Sunday, October 14, 2012

স্কিল ডেভেলপমেন্ট সিরিজ: টাইম ম্যানেজমেন্ট

গত সপ্তাহে দু'টো সেমিনারে গিয়েছিলাম, একটা ক্যারিয়ার বিষয়ক, অপরটা স্কিল ডেভেলপমেন্ট বিষয়ক। ক্যারিয়ার সেমিনারে এক কোম্পানির রিক্রুটার এসছেন, তিনি কোম্পানির ভাল মন্দের পাশাপাশি রিক্রুটাররা কীভাবে চিন্তা করে সেটা নিয়েও কথাবার্তা বললেন, যেমন, একে দেখে কনফিডেন্ট মনে হয় কি না, সরাসরি চোখের দিকে তাকিয়ে কথা বলে কি না, বসার কিছু ভঙ্গি আছে রক্ষণাত্মক, সেগুলো এড়িয়ে চলে কি না। তারপর কোম্পানি সম্পর্কে যথেষ্ট জানে কি না। এসব ত জানা কথা, কিন্তু তার বাইরেও বেশ কিছু কথা বললেন, যেটা খুব ভাল লেগেছে আমার। 

উনি বললেন, এখন থেকেই বিভিন্ন কাজে নিজের দক্ষতাগুলি যাচাই করার চেষ্টা কর। এত ক্লাশ, কাজের ভিড়ে বাসার জন্য সময় বের করা - এগুলো নির্দেশ করে তুমি দায়িত্বগুলোর মধ্যে ভারসাম্য রাখতে পার। আর ভারসাম্য রাখার পূর্বশর্ত নিজের সময়টাকে গুছিয়ে ব্যবহার করতে পারা। তুমি যদি ছাত্রজীবনে ভাল করে টাইম ম্যানেজমেন্ট শেখ, তাহলে চাকুরিতেও অনেক রকমের চাপ সহ্য করে কাজ করতে পারবে - সেটা নিশ্চিত হয়ে বলা যায়। 

বেশ ভাল লাগল কথাটা। এর দুইদিন পরেই ছিল একঘন্টার একটা টাইম ম্যানেজমেন্ট সেমিনার। আমি উন্মুখ হয়ে ছিলাম যাওয়ার জন্য, কারণ আমার কাজের প্রায়োরিটিগুলি এত ছড়ানো ছিটানো, ঠিকঠাকমত সময় অ্যালোকেট করতে না পারলে সমস্যা। 

উনারা প্রথমেই যেটা করতে দিলেন, জানতে চাইলেন, সারাদিনে আমরা কী কী কাজ করি। কীসে কীসে বেশির ভাগ সময় চলে যায়। আমার জন্য ছিল ব্লগিং, নেটওয়ার্কিং এসব। অন্য কয়েকজন বলল ইউটিউবে ভিডিও দেখে দেখে। একজনের বাচ্চাকাচ্চা সামলাতে। ত সব মিলিয়ে কয়েকটা মোটা দাগে কাজ বের হল, যেগুলো দিনের অনেকটা সময় খেয়ে নেয়। 

তারপর উনারা জিজ্ঞাসা করলেন, সময় বাঁচাতে কী কী পদক্ষেপ নিয়েছি এখন পর্যন্ত। আমি ঘুমের সময় কমিয়ে দিয়েছিলাম কয়েকবার, কাজ হয়নি। এক মেয়ে দৈনিক, সাপ্তাহিক, মাসিক রুটিন ঠিক করে রেখে ফলো করার চেষ্টা করেছে, কিছুদিন পর বাদ দিয়েছে। 

তখন একটা এক্সারসাইজ করতে দিল, আমাদের দৈনিক কোন কাজে কত ঘন্টা সময় যায়। যেমন ঘুম দৈনিক কত ঘন্টা, গোসল, সাজুগুজু কত ঘন্টা, রান্না ও খাওয়া ও ক্লিনিং কত ঘন্টা, কাজ কত ঘন্টা, ব্রাউজিং, সোশ্যালাইজিং ইত্যাদি ইত্যাদি.. সব কিছু মিলিয়ে মোট কত ঘন্টা হয় সেটা যোগ করে সপ্তাহের মোট যে ১৬৮ ঘন্টা - তার থেকে বিয়োগ করতে হবে। উদ্দেশ্য হচ্ছে হিসাব কষে দেখানো, কে কত ঘন্টা সময় পায় পড়াশুনা করার জন্য বা যে কাজ করা দরকার তার জন্য। 

হিসাব করার পর বেশ মজার উপাত্ত বের হয়ে আসল। অনেকগুলো ছোট বাচ্চা নিয়ে বেসামাল ভদ্রমহিলাটির হাতে আছে ৩৬ ঘন্টা। তিনি হতভম্ব! তাঁর ধারণা ছিল তাঁর কোন সময়ই নেই। আরেক মেয়ে, যে প্রায় সারাটা সময় অলস ইউটিউব দেখে কাটায়, তার পড়াশুনার জন্য পুরো সপ্তাহে সময় আছে মাত্র ৬ ঘন্টা। চুপসে গিয়ে নরম করে বলল, "makes sense!" আরেকজন ৪২ঘন্টা দেখে অবিশ্বাসের সুরে জানতে চাইল, এই সময় কোথায় যাচ্ছে? আমি ত দেখতে পাচ্ছিনা। তখন ওরা বুঝিয়ে বলল, হয়ত তুমি ভাবছ তুমি ড্রাইভ কর দশ মিনিট। কিন্তু আসলে বাসার দরজা থেকে বের হওয়ার পর থেকে পার্কিং পেয়ে হেঁটে জায়গামত পৌঁছুতে হয়ত তোমার লাগে ত্রিশ মিনিট। তারপর ক্লাশের আগে পরে দশ পনের মিনিট হয়ত এমনিই চলে যাচ্ছে, তুমি হিসাবে ধরনি। এমনিতে দেখতে দশ পনের মিনিট তেমন কিছুই না, কিন্তু দিনে পাঁচ ছ' বার অমন হলে কিন্তু দেড় ঘন্টা এভাবেই চলে যাচ্ছে, সপ্তাহ শেষে দাঁড়াচ্ছে সাড়ে দশ ঘন্টা। 


মনে ধরল। আরও মনে ধরল পরের কথাটা। ওরা বলল, হারিয়ে যাওয়া সময়কে ধরতে একটা সপ্তাহ একটু ট্র্যাক করুন, কী কী কাজ করছেন। জিমেইলে ত একটা ক্যালেন্ডার ফ্রি ফ্রি আছেই। সেখানে লিখতে থাকুন পুরো এক সপ্তাহ প্রতি ঘন্টার হিসেব। দেখবেন একটা প্যাটার্ণ খুঁজে পাচ্ছেন। তখন বুঝতে সুবিধা হবে কোথা থেকে সময় কেটে কোথায় জোড়া লাগাতে হবে। 

গত দু'দিন ধরে কাজটা করছি। আপাতত এই সপ্তাহান্তের হিসাব বলছে ব্লগিং এর চেয়ে বহুগুণ বেশি সময় খরচ হচ্ছে ঘরকন্নায়। দেখা যাক আরো এক সপ্তাহ কী বলে! 

দুরন্ত সময়কে বেঁধে ফেলতে পরের টিপ ছিল মাল্টিটাস্কিং (একই সাথে কয়েকটা কাজ করা।) যেমন রাস্তা দিয়ে যেতে যেতে রেকর্ড করা ক্লাসের লেকচারগুলো একবার শুনে ফেলা। অলস ব্রাউজিং এর ফাঁকেই অনলাইন বিলগুলো দিয়ে ফেলা। ইউটিউব দেখতে দেখতে ঘরের হাল্কা কাজ, যেমন কাপড় গুছানো, ডিশ ক্লিনিং - এগুলো করে ফেলা। ভেবে দেখলাম আমি কিছু কিছু ক্ষেত্রে মাল্টি টাস্কিং করি। যেমন রান্না করার সময় তাফসিরের লেকচার শুনি, আর অলস ব্রাউজিং এর সময়টাতে লেখালেখি করি বা কাউন্সেলিং এর মেইলগুলোর উত্তর দেই। 

কিন্তু মাল্টিটাস্কিং করা যায় একটা হাল্কা কাজের সাথে একটা প্রিয় কাজকে জোড়া লাগিয়ে। যখন বিতিকিচ্ছিরি একটা কাজ করা দরকার, তখন? মানে বলতে চাইছি, জঘন্য খান তিরিশেক আর্টিকেল ঘেঁটে রিসার্চ প্রপোজাল দাঁড় করাতে হবে যখন, তখন? বা বসের চেহারা মনে করেই মেজাজ খারাপ হয়ে যায় এমন কোন কাজের ডেডলাইন যখন শেষ হয় হয়? তখন আমরা কী করি? 

দেখা গেছে এ সময়টাতে (অর্থাৎ চরম বিকর্ষণ হয় এমন কাজে) অমনোযোগিতার পরিমাণ অনেক বেশি থাকে। মানুষ হয় কাজটা ফেলে রাখতে রাখতে একদম শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত ফেলে রাখে (প্রোক্র্যাস্টিনেশন), অথবা আগে শুরু করলেও সময়টা ঠিকমত কাজে লাগায় না। আমি আমার বেলায় দেখেছি, চারদিনব্যাপী একটা রাইটিং ওয়ার্কশপে নিয়ম ছিল তিনঘন্টার একেকটা সেগমেন্ট এ বসে টানা লিখতে হবে। একেকসময় মাথার তার ছিঁড়ে যাওয়ার মত অবস্থা হয়, মনে হয় সব ছেড়েছুড়ে দিয়ে বিবাগী হয়ে যাই। কী যে অসহ্য লাগে! স্বাধীনভাবে পড়াশুনা করার সময় ত আর কেউ নিয়ম করে রাখেনা! তাই মনে বিরাগের উদয় হলেই আমরা ইউটিউবে পালাই। 

এসব ক্ষেত্রে ওদের পরামর্শ ছিল, একদিনের কাজের তালিকায় যদি সমান গুরূত্বপূর্ণ দু'টো কাজ থাকে, তাহলে কঠিন আর করতে ভাল লাগেনা এমন কাজটা আগে করা (অথচ আমরা ঠিক তার উল্টোটাই করি সবসময়।) 

তালিকার কথায় যখন আসলামই, আরেকটা কথা বলে শেষ করি। কোন একটা সময় করে মাসিক, সাপ্তাহিক আর দৈনিক কাজের তালিকা করে রাখলে ফোকাস ঠিক রাখা যায়। কিন্তু প্রথম প্রথম তালিকা করতে নিলে আমরা উৎসাহের চোটে পৃথিবীর যাবতীয় ভাল কাজের লিস্টি করে ফেলি। তা করা যাবেনা। রিয়েলিস্টিক হতে হবে। ঐ যে বললাম এক সপ্তাহ নিজের রুটিন ট্র্যাক করা - ওটা করে তারপর যদি দেখা যায় দিনে ক্রিকেট খেলা অবলোকন বাবদ দশ ঘন্টা সময় ব্যয় করেন, তাহলে রুটিনে তাই লিখুন, এক লাফে একঘন্টায় নামিয়ে আনতে যাবেন না যেন! দিনের রুটিনে ভারসাম্য বজায় রেখে প্রিয় কাজ, অপ্রিয় কাজ, বিশ্রাম - সব মিলিয়েই একটা প্ল্যান করুন। মনে রাখবেন, যে প্ল্যান মেনে চলা সম্ভব না, সেটা আসলে কোন প্ল্যানই না, সেটা ফ্যান্টাসি। 

সুন্দর করে প্ল্যান করলেই কিন্তু কাজ শেষ না। নিয়মিত প্ল্যানটাকে ঝালাই করতে হবে। কী লিখেছিলাম, তার কতদূর সফল হতে পেরেছি - সফল না হলে কোন্ কোন্ বিষয়গুলোর কারণে হতে পারিনি - এসব খতিয়ে দেখে আবারো প্ল্যানটা গুছাতে হবে.. ইত্যাদি ইত্যাদি। 

সব মিলিয়ে, এখন কীভাবে সময় কাটাচ্ছি, আর কীভাবে কাটানো উচিৎ - সেটার মধ্যে সামঞ্জস্য করাই টাইম ম্যানেজমেন্ট। মুসলিমদের জন্য ত টাইম ম্যানেজমেন্ট অপরিহার্য। সূরা আসরে ত আল্লাহ বলেই দিয়েছেন টাইম ম্যানেজমেন্ট না জানা সব মানুষ বিপদের মধ্যে আছে।

Monday, October 1, 2012

সহজ ছোট ভাল কাজ


আমাদের জীবনটা খুব ছোট তার মধ্যে এক চতুর্থাংশ চলে যায় বড় হতে, শিখতে, বুঝতে বড় হওয়ার পরেও তিন ভাগের একভাগ কাটে ঘুমিয়ে আর নিত্য প্রয়োজনীয় কাজ সারতেই বাকি এত অল্প সময়টার মধ্যে পড়াশুনা, চাকুরি, ব্যবসা - এসব করব কী, সংসার চালাব কী.. আর আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য কাজই বা করব কী?

আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য কাজ করাও চাট্টিখানি কথা নয়, আগে জানতে বুঝতে হবে, নিয়্যতটাকে পরিষ্কার করতে হবে, তবেই না! এসব করে সেরে মোটামুটি সংসারের দায়িত্ব সেরে টেরে হিসেব মেলাতে গেলে দেখা যায়, ওমা! কবে জীবনের দুই তৃতীয়াংশ শেষ করে ফেলেছি, টেরই পাইনি! এখন এই শেষ সময়ে তড়িঘড়ি করে দানের টাকা দিয়ে ফেলা, একটু বেশি করে তজবি জপা.. সারাদিন জায়নামাজে বসে থাকা - এসব করতে হয়

কিন্তু ওসবেও সমস্যা আল্লাহ চান ভারসাম্যপূর্ণ জীবন যখন যেখানে সুবিধা সেখানে হেলে পড়লে আর ভারসাম্য হল না আল্লাহ চান আপনি যখন অফিসের কাজে দম বন্ধ হয়ে যাচ্ছে, তখনও আল্লাহ কে খুশি করুন, ছেলে মেয়ে দুটোর পরীক্ষা পরদিন সকালে - সিলেবাস শেষ করাতে করাতে আল্লাহকে মনে করুন.. এমন তাহলে কীভাবে হবে?

এজন্যই, আমরা দিনের একেবারে খুঁটিনাটি ঘটনায় আল্লাহকে এনে ফেললে আর দিন শেষে তজবির উপর ভরসা করে থাকতে হবে না এখানে অত্যন্ত সরল সোজা কিছু টিপস্ দেই

প্রতিদিন একটু হাঁটা হয়না? হাঁটার সময়টা কী করেন আপনি? পা দিয়ে হাঁটাই হয়, মনটা দিয়ে কী করা হয়? কিছুই না, তাইনা? এদিক ওদিক তাকিয়ে দেখা, আগের বা পরের কিছু ভাবা - এসবই ! এখন থেকে হাঁটার ছন্দের সাথে ছোট দু' (যেমন সুব-হা-নাল্-লাহ, ওয়ালহাম-দু-লিল্-লাহ, ওয়ালা-ইলাহা-ইল্লাল্-লাহু, ওয়াল্-লাহু-আক্ব-বার, অথবা সুবহানাল্লাহি ওয়া বিহামদিহী সুবহানাল্লাহিল আযীম) মিলিয়ে পড়তে পড়তে হাঁটবেন প্রথম প্রথম মনেই থাকবে না পড়ার কথা তারপর একটা সময়ে পুরোপুরি প্রোগ্রাম হয়ে যাবে মাথার ভেতর দিনে কত কদম হাঁটা হয়? দুহাজার? প্রতি ষোল কদমে যদি একবার করে দু'আটা শেষ করা হয়, দিন শেষে কতগুলি নেকী জমা পড়ল? কোন কষ্ট ছাড়াই?


এই গেল হাঁটা গোনাগুনির কাজ করতে হয়না? আটটা ডিম, 'টা কলম, তিন তলা, কুড়িটা সিঁড়ি? এক দুই তিন করে না গুণে 'সুবহানাল্লাহ' 'ওয়ালহামদুলিল্লাহ' 'ওয়া লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু' 'ওয়াল্লাহু আক্ববার' - এভাবে চার চার করে গুণে ফেলুন একদম কোন ঝামেলা ছাড়া আরও আট দশবার দুআ পড়া হয়ে যাবে গায়েই লাগবেনা

তারপর নতুন সূরা শেখা হয়না কতবছর হল? শিখতে চান? পছন্দের তিলাওয়াতকারীর তিলাওয়াতের এমপিথ্রি চালিয়ে দিয়ে রাখুন মোবাইলে, গাড়িতে, ঘর গুছানোর সময় - গানের মত পুরোটা মাথায় কপি হয়ে যাবে দু'সপ্তাহ পর এভাবে শুনে শেখার আরো সুবিধা হচ্ছে উচ্চারণও শুদ্ধ হবে, কোথায় কতটুকু বিরতি দিতে হবে, সব জানা হয়ে যাবে

ক্লাসে যাবেন, বাজারে যাবেন, অফিসে যাবেন, জ্যামে বসে আছেন, মেজাজটা তিরিক্ষি - সময়টা কাজে লাগান একটা অডিও লেকচার শুনে সেটা হতে পারে কুরআনের তাফসির, নবীদের জীবনী, পারিবারিক সম্পর্কের উপর ইসলামিক আলোচনা.. শুধু যে মেজাজ রক্ষা পাবে তাই না, অলস সময়টাতে অনেক ভাল ভাল চিন্তা মাথায় চলে আসবে হঠাৎই হয়ত মনে হবে, 'আরে! এই কাজটা করা যায়!' ব্যাস, কোন রিকশাওলা কোন দিক দিয়ে ঢুকে গেল - এসব দেখে আর মেজাজ খারাপ হবে না আপনি আর আপনার সময় নষ্ট করছেন না! ওরা যা ইচ্ছে করুক না!

এগুলো ছিল একদম কোন আয়াস ছাড়াই সওয়াব কুড়ানোর পদ্ধতি এবার আসি একটু শ্রম দিতে হয় এমন কাজে বন্ধুদের সাথে আড্ডা দিতে ভাল লাগে? তক্কে তক্কে থাকুন, কখন অসুস্থ হয় (তাই বলে আবার দোয়া করতে যাবেন না যেন অসুখে পড়ে); হলেই মিস নেই, দেখতে যান, ফোন করে খোঁজ নিন, অন্য সময়ের চেয়ে দুইবার বেশি ফোন দিন শুধু বন্ধুর অসুখই না, বন্ধুর পরিবারের যে কারোর বেলায়ও আল্লাহ ভীষণ খুশি হন এসব কাজে আর তার উপর যদি আল্লাহকে খুশি করার নিয়্যতে করেন, তাহলে ডাবল লাভ!!

দাওয়াতে কোন মুরুব্বী কারও সাথে দেখা হয়? নানু দাদু শ্রেণীর, যারা পার্টি টার্টিতে চুপচাপ এক কোণে বসে থাকেন, সবাই দেখা হলে সালাম দিয়ে চলে যায়, কিন্তু কথা বলে না এমন বয়সের? পাশে গিয়ে বসে কথা বলতে শুরু করুন এমনভাবে আধা ঘন্টা গল্প করুন, যাতে তাঁর মনে হয় এই সমাবেশে উনার সাথে সময় কাটিয়েই আপনি সবচেয়ে বেশি মজা পাচ্ছেন চলে আসার সময় দেখবেন প্রাণঢালা দোয়ার ওজনে হাঁটতে পারছেন না

পরিচিত মানুষজনের সাথে এমনভাবে নরম করে কথা বলা শুরু করুন, যাতে কেউ সমস্যায় পড়লে আপনার কাছে বলতে ভরসা পায় তারপর সমাধান করতে পারেন না পারেন, একটু সুন্দর করে বলুন, 'হ্যা... সত্যিই ... আসলেই সমস্যা... ধৈর্য ধরে থাকেন ভাই! আপনার অনেক ধৈর্য মাশাআল্লাহ!' হয়ে গেল! সে ভাই খুশি, আল্লাহ খুশি, আপনি খুশি খুশিই খুশি


যদি দেখেন কেউ একটা ভাল উদ্যোগ নিয়েছে, কিন্তু কাজটা সুন্দর করে হয়নি দেখে অনেক সমালোচনা করছে সবাই... খুব উৎসাহ দেখান বলুন, জিনিসটা খুবই ভাল হয়েছে সে যখন উৎসাহে টগবগ করতে থাকবে - তখন না হয় সময় নিয়ে ধীরে সুস্থে খুঁতগুলো ঠিক করার পরামর্শ দেবেন ভাল কাজে এই যে উৎসাহ দিলেন, চালিয়ে যাওয়ার পরামর্শ দিলেন - এতে করে আল্লাহ সে ভাল কাজের সওয়াবে আপনারও একটা অংশ লিখে রাখবেন ইনশাআল্লাহ


ফিরে আসি হাঁটার কথায় আবারো চাইলে এক জোড়া গ্লাভস/পলিথিন সাথে করে বের হতে পারেন রাস্তায় ঠোঙা, পেপসির ক্যান, পলিথিন পড়ে থাকতে দেখলে তুলে ডাস্টবিনে ফেলে দেবেন রাস্তার জিনিস পলিথিন মোড়া হাত দিয়ে ধরলে কিন্তু হাত খসে পড়ে যায় না আমরা টাকা ধরার সময় আরো অনেক জীবাণু ধরি আর ভাববেন না, আমি মিউনিসিপ্যালিটির পয়সা বাঁচানোর জন্য আপনাকে দিয়ে ফ্রি ফ্রি কাজ করাচ্ছি এগুলো সব সদকা আখিরাতে ভাল কাজের পাল্লা ভারি করার কিছু ফ্রি টিপস

Monday, September 24, 2012

রিলে রেস্ (একটি আটপৌরে কথোপকথন)

আজকে সকালে নাস্তার পর চা খেতে খেতে স্বামী স্ত্রীতে আলাপ হচ্ছিল। প্রসঙ্গ, যাকাতের টাকাটা কোথায় খরচ করলে ভাল হয়। আমাদের সাধ্য অল্পই, তাই যাকাত ছাড়া অন্য সময় এতটা অর্থ একবারে দান করার সুযোগ হয়না। তাই এ সময় আমরা আমাদের ইচ্ছার/স্বপ্নের সর্বোত্তম প্রয়োগ করার চেষ্টা করি। আমার স্বামীর ইচ্ছা সেল্ফ সাস্টেইনেবল প্রজেক্ট চালাবে, এবং একটা পরিবারকে হলেও স্বনির্ভর করে দেবে, আমার ইচ্ছা জ্ঞান ও মেধার বিকাশ হয় এমন যে কোন প্রজেক্টে, যত সামান্যই হোক, অবদান রাখব। 

এভাবেই কথা বলতে বলতে আমেরিকায় হামজা ইউসুফ পরিচালিত জয়তুনা কলেজের কথা আসল। এটি একটি লিবারেল আর্টস কলেজ। সেখান থেকে ভবিষ্যতের ইবনে তাইমিয়্যা, ইমাম গাজ্জালি, তারিক রামাদান বের হবেন, এমনই স্বপ্ন দেখি আমি। আমার স্বামী বরাবরই বাস্তবমুখি চিন্তা ভাবনার মানুষ। উনি বললেন, "ঠিক আছে। মুসলিম দার্শনিকের দরকার আছে, যারা ধর্মের সাথে জীবনাচারের সামঞ্জস্যের নতুন নতুন রূপরেখা নির্দেশ করবে। কিন্তু একটা আন্ডারগ্র্যাজুয়েট কলেজ খুলে তার কতদূর হবে? সদ্য হাইস্কুল পাশ করা একটা ছেলের/মেয়ের ম্যাচিউরিটি ত কখনই এতখানি হবে না যে সে তারিক রামাদানের লেভেলের চিন্তাভাবনা করবে। আর জয়তুনা কলেজের কারিকুলামে যা আছে, তা মদীনা ইউনিভার্সিটি বল, আল আজহার বল... এসব প্রতিষ্ঠিত বিশ্ববিদ্যালয়ে ত চলে আসছেই। আমার মতে ওদের উচিৎ মাস্টার্স বা পিএইচডি চালু করা, যেখান থেকে একেবারে ফাইনাল প্রোডাক্ট হয়ে থিংকাররা বের হবে, যারা সরাসরি কমিউনিটি তে কাজ করার উপযোগিতা নিয়ে আসবে। আবার দিনরাত্রি চিন্তাভাবনা করে, এমন লোকজনই বা ক'টা পাবে? আমার ত ভাল লাগেনা, তোমার হয়ত তাও কিছুটা ভাল লাগে।" 

চুপচাপ চায়ের কাপে চুমুক দিতে দিতে কথাগুলো মনের মধ্যে আনাগোনা করলাম। তারপর বললাম, "তারিক রামাদানদের তাত্ত্বিক কথাবার্তা সমাজ পর্যন্ত পৌঁছাতে এক ধাপে হবে না। তার আর সমাজের মাঝখানে অনেকগুলো ধাপ আছে। আমি হয়ত রামাদানের কথা কিছুটা বুঝি, আমার সোশ্যাল সায়েন্সে পড়া বান্ধবী আরো ভাল বোঝে। তুমি যদি আরো কম বোঝ তাতেও ত কোন সমস্যা নেই। কারণ তোমাকে দেখেছি, যে কোন তত্ত্বীয় দিকের প্রয়োগটা খুব সুন্দর করে প্ল্যান করে ফেলতে পার। আমি যেমন তত্ত্বকথা নিয়ে পড়ে থাকতে ভালবাসি, তুমি সে আইডিয়াটা ভাল হলে সর্বোচ্চ প্রয়োগ কীভাবে করা যায় সাথে সাথে বের করে ফেলতে পার। সুতরাং তুমি সরাসরি ওদের কথা বোঝনা মানে কিন্তু এই না, তোমাকে ছাড়াও মুসলিম উম্মাহর চলবে, বা তোমার মুসলিম কমিউনিটি কে দেয়ার মত কিছু নেই।" 


কিছুক্ষণ বিরতি। বোধহয় কথাগুলো মনে ধরল। তারপর বলল, "আমি চাই মুসলিমরা জাগতিক উৎকর্ষের দিক থেকে ইহুদিদের মত হবে। ছোট্ট একটা জাতি, কী নেই তাদের? বিজ্ঞানে এগিয়ে আছে, মিডিয়া তাদের দখলে, প্রচুর টাকা.." আমি থামিয়ে দিয়ে বললাম, "কেন, আমাদের মুসলিমদের কি ব্যক্তি পর্যায়ে টাকাপয়সা নেই?" "আছে! ডাক্তারদের আছে! কিন্তু তারা গিয়ে টাকা ঢালে মসজিদে। মসজিদগুলিও দানের টাকা তার সৌন্দর্যবর্ধনের কাজেই লাগিয়ে খুশি থাকে! অথচ হওয়া উচিৎ ছিল এমন, বাল্টিমোর একটা কমিউনিটি, এখানে এতজন মুসলিম ডাক্তার থাকতে হবে, এতজন লইয়্যার থাকতে হবে, সিনেটে লোকজন থাকতে হবে। তারপর হিসাব করতে হবে, এর কতটুকু এখন আছে। তারপর মসজিদভিত্তিক স্কুলগুলোতে ছাত্রবৃত্তির ব্যবস্থা করতে হবে, তুমি যদি হাইস্কুলের পর এই লাইনে যাও, বৃত্তি পাবে।" 

কথাগুলো এত ভাল লাগল, বলে ফেললাম, "ইনশাআল্লাহ! আমরা আমাদের ছেলে/মেয়েকে ল' পড়াব, যদি তার যোগ্যতা ও ইচ্ছা থাকে। আর সাধ্যের মধ্যে থাকলে এমন মেধাকে বিকাশে সাহায্যও করব।" তারপর বললাম, "দেখ, তুমি মসজিদ কমিটিকে দোষ দিতে পারনা। তারা তাদের যোগ্যতার মধ্যে থেকে যা করার করেছে। তাদের লিমিটেশন আছে। কমিউনিটি কে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার প্রথম ধাপ ছিল মসজিদ তৈরি করা, সে মসজিদে মানুষকে আকৃষ্ট করা। সেটা উনারা করেছেন। ভবিষ্যতের চিন্তা করে এভাবে প্ল্যান করাটা উনাদের যোগ্যতায় কুলাবে না।" কী বলতে চাইছি, বুঝতে পেরে বলল, "কিন্তু আমার মত মানুষ ত কেবল প্ল্যান দিয়ে আর সংগঠকদের একটু সমালোচনা করেই সারা। আমরা ত এগিয়ে গিয়ে কাজ করব না। কাজ করার জন্য আরো অনেক বেশি কর্মঠ, গোছানো, ডেডিকেটেড হতে হয়। আমি প্ল্যান দিলেই কী আর না দিলেই কী?" 

চুপ করে থাকলাম। এভাবেই সুন্দর ভাবনার চারাগুলো আলো, পানি, হাওয়া না পেয়ে মারা যায়। এই মানুষটাকে যদি ঠিকভাবে বলতে না পারি, সে হয়ত কখনোই বুঝবে না, এভাবে চিন্তা করার মত আন্তরিক মনের সংখ্যা কত কম! 

বললাম, "দেখ! তুমি এই যে চিন্তাটা করলে, এইটাই কিন্তু তোমার স্বকীয়তা ছিল। অর্গানাইজ করা, এক্সিকিউট করা - এসব না করার দোষ তোমার উপর চাপিয়ে দিলে তোমার উপর অন্যায় করা হবে। মসজিদ কমিটির লোকদের লিমিটেশন আছে সুদূরপ্রসারী চিন্তা করতে পারেনা। সে অভাবটা তুমি পূরণ করছ। তোমার আমার লিমিটেশন আছে, আমরা কোন কিছুর জন্যই সময় বের করতে পারিনা। আমরা কী করব - বড়জোর মসজিদ কমিটির যে বড় ভাই কে চিনি, উনাকে গিয়ে বলব। উনি অন্যদের থেকে একটু আলাদা, কিন্তু উনারও সীমাবদ্ধতা আছে। উনিও কাজটা একা করতে পারবেন না। এজন্যই সবাই মিলে কাজ করাটা খুব বেশি দরকার। সামুদ্রিক কোরালের মত এক কণা এক কণা ইনপুট দিয়ে পুরো জিনিসটা গড়ে উঠবে। আর যে যেখানে পায়, তার যোগ্য মত জায়গাটা খুঁজে নেবে। তার পক্ষে যেটুকু করা সম্ভব, সেটুকু করে আসবে। তোমার কাজ ছিল আইডিয়া দেয়া। তুমি দিয়েছ। তোমার ত মন খারাপ করার দরকার নেই, তুমি এক্সিকিউট করতে পারনা বলে। এক্সিকিউট করা তোমার কাজ না। এক্সিকিউট করার মানুষ বের হয়ে যাবে ইনশাআল্লাহ।" 


কাপের চা শেষ হয়ে ঘড়ির কাঁটা বেয়াড়া রকমের সামনে চলে গেল। আমাদেরও ল্যাবে যাওয়ার জন্য উঠতে হল। বের হওয়ার প্রস্তুতি নিতে নিতে মনে হল, আমরা সবাই একটা সুদীর্ঘ রিলে রেস এ অংশ নিয়েছি। রেস এ কার দৌড় আগে, কার পরে, সেটা জরুরি না, যে দায়িত্বটা দেয়া হয়েছে, সেটা অন্যজনের তুলনায় সম্মানের না অসম্মানের - সেটাও জরুরি না। ব্যাটনটা এখন আমার হাতে, সেটা নিয়ে সময়ের মধ্যেই পরের জনের হাতে তুলে দিতে হবে - এটাই কেবল জরুরি।

Wednesday, September 5, 2012

বিজ্ঞানীদের সম্মেলনে বসে দার্শনিক চিন্তাভাবনা

সায়েন্সের নাকি অদ্ভুত সৌন্দর্য আছে। আমার এক সহপাঠী বিজ্ঞানের নিত্য নিত্য সৌন্দর্য আবিষ্কার করে গদগদ্ হয়ে আমাকে বলে। আমি মুখ ব্যাদান করে শুনি আর নিজের এক্সপেরিমেন্ট কে একশ' বার গাল দেই। কেন ঈস্ট ভদ্রলোকগুলি হঠাৎ করেই কাজ করা বন্ধ করে দেয়, কেন যে তুচ্ছ থেকে তুচ্ছতম পরীক্ষাগুলিও সমাধা করতে গলদঘর্ম হতে হয়, কে দেবে তার জবাব! ক্যালেন্ডারের পাতায় তাকিয়ে হা পিত্যেস করি, কে তুলে দিল দিনগুলিকে রেসের ঘোড়ায়? কেন পাঁচটা কাঁচের বোতল আর ছ'টা পেট্রিডিশ এলোমেলো করে দিল আমার দিনরাত্রির সব হিসাব? 

পিএইচডির অন্য স্টুডেন্টদের এসব বললে তারা মুখ টিপে হাসে। সবাই নাকি অমন হতাশার মধ্য দিয়ে যায়। অন্যদের তখন জিজ্ঞাসা করি, তখন কী কর তোমরা? বলে, 'কী আর করব? বাসায় ফোন করে ঘ্যানঘ্যান করি, বলি সব ছেড়েছুড়ে যাব গিয়ে।' কেউ বলে, সব বাদ দিয়ে ঘুরে আসি বা ইচ্ছেমত গিলি। তারপর আবার সুস্থ হলে ফিরে আসি। আমি ত এগুলো কাজে লাগাতে পারিনা। আমি কেবলই হন্যে হয়ে খুঁজে ফিরি প্যাশন, পারস্পেক্টিভ, মিশন, গোল... বার বার জিজ্ঞাসা করি, কেন করছি? কী হবে করে? এছাড়া আর কিছু কি পাওয়া গেল না করার? 

আমার এক দার্শনিক বন্ধু, যার জীবনের লক্ষ্যই হচ্ছে বিজ্ঞানের মাঝে দর্শন খুঁজে বেড়ানো - সে একদিন বলল, গুরুর কাছে দীক্ষা নিতে গেলে প্রথমে তাকে অনেকগুলো অর্থহীন আচার পালনের মধ্য দিয়ে যেতে হয়। জীবনের সৌন্দর্য এখানেই, আপাত অর্থহীন কাজের মধ্যেও সৌন্দর্য খুঁজে পাওয়া। তুমি গবেষণার মাঝে এখন আর মানবকল্যাণ খুঁজে পাওনা, তুমি পুরো প্রক্রিয়াটার মাঝে সুন্দর খুঁজতে থাক! মানুষ ফিলোসফি দিয়ে বিজ্ঞানকে উন্নত করে, তুমি না হয় বিজ্ঞানের মাঝে ফিলোসফি খুঁজলে!

অর্ধেক বুঝলাম, অর্ধেক বুঝলাম না। কষে কতক্ষণ কটুকাটব্য করলাম। 

এর মাঝে জীবনে প্রথমবার ভীনদেশে একটা কনফারেন্সে যাওয়ার সুযোগ হল। ভিসা জোগাড় থেকে শুরু করে স্বামীর ক্যান্ডিডেসি পরীক্ষা সহ পোস্টার বানানোর বিভিন্ন হ্যাপা সামলে শেষ পর্যন্ত যখন প্লেনে চড়লাম, পাশে বসা কলিগ কাম স্বামীকে বললাম, আল্লাহ যে আমাদের কী পরিমাণ স্ট্রেস সহ্য করার ক্ষমতা দিয়েছেন তা আজকে বুঝলাম। আর কোনদিন কাজের চাপ নিয়ে অনুযোগ করব না। এই কনফারেন্সের জন্য পোস্টার বানাতে গিয়ে যখন একটার পর একটা পেপার ঘাঁটছি পাগলের মত, হঠাৎ করেই দেখলাম, আগে সায়েন্টিফিক পেপারের প্রতি যেমন একটা পূজনীয় শ্রদ্ধা ছিল, এখন আর তা নেই। এখন কেবল আমার দরকারি তথ্যটা কেটে ছেঁটে নিয়ে বাকিটা সম্পর্কে নিরপেক্ষ একটা মনোভাব দেখিয়ে রেখে দেই। তখনই মনে হল, মানুষের সাথে মানুষের সম্পর্কটাও ত ঠিক এমনটাই হওয়ার কথা। এক্সপ্লোর করব, এক্সপ্লোর করব... যেটুকু কাজে লাগে নিব... তারপর বাকিটা নিয়ে ভাল না খারাপ ওসব বাছবিচারেই যাব না। (হ্যা, সৎ কাজের উপদেশ, অসৎ কাজ থেকে বিরত থাকতে বলা এসব আছে... কিন্তু সে অন্য প্রসঙ্গ) 

এত বড় আর নামী দামী কনফারেন্সে আগে যাইনি, তাই একটু ভয়ে ভয়ে ছিলাম। পোশাক আশাক না জানি কেমন পরতে হয়.. দেখলাম খুব ক্যাজুয়াল কাপড়েও বড় বড় বিজ্ঞানীরা টক দিচ্ছে। কী পরল এটা কোন ব্যাপারই না। ভাল লাগল দেখে। হ্যা, রুচিশীলতার ছাপ আছে মোটামুটি সবার পোশাকে, কিন্তু মেকি ভাবটা নেই। 

প্রতিটা টক শেষে প্রশ্নোত্তর পর্বে অন্যান্য বিজ্ঞানী, বা ছাত্রছাত্রীরা প্রশ্ন করে। হয়ত কিছু অংশ বুঝতে পারেনি, এভাবে অনুরোধ করে, 'তুমি বোধহয় আগেই বলেছ, আমি মিস করে গেছি... তুমি কি এই অংশটা আবার একটু বলবে?' কেউ বলে না যে, 'তোমার কথার মাথামুন্ডু বোঝা যাচ্ছেনা' - যেমনটি আমরা নন-একাডেমিক আলোচনায় বলি। আবার কিছু প্রশ্ন হয় এমন, 'তুমি ত বললে এই এই কারণে এটা এটা হয়। অন্য কোন কারণ কি থাকতে পারে? এই যেমন...' তখন আবার সবাই মিলে মাথা ঘামায়। উত্তরদাতা হয় বলে, হ্যা, তোমার কথায় যুক্তি আছে, আমাদের এটা পরীক্ষা নিরীক্ষা করে দেখতে হবে। অথবা বলে, 'ভাল প্রশ্ন, আসলে আমরা ইতিমধ্যে পরীক্ষা করেছি, পরীক্ষায় দেখেছি যে এটা আসলে হয় না।' পুরো ব্যাপারটার মধ্যে এত বিনয়, অন্যের জ্ঞানের প্রতি এত শ্রদ্ধা, নিজের জ্ঞানের সীমাবদ্ধতার প্রতি এত সচেতন... এত যে ভাল লেগেছে, কেবলই মনে হয়েছে, আহা! আমরা ইসলাম বোঝার বেলায় কবে এমন করে কথা বলতে পারব? 

ভালর সাথে খারাপও যে নেই তা কিন্তু নয়। বেশির ভাগ বিজ্ঞানীই নিজের করা এক্সপেরিমেন্টের রেজাল্টকে অন্যের রেজাল্টের চেয়ে বেশি গুরূত্ব দেয়। বয়স একটু বেশি হলে সে বোধটা গোয়ার্তুমির পর্যায়ে চলে যায়। আরেক বিজ্ঞানীর বহুকাল আগে দাঁড় করানো এক্সপেরিমেন্ট তার চেয়ে বয়সে অনেক ছোট, অন্য এক বিজ্ঞানী নিজের নামে চালিয়ে দিচ্ছে। এখন আর উনি সেই নতুন বিজ্ঞানীর কোন ডাটা, কোন পেপার বিশ্বাস করতে চান না। 

সে যাই হোক। কনফারেন্সের লাঞ্চ, ডিনার এ কে কোথায় বসছে কোন বিধি নিষেধ নেই। ইয়াব্বড় আইনস্টাইন মার্কা স্বপ্নের বিজ্ঞানীর সাথে কথা বলতে চাইলে টুক করে প্লেটটা নিয়ে পাশে বসে পড়লেই হল। এর পরে আর মনে হবে না যে সে কেউকেটা একজন। একদম কলিগের মত স্বাভাবিকভাবে কথা বলবে। পোস্টার সেশনেও তাই। আমার কাজ প্রেজেন্ট করা মানে আমি সবচেয়ে ভাল জানি। এ বিষয়ে কারো কোন মতবিরোধ নেই। তুমি যত বাঘা বিজ্ঞানীই হওয়া কেন, আমার পোস্টারের সামনে তুমি ছাত্র, আমি শিক্ষক। কেউ বক্তার যোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তুলবে না, বলবে না, আমার ল্যাব থেকে বছরে পাঁচটা পিএইচডি বের হয়, তুই কোথাকার চুনোপুঁটি রে! বড়জোর বলবে, আরো বেশি মেটারিয়াল থাকলে জিনিসটা আরো ভাল হত। আইডিয়া শেয়ার করবে.. ভবিষ্যতে কী কী করার প্ল্যান শুনে নিজেদের কোন আইডিয়া থাকলে বলবে ইত্যাদি ইত্যাদি। 

এই ত গেল বিজ্ঞানীদের সামাজিক আচার আচরণ। নিজেদের ল্যাবে আবার একেকজন একেক রকমের। গ্র্যাড স্টুডেন্টরা এক হলে সবচেয়ে বেশি কথা বলে নিজেদের রিসার্চ নিয়ে, আর একটু আপন হলে সুপারভাইজর নিয়ে। এই অসাধারণ সব গবেষণার পুরোধাদের মধ্যে অনেকেই হয়ত বস হিসেবে জঘন্য, আবার হয়ত যে ভাল বস্, তার কাজ হয়ত এমন কিছু না। আবার কেউ হয়ত ভাল গবেষক, ভাল সুপারভাইজর, কিন্তু পারিবারিক জীবনে দুঃখজনক রকমের এলোমেলো। এসব দেখি আর ভাবি, সম্মান জিনিসটা আস্ত মানুষটার প্রতি না দেখিয়ে খন্ড খন্ড আচরণের প্রতি দেখালে ভাল। আমি তোমাকে তোমার কাজের জন্য শ্রদ্ধা করি, কিন্তু উন্নাসিকতার জন্য অপছন্দ করি। তোমার ছোট মন দেখলে আমার গা জ্বলে যায়, তাই বলে তোমার রিসার্চ এর ডাটা গ্রহণ করতে আমার কোন আপত্তি নেই। 

তেমনি করে, অনেক বড় বিজ্ঞানীও যখন একটা ডাটা দেখিয়ে বড়সর উপসংহার টানতে চায়, সবাই তির্যক চোখে তাকায়। তুমি বাপু যত বড় বিজ্ঞানীই হওনা কেন, কথায় যুক্তি না থাকলে আমি তোমাকে ধুই না। এ থেকে বি হয়, বি থেকে সিতে না গিয়ে সোজা ডি তে চলে গেলে - এটা কি মগের মুল্লুক নাকি? আমি দেখি আর ভাবি, হায়! ইসলামিক স্কলারদের (বিশেষ করে নর্থ আমেরিকান চোস্ত ইংরেজি বলা স্কলারদের) প্রতি এই দৃষ্টিভঙ্গিটা আমাদের থাকলে কতই না ভাল হত! মানি, উনারা যা বলেন, সবই অনেক বেশি তথ্যনির্ভর। কিন্তু উনাদেরও ত কখনও সখনও বোঝায় ভুল হতে পারে! আমাদের চেয়ে অনেক কম ভুল হবে উনাদের, এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু টেক্সট এর পাশাপাশি তাদের নিজস্ব ইন্টারপ্রিটেশন ও যখন মানুষ চোখ বন্ধ করে নিতে চায়, তখন মন মানে না। 

যে কোন বক্তব্য শোনার পর নিজের বোধ বুদ্ধি, পরিস্থিতি অনুসারে যাচাই বাছাই করা, একই সাথে, আমি যেটা বুঝি, সেটাই সবসময় ঠিক নাও হতে পারে, অন্যরাও ঠিক হতে পারে - এই উদারতাটা থাকা - এই যে পারস্পরিক সম্মান ও আত্মসমালোচনার একটা সুন্দর পরিবেশ - সেটাই শিখে আসলাম 'ribosome synthesis' নামক খটোমটো কনফারেন্স থেকে। এখন একটু আধটু বুঝতে পারছি, সায়েন্স এ দর্শন এর প্র্যাক্টিসগুলি বহুকাল ধরে হচ্ছে, তাই জীবনের অন্যান্য ক্ষেত্রেও কিছু দরকার পড়লে সায়েন্স থেকে ধার করে নেয়া যেতে পারে। এ ব্যাপারটা আমার অনেক আগে আমার সেই বন্ধু ধরতে পেরেছিল বলেই বিজ্ঞানের প্রতি তার এত মোহ।