Sunday, March 4, 2012

আমার যখন মন খারাপ

আমার মন খারাপ হয় দু'টো কারণে। কিছু একটা মনে মনে আশা করে থাকি, সেরকম করে সব না হলে; আর মন খারাপ হয় কেউ অন্যায় আচরণ করলে। অন্যায় আচরণ করলে আমি খুব করে হিসেব মেলানোর চেষ্টা করি, কেন এমন করল? তাহলে কি আমার কোন ভুল ছিল? আমি এই কাজটা এভাবে না করে ওভাবে করলে কি ও আর অমন করত না? তারপর যদি বুঝি যে আমারই দোষ ছিল, তখন মনে হয়, আচ্ছা, আমি না হয় দোষ করেছিই, সে কেন আরো একটু উদার হয়ে দেখতে পারল না? সে কেন ক্ষমা করে দিল না? আমার সাথে ওর হৃদ্যতার উছিলায় কেন আমার এই দোষটা উপেক্ষা করতে পারল না? তবে কি ও আমাকে ততটা পছন্দ করে না, যতটা করে ওর নিজের ইগোকে? 

আর যদি আমার কোন দোষ না থাকে, তখন রীতিমত বিমর্ষ হয়ে পড়ি, মানুষ এত স্বার্থপর কেন? এত ইগোনির্ভর কেন? এইভাবে কেন দেখল ঘটনাটাকে, কেন আমি যেভাবে দেখেছি সেভাবে দেখল না? আচ্ছা, ও কি তাহলে সবসময় সবকিছুকে এভাবেই দেখে? ওর পুরনো কাজগুলোও কি তাই মিন করে? তাহলে ত ও আমার মত না। নাকি ওর আত্মসম্মানবোধ প্রচন্ড বেশি, অথবা ইনসিকিউরিটি এত বেশি, যে তার চাওয়া অনুযায়ী কিছু না হলেই চোখ বুজে ঢাল তলোয়ার নিয়ে নিজেকে রক্ষা করতে লেগে যায় - আর কাকে কী দিয়ে আঘাত করল সেটা দেখতে পায়না? 

আচ্ছা, সে যে অন্যায় করল, সেটা কি সে কোনদিন বুঝতে পারবে? আমি কি ধৈর্য ধরব, না কি এই দন্ডেই তার সাথে সম্পর্ক শেষ করে দিব? আমি কি মাফ করে দিব, না রাগ ধরে বসে থাকব? মাফ করে দিয়ে পুরো স্বাভাবিক হয়ে গেলে ও ত বুঝতেই পারবে না যে সে অন্যায় করেছিল। রাগ সারাজীবন ধরে রাখব? আল্লাহ রাগ হবে যে! আচ্ছা, এখন ভুলে যাই, পরে মনে করিয়ে দেব। কিন্তু আমি ত ভুলতে পারছি না। বুকের ভেতরে খচখচ করে লাগছে। (আচ্ছা, ও কেন এমন করল? ও কি এমনই? ও কি আমাকে পছন্দ করে না? ও কি বোঝেনা যে এটা অন্যায়?) তার চেয়ে এখন মন খারাপ করেই থাকি, বিষন্নতার আবরণে নিজেকে ঢেকে রাখলে এই মুহূর্তে আর কোন কিছুর মুখোমুখি হতে হবে না। 

একটু ঠিক হওয়ার পর... 

ও আমাকে এত কষ্ট দিল? আমিও বোকা, আমি ভুল মানুষের থেকে ভুল আশা করেছিলাম, দোষ আমারই। আমার সত্যিকারের শুভাকাঙ্ক্ষী যারা আছে, তাদের প্রতি এখন থেকে আরো মনোযোগী হব। তাদেরকেই আত্মার সাথে বেঁধে রাখার চেষ্টা করব, যাতে কখনও কষ্ট পেতে না হয়। 

এভাবেই আমি বিলিয়ার্ড বলের মত এক পকেট থেকে আরেক পকেটে মুখ গোঁজার চেষ্টা করে যাব। এই জনের ব্যবহারে দুঃখ পেলে অন্যজনকে আরো বেশি করে আঁকড়ে ধরব, তার প্রতি অতি দয়ার্দ্র হয়ে যাব, যাতে সে আমাকে ভুলেও কষ্ট না দেয়। বন্ধুরা কষ্ট দিলে পরিবারে ফিরে যাব, পরিবারে কষ্ট পেলে বন্ধুদের কাছে। আদর, ভালবাসা, সম্মান পাওয়ার জন্য প্রায়োরিটি ওলট পালট করে দিয়ে যার যা প্রাপ্য তা না দিয়ে যে ভালবাসবে তার জন্য সব উজাড় করে দেব, যতদিন ভালবাসবে, কেবল ততদিনই। 

অন্তঃসারশূন্যতার এই বিরাট ফাঁকি থেকে কবে বের হতে পারব?

Saturday, February 25, 2012

একদিন.. নিশ্চয়ই!

এ পর্যন্ত যে কয়েকজন স্কলার/দা'ঈর লেকচার শুনে ইসলামের প্রেমে পড়েছি তাদের একেক জনের কথার শৈলীতে মনে একেক রকম প্রভাব পড়েছে। উয়িসাম শেরীফ, অতি..রিক্ত ফানি, কথা শুনে হাসতে হাসতে পেটে খিল ধরে যায়... কিন্তু কোথা থেকে যে কোথায় চলে যায়, খেই রাখা যায় না। নোমান আলী খান, প্রাণবন্ত, কথা শুনতে ভাল লাগে, পাশাপাশি প্রতিটা লেকচারেই কুরআনের আরো নতুন কিছু মিরাকল শেয়ার করেন, তখন মনে হয়, বাহ! এত কিছু শিখে ফেললাম! তারিক রামাদান, উনার কণ্ঠস্বরে, শব্দচয়নে কী যেন আছে। শোনার পরপরই আত্মবিশ্বাস বেড়ে যায় অনেক! চিন্তাভাবনার আরো অনেকগুলো দুয়ার খুলে যায়, আবারো হিসেব কষতে বসি আমাদের বিচারবুদ্ধির কতটুকু সত্যিই কাজে লাগাচ্ছি। মোখতার মাগরুবি - উনার কথা কী আর বলব! কানে না, মগজে না, সোজাসুজি যেন হৃদয়ে এসে ঠাঁই করে নেয় কথাগুলো। উনার লেকচার শোনার পরে একটা বাক্যও আমার মনে থাকে না, একটাও না! কিন্তু মনের মধ্যে কী জানি হয়ে যায়, আত্মার সাথে বোঝাপড়া করে নেয় মনে হয় কথাগুলো। 

আরো আছে আমিনাহ আস্ সিলমি। কী শান্ত, মিষ্টি, পুরো পৃথিবীটা যেন ভালবাসা দিয়ে ভরিয়ে দেবেন। জ্ঞানের আধিক্যের চাকচিক্য নেই, তবু মনে হয় ইসলাম যেন উনার আত্মার উপলব্ধি। এই প্রশান্তি যেন আল্লাহ ইসলাম গ্রহণের পুরস্কার হিসেবে দু'হাত ভরে উনাকে উপহার দিয়েছেন। 

আমার এইভাবে দা'ঈ দের আলোচনা সমালোচনা করা ঠিক হচ্ছে না। উনারা আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য ইসলাম প্রচার করছেন। কারো উপর কী প্রভাব পড়বে এটা উনার বা আমাদের দেখার বিষয় না। তবু আমার ভাল লাগে উনাদের পরিবেশনশৈলী, বক্তব্যের গভীরতা - এসব নিয়ে চিন্তা করতে। তাছাড়া এটাও চিন্তা করি, উনারা সংসারের প্রয়োজন মিটিয়ে ইসলামের কাজে এত সময় কী করে দেন.. এত কিছু গুছিয়ে করেন কী করে... নোমান আলী খান এর বায়্যিনাহ ইনস্টিটিউট দশমাস ব্যাপী আবাসিক কুরআন কোর্স করায়। উনি প্রতি সপ্তাহেই ট্যুর করছেন, এ দিকে ছয় সন্তানের জনক, মাশাআল্লাহ। 

ইউসুফ এস্টিস, বৃদ্ধ পক্ককেশ দাদু, কিন্তু মাশাআল্লাহ, দু দু'টো টিভি চ্যানেল চালান। উনার চ্যানেলে কেবল উনার প্রোগ্রামই দেখায়, তার মানে প্রচুর প্রোগ্রাম বানাতে হয়েছে, হচ্ছে - এগুলো চালানোর জন্য। তারপর আছেন, আব্দুর রহিম গ্রীন, উনার নাকি ১১ সন্তান। ১১! স্কলাররা, দা'ঈরা আর কিছু না হোক, সন্তানদের ভাল মুসলিম করে গড়ে তুলবেন - এ প্রত্যয় নিশ্চয়ই থাকে। তার অর্থ উনারা এত কাজের মধ্যেও এ দায়িত্বটুকু নিতে ভয় করেন নি। ইনাদের প্রত্যেকেই আমাকে ইন্সপায়ার করে, সফল জীবন বলতে উনাদেরকেই চোখের সামনে দেখি। 

আমার খুব ইচ্ছে করে সময়টাকে কষে বাঁধ দিয়ে টুপ করে ডুব দেই জ্ঞানের অতল সাগরে। যত সময় নষ্ট করেছি, সবগুলোর পাপ ধুয়ে আলোকিত, স্বচ্ছ হয়ে আসি। যখন বেরিয়ে আসব, আলোকচ্ছটায় কারো চোখ ঝলসে যাবে না, নরম এক স্নিগ্ধ আবেশে মন্ত্রমুগ্ধের মত কাছে আসবে সকলে। সূর্য না, চাঁদ না, আমি হব মোম.. আমার জ্ঞানের উত্তাপ আমাকেই গলিয়ে আরো নত করবে.. আর যেই হাত বাড়াবে, তার সাথেই ভাগ করে নেব.. তাতে আমার ঐশ্বর্য কিছুমাত্র কমবে না... 

জানিনা কখনও হবে কিনা... তবে আমি স্বপ্ন দেখতে ভালবাসি। আমি অল্পতে খুশি হয়ে যেতে ভালবাসি। আমি আজকে যেখানে আছি সেখানে কখনও আসতে চাইনি। যা হয়েছি, তা হতে চাইনি। তবু আমি বিশ্বাস করি, ঠিক এভাবেই আল্লাহ চেয়েছিলেন আমি গড়ে উঠি। আমার ধীরগতির বেড়ে ওঠা, চিন্তার জগতে একাকিত্ব, বিকলাঙ্গ সামাজিকতাবোধ, বিষণ্নতা - এ সব কিছুরই দরকার ছিল। আরো সামনে যা আসবে - তারও খুব খুব প্রয়োজন আছে। একদিন আমি আবিষ্কার করব জীবন হঠাৎ খুব তীব্র বাঁক নিয়েছে, আরও অবাক হয়ে আবিষ্কার করব, এই পথটুকু চলবার জন্যই এক পা এক পা করে আমি হাঁটতে শিখেছিলাম। সময়ের নিষ্ঠুরতায় হতোদ্যম হয়ে যখন কেবল ভাগ্যকে দোষারোপ করেছি, তখন মেঘেরও ওপারে, অনেক দূর থেকে ভাগ্যনিয়ন্তা আমার অস্থিরতা দেখে হেসেছেন। 

আমি যা, ঠিক তাই আমার হওয়ার কথা ছিল। আর কোন কিছু না। অন্য কিছুই না। ধন্যবাদ আল্লাহ! আমি জানি, একদিন আমি দেখতে পাব; ততদিন পর্যন্ত আমার অকৃতজ্ঞতার জন্য আমাকে ক্ষমা করে দিও প্লীজ!

Thursday, February 2, 2012

দাম্পত্য - ৭

দাম্পত্য সিরিজটা আদৌ আর চালাব কি না তা নিয়ে সবসময়েই দোনোমনায় থাকি। কিন্তু পথ চলতে চলতে একেকটা বিষয় চোখে পড়ে, যা নিয়ে প্রায় প্রতি পরিবারেই কিছু না কিছু সমস্যা হয়, তখন মনে হয়, নাহ! লিখি। আর কিছু না হোক, বিষয়টা নিয়ে চিন্তা ত করা হবে। 

স্বামী স্ত্রীর সম্পর্কটা এত বেশি জড়ানো, একে অপরকে নিয়ে, আর তার মাঝে আবেগ ভালবাসার দাবি এত বেশি, যে কোন মূহুর্তে আবেগটুকু, চাওয়াটুকু বদলে যেতে পারে ঈর্ষায়। এরকম দম্পতি প্রচুর আছে, বোঝাপড়া খুব ভাল, একজন অপরজনকে ভালও বাসে অনেক, কিন্তু তাদেরই কোন এক বিপরীত লিঙ্গের বন্ধু বা সহকর্মীর সাথে হৃদ্যতাটা একটু বাড়াবাড়ি মনে হয়। সব ঠিকঠাক, কেবল ঐ বন্ধুটির সাথে মিশলেই স্ফুলিঙ্গের মত ভেতরে জ্বলে ওঠে কী যেন। এই ঈর্ষা বুঝিয়ে বলাও যায়না। ব্যাখ্যা করা যায়না, ঈর্ষান্বিত ব্যক্তিটি হয়ত 'আমি তোমাকে খুব ভালবাসি' এই যুক্তিতে সাফাই গাইতে চাইবে, কিন্তু অপরজন এটিকে দেখবে হীনমন্যতা, বিশ্বাসের অভাব - এভাবেই। এখানে অন্যান্যবারের মত উভয়পক্ষ নিজেকে খোলাখুলি ব্যক্ত করলেও সমস্যার সমাধান হচ্ছেনা। এবং অবধারিতভাবে পরস্পরের প্রতি শ্রদ্ধা কমে যাচ্ছে। 

আমি সবসময়েই কোন সমস্যা দেখলে তা সমাধান করার আগে উৎসটা খুঁজে বের করার চেষ্টা করি। আমার কাছে মনে হয়েছে সামাজিক মেলামেশার ক্ষেত্রে স্বামী আর স্ত্রীর সীমানাটা যদি ভিন্ন হয়, তখন এই সমস্যার সূত্রপাত হয়। ধরুন আপনি ঢাকা ইউনিভার্সিটি/বুয়েটে পড়েছেন, সহপাঠীর সাথে এক রিকশায় ওঠা আপনার জন্য খুবই সাধারণ ব্যাপার। আপনার স্বামী/স্ত্রী হয়ত এ ব্যাপারটায় অভ্যস্ত না, তার কাছে দৃষ্টিকটু লাগছে। মানসিক টানাপোড়েনে বন্ধুর সাথে কথা বললেন অবলম্বন চাইতে, বন্ধুর স্বামী/স্ত্রী হয়ত ব্যাপারটা স্বাভাবিক ভাবে নিল না। আপনার স্ত্রী সোশ্যালাইজ করতে পছন্দ করে, আপনি ভালবাসেন নিজের মত থাকতে, আপনার পছন্দকে সম্মান জানিয়ে স্ত্রী যদি একাই সোশ্যালাইজ করতে শুরু করে, কিছুদিনের মধ্যে একটু ঈর্ষা, একটু সন্দেহ মনে চলে আসতেই পারে। 

এজন্য এই বিষয়ে পরিষ্কারভাবে কথা বলা খুবই জরুরি, সমস্যা শুরুর আগেই। সবচেয়ে ভাল হয় বিয়ের আগেই না হলে সম্পর্কের শুরুর দিকেই কথা বলে নিলে। এমনি এমনি কোন প্রসঙ্গ ছাড়া আলোচনা করা ত কঠিন, আপনি চাইলে বানিয়ে বানিয়ে আপনার কোন বন্ধুর উদাহরণ দিতে পারেন, 'ওদের এমন হচ্ছে, তুমি কি মনে কর?' তখন এর পক্ষে বিপক্ষে যুক্তি আসবে, হয়ত অপরজন বলবে, 'বিয়ের পরে এত মেলামেশা কী?' অথবা, 'বিশ্বাস থাকলে এগুলো আবার কোন সমস্যা নাকি?' - এভাবে আপনি জানতে পারবেন নারী পুরুষের স্বাচ্ছন্দ্যের ঠিক কোথায় আপনার অবস্থান আর কোথায় আপনার সঙ্গীর। 

দ্বিতীয় যে কারণটা আমার মনে হয়েছে গুরূত্বপূর্ণ, তা হচ্ছে ইনসিকিউরিটি। আপনার সঙ্গী/সঙ্গিনীর সর্বাবস্থায় আপনিই একমাত্র অবলম্বন আর থাকছেন না - এই বোধটা খুব ভয়ের। আমি ছাড়া আরও কারো সান্নিধ্য তার ভাল লাগতে পারে - এ ব্যাপারটা মানতে যেন খুব কষ্ট হয়। এ ধরণের ঈর্ষা শুধু বিপরীত লিঙ্গের মানুষদের মধ্যেই সীমিত থাকে না, টেলিভিশন, বই, পোষা প্রাণী, এমনকি নিজের সন্তানদের প্রতিও ঈর্ষা আসতে পারে। এই ঈর্ষাটা মূলতঃ ওখান থেকে আসে, যেখানে আপনি স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছেন আপনার জন্য বরাদ্দকৃত সময়টুকু অন্য কেউ/ কিছু নিয়ে যাচ্ছে। 

এ সমস্যা প্রতিরোধের উপায় কী? প্রথমেই চেষ্টা করতে হবে ইনসিকিউরিটি বোধটা দূর করতে। ছোটখাট সারপ্রাইজ, উপহার, তার পছন্দের কোন কাজ (যা আপনি আগে কোনদিন করেন নি) - এসব তার কাছে এই মেসেজটা পৌছাবে যে আপনি তার ছোটখাট সব ভাললাগার দিকেই লক্ষ্য রাখেন। ঈর্ষার উৎস যদি হয় কোন অভ্যাস, বা কোন বন্ধু, সচেতনভাবে তার সামনে কাজ দিয়ে প্রমাণ করুন যে প্রায়োরিটি লিস্টে ওসব কখনোই তার উপরে না। যেমন টিভি দেখার সময় সে কোন কথা বললে টিভিটা বন্ধ করে তার দিকে ঘুরে কথাটা শুনুন। বই পড়ার বেলায় বই বন্ধ করে মুখ তুলে তাকান। কয়েকবার এমন করলে সে মেসেজ পেয়ে যাবে, এর পর থেকে আপনি নরম সুরে বললেই হবে, আমি একটু পরে করি? সহজ! আর যদি ঈর্ষাটা কোন মানুষের বিরূদ্ধে হয়, চেষ্টা করুন এমন কোন ঘটনা এড়িয়ে চলতে যেখানে আপনার স্বামী/স্ত্রী বনাম বন্ধু - এদের মধ্যে কোন একজনের প্রোগ্রাম বেছে নিতে হয়। একই ট্রিকস বাচ্চাদের জন্যেও প্রযোজ্য। বাচ্চারা ঠিকই বুঝে ফেলে বাবা মা তাদের চেয়ে টেলিভিশন কে বা অন্য কিছুকে বেশি প্রাধান্য দিচ্ছে কিনা। প্রতিশ্রুতি করে সেটা ভাঙলে কিছুতেই আপনার উপর শ্রদ্ধা বাড়বে না, এটা নিশ্চিত। 

ঈর্ষার প্রথম কারণটা আমি মনে করি সমাধান করা বেশি কঠিন। যে রক্ষণশীল তার যেমন নিজের পক্ষে অনেক ভাল ভাল যুক্তি আছে, যে উদার, তারও আছে। অনেক সময় দেখা যায় মানুষ রক্ষণশীল দৃষ্টিভঙ্গিটাকেই ন্যায্য বলে ধরে নেয়, অপরজন তখন একই সাথে অপমানিত ও অসহায় বোধ করে। এই বোধ স্বামী স্ত্রীর মধ্যে থাকা খুবই বিপদজনক। কারণ তখন স্বাভাবিক আবেগ ভালবাসার পথ রূদ্ধ হয়ে যায়। 

ত কী করতে হবে? যে রক্ষণশীল, তাকেই সহনশীল হতে হবে। কারণ জোর জবরদস্তি করে নিষ্পত্তি করার চেষ্টা করা বোকামি। সম্ভব হলে সরাসরি বলতে পারেন, 'এই কাজগুলো আমি সহজভাবে নিতে পারিনা। আমার মধ্যে প্রচণ্ড ঈর্ষা তৈরি হয়, যা আমি নিয়ন্ত্রণ এ রাখতে পারিনা।' তখন অপরপক্ষ স্বাভাবিকভাবেই বলতে পারে, 'এটা তোমার সমস্যা, আমি কেন তার জন্য বন্ধুত্ব নষ্ট করব?' আপনি তখন বুঝিয়ে বলতে পারেন যে 'একটা পরিবার খুব রক্ষণশীল থেকে খুব উদার - যে কোন অবস্থানে থেকেই চলতে পারে। এটা আমার বা তোমার সমস্যা নয়, এটা আমাদের দৃষ্টিভঙ্গির পার্থক্যের সমস্যা। আমি চেষ্টা করব তোমার মত করে চিন্তা করতে, কিন্তু তুমিও চেষ্টা কর এমন কোন সমস্যা যেন না হয় সেটা খেয়াল রাখতে।' এর পাশাপাশি আপনি যাকে নিয়ে ঈর্ষান্বিত হন, তাকে নিয়ে আরো বেশি বেশি চিন্তা করে দেখুন, সে মানুষটার সব কিছুই কি খারাপ? নাকি একটু দু'টো কাজ আপনার ভাল লাগেনা। তখন আপনার সঙ্গীকে আরো পরিষ্কার করে বলতে পারবেন, ঠিক এই বিষয়গুলো তে আমার আপত্তি। কেন আপত্তি সেটাও চিন্তা ভাবনা করে নিশ্চিত হয়ে নিন। আপনি যদি এতখানি পরিশ্রম করেন, আপনার সঙ্গী বুঝতে পারবে যে আপনি সত্যিই সমস্যা সমাধানে আন্তরিক। তখন তার তরফ থেকেও আন্তরিকতা বাড়বে। 

পরিশেষে, একটা চমৎকার দু'আ করুন দু'জনে মিলে, হে আল্লাহ! আমাদের মধ্যে যে ভুল পথে আছে তাকে তুমি শুধরে দাও, আর যে সঠিক পথে আছে তাকে ধৈর্য ধরার শক্তি দাও।

Wednesday, January 11, 2012

ক্বুল হুয়া আল্লাহু আহাদ

আমি কিছুদিন আগে আমাদের স্টাডি সার্কেলে সূরা ইখলাস আলোচনা করার দায়িত্ব পেয়েছিলাম। সূরা ইখলাস কুরআনের এক তৃতীয়াংশ - এটা হজম করতে আমার খুবই কষ্ট হত, আমার ক্ষুদ্র মস্তিষ্কে কিছুতেই ধরত না, চার লাইনের এক সূরা, যেটা এক নিঃশ্বাসে বলে বিশ সেকেন্ডের মধ্যে রূকু তে চলে যাওয়া যায় - তা কী করে এত ভারি হয়? 

সূরা ইখলাস যে কতটা আশ্চর্যকর, কত...টা তা আবিষ্কার করার পর আমার মাথা কিছুক্ষণ ঝিমঝিম করছিল। এই সূরার নামকরণই একটা বিস্ময়। এর নাম ইখলাস, অর্থাৎ sincerity. একটা উপদেশনামায় sincerity নামে চ্যাপ্টার পেলে তাতে কী বক্তব্য থাকা স্বাভাবিক? "ভাল থাক, ভাল কাজ কর, সদা সত্য কথা বল" - এসব ত? ঠিক সূরা আসরে যেমন আছে, (বিশ্বাস কর, ভাল কাজ কর, ধৈর্য ও সততার সাথে অন্যদের ভাল কাজের উপদেশ দাও....) এসব থাকলেই ত মানাত বেশ। তা না করে আল্লাহ নিজের সবচেয়ে পূর্ণাঙ্গ বর্ণনা দিলেন যে সূরায়, তার নাম দিলেন 'ইখলাস'; কেন? মানে টা কী? 

তার পরের বিস্ময় ছিল আমার জন্য, এক তৃতীয়াংশর হাদীস টা। আবু সাইদ খুদরি থেকে বর্ণিত, এক লোক নাকি সারা রাত নামাযে কেবলমাত্র 'ক্বুল হুয়া আল্লাহু আহাদ' পড়েছে, তা শুনে রাসুলুল্লাহ (স) শপথ করে বলেছেন, এটি কুরআনের এক তৃতীয়াংশ। এখানে লক্ষ্যণীয়, লোকটা কেবলমাত্র একটা আয়াত পড়েছে, পুরো সূরাটাও না। রাসুলুল্লাহ আরেক হাদীসে বলেছেন, 

'inna 'ala kuli shay'in noor , wa noor-ul Qur'ani; Qul huwwa Allahu ahad. ' 

'surely, for every thing is light, and the light of the Qur'an is; Say, He is Allah, the One' 

কুরআনের আলো জানার আগে এ সূরা নাযিলের প্রেক্ষাপট আর তাওহীদ সম্পর্কে কিছুটা জানতে হবে। তাওহীদ তিন প্রকার, খুব সংক্ষেপে এই - 

১. তাওহীদ আর রুবুবিয়্যাহ (রব হিসেবে আল্লাহর একত্ববাদ স্বীকার করা) 'রব' হওয়া চাট্টিখানি কথা নয়। লালন পালন, ভরণ পোষণ, ভূত ভবিষ্যৎ চিন্তাভাবনা করা সহ সামগ্রিক দেখভাল যিনি করেন, তিনিই রব হতে পারেন। আমাদের বাবা মাও এক অর্থে আমাদের রব। কিন্তু তাদেরও সীমাবদ্ধতা আছে। উনারা ভবিষ্যৎ দেখতে পান না। খাবার কেনার ক্ষমতা তাঁদের আছে, কিন্তু খাবার সৃষ্টি করার ক্ষমতা তাঁদের নেই। তাই সবকিছু মিলে 'দি রব' হচ্ছেন আল্লাহ। আর এটাকে বিশ্বাস করাই তাওহীদ আর রুবুবিয়্যাহ। 

২. তাওহীদ আল উলুহিয়্যাহ (ইলাহ হিসেবে আল্লাহর একত্ববাদ) যে কোন সমাজই শান্তিতে টিকে থাকার জন্য তার সদস্যদের উপর কিছু নিয়ম কানুন আরোপ করে। সমাজের সদস্যরা দল মত নির্বিশেষে তা মেনে চলে। এই যে একটা মানার ব্যাপার, নিজের একটা বোধ থেকে, যে এটা মানলে সব মিলিয়ে আমার জন্য ভালই হবে - এই বোধ থেকে নিজের ছন্নছাড়া ইচ্ছাগুলোকে বাঁধ মানানো - এই সাবমিশনের ব্যাপারটাই ইবাদত। যার নির্দেশ মানছি, সে হয়ে যাচ্ছে আমার ইলাহ। তাওহীদ আল উলুহিয়্যাহ আমাদের শিক্ষা দেয়, আমাদের আল্টিমেট ইলাহ হচ্ছে আল্লাহ। অর্থাৎ অন্য কারো বেঁধে দেয়া নিয়ম যদি আল্লাহর বেঁধে দেয়া নিয়মের সাথে সাংঘর্ষিক হয়, তাহলে আল্লাহর নিয়মটাই আমাদের বেছে নিতে হবে। এমনকি তা যদি বাবা মায়ের থেকে হয়, তবুও। 

৩. তাওহীদ আল আসমা ওয়া আস সিফাত (আল্লাহর নাম ও গুণবাচক বিশেষণের স্বাতন্ত্র্যের প্রতি বিশ্বাস) আল্লাহর অনেক গুণবাচক নাম, আল্লাহকে চেনার জন্য কুরআনে প্রতি তিন চার আয়াত পর পর আল্লাহর সম্পর্কে একটা কিছু লেখা। কুরআনে লেখা, তা ত আর মিথ্যা বা কাল্পনিক হতে পারে না, অতএব আল্লাহর প্রতিটা নাম ও গুণকে অন্তর থেকে বিশ্বাস করা এই তাওহীদের অন্তর্ভুক্ত। তাছাড়া একই গুণ যদি আমরা মানুষের মধ্যে পাই তবু জানব আল্লাহর এই গুণ স্বতন্ত্র, কারণ এর কোন আদি অন্ত নেই, আর আল্লাহকে এই গুণ কেউ দিয়ে দেয়নি, কিন্তু মানুষকে এই গুণ দিয়েছে আল্লাহ। 

যাই হোক, বলছিলাম ক্বুল হুয়া আল্লাহু আহাদ এর কথা। রাসুলুল্লাহ (স) যখন তাওহীদের কথা প্রচার করতে থাকলেন, যে গড বা ঈশ্বর একজনই, তখন কুরাইশদের মধ্যে কেউ কেউ জানতে চায়, তোমার গড কেমন? আমাদের লাত উজ্জা ত সোনা রূপার তৈরি, তোমার গড কীসের তৈরি? সে দেখতে কেমন? তখন আল্লাহ রাসুলুল্লাহ (স) এর কাছে ওহী পাঠান, 'বল, তিনি আল্লাহ, তার মত কেউ নেই।' একটা বাক্যের অবতারণা যখন হয় 'সে' বা 'তিনি' দিয়ে, তখন বুঝতে হবে, বাক্যের আলোচ্য ব্যক্তিটি আগে থেকেই শ্রোতাদের পরিচিত। এখানে কুরাইশরা জানতে চেয়েছে তোমার 'গড' টা কে বা কী? রাসুলুল্লাহ বলেছেন, 'তিনি হচ্ছেন আল্লাহ, আহাদ।' এই তিনি দিয়ে রাসুলুল্লাহ (স) নির্দেশ করেছেন তাঁর ঈশ্বর কে। এই পুরো 'তিনি হচ্ছেন আল্লাহ, আহাদ' - বাক্যটা সাক্ষ্য দিচ্ছে যে আল্লাহই রাসুলুল্লাহ (স) এর একমাত্র রব। আর এটাই তাওহীদ আর রুবুবিয়্যাহ এর শিক্ষা। 

পরের শব্দ 'আল্লাহু', আরবি ব্যকরণবিদরা এখনও নিশ্চিত হতে পারেন নি 'আল্লাহ' কি একটা বিশেষ্য না বিশেষণ, আল্লাহ কি শুধুই একটা নাম, নাকি একে ভেঙে 'আল ইলাহ' বানানো যাবে। দুটো মতবাদই এখন পর্যন্ত গ্রহণীয়, তাই এই একটা বাক্য আল্লাহর নাম, আর আল্লাহর গুণ - দু'টোই প্রকাশ করছে। যেমন 'তোমার গড কে?' উত্তর 'তিনি হচ্ছেন আল্লাহ', আবার 'তোমার গডের সম্পর্কে কিছু বল' এর উত্তরও 'তিনি হচ্ছেন আল্লাহ।' অর্থাৎ আল ইলাহ বা একমাত্র উপাস্য, আমি যার ইবাদত করি। (তাওহীদ আল উলুহিয়্যাহ) 

আয়াতের সর্বশেষ শব্দ, 'আহাদ' মানে কেবল সংখ্যায় এক নয়, ইউনিক, এর মত কোন কিছু কোথাও পাওয়া যাবেনা, একটাই, মাস্টারপিস। এমন একটা কিছু, যার উৎস জানা নেই, যার সমকক্ষ, বা সমমানের কোন কিছু নেই। এই 'আহাদ' শব্দটা থেকেই নিশ্চিত হয়ে যায় আল্লাহর কোন জনক নেই, বা তাঁর কোন সন্তান নেই। তাঁর সমকক্ষ নেই, তার মানে তিনি স্ত্রী বা সহযোগীও গ্রহণ করেন নি। পুরোপুরিই অদ্বিতীয়। 

এইবার সূরা ইখলাস এর পরের আয়াতগুলো পড়ে দেখুন। নতুন কিছু পেলেন কি? 

আল্লাহ এই সূরা শুরু করেছেন 'বল', এই নির্দেশ দিয়ে। কাকে বলতে বলেছেন? যার প্রতি নাযিল হয়েছিল, তিনি নিজেও জানতেন না আল্লাহর স্বরূপ। তাই আল্লাহর নির্দেশ পালন করতে হবে নিজেরই উপরে সর্বপ্রথম। নিজেকে 'তিনি আল্লাহ, আহাদ' এর মর্মার্থ হৃদয়ঙ্গম করাতে হবে। তারপর আল্লাহর নির্দেশে এই বার্তা ছড়াতে হবে অন্যদের মাঝেও। এখন তাওহীদের বাণী নিজের মধ্যে প্রতিষ্ঠা করে এবং অন্যদের দাওয়াত দিতে থাকলে দ্বীনের প্রতি আপনার সততা প্রমাণিত হবেই। তাছাড়া আমরা যখন মনে প্রাণে কৃতজ্ঞচিত্তে বিশ্বাস করব আমাদের সব কিছু দেখভালের দায়িত্ব নিয়েছেন আল্লাহ, আমাদের ইবাদতের একমাত্র দাবিদার আল্লাহ, এবং তাঁর সমকক্ষ বা সাহায্যকারি কেউ নেই, যাকে ধরে শেষ বিচারের দিনে পার পেয়ে যেতে পারি, তখন দৈনন্দিন কাজে ফাঁকি দেয়ার কি আর কোন উপায় থাকবে? 

এ জন্য এই সূরার নাম sincerity? ও!

Wednesday, December 28, 2011

শেখার কোন শেষ নেই

I have learnt silence from the talkative, toleration from the intolerant, and kindness from the unkind; yet strange, I am ungrateful to these teachers. 

Kahlil Gibran এর এই কোট টা আমি প্রথম শুনি যখন ইউনিভার্সিটির এক ফ্যাকাল্টির খুব বাজে ব্যবহার পেয়ে আমার মন অসম্ভব খারাপ। এই কথার অপরিমিত শক্তি বোঝার অবস্থা তখন আমার ছিলনা। আমি তখন দুঃখের সাগরে ডুবছি। কিন্তু এর পর থেকে, গত দেড় বছরে, এই কথাগুলো একদিনের জন্যেও ভুলিনি। প্রতিদিন অল্প অল্প করে, একটু আধটু করে নিজের অভিজ্ঞতা দিয়ে বার বার অনুভব করেছি এর প্রয়োজন।

আমরা কি আমাদের চারপাশ থেকে শিখি? সবাই বলবে শিখি। কেমন করে? এই যেমন ভাল জীবনাচরণের উদাহরণ দেখলে তার মত করে চলার শিক্ষা নেই, কারো আত্মবিশ্বাস আমাদের উদ্বুদ্ধ করে, কারো সৃষ্টিশীলতায় মুগ্ধ হয়ে আমরা অনুপ্রাণিত হই, আমাদের আগামী প্রজন্মও যেন এমন হয় - ইত্যাদি ইত্যাদি। নিজের জীবনে ঠেকে শিখি সবাই। অনেকে অনেক ঠকেও ধরতে পারেনা ঠিক আর বেঠিকের ফারাক। শিখছি আমরা প্রতিদিনই। কিন্তু কাজে লাগাতে পারছি কতটুকু? 

আমরা মানুষেরা বোধহয় জন্মগতভাবেই ভুলোমনা। বড় হওয়ার সাথে সাথে ভুলে যাই কৈশোরের আমাদের মনটা কেমন ছিল। আমরা বোধহয় স্বার্থপরও, নিজেকে আরেকজনের অবস্থানে বসিয়ে কিছুতেই বিচার করতে পারিনা কেন একজন মানুষ ভুল করে। আমার জন্য যেটা খুব সহজ, অপরজনের জন্য তাই হয়ত নিত্যদিনের স্ট্রাগল। আমার এক কাছের মানুষ সময়ের ব্যাপারে খুব বিচক্ষণ, অন্য কেউ সময়ের নড়চড় করলে তার থেকে কর্কশ মন্তব্য শুনতে হবেই। তার কথা হচ্ছে আমি ত কোন কমিটমেন্ট করলে আর সব কিছু সেভাবে প্ল্যান করে নেই, তুমি পার না কেন? সেই একই মানুষ নিত্যনিয়ত স্ট্রাগল করে যাচ্ছে তার বাকযন্ত্র কে সংযত রাখার। প্রতিদিন সে হেরে যায় এখানে, বার বার হারে, একই ভুল প্রতিদিন করে। তবু সে শেখেনি - স্ট্রাগল প্রত্যেকেরই আছে, যার যার নিজের মত, সময়ের হোক অথবা সংযমের। 

নিজের সংসার হওয়ার পর থেকে আমি প্রত্যেকটা পরিবারকে খুব ভালভাবে পর্যবেক্ষণ করি। প্রবাসে থাকি, বাবা মা, শ্বশুরবাড়ি ত নেই, এরাই সব। বেশ অনেকদিন ধরে সংসার করছেন এমন বড়বোনদের সংসর্গে থাকার চেষ্টা করি, যাতে তাদের অভিজ্ঞতালব্ধ শিক্ষা অল্প আয়াসে অর্জন করে ফেলতে পারি। শিক্ষার ধরণটাই এমন, না ছেঁকে নেয়ার উপায় নেই কোন কিছুই। গ্র্যাড স্কুলে এতদিন ধরে আমাদের এটাই অনেক কষ্টে শেখানোর চেষ্টা করছে, কোন পাবলিকেশন বিশ্বাস করবে না, ডাটা যাচাই না করে। একটা সময় বুঝলাম, এই পদ্ধতি শুধু একাডেমিক লাইফে না, সোশ্যাল লাইফেও খুব জরুরি। ছোটবেলা থেকে শিখে এসেছি বাবা মা সবসময় ঠিক, স্কুল কলেজ ইউনিভার্সিটিতে শিক্ষক মানে অবিসংবাদিত চরিত্রের অধিকারী, তাদের একটু চ্যুতি দেখলে মুষড়ে পড়তাম। আশ্চর্য ব্যাপার, কেন কখনও কেউ বলে দেয়নি, তাদেরও ভুল হয়, ভুল করতে দেখলে হতাশ না, শিখতে হয়। তেমনি এখনও, সুপারভাইজর কে মাথায় তুলে রাখি, আত্মীয়, বন্ধুবান্ধব সহ নিজেদের পরিবারকে ভাবি সব ভুলের ঊর্ধ্বে, যখন দেখি ভীষণ নীতিবাগিশ মানুষটি জীবনের কোন একটা জায়গায় এসে অন্যায় করে ফেলছে, তখন তার উপর বিশ্বাসটাই চলে যায়। কেন, সে কি ভুল করতে পারেনা? অন্যায় করলেই আমি তার থেকে শেখা বন্ধ করে দেব কেন? তার ভুলটা ত আমিও করতে পারতাম! 

অনেকদিন ধরে পরিচয় থাকলে মানুষের ভাল খারাপ সবকিছুই চোখে পড়ে। সমস্যা হচ্ছে, আমি কিছুদিন যাওয়ার পরেই তাকে লেবেল করে ফেলি, 'আমি একে পছন্দ করি, আমি একে পছন্দ করি না।' তারপর যাদের পছন্দ করি, তাদের ভাল গুণগুলি খুঁটিয়ে দেখে শিখতে থাকি, আর যাদের পছন্দ করি না, তাদের দোষগুলিও মনের মধ্যে জমা রেখে শিখতে থাকি। উল্টোটা সচেতনভাবে কখনই করতে পারিনা। বিশেষ করে যাকে পছন্দ করিনা, তার গুণগুলো দেখতে আমার ভীষণ এলার্জি। কিন্তু এটা কি ঠিক পথ? আমি না আল্লাহর কাছে দুআ করি উনি যাতে আমাকে সরল পথে রাখেন সঠিক পথে রাখেন? নাস্তিকরা যা বলে তার কি সব খারাপ? ইসলামের দোহাই দিয়ে গালিগালাজ থেকে শুরু করে আর যা কিছু করা হয় তার কি সব ভাল? আমরা ছাঁকতে শিখিনি। বাইনারি ডিজিট এর মত 'All or none' এই জায়গাতে এসে থেমে গেছি। 

আমি শিখছি, সবই শিখছি, সাইকোলজিক্যাল ডিজঅর্ডার থেকে শুরু করে স্ট্রিং থিওরি - তত্ত্বকথা যত আছে, জীবনের সাথে সামঞ্জস্যহীন - তার সবকিছুতেই আমার খুব আগ্রহ। কিন্তু শিখিনি গৃহস্থালির খুব বেসিক কিছু বিষয়ও, শাক সবজি কীভাবে তাজা রাখা যায়, ঘরকে পরিচ্ছন্ন রাখার জন্য কী কী রুটিন মেনে চলা জরুরি - এগুলো কোন কিছুই আমার কাছে জরুরি মনে হয়নি কোনদিন। একদিন ব্লগে দেখলাম এক ছেলে অহংকার করে বলছে, 'আমি জীবনে কোনদিন ভাত বেড়ে খাইনি।' আমরা না পারা, না জানা - এসবও অহংকার করার বিষয় মনে করি। শিক্ষার কী অদ্ভুত বিকলাঙ্গ রূপ! 

যাই হোক, এত হতাশামার্কা কথা বলে লেখা শেষ করতে চাইনা। যারা ছাত্রজীবনে আছেন, বিশেষ করে যারা দেশে আছেন, তারা অবসর সময়ে হতাশা চর্চা না করে চলুন একটু বড় বড় চোখ করে চারপাশে তাকাই। যদি বৃষ্টির জন্য বাসা থেকে বের হতে না পারেন, একটু রান্নাঘরে যান, দেখুন মা কীভাবে চটপট রান্না, ধোয়ামোছা সবই খুব স্মার্টভাবে করে ফেলেন খুব অল্প সময়ে। এটা একটা স্কিল। দুপুরে বিছানায় অলস শুয়ে থাকলে চুপচাপ একটু ভাবুন আপনার অপছন্দের কোন মানুষের কথা। তার ভাল দিকগুলো, দোষগুলো - সবকিছু নিয়েই চিন্তা করুন। শেখার অ-নে-ক কিছু পাবেন। বাবাকে যদি সবসময় দেখেন ব্যাংকে বিল দিয়ে আসলেই মেজাজ খারাপ থাকে, তাহলে একদিন তার সাথে যান, শেখা হয়ে যাবে মেজাজ ঠিক রাখতে হলে কোন কোন জিনিসগুলো সহ্য করতে শিখতে হবে। শেখার কি শেষ আছে? অল্প কথায় কী করে অনেক কথা বলা যায় - তাও একটা শেখার মত জিনিস, আমাকে যেটা শিখতে হবে খুব শীঘ্রই।

Tuesday, December 13, 2011

আমাদের আড্ডা

গ্র্যাজুয়েট স্টুডেন্টদের জীবনটা বেশ পানসে টাইপ। বাসা, ল্যাব, ল্যাব, বাসা - এই করে করেই আড়াই বছর কাটিয়ে দিলাম। আন্ডারগ্র্যাডরা দেখি কত রকমের ক্লাব করে, কমনস্ এ নাচ প্র্যাক্টিস করে - আর ফ্রি মুভি, সোশ্যাল আওয়ার - এসব ত চলছেই। অনার্স পড়াকালে আমারও কতকিছুতে উৎসাহ ছিল, এখন কেবল চশমা এঁটে ভারিক্কি চেহারা করে ল্যাবে গিয়ে ডেস্কে বসে থাকি। ছুটির দিনগুলোতেও ভারি আলিস্যি, ঝিমিয়ে ঘুমিয়ে আর virtual socializing করে করেই দেখি দুই দিন পার হয়ে গেছে। 

আমাদের মতই আলস্যপ্রিয়, উদ্যমহীন, ভাবুক শ্রেণীর আরও কিছু গ্র্যাড স্টুডেন্ট এর পরিচয় হয়েছে এই দু'বছরে। দেশীয় স্টাইলের আড্ডার নেশা ঢুকিয়ে দিয়েছি ওদের মধ্যেও। মনে যত কথা আসে, ভাঙা ইংরেজিতে তার অর্ধেকও প্রকাশ করতে পারিনা, তাতে কী হয়েছে? আন্তরিকতা আর হৃদ্যতার বোধ করি ভাষা প্রয়োজন হয়না। কারও একজনের পরীক্ষা ভাল হলে বা প্রেজেন্টেশন/প্রজেক্ট শেষ হলে মহানন্দে রান্না করে সবাইকে আমন্ত্রণ জানায় খেয়ে যাবার জন্য। প্রতি সপ্তাহেই এই মুখগুলো দেখি, মাঝে মধ্যে মনেও হয়, এত কী কথা বলব? সেদিনই ত দেখা হল! 

কিন্তু মজা হচ্ছে এদের সাথে কথা বলার টপিক কখনও ফুরায় না। পৃথিবীর যাবতীয় নিয়মকানুনের গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে আমাদের প্রশ্ন। রাজনীতি নিয়ে আমাদের তর্ক, সাদার সাথে শুভ্রতা আর কালোর সাথে কেন মন্দকে মেলানো হবে তাই নিয়ে আপত্তি। আফ্রিকান আমেরিকানরা কতটা নির্যাতিত হয়েছে (এখনও হচ্ছে) এ বিষয়ে বিশেষজ্ঞজনের মতামত ইত্যাদি ইত্যাদি। দর্শন হচ্ছে প্রত্যেকের প্রিয় বিষয়বস্তু। আমরা কীভাবে বিভিন্ন ঘটনাকে দেখি, কীভাবে সিদ্ধান্ত নেই, কোনটা শিক্ষণীয়, কোনটা মিডিয়ার প্রভাব - এসব নিয়ে সূক্ষ্মাতিসূক্ষ পর্যালোচনা চলছেই। 

আরেকটা অতিপ্রিয় বিষয় হচ্ছে মানুষের ব্যক্তিত্ব কীভাবে গড়ে ওঠে, সম্পর্কগুলোর প্রতি দৃষ্টিভঙ্গি কীভাবে ঘাত প্রতিঘাতে নতুন রূপ নেয়, সম্পর্কের প্রতি দায়িত্বশীলতা gender ও culture ভেদে কতটুকু ভিন্ন হয়, আদর্শ ব্যক্তিত্ব ও আদর্শ পরিবার কেমন হওয়া উচিৎ এসব। বলা বাহুল্য, এধরণের চিন্তাভাবনার অফুরন্ত খোরাক আছে ধর্মে। তাই ঘুরে ফিরে আমাদের তর্কে বারবারই আসে ধর্ম। যেহেতু সবাই মুসলিম, অল্প বিস্তর প্রত্যেকেরই আগ্রহ আছে ইসলামকে জানার, আর অন্য ধর্মগুলো নিয়ে জ্ঞানের পরিধি ভয়ঙ্কর রকমের কম, তাই ইসলামকে নানা দৃষ্টিকোণ থেকে আলোচনা করা হয় প্রায়ই। 

একটা সময় আমরা খেয়াল করলাম আমাদের আলোচনাগুলো, প্রশ্নগুলো একই জায়গায় ঘুরপাক খাচ্ছে। কারণ আমরা কুরআন ভাল জানিনা, হাদীস গল্পের মত পড়েছিলাম কোন এক কালে, সীরাহ (রাসুলুল্লাহ (স) এর জীবনী) সম্পর্কে ত অতল অন্ধকারে। আমাদের আড্ডায় চিন্তা করার মত অসাধারণ মাথা আছে অনেক, কিন্তু জ্ঞানের সীমাবদ্ধতার কারণে হিরা কাটার ছুরি দিয়ে ঘাঁটছি কাদামাটি। এর মধ্যে তারিক রামাদানের লেকচার শুনতে Johns Hopkins এ গেলাম, উনি বারবার জোর দিয়ে বললেন, মুসলিমদের তার মূল রেফারেন্সে আসতে হবে। কুরআন ও হাদীস বুঝতে হবে, কিন্তু একই সাথে intellectual humilityর চর্চাও করতে হবে। সব শুনে মনে হল ইসলামকে বিভিন্ন আঙ্গিকে বুঝতে চাওয়ার আমাদের এই প্রয়াসটা ঠিকই আছে, কিন্তু রেফারেন্স অংশটুকু অনুপস্থিত। 

ঐ দিনই লেকচারের পর আমরা একটা রেস্টুরেন্ট এ খেতে গিয়েছিলাম, ওখানে বসে ঠিক করলাম, প্রতি শুক্রবার সন্ধ্যায় আমরা কারও বাসায় একত্রিত হব, শুধুমাত্র কুরআন, হাদীস এবং সীরাহ নিয়ে methodically জ্ঞান অর্জন করতে। কীভাবে methodically জ্ঞান অর্জন করা যায়? আমাদের ৮-৯ জনের মধ্যে ৩ জন প্রতি সপ্তাহে ৩টা পার্ট আলোচনা করবে। কুরআন ৩০ মিনিট, হাদীস ৫-১০ মিনিট, সীরাহ ২০ মিনিট। মাগরিবের পর শুরু হবে, খাওয়া দাওয়া হবে, আলোচনার যে কোন অংশে যে কেউ প্রশ্ন এবং তর্ক বিতর্ক শুরু করতে পারে। তবে একজন (আমাদের মধ্যে ওরই পড়াশুনা সবচেয়ে বেশি) খেয়াল রাখবে আলোচনা যেন বেশি অফট্র্যাক হয়ে না যায়, বা অতি উত্তপ্ত হয়ে না যায়। 

গত ছয় সাত মাস ধরে অনিয়মিত ভাবে এই স্টাডি সার্কেল চলে আসছে। 

আমাদের মধ্যে কেউই স্কলার না হওয়ায়, আর খুব ঘনিষ্ঠ বন্ধু হওয়ায়, ধর্ম নিয়ে যত রকমের বিব্রতকর প্রশ্ন আছে সবই উঠে আসে। আমরা যে যেটুকু জানি, বুঝি শেয়ার করি, অথবা পরে খুঁজে পেলে কমন মেইল করে জানিয়ে দেই। শুক্রবার ছাড়াও অন্যান্য সময় ওদের সাথে আড্ডা হলে এই রেফারেন্সগুলো চলেই আসে। আমাদের প্রত্যেকেই অনেক অল্প আয়াসে ৯-১০ গুণ বেশি শিখে ফেলছি। আমার সবচেয়ে ভাল লাগে রাসুলুল্লাহ (স) এর জীবনী অংশটুকু, এ বিষয়ে জানি তুলনামূলকভাবে অনেক কম, তাই সবই শিখছি, আর মুসলিম, নন-মুসলিম বিভিন্ন লেখকের ভিন্ন ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি থেকে ব্যাখ্যা পড়তে পড়তে মনে হয় আমি যেন ঐ পরিবেশেই আছি, এমন ঘটনা আমারও চারপাশে ঘটছে, আমিও রাসুলুল্লাহ (স) এর মত সবচেয়ে অশান্ত সময়ে শান্ত আছি, মানুষের বিদ্রুপের উত্তর দিচ্ছি দু'আর মাধ্যমে। যুদ্ধক্ষেত্রে দাঁড়িয়ে নামাজে মনসংযোগ করে ভুলে যাচ্ছি চারপাশের আর সব প্রতিকূলতা। শুনতে গল্পের মত, তার উপর আছে পারিবারিক, সামাজিক, রাজনৈতিক, ধর্মীয় - সব কিছুরই সংমিশ্রণ, তাই এ সময় সবার মুখে প্রশ্নের ফুলঝুরি ফোটে, সবাই চেষ্টা করে নিজের জীবনে প্রয়োগ করা যায় এমন উদাহরণ মনের লাইব্রেরিতে তুলে রাখতে। 

আল্লাহর দ্বীন জানার উদ্দেশ্যে যারা একত্রিত হয় ফেরেশতারা নাকি তাদের উপর রহমতের ডানা বিছিয়ে দেন, তাদের উপর 'সুকুন' নাযিল হয় (সুকুনের মানে আমি বুঝিয়ে বলতে পারব না, মুভিতে যেমন দেখায় চারপাশে সব স্লো মোশনে চলছে, সবকিছু সুন্দর, নায়কের মুখে স্মিত হাসি ... ঐ ধরণের শান্তি, স্থিরতা, কৃতজ্ঞতার মিশ্র রূপ হচ্ছে 'সুকুন'; দেশে ঝিরি ঝিরি বৃষ্টির মাঝে কৃষ্ণচুড়ায় লাল হয়ে থাকা পথের উপর খালি পায়ে হাঁটলে মনটা যেমন হালকা.. হয়ে যায়, সুকুন তেমনই।) অন্যদের কথা জানিনা, আমি প্রায়ই এরকম 'সুকুন' স্টেট এ থাকি। শরীরটা এত.. হালকা লাগে, হাত পা কোন কিছুর ওজন টের পাইনা। মনের মধ্যে কে যেন বলতে থাকে, সবকিছু এত সুন্দর কেন? এত সুন্দর কেন? আলহামদুলিল্লাহ..., আলহামদুলিল্লাহ ... সত্যি! ঐ সময়টায় আমি যদি মরেও যাই, মনে হয় কেবল চোখটুকু বন্ধ করা ছাড়া আর কোন কিছু করতে হবেনা। 

আমি নিজেকে খুবই ভাগ্যবান মনে করি আমার এই বন্ধুদের জন্য। ওদের সাথে থেকে আমি এত কিছু শিখেছি... আসলে আল্লাহর অনেকগুলি রহমতের মধ্যে এটাও একটা, আমার বন্ধুরা প্রত্যেকের মন এত এত সুন্দর - ওদের সাথে যত সময় কাটাই ততই শিখি। এখন আফসোস হয়, কেন দেশে থাকতে বন্ধুরা মিলে এমন স্টাডি সার্কেল করলাম না! আমি ত চাই আমার প্রিয় মানুষগুলোর প্রত্যেকের উপর ফেরেশতারা রহমতের ডানা বিছিয়ে রাখুক, সবসময়।

