Monday, August 1, 2011

চাবির রিং

আমি এক পরিচিত বড় ভাইকে দিয়ে কষ্টে মষ্টে আমার বোনের কাছে একটা চাবির রিং পাঠিয়েছি। সুদূর আমেরিকা থেকে বাংলাদেশ, তিন হাত ঘুরে একখানা চাবির রিং - বারো হাত কাঁকুড়ের একশ তের হাত বিচি। তাও জিনিসটা দেখতে সুন্দর হলে কথা ছিল। একটা অর্ধেক কাটা পাথর, আমাদের জাফলং এ গেলে হাত ভরে নিয়ে আসা যায়।

খনিজ পাথর যে কত রকমের হয়! ভার্জিনিয়ায় Luray Cavern নামে একটা গুহা আছে, উপর থেকে ফোটা ফোটা পানি পড়ে পড়ে ইয়া বড় বড় স্তম্ভ তৈরি হয়েছে। ছোট বেলা রকিব হাসানের তিন গোয়েন্দাতে স্ট্যালাকটাইট, স্ট্যালাগমাইট এর কথা পড়ে মোটামুটি একটা আইডিয়া ছিল এইগুলি কীরকম হয়, কিন্তু গিয়ে দেখি এলাহী কারবার! কত রকমের যে স্ট্রাকচার! সুবহানাল্লাহ, শুধু পানির ফোটার সাথের ক্যালসিয়াম কার্বনেট জমে জমে এরকম মিনারের মত, পর্দার মত, আলাদীনে আঁকা রাজপ্রাসাদের মত - কত কিছু তৈরি হয়ে বসে আছে - দেখে গায়ে কাঁটা দেয়। তবে লুরে তে সমস্যা হচ্ছে রঙের খুব বেশি বৈচিত্র নেই। হলদেটে লাল একটা রং, এইটাও অবাক লাগে, শুধু প্যাটার্ণ দিয়েই কত রকম ইয়ে করা যায়! এর সাথে যদি রং যোগ হয়, মাথা ঘুরে যায়। বিশ্বাস না হলে উইকি তে লিস্ট অব মিনারেলস এ ঢুকে দেখতে পারেন। আমার সবচেয়ে ভাল লাগে মালাকাইট। যেমন রং তেমন প্যাটার্ণ। সুবহানাল্লাহ!

এই পাথরদের আরো ভালবেসে ফেললাম আমিনাহ আস্সিলমির এক লেকচার দেখার পর। উনি বাচ্চাদের কাছে ডেকে একটা একটা করে পাথর দেখাচ্ছিলেন, বাচ্চারা ত খুব খুশি! উনি তখন বলছিলেন এগুলো আল্লাহ তৈরি করেছেন, আমাদের জন্য। একটা পাথর দেখালেন, সাদামাটা পাথর। কিন্ত মাঝখানে গোল মসৃণ একটা ফুটো। বছরের পর বছর ধরে এক ফোটা এক ফোটা করে পানি পড়ে এমন হয়েছে। উনি মা দের বলছিলেন, এটা হচ্ছে পেশেন্স। একবারে বদলাতে যান, ভেঙে যাবে, কিন্তু দীর্ঘ সময় ধরে অল্প অল্প করে বললে শক্ত পাথরও শেপ আপ হয়।

আরেকটা পাথর উপরটা খুব সাদামাটা। ভেতরের দিকে মুক্তো দানার মত ঝিকমিক করে। উনি বললেন ইসলাম বাইরে থেকে দেখতে এমনই, যত কাছ থেকে দেখবে, ততই এর সৌন্দর্য টের পাবে।

ঐ একটা লেকচার থেকে আমি অনেক কিছু শিখেছি। শিখেছি আল্লাহর ভালবাসাকে চিনিয়ে দিলে মানুষের আপনা থেকেই পরিবর্তন আসে। শিখেছি ছোট্ট ছোট্ট নিদর্শন থেকেও আল্লাহর স্মরণ করা সম্ভব। আল্লাহর সাথে প্রাথমিক পরিচয়ের জন্য কুরআনে এক্সপার্ট, আরবিতে তুখোড় হওয়ার দরকার নেই। নেচারের দিকে তাকালেই যথেষ্ট। আল্লাহ বলেন, তোমরা কি দেখনা কীভাবে পানিকে আকাশে উত্তোলিত করি, আর বৃষ্টি নামাই, আমরা পানি চক্র আবিষ্কার করে বলি, তাই ত! তাই ত! উনি বলেন, পর্বতকে পেরেক বানিয়েছি, ভূগোলে পর্বতের গঠন পড়ে আমরা মাথা চুলকাই, 'জানল কেমনে?' একাডেমিক পড়ার সাথে আমরা কুরআনের সম্পর্ক করতে শিখিনি। অথচ এগুলো আল্লাহর পারফেকশনের উদাহরণ - এটা মাথায় রাখলেই অনেক কিছু স্পষ্ট হয়ে যেত। শুধু বিজ্ঞানের বেলায় না, রিয়োল লাইফে একটা প্রবলেম আসুক, নিজের বুদ্ধিমত সলভ করে দেখুন, শেষ পর্যন্ত আবিষ্কার করবেন আল্লাহর দেয়া সলিউশন টা বেস্ট ছিল। আল্লাহ কুরআনে এক লাইনে স্বামী স্ত্রীর সম্পর্ককে 'garments for each other' বলে খালাস। এটাকে টানতে টানতে কমফোর্ট বের হয়, প্রটেকশন বের হয়, কমপ্লিমেন্ট করা বের হয়, ফ্লেক্সিবিলিটি ইত্যাদি ইত্যাদি।

পড়তে হবে, পড়ার কোন বিকল্প নাই। আমার খুব ইচ্ছা যদি আল্লাহ সুযোগ দেন সাইকোলজি, স্পিরিচূয়ালিটি, ফিলসফি নিয়ে পড়াশুনা করব। এসব সম্পর্কে কিছুই ত জানিনা, শুধু মনে হয় একটা খনিভর্তি না জানি কত রত্ন লুকানো আছে। নেট এ এখন কত ইনফরমেশন, পছন্দের টপিক নিয়ে পড়াশুনা করার কি কোন অসুবিধা আছে? ফেসবুকিং, আড্ডা, টিভি, মেয়ে মেয়ে, ছেলে ছেলে - এসব করতে কতক্ষণ ভাল লাগে সত্যি করে বলেন ত? একটা সময় 'দুচ্ছাই!' বলে সব ঝেড়েঝুড়ে উঠে পড়তে ইচ্ছ্া করে না? তখন প্লিজ একটু পড়াশুনা করেন, যেইটা নিয়ে মনে চায়, দেখবেন খুব ভাল্লাগবে।

আমিনাহ আস্সিলমির সেই ভিডিও আমাকে এত মুগ্ধ করেছে, আমি একটা চাবির রিং এ ওরকম সাদা এবড়ো খেবড়ো পাথর দেখে আমার বোনকে পাঠিয়েছি। জিনিসটা ওর হাতে পৌছানোর পর ওকে আমিনাহ আসসিলমির এই লেকচারের গল্প শোনালাম। ওকে বললাম, পাথরটা রোদে নিয়ে দেখিস একটা পিঠ কেমন রোদে ঝিলমিল করে। জিনিসটা কেনার পর আমি শুধু দোয়া করছিলাম, আল্লাহ, এই পাথরটার মতই আমার বোনের ভেতরটা সুন্দর করে দাও, বাইরে সে যেমনই হোক। তোমার দেয়া জ্ঞানের আলোয় ওও যেন ঠিক এমনি করেই ঝিকমিক করে।

1 comment: