়া ইচ্ছাগুলোকে বাঁধ মানানো - এই সাবমিশনের ব্যাপারটাই ইবাদত। যার নির্দেশ মানছি, সে হয়ে যাচ্ছে আমার ইলাহ। তাওহীদ আল উলুহিয়্যাহ আমাদের শিক্ষা দেয়, আমাদের আল্টিমেট ইলাহ হচ্ছে আল্লাহ। অর্থাৎ অন্য কারো বেঁধে দেয়া নিয়ম যদি আল্লাহর বেঁধে দেয়া নিয়মের সাথে সাংঘর্ষিক হয়, তাহলে আল্লাহর নিয়মটাই আমাদের বেছে নিতে হবে। এমনকি তা যদি বাবা মায়ের থেকে হয়, তবুও। 

৩. তাওহীদ আল আসমা ওয়া আস সিফাত (আল্লাহর নাম ও গুণবাচক বিশেষণের স্বাতন্ত্র্যের প্রতি বিশ্বাস) আল্লাহর অনেক গুণবাচক নাম, আল্লাহকে চেনার জন্য কুরআনে প্রতি তিন চার আয়াত পর পর আল্লাহর সম্পর্কে একটা কিছু লেখা। কুরআনে লেখা, তা ত আর মিথ্যা বা কাল্পনিক হতে পারে না, অতএব আল্লাহর প্রতিটা নাম ও গুণকে অন্তর থেকে বিশ্বাস করা এই তাওহীদের অন্তর্ভুক্ত। তাছাড়া একই গুণ যদি আমরা মানুষের মধ্যে পাই তবু জানব আল্লাহর এই গুণ স্বতন্ত্র, কারণ এর কোন আদি অন্ত নেই, আর আল্লাহকে এই গুণ কেউ দিয়ে দেয়নি, কিন্তু মানুষকে এই গুণ দিয়েছে আল্লাহ। 

যাই হোক, বলছিলাম ক্বুল হুয়া আল্লাহু আহাদ এর কথা। রাসুলুল্লাহ (স) যখন তাওহীদের কথা প্রচার করতে থাকলেন, যে গড বা ঈশ্বর একজনই, তখন কুরাইশদের মধ্যে কেউ কেউ জানতে চায়, তোমার গড কেমন? আমাদের লাত উজ্জা ত সোনা রূপার তৈরি, তোমার গড কীসের তৈরি? সে দেখতে কেমন? তখন আল্লাহ রাসুলুল্লাহ (স) এর কাছে ওহী পাঠান, 'বল, তিনি আল্লাহ, তার মত কেউ নেই।' একটা বাক্যের অবতারণা যখন হয় 'সে' বা 'তিনি' দিয়ে, তখন বুঝতে হবে, বাক্যের আলোচ্য ব্যক্তিটি আগে থেকেই শ্রোতাদের পরিচিত। এখানে কুরাইশরা জানতে চেয়েছে তোমার 'গড' টা কে বা কী? রাসুলুল্লাহ বলেছেন, 'তিনি হচ্ছেন আল্লাহ, আহাদ।' এই তিনি দিয়ে রাসুলুল্লাহ (স) নির্দেশ করেছেন তাঁর ঈশ্বর কে। এই পুরো 'তিনি হচ্ছেন আল্লাহ, আহাদ' - বাক্যটা সাক্ষ্য দিচ্ছে যে আল্লাহই রাসুলুল্লাহ (স) এর একমাত্র রব। আর এটাই তাওহীদ আর রুবুবিয়্যাহ এর শিক্ষা। 

পরের শব্দ 'আল্লাহু', আরবি ব্যকরণবিদরা এখনও নিশ্চিত হতে পারেন নি 'আল্লাহ' কি একটা বিশেষ্য না বিশেষণ, আল্লাহ কি শুধুই একটা নাম, নাকি একে ভেঙে 'আল ইলাহ' বানানো যাবে। দুটো মতবাদই এখন পর্যন্ত গ্রহণীয়, তাই এই একটা বাক্য আল্লাহর নাম, আর আল্লাহর গুণ - দু'টোই প্রকাশ করছে। যেমন 'তোমার গড কে?' উত্তর 'তিনি হচ্ছেন আল্লাহ', আবার 'তোমার গডের সম্পর্কে কিছু বল' এর উত্তরও 'তিনি হচ্ছেন আল্লাহ।' অর্থাৎ আল ইলাহ বা একমাত্র উপাস্য, আমি যার ইবাদত করি। (তাওহীদ আল উলুহিয়্যাহ) 

আয়াতের সর্বশেষ শব্দ, 'আহাদ' মানে কেবল সংখ্যায় এক নয়, ইউনিক, এর মত কোন কিছু কোথাও পাওয়া যাবেনা, একটাই, মাস্টারপিস। এমন একটা কিছু, যার উৎস জানা নেই, যার সমকক্ষ, বা সমমানের কোন কিছু নেই। এই 'আহাদ' শব্দটা থেকেই নিশ্চিত হয়ে যায় আল্লাহর কোন জনক নেই, বা তাঁর কোন সন্তান নেই। তাঁর সমকক্ষ নেই, তার মানে তিনি স্ত্রী বা সহযোগীও গ্রহণ করেন নি। পুরোপুরিই অদ্বিতীয়। 

এইবার সূরা ইখলাস এর পরের আয়াতগুলো পড়ে দেখুন। নতুন কিছু পেলেন কি? 

আল্লাহ এই সূরা শুরু করেছেন 'বল', এই নির্দেশ দিয়ে। কাকে বলতে বলেছেন? যার প্রতি নাযিল হয়েছিল, তিনি নিজেও জানতেন না আল্লাহর স্বরূপ। তাই আল্লাহর নির্দেশ পালন করতে হবে নিজেরই উপরে সর্বপ্রথম। নিজেকে 'তিনি আল্লাহ, আহাদ' এর মর্মার্থ হৃদয়ঙ্গম করাতে হবে। তারপর আল্লাহর নির্দেশে এই বার্তা ছড়াতে হবে অন্যদের মাঝেও। এখন তাওহীদের বাণী নিজের মধ্যে প্রতিষ্ঠা করে এবং অন্যদের দাওয়াত দিতে থাকলে দ্বীনের প্রতি আপনার সততা প্রমাণিত হবেই। তাছাড়া আমরা যখন মনে প্রাণে কৃতজ্ঞচিত্তে বিশ্বাস করব আমাদের সব কিছু দেখভালের দায়িত্ব নিয়েছেন আল্লাহ, আমাদের ইবাদতের একমাত্র দাবিদার আল্লাহ, এবং তাঁর সমকক্ষ বা সাহায্যকারি কেউ নেই, যাকে ধরে শেষ বিচারের দিনে পার পেয়ে যেতে পারি, তখন দৈনন্দিন কাজে ফাঁকি দেয়ার কি আর কোন উপায় থাকবে? 

এ জন্য এই সূরার নাম sincerity? ও!