ডমেস্টিক ভায়োলেন্স নিয়ে কিছু কথা

'ডমেস্টিক ভায়োলেন্স' শব্দটার সাথে আমার পরিচয়ই ছিল না। আবছা একটা ধারণা ছিল, যেসব নরপশু স্ত্রীর চোখ উপড়ে প্রথম আলোর প্রথম পাতা দখল করে তারাই ওসব ভায়োলেন্স টায়োলেন্স এর সাথে জড়িত। কিন্তু ভায়োলেন্স এর অসংখ্য দিক আছে, যা আমার জানা ছিলনা। জানতাম না ইমোশনাল ভায়োলেন্স বলে একটা কিছু আছে, যেখানে একপক্ষ সারাক্ষণ ভয়ে কাঁটা হয়ে থাকে অপরপক্ষ 'মাইন্ড' করবে দেখে। তাকে খুশি করার জন্য সে যা বলে তাই মেনে নেয়, আপত্তি করলে অবস্থা আরো খারাপের দিকেই যাবে, তাই যা বলে মুখ বুজে মেনে নেয়। ইমোশনাল অ্যাবিউজ একটা চক্র মেনে চলে। প্রথম ধাপে চাপা টেনশন তৈরি হবে, দ্বিতীয় ধাপে তা বার্স্ট করবে, রাগ, কান্না, দোষারোপ - যেভাবেই হোক - আর তৃতীয় ধাপে অনুশোচনা, ক্ষমা প্রার্থনা - যাকে বলে 'হানিমুন পিরিয়ড', অ্যাবিউজার ভীষণ ভাল ব্যবহার করবে, আদর যত্ন হাসি খুশি - অ্যাবিউজড যখন ভাবতে শুরু করবে, সব ঠিক হয়ে গেছে, তখনই প্রথম ধাপের পুনরাবৃত্তি হবে। 

ইমোশনাল অ্যাবিউজের মধ্যে আছে এক পক্ষের অন্য পক্ষকে পূর্ণ কন্ট্রোলের মধ্যে রাখার চেষ্টা, কার সাথে মিশবে, কোথায় যাবে - সে ব্যাপারে সার্বক্ষণিক নজর (লক্ষ্য করুন, কোথায় কার সাথে মিশছে তা খোঁজ নেয়াতে কোন সমস্যা নেই, অভিভাবক হিসেবে তা করাও উচিৎ, কিন্তু) জানার বাইরে কারো সাথে পরিচয় হলে অস্থির হয়ে যাওয়া, রেগে যাওয়া - এসব অ্যাবিউসিভ কনডাক্ট। এছাড়া মানুষের সামনে অপমানজনক নাম ধরে ডাকবে, সমালোচনা করবে, হাসাহাসি করবে, পরিবারের অন্যদের কাছে তার ভুল নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করবে ও পরিবারের অন্যদেরও নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি আনতে উস্কে দেবে - যাতে করে সেই মানুষটা একই সাথে ঘরে কোনঠাসা মনে করে, ও নিজেকে সবকিছুর জন্য অপরাধী ভাবতে থাকে। 

ইমোশনাল অ্যাবিউজ আর খাঁটি দোষের শাস্তি অনেকটা একই রকম, তাই অ্যাবিউজড হচ্ছে যে, সে ভেবে নেয়, এটা ত আমার ভালর জন্যই করা। কিন্তু অ্যাবিউজিভ রিলেশনে মূল উদ্দেশ্য থাকে ডমিনেট করার ইচ্ছা, আর তাকে জাস্টিফাই করার জন্য অ্যাবিউজার বিভিন্ন সামাজিক ও ধর্মীয় অজুহাত দেখায়। 

ধর্মীয় অজুহাতের কথা যখন আসলোই, তখন স্পিরিচুয়াল অ্যাবিউজ নিয়েও বলি। তুমি 'ভাল মুসলিম' এর মত কাজ করছ না, এই অজুহাতে স্বামী/স্ত্রী বা তার আত্মীয় স্বজন অন্যায় সব দাবি চাপিয়ে দিতে পারে, এমনকি মেয়েদের বেলায় বাবার বাড়ি যাওয়ার উপরেও নিষেধাজ্ঞা দিতে পারে। প্যারেন্ট-চাইল্ড রিলেশনশিপেও অমন দেখা যায়। ছেলে মেয়েকে অন্যদের সামনে স্টুপিড, গাধা ইত্যাদি বলে অ্যাবিউজ করলেও, সন্তানের অবাধ্যতা বা অসন্তোষ দেখলে কুরআনের আয়াত টেনে আনবে, জাহান্নামের শাস্তির ভয় দেখাবে। 

যেহেতু এই বিষয়গুলো খুবই স্পর্শকাতর, বিশেষত আমাদের দেশের প্রেক্ষাপটে, তাই কয়েকটা বিষয় স্পষ্ট করে নেয়া ভাল। 

১. সন্তান বাবা মা কে জান্নাতের দরজা হিসেবে ট্রিট করা উচিৎ, এতে কোন মতভেদ নেই, কিন্তু বাবা মা স্বেচ্ছাচারিতা করার অধিকার রাখেন না। আল্লাহর থেকে প্রত্যেকে নিজ নিজ বিবেক ও সিদ্ধান্ত নেয়ার স্বাধীনতা নিয়ে এসেছে। বাবা মা একটা বয়স পর্যন্ত সেই বিবেক কে মজবুত করবেন, এবং সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষমতাটাকে ঘষে মেজে ধারালো করবেন। এবং অবশ্যই মূল লক্ষ্য থাকবে সে যেন নিজের বিচারবুদ্ধির প্রতি আস্থাশীল হয়। রাসুলুল্লাহ (স) নিজের সন্তানের সাথে কেমন আচরণ করতেন বা কিশোর বয়সী সাহাবীদেরও কতটা মর্যাদা দিয়ে কথা বলতেন তা লক্ষ্য করলেই ইসলামে বড়দের প্রতি ছোটদের অধিকার কী এটা পরিষ্কার হয়ে যাবে। 

২. বৈবাহিক সম্পর্কে ছোটখাট অসন্তোষ এড়িয়ে গিয়ে ঘরে শান্তি রাখার চেষ্টা করা, আর নিজের স্বাধীনতা পুরোপুরি ত্যাগ করা - এ দুটো এক জিনিস না। অনেক ছেলেই আছে মায়ের সব রকমের ইমোশনাল অ্যাবিউজ চুপচাপ মেনে নিয়ে নিজের উপরেও জুলুম করছেন, স্ত্রীর উপরেও করছেন। যেটা অন্যায় সেটাকে উপেক্ষা করতে ইসলাম আমাদের শেখায় নি। আমরা মুসলিমরা একে অপরকে ধৈর্য ধরতে উপদেশ দিতে পারি, ধৈর্য ধরতে বাধ্য করতে পারিনা। সুতরাং এ ধরণের সমস্যাকে অন্তত সমস্যা হিসেবে স্বীকার করতেই হবে। 

অ্যাবিউজিভ রিলেশনশিপের শিকার যারা তাদের ব্যক্তিত্ব গঠন চরমভাবে বাধাগ্রস্ত হয়। বিভিন্ন সামাজিক পরিবেশে তারা স্বচ্ছন্দভাবে অংশগ্রহণ করতে ভয় পায়। সমালোচনার প্রতি অতিরিক্ত নাজুক হয়। আত্মবিশ্বাসে ঘাটতি থাকে, কারণ নিজের সিদ্ধান্ত কে বাধাহীন ভাবে প্রয়োগ করার সুযোগ সে খুব একটা পায়নি, পেলেও গঠনমূলক বা উৎসাহব্যঞ্জক প্রতিক্রিয়া পায়নি। সমাজে খুব একটা মেশার সুযোগ হয়না বলে অ্যাবিউজিভ পরিবেশেই বেশির ভাগ সময় কাটাতে হয় - পরিণতিতে মানসিক এই দৈন্যের ব্যাপারটা বহুগুণে বেড়ে যায়। সবচেয়ে ভয়াবহ ব্যাপার হচ্ছে, যারা ডমেস্টিক ভায়োলেন্স এর মধ্যে বড় হয়েছে, তারা এই পরিবেশে অভ্যস্ত হয়ে ওঠে বলে তারাও নিজের জীবনে অ্যাবিউজার হওয়ার সম্ভাবনা বেশি থাকে। 

এই বিষয়গুলো নিয়ে আমাদের সবার সচেতন হওয়া দরকার। পরে হয়ত কখনো আরো গুছিয়ে এ বিষয়ে লিখব।